ধারাবাহিক গদ্য : সিন্ধু সোম

fail

পর্ব – ৮

রাজস্থান ডায়েরিস—১৫

ইউক্যালিপ্টাসের চামড়া ধোয়া চাঁদ। এখানে ছোপ। ওখানে ছোপ। পায়ের শ্বদন্ত। মাটির কামড়ে রক্ত। রক্তাভ। এভাবে লক্ষ্মী পাতা এখানে হয়েছে কত মাস! একা রাত বেছে কেনে কলঙ্কের মালা। চাঁদের সোকেসে ভারাতুর আবিলতা। কাঁচের পেছনে অসম্বৃত দোকানদার দ্রুত হাতে গুছিয়ে নেয় পসরা। রাস্তায় দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ ছায়া পিছু নিয়েছে। হঠাৎ পিছন ফিরলে ছায়া চমকে চমকে ওঠে। বিবাহিতার ওসব গ্রাহ্য নেই। সঙ্গের আনন্দে ওর ঘোরের সঙ্গম জমে। এক বিন্দু এক বিন্দু। প্রলম্বিত প্রতিবিম্ব। চাঁদও ঢুকে আসে সেই চোঁয়ানো ঘামে। এক পা ছায়ার বুকে দিয়ে বিবাহিতা আমার আগে আগে। খ্র্যাচ খ্র্যাচ খ্র্যাচ। হাসি। ঝাঁকড়া গাছের উপর বাসা। প্যাঁচাটা নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেছে। সুতো ছিঁড়ে আসে মাথার ভেতরে। পায়ের ছন্দপতনে উষ্ণতা। স্বাস্থ্যের ধোঁয়ায় শিশিরের ছানা কাটে অনর্গল। ওটা কি? একটা লাশের মতো! কাছে যেতে ভুল ভাঙে। ফ্রস্টের টুপি। কুড়িয়ে নিলেম না। যোগ্যতা যার সে আসবে। আমার মন বলছে। ঝপ ঝপ। ঘাড়ের কষ বেয়ে ডানা। চামচিকের টানা সুরমা সরে সরে যায়। বিরক্ত হয়েছে? না! বিবাহিতা দাঁড়িয়ে পড়েছে। আঙুলের কাটাদাগ আনমনে খোঁটে। আমার চোখের নিচে অন্ধকার, অন্ধকার আরো অন্ধকার হয়ে জমে ওঠে স্মৃতি।

তিল। দিতির পিঠের খাঁজের মতো পিচ। আমাকে নীচে নামতে বাধ্য করে। কেমন গুলিয়ে ওঠে জ্যোৎস্না। একটা অবলম্বন চাই। পড়ে যেতে যেতে আমি বিবাহিতার কোমরে হাত রাখি। এভাবেই ডুবতে চায় সূর্য। পাহাড় থেকে ছলকে ওঠে দুধ। রঙ। মন্দিরের চূড়া। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর। পাথরের ভাঁজে চুঁইয়ে পড়ছে অবাধ্যতা। পায়ের লাগামে রেখা বেঁকে যায় গর্ভবতী হয়ে। আমার কাঁধে মাথা রাখে অচেনা সুন্দরী। নতুনা। সাদা জামায় পিঁপড়ের দাগ। আমার কেউ সচেতন হয়ে ওঠে। এভাবে। না এভাবেই। এভাবেই কাছে পিঠে আলো খুঁজে পাল তোলে শুভ্রতা। লালা জড়িয়ে নেয় পাকে পাকে। শুঁয়োপোকার গুটির মতোন আমরা দোল খেতে থাকি। পাতা আধখাওয়া পড়ে থাকে এককোণে। চোখ ভরা জিজ্ঞাসার অত্যচার করে না নতুনা। “তোমার দ্বারে কেন আসি ভুলেই যে যাই; কতই কী চাই–/ দিনের শেষে ঘরে এসে লজ্জা যে পাই।।”[১]  দিলবরা। উচ্ছিষ্টের দলায় যে কাতরতা শিল্প হয়, তাজমহল তাকে ছুঁতে পারে না কোনও দিন। ঢং ঢং। ফেরার ডাক পথে। নতুনা হারিয়ে গেছে সারির ভিড়ে। কাতরে কাতরে ছুঁতে চাই। খুঁজে ফিরি। ফিরি। ফিরি। শেষবারের চোখে ধরা থাকে ইশারা। সেই গঙ্গার ভীষ্মেরা ইচ্ছে করেও মৃত্যুর ঠোঁট পায় না কোনও দিন। আমার দিতির খোঁজ সাধনায়। সাধের শিক্‌লি কেটে দানের ভার নৌকাখণ্ডের শাড়িতে লেগে থাকে। শেয়ালকাঁটার মতো।

