বাংলাদেশে করোনাকাল : আকাশে বসত মরা ঈশ্বর – আহমেদ মুগ্ধ

fail

আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলো ‘করোনা’ সামাল দিতে গিয়ে যেভাবে পর্যদুস্ত হচ্ছে বাংলাদেশও ঠিক সেভাবে একই পথে হাঁটছে।ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আকাশেও কালো মেঘেদের স্তূপ নিজেদের আরো সমৃদ্ধ করছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলতে পারি যে,এ যেন ক্ষুদ্র পিপীলিকার গায়ে একটা মস্ত বড় প্লাটফর্মের ভার চাপিয়ে দেয়া! তবে এই ক্ষুদ্র পিপীলিকা বোধকরি এখন রাশিয়া এবং আরো কয়েকটি দেশ বাদে গোটা বিশ্বও।সেই পিপীলিকার সারির মাঝে আমরাও এক ক্ষুদ্র পিপীলিকা এখন।মহাকালের বুকে পিঁপড়ের সারির মতই মানুষের বিচরণ,কিন্তু পিঁপড়ের ফেরোমন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে গেলে যেমন এরা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন,আপাতদৃষ্টিতে এই পৃথিবীর ভূখণ্ডে বিভিন্ন রাষ্ট্রের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া যেন এমনই কোনো এক ফেরোমনের নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা নদী হয়ে মানুষের হাতের করতলের রেখার মত ছড়িয়ে ছিল পৃথিবীব্যাপী। তবুও আমাদের মাথার উপর এক আকাশ,সেই এক আকাশ দ্বারা পৃথিবীর মানুষেরা দৈহিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও এই মহামারির কালে আরো দৃঢ় করে তুলেছে নিজেদের আত্মিক বন্ধনের ভিত্তিপ্রস্তর। সেই আত্মিক বন্ধনই বাতাসে বাতাসে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির আগমনী সুবাসের মত ছড়িয়ে ধরণীর বুকে এই আশার বীজ বপন করছে যে আমরা সবাই একসাথে মিলিয়েই পৃথিবীর সোনালী দিগন্ত আবার উন্মোচিত করব।আবার আমরা সব নদী একসাথে মিশে সমুদ্র স্নানে যাব। কিন্তু এই প্রশান্তির বারিধারা আর কতদূর?

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে যদিও আশার আলো পাওয়া যাচ্ছে।এপ্রিলের ৭ তারিখ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দন্ডায়মান হয়ে দেখা যাচ্ছে গত দুই-তিন দিনে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু সারাবিশ্বে অনেক কমেছে।কিন্তু বাংলাদেশে এই গ্রাফটা ঠিক বিপরীতমুখী–আমাদের এই গ্রাফ গত কয়েকদিনে ঊর্ধ্বগামী,গত তিন-চারদিনে এই বৃদ্ধি বর্গের সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।প্রথমদিকে করোনা পরীক্ষা কম করার কারণে করোনা আক্রান্ত রোগী প্রতিদিন বাড়ছিল মাত্র ২-৫ জন করে।এমনটা বলছি কারণ অফিশিয়ালি করোনা রোগীর সংখ্যা কম হলেও প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০-১২ জন করে করোনা উপসর্গ নিয়ে মানুষ মারা যাওয়ার খবরগুলো পাওয়া যাচ্ছিল এবং এখনো যাচ্ছে।তাই দেশজুড়ে করোনা টেস্ট করা বাড়ার পর ২-৫ জন করে যেখানে করোনা রোগী পাওয়া যাচ্ছিল সেখানে দুই একদিনের মধ্যেই সেই সংখ্যা ৯ থেকে ১৮ হয়ে যাওয়া, পরের দিনও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩৫ জন হয়ে যাওয়া এবং তার পরের চারদিনে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৪১, ৫৪, ১১২ ও ৯৪ তে গিয়ে যখন দাঁড়ায় তখন বলার অপেক্ষা থাকে না যে, অফিসিয়ালি ১০ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় সর্বমোট আক্রান্ত ৪২৪ জন এবং সর্বমোট মৃত্যুর সংখ্যা ২৭ হলেও ইতিমধ্যেই আরো অনেকেই যারা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গিয়েছেন,তাদের অনেকেই যে করোনা আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই কোনো। মৃত্যুর পর তাদের করোনা ছিল কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে,মৃত্যুর পূর্বে করা হয় নাই।