কবিতা নিয়ে : ইন্দ্রনীল ঘোষ

fail

দ্বিতীয় পর্ব

কবিতার বয়েস

আলোচনা — সপ্তমীর সকাল / সমর রায়চৌধুরী

Saptamir Sakal by Samar Roychowdhury
সপ্তমীর সকাল | সমর রায়চৌধুরী | প্রকাশক এখন বাংলা কবিতার কাগজ | দাম ৩০ টাকা

কবিতা কী—এ’ নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট নয় বরং বিভিন্ন ধারণা রয়েছে মানুষের। নিজের নিজের মতো ধারণা। এককালে যখন ছন্দ, অলঙ্কারের আধিপত্য ছিল, তখন তবুও কিছু মাপ-জোখের মতো ব্যাপার পাওয়া যেত যা দিয়ে সংজ্ঞার বেড়া দেওয়া হতো কাব্যকে। কালে কালে সে বেড়াও ভেঙে পড়ে। ব্যক্তি-মানুষ বা ছোট-বড় বিভিন্ন গোষ্ঠী যে যার নিজের মতো কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে চলতে থাকেন, তার প্রচার ও প্রসারে মাতেন। তারপর একসময় তাঁর বা তাঁদের বিশ্বাসটাই একমাত্র পথ—এটাই কবিতা, আর বাকি সকলই অকবিতা—এমন এক সিদ্ধান্তে এসে দাঁড়ান। কতকটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মতোই এই কবিতা সম্প্রদায়গুলি, প্রাথমিকভাবে তাতে ধর্ম বা কবিতার বিশাল ব্যপ্তিকে অনুভব, অনুধাবনের চেষ্টা থাকলেও ক্রমে ক্রমে তা রীতাচার, ছুৎ-অচ্ছুতের গড্ডালিকায় এসে পড়ে… মূল হারিয়ে যায়।

কবিতা সম্পর্কে কবিদের এই বিভিন্ন বোঝাপড়া গ’ড়ে ওঠার পিছনে নানারকম কারণ থাকে। তার কিছু যেমন ব্যক্তিগত উপাদান—বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া, ব্যক্তিগত বোধ-বুদ্ধি-চিন্তনপদ্ধতি ইত্যাদী, তেমনই কিছু আবার সমষ্টিগত উপাদান—যে ভৌগলিক অবস্থান ও সময়ে কবি জীবন্ত তার আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা। কোনো কবির সমষ্টিগত স্বত্তা ও ব্যক্তিস্বত্তা একে অপরকে গড়তে-ভাঙতে থাকে সারাজীবন।  আর একটি উপাদান থাকে। খুব উল্লেখযোগ্য। বয়েস। সব বয়েসে কবিতা সম্পর্কিত বোঝাপড়া সমান হয় না।

সমর রায়চৌধুরীর ‘সপ্তমীর সকাল’ পড়তে পড়তে তাই আটকালাম। থমকে, ভাবতে বসলাম। কবির লেখালিখির সাথে দীর্ঘকাল পরিচয় থাকলেও, ২০১৫-‘র অগস্টে প্রকাশিত এই এক ফর্মার বইটির সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না। মা-কে নিয়ে লেখা পনেরটি কবিতার বই ‘সপ্তমীর সকাল’। কবিতাগুলোর নাম দুর্গার বিভিন্ন নামে— উমা, অপর্ণা, গৌরী, অম্বালিকা, পার্বতী, ভগবতী, শিবানী, শর্বানি, বাসন্তী, অম্বিকা, দুর্গা, শংকরী, সতী, অদ্রিজা, কাত্যায়নী। সব ক’টি কবিতারই বিষয় ‘মা’।

বইটির আলোচনায় একটু পরে আসছি। প্রথমে এই বইয়ের আগে সমর রায়চৌধুরীর যে সমস্ত কবিতার সাথে আমার পরিচয় ছিল তার কয়েকটি উল্লেখ করি।

বিরক্তি

বিরক্তি এসে ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়
তুমি আমার রক্ত চুলকে দাও
আমার ঘুম চুলকে উঠছে
বিরক্তি এসে বিরক্ত করছে আমাকে

ভিতরে কুকুর চকচক ক’রে চেটে খাচ্ছে জল
অবিরাম চাটছে রক্ত আমার
রক্ত খাওয়ার শব্দে আঁৎকে উঠছে ঘুম