শিরিশিরে হাওয়া। জানালার হাল ঘোরে। ক্ষেতের আবেশ। ধনুক টানে গরু। কাগজ। কাগুজে গোলাপি। রক্তের ছিটছিট। হলদেটে বাসি। ফুল। ঝুম ঝুম ঝুম। অনেক দিন পর। নতুন মরণে আসে নুপুরের কান্না। সময় এল এরমধ্যেই। একটা বেড়ালের বাচ্চা কোলে। কোথা থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনে কে জানে! বেড়ালটা ঝিমোচ্ছিল। এবার নীচুর গন্ধ পেয়ে মৃদু স্বরে একটা আপত্তি করল। নখ। নখর। ওকি জানে? নুয়ে পড়া সাদা কাঠে জামরুলের মতো আঁশটে গন্ধ। স্কিচ স্কিচ। প্রশ্নচিহ্ন বয়ে নিয়ে বেড়ায় কাঠবিড়ালী। বিবাহিতা তাড়াতাড়ি আঁচলটা টানে একটু। সময় বিবাহিতার গলা ধরে ঝুল খায়। “দিদি, এমা! তোর দুটো চুল পেকেছে। দেখ! কালো করে দিলাম কেমন!” আঙ্গুলের সুরে রঙ ধরে। বিবাহিতা করুণ ভাবে হেসে বলে, “না ভাই। আজ অমন শুকনো মুখে ছাড়তে আমি রাজি নই। তুই কি মিস্তিরি?” সময়ের চোখে ঝিলিক। ঠোঁট টিপে বলে, “ও তো তাই ভাবে!” “ভাবতে দে। ফালতু একটা লোক। কখন থেকে এগিয়ে পড়ছি খালি। চলতেই পারে না। শুধু এদিক আর ওদিক। উফফ্‌! বাবা! আর পারি না।” পাহাড়ের চূড়ায় শেষ হয় আরতি। রতির কোলে ঝাঁপ দেয় সূর্য। আসলে রতিই সরযূ। বুঝতে পারি নতুনার অলিখিত দলিলে হস্তাক্ষর দ্বিধা করছে একটু। নোনার দুই ভাগ। আপন মনে গল্প করে ওরা। জ্যোৎস্না ভরা ছায়ার সমারোহ। আমি ওদের হাত পা নাড়া দেখি। কেমন নিজের মতো নিজেই ওরা! পুরুষের উপস্থিতি প্রকৃতিকে আকুল করে বারবার। অশান্ত করে। নিজেকে কলুষিত মনে হয় খুব। আমার কাছে এসে সময় গলার গন্ধ নেয়। “তোমার কাঁধে এত লম্বা চুল কার গো? বুকে কামড়ের দাগ আছে নাকি? দেখি!” জামা টেনে নামায়। আমি বলি, “তোমাদের অশুচি করছি ভেবে লজ্জা করছে খুব জানো! বিশ্বাস করো, আমি চাই নি যে আমি চাই! অথচ ‘চাই’-এর বুকের চাঁই সরানো আমার কম্ম নয়।” সময়ের দৃষ্টিতে জমা হয় বিষন্নতা। বলে, “তোমরা নিজেদের এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ভাবো বলো তো?” “বলো কি! নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ আর ভেবে উঠতে পারলাম কই? তবে প্রকৃতির সাধনায় যুদ্ধ কিছু কম হয় নি! অন্তত তেমনটাই ইতিহাসে লেখে।” “ওটাও অব্জেক্টিফিকেশন। যুদ্ধ পুরুষাঙ্গ মাপার ফিতে ছাড়া আর কিছু ছিল না কোনও দিন। সবেতেই ছাব্বিশ ইঞ্চি।” আমার মুখটা কি হল জানি না! বুকটা বড় হালকা হয়ে যায়। হেমন্তের গলায় কেউ গেয়ে ওঠে অবিকল “আমি জ্বালব না মোর বাতায়নের প্রদীপ আনি, / আমি শুনব বসে আঁধার-ভরা গভীর বাণী।।/ আমার এ দেহ মন মিলায়ে যাক নিশীথরাতে, / আমার লুকিয়ে ফোটা এই হৃদয়ের পুষ্পপাতে, / থাক্‌-না ঢাকা মোর বেদনার গন্ধখানি।।”[২] ধূসর নদীতে ভেসে ওঠে মধুকর। সময়ের চোখ। আবছা নিজের দাঁতে কাটা দাগ। জল জমল কি? রামায়ণের নদীতীরকে কি সময়ও ভুল বুঝবে?