অর্থাৎ অন্যান্য দেশের তুলনায় করোনার সংক্রমণ আমাদের দেশে আরো পরে হলেও সরকার এই প্রাপ্ত সময়টার যথোচিত ব্যবহার করে যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে নাই।’একটা উল্টো যাওয়া ঘোড়ারগাড়ি,আরেকটিকে সাবধান করে’—পৃথিবীর এত ঘোড়ারগাড়ির উল্টো যাওয়াটাও কিন্তু আমাদের ঘোড়ারগাড়িকে বিন্দুমাত্র সাবধান করতে পারে নাই।যদিও তাদের দাবি যে আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলো থেকে তাদের পূর্বপ্রস্তুতি ভালো ছিল,আমেরিকার করোনা মোকাবেলার জন্য নগণ্য প্রস্তুতি দেখার পর এই কথাটা একেবারে উড়িয়ে না দেয়া গেলেও এপ্রিলের ৫-৬ তারিখের মধ্যে পাওয়া বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে তখন পর্যন্ত করোনা রোগীর সংখ্যা এদেশে কম হলেও, মৃত্যুর হারে আমাদের দ্বিতীয়তে অবস্থান করাটা আমাদের ভীষণ শঙ্কিত করছে।কারণ এটা আমাদেরকে এমন দুশ্চিন্তার সম্মুখীন করছে যে, এখনই যদি মৃত্যুহার আমরা সামলাতে না পারি তাহলে এখন যেভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমরা কীভাবে এই করোনা মোকাবেলা করব।
যদিও করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যখন মাত্র ২-৩ জন ছিল তখনই সমালোচনার মুখে সরকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।তার কিছুদিনের মধ্যেই এর বিস্তার আরো বাড়লেই সময়মত সরকার মার্চের ২৬ তারিখ থেকে অফিস-আদালত, গণপরিবহন সব কিছু বন্ধ করে রাস্তায় পুলিশ-আর্মি নামিয়ে সারাদেশকে কার্যত লকডাউনই করে দেন,তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি।কারণ জনগণের অসচেতনতা, অকারণে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক্ষেত্রে হার্ডলাইনে না যাওয়া।এরমধ্যেও যারা রাস্তায় বেরোতে বাধ্য, তারা হলেন আমাদের দেশের দিনমজুরেরা, যারা দিন আনে দিন খায়।তাদের সংখ্যা কোটি কোটি এদেশে।সরকার ত্রাণ দিচ্ছেন,কিন্তু ত্রাণ দেশের অনেক জায়গাতেই ঠিকভাবে গরীব মানুষদের কাছে যাচ্ছে না।করোনা হয়তো এদেশে ঘাঁটি গাড়বে আরো দীর্ঘদিনের জন্য, তখন এদেশের এই গরীব মানুষগুলোর অবস্থা যে বানের জলে ভেসে যাওয়ার মত হবে তা ধরেই নেয়া যায়। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী কিছু দৃশ্যের মধ্যে ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনের একটি দৃশ্য আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সেখানে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়ার সময় পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে অনেক শ্রমিকই ত্রাণ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে হাতাহাতি, মারামারিতে জড়ায়। যদিও খাদ্যের মজুদ অপর্যাপ্ত নয় দেশে কিন্তু অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতা নেই।