এসো তুমি
আমার লোহিত ও শ্বেতকণিকাগুলি
                       একটু চুলকে দাও

বিরক্তিতে আমার রক্তের ভেতর অবধি চুলকে উঠছে

পাখিচোরের ডায়েরী

ওই নদী এক পাখির নখের আঁচড়
ওই রাস্তা এক পাখির লেজ
ওই মেঘ এক পাখির পালক
ওই পাহাড় এক পাখির ডিম
ওই চাঁদ এক পাখির চোখ, আর
আমি পাখিচোর
এক অন্ধকার থেকে তুলে এনে অন্য অন্ধকারে
                                             ছড়িয়ে দিই
স্তব্ধ পাখির ডাক
পাখির স্তব্ধ ডাক, আর
নানারকম পাখির ডাকের নৈঃশব্দ্যময়
                                             আত্মার অন্ধকার

এই দুটি কবিতাই ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত কবির কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘওয়ালা’ থেকে নেওয়া। খুব সহজ, সুগঠিত, বাক্য ব্যবহার। কোথাও বাক্য গঠনের সিনট্যাক্স ভাঙা নেই। কিন্তু ‘বাস্তবতা’ বলতে যে ফ্রেমটি আমরা বুঝি, তাকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে দেওয়া হয়েছে দৃশ্যের, ঘটনার আপাত র‍্যাশানালিটি। যেন দৃশ্যের আভন্তরীণ আরও সূক্ষ দৃশ্য-স্রোত, ঘটনার ভিতরে আরও আরও ঘটতে থাকা ঘটনা বাইরে বেরিয়ে আসছে। বস্তুর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা বস্তুর গুণ নিজেই চরিত্র হয়ে উঠছে। আর গুলিয়ে যাচ্ছে আমাদের আপাতভাবে পরিচিত কাঠামো। ম্যাজিক লাগছে তাতে—কবিতার।

‘সপ্তমীর সকাল’ বইটি পড়তে গিয়ে এই জায়গাটা কিন্তু পেলাম না। সেখানেও সহজ, সুগঠিত বাক্য ব্যবহার। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে, যা ঘটছে প্রায় সেটাই বলা। বাস্তব বলতে যা বুঝি আমরা তাকে ভাঙার চিহ্ন প্রায় নেই বললেই চলে। বরং সে বাস্তবের বিভিন্ন অংশে যে কবিতার ছোঁয়া, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৈনন্দিনের মধ্যে যে ইন্দ্রিয়াতীত—নানাভাবে তারই উল্লেখ করা রয়েছে। যেন কবি কবিতাটা লিখছেন না, দ্যাখাচ্ছেন, “দ্যাখো ওই ওদিকে কবিতা, শোনো ওই আওয়াজ একটা কবিতা”।

উদাহরণ দিই।

অপর্ণা

একদিন যখন আমি খুব ছোট, আর
মা যুবতী
ঘর গেরস্থালির কাজকর্ম, নিজের স্নান-খাওয়া সেরে
বিকেলবেলা পরিপাটি, পান মুখে দিয়ে
মা বলেছিল, জানিস —
সূর্যাস্তই হচ্ছে, পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর বিষণ্ণ কবিতা
বলে কি মা!
সবে বর্ণপরিচয়, কবিতা কি তাইতো জানি না…

কিন্তু, এখন, যখন শহরে ফেরার বাস ধরতে
জড়িয়ে ধরে, প্রণামান্তে
বিদায় চাই মায়ের কাছে
সে সকালই হোক, কি দুপুর বা রাত
মায়ের চোখে সূর্যাস্ত দেখি, দেখে বুঝি —

সূর্যাস্তই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধতম কবিতা

কোথাও কবিতা লেখাই নেই যেন, যেন সাধারণ কিছু ঘটনা-কথা বলা হচ্ছে গল্পের ছলে। সূর্যাস্ত যে কবিতার মতো—সুন্দর, বিষণ্ণ, শুদ্ধতম—সেই উপলব্ধিটি জানানো হচ্ছে। কোনো সাজ-গোজ নেই এর। এমনকি ‘মায়ের চোখে সূর্যাস্ত’-তে একটু যা মেটাফর তা-ও যেন পরিচিত, ব্যবহৃত, দৈনন্দিন, আটপৌরে। যেন অভিনবত্বের মাথা তোলার কোনো ইচ্ছেই নেই। কবি সে প্রয়োজনটুকুও বোধ করেন না। তাঁর অনুভবটা খালি ব’লে দিলেন। পাঠক তেমন অনুভবের মধ্যে দিয়ে গেলে রিলেট করতে হলে করবেন। ব্যাস—আর কিছুই চান না কবি।

