ধারাবাহিক উপন্যাস : নীলাব্জ চক্রবর্তী

fail
যখন সবাই ছিল সংখ্যালঘু অথবা বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে
দ্বাদশ পর্ব

২২

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

গোপনে প্রেম ছাড়ান

অব্যর্থ ঔষধ, পরীক্ষা প্রার্থনীয়

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

# * # * #

— তোমার কী মনে হয়? ধরো কোনও এক সুদূর বা অদূর ভবিষ্যতে কোনও কারণে মানুষকে বাধ্য করা হল দীর্ঘদিন যাবত একটানা ঘরে থাকতে… একেবারে একা… জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায়… তাতে কি মানুষের বেসিক নেচারটা বদলে যেতে পারে? মানে ধরো, যে সারাজীবনে পাঠ্যবই, দোকানের সাইনবোর্ড আর হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া ফরওয়ার্ডেড মেসেজ ছাড়া আর কিছু পড়েনি, সে অবধি আস্তে আস্তে বই পড়ার অভ্যাস তৈরী করে ফেলতে পারে?

— হ্যাঁ রে, কাল কি আলুর দাম বাড়তে পারে?

— কেন! তোমরা কী ভাব বলত? মেয়েরা কি ছেলেদের মতো বেশী বেশী মদ খেতে পারেনা? শালা! সবেতে ডিসক্রিমিনিশেন! বালের সোসাইটি একটা!

— আমাকে ১২০০ টাকা ধার দিতে পার? কয়েকদিনের মধ্যেই দিয়ে দেব…

— যাব্বাবা… যত ফালতু কথা… এত উলটোপালটা হাইপোথিসিস নিয়ে খামোখা মাথা ঘামাতে যাবই বা কেন!

— কাল কেন দাদা? আজ বিকেল থেকেই বেড়ে গেছে তো! সকালে ১৮-য় বেচেছি… এখন ২২… নিলে নিয়ে যান ২-৩ কেজি যা পারেন… কাল তো মনে হয় ২৫ পেরিয়ে যাবে…

— অত চাপ নিও না তো… লিখে যাও। বেশী ভেবো না। আর… শোনো, তুমি রোজ একটা করে চিঠি লিখবে…

— দু হাজার টাকা এন্ট্রি ফি ছেলেদের জন্য, আর মেয়েদের লাগবে দেড় হাজার টাকা করে… যত ইচ্ছা মদ খাও… ইনক্লুডিং খাবার-দাবার… যত পারো খাও… সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা থেকে পার্টি শুরু… চলবে একদম রাত সাড়ে বারোটা একটা পর্যন্ত…

— আমি যদি অ্যাসটেরিক্স সিরিজের কোনও একটা গল চরিত্র হতাম… আমার নাম, আমি, জানো, ‘অন্যমনিক্স’ রাখতাম…

— আরে দেখবি টিচার্সের বোতল থেকেই ঢেলে ঢেলে দেবে। কিন্তু ভেতরের মালটা আর এস। তোরা এসব ধরতে পারবি? দু পেগ খাওয়ার পর তো নিজের বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত বলতে পারিস না ঠিক করে!

২৩

ভাঙা ডায়েরীর যে টুকরোগুলো জোড়া লাগতে চায়নি

আমি কি শুভেচ্ছা জানাব? আমি কী শুভেচ্ছা জানাব? আমি তো একটু একটু করে জীবন নিচ্ছি, ভাষা নিচ্ছি, আবিষ্কার নিচ্ছি, আমি তো ঋণে… আশায়… পারদে… আশঙ্কায়… সারাক্ষণ…

যাই হোক, ভাল থেকো। প্রতিদিন তোমার হোক। প্রতিটি উদযাপন তোমারই হোক। আরও একবার, খুব স্পষ্ট করেই বলি,

‘তুমি ছাড়া কোনোকিছু / ভাল লাগে না আমার / কী লিখি তোমায়’…

ভাল কথা, এটা খুব বিরল একটা গান জানো? কিশোরকুমারের সুরে লতাজীর গাওয়া। কথা, সম্ভবতঃ মুকুল দত্ত। এরকম কম্বিনেশনের বাংলা গান আর মাত্র একটাই আছে।

