কভিড নাইন্টিন, এ সময়ের প্রতিভাষ : শ্রেয়সী গঙ্গোপাধ্যায়

fail

এখনও গায়ে আঁচ এসে লাগে নি, তাই হয়তো লিখছি। রোজ ঘরে বসে টুকরো টুকরো খবর পাওয়ার মধ্য দিয়ে দিন গুজরান। নয়তো আর কোনো দুর্ভাবনার অবকাশ মাথায় নেই কখনোই। দিব্যি খাচ্ছি, ঘুমিয়ে উঠছি, ঘরে বসে নিবিষ্ট মনে লিখছি, আঁকছি। এ যেন এক পরম পাওয়া। ঐ দিকে মৃত্যু মিছিল। বিদেশে যে আত্মীয় ও চেনা বন্ধুরা আছে তাদের খোঁজ নিচ্ছি মাত্র। ব্যস এটুকুই তো। এতেই নাকি হয়ে যাচ্ছে! মাঝে মাঝে মনটা উচাটন হয় ছাত্রীগুলোর জন্য নইলে কলেজের সঙ্গেও শৌখিন দূরত্ব বজায় রেখে দিনযাপন যেন এক অনন্য স্বাদ। এইভাবে বাড়িটাকে কখনো দেখা হয় নি এতোদিন। মানুষ মরছে বলেই না, আমি নিশ্চিন্তে এমন দেখে নিতে পারছি আমার পরম আদরের কাঞ্চন গাছটিতে বর্ষার আগেই কিভাবে আজস্র সাদা ফুল ফুটে থাকে নিভৃতে। ঐ দিকে ইতালীতে মৃত্যু সংখ্যা ছাড়িয়েছে একুশ হাজার। তাতে কি! সে তো আর আমার দেশ নয়। আমি রোমান্টিক হতে জানি। এই তো বাড়ি বসে দিব্যি দেখে নিলাম কালবৈশাখীর আগে বাড়ির মেহগিনি গাছটা কিভাবে পাতা ঝড়িয়ে নিলো মাত্র দু’দিনের অবসরে, ফলগুলো থেকে টুপটাপ ঝড়ে পড়লো বীজ। সারা উঠোন ছড়িয়ে গেল খয়েরী শুষ্ক পাতায়, আহা! কি বাহার। গণ কবর কি তা তো আমি আন্দাজ করতে চাইছি না। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, কে বানালো আমাকে সমকালীনতা থেকে এতটা উদাসীন। আমার কিন্তু ঘাড়ে বিপত্তি না আসা পর্যন্ত এই আকূল করা রোমান্টিসিজমের কোনো সুরাহা হবে বলে মনে হয় না। এই দিকে আমারই আত্মীয়-অনাত্মীয়রা গৃহবন্দী, খাবারের সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি খবর পাচ্ছি যখন আমি কিন্তু দিব্যি দুপুরে গড়িয়ে, বিলাসিতা করতে পারছি ফলওয়ালার ঝাঁপিতে কি কি ফল আছে সে সব নিয়ে। তাদের রুজিরোজগারের টানাটানির গল্প শুনছি জোরকদমে, এই বুঝি নতুন গল্প ফেঁদে ফেলার রসদ এবার জোগাড় হয়ে এলো। এতটা ইতিহাস, সমাজ বিচ্যুত আমাকে বানালো কে? শুধু যে ইতিহাস বিমুখ আমি সেটাই নয় যথেচ্ছ হারে বেপরোয়াও বটে। কেবল গৃহবন্দী থাকতে বিরল এক সুখানুভূতি উস্কে উঠেছে বলে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি এই নিভৃত যাপন। কিন্তু এতো কোনো সমাজ সচেতন নাগরিকের থেকে কাম্য নয়। কাল হলো সেই আদিখ্যেতা মাখানো রোমান্টিসিজম। ঘরে শুয়ে শুয়ে ভিক্টোরিয়ান এজের ছবি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে যে সুখ তা আর এই বাজার অর্থনীতির ধসে পড়ার মধ্যে কোথায়! মন দৃঢ়ভাবে মেনে নিয়েছে এইসব বিষয় আমার জন্য নয়। ভয়টাও তাই হচ্ছে না এবার। ভয় নেই। আমি আছি দিব্যি ঘরের ভিতরে। রোমান্টিসিজম জাপটে।

