ধারাবাহিক উপন্যাস : নীলাব্জ চক্রবর্তী

fail

যখন সবাই ছিল সংখ্যালঘু অথবা বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে

ত্রয়োদশ পর্ব

২৩

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

তবে কি ভাষার কাছে

ফিরে যাবে কাঁচেদের নাম

= = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = = =

# * # * #

— মাননীয় প্রধানমন্ত্রীজীর ভাষণের সময় আপনি কী এমন রাজকার্য করছিলেন? কী করছিলেন? স্পেসিফিক উত্তর দিন! আগে থেকে বারবার জানানো সত্ত্বেও ওইদিন আপনাদের বাড়িতে রাত আটটার সময় টিভি চলেনি। কেন? আমাদের লোক অনেকদিন ধরেই আপনাদের ওপর নজর রাখছে… সব খবর রাখি আমরা…

— গায়ত্রীমন্ত্র জপ করো। সমস্ত বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে… এইরকমভাবে পৈতেটা দুআঙুলে জড়িয়ে নেবে… পুবদিকে মুখ করে মনে মনে ১২ বার… তুমি জানো, আমি ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডালিস্ট ইঞ্জিনীয়র… জীবনে কোনোদিন কোনও পরীক্ষায় সেকেণ্ড হইনি…

— কী রে, তোরা বাড়িতে আলো নেভাসনি? পাড়ার সবাই তো… ঠিক রাত ন’টায়… ন’মিনিটের জন্য…

— ঈশ্বর মানে বিদ্যাসাগর, ঠাকুর মানে রবীন্দ্রনাথ। ব্যস… আবার কী!

— আপনাকে ঘেন্না করি মশাই…

— শোন, সবার কাছ থেকে কিছু না কিছু শেখার আছে। আমি তো শিখি। কারো কাছ থেকে শিখি ‘হোয়াট টু ডু’ আর কারো কাছ থেকে শিখি ‘হোয়াট নট টু ডু’। অবশ্য, এটা স্বীকার করতেই হবে যে দ্বিতীয় দলটাই ভারী… হা হা হা হা…

— সেদিন শ্মশানে গিয়ে দেখি একটু দূরে দূরে গোল গোল করে দাগ কাটা… সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন! জিগ্যেস না করতেই একজন জানালেন আগেরদিন নীলষষ্ঠী না কি শ্মশানকালী কী একটা পুজো ছিল ওই শ্মশানের পাশের মন্দিরে… সেইজন্য পুণ্যার্থীরা যাতে একেবারে গায়ে গায়ে না দাঁড়ায়… সেইজন্য ওই ব্যবস্থা। চমকে উঠেছিলাম… ভাবছিলাম, একটা কবিতার থেকে একটা কবিতার দূরত্বও এভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার সময় এসেছে হয়তো…

— সেই সাতের দশকে এই এলাকার কংগ্রেসীরা বেশীরভাগই ছিল গুণ্ডাপাণ্ডা গোছের… লেখাপড়া বিশেষ কিছুই করত-টরত না… শীতলদা ছিল, বলতে গেলে, একমাত্র ব্যতিক্রম…

— আর বলিস না… সল্টলেক থেকে এক বন্ধু ফোন করে জানাল… ওদের ওখানে দোকানগুলোতে মাড়োয়ারীরা এক একজন টেম্পোভাড়া করে আসছে… প্রায় দোকান-কে-দোকান মালপত্র কিনে নিয়ে চলে যাচ্ছে… এক একজন কয়েকমাসের চাল, ডাল, তেল, আটা, ময়দা, বেসন, ক্রিম, পাউডার, ক্যাডবেরী, চিজ, বাদাম, ফলের রস, মেওনিজ, অমুকতমুক যা পাচ্ছে পাগলের মতো কিনে নিচ্ছে…

— এ কী! রাস্তার মধ্যে থুতু ফেললেন কেন?

