রাগ-রাগমালা সখ্য, ভারতীয় মুসলমান শিল্পীর মুনশিয়ানা : অর্ক দেব

fail

একেকটা ছবি অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়৷ অস্তিত্বটাই দুমড়ে যাবে যেন। বর্তমান ভারতবর্ষের সমস্ত ছবিই প্রায় এমন। শুধু অসুখ নয়, মহাভারতের যদুবংশের মত নিরন্তর লড়াইয়ে মত্ত সেই দেশ যার অখণ্ডতার ধারণা বহু দেশের পাথেয় ছিল। ভাঙা আয়নায় চোখ চলে যায়। দেখি সার বেধে দাঁড়িয়ে আছে ‘মুসলমান’, ‘শ্রমিক’ এই সব অপরজন। শিল্প, সাহিত্য; সৃষ্টি-কৃষ্টি এলিট জগতে ব্রাত্য এই ঊনজনের বর্গের ইতিহাস খুঁজতে বসে নানা জানলার সামনে এসে দাঁড়াই। এমনই এক বহু শতকের পুরনো জানলা- রাগসঙ্গীত ও রাগমালা চিত্রকলা, যার সঙ্গে যোগ ছিল মুসলমানের। শ্রমিকের। কিঞ্চিত যোগ স্থাপিত হয়েছে আমারও, যেটুকু যোগ থাকে কথকের।


(১৭৫৫ সালে আঁকা দীপক রাগের ছবি। সান দিয়োগো আর্ট মিউজিয়ামে সঞ্চিত। শিল্পীর নাম-ফকির উল্লাহ।)

বৃত্তের বাইরে থেকে রাগের ঝাঁকিদর্শন

ভারতীয় রাগসংগীতের নানা ঘরানার সঙ্গে আজ জনজীবনের তেমন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নেই, একথা দ্বিধাহীন ভাবে মেনে নিতে হয়। আর্টের সঙ্গেও আটপৌরে জীবন যাপনের কোনও মিথস্ক্রিয়াই গড়ে ওঠেনি। আসলে দিনযাপনের গ্লানি, বারুদসংকুল সময় নিরন্তর অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইতিহাসে ফিরে তাকালে যে কোনও রূপদ্রষ্টাই অন্য আলোয় দেখতে পাবে, এই দুই মাধ্যমের সোনালি ঐশ্বর্য যা ‘আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির সঙ্ঘের দিকে-ধর্মে-নির্বাণে।’

ইউরোপীয় স্বর পরম্পরায় যেমন বিভিন্ন স্কেল, নানা মোড আয়োনিয়ান, ডোরিয়ান, লিডিয়ান ইত্যাদি; ভারতবর্ষে তেমনই রাগ। অনুবর্তী সুরের রূপভেদ অনুসারে আঙ্গিকগুলো বদলে বদলে যায়। মানে ভৈরবী বা ইমন এগুলি মোডই সে অর্থে। তবে হ্যাঁ মোডের তুলনায় রাগের ব্যাপ্তি কয়েক সহস্র গুণ বেশি। রাগের বিস্তারের একটা বিরাট আধ্যাত্মবাদী দিক আছে , তা অন্য পরিসরে আলোচনার দাবি রাখে।

‘রাগ’ শব্দটিরঅভিধানিক অর্থ ‘রঙ’। স্বাভাবিকভাবেই তার পূর্ণতা রাঙিয়ে দেওয়ায়। অষ্টপ্রহর প্রতিটি ভাবের উপযোগী সুরমূর্ছনায় তন্ত্রীকে রঞ্জিত করাই তার অভীষ্ট। ভারতীয় রাগ রাগিণীর মূল উৎস চারটি, যথা: ১) লোক ও মার্গসংগীত ২) ভজন বা যোগীর গান ৩) কাব্য থেকে উৎসারিত সংগীত ৪) ওস্তাদী বা দরবারী। ১৫৭০ সালে রেওয়া অঞ্চলের পুরোহিত ক্ষেমাকর্ণ তার সংস্কৃত রাগমালা কাব্যে ছয়টি পুরুষ রাগের কথা উল্লেখ করেছেন। এই রাগ ষড়ঋতুর ব্যঞ্জনা দিতে সক্ষম। তিনি ভৈরবী, দীপিকা, শ্রী, মালকোষ, মেঘ, হিন্দোলা এই ছ’টি রাগকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর দর্শনে একেকটি রাগ একেকটি ঋতুর দ্যোতনা বহন করছে। প্রতিটি রাগের আবার পাঁচটি, মতান্তরে ছয়টি রাগিণী বিদ্যমান। যেমন ভৈরব রাগের স্ত্রী ভৈরবী, মেঘের স্ত্রী মল্লার, শ্রী রাগের রামকেলী ইত্যাদি। রাগ রাগিণীর পুত্রকন্যা এমনকি পুত্র-পত্নীও রয়েছে। প্রতিটি রাগ দম্পতির (রাগ-রাগিনীর) আটজন রাগপুত্র রয়েছে। যেমন মেঘ রাগের পুত্র শঙ্কর, হিন্দোলা রাগের পুত্র বিনোদ।

