মহামারীর ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের সাঁকোয় দোদুল্যমান আমরা ও আমাদের আয়না : প্রবুদ্ধ ঘোষ

fail

“অন্ন আলো অন্ন জ্যোতি সর্বধর্মসার
অন্ন আদি অন্ন অন্ত অন্নই ওংকার
সে অন্নে যে বিষ দেয়, কিংবা তাকে কাড়ে
ধ্বংস করো, ধ্বংস করো, ধ্বংস করো তারে৷”

আমরা বহুদিন আগেই শাইনিং ইন্ডিয়া আর গ্লুমি ভারতের ভাগ জেনে গিয়েছিলুম। জেনে গিয়েছিলুম যে, উন্নতি আর আদর্শ শব্দদু’টো বিপ্রতীপ। বিশেষতঃ ভারতের মতো দেশ যা বহুধাবিভক্ত- জাতি-ধর্ম-ভাষা-লিঙ্গ এবং অবশ্যই শ্রেণিতে, সেখানে ইন্ডিয়া আর ভারতের বিযুক্তি ঘটেই চলেছিল। ক্ষমতা-হস্তান্তর পরবর্তী বিঔপনিবেশিক শাসনে আমাদের আর দোষ দেওয়ার মতো বিদেশি শাসক রইল না কোনও; আমরা জেনে গেলুম দেশি শাসকেরাই এই ফাটলগুলো সযত্নে রক্ষা করছে। জেনে গেলুম নিম্ন, নিম্ন-মধ্য, উচ্চ-মধ্য এবং উচ্চ এই চারভাগে ভাগ হয়ে আছে ভারতের বিত্তবৃত্ত। তথ্যবিস্ফোরণের যুগে আমরা জানি সহজ সাধারণ কিছু হিসেব- ১০% ভারতীয় ধনীর কাছে গচ্ছিত আছে দেশের ৭৭% সম্পদ এবং বছরজুড়ে আয় হওয়া ৭৩% সম্পদ যায় মাত্র ১% ধনীর ঘরে যেখানে ৬৭ মিলিয়ন দরিদ্রতম ভারতীয়ের ঘরে মাত্র ১%। প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ভারতীয় প্রতিবছর শুধুমাত্র চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যায়ের কারণে নিঃস্ব হয়ে যায়।[১] ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ভারতরাষ্ট্রের আর্থিক বাজেটের থেকে বেশি পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ রয়েছে মাত্র ১৩০ জন বিলিওনেয়ারের হাতে। স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বাসস্থানের সমস্যা এখনও এতটাই বেশি এবং অপুষ্টি-অনাহার-চিকিৎসাহীনতার মারণক্ষমতা এত বেশি যে মহামারীর থেকে কম বিপজ্জনক নয়। আর, এত তথ্যসঙ্গমের বিলাসিতার পর এবং নিশ্চিন্তির চেয়ারে বসে ল্যাপটপে এটুকু লিখে বা পড়ে ফেলার পরে আমরা স্ট্যাটিটিক্সের ঠিক-ভুল, ধ্রুবক-ভেরিয়েবল ইত্যাদির মানপরিবর্তনের সূক্ষ্ণ তর্ক চালিয়ে যেতেই পারি। হ্যাঁ, এখন জেনে গেছি ‘ডিজওন’ করার কায়দাগুলোও। যে ভারত ইন্ডিয়ার ভিত্তিভূমি, যে ভারত ‘ক্যোরেন্টিন’, ‘লকডাউন’ শব্দগুলো শুনে আনন্দে বিগলিত হরষবিষাদে শিহরিত হচ্ছে না, যে ভারতের দু’শোর বেশি নাগরিক ইতিমধ্যেই মারা গেছেন লকডাউনের ফলে,[২] যে ভারতের নাগরিকেরা সারাদিনে বিপন্নতার সঙ্গে মাত্র দু’টো পোড়ারুটি-আচার ‘ত্রাণ’ হিসেবে পাচ্ছে এবং ধর্মবিদ্বেষের প্রাবল্যে শাইনিং ইন্ডিয়ার উন্নয়ন-কক্ষপথ থেকে ছিটকে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত- সেই ভারত ও তার নাগরিকদের ডিজওন করেছি আমরা। এই রাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রনির্মাণনীতিতে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে সাংস্কৃতিক অভিমুখের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের নিরাপদ কৌশলগুলো। আমরা কি এসব জানতুম না? হ্যাঁ, আমরা জানতুম; করোনা শুধুমাত্র আমাদের তত্ত্ব-হ্যাশট্যাগের ভাল-মুখোশের তলায় চাপা মুখটা বের করে দিয়েছে। আমাদের শ্রেণিচেতনার অন্ধকার স্যাঁৎলা পড়া কোণে চেপেচুপে রাখা খারাপগুলোকে বের করে এনেছে আলোয়। বাবুদের ভার্চুয়ালবৃত্তে বিভিন্ন সংকটঘন আলাপালোচনা চলছে। আর, বাবুরা নিশ্চিন্তির লক্ষ্মণরেখার ভেতরে ‘ওদের’ জন্যে চিন্তাফিন্তা করছি। মহামারীর ইতিহাসের সঙ্গে নভেল-করোনার মিল-অমিল খুঁজতে লিখছি, লেখা পড়ছি…

