ইতিহাসের পাতা থেকে : ফ্যাসিবাদ প্রসঙ্গে জর্জি দিমিত্রভ

fail

[হিটলার যখন জার্মানিতে ক্ষমতা দখল করে, তখন জীবন বাজি রেখে বুলগেরিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক জর্জি দিমিত্রভ মিখাইলভ বা জর্জি মিখাইলোভিচ দিমিত্রভ সেখানে ফ্যাসি-বিরোধী ইউরোপীয় শ্রমিকদের কংগ্রেসের প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ১৯৩৩ সৃষ্ট রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডকে সামনে রেখে হিটলার যখন কম্যুনিস্ট নিধন এবং নিজের ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, তখন তার সামনে এক অলঙ্ঘনীয় পর্বতের মত দাঁড়িয়ে যান দিমিত্রভ। অসীম নির্ভীকতার সঙ্গে তিনি ফ্যাসিবাদের বর্বরতা ও সন্ত্রাসমূলক নীতির মুখোশ খুলে দেন এবং প্রমাণ করেন যে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাস কায়েম করার লক্ষ্যেই নাৎসিরা বাহিনী রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত করেছে। আদালতের কক্ষের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি কমিউনিস্ট, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসহ সকল স্তরের শক্তিকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান জানান, এবং ফ্যাসিবাদী আঘাতের বিপ্রতীপে শ্রমিকশ্রেণীর যুক্তফ্রন্ট ও সকল স্তরের মানুষের গণফ্রন্ট গঠনের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করেন। কিন্তু মুখে চুনকালি মেখেও সেদিন হিটলার লজ্জিত হয়নি, যেমন হয়না কোনো ফ্যাসিস্তই। সে কায়েম করে নিয়েছিল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের শাসন, পৃথিবী আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু সত্যের পক্ষে যাঁরা থাকেন তাঁরা অত সহজে ভীত হন না। এহেন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে (১৯৩৪ সালের এপ্রিলে) কম্যুনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটির রাজনৈতিক সেক্রেটারি হয়ে তাই দিমিত্রভ প্রথমেই ঠিক করেন ফ্যাসিবাদকে খতম করতে হবে। তিনি দৃঢ় হাতে ফ্যাসিবাদের আক্রমণ ও যুদ্ধের ভয়াবহ বিপদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণী ও শান্তিকামী জনগণকে একত্র করার দুরূহ কর্তব্যে হাত লাগান এবং পুরনো হয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারণা ও কর্মকৌশল কে বাতিল করে এক নতুন পথনির্দেশ গ্রহণ করেন। । ১৯৩৫ সালের ২৫শে জুলাই থেকে ২০শে আগস্ট, মস্কোতে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দিমিত্রভ তাঁর বিপুল সৃজনশীল প্রতিভা মারফত আন্তর্জাতিকের অন্যান্য নেতাদের সহযোগিতায় সপ্তম কংগ্রেসের মূল রিপোর্টে প্রণয়ন করেন এবং তাকে ঘিরে যে সকল প্রশ্ন আবর্তিত হচ্ছিল তার উত্তর দেন। এই কংগ্রেসেই তিনি আন্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
সেই কংগ্রেসে দিমিত্রভ তৎকালীন বিশ্বে ফ্যাসিস্ট আক্রমণের প্রেক্ষিতে যে প্রতিবেদন পেশ করেন তার কিছু অংশ আমাদের পত্রিকায় আমরা প্রকাশ করলাম। আমাদের দেশের রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেই আলোচনা আজও গুরুত্বপূর্ণ পুনঃপাঠ বলে মনে হয়। ।

অংশটি নেওয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড’ থেকে প্রকাশিত “শ্রমিক ঐক্য : ফ্যাসিবাদ-বিরোধী দূর্গ” শীর্ষক বই থেকে। – অপরজন]

ফ্যাসিজমের জয় কি অনিবার্য?

ফ্যাসিজম কেন, কিভাবে জয়লাভ করলো?
ফ্যাসিজম শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী মানুষের সবচেয়ে মারাত্মক শত্ৰু। ফ্যাসিজম জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও অন্যান্য ফ্যাসিস্ট দেশের বাসিন্দাদের দশ ভাগের ন’ভাগ মানুষের শত্রু। কোন পথে, কি উপায়ে এই মারাত্মক শত্রু জয়ী হতে পারলো?