এই জগতের সন্দিগ্ধ মানুষজনের বিশ্বাস যে রাগ যে সময়ের চিহ্ন বহন করে, সেই সময়ে গীত হলেই তার পূর্ণতা প্রকাশ পায়। ভৈরব রাগের সঙ্গে শিবপুজোর অন্তর্লীন যোগসূত্র রয়েছে। অর্থাৎ বৈশাখের আগুন দিনই এই রাগচর্চার প্রকৃত সময়। শিবের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্য একটি রাগ মালকোষ। মালকোষ শব্দটি তৈরি হয়েছে মাল এবং কৌশিক এই শব্দদু’টির সংমিশ্রনে। এর অর্থ এমন মানুষ যিনি সর্পকে গলায় মালার মত ধারণ করেছেন। কথিত আছে শিবের তাণ্ডব থামাতে পার্বতী এই রাগ সৃষ্টি করেন। মালকোষ রাগের স্ত্রী গাউন্দকারী, দেবগান্ধারী, গান্ধারী, ধ্যানেশ্রী। পুত্র মারু, মেওয়া, মুস্তাংভোরা প্রমুখ। মালকোষ গাওয়া হয় মধ্যরাত্রে। এতে মুরকির তেমন ব্যবহার নেই। বরং গমক, আন্দোলনের কাজ রাগটিকে মান্যতা দিয়েছে। একটি রাগের সঙ্গে অন্য রাগের প্রকৃতিগত পার্থক্য অনেকসময় খুবই কম। যেমন তিলক কামোদ আর দেশ রাগের মধ্যে ফারাক খুবই সূক্ষ্ম। দেশে আরোহণে শুদ্ধ নি আর অবরোহণে কোমল নি-এর ব্যবহার আছে। অন্য দিকে তিলক কামোদে ব্যবহৃত স্বরগুলি শুদ্ধ। কোমল নি আকস্মিকভাবে আসে। একইরকম ভাবে মালকোষের সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে কর্ণাটকী রাগ হিন্দোলমের।

রাগসংগীতের জগত ঘিরে অনেক গল্প রয়েছে যা থেকে তার সমাদর ও সমাঝদারের ঔদার্য্যের একটা আভাস পাওয়া যায়। তাঞ্জোরের জনৈক রাগসংগীত গায়ক মেয়ের বিয়ে দিতে মোটামুটি সর্বস্বান্ত হয়ে কোনও উপায়ন্তর না দেখে মহাজনের দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু তার তো কোনও মহার্ঘ্য সঞ্চয় নেই বন্ধক রাখার মতো। মহাজন তার কাছে তোড়ি রাগটি চেয়ে বসলেন। একপক্ষ কাল পেরোলেই রাজসভায় সঙ্গীতের আসর। তবু তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই বন্ধক রাখলেন প্রানপ্রিয় রাগটিকে। জলসার দিনে নির্দিষ্ট সময়ে ডাক পড়লে তিনি একে একে পেশ করলেন বৃন্দাবনী সারেঙ, দেশ রাগ। শুধু তাঁর সিগনেচার রাগটি গাইলেন না। মহারাজ সারাভোজী (১৭৯৮-১৮২৯) কারণ জানতে চাইলে তিনি সবটা খুলে বললেন। সহৃদয় রাজা তাঁকে তৎক্ষণাৎ ঋণের দায় থেকে মুক্ত করলেন। রাজসভা ফুল ফোটাল তোড়ি। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে আকবরই প্রথম রাগসঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক একথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। কারণ বাবর সঙ্গীতকে হালাল মনে করতেন। হুমায়ুন সময়ই পাননি। আকবরের আমলেই আমীর খসরু তৈরী করেছেন রাগ জৌনপুরী। উত্তর প্রদেশের জোনপুর বা গুজরাটের যবনপুর অঞ্চলের নাম অনুসারে এ হেন নামকরণ।