*

আজ লেট করে অফিস যাচ্ছি। বাড়ি থেকে একটু আগে বেরিয়েছি। ন’টা বাজে। এক্সপ্রেসওয়েতে এসে দাঁড়ানোমাত্র একটা এসি বাস… এমনকি বসার জায়গাও… হালকা করে গান চলছে… কুমার শানু… যব কিসিকে তরফ দিল ঝুঁকনে লাগে / … হোনে লাগে / প্যয়ার হোনে লাগে…. মুষ্টিমেয় যে কয়েকটি গানের জন্য হিন্দি ভাষাটার কাছে যাতায়াত করা যায়, এই গানটা অবশ্যই তাদের মধ্যে পড়বে না কখনও… তবু… ভাল্লাগছে ভাল্লাগছে… অথচ, আমি জানি, এই উপন্যাসের শেষ লাইনটা আমি ঠিক করে রেখেছি। এবং, সেটা হল, ‘লোকটা আর কখনও প্রেমে পড়বে না’…

তখন মনে হয়নি, এখন লিখতে বসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মনে আসছে… ‘এক একদিন উদাসীন’…

*

আমি সারাদিনই তুমি। সমস্ত রেফারেন্স ও ক্রসরেফারেন্সের ভেতর যে বুদ্বুদ। এইসব খাঁ খাঁ গ্লোবাল দুপুরে আমি লেখাটাকে খুঁজতে বের হই। ক্যাকোফোনির ভেতরে আমি সারাদিনই একটা চিঠি। লক্ষ করি, ক্রমে, স্পর্শের মতো স্মৃতিও… আমি এক অনুমতি হয়ে উঠতে চাইছি। সম্পর্ক নামের যত কাঁচ, এইমাত্র লেখা হচ্ছে…

*

আজ ডাইরেক্ট কেষ্টপুর পর্যন্ত বাস পাইনি বাড়ি থেকে। হলদিরাম অবধি বাসে এলাম। এই বাসটা এরপর বাঁদিকে চিনার পার্ক হয়ে ইকো পার্ক হয়ে রাজারহাট নিউটাউন। ফলতঃ, হলদিরাম থেকে কেষ্টপুরের অটো। অটোওয়ালা হাঁকছে ‘আল্টোডাঙা আল্টোডাঙা’… হ্যাঁ। এই রুটের অটো সোজা উল্টোডাঙা অবধি চলে যাবে বাগুইআটি, কেষ্টপুর, লেকটাউন পেরিয়ে। আরও অন্ততঃ দু’জন না হলে ছাড়বে না। ঠিক আছে। ওইটুকু সময় আছে হাতে। এদিকে, অটোর ভেতর গান বাজছে… ডুয়েট… শানু আর অলকা… দিওয়ানা / ম্যয় তেরা দিওয়ানা / মুহব্বত কেয়া হ্যয় অব ইয়ে জানা / নজরে যো ঝুমকে / আয়ে তুঝে চুমকে / ছাহনে লগা নশা / দিওয়ানা… কী সিনেমা যেন ছিল এটা? শাহরুখ খান সোনালি বেন্দ্রে? ইংলিশ বাবু দেশী মেম? হ্যাঁ, ওটাই মনে হয়… নিখিল-বিনয়ের সুর ছিল? নয়ের দশক? কেমন ঘুম ঘুম পেতে থাকে আমার… আচ্ছা তখন কি যাদবপুরে পড়ি আমি? তখন আমার বয়েস কত ছিল?