আমরা বাবুরা ভারি চিন্তিত। ঘরভরা বা আধভরা চাল-ডাল-দুধ-তেল-নুন নিয়ে বাবুরা ভারি চিন্তিত। দেশের এত গরীব মানুষদের নিয়ে, দৈনন্দিন-রোজগেরে মানুষের ডান হাত মুখে ওঠা নিয়ে, পরিযায়ী শ্রমিকদের সংক্রমণ-সম্ভাবনা নিয়ে এবং ‘অশিক্ষিত’ ও সংখ্যালঘুদের অবিমৃশ্যকারিতা নিয়ে। “খাবার না পেয়ে লোকজন তো লুঠপাট শুরু করবে এবার!” “রাস্তায় বেরিয়েছে? গুলি করে মারা উচিত। উদোম ক্যালানো উচিত”, “কয়েকদিন লকডাউন হয়ে থাকতে পারছে না? কয়েকদিন ভাত-ডাল না খেলে কী হবে?” “লকডাউন থাক, আমিও চাই। কিন্তু, খাবারের সাপ্লাই না থাকলে লোকজন তো না খেয়ে মরবে, তখন যদি তারা বাড়ি লুঠ করে?”, “পরিযায়ী শ্রমিকদের খুবই দুর্দশা কিন্তু ওরা তো রোগ নিয়ে ফিরবে, করোনা ছড়িয়ে দেবে”, “আমি রাজনীতি পছন্দ করিনা কিন্তু, অশিক্ষিত বস্তির লোকগুলো রোজ বেরোচ্ছে, এক্ষুনি এমার্জেন্সি চালু করা উচিত।”- আমাদের পছন্দের ভার্চুয়ালবৃত্ত আর সযত্নফ্রেন্ডলিস্ট ভরে উঠছে এই আলোচনায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা গল্প আছে। ‘ছিনিয়ে খায়নি কেন?’ ’৪৩-র মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে লেখা। মূল চরিত্র দু’টো। বাবু ও যোগী। শহরের বাবুকে যোগী বারবার প্রশ্ন করে, “দলে দলে মরছে। তবু ছিনিয়ে খায়নি। কেন জানেন বাবু?” বাবুরা তত্ত্ব বানায়, নতুন নতুন তত্ত্ব- “আকাল তো ওদের লেগেই আছে। বছর বছর। বলতে বলতে গলা ধরে এসেছিল তেনার, দুঃখীর তরে দরদ ছিল বাবুর; নাক ঝেড়ে, গলা খাঁকরে তারপর বললেন, বড়ো আকাল এল, ওরাও এইভাবে লড়াই করল বাঁচতে, চিরকাল যেমন করে এসেছে, ঘরে ভাত না থাকলে যা করা ওদের অভ্যেস”।
যোগী, এককালের ডাকাত, গরীবদের নিয়ে দল গড়ে লুঠ করা যোগী বলে, “তা নয় বুঝলাম বাবু, না খাওয়াটা ওদের অভ্যেস ছিল। কিন্তু মরাটাও কি ওদের অভ্যেস ছিল বাবু?” মজুতদার, আড়তদার, কালোবাজারি, অনাহারক্লিষ্ট লোকেদের লাইন, রাষ্ট্র-ফড়ের সাঁট সমস্ত শব্দ পেরিয়েও যোগীর বিরক্তি একটা বিশেষ শব্দে- ফুড! “দোকানে আড়তে চাল-ডাল তেল-নুন, লুকানো গুদোমে চালের পাহাড়, বড়োলোকের ভাঁড়ারে দশ-বিশ বছরেব ফুড- ফুড কথাটা চালু হয়েছে বাবু আপনাদের কল্যাণে… গরিবের মুখে না উঠে যে চাল-ডাল তেল-নুন গুদোম থেকে গুদোমে কেনাবেচা হয়ে চালান যায়, তাকে বলে ফুড। হাঁ, মাছ-মাংস, দুধ-ঘিও ফুড বটে… তা, ফুড না বলে চাল বললেই হত।”
যোগীর সঙ্গে বাবু তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। গ্রামের পথে হোঁচট খায় বাবু, নালায় পড়ে যায়, কাটা ধানের গোড়ায় খোঁচা খায়। যোগী বাবুকে হাত ধরে দাঁড় করায়। আর, বাবুকে বলে সেই অমোঘ যুক্তি, নিরন্নরা ছিনিয়ে খায়নি কেন? “একদিন খেতে না পেলে শরীরটা শুধু শুকোয় না, লড়াই করে ছিনিয়ে খেয়ে বাঁচার তাগিদও ঝিমিয়ে যায়। দু’চারদিন একটু কিছু খেতে পেলেই সেটা ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দু’দিন খেতে না পেলেই সেটা ফের ঝিমিয়ে যায়। তা এতে আশ্চয্যি কী! এ তো সহজ সোজা কথা। কেউ বোঝে না কেন তাই ভাবি। শাস্ত্রে বলেনি বাবু, অন্ন হল প্রাণ?”