# * # * #

কালো ডায়েরী

পুরী থেকে ফিরে আসার কয়েকমাস বাদে অনিন্দ্যদাকে স্বপ্ন দেখলাম… গোঁফের কোনাটোনাগুলো একটু অন্যরকম হয়েছে মনে হচ্ছিল… জোসেফ ভিসারিওনোভিচ জুগুসভিলি, মানে স্তালিনের মতো দেখাচ্ছিল… স্বপ্ন, যেমন হয়, গোলমেলে আর পারম্পর্যহীন এবং সবাই জানে ওটাই স্বপ্নের সিনট্যাক্স। (আমি স্বপ্ন ডিজাইন করার কথা ভাবি।) দেখলাম আমি একটা বিয়েবাড়িতে এসেছি এবং কার বিয়ে জানি না এবং সেটা খুব স্বাভাবিক মনে হল… আমার দাড়ি কামানো হয়নি… আশেপাশে কাউকেই আমি চিনি না (এবং সেটাও খুব স্বাভাবিক মনে হল।)… বিয়েবাড়ির উপহারটা অনিন্দ্যদার কাছে থাকার কথা… আমি অনিন্দ্যদাকে খুঁজছি… খিদে খিদেও পাচ্ছে… উপহারটা দিয়ে দিলেই দুজন খেয়ে নিতে পারি… গ্রাউণ্ড ফ্লোরে নেই… উপরে যেতে হবে তার মানে… সিঁড়ি নেই… লিফটও নেই… একটা এসক্যালেটরটার… সেটা দিয়েই সবাই ওপরে যাচ্ছে… আমিও উঠব… লক্ষ করলাম এসক্যালেটরটার ধাপগুলো মার্বেলের… সাদা-সবুজ মেশানো… দোতলায় ওঠার পর দেখি একদিকে খাওয়ার জন্য বিশাল জায়গা… অন্যদিকে মঞ্চের মতো করা… তার সামনে অনেক চেয়ার পাতা… ওখানে অনিন্দ্যদাকে পাওয়া গেল… স্তালিনের মতো লাগছিল… আমি হেসে বললাম, ‘স্তালিনকে লৌহ-পু-রুশ বলা যায়? মানে তালব্য শ ব্যবহার করে’… অনিন্দ্যদা বলল, ‘কিন্তু আমি আগেই একটা কবিতায় মেনহির-সমগ্র কথাটা ব্যবহার করে ফেলেছি যে। চলো খেয়ে আসি। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’ পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘না না, এ কী কথা! মাত্র পঞ্চাশজন শ্রমিক নিয়ে একটা চটকল চলতে পারে না কি কখনও?’

লাল ডায়েরী

লক্ষ করো, বেসরকারী কর্পোরেট বা সেমি-কর্পোরেট সংস্থাগুলো কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও একটা অদ্ভুত ‘উইন-উইন’ সিচুয়েশনে আছে। কর্মচারীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর নামে একাধিক উপায়ে তারা নিজেদের কাজ হাসিল করে চলেছে। প্রথমতঃ এই লকডাউনের ফলে তাদের রানিং এস্ট্যাবলিশমেণ্ট কস্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক খরচ কমে প্রায় শূন্য। তাদের অফিসবিল্ডিঙের আলো, এসি, কম্প্যুটার সব বন্ধ… অর্থাৎ বিদ্যুতের খরচ নেই। তার সাথে প্রতিদিনের চা, কফি, প্রিণ্টআউটের কাগজের খরচ বন্ধ। অফিস বাস বা গাড়ীর যাতায়াত নেই অর্থাৎ পেট্রল-ডিজেলের খরচ শূন্য। দ্বিতীয়তঃ, কর্মচারীরা বাড়ি থেকে কাজ করছে, ফলে প্রোডাকশন চালু থাকল, বস্তুতঃ, তাদের চাপ দিয়ে ডিউটি আওয়ার এখন আনলিমিটেড করে দেওয়া সম্ভব… দিন নেই রাত নেই শনি নেই রবি নেই… ফোন, মেইল, কনফারেন্স কল… আরও কাজ করো… বাড়িতে বসেই করো…

এরপরেরটা আরও মারাত্মক। এরা ইনভয়েস হচ্ছে না, বা কালেকশন হচ্ছে না, ক্লায়েণ্টপার্টিরা পেমেণ্ট করছে না, বা ভবিষ্যতে ইনভয়েস হবে না, বা কালেকশন হবে না, পেমেণ্ট পাবো না… এইসব ধানাইপানাই করে তোমার-আমার মাইনেটা আটকে দেবে। ছাঁটাই শুরু করতে পারে এই হাওয়া তুলে আরও চাপ, আরও কাজ, আরও সময়, আরও অনিশ্চয়তা… জাস্ট, এটা পরিষ্কার যে তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এটা করছে। চাতুর্যটা ভাবো। এভাবে একঢিলে কতগুলো পাখি মারছে তারা… কিছু দালাল শ্রেণীর লোক নিজেদের চেয়ারটা পায়াগুলো হাতলগুলো শক্ত করছে আসলে এই সুযোগে… এটাও তো পুঁজির চরিত্রেরই একটা দিকে।

ঘেন্না করে না? বিরক্তি-অস্বস্তি… পুঁজ… পুঁজি… পুঞ্জীভূত ঘেন্না… পড়ে না? পুঁজি বললে পুঁজ মনে পড়ে না?