ফ্যাসিজম ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে প্রধানত এই কারণে যে, সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতৃবর্গ বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে শ্রেণী সহযোগিতার যে নীতি অনুসরণ করে চলছিল তার ফলে শ্রমিকশ্রেণী ছিল দ্বিধা বিভক্ত — বুর্জোয়াদের আক্রমণের সামনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে নিরস্ত্র। আর অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টিও এতটা শক্তিশালী ছিল না যে সোস্যাল ডেমোক্রাটদের বাদ দিয়ে এবং তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে চুড়ান্ত সংগ্রামের জন্য জনসাধারণকে উদ্ধুদ্ধ করতে পারে এবং তাদের নেতৃত্ব দিতে পারে।
লক্ষ লক্ষ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিক, যাঁরা আজ তাঁদের কমিউনিস্ট ভাইদের সঙ্গে একযোগে ফ্যাসিস্ট বর্বরতার ভয়াবহতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন, কথাটা তাঁরা যেন একবার গভীরভাবে ভেবে দেখেন। ১৯১৮ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় যখন বিপ্লবের আগুন জ্বলে ওঠে, তখন সেখানকার শ্রমিকেরা অস্ট্রিয়ায় অটো বাউয়ার, ফ্রিডরিশ অ্যাডলার ও কার্ল রেনার এবং জার্মানিতে এবার্ট এবং শাইডেমান প্রমুখ সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতৃবৃন্দকে অনুসরণ না করে যদি রুশ বলশেভিকদের পথ অনুসরণ করতেন, যদি অনুসরণ করতেন লেনিন-স্তালিনের পথ তাহলে অস্ট্রিয়া বা জার্মানি, ইতালি বা হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড বা বলকানে কোথাও ফ্যাসিজম কায়েম হতে পারতো না। অনেক আগেই তাহলে বুর্জোয়ারা নয়, শ্রমিকশ্রেণীই হতো ইউরোপীয় পরিস্থিতির ভাগ্যবিধাতা।
অস্ট্রীয় সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির দৃষ্টান্তই ধরা যাক। ১৯১৮ সালের বিপ্লব এই পার্টিকে অভূতপূর্বভাবে এগিয়ে দিয়েছিল। ক্ষমতা ছিল তাঁদের হাতে, সৈন্যবাহিনী এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ছিল তাঁদের সুদৃঢ় ঘাঁটি। এই ঘাঁটিগুলির উপর নির্ভর করে তাঁরা অনায়াসেই ফ্যাসিজমকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা বিনা প্রতিরোধে শ্রমিকশ্রেণীর ঘাঁটিগুলি একটার পর একটা ছেড়ে দিলেন। এরা বুর্জোয়া শ্রেণীকে তাদের ক্ষমতা বাড়াতে, শাসনবিধি বরবাদ করতে, রাষ্ট্রযন্ত্র, সৈন্যবাহিনী এবং পুলিশবাহিনী থেকে সোস্যাল ডেমোত্রাটিক কর্মকর্তাদের ঝেঁটিয়ে তাড়াতে এবং শ্রমিকদের হাত থেকে অস্ত্রাগার কেড়ে নিতে দিয়েছেন। এঁরা ফ্যাসিস্ট দস্যুদের হাতে যথেচ্ছভাবে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক কর্মীদের নিহত হতে দিয়েছেন। এরা মেনে নিয়েছেন হুটেনবুর্গ চুক্তির শর্ত, যার ফলে ফ্যাসিস্টপন্থীরা কারখানায় প্রবেশাধিকার পেয়েছে। আর এরই সঙ্গে লিন্ৎস কর্মসূচী দিয়ে সোস্যাল ডেকোক্রাটিক নেতারা শ্রমিকশ্রেণীকে বোকা বানিয়েছেন। এতে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার এবং শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার একটা বিকল্প উপস্থিত করা হয়েছিল। শ্রমিকদের এই বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, শাসকশ্রেণী যাদি শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করে তাহলে পার্টি সাধারণ ধর্মঘট এবং সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান জানিয়ে তার প্রত্যুত্তর দেবে। যেন শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট আক্রমণের প্রস্তুতির নীতিটা শ্রমিকশ্রেণীর বিরুদ্ধে নিয়মতন্ত্রের মুখোশে ঢাকা ধারাবাহিক আক্রমণেরই অঙ্গ নয়। এমন কি ফেব্রুয়ারী লড়াই-এর প্রারম্ভে এবং লড়াই চলবার সময়েও অস্ট্রিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতারা বীর বিক্রমে সংখ্যাগত সুটজবুন্দ ব্যাপক জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন, আর এইভাবে তাঁরা অস্ট্রিয়ার শ্রমিকশ্রেণীকে ঠেলে দিয়েছেন পরাজয়ের মুখে। জার্মানিতে ফ্যাসিজমের জয় কি অবশ্যান্তাবী ছিল? মোটেই না — জার্মান শ্রমিকশ্রেণী এটা ঠেকাতে পারতেন।
কিন্তু তা করতে হলে, দরকার ছিল ঐকাবদ্ধ ফ্যাসিস্ট-বিরোধী শ্রমিক ফ্রন্ট গঠন অনিবার্য করে তোলা, কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতারা যে অভিযান চালাচ্ছিলেন তা বন্ধ করতে এবং ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অভিযান চালাবার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি পুনঃ পুনঃ যে প্রস্তাব রাখছিলেন তা তাদের মেনে নিতে বাধ্য করা।
ফ্যাসিজম যখন আক্রমণ চালাতে লাগলো, বুর্জোয়ারা যখন ক্রমে ক্রমে বেশি মাত্রায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা বিলোপ করতে থাকলো, সেই সময় সোস্যাল ডেমোক্রাটদের মৌখিক প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হওয়াটা তাদের উচিত হয় নি — উচিত ছিল সত্যিকারের গণসংগ্রাম মারফত এর উত্তর দেওয়া। এ যদি করা হতো তাহলে জার্মান বুর্জোয়াদের ফ্যাসিস্ট পরিকল্পনা পূর্ণ করা আরও কঠিন হতো।