কিছুদিন আগেই সরকার নামমাত্র মূল্যে গরীব-দুঃখীদের মাঝে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা শুরু করেন।কিন্তু তা সঠিকভাবে গরীব মানুষদের কাছে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য পৌঁছাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় সরকারের এমন কিছু লোক পাওয়া যাচ্ছে, যাদের ঘরে ত্রাণের অর্ধেক খাবার,যখন কিনা এই দুঃসময়ে রিকশা চালক বাবা তার শিশুটির জন্য দুধেরও জোগান করতে পারছেন না। এরা অসহায়,ঘরে এদের অভুক্ত পরিবার, দিনের পর দিন তাদের হাতে কাজ নাই, কোথায় যাবে তারা?কার কাছে যাবে তারা?তবুও এইটুকুই স্বস্তি যে এদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে।আর সেক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।কিছুদিন আগে দেশের মিরপুরের পল্লবীর বস্তির চিত্র এই যে, শত শত মানুষ ত্রাণের জন্য রাস্তায়।পেটের ক্ষুধা কি করোনা মানে?লকডাউন মানে?আর্মি যদি গুলিও করা শুরু করত তবুও কি তারা ভাবত না যে, গুলি দিয়েও তবু ক্ষুধার্ত পেটের উদরপূর্তি হবে?সারা পৃথিবীতে একটাই স্লোগান যে, ‘ঘরে থাকাই এখন শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম’,দেশের মান্যগণ্য লোকেরা বলছেন যেভাবেই হোক ঘরে থাকাই শ্রেয়।ত্রাণ দেয়াও এখন বিপদজনক,এটাও যে কি ভীষণ সত্যি তা দেখা যায় যখন ত্রাণ দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যুর খবর পাই। আর একজনের হওয়া মানে তো আরো দশজনের হওয়ার আশঙ্কা!যেখানে এদেশে ডাক্তারদের পোশাকই যথেষ্ট বিপদমুক্ত নয় সেদেশের সব জায়গায় কীভাবে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করে ত্রাণ দেয়া যায়?তবে এই দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত মানুষকে বাঁচানোর জন্য কিছুই করার নেই! বড় এক অদ্ভুত সময় পার করছে রাষ্ট্র!ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ বিতরণকেও আপাতত করতে হচ্ছে অনুৎসাহিত।সরকারি ছুটি ও নিয়ন্ত্রিত চলাফেরার নির্দেশ ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের কিছু কিছু জেলা লকডাউন করা হয়েছে।এমতাবস্থায় এই গরীব-দুঃখী মানুষগুলোর কী হবে?ত্রাণের খোঁজে এদের এমন ছুটে বেড়ানো দেখে ১৯৭১ এ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ নিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গের লেখা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর কথা আবার মনে পড়ে,এখানে যুদ্ধটা এই মহামারির সাথে—

“কার কাছে বলি ভাত রুটি কথা,
কাকে বলি করো করো করো ত্রাণ,
কাকে বলি, ওগো মৃত্যু থামাও,
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ…
লক্ষ মানুষ ভাত চেয়ে মরে,
লক্ষ মানুষ শোকে ভেসে যায়…”

সত্যিই আকাশের উপর বাস করা ঈশ্বরটি কি আবার মারা গেলেন?বারবার মরে যাওয়ার এই নিপুণ খেলায় আর কতদিন মত্ত থাকবেন তিনি?এই ধরণীর বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন যে,এই পৃথিবীর সকল কিছুর মৌলিক জননী তিনি।আর তিনিই সারা পৃথিবীর এই ক্রন্দন কি শুনছেন না?ইতালির,যুক্তরাষ্ট্রের, স্পেনের এত এত মানুষের স্বজন হারানোর আহাজারি কি তিনি শুনছেন না?শুনছেন নাকি আমাদের দেশের দিনমজুর ও গরীবদের অন্ন চেয়ে এই আহাজারি?
” আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে?” গিন্সবার্গের সেই কথাই এখন আবার পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে তার সত্যতা জানাচ্ছে।

করোনায় এদেশে মৃত্যুর শঙ্কা শেষপর্যন্ত কততে গিয়ে দাঁড়ায়,কীভাবে সরকার এই পরিস্থিতি সামলে নেবে, কতটা নিরাপদ আমরা এবং আমাদের স্বজনরা, এসব দুশ্চিন্তা নিয়েই আমাদের দিনাতিপাত এখন।প্রতিদিনের টেলিভিশনের খবরগুলো এবং সংবাদপত্র রোজ নিয়ম করে আমাদের বিভীষিকায় ফেলে দিচ্ছে।করোনার কারণে আমাদের দেশের কিছু কিছু হাসপাতাল মানুষের সেবা দেয়ার বদলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে,এমতাবস্থায় করোনা আক্রান্ত রোগী বাদে অন্যান্য রোগীদের কী হবে সেই দুশ্চিন্তাও আছে।যেসব ডাক্তাররা চিকিৎসা না দিয়ে ঘরে বসে আছেন তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী লাইসেন্স বাতিল করে দেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।কিন্তু তা কতটা কার্যকরী হবে সেটাই দেখার বিষয়। তাছাড়া দেশের অর্থনীতি বড় ধরণের হুমকির সম্মুখীন। আমাদের দেশের অর্থনীতি পোশাক রপ্তানির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল, বিজেএমইএ-এর সভাপতি প্রায় দেড়শ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।অনেকেরই চাকরি হারানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে পোশাকশিল্পের কর্মীদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। এটার সঠিক ব্যবহারই এখন দরকার।করোনার বর্তমান পরিস্থিতি এবং এদেশের মানুষের জীবন নিয়ে যেমন এখন শঙ্কা ঠিক তেমনি করোনা-পরবর্তী সদ্য নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়েও প্রচন্ড শঙ্কিত বোধ করছি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা মনে করছে, ২০২০ সালে করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে,সারা বিশ্বে করোনার প্রভাবে চাকরি হারাতে পারে ২ দশমিক ৫ কোটি লোক।সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে?এশীয় ব্যাংক বলছে যে,২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমে ৭.৮ হলেও এবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধি অর্জনে শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশ।কিন্তু তারা এটাও বলছেন যে, করোনার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৯ লক্ষ কর্মজীবী মানুষ চাকরি হারাতে পারে।দেশে বেকারদের সংখ্যা এমনিতেও কম নয়। তার উপর যদি আরো ৯ লক্ষ মানুষের নাম বেকারের খাতায় উঠে যায় তাহলে সেটা যে আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কতটা সুদূরপ্রসারী এক অভিশাপ হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।দেশের প্রায় ৯ লক্ষ মানুষের চাকরি হারানো মানে দেশের লক্ষ লক্ষ পরিবারের কূল-কিনারাহীন এক অবস্থা।ধ্বস নামবে ব্যাংক খাতে,মানুষ লোনের টাকা শোধ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে আছে সংশয়। ব্যাংকগুলোকে পড়তে হবে আর্থিক সংকটে। অনেক মানুষেরাই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন,ফলস্বরূপ সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য ঘাটতি দেখা যাবে, আর এই ঘাটতি ঠিক কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে তাও জানা নেই আমাদের।কিন্তু সারাদেশ কার্যত লকডাউন করে দেয়ার যথেষ্ট মূল্য এদেশের মানুষ দিতে পারল না।