আকাল, ক্রাইসিস, খাদ্য-সংকট, ছিনিয়ে খাওয়া নিয়ে সমস্ত কিছুই জানি আমরা, বাবুরা। তবু, যোগীর সঙ্গে দেশের মাটিতে সমান তালে কেন যে চলতে পারি না!? যোগী রিলিফখানায় ধুঁকতে থাকাদের চেতিয়ে দিতে চাইত, লুঠ ক’রে নিতে চাইত মজুতদারের আড়ত বা কালোবাজারিদের গুদাম… তবু তারা এক মগ সেদ্ধ চালের জন্যই ধুঁকত।

“ভোমা জঙ্গল। ভোমা আবাদ। ভোমা গ্রাম। কোটি কোটি ভোমা।
ঐ তো ভোমার মা- ভাঙা পাঁচিলে ঘুঁটে দিচ্ছে।
ঐ তো ভোমার বাপ- ঝোপরিতে ছেঁড়া চট টাঙ্গাচ্ছে।
ঐ তো ভোমার ভাই- শুয়োরের পাল তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ঐ তো ভোমা- ছেঁড়া গালে চোখের নোনতা জলের দাগ।
‘ভোমা ভাত খাবে বাবু, চাল নিতে বলেন। ভাত হোক বাবু, ভোমা শুলো… ভাত হোলো বাবু? ভোমার ক্ষুধা লাগে।’”

এই যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আমরা চিন্তা করছি, তাঁদের না-ফেরা, তাঁদের না-খাওয়া এবং না-অধিকার নিয়ে ভাবছি আমরা- কোনও সংগঠিত শ্রমিক ইউনিয়ন কী এঁদের পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছে? দক্ষিণপন্থী বা ফ্যাসিস্তপ্রবণ দলগুলোর কথা ধর্তব্য নয়, কিন্তু লাল-পতাকার দলগুলো? ভারতের অসংগঠিত শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে লেখালেখি, মিটিং হয়; কিন্তু, তাঁদের সংগঠিত করার চেষ্টা? এই পরিযায়ী শ্রমিকেরা প্রায় প্রত্যেকেই অসংগঠিত শ্রমক্ষেত্রের উৎপাদক। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ভারতের মোট জিভিএ-তে অসংগঠিত শ্রমজীবীদের অবদান ৫২.৪% এবং মোট অসংগঠিত বা ইনফর্ম্যাল সেক্টরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ ৮৬.৮%[৩]। এঁদের সিংহভাগই নিজের জন্মস্থান ছেড়ে ভিন জেলায় বা রাজ্যে বা মেট্রোশহরে পাড়ি দেন শ্রম বেচবেন বলে। নির্মাণশিল্প থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র-উৎপাদন শিল্প থেকে পরিষেবা- সমস্ত ক্ষেত্রেই এঁদের উপস্থিতি। কিন্তু, এঁরা অসংগঠিত, এঁদের মাথায় কোনও নির্দিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের ছাতা নেই। বান্দ্রা স্টেশনে যখন এঁরা ভিড় করেন, কয়েকশো কিলোমিটার পথ রোদে সেদ্ধ হতে হতে ফেরার চেষ্টা করেন, নদীর ধারে নক্ষত্রের নিচে বসে পোড়া রুটি খান কিংবা বিভুঁই থেকে ঘরে ফেরার মরিয়া চেষ্টায় পুলিশের স্প্রে করা ব্লিচিং-পাউডারে ঝলসে যান- তাঁদের মাথায় ছাতা ধরার বা গায়ে রক্ষাকবচ দেওয়ার জন্যে কোনও সংগঠিত শ্রমিক ইউনিয়ন থাকে না। এই প্রবাসী শ্রমিকদের বহু সময়েই বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়, ধর্ম-ভাষা-জাতির ভিন্নতায় স্থানীয় ক্ষমতা-কাঠামো এঁদের কোণঠাসা ক’রে রাখে, বহিরাগত তকমা এঁটে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকারও দেওয়া হয়না এঁদের। সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার এই উদাহরণগুলো কিন্তু নতুন নয়; নিম্নবর্গে অবস্থানের জন্যে নিজভূম ও প্রবাস দুই ক্ষেত্রেই বঞ্চনার শিকার এঁরা। লকডাউনের সময়ে যখন এঁদের যূথবদ্ধ ছবি আর অসহায় বিক্ষোভের খবর সামনে আসছে, আমরা খুব অবাক হচ্ছি। আমরা হায় হায় করে উঠছি আমাদের এতদিনের অপদার্থতায়, আমরা না’হয় বেদনার্দ্র হয়ে দু’টো আর্থ-সামাজিক প্রবন্ধ লিখে ফেলছি কিন্তু তাতে তাঁদের কিছু যায় আসছে কি? আমরা কি জানতুম না এঁদের কথা? আমরা কি জানতুম না যে, আধুনিক নগর-সভ্যতায়, বিশ্বায়ন-নগরায়ণের যুগলবন্দির উন্নয়নের অশ্বমেধের এঁরাই সেই অশ্ব? অবশ্য, অশ্বমেধ যজ্ঞের নিয়মে দিগ্বিজয়ী অশ্বকে যজ্ঞভূমিতেই কোতল করার নিয়ম, তাতেই রাজশাসন নিরঙ্কুশ হয়।
মহামারীর ইতিহাস এবং তাকে রোখার জন্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ইতিহাস, যার মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও পুরনো পন্থা লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বের জরুরি অবস্থা, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, মহামারীর সঙ্গে সঙ্গেই এবং তার পরে দীর্ঘদিন চলেছে অর্থনৈতিক হাহাকার যা সংক্রামক ব্যাধির চেয়ে বরং বেশি প্রাণঘাতী। “The World Bank reported that epidemics affect the economy through two channels. First is the temporary or permanent decrease in the labor supply due to the direct and indirect effects of sickness and mortality. Second is the behavioural effect due to people’s fear of contagion.[৪] Such behavioural effects cause a decrease in labor force participation due to the fear of contact with other people, shutting down places of employment.” এই সহস্রাব্দের প্রথম দশকের শুরুতে সার্স মহামারী কিংবা ২০০৯-র এইচ১এন১ ভাইরাসের মহামারীর সময়েও শ্রমক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল; ২০১৪ সাল নাগাদ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অংশে ইবোলা মহামারীর সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছিল, মহামারীর প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াও অর্থনৈতিক পরোক্ষ প্রভাবে মারা গিয়েছিলেন বা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন প্রচুর লোক। ইপি ফেনিকল তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধতে [৫], স্পষ্টতই বলছেন যে, ক্যোরেন্টিনের মতো পদ্ধতিতে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার হ্রাস পায়; যদিও বা মহামারীর সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে (অবশ্যই উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায়), কিন্তু সামাজিক প্রগতিতে ধাক্কা লাগে অনেক বেশি এবং অর্থনীতির বেহাল দশার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা-ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৩ নাগাদ সার্স মহামারীর সময় হংকং এর’মই অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল এবং গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসায় ধ্বস নেমেছিল, বেড়ে গেছিল বেকারত্ব ও শ্রমিকদের দুর্দশা। আইকেলবার্জার তাঁর প্রবন্ধে [৬] যুক্তরাষ্ট্রে সার্সের প্রভাব নিয়ে বলছেন, “চায়নাটাউন সহ আমেরিকার অন্যান্য নাগরিকের মধ্যে ব্যাধির থেকেও ভয়ের সংক্রমণ ছিল বেশি।” ঠিক যে সামাজিক-সংক্রমণে আমরা এখন ভুগছি ভারতে। তাই, পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরলে ব্যাধির তীব্রতা বাড়বে ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছি, খুব সহজেই ধর্মের নামে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে- সংখ্যালঘুরা, পরিযায়ী শ্রমিকরা, অপুষ্টিতে ভোগা ও সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরাই ‘রোগ’ ছড়িয়ে দেবে ভেবে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় মতামত ছড়িয়ে দিচ্ছি আমরা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশন্যাল সম্প্রতি তাদের এক রিপোর্টে গাল্‌ফ-দেশগুলোতে আটকে থাকা আন্তর্জাতিক পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে, [৭] আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সাম্প্রতিক ইতিহাসের বিভিন্ন মহামারী ও ক্যোরেন্টিন নিয়ে সমীক্ষা ক’রে বিশ্বব্যাপী পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার অনুরোধ জানিয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানদের। তবু, সচেতন হয়েছে কি ক্রম-ফ্যাসিস্ত শাসকেরা?