দিগাঙ্গনার বুকের কাছাকাছি। নিঃশব্দের অবচেতনে চিরকাল কেঁপে কেঁপে ওঠে অস্তিত্ব। নতুনার বুক। সাদা প্রতিশব্দ। আকাশে ভাসে সেই গন্ধ। পরিচিত হয়ে আসে অন্ধকার। স্নিগ্ধতার কার্পেটে পথের দীর্ঘতারা ঘরোয়া। গুন গুন। বিবাহিতার পায়ের পাতায় ছলকে উঠছে স্মৃতির শুভ্রতা। আমি কানে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। পায়ে পায়ে। গাভীন হয়ে উঠেছে দ্বিত্ব। সময় আরো কাছ ঘেঁষে আসে। বুঝি গাল দেওয়াটাও স্বার্থপরতা। নিজের জন্যই। তা না হলে আমার শরীরটা কী এমন দামী যে এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকে পরিপূর্ণতা? সময় আমার চোখে তাকিয়ে বুঝতে পারে। একটা প্রশ্রয়ের হাসি ওর মুখে। সেই রাস্তাটা! জোনাকি পোড়ে। মাদল বাজে। আদল নেশায় গভীরতা নেই। এভাবে দুধের ওপর হেঁটে যেতে ক্লান্তি লাগে না। হাজার মরণ পায়ের সিম্ফনি হতে পারে। আমি অন্ধ হতে পারি। কিন্তু স্পর্শ নেব। শব্দ মিলিয়ে নেবে মাটির কাছকাছি। বাউলের একতারা প্রোথিত এখানে রাতের বছরে। চটপট চটপট। আবহমান। চোখের কুয়াশা খানিকটা কেটেছে। সেই সন্দিগ্ধ আলোয়ানের ফাঁক দিয়ে আমাদের দৃশ্যপট। সামনে রাস্তায় হেঁটে চলেছেন জর্জ। মাথায় রবার্ট ফ্রস্টের হ্যাট। অনুরণন। কানে ঠোঁটের উষ্ণতায় ভাসছে— “আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে……”![৩]

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
২৭শে অক্টোবর
রাত ১০টা ২৫

যে গুল্মে যোনির মতো চোখ, সরীসৃপের ছায়া কাটা নক্সা, আর সোনালিমা শীতের ফসল, তার পাতা আমার বসতি

ছায়াছবিতা বিতানো পার্শ্বিকের কোল দেয়! গুঁড়ি দেওয়া বরফের বুকে লখীন্দরের পদচিহ্ন, ধূপ থেকে ধূ ধু…

রাজস্থান ডায়েরিস—১৬

ঘুম ঘুম। ঘুঙরু। ঘুঙ্ঘট। ঘাঘরার চোখ। চোখের বিস্ময়। আলু থালু মার্বেলে ফেটে পড়ে নিবেদন। পায়ের নীচে কিছু নেই। শূন্য। দারুচিনির ছালছেঁড়া রঙ। গন্ধ। আবার ওভারব্রীজ। বয়ে যায় সংকীর্ণা। ঝুমঝুমি হাতে। পাথরে বাঁদর নাচায়। হাতে বেতের ঝুড়ি। একপেয়ে স্তূপ। ছায়া আসে পাথরকুচি বেয়ে। রোদ মুখ বাড়ায় গাছের জানলায়। “কিরে? ব্যাগ কই? শালা ডোবাবি দেখছি!” বলি, “আছে আছে। সম্পূর্ণার সাধনায় শূন্যই নির্বাণ। তুই মাল এখন ওঠ দেখি! রোজ রোজ কোলে নিতে পারব না!” রাগ করলে কিনা কে জানে! মুখ ঘুরিয়ে নিলে। হলুদ ক্ষেতের বেগুনি শাড়ি। খোলা আকাশ। শ্বাশুড়ি বউয়ের আঙুলে মাখিয়ে দিচ্ছে আদর। নিজেরই শৈশবে ছায়া দেয় মহীরুহ। চোখের আবর্ত ছাড়িয়ে চাকার আবর্তে ঠেকে জীবন। বিবাহিতার খোলা চুলে নেমে আসে বালিয়াড়ির ঢেউ। হাওয়ার পালে মজা নদী স্রোত ধরায় একাকী। এও কি যৌবনবতী হবে? বুকে নেবে সোনার তরী? একটা ভাঙা হারমোনিয়াম। ছড়িয়ে আছে দু পাত্তর। শচীন কত্তা গাইছেন, “কেঁ যাঁস রেঁ………” । উত্তর দেওয়া যায় না। অনেকটা দূরত্ব। আমি নড়া দাঁতে নাড়া চিবানোর শিরশিরানি উপভোগ করি মাত্র। ক্ষেত কামানোর পর যে বোঁটা পড়ে থাকে বুলবুলচণ্ডীতে তাকেই নাড়া বলে। সব কিছুতে পায়জামা নামাতে কোথাও বাধো বাধো ঠেকে।