অকারণে তারা তবুও বাহিরে ঘোরাঘুরি করেছে,কিছুদিন ধরে অহেতুক ঘুরে বেড়ানো এই মানুষগুলোর মধ্যে কিছু মানুষকে জরিমানা গুনতে হচ্ছে।এই ব্যবস্থাও নেয়া উচিত ছিল সেই ২৬ শে মার্চ থেকেই, যেদিন থেকে দেশ কার্যত লকডাউন।সরকারের পূর্বপ্রস্তুতি না থাকা এবং এদেশের মানুষের অসচেতনতার মাশুলই হয়তো পেতে যাচ্ছি আমরা।বিশ্বের বেশিরভাগ রাষ্ট্রই প্রথম থেকে করোনাকে গুরুত্বের সাথে না নেয়ার মাশুলই এখন পাচ্ছে।স্বাস্থ্য খাতের চেয়ে সামরিক খাতে অনেক বেশি খরচ, মারণাস্ত্র তৈরিতে অনেক বেশি খরচ এবং খরচের পরিকল্পনার মাশুল হয়তো বিশ্ব এই মহামারিতে দিচ্ছে।এই সামান্য জীবাণুই মারণাস্ত্র তৈরি করার পেছনে অঢের অর্থ ঢালা বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোকে নতুন করে জানাচ্ছে যে, মানুষকে বাঁচানোই মানুষ ও রাষ্ট্রের ধর্ম,হত্যা বা ঘৃণা ছড়ানো নয়।একটা আদর্শ দেশের পরিচয় মারণাস্ত্রতে নয়,মানবিক বোধে।একমাত্র এই বোধই মানুষ, রাষ্ট্র ও পৃথিবীর গলায় গলার হার হয়ে, নক্ষত্রের ঐশ্বর্য নিয়ে জ্বলজ্বল করতে পারে। অন্য আর কিছু নয়। চার্লি চ্যাপলিনের সহজ সত্য কথাই নিজেকে বলে এখন শান্ত করতে হয় যে, পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয় আর চিরস্থায়ী নয় আমাদের সমস্যাগুলোও।

কিছুদিন আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম আকাশে কয়েকটা তারা মিটিমিটি জ্বলছে।কিন্তু তা প্রশান্তি দিতে পারছিল না মনকে।এই আকাশের নিচে গাড়ি-ঘোড়ায় প্রতিদিনের ব্যস্ত হয়ে থাকা সড়কটি অন্ধকারের নদীতে হারিয়ে গেছে–রাস্তার কিছুই আর আলাদা করে ঠাহর করে নেয়া যাচ্ছিল না চোখে।এরমধ্যে এলাকার আশেপাশের সব মসজিদ থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য জামাতে নামাজ পড়ার বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসছিল।যে ঘোষণাটি অনেক আগেই আসা উচিত ছিল কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়াদের কথা মাথায় রেখে সরকারের পক্ষে যথাসময়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় নাই।বাসার বারান্দার থেকে দেখা যায় অনতিদূরে, রাস্তার ওপারে,তিনতলা শপিং মলের উপর স্বপ্নালু নীল আলোতে ভেতর-মোড়ানো মসজিদটা,সেখান থেকেও এই ঘোষণা এসে মনকে কেমন যেন নিশ্চল করে দিচ্ছিল।এই ঘোষণাগুলো রাস্তার উপর বয়ে যাওয়া এই অন্ধকার নদীর গভীরতা জানান দিচ্ছিল।মসজিদের শহর এই ঢাকার মানুষদের বোধকরি আজানের শব্দও এখন আকাশ দেখার নেপথ্য ধ্বনি হয়ে তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে মনকে প্রশান্তি দিতে পারছে না–কেমন এক অস্থিরতা,অনিশ্চয়তা ঝুলে আছে বাতাসে বাতাসে।এই অনুভূতিই এক ভীষণরকম শূন্যতা যেন! আমাদের বাসার ওপারের মসজিদটার সাথেই অর্থাৎ শপিং মল লাগোয়া শনি মন্দির। প্রতি শনিবার সেখানে শনি পূজা হতো,কিছুটা দূর থেকেও মন্দির থেকে ভেসে আসত ধর্মীয় গানের সুর আর ধূপের গন্ধ, যা জানালা দিয়ে গড়িয়ে এসে ঘরের মধ্যে আধ্যাত্মিক অনুভূতি ছড়াতো। সেইসাথে যখন মাগরিবের আজান মিলে যেত তখন যেন মানস-সরোবরে এই আশ্চর্য অনুভূতি ষোলকলা পূর্ণ হয়ে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে উঁকি দিত।কিন্তু এখন মসজিদ-মন্দিরের এই স্তব্ধতা,এই শূন্যতা যেন ভারতচন্দ্রের কবিতার পঙক্তিটাই মনে করিয়ে দেয়—’নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’ হারানোর জন্য তো এই শহরটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, এই শহরটাই নিখোঁজ হয়ে থাকলে আর কোথায় হারাব! যা কিছু সঞ্চয় তাও তো এই শহর!