*

কাকে যে মুদ্রা বলো। ঊরু এক ঘোর যখন। যা কিছু আরোপযোগ্য হয়ে উঠছে। মধু ও ধ্বনির মাঝামাঝি যে হরফগুলো পড়েই থাকল সারারাত। এইভাবে, অপেক্ষক ও চলরাশিসমূহ, পরস্পরকে অবশ্যই বৈধ করে তুলতে থাকে। রূপ। অনিবার্যতার ভেতর বসে ভাবি, প্যারামিটার শব্দটি এ ভাষায় পরামাত্রা লেখা হলে তা যথেষ্ট সঙ্গত হবে কি না। অন্ততঃ এইটুকু তো স্বীকার্যই যে, নেশা একটি রঙ। ওঠানামার স্মৃতি বলতে একটার পর একটা চাবির রিঙ, সবুজ ফিল্টার…

*

নেভিল কার্ডাসের সঙ্গে আমি আংশিকভাবে একমত। স্কোরবোর্ড গাধা হলেও সংখ্যাই সর্বশক্তিমান ও সত্য। অতুলনীয় একটা প্যারামিটার। এবং, সংখ্যাকে একমাত্র সংখ্যা দিয়েই সিম্বলাইজ করা যেতে পারে, জাস্টিফাই করা যেতে পারে। সংখ্যা স্মৃতি নিয়ে আসে। যেমন ৮৬ বললেই মারাদোনা মনে পড়ে, আর মনে পড়ে জলপাইগুড়ি ছেড়ে চলে আসা, সিপিয়েমের হোপ-৮৬-ও মনে পড়ে তারপর। কখনও কোথাও ৭৭৪ দেখলে বা শুনলেই মনে হয় গাভাসকারের জীবনের প্রথম সিরিজ, ওয়েস্ট ইণ্ডিজ সফর। এবং, সংখ্যাই সংখ্যার স্মৃতি ও চেইন-রিঅ্যাকশন। কারণ ঠিক তক্ষুনি মনে পড়বে ওটা ছিল ১৯৭১ সাল। অর্থাৎ বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ। ২৪৬ শুনলে প্রথমে মনে পড়বে জিওফ বয়কটের সর্বোচ্চ রান, সাবসিকোয়েণ্টলি মনে পড়বেই, মন্থর ব্যাটিঙের জন্য পরের টেস্টেই উনি বাদ পড়েছিলেন। তারপর মনে পড়বে, আরে! এটা তো সমান্তর প্রগতিতে আছে… যেমন ১৩৭ শুনলে প্রথমে মনে হয় বিশ্বনাথের প্রথম টেস্ট… প্রথম ইনিংসে শূন্য করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরী। তারপর মনে পড়বে সম্ভবতঃ, উনিই প্রথম একটা মিথ ভাঙেন যে ভারতের হয়ে খেলতে নেমে প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরী করলে আর কখনও সেঞ্চুরী পাওয়া যায় না… আচ্ছা, ১৩৭ তো একটা মৌলিক সংখ্যা! ওঁর আগে যাঁরা সেঞ্চুরী করেছিলেন… লালা অমরনাথ ১১৮… বাকিরা… আব্বাস আলি বেগ, হনুমন্ত সিং… নাহ, বাকি নামগুলো মনে পড়ছে না… রানগুলো তো পড়ছেই না। গুগল করা যাক। হুঁ, এই তো। লালা অমরনাথ ১১৮, দীপক শোধন ১১০, কৃপাল সিং ১০০, আব্বাস আলি বেগ ১১২, হনুমন্ত সিং ১০৫… তার পরেই ভিশি! এবং ওই সংখ্যাগুলো একটাও মৌলিক নয়। অর্থাৎ, নিজের অজান্তেই সেঞ্চুরীর ওই মিথটা ভাঙার জন্য একটা মৌলিক সংখ্যা-ওয়ালা রানসমেত সেঞ্চুরী করেছিলেন বিশ্বনাথ। সংখ্যার খেলা… কে জানে, না হলে হয়তো ওই মিথটা আরও অনেকদিন বজায় থাকতো… আরও অনেক ব্যাটসম্যান… কী বলব একে? মৌলিকত্বের প্রতি ক্রিকেটের পোয়েটিক জাস্টিস!

