করোনা – একটা যুদ্ধের অপর নাম : দেবাশিস দত্ত

fail

সেদিনে আর এদিনে ফারাকটা অনেক, আসমানে আর জমিনে। তাতেও কম বলা হয়। অশন ব্যসন বাস থেকে বেশ সবেতেই যেন ভুষো কালিতে স্পষ্ট বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ সঙ্গে কর্নিয়ার ছবি। আজ খাগের কলম নেই, ঝর্নাও গত – ডট জেল, ইউজ অ্যান্ড থ্রো। ইজের থেকে জিনস, সেমিজ থেকে বিকিনি, দুধ ভাত থেকে বিরিয়ানি, ইহলোক থেকে চন্দ্রালোক – এই আবর্তন আমাদের জন্য নয়, আমাদের নয়, আমরাও করিনি – আবার অজান্তে অজ্ঞাতে প্যাসিভ অ্যাপ্রুভাল নিয়ে আমাদের হাত ধরেই এসেছে চলেছে – যুগ যুগ ধরে, আমাদের মধ্যেই রীতিমত বসত করছে, চোখ রাঙ্গিয়েছে প্রয়োজনে চোখ উপড়েও নিয়েছে। একদিকে জমেছে ক্যালরির বিপুল পাহাড় অপরদিকের ক্যালরি উনিশ অথবা বিশ ছাড়ায়নি – ঠিক ততটুকু যতটুকু বেঁচে থাকতে প্রয়োজন। অবশেষে রক্তাল্পতা একটা নিকষ কালো অন্ধকার নিয়ে এসেছে যা শুধু বিপন্নতা নয় দুনিয়াকে বদলে দিয়েছে, মানবতাকে ধ্বংসের কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে – এখন সব ‘বাতি’ নেভাবার ডাক এসেছে। অপরদিকে করোনা দুনিয়াটাকে একটা চৌমাথার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে – লাভ লোভের নতুন ব্যাকরণ পাঠ, প্রতিদ্বন্দ্বীতা, যুদ্ধ, জয় পরাজয়, নতুন বাঁটোয়ারা, বিলুপ্ত হয়ে চিহ্ন খুইয়ে নতুন মানের চিত্র প্রকাশ, সব হারা আর পরিযায়ীদের নতুন ঠিকানার সন্ধান অথবা নির্মাণের এক বিকল্পের প্রেক্ষিত, বিকল্প দুনিয়া গড়ার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। সে ভাবনা হয়তো প্রবল নয় বা হতে কতক্ষণ! এখনও হয়তো অপেক্ষা অথবা চলা শুরুর ডাক উঠে আসেনি কেউ এখনও বলতে পারছে না বাতি নেভানো চলবে না। তেমন লক্ষণ নজরে নেই। চুইয়ে চুইয়ে উন্নয়নের সঙ্গে সইয়ে সইয়ে চলার চেষ্টা, মানসিকতা, দণ্ডী কেটে কেটে এখনও সব ঠাকুরের থানে সিন্নি চড়াতে চড়াতে চলেছে! মুক্তি অধরা আজও স্বপ্নই থেকে গেছে। অথবা বলছে খাঁচায় থাক কিন্তু স্বপ্নটা বেঁচে থাক !!