একটি অদৃশ্য জীবাণু আজ মানুষের জীবনকে এত পলকা করে তুলেছে,এত অসহায় করে তুলেছে যে,কাঁচের আয়নার ভেতর দিয়ে মানুষের প্রতিচ্ছবিগুলো চলে গিয়েছে অনেক দূর।কোনো শান্ত জলধারা ঘিরে আজ তাদের সম্মিলন, জল ছাড়া আর কোথাও যেন আজ মানুষের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে না। অথবা জলই আজ তার ছবি।মানুষের জীবন যেন বৃক্ষের নিচে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা সেই কুকুর,হঠাৎ যে কুকুরটার ঘুমের ভেতরে একটা ঝড় শাঁই-শাঁই করে এসে তাকে আদিগন্ত তাড়া করে বেড়ালো।অতঃপর কুকুরটি যখন কোনো চার দেয়ালের ভেতর ঢুকে গেল,ঝড় তখন চার দেয়ালের শাটার নামিয়ে পথ জুড়ে কুকুরের ফেলে যাওয়া বেদনার ধ্বনিগুলোকে জড়ো করে আবার ছুটে চলেছে আকাশের দিকে।আর সেই কুকুরটি এখন চিরকাল জেগে থাকবে মৃত্যুর সেই অন্ধকূপের ভেতরে–সে এখন জেগে থাকতে শিখেছে! যে জীবন নদীর ছিল,আজ মাথার উপর রেখে প্রাপ্তবয়স্ক চাঁদ,দেখি সেই নদীতে কে যেন ছড়িয়ে দিয়ে গেছে কুয়োর বীজ।ঢেউ নেই,প্রবাহ নেই,কেমন নিশ্চল আর তাই স্থির এক গভীর বোধ তাদের চোখে।এই চোখ তাদেরই যারা অনুভব করতে পারছে ঝড়ের মুখে পৃথিবীর এই নাড়িছেঁড়া ক্রন্দন,যাদের চোখ আজ স্থির হয়ে ভাবা শুরু করেছে যে জলই কি মানুষের চিরসত্য ভূমি!অথবা যে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আত্মম্ভরিতা, সেই মাটি কি ছলনা মাত্র,বেলাশেষে মানুষের মতই অনেক ধর্মের আড়ালে কি সে লুকিয়ে রেখেছে তার আসল ধর্ম?যে ধর্ম জলের, সেটা কি তারও ধর্ম,মানুষকে অতলে তলিয়ে যেতে দেয়া?যারা ইতিমধ্যে চলে গিয়েছে সেই অতলে, তারা কি এখন মৃত্যুর দেশে জলজ প্রাণী হয়ে মাছেদের অনিমেষ চাহনি নিয়ে প্রার্থনা করছে তার ফেলে আসা সন্তানের জন্য, সুস্থ পৃথিবীর?
অথবা বলা যায় কোনো এক মায়ের গল্প।যে তার ছোট ছেলেমেয়ে দুটির হাত ধরে একদিন ঘাসের চাদরে খরগোশের মত লুটোপুটি খেলবে বলে করেছিল মনস্থির। কিন্তু সেদিন তাদের ছোট বাগানের উপর এসে জড়ো হয়েছিল সেসব মেঘেরা,যেসব মেঘেদের ভেতরটা যেন ঈশ্বর সুই-সুতার ফোঁড়ে সেলাই করে দিয়েছিলেন অবিরাম জলে।অতঃপর তুমুল হাওয়া এসে ছিঁড়ে দিয়েছে মেঘেদের, ঝরিয়ে দিয়ে গিয়েছে ওদের ভেতরে জমানো গল্পদের।ঝরিয়ে দিয়েছে মন কেমনের সেই বৃষ্টি, যা বুকটাকে উটের পিঠের মত প্রশস্ত করে দেয় চাপা কান্নায়।যে বাচ্চারা আনন্দের সাথে বলতে শিখেছিল ‘Rain,rain,go away’, তারা সেদিন গাইল তা করুণ সুরে, যেন অদূর কোনো এক শঙ্কিত ভবিষ্যৎকে তারা ঠিকই শনাক্ত করে নিতে পেরেছিল তাদের ঘড়ির ভেতরে।সেই ভবিষ্যৎ যখন বর্তমান হয়ে আসে,কোনো এম্বুলেন্স তখন মাটির কোমল সুর ভেদ করে ভয়ের ডঙ্কা বাজিয়ে এসে নিয়ে যায় তাদের মাকে।আইসোলেশনে।তাদের সামনেও ঝুলিয়ে দেয়া হয় সেই জীবন, যা নির্জন দ্বীপের।সেই মহামারির কালে বাতাসে বাতাসে কান্নার অনুবাদে গ্রন্থিত হয় যেন তাদের সেই করুণ সুর —

“Rain,rain, go away
N-e-v-e-r come another day
Mommy wants to play
Rain rain go away.”