“তুমি তো কিছুই নিলে না, অক্ষত-যৌবন, প্রেম,
দ্বিধাগ্রস্ত আমার পৃথিবী; সুজলা-সুফলা বাংলা,
প্রিয় জন্মভূমি, শ্যামরক্তে পোষা নীল পাখি-;
-তুমিতো কিছুই নিলে না।

……………………

বিষাদে বিষাক্ত দেহ তুলে নেবে তুমি, জেলেরা যেমন করে
ত্রস্ত হাতে জাল থেকে মৎস তুলে নেয়-;
অথবা বেদেনী যেমন সব খেলা শেষ হলে বাক্সে ভরে
দন্তহীন, ক্রীড়াক্লান্ত বিষাক্ত গোক্ষুর।”[৪]

নতুনার স্মৃতির আতর। বিবাহিতা আমার কব্জিতে চেতনা ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেয়। খট খট। উটের গাড়ি। এ পথের ইতিহাস তাড়া করে এ জন্মকে। হেমন্তের বোল ধরেছে গুল্ম। “সেদিন তোমায় দেখেছিলেম ভোরবেলায়…”! ক্যাচর ম্যাচর। সারাদিন চলে চাকা। সূর্য হাতছানি দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ে। কলাবতীর কুচবরণ। চিলের মতো ঘোরে। ডাক দেয়। রাজকন্যের বিষে অচেতন বিশালাকায় হায়ড্রা। থৈথৈয়াঙ্কে পটভূমি থর থর থর বোনে। জালের ওপর মাখন শুকায় নন্দ ঘোষের ছেলে। ছবি। ছবিতার উপকথা। থেমে থাকা জলে মরুর সবুজতা খেজুরে আলাপের মতো হাতখানেক গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। স্লপ স্লপ। হায়ড্রার উদরে স্রোত। ভাসি চুনাপাথরের ঘাসে। সর্পিল। পাতার ছাওনি। চকচক করে খৈনির প্যাকেট। অচলতা পরিত্রাণ চায়। আমি আকন্দের মতো বর দিয়ে ফেলি। টুপ টুপ। তরুক্ষীর লতা বেয়ে পড়ে।

দোলন চাঁপা দোলন চাঁপা। না। ওরম পাতার ফুলঝুরি। মেবারের গেঞ্জির বাইক। উরিশ্শাআআ! চিমটি। আমি বিবাহিতার নখের দিকে তাকাই। বাইরের ক্ষেত একবুক ইঁটভাঁটার ব্রণ নিয়ে মুখ নামিয়ে আড়াল দেয়। শক্ত পাথর কাটলে শাক্তমন্ত্রে ভুল হয়। রাস্তাও হয়। বিবাহিতা আড়চোখে মাপে। ঠোঁটের কোনে লুকিয়ে রাখা হাসি উপচায়। দু হাত। হুর হুর হুর। পাথুরে মেঝেয় ছুটে আসছে অবাক হওয়ার ক্ষমতা। আমি বিবাহিতাকে ডাকি। কাজল মেঘ বেয়ে ভেজা উঠোন। ধান শুকোনোর গন্ধ। বিবাহিতা একচোখ বিস্ময় মাখানো ঠোঁট নিয়ে বলে, “কী?” আমার চোখ এগিয়ে যায় বিস্ময়ের উৎস সন্ধানে। মাঝে কী করে ঠোঁট আলপনা দেয়, বুঝতেই পারি না! বিবাহিতা কপট রাগে চোখ পাকিয়ে তাকায়। আমি দেখি “গহন কুসুম কুঞ্জ”।[৫]  ভেজা। ভিজে উঠছে। ভিজতে চাইছে। আমি চোখের উপর ঠোঁট আঁকি ওর।