ব্রাউন ও শেভেরিং গভর্নমেন্ট কর্তৃক “রেড ফ্রন্ট সংগ্রামীদের সঙ্ঘের” উপর নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়াটা তাদের উচিত হয় নি – উচিত ছিল সঙ্ঘ এবং প্রায় দশ লক্ষ সভ্যের সঙ্ঘ রাইশব্যানার [রাইশব্যানার (রাষ্ট্রের পতাকা) – একটি সোস্যাল ডেমোক্রাটিক আধা-সামরিক গণ-সংগঠন।] এর মধ্যে সংগ্রামী সংযোগ স্থাপন করা, উচিত ছিল ফ্যাসিস্ট বাহিনীগুলিকে প্রতিরোধ ও খতম করার জন্য এই দুই প্রতিষ্ঠানকেই সশস্ত্র করতে ব্রাউন ও শেভেরিংকে বাধ্য করা।
সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতারা, যাঁরা ছিলেন প্রশীয় গর্ভনমেন্টের কর্ণধার, তাঁদের দিয়ে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়ে নেওয়া এঁদের উচিত ছিল। উচিত ছিল ফ্যাসিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করতে তাঁদের বাধ্য করা, ফ্যাসিস্টদের সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া, তাদের বৈষয়িক সম্পত্তি এবং যেসব পুঁজিপতি ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের কড়ি জোগায় তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া। উচিত ছিল ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলিকে ভেঙে দিতে বাধ্য করা, তাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া ইত্যাদি।
এছাড়াও, তাঁদের উচিত ছিল সঙ্কটের ফলে যে কৃষকশ্রেণী সর্বস্বান্ত হচ্ছে তাদের জন্য সকল প্রকার সামাজিক সাহায্যের ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠা ও সেগুলির সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করানো — উচিত ছিল ব্যাঙ্ক এবং ট্রাস্টসমূহের উপর কর বসিয়ে কৃষকদের জন্য খাজনা মকুব এবং সঙ্কটভাতা আদায় করা। এবং এইভাবে মেহনতকারী কৃষক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করা। জার্মানির সোস্যাল ডেমোক্রাটদের দোষেই এ কাজ হয়নি আর তাই ফ্যাসিজম জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
স্পেনে যেখানে শ্রমিক বিদ্রোহের শক্তি এবং কৃষক-সংগ্রামের মধ্যে অত্যন্ত সুবিধাজনক সমন্বয় ঘটেছে সেই স্পেনে বুর্জোয়া শ্রেণী ও অভিজাত সম্প্রদায়ের বিজয়লাভ কি অবশ্যম্ভাবী ছিল?
বিপ্লবের প্রথম দিন থেকে সেখানের সোস্যালিস্টরা গভর্নমেন্টে ছিলেন। তাঁরা কি কমিউনিস্ট ও নৈরাজ্যবাদী (আ্যানার্কিস্ট) সমেত সমস্ত রাজনৈতিক মতবাদের শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন? তাঁরা কি শ্রমিকশ্রেণীকে একটা ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের মধ্যে মেলাবার চেষ্টা করেছেন? কৃষকদের বিপ্লবের সপক্ষে টানাবার জন্য তাঁরা কি কৃষকদের জন্য জমিদার, গীর্জা এবং মঠের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেবার দাবি জানিয়েছেন? তাঁরা কি ক্যাটালোনিয়ান ও বাস্ক্দের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য কিংবা মরক্কোর মুক্তির জন্য লড়বার চেষ্টা করেছেন? রাজতন্ত্রী এবং ফ্যাসিস্টপন্থীদের সৈন্যবাহিনী থেকে ঝেঁটিয়ে তাড়িয়ে তাঁরা কি সৈন্যবাহিনীকে শ্রমিক-কৃষকের স্বপক্ষে ভেড়াবার জন্য প্রস্তুত করেছেন? জনসাধারণ যাদের ঘৃণা করে, জনসাধারণের প্রত্যেকটি আন্দোলনের প্রতি যারা জল্লাদের মতো ব্যবহার করেছে — সেই সিভিল গার্ডকে কি তাঁরা ভেঙে দিয়েছেন? জিল রোবল্সের ফ্যাসিস্ট পার্টি বা ক্যাথলিক চার্চের প্রতাপের উপর কি তাঁরা আঘাত করেছেন? না, তারা এর কোনটাই করেননি। বুর্জোয়া-জমিদার প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা বারবার ঐক্যবদ্ধ অভিযানের প্রস্তাব করেছে — আর তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা এমন এক নির্বাচনী আইন পাস করেছেন যার ফলে ‘কোর্টেসে’ (পার্লামেন্ট) প্রতিক্রিয়াশীলদের সংখ্যাধিক্য লাভ সম্ভব হয়েছে। এই আইন গণ-আন্দোলনকেই আঘাত করেছে। এই আইনের বলেই অ্যাসটুরিয়ার বীর খনি-শ্রমিকদের এখন বিচার চলছে। যেসব কৃষকেরা জমির জন্য লড়েছিলেন, সিভিল গার্ডদের দিয়ে তাঁরা তাঁদের গুলি করে হত্যা করেছেন।
এইভাবে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ ছড়িয়ে সোস্যাল ডেমোক্রাটরা জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেনে ফ্যাসিজমের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করেছেন।
কমরেডগণ, ফ্যাসিজম যে জয়যুক্ত হয়েছে তার আর একটা কারণ হলো এই যে শ্রমিকশ্রেণী তাদের স্বাভাবিক মিত্রশক্তির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন।ফ্যাসিজম যে জয়যুক্ত হয়েছে তার কারণ এই যে, ফ্যাসিজম বিপুল সংখ্যক কৃষককে দলে টানতে পেরেছিল। দলে টানতে পেরেছিল এই কারণে যে, সোস্যাল
ডেমোক্রাটরা শ্রমিকশ্রেণীর নাম করে যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন আসলে তা কৃষক-বিরোধী নীতি। কৃষকেরা একাধিক সোস্যাল ডেমোক্রাটিক গভর্নমেন্টকে ক্ষমতায় আসীন দেখেছেন। তাঁদের কাছে এই গভর্নমেন্টই ছিল শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক। কিন্তু এর মধ্যে কোনটিই কৃষকদের অভাব ঘোচায়নি, কেউই কৃষককে জমি দেয়নি। জার্মানিতে সোস্যাল ডেমোক্রাটরা জমিদারদের কেশাগ্র স্পর্শ করেননি — প্রতিহত করেছেন খেতমজুরের ধর্মঘট। ফলে হিটলারের ক্ষমতা দখলের অনেক আগেই জার্মানির খেতমজুরেরা সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়ন বর্জন করেছিলেন, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা চলে যাচ্ছিলেন স্টকহল্ম্ ও ন্যাশনাল সোস্যালিস্টদের (নাৎসি) দিকে।