মেঘের ঠিকানায় প্রবেশ করছি ক্ষণ
সহসা কি যেন আড়াল ডাকছে
দূরের রোদ রেখার মতো সমানুপাতিক
ডাকছে, বলছে কাছে আসার কথা
ধানক্ষে্তের রেজিমেন্টে প্রতিনিয়ত দেদার
কাকতাড়ুয়ার হাত হতে উড়ে যায় গাঙচিল
ক্ষেতের মধ্যেখানে মেঘের ছায়া
স্বপ্নময় আলোকিত হুটোপাটির মাতলা
নীচুতে ডাকছে কবিতার মতো চন্ডিমন্ডপ

কভিড নাইন্টিন নিয়ে পড়াশুনাও করছি ইদানিং। গার্ডিয়ান কি বলছে, নেচার কি লিখলো। অর্থনীতিবিদদের মতামত কি অথবা পরিসংখ্যান; সে এক বিশ্লেষনী প্রবন্ধ এই ছুটিতে লিখে ফেলাই যায়। বিদগ্ধ বলে পরিচিতির এ সুযোগ অন্যথা হয় কেন! কিন্তু না, বাধ সাধলো সেই রোমান্টিসিজমই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী এতো বড় রোমান্টিক পরিণতি স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় কি! এক সময় ম্যালেরিয়া হতো, লাভ ইন দ্যা টাইম অব কলেরাও না হয় হলো কিন্তু স্বচক্ষে করোনাকে উপলদ্ধি করার মতো এতো বড় ইতিহাস হাতের মুঠোতে পাওয়ার পর আমি স্বততই রোমান্টিক। একবার ভাবি ধিক্কার জানাবো নিজেকে। কিন্তু বলুন তো বাঙালী, দুপুরের কচি পাঠার পর আপনার শরীর কি ছেড়ে যাচ্ছে না রবিবাসরীয় হাতে ভাতঘুমে! এ যে পরম প্রাপ্তি। রুজি রোজগার নেই তো তাতে কি! রোজগারের পথ আমারও সুগম নয় এখনো, চাকরী হারানোর ভয় আমারও রয়েছে ষোলোআনাই; কিন্তু আমি তো রোমান্টিক।
আমি বরং হাকুসাইয়ের ছবি টানিয়ে রাখি চোখের সামনে। উড এনগ্রেভিংয়ের উত্তাল সামুদ্রিক ঢেউ দেখি আর ভাবি এই উর্মি তলে আমি তো নেই ভেসে যাবো না অতএব। যে নৌকারা ভাসছে এ তাদের নিয়তি। ঢেউয়ের রেখায় এমন উদগ্র অবতারণা আমাকে টানটান বসিয়ে রাখে। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি শওপিঙের ‘লোটাস ফ্লাওয়ার’। ক্যালিগ্রাফারের হাতে এমন কালার সেন্স চট করে খুব একটা দেখা যায় না। আমি ছবি আঁকড়ে রোমান্টিক দিনযাপন করি। বেশী করে দেখতে থাকি চিন, জাপানের ছবিগুলোকে। এক এক করে ছবির হাত ধরে পাড়ি দিই এই সময় হতে বিগতকালে। হাকুসাইয়ের অন্যান্য এনগ্রেভিংয়ের কাজ দেখি। শওপিঙের ল্যান্ডস্কেপের কাজ দেখি কিন্তু মন টানে না; ফিরে আসি আর ফুলের আঁকাগুলোর দিকে। এ এক অসাধারণ মুক্তির পথ কাঠ খোদাই আর পেপারে কালির আঁকিবুঁকির মধ্যে।
চোখ সরিয়ে তাকাই ইতালীর ছবির দিকে। হাজার হোক এতো মানুষ মরছে, তা কেমন ছবি ছিলো তাই ভাবতে লাগলাম। কি বিস্ময়, যে দেশের ঐশ্বর্য এতো, দাম্ভিকতা এতো এমন কি প্রযুক্তিও এতো তার কেন এতো মৃত্যু মিছিল। গলদটা কোথায়? ছবি দেখায় কোথায় যেন ছন্দ হারিয়ে যায়। কি এমন অসুখ যার সামনে প্রথম বিশ্ব এভাবে মুখ থুবরে পড়লো!
ইন্টারনেটে খুঁজে দেখছিলাম কভিড-নাইন্টিনের নানান টুকরো খবর। স্বভাব তো, যাবে কোথায়, কোন চোরা পথে ঢুকে পড়েছি ছবির জগতে। তো সেখানেও দেখলাম অবধারিত টানাটানি পড়ে গিয়েছে মোনালিসাকে নিয়ে। তাকেও পড়ানো হয়েছে এন নাইন্টিফাইভ মাস্ক। পপ আর্টের এই এক দাপুটে ঝড় যা বারবার ভারাক্রান্ত করে এসেছে মোনালিসাকে। ব্যাঙ্কসি এলো, উঠিয়ে দিলো মোনালিসার পিছনের কাপড়; তেমনি আবার কভিড এলো তো মুখে চড়লো মাস্ক। পিকাসোও কভিডের দৌলতে পেল এক নতুন অভিব্যক্তি। পিকাসোর ছবিকেও পড়ানো হলো কভিডের রক্ষাকবচ মাস্ক। স্ট্রীট আর্টের ক্ষেত্রে কভিডের বাড়বাড়ন্ত দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেখলাম সনাতন দিন্দার এক গুচ্ছ ছবি। করোনার দিনগুলোতে তীর্যক দৃষ্টি সমেত মুখাবয়বে মাস্কের অবতারণা হাড় হিম করা সময়কে প্রতিভাত করছে যেন। আমার এক বন্ধু করোনার দাপট সামলাতে না পেরে অ্যান্টিস্ট্রেসের ওষুধ খাচ্ছে, তাকে বসিয়ে দেখাতে ইচ্ছা করলো ছবিগুলো, বললাম ছবি দেখ, দেখবি হালকা লাগবে। আসলে এ কথা নিজেকেই বলা। দিন্দার ছবিতে রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বদল দেখলাম অনেক। সাদা-কালো-ধূসরের পরিবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে এসে ভারমিলিয়নের ব্যবহার একটি ছবিতে চোখ আটকে দিলো। ভারমিলিয়নের তীর্যক চাউনির সঙ্গে সঙ্গত রেখে অবয়বের স্টাকচার ছবিতেই মুক্তি ডেকে আনে অবসম্ভাবী। একটি ছবিতে আইভরি ব্ল্যাক ও প্রুসিয়ান ব্লুয়ের সঙ্গত যোগ্য রহস্যময়তা নিয়ে এসেছে। প্রতিটি ছবিতেই মিস্টিক আবহ করোনার ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছে। দিন্দার কাজ তাৎক্ষণিক। রেখায় রঙে আকশ্মিকতার চলন মুখ্যত। যেন সময়ের গড়নটাকে তুলে ধরতে চাওয়ার চেষ্টা। এক ভয়াবহ সময়ের উজ্জ্বল দলিল এই ছবি কয়টি।