আকবরনামায় রাগসঙ্গীত নিয়ে নানা মিথ খুঁজে পাওয়া যায়। এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, দিনের বেলা তানসেন রাত্রির রাগ গাইতে শুরু করলে অকাল সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসে। এমনও পাই, যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে নায়েক গোপাল দীপক রাগ গেয়ে উঠলে যমুনার জলে আগুন জ্বলে ওঠে। আকবর শুধু সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতাই করেননি৷ বহন করেছেন ভারতীর রাগমালা চিত্রকলার বিরল ঐতিহ্যও। রাজস্থানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রাগমালাচিত্রকলাকে নতুন আলোয় তুলে ধরেছে।

রাগমালাচিত্রকলা, যাত্রাপথের আনন্দগান

রাগ বা রঙ আমাদের গণস্মৃতিতেই রয়েছে। আমরা যে কোনও মুহূর্তকে রঙহীন ভাবতেই শিখিনি। ভরতের মতে শৃঙ্গারের রঙ গাঢ় বাদামী। আনন্দের প্রকাশ সাদায়। ধূসর রঙের জন্ম করুণার অভিব্যক্তিতে। লাল হল রুদ্র, কালো বীভৎস, হলুদ চমকপ্রদ। বোঝাই যায় আমাদের পল অনুপলকে রঙের মাত্রা দিয়ে ভাবার একটা জমি আগেই তৈরি ছিল। কাজেই একটি রাগও যে রঙের উদ্ভাসেই আত্মপ্রকাশ করবে, তা ভারতীয় আত্মায় ভাবা সম্ভব।

চতুর্দশ শতাব্দীতে তাইই হয়েছিল। রাগকে রঙে ফুটিয়ে তোলার এই আনন্দময় প্রকল্প হইহই করে চলেছে অন্তত ৪০০ বছর। ছবি এঁকেছেন ‘আমআদমি’। ষোল শতক রাগমালা কাব্যের পুঁথিতে রাগরাগিণীর প্রচুর ছবি পাওয়া যাবে৷ এই ছবির বীজ অবশ্য লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতীয় চিত্ররীতিতেই। জৈন ও বৈষ্ণব পুঁথিচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে।
আজমীর, বুঁদি, বিকানীর, অম্বর, কিষেনগড়, কোটা, মারওয়ার, মেবার ইত্যাদি অঞ্চলগুলি ছিল রাগমালা ছবির হটস্পট। অনেকটা প্রথম দিকের কালীঘাট পটের মত ধর্মাধর্ম আর দৈনন্দিন এই নিয়েই কারবার করতেন রাগচিত্রীরা। কেউ প্রেমিক প্রেমিকার যৌথ যাপনের চিত্র ধরে রেখেছেন, কখনও বারোমাস্যা বা ষড়ঋতুর নানা পর্যায়গুলো ফ্রেমবন্দও হয়েছে। পরিবেশের সঙ্গে নাড়ির যোগ টের পাওয়া যায় এসব ছবিগুলি দেখলে। কাজের টেকনিক লোকায়ত। চারপাশে যা দেখা যায়, শিল্পী নির্দ্বিধায় তাকে ঠাঁই দিয়েছেন ক্যানভাসে। সারস, সাপ, হরিন, ময়ূর, সাপ, মানুষের নিত্যসঙ্গীরা মানুষেরই মত এইসব ছবির অংশ। প্রাকৃতিক রঙে আঁকাছবিতে প্রকৃতির একটি খণ্ডকেই দেখছেন শিল্পী। আজ এত শতক পরে এই বিষাক্ত জলহাওয়ায় প্রাণসংশয়ে দাঁড়িয়ে আমক ছবিগুলি দেখতে দেখতে আসলে দেখছি সেই শিল্পীকে, ভারতের আত্মাকে।

আমরা এখানে কথা চালাচ্ছি রাগমালা ছবি নিয়ে। যদিও সামগ্রিক রাজপুত চিত্রকলাই আসলে তৎকালীন পাবলিক আর্ট। তার মধ্যে একটা সর্বজনগ্রাহ্যতার দাবি আছে। আছে অনুপুঙ্খ ডিটেলিং আর কাব্যিক শুশ্রূষা। সেই গুণই আহরণ করেছেন রাগমালা আঁকিয়েরা।


