করোনা উত্তরকাল – কিছু প্রশ্ন : শুভংকর গুহ

fail

স্পানিশ ফ্লুর শতবর্ষ অতিক্রান্ত। ১৯১৮ সালে স্পেনে প্রথম থাবা বসিয়েছিল। ঘৃণ্য কার্যক্রম ছিল টানা দুই বছর। পরিসংখ্যান বলছে, স্প্যানিশ ফ্লুতেই এই পর্যন্ত মৃত্যু সর্বাধিক। সেই ১৯১৮ সালের পৃথিবীর মানুষের সামনে আরও একটি পরীক্ষা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দগদগে ঘায়ের মধ্যেই স্প্যনিশ ফ্লুর আক্রমণ বিশ্ববাসীর অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দিয়েছিল। তবুও সভ্যতা থেমে থাকেনি। নিজের মতো করে গতিপ্রবাহ ঠিক করে নিয়েছিল। মানুষের জীবন বিনাশ ও বিপর্যয়ের জন্য কি সর্বক্ষেত্রে প্রকৃতিই দায়ি ?
নিশ্চয়ই মহাযুদ্ধ ও যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না। তবে বিশ্বে নিরন্তর ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যয় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রকৃতির এক স্বাভাবিক কার্যক্রম। অর্থাৎ প্রকৃতি নিজেই নিজের পোশাককে নিজের মতো করে, আরামদায়ক করে নেয়। এই নিয়তির ওপরে মানুষের কোনো হাত নেই। আজ যা আধুনিক কালের নিয়মে তা পুরাতন।
মানুষের সভ্যতা ও তার ঔদ্ধত্য প্রকৃতির ওপরে যে আচরণ করেছে, প্রকৃতি তার চরিত্রকে বদল করেছে। এর ফলে মহামারীতে মানুষের প্রাণহানির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান নিরন্তর পরাজয় স্বীকার করেছে। বলার কথা হল, ১৯১৮ সালেই বিখ্যাত ইংরেজ কবি রবার্ট ফস্ট নিজের লেখা কবিতায় সংশয় প্রকাশ করে বলেছিলেন এই পৃথিবীর বিনাশ হবে, হয় বরফে না হয় আগুনে। এই তো মাত্র কিছুদিন আগেই বিশ্ববিখ্যাত চিন্তাবিদ সমাজ বিজ্ঞানি, বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও দার্শনিক নোয়ম চমস্কি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন তার ভাষণে, প্রখর উষ্ণতার কারণে যে ভাবে উত্তর মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে, বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ রাষ্ট্র সমুদ্রের গর্ভে চলে যেতে আর মাত্র তিনটি দশক অপেক্ষা করতে হবে। গ্রীনহাউস বলে একটি ছেদো কথা যার নিয়ামক বিশ্ব পরিবেশ সংস্থা, যার নিয়ম কানুন রাষ্ট্রনেতারা মোটেই মেনে চলছেন না, তার পরিণাম আমাদের ভুগতে হচ্ছে ও ভবিষ্যতেও ভুগতে হবে। নোয়ম চমস্কি দ্বিতীয় যে সাবধান বাণী দিয়েছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যার পরিণাম মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বিশ্ব একটি আগুনের গোলায় পরিণত হবে। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে পৃথিবীর মানুষ খুব একটা স্বস্তিতে নেই।
আজকে এই সব কথা প্রসঙ্গতই এসে যাচ্ছে, তার কারণ প্রবল ভাইরাস সংক্রমণ ও আক্রমণের কাছে মানুষ চিরকাল নতিস্বীকার করেছে। আমাদের দেশের কথা ছেড়েই দিলাম, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই ভারত সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়। সাম্প্রতিক কালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এতটাই উপেক্ষিত করে রাখা হয়েছে, আমাদের কাছে তা গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মন্দির, সংসদ ভবন, জনপ্রতিনিধিদের বেতন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ক্লাব সমিতির ক্ষেত্রে সরকার এত আজুবাজু অর্থ ব্যয় করছে, সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের কাজকর্ম পারলৌকিক ক্রিয়ার মতো স্বান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্ট্রাকচার অফ মাইণ্ড বা মানব মনের কাঠামোকে মহামারী কি খুব বেশি