   

শিল্পী- সনাতন দিন্দা, সৌজন্যে- ফেসবুক।

কোভিড নাইন্টিনে বিশ্ব বিধ্বস্ত। শিল্পীরা আঁকছেন সেই আক্রান্ত পৃ্থিবীকে; এদিকে আমি ঘরে বসে দেখে যাচ্ছি রোমান্টিক পিরিয়ডের ছবি। রোমান্টিসিজমের ছবির সেই বিপুল পাহাড়ের সামনে অথবা ঝর্ণা বা সমুদ্রের সামনে একলা মানুষের বিস্তৃতি সম্ভ্রম জাগায়। চিনতে শেখায় প্রাকৃ্তিক শক্তির বিপুলতা, বিশালতাকে। আমাকে টানছে রোমান্টিক পিরিয়ডের স্টাডির কাজগুলো। নোট নিচ্ছি, লিখছি। রোমান্টিক পিরিয়ডকে আত্মীভূত করার এক অবশ্যম্ভাবী রোমান্টিক পিস অব টাইম হয়ে দাঁড়ালো কি না শেষ পর্যন্ত লকডাউনের সময়। নিজেও আঁকছি। তবে বড় ছবি নয়। ছোট ছোট স্কেচে রোজকার রোজনামচা। সেখানেও কভিডের ভাবনা থাবা বসিয়েছে কখন নিজের অজান্তেই। জুড়ে যাচ্ছে মাস্ক অর্থাৎ কি না প্রতিরোধ গড়ে তোলার একমাত্র হাতিয়ার যা সর্বসাধারণের মধ্যে রয়েছে। ভাবছি বস্তির ছেলেটা স্যানিটাইজার পাচ্ছে কোথায়? তার হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে জীবন কি ভাবে চালিত হবে! কত কত ভাবনা আসছে মনে অথচ নিখুঁত অলসতায় সে সব চিন্তাগুলোকে নিয়ে নাড়াচাড়া করেই দিন গুজরাণ। রাষ্ট্র, রাজনীতির প্রতি উদাসীন আমি আবার ঘরে এসে দেখতে থাকি সুদূর পরাহত এক জগতকে। দেখি রোমান্টিক এরাকে।