(এই ধরণের খসখসে কাগজেই রাগমালা ছবি আঁকা হত)

তোড়ি রাগের গল্প বলছিলাম শুরুতে। এই রাগকে প্রতাপগড়ের শিল্পীরা আনুমানিক ১৭১০ সাল নাগাদ বীণাবাদনরত মহিলার রূপ দিয়েছেন। রাগপুত্র ভ্রমরানন্দ শিল্পীর চোখে এক যোগী। তিনি তাণ্ডব নৃত্য করছেন আর বোল তুলে সঙ্গ দিচ্ছেন এক রমণী। মেঘরাগের বিস্তার বোঝাতে বজ্রগর্ভ মেঘের সঞ্চারে সখীদের আনন্দগান রঙ ও রেখায় ধরা আছে। হিন্দোল রাগের স্ত্রী আহিরী রাগিণীর ছবিটা সাক্ষাৎ আনক্যানি। দেখা যাচ্ছে কয়েকজন মেয়ে মাটির পাত্র থেকে বেরিয়ে আসে গোখরো সাপকে দুধ দিচ্ছে। সহাবস্থানের এই ছবি আজকের পৃথিবীকে বাস্তুতন্ত্রের পাঠ দিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।


(প্রতাপগড়ের শিল্পীদের আঁকায় তোড়ি রাগ। আনুমানিক ১৭১০ সালের ছবি।)


(ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আহিরি রাগিনীর ছবি।)

অহেতুক পরিশীলনের মধ্যে না গিয়ে শিল্পী তাঁর দৃশ্যমান জগতকেই ছবির ভাষায় বাঙ্ময় করে তুলেছেন। সব ক্ষেত্রে ন্যারেটিভ টেকনিক ব্যবহার করার প্রবণতাটাই ইউএসপি। রাজপুত রাগমালা ছবির অন্যতম আখড়াগুলি মাওয়ার, বুদি, বিকানের। মারওয়ারের আঁকিয়েদের মধ্যে রোম্যান্টিক ছবি আঁকার প্রবণতা প্রবল। ‘রসিকাপ্রিয়’-র ন্যারেশানে তাঁরা অন্য সকলকে ছাপিয়ে গেছেন। একটি ছবিকে শিল্পী দুটি স্তরে ভাগ করেছেন। আবারও পটের কথা আসবে। জড়ানো পটের মত স্তরে স্তরে গল্প বলার টেকনিক। আদি টেলিভিশন আরকি।


(সাহাবুদ্দিনের চোখে রসিকাপ্রিয়।)

একটি ছবিতে প্রথম স্তরে দেখা যাচ্ছে, পাঁচজন সখী পরিবৃত হয়ে বসে আছেন রাধা। সখীদের কারও হাতে আয়না, কারও হাতে চামর। পরের ছবিতে রাধাকে দেখা যাচ্ছে বাগানে প্রসাধনরতা। তুলে ধরা আয়নায় তিনি নিজের সঙ্গে দেখতে পাচ্ছেন দূরে দাঁড়ানো কৃষ্ণকেও। কৃষ্ণের গায়ে রাজস্থানী পোশাক, স্টাইল মুঘলদের মতোই। মারওয়ার অঞ্চলের অন্যতম সেরা শিল্পী হিসাবে মুসলিম চিত্রকর সাহাবুদ্দিন -এর নাম পাওয়া যাচ্ছে।

মাওয়ার অঞ্চলের ছবির অল্প বিস্তর প্রভাব পড়েছে অন্য সব অঞ্চলে। রাজপুত মিনিয়েচারের অন্যতম পীঠ বুঁদিতে আঁকাআঁকি শুরু হচ্ছে সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে। বুঁদি ঘরানায় মুঘল- মারওয়ার স্কুলের সংশ্লেষে এক নতুন অভিব্যক্তি তৈরি হয়েছে। এখানে রঙের ব্যবহার অসামান্য। মুঘলদের মতই ছবিতে স্থাপত্যের সূক্ষ কাজ ধরে রাখার প্রবনতা এদের। মানুষের স্কিনটোনে লাল রঙের ব্যবহার, চৌকো মুখ, সরু ঠোঁট, সরু চোখ, তীক্ষ্ণ নাক বুঁদি স্কুলের ছবিগুলির নিজস্বতা।