“আবার নদীর পারে ছেড়ে যাবে বলো?” বিবাহিতার দিকে চাইতে ভয় করে। কিন্তু দিতি যে আমার সাধনা। বিবাহিতা যে বোঝে না, তা নয়। তবু নারীত্বের চিরন্তন দাবী! তা কেমন করে এড়াবে ভুল? অভিমানিনী মরুভূমির কুয়ো। আমি ওকে নতুনার গল্প শোনাই। মিট মিট। পাথর চেয়ে থাকে। বাবলার ঝাড়ে সূর্য ঝিমায় কিছুক্ষণ। আবছায়া কাগজ ফুলের রাস্তায় চাকার শন শন শব্দ। হলদিঘাটি। হাতি দুলছে। চেতকের হ্রেষায় ছেতরে যাচ্ছে ঔপনিবেশিক আনুগত্য। ধুলোর বুকে একটাই ছায়া পড়ছে। দুলুক দুলুক। রানী রঙে ঢেউ। কোমরের স্রোতে কাঠকুড়ুনি চলেছে। মাথায় আগুনের প্রতীক্ষা। হয়তো ঘরে পথ চেয়ে আছে একটা ছেলে। হেঁসেল ঠেলে ক্লান্ত স্বামী সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে জড়োয়া। সূর্যকে আড়াল করে পরাবে আজ রাতে। সন্ধের দোলায় ইতিহাস ইতিহাস নামতা। একটা বাচ্চা আধখাওয়া পেয়ারা হাতে হাঁ করে বাস দেখছে। দেখে ঝুলন্ত সূর্যের বিঁধে থাকা কাঁটা গেল ঝরে।

উপরে রাণী। এক ফুট ছয়। পাঁচটা সিঁড়ি নীচে মহারাজের দরবার। দুফুটের গম্ভীর পায়চারি। নাট্যমঞ্চ স্থানীয় নিম্ন বুনিয়াদী। আল । এখানে পাথর হয়ে থাকে। রক্তের রঙ কালো হয়ে এল। চরতে থাকা মোষের শিঙে পাহাড়ের ছায়া পড়েছে। বিবাহিতার আঁচল টেনে ঘাম মুছি। “নতুন শাড়ি! দূর তুমি না! যাতা একেবারে।” কপট রাগে মেঘ ঘনায়। অন্ধকার ঘর। আমার মনে পড়ে বৃদ্ধা বাঈজীকে। একা একা ছড়া কাটে,”শাঁখা চাই? শাঁখা? জয়া! ওকে বলে দে…”! কেউ শোনার নেই। এভাবেই মানুষ নিজেকে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। অনিশ্চয়তায় দোলাচল। বুককে বোঝায় যেন সে একাকিনী আবৃত্তি, “বেঁচে আছি, বেঁচে আছি, বেঁচে আছি।” দিতিও কি তাই করে আজকাল? বিবাহিতা আঁচলটা টেনে নিল বুকে। আমরা পা বাড়াই ভাঁ সঁ-র স্টারি নাইটের আকাশ পিছনে রেখে। আলপনার দেশ। গাছের জন্মদাগ রাস্তায়। এখানে। ঠিক এই মোড়ে গতবার দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। রামপ্রসাদের মতো আবর্তে থেকে প্রকৃতির সাধনার আশায়। “ও কে কাঁদছে গো ধন বিহনে।/ সামান্য ধন দিবে তারা, পড়ে রবে ঘরের কোণে।।”[৬] একটা মৃত্যু অনুভূতি আনে। অনুভূত হয়, পথের সাধনা চিরকাল পথিকেই করে। ঘর তার শক্তির মূল। উত্থিত ঋজু যৌনাঙ্গ মাত্র। একতারায় সন্ধেপ্রদীপ জ্বালতে সূর্যেরও একটা কাদম্বরী লেগেছিল! ভুলে যায়! মানুষ ভুলে যায়। বেঁচে থাকে ফার্স হওয়া ট্রমা। তাই মৃত্যুকে চিনতে আজও কীর্তন লাগে মানুষের। “তুমি দাঁড়ায়ো ত্রিভঙ্গে …” আর “তুঁহু নাহি বিসরিব, তুঁহু নাহি ছোড়বি” যুগ্মবেণী গঠন করে তাই প্রতি রাতে। যখন পথের কাছে পথিক এক পথ নিতে আসে…

২৮ শে অক্টোবর ২০১৮
দুপুর ১২টা ২১

______________________________________
[১] রবীন্দ্রনাথ
[২] রবীন্দ্রনাথ
[৩] রবীন্দ্রনাথ
[৪] নির্মলেন্দু গুণ
[৫] রবীন্দ্রনাথ
[৬] রামপ্রসাদ

Facebook Comments

Posted in: March 2020, Prose

Tagged as: ,

Leave a Reply