২০১২ সালে সৌদি আরবে প্রথম দেখা যায় মার্স (মিডল্‌ ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম)-র প্রভাব। যে ভাইরাসের মারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৫.৯%, দক্ষিণ কোরিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে ২০১৫ নাগাদ। কোভিড-১৯-র মতো এই রোগেও মৃত্যুর হার বেশি বয়স্ক নাগরিকদের, যাঁদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আংশিক লকডাউন সহ প্রতি ৩০০০ নাগরিকের মধ্যে ১ জনকে (মোট ১৬,৭৫২) বিচ্ছিন্নকরণ বা আইসোলেশনে রাখা হয়। আর, তার সঙ্গেই ছড়িয়ে যাওয়া ভীতি এবং সামাজিক দূরত্বের ভাসা-ভাসা ধারণা নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সমীক্ষা অনুযায়ী, এক্ষেত্রেও সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে অসুরক্ষিত অংশ তথা অনিয়মিত-রোজগেরে শ্রমিকরা, যার মধ্যে মহিলা, বৃদ্ধদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বিশ্বায়নী-উদারনৈতিক অর্থনীতিতে তরতরিয়ে এগিয়ে চলা কোরিয়ার মোট শ্রমজীবী সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি এই অনিয়মিত-রোজগেরে শ্রমিক, যাঁদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধে, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান দেওয়া হয় না। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যাঁদের, সেই শ্রমজীবীরাই মার্সের শিকার হন সবচেয়ে বেশি, প্রত্যক্ষভাবে তো বটেই এবং পরোক্ষে বেকারত্ব এবং বাধ্যতঃ আরও-অনিশ্চিত জীবনে ঢুকে পড়ে। অ্যায়ং লি এবং জুনমো চো তাঁদের গবেষণা পত্রে [৮] বিশ্লেষণ করেছেন মার্স এবং তজ্জনিত লকডাউনের প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। স্বাস্থ্যআওতায় অসুরক্ষিত জনগণের বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বিশেষতঃ যাঁরা পঞ্চাশোর্ধ তাঁদের ক্ষেত্রে (প্রায় ১৮%)। মধ্যবয়স্ক এবং প্রৌঢ়দের জীবনহানির শঙ্কায় এবং সামাজিক দূরত্বের আতঙ্কে আচরণগত তফাৎ এসেছে মহামারীর পরে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে পণ্যক্রয়ে, পরিষেবাক্রয়ে এবং শ্রমক্ষেত্রে। সমগ্র আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে, বিশেষতঃ অসুরক্ষিত এবং অনিশ্চিত জীবনযাপনকারীরা আরও অসুরক্ষিত এবং অনিশ্চয়তার দিকে হাঁটতে থাকে। ক্ষমতা-কাঠামোর চূড়ায় বসে থাকা মুষ্টিমেয় অংশ বাদ দিলে সমাজের বাকি অংশও কিন্তু নিরাপদ থাকেনা আর। ভাঙতে থাকে ভাতঘুমের খোঁয়ারি। ‘প্রবাসী’ আর ‘পরিযায়ী’- শ্রমের ক্ষেত্র ও স্টেটাস বদলের সঙ্গে শব্দের রাজনীতি জড়িয়ে থাকে, নিশ্চয়তার আলগা খোলসও। আর, অনিশ্চয়তার পথে হাঁটতে হাঁটতেই ভারতের পরিযায়ী শ্রমিকেরা কয়েকশো মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঘরে ফিরতে চান; যাদব গগৈ ২৮০০ কিলোমিটার পথ উজিয়ে সর্বস্বসম্বল খুইয়ে কোনওমতে স্বরাজ্যে ফিরতে পারেন আবার কেউ কেউ ২০০ কি.মি হাঁটার পরিশ্রমে পথেই মারা যান আর কেউ রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছলেও তাঁদের ওপর ব্লিচিং-পাউডার ছুঁড়ে দেয় রাষ্ট্র। অথচ, এঁদের প্রত্যেকেরই পাওয়ার কথা ছিল সুরক্ষার আশ্বাস, ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যবীমা এবং সবেতন ছুটি।
মহামারীর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সর্বাগ্রে বিপদগ্রস্ত হন তাঁরা, যাঁদের মজুত এবং রসদ কম। যাঁদের ঘরে বা ব্যাঙ্কে সঞ্চয় প্রায়-নেই বা খুব কম। অস্থায়ী-শ্রমিক, ছোট-কৃষক, ভূমিহীন কৃষক এবং অস্থায়ী-রোজগেরেদের সঙ্গেই এই তালিকায় আসেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। আর, ভারতে এই সংখ্যাটা যথেষ্ট পরিমাণ, ২০০১ সালে ভারতবর্ষের অন্তর্বর্তী পরিযানের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ১২০ মিলিয়ন, যাঁদের মধ্যে ৪০ মিলিয়ন শ্রমিক নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, ২০ মিলিয়ন গৃহকাজে, ১১ মিলিয়ন বস্ত্রবয়ন শিল্পে এবং ইঁটভাটায় প্রায় ১০ মিলিয়ন শ্রমিক যুক্ত। [৯] এছাড়াও পরিবহণ শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, খনি ও কৃষিকাজে যুক্ত থাকেন তাঁরা। ভারতবর্ষের মতো আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক দেশে নগরায়ণের জবরদস্তি এবং দিশাহীন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে গ্রামীণ-শহুরে অর্থনীতির বৈষম্য, মড়ক, উন্নত জীবনমানের আশা ইত্যাদি বহু কারণে বড় শহরে বিশেষতঃ মেট্রোসিটিগুলোতে পরিযানের হার বেশি। বাণিজ্যিক অর্থনীতি ও পরিষেবা অর্থনীতি বেশি যে শহরগুলোতে, সেখানে ভিনরাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ ভিড় করেন বেশি। আর, এরই সঙ্গে জুড়ে থাকে দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকের পুঁজিপতিকর্তৃক-নিদিষ্ট মাপকাঠি, অসম বেতনকাঠামো, সস্তার শ্রমমূল্য, ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধির অভাব এবং কন্ট্রাকটর ও পুঁজিপতির শোষণ। ২০১৮-১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের মোট শ্রমশক্তিতে অসংগঠিত বা ইনফর্ম্যাল সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা আরও বাড়তে চলেছে। ৭০%-র বেশি শ্রমজীবীর কোনও চুক্তিপত্র নেই। ভারত সরকারের সাম্প্রতিক শ্রমআইনবিধিতে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এই শ্রেণি, কতিপয় পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষায় শ্রমসুরক্ষার শর্তগুলো লঙ্ঘিত হয় বারবার। নভেল-করোনার সংক্রমণ শুধু নয়, এঁদের প্রতিদিন যুঝে চলতে হয় অন্যান্য বহু রোগের সঙ্গে, প্রতিকূল জীবনমানের সঙ্গে- বয়স্ক এবং নারীশ্রমিকদের অবস্থা এঁদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। অধ্যাপক সাল্‌ভে তাঁর গবেষণায় জানাচ্ছেন, “Health hazards are a serious problem for the migrant workers in various sectors. Construction and brick kiln migrant workers suffer from a number of diseases which are a result of their occupation or working conditions. Accidents and lung diseases are common among construction workers… In the sugar factories of Maharashtra state, it was observed that pregnant migrant women workers were found to be suffering from sickness like toxaemia, nutritional anemia, trichomoniais etc.In the case of illness arising out of pregnancy, miscarriage migrant women workers, none of the served sugar factories had provided medical facilities to seasonal migrant women workers in pre natal and post natal stages” [১০] মহারাষ্ট্র, যে রাজ্য ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং যেখানে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা সবথেকে বেশি, সেখানে আখশিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন বাসস্থান এবং ন্যূনতম বেতন কোনওটাই পান না। এর ওপরে স্বাস্থ্যবীমা কিংবা ‘সমকাজে সমবেতন’ বা কর্মক্ষেত্রে ধর্ম-জাতি-লিঙ্গের সমতাবিধান পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে আকাশকুসুম স্বপ্ন ছাড়া কিছুই নয়। করোনার মতো প্রবল সংক্রামক ব্যাধিতে সবথেকে অসুরক্ষিত কিন্তু এঁরাই। তাই, ভারতের বিচারপতি যতই দাবি করুন যে, আটকে-পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের খাবার দেওয়াই যথেষ্ট, বেতন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, [১১] কিন্তু তাঁদের এই লকডাউনের কাজ-বন্ধ সময়ে বেতনের প্রয়োজন রয়েছে নিজেদের সুরক্ষা ও নিশ্চয়তার জন্যেই। সরকারি বেতনপ্রাপ্ত অধ্যাপক, যাঁর মাসমাইনের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও রয়েছে, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘অর্থের লোভে ভিনরাজ্যে গমন’ নিয়ে ঠাট্টা করতেই শুধু পারেন, কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকের অনিশ্চয়তার খোঁজ রাখতে পারেন না; ভিন রাজ্যে বা ভিন জেলায় কাজ করতে আসা শ্রমিককে তাঁর নিজভুঁয়ে রেখে আসা পরিবারের জন্যে সংস্থান পাঠাতে হয়- প্রত্যেকদিনের কর্মক্ষেত্রে বা মরসুমি কর্মক্ষেত্রের প্রতিকূলতা সহ্য করেও এই দায়িত্ব তাঁদের নিতেই হয়। দীর্ঘদিন কাজ ও বেতন বন্ধ থাকলে সেই সংস্থান পাঠানো যায় না, মানসিক উদ্বেগ গ্রাস করে তাঁদের। ইন্ডিয়ার সংবাদপত্রে ভারতের দৈনিক-রোজগেরেদের অসহায় মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, [১২] ২৫ বছরের প্রবাসী শ্রমিক যুবক, ২৪ বছরের মোটর মেকানিক আত্মহত্যা করেন লুধিয়ানায়, উপ্পলে। দীর্ঘদিন খাবার না পেয়ে কোনও মা বাধ্য হন সন্তানদের গঙ্গায় ফেলে দিতে। প্রথমে অবিশ্বাস্য লাগে আমাদের, তারপর নিয়মিত ঘটনাপ্রবাহে স্বাভাবিক হয়ে যায় খবরগুলো আর চমকে উঠি না আমরা। আর, প্রতিটি মহামারীর পরে মানসিক অবসাদ বিষাক্ত ছোবল মেরেছে জনমানসে। প্রিয়জন হারানোর শোক, দৈনন্দিন যাপনচক্র ওলোটপালট হওয়া ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্বজুড়ে মানসিক অবসাদ ও আচরণগত পরিবর্তনের সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে; কলেরা, প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ইবোলা বা মার্স- প্রতিটি মহামারীর ইতিহাসেই এই ঘটনা ঘটেছে।

“…because he had the weak pulse, the hoarse breathing, and the pale perspiration of a dying man. But his examination revealed that he had no fever, no pain anywhere, and that his only concrete feeling was an urgent desire to die. All that was needed was shrewd questioning, first of the patient and then of his mother, to conclude once again that the symptoms of love were the same as those of cholera.”