ঠিক এর পরের কবিতাটাই যদি দেখি,

গৌরী

কি ছাতা মাথা রোজগার, আর
ছাতা মাথা লিখি বসে বসে

খোঁড়াতে খোঁড়াতে মা ঢোকে রান্নাঘরে
আগুনের তাপে মুখ লাল

উনুনে কড়াই বসিয়ে
আমার জন্য মা যে কবিতা রান্না করে
তা হচ্ছে মুসুরির ডাল, মুচমুচে আলুভাজা

আমি নেমকহারাম
বসে বসে মায়ের কবিতা দিয়ে ভাত মেখে খাই
কিন্তু মায়ের কবে একাদশী
সে কথা আমার খেয়ালই থাকে না

মা দুধ, গুড় আর আটা গুলে নিয়ে
গোলারুটি বানিয়ে খায়

টানা ব’লে যাওয়া কিছু কথা—মা সংক্রান্ত, মায়ের প্রতি বেখেয়াল সংক্রান্ত। যেমন আমরা অনেক সময়ই অনুশোচনা হলে বলি, নিজের মনে মনে বা কাছের মানুষজনদের সামনে—তেমনই। শুধু ‘আমার জন্য মা যে পদ রান্না করে’ বা ‘পদ দিয়ে ভাত খাই’ এই দুই বাক্যে ‘পদ’ শব্দের বদলে ‘কবিতা’ শব্দটি বসানো—এটুকুই। কবি নির্দিষ্ট করতে চাইছেন, মা যেটা বানাচ্ছেন সেটাই কবিতা—আর এ’জন্যই কন্ট্রাস্টে নিজের কবিতা লেখাকে ‘ছাতা মাথা লিখি’ ব’লে উল্লেখ করছেন। এই কন্ট্রাস্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—বোঝা যায়, কবিতা এখন আর লিখিত এক আর্ট ফর্ম নয় কবির কাছে। বরং চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিশ্বের যে কবিতা, তিনি তাকে রেফার করতে চান শুধুমাত্র। এটা এমন, যেন, পাখির ডাকে যে কবিতানুভব তাকে ধরতে আমি “পাখির ডাক” এটুকুই বললাম; নদীর জলের মায়া বোঝাতে খালি বললাম “নদীর জল”। বাকি, যে পাখির ডাক শুনেছে, নদীর জল দেখেছে সে আপনা-আপনিই রিলেট ক’রে নিলো।

তবে কবি কী করলেন? কেবলমাত্র রেফারটুকু? আমি ভাবতে থাকি। আমার বয়েসে দাঁড়িয়ে, আমার কবিতা-বোধে কেমন এক খুঁতখুঁত লাগে। হয়ত দূর আরেক বয়েস থেকে, আরেক কবিতাবোধ থেকে এরই উত্তর আসে। যেখানে কবির কাজটাই ছাতা-মাথা কাজ, হাবিজাবি কাজ। যেখানে মনে হয়, কবি তো শুধু বানিয়ে বানিয়ে বলে, আসল কবিতা তো ছড়িয়ে থাকে চারপাশে। সত্যি বলতে, সেভাবে দেখতে গেলে, কবি তো সৃষ্টির সেই কবিতাগুলোকেই রেফার করে, কোনো-না-কোনো ভাবে… সমস্ত রচনাতেই। সৃষ্টির বাইরে—যা নেই—এমন কিছু বানানো তো তার পক্ষে সম্ভব নয়। 

কিন্তু, সরাসরি কেবল দৃশ্যদের বা ঘটনাদেরই যদি রেফার করতে থাকেন কবি? কেন করেন, কখন করেন? হয়ত দীর্ঘ বয়স ধ’রে, দৃশ্যে অভিজ্ঞতার স্তর জমতে জমতে সেই দৃশ্যটিই কবির কাছে আজ কবিতা। তার উল্লেখমাত্র যথেষ্ট মনে করেন তিনি। শৈলি, আঙ্গিকের প্রয়োজনীয়তা শিথিল হয়েছে সেখানে। বিছানার নিচে পেতে দেওয়া রাবারক্লথ, ছেলেমেয়ে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া মা, সূর্যাস্তের দৃশ্য এরা নিজেরা নিজেদের মতোই থাকে—তাঁর কবিতা হয়ে।

[হেমন্তলোক পত্রিকার সমর রায়চৌধুরী সংখ্যায় লেখাটি পূর্বপ্রকাশিত]

Facebook Comments

Posted in: April 2020, Criticism

Tagged as:

Leave a Reply