এবং, যদিও তুমি-আমি সবাই এই খেলাটার মধ্যে কোনও না কোনওভাবে আছি, আমার মনে হয় এই কথাগুলো কখনও না কখনও বলা দরকার।

নীল ডায়েরী

রাগ – বিলাবল

ত্রিতাল

রাগ পরিচয়

উৎপত্তি – বিলাবল ঠাট। বাদী – ধ, সমবাদী – গ। জাতি – সম্পূর্ণ। গতি – বক্র। গাহিবার সময় – দিবা প্রথম প্রহর। ইহার সকল স্বর শুদ্ধ। উত্তরাঙ্গপ্রধান রাগ।

পকড় – গপ, নিধনিসা

আরোহণ – সা রে গ ম প ধ নি সা

অবরোহণ – সা নি ধ প ম গ রে সা

রাগ – ভূপালী

ত্রিতাল

রাগ পরিচয়

উৎপত্তি – কল্যাণ ঠাট। বাদী – গ, সমবাদী – ধ। জাতি – ঔড়ব ঔড়ব, ম ও নি বর্জিত। গতি – সরল। গাহিবার সময় – রাত্র প্রথম প্রহর। ইহার সকল স্বর শুদ্ধ। পূর্বাঙ্গপ্রধান রাগ।

পকড় – গ, রে, সাধ, সারেগ, পগ ধপ, গ, রে, ধসা

আরোহণ – সা রে গ প ধ সা

অবরোহণ – সা ধ প গ রে সা

সবুজ ডায়েরী

স্বেদ ও নির্গমন, বস্তুতঃ, এক নিরালোকসম্ভব দৃশ্য। চিত্র। কে তাহার ভাষা? এইসব সান্দ্রোজ্জ্বল শোকের ভিতর, ইঙ্গিতের ভিতর ধাবমান যে চিহ্ন ও যোজ্যতাসমূহ, ভেদ ও ধ্রুবকসমূহ, তাহাই কি সময়? তথাপি, ভাষা ও ভাবনার ভিতর যে অনির্ব্বচনীয় দূরত্বটুকু রহিয়াই যায়, অনিদ্রা ও স্ফীত বাষ্পে বাষ্পে আমি তাহার মুখাবয়ব… কল্পনা ব্যতীত অর্থের ন্যায় নগ্ন আর কীই বা? এইরূপে বৃক্ষ যে বিগ্রহ হইলেন, এবং, তদনুযায়ী, পর্যটন শব্দটি, ইত্যবসরে, কেমন স্মিত হইয়া আসিলেন এতদিনে… অহো, সেইসব মৃত ধূলিকণাসমূহের পবিত্র আত্মাগণ এ নক্ষত্রমণ্ডলে চিরস্মার্ত হইয়া রহিবেন। এক্ষণে স্বাদু এই নিভৃতাচার রমণীয় হয় এবং সংশয়ের ভিতর দোদুল্যমান হইতে হইতে জামলো মকদমকে এবং তাহার গৃহাভিমুখী ত্রিদিবসব্যাপী অবিরাম পদচারণাকে, যাহা শেষাবধি মৃত্যুতে ফুরায়, বিস্মৃত হইতেছে। ভাবিতেছে গভীরতা কি, প্রকৃতপক্ষে, এক মূক অবস্থানমাত্র? এইসব আচরণের ভিতর, এক্ষণে, ক্যামেরা কোথায় অধিষ্ঠান করিবে? জ্যামিতি কি একটি মৃদু অভিপ্রায়? হাঁ, দূরত্ব এক স্মৃতি বটে… হে শরীর, অবলোকন করো, ভাষা নামিতেছে…

(চলবে)

Facebook Comments

Posted in: April 2020, Novel

Tagged as: ,

Leave a Reply