ফ্যাসিজম যে জয়যুক্ত হয়েছে তার আর একটা কারণ হলো এই যে — তারা যুব সমাজের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে সোস্যাল ডেমোক্রাটরা শ্রমিক যুবকদের শ্রেণী সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল আর বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী ও যুবকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কাজ প্রবর্তন করতে পারেনি বা তাদের বিশেষ স্বার্থ ও দাবি আদায়ের সংগ্রামের প্রতি যথোপযুক্ত মনোযোগ দেয়নি। যুব সমাজের পক্ষে জঙ্গী কার্যকলাপ যে সবিশেষ প্রয়োজন ফ্যাসিজম তা বুঝতে পেরেছিল আর তাই বেশ কিছু সংখ্যক যুবককে প্রলুব্ধ করে তারা তাদের জঙ্গী বাহিনীতে যোগ দেওয়াতে পেরেছিল। নতুন যুগের তরুণ তরুণীরা যুদ্ধের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁদের মর্মে মর্মে ভোগ করতে হয়েছে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও বেকারির বোঝা — আর তাঁরা উপলব্ধি করেছেন বুর্জোয়া গণতন্ত্র ভেঙে পড়ার ফল। কিন্তু ভবিষ্যতের কোনরূপ সম্ভাবনা না দেখতে পাওয়ায় ফ্যাসিজম জয়যুক্ত হলে চটকদার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে বলে ফ্যাসিস্টরা যে গলাবাজি করেছিল, যুবকদের বেশ বড় একটা অংশ তার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
এই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি যা ভুলভ্রান্তি করেছে, যার ফলে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম ব্যাহত হয়েছে তার উল্লেখ না করে পারা যায় না।
আমাদের মধ্যেই এমন লোক ছিলেন যাঁরা ফ্যাসিজমের বিপদকে অসহনীয়ভাবে খাটো করে দেখেছেন। এই ঝোঁকটা আজও পর্যন্ত সর্বত্র কাটিয়ে ওঠা যায় নি। “জার্মানি, ইতালি নয়” — আমাদের পার্টিগুলির মধ্যে আরো এমনি ধারা যে অভিমত প্রচলিত ছিল তাকে এই ধরণের ধারণার অন্তর্গত বলা যায়। অর্থাৎ, এই মত অনুযায়ী ইতালিতে যদিও বা ফ্যাসিজম জয়যুক্ত হয়েছে কিন্তু জার্মানিতে তার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ জার্মানি শিল্পবাণিজ্য এবং সংস্কৃতির দিক থেকে সাতিশয় উন্নত একটা দেশ, যার পিছনে রয়েছে ৪০ বছরের শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহ্য। সুতরাং, সে দেশে ফ্যাসিজমের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। অথবা “আদি” (ক্লাসিকাল) বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দেশে ফ্যাসিজমের সম্ভাবনা নেই — এই ধরণের যে অভিমত আজকাল শোনা যায় তাও এই পর্যায়ভুক্ত। এই ধরণের অভিমত ফ্যাসিজমের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক দৃষ্টিকে শিথিল করতে পারে বা অনেকক্ষেত্রে ইতোমধ্যে করেছেও। এর ফলে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সমাবেশ গড়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
কমিউনিস্টদের সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য ফ্যাসিস্ট হামলার মুখোমুখি হওয়ার বহু সংখ্যক উদাহরণ দেওয়া যায়। বুলগেরিয়ার কথা স্মরণ করুন। সেখানে আমাদের পার্টির নেতৃত্ব ১৯২৩ সালের ৯ই জুনের ফ্যাসিস্ট অতর্কিত অভিযান সম্পর্কে “নিরপেক্ষ” কিন্তু আসলে সুবিধাবাদী মনোভাব অবলম্বন করেছিলেন। পোল্যান্ডে ১৯২৬ সালের মে মাসে পোল বিপ্লবের চালিকা শক্তি সম্পর্কে হিসাব ভুল করায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব পিলসুডস্কির অভ্যুত্থানের ফ্যাসিস্ট চরিত্র ধরতে পারেননি—তাঁরা ঘটনার পিছনে পিছনে চলেছেন। ফিনল্যান্ডে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ফ্যাসিজম হবে এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে বুর্জোয়াদের নেতৃস্থানীয় দলটি যে ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করেছিল আমাদের পার্টি তা দেখেনি। এখানেও পার্টি ও শ্রমিকশ্রেণী এই অভ্যুত্থানের সামনে অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়েছেন।
জার্মানিতে ন্যাশনাল-সোস্যালিজম যখন একটা আশঙ্কাজনক গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, তখনও হাইনৎস নরমানের মতো কিছু কমরেড, যারা ব্লুয়েনিং-এর গভর্নমেন্টকেই ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের গভর্নমেন্ট বলে মনে করতেন তাঁরা, খুব গর্বভরে ঘোষণা করেন: “যদি হিটলারের ‘তৃতীয় সাম্রাজ্য’ কোনদিন দেখা দেয় তবে তা ছ’ফিট মাটির তলায় থাকবে আর তার উপরে প্রতিষ্ঠিত হবে শ্রমিকশ্রেণীর জয়যুক্ত রাষ্ট্রক্ষমতা।”