প্রতিভাষ, স্কেচ – ১

প্রতিভাষ, স্কেচ – ২

কথা হচ্ছিল অপর এক শিল্পী বন্ধুর সঙ্গে ছবির বাজার নিয়ে, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব ছবির বাজার ঠিক কোন দিকে যাবে সে সংক্রান্ত দুঃশ্চিন্তা। এমনিতেই বেশ কিছু বছর ধরে ভারতে ছবির বাজার নেই, দিল্লী ব্যতীত সারা ভারতে ছবির বাজারে মন্দা। মন্দের ভালো বলতে ঐ এক দিল্লী। কলকাতার অবস্থা উল্লেখযোগ্য নয়। কভিড যেখানে বিশ্বজুড়ে মন্দাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে সেখানে ছবির বাজার ও যে আক্রান্ত হবে একথা বলাই যায়। ছবিকে এই দুঃসময়ে বাজারজাত হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কি কি পদক্ষেপ এখন গ্যালারীগুলো গ্রহণ করছে সেটাই দেখার।
এইভাবে নববর্ষ চলে এলো। বাঙালীর এক পরব এবার গৃহবন্দী থেকেই কেটে গেল। তাতে আক্ষেপ নেই। আমি তো তখন রোমান্টিকতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে এক আস্ত ভ্রুণের মুখেই চাপিয়ে দিলাম মাস্ক। আমার শিল্পী মন দায় সাড়ল।

প্রতিভাষ, স্কেচ – ৩

দেখছি যা কিছু তা মননে ছায়া ফেলছে, ভাবছি যা কিছু তা যেন সঠিকভাবে প্রকাশিত হয় না কখনোই। তবু মন ছুঁতে চায় এক সামগ্রিকতাকে।
কভিড নাইন্টিন কিন্তু আমাদের ভাবতে শেখালো যে মানুষে মানুষে দূরত্ব কি নিবিড়তার সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। কেউ তো কোথাও যাচ্ছি না কিন্তু হৃদয় যুক্ত হচ্ছে কতো অচেনা বিশ্ববাসীর সঙ্গে। জনতা কার্ফু দেখলাম, আলো জ্বালানো দেখলাম, দেখলাম এক সমন্বয়ের ছবিতে আমিও উদ্বেলিত। কভিডের দিলগুলোতে লকডাউনের মধ্যে তাই দিন গুজরাণ রোমান্টিকতাকে জাপটে। আমি মুক্তি খুঁজি অক্ষরে, লাইনে, স্কেচে, লেখায়। সর্বপরি অলসতা মাখানো হাড়হিম করা এক রোমান্টিকতায়।

রুদ্র কল্যাণ মেতেছে আবিরে
আহা! সুন্দর এই সাধণা মোতাবেক
ঋত হয়েছে, শহর ছুঁয়েছে শঙ্খচিল
মেতেছে আবিরে করুণার আখিঁজল
শান্ত ঈশানে দুলছে যেন বা অধুনা
আরামের গোচরে তীব্র এক মনস্তাপ
বাতাসের কল্যাণ যেখানে দোটানায়
আড়ালের রণক্লান্ত মুখ্য সমীপে

[লেখিকা – উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল ও ফলিত ভূগোল বিভাগে গবেষণারতা। প্রসন্নদেব মহিলা বিদ্যালয়ে ভূগোলের অতিথি অধ্যাপিকা। ছোট থেকেই ছবি ও লেখার সঙ্গে যুক্ত। রামকিংকর বেইজ প্রদর্শনী কক্ষ শিলিগুড়ি, নর্থ গ্যালারী, আকাদেমী অব ফাইন আর্টস, নন্দলাল বসু আর্ট গ্যালারী আই সি সি আর, কেমল্ড আর্ট গ্যালারী, গ্যালারী গোল্ড, ওয়েস্ট গ্যালারী আকাদেমী অব ফাইন আর্টস, কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে তার আঁকার প্রদর্শনী হয়েছে।  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ বন্দিশ, ২০১৯]

Facebook Comments

Leave a Reply