*

দুপুরে খাওয়ার পর ময়ূখ ভবনের সামনে ফুটপাথে দাঁড়িয়েছিলাম। ধরে নাও এমনিই। জাস্ট দাঁড়িয়েই ছিলাম, কার্যতঃ। আমার থেকে একটুখানি অথচ কেমন-জানি-একটা-অনতিক্রম্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে একটা লোক, আমারই বয়সী হবে, গান গাইছিল। গুনগুন করে আর গলা-খুলের মাঝামাঝি একটা কিছু ভল্যুমে। কোনও একটা হিন্দি গান। ঠিক মনে পড়ছে না। হয়তো, আপ কি আঁখো মে কুছ… ওইটাই হবে… তো, তারপর যেটা হল, রাস্তা থেকে একজন লোক এসে ওই গান-গাওয়া-লোকটাকে জিগ্যেস করল, ‘দাদা এটা কি কোর্ট?’ লোকটা গান গাইতে গাইতেই সদর্থকভাবে মাথা নাড়ল। তারপর গান থামিয়ে স্পষ্টভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, এই বাড়িতে একটা কোর্ট আছে।’ এবং, প্রশ্নকর্তাটিকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলে বসল, ‘আচ্ছা বলুন তো, এই যে আপনি বললেন, দাদা এটা কি কোর্ট, এখানে কি বানানটা ক-এ হ্রস্ব ই হবে না দীর্ঘ ঈ হবে?’ ভাবো একবার! কোনও মানে হয় এসবের?

*

ঘুমের মধ্যে সংখ্যা জড়িয়ে যাচ্ছে… আআআজ, কত তারিখ, ধরা যাক থার্ড মার্চ… তার মানে আজ ভ্যানোপ্রসাদ ১১ বছর ১০ মাস ১৫ দিন… মানে… ১১১০১৫… এগুলো যোগ করলে ১+১+১+০+১+৫ = ৯

বেশ, আজ আমি ৪২ বছর ৬ মাস ৬ দিন… মানে… ৪২০৬০৬… যোগ করলে ৪+২+০+৬+০+৬ = ১৮ মানে ১+৮ = ৯

আবার দিন হিসাব করলে আজ ভ্যানোপ্রসাদের বয়েস ৪৩৩৮ দিন। যোগ করা যাক… ৪+৩+৩+৮ = ১৮ মানে ১+৮ = ৯

মানে

১১ বছর ১০ মাস ১৫ দিন = ৯
৪২ বছর ৬ মাস ৬ দিন = ৯
৪৩৩৮ দিন = ৯

আশ্চর্য হই…

*

এইভাবে ফিকে হতে হতে চলে গেল ঋতু। আমাদের একদিন হঠাৎ একা একা মার্চ। ডেথ টোল। আর, প্রফুল্লনগর ভরে উঠল আমের মুকুলের গন্ধে। আ, এই উদ্বাস্তু-কলোনীর লোকেরা, একসময়, আর কিছু পারুক আর না পারুক, একটা-দুটো করে আমগাছ কাঁঠালগাছ লাগিয়েছিল প্রায় প্রত্যেকেই। এখন তার আমের মুকুলের গন্ধ, এখন তার কাঁঠালের গুটিগুটি সম্ভাবনাদৃশ্য।

কেন যে একটা দিন একদম আরেকটা দিনের মতো হবে হুবহু…

*

অথচ রেশম রেশম বলে পরোক্ষে ডেকে উঠছে চিরমুগ্ধতার একটা একটা দিন। তুমি লিখছি। এইসব নিরুত্তর। অভিমান লিখছি। ভাঁজ করে অক্ষরেখা রাখছি। প্রশ্রয় ও উইথড্রয়াল সিম্পটমস। স্নায়ু। ছোট ছোট বাক্যে, রোদের সিনট্যাক্স পড়ছে। লং স্ট্রোকস। তোমার জন্য ভেঙে যে দৃশ্যগুলো ফেলা হচ্ছে। ক্ষত অবধি এই পথ। শিফট করছে। চলে যাওয়া ভ্যালেনটিনা নাম…

# * # * #

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

এখানে স্মৃতি পরীক্ষা করা হয়

নিজের নিজের টোকেন হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়ান

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

(চলবে)

Facebook Comments

Posted in: March 2020, Novel

Tagged as: ,

Leave a Reply