জার্মানিতে ভার্সাই সন্ধি সম্পর্কে জনসাধারনের আহত জাতীয় চেতনা ও বিক্কোভ আমাদের কমরেডরা ধরতে পারেননি। কৃষক ও পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণীর দ্বিধাগ্রস্ত মনোভাবকে তাঁরা খুব বেশি মূল্য দেননি, সামাজিক এবং জাতীয় মুক্তি সম্পর্কে নিজস্ব কর্মপন্থা প্রণয়ন করতে তাঁরা দেরি করে ফেলেছিলেন। যখন তাঁরা কর্মপন্থা প্রস্তুত করলেনও তখনও তারা তাকে জনসাধারণের সুনির্দিষ্ট দাবি এবং চেতনার স্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি। এমনিকি জনসাধারণের মধ্যে সে কর্মপন্থা ব্যাপকভাবে প্রচার করতেও তাঁরা সমর্থ হননি।
ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন তার বদলে কয়েকটি দেশে “সাধারণভাবে” ফ্যাসিজমের চরিত্র নিয়ে চুলচেরা তর্কের আসর জমানো হয়েছিল আর অত্যন্ত কুনো-সঙ্কীর্ণ মনোভাব নেওয়া হয়েছিল পার্টির বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা ও তার সমাধান উপস্থিত করার সময়।
কমরেডগণ, আমরা এখানে ফ্যাসিজমের বিজয়ের কারণ নিয়ে যে আলোচনা করছি বা শ্রমিকশ্রেণীর পরাজয়ের জন্য সোস্যাল ডেমোক্রাটদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি বা ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের নিজেদের ভুলভ্রান্তি নির্দেশ করছি তা শুধু এই জন্য নয় যে আমরা অতীতকে খুঁচিয়ে তুলতে চাই। জীবন্ত বাস্তব থেকে বিচ্যুত হয়ে যাঁরা ইতিহাস আলোচনা করেন আমরা তেমন ধরণের ঐতিহাসিক নই।

‘ফ্যাসিজমের জয় প্রতিরোধ করা কি সম্ভব, সম্ভব হলে কেমন করে?’

— এ প্রশ্ন আজ লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের মনকে মথিত করছে। শ্রমিকশ্রেণীর নিরলস সিপাহী হিসাবে এ প্রশ্নের জবাব দিতে আমরা বাধ্য। আর লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের আমরা জবাব দিচ্ছি: হ্যাঁ কমরেড, ফ্যাসিজমের পথরোধ করা যায়। নিশ্চয়ই করা যায়। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষ — আমাদেরই উপর এ কাজ নির্ভর করছে।
ফ্যাসিজমের জয় ঠেকানো যাবে কিনা তা নির্ভর করছে প্রথমত শ্রমিকশ্রেণী নিজে কতটা জঙ্গী আন্দোলন চালাতে পারেন তার উপর, শ্রমিকশ্রেণীর শক্তি একটি জঙ্গী বাহিনীর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুঁজিবাদী ও ফ্যাসিবাদের আক্রমণাত্মক অভিযানকে প্রতিহত করতে পারছেন কিনা তার উপর। শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে সংগ্রামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাঁরা কৃষক সম্প্রদায়, শহরের পেটি-বুর্জোয়া শ্রেণী যুব সমাজ ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের উপর থেকে ফ্যাসিজমের প্রভাবকে অচল করে দিতে পারবেন, এক অংশকে নিরপেক্ষ করে দিয়ে অন্য অংশকে দলে টানতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, এটা নির্ভর করছে, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মেহনতী মানুষকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়ে বারে বারে শ্রমিকশ্রেণীকে শুধু পশ্চাদপদসরণেরই নির্দেশ দেয়, যে পার্টি ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়াদের নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করতে দেয় সে পার্টি শ্রমিকশ্রেণীকে নিশ্চয়ই পরাজয়ের মধ্যে ঠেলে দেবে।
তৃতীয়ত, এটা নির্ভর করে শ্রমিকশ্রেণী কৃষক ও শহরের পেটি-বুর্জোয়া জনসাধারণ সম্পর্কে সঠিক নীতি অনুসরণ করছে কিনা তার উপর। এই জনসাধারণ যেমন আছেন ঠিক তেমন ভাবেই তাঁদের গ্রহণ করতে হবে — আমরা তাদের যেমন দেখতে চাই সেইভাবে ধরে নিলে চলবে না। একমাত্র সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাঁদের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঘোচাতে পারি, আমরা যদি তাঁদের অবশ্যম্ভাবী দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সম্পর্কে ধৈর্যশীল মনোভাব গ্রহণ করতে পারি তবেই এবং শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক সাহায্যেই তাঁরা বিপ্লবী চেতনা ও ক্রিয়াকলাপের উচ্চতর স্তরে উঠতে সক্ষম হবেন।
চতুর্থত, এটা নির্ভর করে শ্রমিকশ্রেণী সদাজাগ্রত সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন কি না এবং যথাসময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করছেন কি না তার উপর। ফ্যাসিজম অতর্কিতে তাঁদের অভিভূত করে ফেলবে — এই রকমটা হলে চলবে না। ফ্যাসিজমের হাতে উদ্যোগ ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে না। ফ্যাসিজম আপন শক্তি সঙ্ঘত করার আগেই তার উপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। ফ্যাসিজমকে নিজের ঘাঁটি শক্ত করতে দেওয়া চলবে না। যেখানেই ও যখনই ফ্যাসিজম মাথা চাড়া দেবে সেখানেই এবং তখনই তাকে প্রতিহত করতে হবে। ফ্যাসিজমকে নতুন ঘাঁটি গড়তে দেওয়া চলতে পারে না। এইসব কাজগুলিই ফরাসী দেশের শ্রমিকশ্রেণী বিশেষ সাফল্যের সঙ্গে করে চলেছেন।
ফ্যাসিজমের বিকাশ ও ফ্যাসিজম কর্তৃক দখল প্রতিরোধ করারি এইগুলিই হলো মূল শর্ত।

ফ্যাসিজম — এক হিংস্র কিন্তু ক্ষণস্থায়ী শক্তি

বুর্জোয়া শ্রেণীর ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব একটা হিংস্র শক্তি — কিন্তু ক্ষণস্থায়ী।
ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের এই ক্ষণস্থায়িত্বের মূল কারণগুলি কি?