‘করোনা’ এসেছে। চোখ মুখ বেশ লালচে, দেখে মনে হয় বেশ রেগেমেগেই এসেছে। হাতে শূল ক’টা জানিনে – প্রতিবাদ নয় প্রতিরোধও নয় একেবারে প্রতিশোধের ভাষা নিয়ে – ভাবসাব রকমসকম তেমনি। করোনা এখন উদোম নৃত্য, ধ্রুপদী অর্থে বলা যায়, স্থান কাল পাত্র ভেদে নয়, সর্বত্র তাণ্ডব নৃত্য নেচে চলেছে। আক্রোশের মুখটা পালের গোদার দিকে। করোনা এই ক’দিনেই একেবারে সিস্টেমের – নিচের দিকে হলে অণ্ডকোষ আর ওপরের দিকে হলে কলজেটা ধরে টান মেরেছে। টান পড়তেই কল থেকে মল হল সব বনধ, এমনকি যারা ‘বনধ’য়ের বিরোধী তারা শুদ্ধু সবাই সব পসরা বন্ধ করে পাততাড়ি গুটিয়ে কেটে পড়েছে। ‘মামেকং শরনং ব্রজ’-ধামেও তালা পড়েছে, সব ধম্মোকম্ম ‘সাইনে ডাই’। অসংখ্য গজিয়ে ওঠা ফুলের দোকানে এখন লাইন নেই, আজানে সাড়া নেই – সব ‘মাহাত্ম্য’ আপাতত সাসপেনডেড। করোনা আসার আগে পর্যন্ত যারা যোগ‘মুক্তি গো চনায় দিশা দেখাচ্ছিলেন এখন তারা নিজেরাই পালাবার পথ খুঁজছেন। সিংহমশাই’র তর্জন গর্জন শিকেয়, বিপাকে ভিখিরির ভূমিকায় – বেসরকারিকরণ করে এখন হাত পেতে ওষুধ চাইছে। স্বর্ণমুদ্রা নয় এখন লাশ গুনতি হাড় গুনতি নয়। শ্মশানও লাশ রিফিউজ করছে। গণকবর এখন একমাত্র উপায়। বন্দরকাল হল শুরু, কোথায় পোঁছিবে ঘাটে, কবে হবে পার, দুলিয়া চলিছে তরী কোথা যাত্রীদল, গ্রামে শহরে দেশ-দুনিয়ায় বিশ্বায়নী সুরে এক ধ্বনি একই বার্তা এক সংকেত। বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ – তর্কটা আজ আর অষ্টম শ্রেণির সিলেবাস নয়।

‘লক আউট’ বস্তুটা মজুরদের হাড়ে-মাসে জানাই ছিল। আখ মাড়াইয়ের কলে অথবা গোয়ালে খাটালে চতুস্পদকে সুচ ফুটিয়ে ‘টানা মেরে’ হিমোগ্লোবিনের শেষটুকু শুষে নিতে যারা ছিল সিদ্ধহস্ত তারাও এবারে ‘লকডাউন’য়ে কিছুটা স্বাদ বুঝল হয়তো! জ্ঞান বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে তার সমস্ত আশীর্বাদটুকু জমা হল খাতার একদিকে – অপরদিকে বিপরীতে, সমস্ত অভিশাপ আর দীর্ঘশ্বাস সৃষ্ট এক বিশাল খাঁড়ির দিকে একটু পুশ করে দেওয়া! বাস নাম নিশান কোন কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, মেসোপটেমিয়ার লাইনে স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর প্যাটেলের মূর্তি আকাশ ছুঁতে হাত বাড়িয়ে! প্রকৃতির বিরূপতা, ব্যাঙ্কের খাতায় কলমের চাবুকে ভেল্কিতে ব্যাল্যান্সে ঘাটতি ব্যাজার মুখভার তো এমনি এমনি ঘটেনি। যেমন এইচ-টু-ও (জল) নিম্নাঙ্কে জমে থাকার কথা অথচ কীসের কাদের উতপাতে গলছে, কে চটাল সবুজকে এখন জ্বলছে, কে জ্বালাল! যুগ যুগ ধরে অসংখ্য লাম্পট্যের বীভৎস উল্লাস জল, বায়ু, সবুজ সইবে কেন! জবাব দিলেন জাতিসংঘের পরিবেশ বিভাগের অধ্যক্ষা। সম্প্রতি তাঁর জবানীতে জানা যায় ইদানীং কালের মানুষের সমস্ত অসুখের শতকরা পঁচাত্তর ভাগ এসেছে জন্তু জানোয়ারের শরীর থেকে। কারণ খনিজ পদার্থের খোঁজে, গাছ কেটে, জঙ্গলকে খামার বানিয়ে, বাসস্থানের এলাকা বাড়িয়ে, বেআইনীভাবে পশু পাচার করে সাধারণভাবে পরিবেশ ধ্বংস করে জন্তুজানোয়ারদের ‘শরণার্থী’ বানানো হয়েছে। ওদের সঙ্গে মানুষও তো বাদ যায়নি। ‘ক্রোনোলজি’ আর ‘ঘুষপেটিয়া’র উপাখ্যান স্রস্টারা কাউকে বহিস্কার, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর হম্বিতম্বি দেখাচ্ছে না! অদৃশ্য শত্রুর কাছে সব হিম্মৎ কাৎ! উল্টে বরং ‘সব এক কামরে মে’ অথবা ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ মে বন্দী হ্যাঁয় ! কী পরিহাস!! প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষ, দুর্বল নিকেশে সংঘর্ষ ক্রমশ বেড়েছে। বাজারি অর্থনীতির আজ নাভিশ্বাস। আইএমএফ প্রধান বলছেন: ‘মানব সভ্যতার অন্ধকারতম মুহূর্ত’ উপস্থিত। মেল্টিং পয়েন্ট! একদিকে বরফ অপরদিকে সভ্যতার অর্থনীতি যার শুরু হয়েছিল শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে – দুটোই আজ গলছে। সভ্যতার সঙ্গে অসভ্যতা কে করল? বর্বরতার আমদানি কীভাবে হল? নিরুত্তর।