লকডাউন চলাকালীন দিনমজুর, রোজগারহীন, ভবঘুরে, রেশনকার্ডহীন মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর যথাসাধ্য চেষ্টা চালাচ্ছে কিছু মানুষের যৌথ উদ্যোগ, যার সিংহভাগই বাম (সংসদবিরোধী ও সংসদীয় দুইই) মনোভাবাপন্ন। ছাত্রছাত্রীরা, যাঁদের অধিকাংশকেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ দেগে দিয়েছিল, তাঁরাও সাধ্যমতো কমিউনিটি কিচেন চালু ক’রে আশ্রয়হীন, বেরোজগেরেদের খাদ্যের সংস্থান করছেন। বহু মানুষ সাধ্যমতো অবদান রাখছেন উদ্যোগগুলোয়। দক্ষিণপন্থী কিছু দলের উদ্যোগ কম হলেও রয়েছে। আর, এখানেই প্রশ্ন জাগে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। যে রাষ্ট্র কোভিড-১৯ মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আগে ভারতের জনগণের ঠিকুজি-জন্ম বিচার করা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, যে রাষ্ট্র সাংবিধানিক-আইনি পথে বহু সংখ্যক মানুষকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সিএএ-এনআরসি প্রক্রিয়ায়, সেই রাষ্ট্র (পৃথিবীর বৃহত্তম ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র) নাগরিকদের জন্যে খাদ্য-বাসস্থানের সুরক্ষা দিতে অপারগ কেন? আন্তর্জাতিক স্তরে পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ দেওয়া ও অবৈষম্যমূলক আচরণের নির্দেশ রয়েছে, মহামারীর ইতিহাসে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে- “Asylum seekers, itinerant migrant workers, and other undocumented migrants are often exposed to high-risk working and living environments, yet they remain marginalized within national health systems… Politicization and factors such as “othering” may prompt non-evidence-informed decision making. Human rights concerns need to support the prioritization of vulnerable and stigmatized groups for vaccination during a pandemic.”- [১৩] তা সত্ত্বেও রাষ্ট্র কি সময়মতো সঠিক উদ্যোগের সদিচ্ছা দেখাতে পারত না? যে পরিকল্পনা ও শক্তি অপচয় ক’রে নাগরিকদের বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল, সেই পরিকল্পনা ও শক্তিপ্রয়োগ সঠিক সময়ে সঠিকভাবে ব্যবহার ক’রে নাগরিকদের নিশ্চয়তা দেওয়া যেত না? কিছুমাস আগেই কেন্দ্র-সরকার শ্রম আইন সংস্কার করছিল। ‘শিল্পস্থাপনে জটিলতামুক্তি’-র নাম ক’রে পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষায় শ্রমিকনিধনের কল তৈরি করা বা নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার ও স্বাচ্ছন্দ্য খতিয়ে না দেখেই কারখানা তৈরি ও চালানোর অনুমতি দিয়ে দেওয়ার পেছনে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রই কাজ করে। অথচ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত করা, স্বাস্থ্যবিধি মানতে পুঁজিপতিদের বাধ্য করা এবং বেতনকাঠামো-অবসরভাতা সংস্কারের কথা ভাবতে পারত না রাষ্ট্র? ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়া প্রায় ২৫ লাখ পরিযায়ী শ্রমিককে যথাযোগ্য স্বাস্থ্যকর ক্যোরেন্টিন সেন্টারে রাখার জন্যে বা সরকারি পরিবহন ব্যবহার ক’রে তাঁদের নিজেদের বাসস্থানের কাছাকাছি ক্যোরেন্টিন সেন্টারে ফেরাতে রাষ্ট্রের যে অর্থ খরচ হত, তা কি দেশজুড়ে হতে চলা (আপাততঃ ‘স্থগিত’) সিএএ-এনআরসির জন্যে বরাদ্দ খরচের থেকেও বেশি?