আহত করতে পারে ? বা এমন কিছু পরিবর্তন ঘটাতে পারে যাতে করে মানুষের মননে গভীরতর রেখাপাত করতে পারে ? প্রতি শতবর্ষের অর্থাৎ ১৭২০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মহামারীর যে ইতিহাস তার প্রেক্ষিতে বলা যাচ্ছে মানব সভ্যতার গতিপ্রবাহ রাষ্ট্রশাসনের ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে লক্ষ করা যাচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র গভীরভাবে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। প্রায় অধিকাংশ রাষ্ট্রব্যবস্থাই চূড়ান্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতে আমরা এক সময়ে, করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব ও সংক্রমণ কাটিয়ে উঠব এবং তা থেকে মুক্তিও পাব, তখন আমাদের সামনে যে পৃথিবী, তাকে পুনর্নির্মাণের দীর্ঘ অবকাশ থাকবে। আপাত দৃষ্টিতে দেখতে গেলে, আমাদের মতো রাষ্ট্রে মানুষ মননে ও চেতনায় গভীরতর বিপন্ন বোধ করছে।
আজ থেকে এক মাস আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা গেছিল, আফ্রিকা মহাদেশে করোনা ভাইরাস সেই ভাবে সংক্রমিত হয়নি, একমাত্র মিশর ছাড়া। কারণ সেখানে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা ও ভ্রমণের কারণে সংক্রমণ ঘটেছিল, এই কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আফ্রিকা মহাদেশে একমাত্র মিশরেই সব থেকে বেশি বিদেশি পর্যটকদের আসা যাওয়া লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশেও এখন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা হলে কি ধরে নিতেই পারি, করোনা ভাইরাসের ব্যাপ্তি অন্য সব মহামারী থেকে অনেক অনেক বেশি ব্যপ্ত।
করোনা পৃথিবী উত্তরকালে আমরা এক নতুন পৃথবীকে পাব যেখানে আমাদের মনন ও চেতনায় এক গভীরতর রূপান্তর ঘটে যাবে। মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে কিছু পরিবর্তন এলেও, মানবিক সম্পর্ক সামান্য অবস্থান পরিবর্তন করলেও মানুষকে ক্রমাগত সংঘর্ষ করে যেতে হবে প্রবল দারিদ্র, ক্ষুধা, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রের খাদ্য বণ্টনের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে। ভারতবর্ষের কৃষি ব্যবস্থা বিশ্বের সর্ববৃহৎ হলেও, খাদ্য বণ্টনের ক্ষেত্রে অসাধুতা ও বিশৃঙ্খলা সাধারণ গরিব মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।
আমাদের স্বাভাবিক কমিউনিটি জীবনে আঘাত আনবে পারস্পরিক সন্দেহ, করোনা পরবর্তী জীবনেও আমাদের ঘরের বাইরে জীবনে নিয়ে আসবে, অনেক সতর্কতা যা অতীতেও আমাদের পক্ষে খুব জরুরি ছিল। কিন্তু আমরা নিজেদের স্বাস্থ্যসম্মত রাখার জন্য, যে ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলি নেব তা অনেকটাই সচেতন করে তুলবে। সাধারণ গরিব মানুষদের জন্য অপেক্ষা করবে, চরম দুর্গতি। সাহিত্য শিল্প ক্ষেত্রে কি কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে ? হয়তো সৃষ্টিশীল চেতনা ও মনন মেধা তা দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অন্য কথা বলবে। অনেক না জানা প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের করোনা পরবর্তী সময়ের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। মানুষের মনের ও চিন্তার কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন যে হবেই তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। গ্রামজীবনের ক্ষেত্রে তা বিস্তৃত না হলেও শহর ও নাগরিক জীবনে অনেক প্রভাব পড়বে, এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

Facebook Comments

Leave a Reply