এমন কোনো অশনি সংকেতের বৃষ্টির পৃথিবীর থেকে চিরকাল ঝরে যাওয়ার অপেক্ষাতেই পৃথিবীর সব মুখগুলো আজ জানালায় স্থির।তারা চায় অমোঘ শান্তির বারিধারা।কাফকার সেই পথ হারানো অনন্তকাল ধরে আসতে থাকা কোনো বার্তাবাহকের কাছ থেকে সম্রাটের বার্তার জন্য এই অপেক্ষা নয়।সেইসব পায়রাদের জন্য,যারা ভালোভাবেই মানুষের পথ চিনে,যাদের ঠোঁটে মানুষের জন্য সেইসব জোনাকির দল,যেসব জোনাকির আলোতে লেখা থাকবে ফের জীবিত হয়ে উঠা ঈশ্বরের পক্ষ থেকে পৃথিবীর সুস্থতার বার্তা।যে বার্তা তাদের আবার নিয়ে যাবে পৃথিবীর অশেষ কর্মের ভীড়ে।

বেঁচে যারা আছে এখন,ওদেরও হাতেখড়ি হয় মৃত্যুতে,
কাল হয়তো ওরা সম্বিত ফিরে পাবে প্রিয় মানুষের সাথে;
হয়তো কেউ পাবে না,দেখবে প্রিয় মানুষেরা ঘুমাতে শিখে গেছে—
পাখিরা যারা স্নান শিখে গেছে,এসে বসবে গির্জার উঁচু চূড়োতে;
শান্ত করবে মেঘেদের—আগুনের সাথে বোঝাপড়া হবে জলের–
লকডাউনের এই শহরে দুপুরের সঙ্গিন বাতাসে, মানুষের উড়ে যাওয়া ইতিকথা, নারীর আঁচল উড়বার;
মানুষ এখন আরো কাছে এসে বসে জানলার,
কাছে যত যায় মানুষ, চক্রকমিক হারে বয়স বাড়ে জানলার;
কোলরিজের বুড়োর মত এই শহর, মানুষ না পেয়ে পুকুরের জলের মত শুয়ে আছে স্তিমিত–
মানুষের দুঃখ এখন ব্ল্যাকহোল,সেই নির্মিতব্য দালানের ভেতর অন্ধকারই পিলসুজ;
আর সেই পিলসুজে মানুষের মুখই দীপ —
বেদনা দিয়ে যা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে আরো।
মানুষের বেদনাকে হেলা করে আরো,বর্তমান গড়িয়ে যায় আরও বর্তমানের দিকে–
ঝড়ের পুরোভাগে গাছের পাতাগুলোর মতোই মানুষ আঁকড়ে ধরে থাকে যেন কিছু!
অথচ জানে না সে, আঁকড়ে আদৌ ধরতে পারে না মানুষ আসলে কিছুই–
গাছের পাতাগুলোর মত,মানুষকে যতটুকু
ধরে রাখার সেতো রাখে তার উৎস—
পাতাগুলোকে তবু ওভাবে দুলতে হবে,ঝড়ের মঞ্চে ঝড় মঞ্চস্থ হবার এমনই তো নিয়ম!
সময় সৃষ্টির শুরু থেকে এখনো বর্তমান হয়ে আছে,অতীত  সে হয় না কখনো—
অতীত হয় বৃক্ষ-লতা,মানুষ,হরিণীর একক জীবন–
মহামারির ক্রান্তিলগ্নে মানুষই শুধু নিঃসঙ্গ হয়–অতীত হওয়ার মহড়া দিতে দিতে বহু মানুষ
পাহাড়ি ঢলের মত শহরে নেমে অতীত হয়–
তখনও মানুষের ঘুমের ভেতরে জাগরণের লেশ থেকে যায়, আমাদের চৈতন্যের ভেতর—
মৃত্যুর পরও আরো কিছুকাল, মাটির আতিশয্যে, ঘুমাতে শিখে মানুষ ;
স্ক্রন্ধ্রে নিয়ে এই ঝড়—প্রসবকালীন বেদনার পর পৃথিবী ভূমিষ্ঠ করবে নবজীবন;
তুমি বেঁচে আছো,তুমি স্বজনও হারাওনি
তবুও যখন পুড়ছে পৃথিবী তুমি কি পুড়বে না একটুও–
সময়ের এই বয়ে যাওয়ায়,সব মানুষ নদীর তরঙ্গ, সূর্যের দিকে যেতে যেতে তুমিও ডানায় করে বয়ে নিয়ে গেলে সময়—
আর যারা চলে গেল মেঘেদের ওপারে কিংবা যারা জলের বোধ নিয়ে তবু বেঁচে আছে ঘরের ভেতর—লকডাউনের পৃথিবীতে পরিযায়ী পোকামাকড়ের আদল পায় মানুষের বোধ।
Facebook Comments

Leave a Reply