(মেঘমল্লার রাগ। বুঁদি অঞ্চলের ছবি। আনুমানিক ১৭৭৫ সালে আঁকা।)

সামগ্রিক রাজস্থানী চিত্রকলার উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে বিকানির ঘরানা। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে এই ঘরানার সূচনা। মেওয়ার স্কুলের রঙের জমক থেকে বেরিয়ে বিকানিরের রঙ অনেক ম্লান, ভাব গম্ভীর। আবার বুঁদি স্কুলের মত স্থাপত্য শৈলীর এফেক্টও বিকানিরে আসেনি। রাজস্থানী মিনিয়েচারে ফিগারের যে বলশালী ভাব তা বিকানীরে উধাও। অবসরমুখর বহমান জীবন এই ছবিগুলিতে অনেক বেশি ফুটে ওঠে। বিকানিরের চিত্রকরদের মধ্যে অনুপ সিংহের রাজত্বকালে (১৬৭৪-১৬৯৮) নাসিরুউদ্দিনের নাম পাওয়া যায়। লস অ্যাঞ্জেলস মিউজিয়ামে তাঁর আঁকা ছবি এখনও রক্ষিত রয়েছে।

রাগমালাচিত্রকলা দক্ষিন ভারতেও তার স্বতন্ত্র পথ খুঁজে নিয়েছে। মূলত আহমেদ নগর, বিজাপুর, গোলকোন্ডা এই তিনটি অঞ্চলে এই ধারা বিকশিত হয়েছে। রাজপুত রাগমালা যেমন সংস্কৃত কাব্যের পরিবর্ধিত রূপ, তেমনই দাক্ষিণাত্যের রাগমালায় অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে তৎকালীন ঊর্দু কাব্য। বিজাপুরের সুলতান দ্বিতীয় আদিল শাহ এর পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তিনি নিজেও একজন ছবি আঁকিয়ে ছিলেন। আনুমানিক ১৬৯০-১৭০০ সালে গোলকোণ্ডায় আঁকা হোরিখেলার ছবিটি বসন্ত রোগের দ্যোতক। একই সময় আহমেদ নগর বা বিজাপুরে আঁকা হচ্ছে শ্রী রাগের ছবি। শ্রী রাগকে শিল্পী ফুটিয়েছেন একজন রাজার আবেশঘন মুদ্রায়। তিনি পদ্ম ফুল হাতে বসে আছেন। রাজার বামদিকে একজন অধস্তন, তার একহাতে তরবারি আর অন্য হাতে রাজাকে বাতাস করার চামর। ডানদিকে রয়েছেন বীণাবাদনরত একজন সঙ্গীতকার। রাজা বসেছেন এক পার্সি কায়দার সিংহাসনে। একটি ময়ূর খেলে বেড়াচ্ছে ছবির ফোরগ্রাউণ্ডে।সব মিলে একটা সিমেট্রিকাল আর্কিটেকচার। তার মাথার মিনারগুলি তুর্কি প্রভাবের দ্যোতক।


(গোলকোন্ডায় আঁকা শ্রী রাগ।)

১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথে ইব্রাহিম লোদির পতনের মধ্যে দিয়ে বাবরের হাত ধরে ভারতে মুঘল অভ্যুত্থান। কিন্তু বাবরের সভাসদের মধ্যে কোনও চিত্রকর ছিলেন না। হুমায়ূনও প্রথম দিকে কোনও চিত্রকরের সংস্পর্শে আসেনি। পারস্যে গিয়ে তিনি রাজকীয় চিত্রকলার কর্মশালার সাথে পরিচিত হন। মীর সৈয়দ আলি এবং আবাদ আল সামাদ এই দুই চিত্রকরকে ভারতে নিয়ে আসেন হুমায়ুন। ভাগ্যের পরিহাস নিষ্ঠুর। ভারতে ফেরার পর হুমায়ুনের আয়ুষ্কাল ছয় মাসের। চোদ্দ বছর বয়সে আকবরের সিংহাসনে আরোহণ। প্রথম দিকে ছবি আঁকা বা বলা ভাল বিদ্যাচর্চাতেই তাঁর তেমন কোন উৎসাহ ছিল না। বরং শিকার ও বীরোচিত যে কোনও খেলায় ঝোঁক ছিল অনেক বেশি। ১৫৬৪ নাগাদ আকবর নারওয়ার এর জঙ্গলে হাতি শিকারে যান। শিকারের পরদিন সকালে রাজসভার কথক তাঁকে মহান বীর হামজারগল্পগাথা বলতে শুরু করেন। বাগদাদ খলিফার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহীর লড়াই আকবরকে শিহরিত করে। আকবর যেন নিজের মধ্যে হামাজের প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পেলেন। আকবর ‘হামাজ নামা’ নামক একটি আখ্যান তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৪০০ বড় আকারের ছবি কাপড়ের ওপর আঁকার জন্য তিনি ৩০ জন পার্শী ধারায় শিক্ষিত চিত্রকর নিয়োগ করলেন। ১৫৬৫-১৫৬৭ এর মধ্যে ছবিগুলি আঁকা হয়। এইভাবে মুঘল চিত্রকলার যাত্রা শুরু।