সমস্যা সমাধানে অতঃপর তহবিলের সন্ধান! দেখা গেল অর্থনীতি একদম পাঁকে বসে গেছে। সাকশান পাম্প বসানোর পালা চলছে। বসে যাওয়া টিউবওয়েল চালু করতে বাইরে থেকে জল ঢালতে পাম্প করতে হয়। অর্থনীতির সাকশান পাম্প চালু করতে হলে ‘গরীব’দের হাতে এখন বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে দিতে হবে। এই অর্থের সাথে কাজের কোন সম্পর্ক নেই। কেইনস? ‘সরণ’ বিনা কাজে অর্থ ঢালতে হবে। বোঝ ঠ্যালা। যে ‘গরিব’রা কাজ করে ন্যায্য মজুরি পায় না, না পেয়ে পেয়ে বাপ দাদা চোদ্দ পুরুষ ধরে নসিবে ‘গরিব’ লেখা হয়ে গেল এখন অর্থনীতির দেহে প্রাণসঞ্চার করতে সেই ‘গরিব’কে বিনা কাজে কাড়ি কাড়ি টাকা গোণার কথা উঠছে!! এমনও বলা হচ্ছে টাকা না থাকলে দেদার টাকা ছাপো! অবাক কান্ড ! মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে খাটে, না খাটলে মরে – টাকাও নাকি তেমনি খাটলেই বাঁচে বাড়ে নইলে শুকিয়ে মরে। বিষয়টা দাঁড়ালো টাকার অঙ্গে প্রাণ সঞ্চার করতে ‘গরিব’য়ের দেহে প্রাণ সঞ্চার। কী সাংঘাতিক অঙ্ক!! তো প্রশ্ন উঠলো কত টাকা? আর সেই টাকা আসবে কোত্থেকে অর্থাৎ সোর্স কী? প্রথম কথাঃ গরিব গুর্বো মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে। দ্বিতীয় কথা জীবন নির্বাহে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চলল অন্বেষণ। শুভনীল চৌধুরির হিসেব অনুযায়ী এই দুই খাতে আনুমানিক খরচ হবে ৯.৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি বললেনঃ ভারতের মোট সম্পদের পরিমাণ ক্রেডিট সুইসের হিসেব মতে ১২.৬ লক্ষ কোটি ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় (১ ডলার = ৭০ টাকা ধরলে) দাঁড়ায় ৮৮২ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ৬৬১ লক্ষ কোটি টাকা রয়েছে ধনীতম ১০% ব্যক্তির হাতে। এই ব্যক্তিদের সম্পদের ওপরে যদি ১.৫% সম্পদ কর বসানো হয় তবে প্রয়োজনীয় অর্থ উঠে আসবে। কিন্তু এই টাকা কে তুলবে? কে বলবে সম্পদ কর দাও দিতে হবে! কার আছে সে হিম্মৎ! এদেশে ধনীরা দেবে সম্ভাবনা কম। শাসকের হুকুমে আদায়ের সম্ভাবনা আরও কম। ধনীরা নির্লিপ্ত। কারণ ওদের জান মান প্রটেক্টেড। শেয়ার বাজারে যখন ধস নামে ধনকুবের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চোট হয়। সেই চোট ওরা সয়। কারণ শেয়ার খেলার ওটাই নিয়ম। অর্থনীতিতে ‘গরিব’দের দেওয়াটা নিয়ম নয়, লোটাটা নিয়ম। অতঃ কিম? টর্চ জ্বালিয়ে পথসন্ধান!