কলকাতা শহর মহামারীর ভয়ানক রূপ দেখেছে বেশ কয়েকবার, যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সম্ভবতঃ ১৮৯৬-৯৮ সালের প্লেগ। বম্বে থেকে কলকাতায় এবং হুগলি চব্বিশ পরগণা, বর্ধমানে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়লেও, পূর্ববঙ্গে ও রাজশাহীতে এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়নি বলেই উল্লেখ করেছেন বাংলার তৎকালী স্যানিটারি কমিশনার ক্লেমেশা। [১৪] কিন্তু, কলকাতা শহর প্রায় উজাড় হয়ে যায় ১৮৯৮ সালে, প্লেগে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৯২%। ব্রিটিশ অধিকৃত কলকাতার শাসকরা দিশেহারা হয়ে গেছিল এই মহামারী সামলাতে; তার কারণ ছিল মূলতঃ দু’টো- সাধারণ মানুষের মধ্যে যুগপৎ ছড়িয়ে যাওয়া অন্ধবিশ্বাস ও গুজব এবং নিকাশি ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম (বিশেষতঃ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য) সুযোগসুবিধার অভাব। বিদেশি শাসকদের প্রতি ভয়, ক্যোরেন্টিন ও বলপূর্ব্বক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক, টীকা দেওয়া নিয়ে গুজব আর ব্রিটিশ শাসকের ঔপনিবেশিক বিচারধারার আবর্তে কলকাতা শহরে মৃত্যুমিছিল, অসংখ্য লাশ ছড়িয়েছিটিয়ে ফুটপাথে, পচেছে দিনের পর দিন। মূলত ঘনবসতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এবং ভিন রাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমজীবীরা (কলকাতা তখন রাজধানী)। মানিকতলায় তৈরি হয় প্রথম আইসোলেশন কেন্দ্র এবং মারোয়াড়ি সম্প্রদায় নিজেদের জন্যে হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেয়। কলকাতার উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজের অনেকেই শহর ছেড়ে ‘গ্রামের বাড়ি’তে চলে যান কিন্তু যাঁদের যাওয়ার জায়গা ছিল না কোথাও সেই অংশটাই সবচেয়ে অসুরক্ষিত থেকে যায়। শ্রীলতা চ্যাটার্জ্জীর প্রবন্ধে [১৫] প্লেগের বছরগুলোর রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক অস্থিরতার ছবি থেকে এটা পরিস্কার হয় যে প্রায় ১২০ বছরের ব্যবধানেও ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র নাগরিকদের সুরক্ষায় খুব বেশি নজর দিতে পারেনি; ‘লকডাউন’-র মতো শব্দকে বাদ দিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অন্তর্বর্তী উদ্যোগ এবং অন্ধবিশ্বাস-গুজব দূর করার মতো উদ্যোগ এখনও রাষ্ট্র নিতে পারেনি নাগরিকদের জন্যে। ঔপনিবেশিক শাসকদের ‘নেটিভ’দের প্রতি উদাসীনতা, হাজার হাজার শ্রমজীবী-নিম্নবর্গের মৃত্যু এবং সামাজিক ও শ্রেণিবৈষম্যের ইতিহাস তো বর্তমানও…
রাষ্ট্রের হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব এখন। সারা বিশ্বে প্রবল গতিতে ছড়িয়ে চলা সংক্রমণ ও মৃত্যুমিছিলের মধ্যেই রাষ্ট্র কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। ‘এখন রাজনীতি করার সময় নয়’, ‘সরকারের সব নির্দেশ মেনে চলতেই হবে’- আমরা নিজেরাই নিজেদের বুঝিয়ে নিয়েছি রাষ্ট্রনির্মিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। আর, রাষ্ট্রও তার বাকি সমস্ত দায়বদ্ধতা, মৌলিক অধিকারের খাতে ব্যয়সঙ্কোচের কুনীতি, প্রতিরক্ষা খাতে অনাবশ্যক ব্যয়বৃদ্ধির নির্লজ্জতা এবং যাবতীয় সাংবিধানিক ব্যর্থতা ভুলে ক্যোরেন্টিন-লকডাউন-সামাজিক দূরত্ব-নাগরিকদের দায় এই শব্দগুলোকেই প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছে কারণ এটাই সহজতম দায়হীন পন্থা। তবু, অন্ততঃ আমাদের ভুলে গেলে চলে না যে, শ্রেণিবিভক্ত সমাজকাঠামোয় রাষ্ট্র আর যাই করুক ভালবাসতে শেখায় না। বিদ্বেষ আর বিভেদের অনুশাসন অব্যহত থাকে, ব্যর্থতার দায়ভার শুধুমাত্র নাগরিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে কোণঠাসা করা থাকে এবং সামাজিক-মাধ্যমগুলো ব্যবহার ক’রে সংক্রামক ঘৃণাকে গুণোত্তর গতিতে ছড়িয়ে দেওয়া জারি থাকে। এই বিপন্ন সময়ে যখন নাগরিকেরা অন্ততঃ একবার রাষ্ট্রের ‘মানবতার মুখ’ দেখতে চাতকআশায় বসে আছে, তখনও রাষ্ট্র ইউএপিএ-আফস্পা আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, প্রতিরোধী মানুষদের জেলে পাঠাচ্ছে এবং কমিউনিস্ট হওয়ার অপরাধে বৃদ্ধ কবি বৃদ্ধা সমাজকর্মীকে ভুয়ো মামলায় জেলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিনা চিকিৎসায় মারার উদ্যোগ জারি রেখেছে। তবে, নভেল-করোনা ভাইরাসের অভূতপূর্ব সংক্রমণের মুখে পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোর বহু তত্ত্বই অকেজো হয়ে গেছে; আগামীদিনে অর্থনীতি ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে যে প্রভাব পড়তে চলেছে আমরা তার সম্ভাবনা খানিক অনুমান করতে পারি মাত্র। লকডাউন কিছুমাত্রায় প্রয়োজন কিন্তু, ভারতের মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত অর্থনীতির দেশে কীভাবে ‘অপর্যাপ্ত’ পরিকাঠামো নিয়ে শুধুমাত্র লকডাউন চাপিয়ে করোনা-ভাইরাসের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় সেকথা সময় আর বিজ্ঞান বলবে। কিন্তু, মহামারী ও বিশ্বসংকটের ইতিহাস থেকে এবং বর্তমান বাস্তবতা থেকে অনুমান করা যায় আরেকটি সম্ভাবনা- পেশাবদল। লকডাউন ও পেশাবন্ধের কারণে বহু মানুষ ক্ষতিস্বীকার করেও তাঁদের স্বল্পসঞ্চয় দিয়ে আপাততঃ টিঁকে থাকার মতো সাময়িক কাজ বেছে নিয়েছেন। কেউ শাকসবজি, কেউ মাস্ক, কেউ নুডলস্‌, কেউ বিস্কিট কিংবা কেউ বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করছেন- এঁরা আগে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; অস্থায়ী হলেও মাসমাইনে কিংবা অনিয়মিত হলেও দৈনিক রোজগার ছিল এঁদের।