মুঘল চিত্রকররা দেদার রাগমালা ছবি এঁকেছেন। ১৬১৫ সালে বিলাবল রাগিনীর একটি অনিন্দ্যসুন্দর ইলাষ্ট্রেশান তৈরি হয়। সেখানে নানা রকম গহনায় সজ্জিত এক তরুণী কাঙ্খিত পুরুষের জন্য অপেক্ষা করছে।

রাজপুত চিত্রকলামুঘল স্কুলের প্রভাবে নিজেদের সমৃদ্ধতর করেছে। তবে তা একান্তই ভারতের নিজস্ব ঘরানা। প্রথমে মারওয়ার পরে ধীরে ধীরে কাংড়া অঞ্চলের শিল্পেও মুঘল ঘরানা এক স্থায়ী ছাপ রেখেছে। মুঘলসাহচর্য্যের প্রভাবে বিকানিরের শিল্পীরা নীল ও লাপিজ থেকে তৈরি রঙ মিশিয়ে কৃষ্ণকে এঁকেছেন। ভাসলির রাগমঞ্জরীতেও কৃষ্ণকে লাপিজের রঙে রঞ্জিত অবস্থায় পাই আমরা। আবার কাংড়া অঞ্চলের চিত্রকররা তাকে আলট্রা মেরিন ব্লু রঙে ধরেছেন।

চারশো বছরের এই সুদীর্ঘ যাত্রাটার শেষ দিকে উপনিবেশ তৈরি করতে আসছে পশ্চিমী দেশগুলি। আসছেন নানা পশ্চিমী শিল্পীও। জোয়ান জোকামি, ওজিয়াস হামফ্রে, টিলি কেটিল প্রভৃতি ইউরোপীয় শিল্পীর নাম জড়িয়ে আছে কিছু রাগমালা চিত্রের সঙ্গে।। এদের হাত ধরেই রাগমালা চিত্রকলায় ইউরোপীয় রিয়েলিজমের অনুপ্রবেশ দেখতে পাওয়া যায়।

কোথাও যাইনি। ছবি দেখি বইয়ের পাতায়,অন্তর্জালে। একটি দেশের মানুষের সঙ্গে না মিশলে দেশের আত্মার অনুসন্ধান করা যায় না। বন্ধু নাদিয়া আমায় চিনিয়েছে রিভেরি-ফ্রিডার মেক্সিকোকে। রাশিয়ার পুরনো ছবি দেখিয়েছে উদ্বাস্তু ছবিতুলিয়ে বন্ধু অ্যালেনা উসচেকা। এত সামান্য দেখা, তবু মনে হয় পৃথিবীর আর কোনও দেশে ছবিকে গানকে এমন অপার্থিব স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা আছে বলে জানা নেই, নেই ধর্মাধর্ম, লিঙ্গচেতনার অন্তরে এত চোরাস্রোত। বিমূর্তকে মূর্তে ধরার এই নজিরবিহীন প্রকল্প প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিল্প- ঐতিহাসিকদের কতটা মুগ্ধ করে জানি না। কলম বন্ধ করার আগে আমার রোমকূপ জেগে ওঠে।


(বারোমাস্যা ছবির একটি উদাহরণ। ধাপে ধাপে কবিতা বর্ণিত হয়েছে।)

তথ্যসূত্র:

রাগমালা চিত্রকলা-প্রতাপাদিত্য পাল
মুঘল পেন্টার্স- সোমপ্রকাশ বর্মা
নেকটর অফ ইন্ডিয়ান কালচার- কুমুদ মোহন

Facebook Comments

Leave a Reply