‘করোনা’ বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে সত্য, আরও কত মানুষের প্রাণ যাবে তার ঠিক ঠিকানা নেই, সমস্ত ধরণের অর্থনৈতিক কাজ কর্ম বন্ধ, মানুষ ‘ঘরবন্দি’, বাঁচার রসদ ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে – বিশ্ব অর্থনীতি কোমায় চলে যাচ্ছে দ্রুত – ক্ষতির পরিমাণ কষে ওঠা এখুনি অসম্ভব। এখন সবাই ভিখিরি, সবাই হাত পেতে দাঁড়িয়ে, পৈতে আছে কি নেই কেউ দেখার নেই এবং নির্মম নিষ্ঠুর সত্য হাত উপুড় করার কেউ নেই। এমন চেহারা কে কবে দেখেছে? কে কবে ভেবেছে? আইএমএফ প্রধান ঠিকই বলেছেন ‘মানব সভ্যতার অন্ধকারতম মুহূর্ত’ উপস্থিত। এই ব্যবস্থার বিনাশ কাল উপস্থিত… বিনাশ কালে গভীর উপলব্ধি! আইএমএফ ভারতকে ত্রাণে ১০০ কোটি ডলার মানে (১০০ x ৭০) ৭০০০ কোটি টাকা দিয়েছে। তাতে ‘সাকশান পাম্প’ চালু হবে ! ‘কক সিওর’ নয় কেউ।

এই তমসা কি শুধুই তমসা? একক অস্তিত্ব সম্ভব? নাকি আলো আছে কোথাও! বর্তমান অন্ধকার তারই সন্ধান শলাকা? কিছু সুলক্ষণ কিছু সুবার্তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমনঃ এক] আজ থেকে তিন দশক আগে – সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিপর্যয়, বলা হয় ‘সমাজতন্ত্র’ ব্যর্থ, মার্কসবাদ সেকেলে, ‘ধনতন্ত্র’ মানবজাতির ‘মুক্তির’ একমাত্র উৎকর্ষ দর্শন ও ব্যবস্থা। সেই দাবি যে ছিল কতটা আনাড়ি, অসাড়, অসৎ, অদূরদর্শী এবং দেউলিয়া আজ তা দিনের মত স্পষ্ট এবং সত্য। তিরিশটা বছর সময় লাগলো এই যা! কার সাধ্যি আজ অস্বীকার করে ! সমাজতন্ত্রকে আজ দোষারোপ করার কোন উপায় নেই। দুই] বর্তমান বিপর্যয় কোন একটা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপর্যয় নয় – এই বিপর্যয় ধনতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা তথা বিশ্বায়নের বিপর্যয়। ৩] বিশ্বের নিপীড়নকারী ও নিপীড়িত দুই শক্তি, ‘জাতি’ বা শ্রেণির মুখোমুখি, খাড়াখাড়ি বিভাজন স্পষ্ট; নিপীড়নকারী শক্তির হাতে পরিত্রাণের কোন বিকল্প নেই। ৪] পীড়ন ও বিভেদের হাতিয়ার ও তার বর্ম হিসেবে ধর্ম বর্ণ জাতি ভাষা প্রান্তিকতার অন্যায় ব্যবহার অনেকটাই এক্সপোজড। ৫] ধনতন্ত্রের লোভাতুর ভূমিকা ও বিশ্ব উষ্ণায়ণজনিত সমস্যার জেরে ধ্বংসের কিনারায় প্রাকৃতিক সন্তুলন। প্রকৃতি এখন প্রতিস্পর্ধা দেখায় প্রতিশোধের ভূমিকায়। দু সপ্তাহের করোনা ‘লকডাউন’য়ের জেরে বহু দশক বাদে এই প্রথম পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে ২১৩ কিমি দুরের হিমালয়ের ধৌলাধার দৃশ্যমান হওয়া ছোট্ট ঘটনা কিন্তু যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী। ‘লকডাউনে’ ‘করোনা’ দূষণের মাত্রা অনেকটাই কমেছে – অর্থাৎ পথ ছিল, কিন্তু ব্যবস্থা সেপথে পথে হাঁটবে না যা স্পষ্ট বার্তা দেয় এখনও সব কিছু শেষ হয়ে যায় নি, সময় আছে – ঘুরে দাঁড়ানো যায়। অবশ্য বিপদও আছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে একদিকে চলেছে মৃত্যুর মিছিল। অন্যদিকে অগণিত আর্থিক দিক থেকে দুর্বল ‘গরিব’ বলে পরিচিত মানুষ কাল কী খাবেন ঠিক নেই। এমন অনিশ্চিত অবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৫ এপ্রিল রাতে (দলীয় প্রতিষ্ঠা দিবস) শাসকের ডাকে দেদার পুড়ল বাজি, পালিত হল ‘দীপাবলি’ যেন এক উৎসব। ৪৫ মিনিটে বিত্তশালীদের ছোবলে বাজীর ধোঁয়ায় বাতাসে বিষ ছড়াল ১৪ মাইক্রোগ্রাম। এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় শাসকের অজ্ঞতা যার হাত ধরে এসেছে নিষ্ঠুরতা, বিপন্নতা। সৃষ্টি বিপন্ন, বিপন্ন অস্তিত্ব। তাকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন প্রকৃতির সন্তুলন। কোন ধরণের লুটেরা আচরণ অজ্ঞতা কোন মতেই বরদাস্ত আর নয় – বর্তমান সেই বার্তাই দেয়, ক্ষেত্র প্রস্তুত জানান দেয়। পরিবেশ রক্ষার এই চিত্রটা কোন আঞ্চলিক চিত্র নয় – এর আন্তর্জাতিক চরিত্র বিশ্বায়নী রূপ প্রকাশ পেয়েছে যা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে। ‘মানব সভ্যতার অন্ধকারতম মুহূর্তে’ গ্রেটা থুনবার্গের পরিবেশ সচেতনতা ও তা রক্ষার লড়াইটা এখানে বাঙময় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষিত খুঁজে পায়। তাঁর লড়াইয়ের যৌক্তিকতা স্পষ্ট, শক্তিশালী ও সার্বজনীন হয়ে ওঠে। এই ভুখন্ডে দেরাদুনের সেন্ট জোসেফ অ্যাকাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র অভিনব কুমার শর্মার চিঠি। অভিনব লিখছেনঃ “আই দেয়ারফোর রিকোয়েস্ট ইউ … টু মেক ইট ম্যান্ডাটরি ফর অল রিলিজিয়াস ট্রাস্ট ইররেস্পেক্টিভ অব দেয়ার রিলিজিয়ন টু ডোনেট এইট্টি পারসেন্ট অ্যামাউন্ট অব ‘গডস ওয়েলথ’ টু কান্ট্রি বাই গিভিং টু পিএম রিলিফ ফান্ড। আই অ্যাম সিওর গড উড বি হ্যাপি টু ব্লেস আস ইফ দিস মানি সেভস গডস চিলড্রেন। উই উইল হ্যাভ মোর ফেথ ইন হিউম্যানিটি। কপি টুঃ অল গডস (ভগবানজী, আল্লাহ্‌ ওহেগুরুজী, জেসাস)”।