ভোমাকে আমরা ব্যবহার করেছিলুম, ভোমাকে দিয়ে সভ্যতা-উন্নয়নের সব বন্দোবস্ত পাকা করে রেখেছিলুম, তারপর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম। ভোমাদের ভুলে না গেলে আধুনিকতা বাঁচে না, ভোমাদের নিংড়ে না নিলে আমাদের নিশ্চয়তা বিপন্ন হয়ে পড়ে। ভোমাকে আমরাই বিচ্ছিন্ন ক’রে দিয়েছি তার মূল থেকে, তার অধিকার থেকে, তার স্বাচ্ছন্দ্য থেকে আবার আমরাই তাকে আমাদের থেকেও বিযুক্ত করতে করতে এগিয়েছি। ‘ভোমার ক্ষুধা লাগে’ অসংখ্য ভোমা আর যোগী খাবার খুঁজতে বেরোন। প্রায় ১০০ কিলোমিটার হেঁটে ভোমা, বাঘারু, কেলু, চ্যারকেটু, টুলটুলি, বসাই, জামালো মাড়কাম [১৬], রণবীর সিং, লাউরাম ভগোড়ারা মারা যান। প্রতিটি ক্লান্ত শ্বাস নেওয়ার সময়, ক্ষতবিক্ষত পা ফেলার সময় তাঁরা ভেবেছিলেন আর কয়েক কিলোমিটার পরেই গ্রামের সবুজ দেখা যাবে, চেনা বসতির গলি পাওয়া যাবে- আর একটুকু পথ। মহামারীর ইতিহাস ঘাঁটলে এঁদের সংখ্যা পাওয়া যায়, কলকাতায় যেমন ঊনিশ শতকের শেষে, বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মহামারীতে এঁরা মরে-পচে ছড়িয়ে থাকতেন রাস্তায় বস্তিতে। এঁদের নাম অন্ততঃ চেনা ইতিহাসে থাকে না, থাকতে নেই। এঁরা সংখ্যা। বর্তমান মহামারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে এই সংখ্যাগণনা শুরু হয়েছে। নাঃ, আমাদের চেনাবৃত্তে নিশ্চিন্তির অবকাশে আপাততঃ এর প্রভাব পড়ছে না; আমাদের ভার্চ্যুয়াল মাধ্যম আর বিনোদন জগতের মধ্যে কিংবা ঘরে মজুত খাবার ও ‘এসময় রাজনীতি করবেন না’ বলার মধ্যে যে সাড়ে তিন হাতের ব্যবধান, সেখানে এঁরা বোধহয় নেই!
‘কিন্তু, ভোমা আছে। আমি জানি, ভোমা আছে। জানি, তাই আমার স্বপ্ন আছে।’ ভোমারা একদিন, এই লকডাউনের শেষে, অনন্ত পরিযানের শেষে, অর্থনৈতিক মন্দার শেষে, বারবার পেশাবদলে ধ্বস্ত হয়ে, খাবার-খোঁজা দীর্ঘ দিনলিপি পেরিয়ে, সারা গায়ে ব্লিচিং-স্প্রের জ্বালা নিয়ে, গুজব আর রাষ্ট্রের লাঠি-গুলির আঘাত সয়েও উঠে দাঁড়াবেন। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যঅসচেতনতা, মৌলিক-অধিকার-রক্ষায়-ব্যর্থতা, ইউএপিএ-এনআরসি, শ্রমিক-বিরোধী-শ্রম-আইন সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিস্পর্ধায় জেগে উঠবেন। আর, আমাদের অরাজনীতি, নিরপেক্ষতা, শ্রেণিমুখোশ, নিশ্চয়তার তত্ত্ববিলাস নিয়েও প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবেন। আশা করি, ততদিনে আমরা নিজেরাই আমাদের আয়নাগুলো ভেঙে ফেলব না।

[১] https://www.oxfam.org/en/india-extreme-inequality-numbers
[২] https://theprint.in/opinion/more-than-300-indians-have-died-of-the-coronavirus-and-nearly-200-of-the-lockdown/400714/
[৩] Ramana Murthy S V, Measuring Informal Economy in India _ Indian Experience, www.imf.org conference.
[৪] World Bank. The economic impact of the 2014 Ebola epidemic: short and medium term estimates for West Africa. Washington, DC: World Bank Group Publishing; 2014
[৫] Fenichel E.P, Economic considerations for social distancing and behavioural based policies during an epidemic, 2013
[৬] Eichelberger L, SARS and New York’s Chinatown: The politics of risk and blame during an epidemic of fear, 2007
[৭] https://www.amnesty.org/en/latest/research/2020/04/gulf-concerns-regarding-migrant-workers-rights-during-covid19-pandemic/
[৮] Lee Ayoung & Cho Joonmo, The impact of epidemics on labor market: identifying victims of the Middle East Respiratory Syndrome in the Korean labor market, International Journal for Equity in Health (2016) 15:196
[৯] http://www.aajeevika.org/labour-and-migration.php
[১০] Salve W.N, Labour Rights and Labour Standards for Migrant Labour in India, http://www.oit.org
[১১] https://www.indialegallive.com/constitutional-law-news/courts-news/sc-denies-need-payment-migrant-workers-says-food-provided-95054
[১২] https://www.indiatoday.in/india/story/gurugram-troubled-by-lockdown-unemployed-man-unable-to-feed-his-kids-kills-self-1668441-2020-04-18
[১৩] Where Are the Migrants in Pandemic Influenza Preparedness Plans?  Health and Human Rights Journal, Vol. 20 (1), June 2018
[১৪] https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC5180973/pdf/indmedgaz73269-0008.pdf
[১৫] Chatterjee Srilata, Plague and Politics in Bengal 1896 to 1898, 2005-06, Jstor
[১৬] https://gulfnews.com/world/asia/india/coronavirus-lockdown-12-year-old-indian-migrant-worker-walks-100-km-dies-just-11km-away-from-home-1.1587462168019

[লেখক – গবেষক, তুলনামূলক সাহিত্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়]

Facebook Comments

Leave a Reply