ফ্যাসিজম বুর্জোয়া শিবিরের মধ্যকার কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব অতিক্রম করতে প্রয়াসী হলেও তারাই এই অন্তর্বিরোধকে তীব্রতর করে তুলেছে। ফ্যাসিজম বলপ্রয়োগে অন্যান্য রাজনৈতিক পার্টি ধ্বংস করে নিজেদের একচেটিয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অস্তিত্ব, বিভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্ব এবং শ্রেণী-দ্বন্দ্বের তীব্রতাবৃদ্ধি, অবশ্যাম্ভাবী, তাই ফ্যাসিজমের একচেটিয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্বের গোড়ায় আঘাত করে, তাকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। সোভিয়েত দেশেও শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব বাস্তবে রূপায়িত হয় একটি দলের রাজনৈতিক একচেটিয়া কর্তৃত্বের মধ্য দিয়ে — কিন্তু সেখানে এ ব্যাপারটি ঘটে না। ঘটে না এই কারণ যে, সেখানে এই এই রাজনৈতিক একচেটিয়া কর্তৃত্ব লক্ষ লক্ষ মেহনতকারী মানুষের স্বার্থকেই পুষ্ট করে, সেখানে এই কর্তৃত্ব ক্রমবর্ধমানভাবে শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। একটা ফ্যাসিস্ট দেশে, ফ্যাসিস্টদের পার্টি এই একচেটিয়া কর্তৃত্ব বেশিদিন বজায় রাখতে পারে না। কারণ তারা তো আর শ্রেণী এবং শ্রেণী-দ্বন্দ্ব বিলোপের কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে না। বুর্জোয়া পার্টিসমূহের আইনসঙ্গত অস্তিত্ব তারা বিলোপ করে। কিন্তু এই পার্টিগুলির মধ্যে অনেকগুলিই বে-আইনীভাবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখে আর কমিউনিস্ট পার্টি বে-আইনী অবস্থায়ও অগ্রগতির পক্ষে এগিয়ে যায়, পোড় খেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম পরিচালনা করে। সুতরাং, শ্রেণীদ্বন্দ্বের আঘাতে ফ্যাসিজমের রাজনৈতিক একনায়কত্ব গুঁড়িয়ে যেতে বাধ্য।
ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের ক্ষণস্থায়িত্বের আর একটা কারণ এই যে ফ্যাসিজমের পুঁজিবাদ-বিরোধী গলাবাজির পাশাপাশি তার দস্যুর মতো একচেটিয়া বুর্জোয়াশ্রেণীর ভাণ্ডার ভরে তোলার নীতির বৈপরীত্য অনায়াসেই ফ্যাসিজমের শ্রেণীস্বরূপ উদ্ঘাটিত করে দেয় এবং ফ্যাসিজমের গণভিত্তিকে কাঁপিয়ে তোলে, আরও সঙ্কুচিত করার উপক্রম করে।
উপরন্তু ফ্যাসিজমের সাফল্য জনসাধারণের মধ্যে গভীর ঘৃণা ও ক্রোধ প্রজ্জ্বলিত করে। তাদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনার সঞ্চার করে এবং ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের কাজে প্রচণ্ড প্রেরণা যোগায়।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের (autarchy) নীতি অনুসরণ করে এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য জাতীয় আয়ের বেশিরভাগটাকেই ছিনিয়ে নিয়ে ফ্যাসিজম দেশের অর্থনৈতিক জীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয় এবং বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সংঘাত তীব্রতর করে তোলে। বুর্জোয়শ্রেণীর অন্তর্বিরোধকে ফ্যাসিজম প্রচণ্ড করে তোলে, অনেক সময় রক্তাক্ত সংঘর্ষ পরিণত করে। এর ফলে জনসাধরণের চোখে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রশক্তির স্থায়িত্বের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।
গত বৎসর ৩০শে জুন জার্মানিতে ঠিক যা ঘটেছিল সেই রকম যে গভর্নমেন্ট নিজেদের অনুগামীদেরই হত্যা করে — একটা ফ্যাসিস্ট গভর্নমেন্ট যার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়াদেরই আর একটা অংশ সশস্ত্র সংঘর্ষ চালায় (অস্ট্রিয়ায় ন্যাশনাল সোস্যালিস্টদের অতর্কিত ক্ষমতা দখল (putch) এবং পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে ফ্যাসিস্ট গভর্নমেন্টের উপর বিভিন্ন ফ্যাসিস্ট উপদলের আক্রমণ) — এই ধরণের গভর্নমেন্ট পেটি-বুর্জোয়া জনতার ব্যাপক অংশের উপর বেশিদিন নিজ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে না।
বুর্জোয়া শিবিরের প্রত্যেকটি অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিরোধের সুযোগ শ্রমিকশ্রেণীর নিতে পারা চাই। কিন্তু তাঁরা যেন এই ভ্রান্তি মনেও না স্থান দেন যে ফ্যাসিজম স্বেচ্ছায় নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলবে। ফ্যাসিজম আপনা থেকেই ভেঙে পড়বে না। বুর্জোয়া শিবিরের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে যেসব বিরোধের সূচনা হয়, একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী কার্যকলাপই তার সুযোগ নেওয়ার দিক থেকে কাজে আসতে পারে যাতে করে ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের ভিত্তিতে ভাঙন করে ও তার পতন ঘটে।
বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চিহ্নটুকু পর্যন্ত ধ্বংস করে, খোলাখুলি সন্ত্রাসবাদকে গভর্নমেন্ট ব্যবস্থায় পরিণত করে ফ্যাসিজম গণতান্ত্রিক মোহকে তীব্রভাবে ধাক্কা দেয় এবং শ্রমজীবী জনসাধারণের চোখে আইনের কর্তৃত্বকে হেয় করে। অস্ট্রিয়া, স্পেন প্রভৃতি দেশ সম্পর্কে বিশেষ করেই একথা খাটে। সেখানকার শ্রমিকেরা ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছেন। অস্ট্রিয়াতে শুৎসবুণ্ড ও কমিউনিস্টদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম পরাজয় সত্ত্বেও একেবারে গোড়াতেই ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের ভিত নেড়ে দিয়েছে। স্পেনের বুর্জোয়াশ্রেণী ফ্যাসিজম দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর মুখ বন্ধ করতে পারেনি। অস্ট্রিয়া ও স্পেনের সশস্ত্র সংগ্রামের ফলে ক্রমশ শ্রমিকশ্রেণীর ব্যাপকতর অংশ বিপ্লবী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারছেন। একেবারে নিরেট ধরনের অন্তঃসারশূনা ব্যক্তিরা বা বুর্জোয়াদের দালাল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বাহাত্তুরে তত্ত্ববাগীশ কার্ল কাউটস্কির মতো লোকেরাই শ্রমিকশ্রেণীকে এই বলে ধিক্কার দিতে পারে যে, অস্ট্রিয়া এবং স্পেনে তাঁদের অস্ত্রধারণ করাটা উচিত হয়নি। অস্ট্রিয়া এবং স্পেনের শ্রমিকশ্রেণী যদি কাউটস্কিদের বিশ্বাসঘাতক উপদেশ শুনে চলতেন তাহলে আজকে সে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের অবস্থা কি দাঁড়াত? শ্রমিকশ্রেণীর শিবিরে তাহলে এতদিনে ছড়িয়ে পড়ত গভীর হতাশা।লেনিন বলছেন:
“গৃহযুদ্ধের পাঠশালা কোন মানুষকেই অব্যাহতি দেয় না। এ এক নিদারুণ পাঠশালা। প্রতিবিপ্লবের জয়, ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়াশীলদের পাষণ্ডের মতো উম্মত্ত আচরণ, পুরনো গভর্নমেন্ট কর্তৃক বিপ্লবীদের বর্বর শাস্তিদান ইত্যাদিও
নিশ্চিতভাবেই এর সম্পূর্ণ পাঠাতালিকার অন্তর্গত। কিন্তু বিভিন্ন জাতি এই বেদনাদায়ক পাঠশালায় ঢুকছে দেখে একমাত্র পন্ডিতিফলানেওয়ালা আর মানসিকভাবে পঙ্গু জীবন্মৃতদেরই প্রাণে ব্যখা লাগতে পারে। কিভাবে গৃহযুদ্ধ
চালাতে হয় এই পাঠশালা তা নিপীড়িত শ্রেণীসমূহকে শেখায়, এই পাঠশালা শেখায় কোথায় কি করে সাফল্যমণ্ডিত বিপ্লব করতে হয়। নিপীড়িত, বুদ্ধিহীন, অশিক্ষিত ক্রীতদাসদের মনে সর্বক্ষণই যে ঘৃণা ধিকি ধিকি জ্বলে এই পাঠশালা আজকের দিনের ক্রীতদাসের মধ্যে সেই ঘৃগাকেই লেলিহান করে তোলে আর যে সব ক্রীতদাস তাঁদের এই দাসত্বের লজ্জা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছেন তাঁদের চালিত করে মহত্তম ঐতিহাসিক কী্তির পথে। (লেনিন । “বিশ্ব রাজনীতিতে দাহ্য পদার্থ”, নির্বাচিত রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ: ২৯৮, লর়েন্স অ্যান্ড উইশার্ট সংস্করণ)
আমরা সকলেই জানি জার্মানিতে ফ্যাসিজমের সাফল্যের পর আর এক দফা ফ্যাসিস্ট আক্রমণ শুরু হয়েছে। অস্ট্রিয়াতে এই আক্রমণই প্রকটিত হয়েছে ডলফাসের উসকানিতে। স্পেনে জনসাধারণের বিপ্লবী জয়ের উপর প্রতিবিপ্লবীরা নতুন আঘাত হানছে – পোল্যান্ডে শাসনবিধির ফ্যাসিস্ট সংস্কার করা হচ্ছে আর ফ্রান্সের সশস্ত্র ফ্যাসিস্ট বাহিনীর়া তো উৎসাহের চোটে ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অতর্কিতে ক্ষমতা দখলের চেষ্টাই করে বসে। কিন্তু এই জয় আর ফ্যাসিস্ট একনায়কত্বের এই উন্মত্ততা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটা বিরুদ্ধ আন্দোলন, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর সংযুক্ত ফ্রন্ট গঠনের আন্দোলনের সুচনা করেছে। রাইখস্ট্যাগ, অগ্নিকাণ্ড — শ্রমিকশ্রেণীর উপর যা সর্বগ্রাসী ফ্যাসিস্ট আক্রমণের সূচনা করে — ট্রেড ইউনিয়ন প্রভৃতি শ্রমিক সংগঠন দখল ও লুটপাট, ফ্যাসিস্ট ব্যারাক বা বন্দী শিবিরের কুঠুরি থেকে ভেসে আসা নির্যাতিত ফ্যাসিস্ট-বিরোধীদের গোঙানি — সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতাদের বিভেদমূলক ভূমিকার ফল যে কি হয়েছে জনসাধারণের কাছে তা পরিস্কার করে দিচ্ছে। ফ্যাসিজমের অগ্রগতির বিরুদ্ধে যুক্ত আন্দোলনের জন্য কমিউনিস্টদের আবেদন তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এসব ঘটনা জনসাধারণের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস এনে দিচ্ছে যে, ফ্যাসিজমের উচ্ছেদের জন্য শ্রমিকশ্রেণীর সমস্ত শক্তি সঙ্ঘবদ্ধ করা দরকার।