রাষ্ট্রের ডাকে রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের প্রতি সাড়া দিয়ে রাষ্ট্রকে এমন চেতাবনী আলবাত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশা আস্থা ও ভরসা যোগায়। ‘অন্তরাত্মা’ থেকে ভবিষ্যৎ নাগরিকের স্পষ্ট উচ্চারণ: সমস্ত জাগতিক সম্পদ ঈশ্বরের সম্পদ, সকলেই ঈশ্বরের সন্তান, ঈশ্বরের সন্তানদের কষ্ট ও দুরবস্থা দূরীকরণে খরচ করলে ঈশ্বর সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। এমন ব্যবস্থা মানবতার মহত্তম দিকটি উন্মোচন করবে এবং তার প্রতি সকলেই আরও বিশ্বস্ত হয়ে উঠবে। নাগরিক তাঁর চিঠির প্রতিলিপি সকল ঈশ্বরের কাছে (ভগবান, আল্লাহ্‌, যিশু) পাঠিয়েছেন। ঈশ্বর, ধর্ম, বহুত্ব, বিশ্বাস এবং মানবতা সম্পর্কে ব্যক্তি নাগরিকের স্পষ্ট উচ্চারণ সমস্ত কুপমন্ডুকতামুক্ত এবং সামাজিক রাষ্ট্রিক জীবনে এখনও বিঘ্ন ঘটায় নি। ঘটাতে পারে নি।

লক্ষ লক্ষ ভূখা জ্যান্ত ঈশ্বর আশ্রয় হারিয়ে ‘মানবো না’ নিয়মে ঝুঁকি নিয়েই এবারে সশরীরে পথ হেঁটেছে, শত শত মাইল পাড়ি দিয়েছে ‘ঘর’ যাবে বলে। ওদের ঘর আছে তো কাজ নেই, কাজ আছে তো ঘর নেই – ওদের বাসভূমি আর কর্মভূমি আলাদা। তারাই কম পয়সায়, বিনি সুবিধায় প্রাপ্ত জলজ্যান্ত ঈশ্বর – ‘পরিযায়ী’ ডাকনামে যাদের সবাই চেনে। ওদের বদৌলতে সমাজের ওপরের সবাই আলো পায় আর ওদের গা দিয়ে গরম তেল গড়িয়ে পড়ে। আগামিতে বদলে যাবে কাজ কাজের ধরণ-ধারণ আর এখনকার ৯০ লাখ [অর্থ মন্ত্রকের সমীক্ষা- ২০১৭] এক লাফে বেড়ে যাবে কয়েক কোটিতে। অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের কলমে: “রাজনীতির নিয়মে চালিত যে অর্থনীতির মধ্যে আমরা নিজ খোপে বিরাজ করি, সেই আর্থিক ব্যবস্থাটি তাঁদের অন্তত এক আনা, দু-আনা মানুষের মুল্য দেয়। কোভিড-১৯ আচমকা সেই ছকটাকে ভেঙ্গে দিল। রাতারাতি কোটি কোটি গতর-খাটা মানুষ একেবারে বসে গেলেন। ফলে পলিটিক্যাল ইকনমির কাছে তাঁরা এক আনা মানুষও থাকলেন না। ঘোড়া হয়ে গেলেন। ” সেই যেমন ১৮৪৪ সালে কার্ল মার্ক্স দেখেছিলেন। দেখিয়েছিলেন ক্যাপিটাল হল আর কিছু নয় ‘অ্যাকুমুলেটেড লেবার’ এই জ্যান্ত ঈশ্বররা যার ধারক এবং বাহক অথচ নিঃস্ব – সর্বহারা। এঁরাই হলেন ‘কবর-খনক’। রাষ্ট্রের চিন্তায় ভাবনার কোথাও এঁদের ছিটেফোঁটা জায়গা ছিল না, থাকে না, যদি থাকতো, তবে লকডাউনের আগে এদের পরিণতির কথা ভাবা হত। ‘রাষ্ট্রের চিন্তায় তাঁরা কোথাও ছিলেন না এমন পর্যবেক্ষণ সঠিক। অনির্বাণ বলছেন: এই “পরিযায়ী শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে কাজ করেন এবং মনের আড়ালে বাস করেন। আমরা তাঁদের দেখেও দেখি না। মাঝের কয়েকটা দিন দেখতে বাধ্য হয়েছিলাম, কারণ তাঁরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের ‘স্পেক্ট্যাকল’-এ পরিণত করেছিলেন। কিন্তু ওই কয়েকটা দিনই। তারপর আবার সেই সব কথা আর ছবি অন্তরালে সরে গেছে, ওই দুর্ভাগাদের ভয় দেখিয়ে মেরে ধরে গায়ে কীটনাশক ছড়িয়ে চোখের আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে” … এবং “যেমন সেদিন ভারতের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’র এক রেল স্টেশনের সামনে আচমকা ভিড় জমালেন তাঁরা, যদি ট্রেন চলে, যে ট্রেন তাঁদের দেশে নিয়ে যাবে – নিজের দেশে। অমনি আবার শোরগোল, আবার মারধর, আবার – ভ্যানিশ।” মনে করিয়ে দিই ওদের জন্যে ট্রেন চলে না – কাজ নেই কাম বন্ধ তো ট্রেন বন্ধ। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ওঁরাও বড় হচ্ছে – দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ওঁদের লাইন – কবর খুঁড়তে অনেক লোক লাগবে, চাকরিটা মন্দই বা কীসে! সেই দিয়েই শুরু আর একটা পর্বের।

[লেখক – ট্রেড ইউনিয়নকর্মী ও পত্রিকা সম্পাদক।]

Facebook Comments

Leave a Reply