হিটলারের জয় ফ্রান্সে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণীর যুক্তফ্রন্ট গঠনেও গভীর প্রেরণা যুগিয়েছে। হিটলারের জয়ের ফলে জার্মান শ্রমিকদের ভাগ্যে যা ঘটেছে শ্রমিকদের মনে শুধু যে সেই পরিণাতি ঘটার ভয় দেখা দিয়েছে তাই নয়, জার্মান ভাইদের ঘাতকদের উপর তাঁদের মনে শুধু যে তীব্র ঘৃণার আগুন জ্বলছে তাই নয়, তাঁদের মনে এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও সঞ্চারিত হয়েছে যে জার্মান শ্রমিকদের ভাগ্যে যা ঘটেছে, তাঁদের দেশে তাঁরা আর তা ঘটতে দেবেন না।
সমস্ত পুজিবাদী দেশগুলিতে যুক্তফ্রন্ট গঠনের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে তা থেকে এই কথাটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে পরাজয়ের শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। শ্রমিকশ্রেণী নতুনভাবে কাজ করতে আরম্ভ করেছেন। যুক্তফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি যে উদ্যোগ দেখিয়েছেন, কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী শ্রমিকেরা ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে চূড়ান্ত আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার ফলে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অভূতপূর্ব মর্যাদা বৃদ্ধি হয়েছে। আর তারি সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের মধ্যে দেখা দিচ্ছে গভীর সঙ্কট। জার্মানির সোস্যাল ডেমোক্রাসি দেউলিয়া হয়ে যাবার পর এই সঙ্কট আরও বেশি পরিষ্কার, আর বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে।
সোস্যাল ডেমোক্রাটিক শ্রমিকেরা আজ নিঃসন্দেহে বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন যে ফ্যাসিস্ট জার্মানি, তার বিভীষিকা এবং বর্বরতা এ সবই চূড়ান্ত বিচারে বুর্জোয়াদের সঙ্গে শ্রেণী সহযোগিতার সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নীতির ফল। জনসাধারণ আজ অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছেন যে জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রাটিক নেতারা শ্রমিকশ্রেণীকে যে পথে চালিত করেছেন আর কিছুতেই সেই পথে যাওয়া চলবে না।বর্তমান সময়ে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের শিবিরে যে আদর্শগত সংঘাত দেখা দিয়েছে আগে কখনও তা দেখা যায়নি। সোস্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিগুলির মধ্যে নানা মতে ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে প্রধানত দু’টো শিবির গড়ে উঠেছে : যারা সোস্যাল ডেমোক্রাট আর বুর্জোয়াদের জোট বজায় রাখবার জন্য সর্ববিধভাবে চেষ্টা করছে, যারা কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাব উন্মত্তের মতো প্রত্যাখান করেছে। প্রতিক্রিয়াশীলদের সেই পুরনো শিবিরের পাশাপাশি গড়ে উঠছে এক বিপ্লবপন্থীদের শিবির। এঁরা বুর্জোয়াদের সঙ্গে শ্রেণী সহযোগিতার নীতির যথার্থ সম্পর্কে সম্পর্কে সন্দিহান। এঁরা কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সপক্ষে এবং ক্রমশই বিপ্লবী শ্রেণী সংগ্রামের নীতি গ্রহণের দিকে এগিয়ে আসছেন।
ফ্যাসিজম — পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভাঙনের ফলেই যার উৎপত্তি তাই আবার শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাদে আরও বেশি ভাঙন ধরাবার উপাদান হিসাবে কাজ করছে। ফ্যাসিজম মার্কসবাদ আর বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের কবর রচনা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জীবন ও শ্রেণী সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক গতির ফলে সেই ফ্যাসিজমই এমন সব শক্তির অধিকতর বিকাশে সাহায্য করছে যারা তারই, পুঁজিবাদের কবর রচনা করতে বাধ্য।

Facebook Comments

Leave a Reply