চিঠি, যা নরম ছিলনা, মাংস ছিলনা.. : স্বপন রায়

fail

তৃতীয় পর্ব

[ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুধু যুদ্ধ ছিলনা। মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধও সংঘটিত হয়েছিল নাৎসি পার্টির নেতৃত্বে। হিটলারের ‘ন্যাশনাল সোশালিজম’ খাঁটি আর্য রক্তের বাইরের সবাইকে চিহ্নিত করেছিল হীন জাতি হিসেব। প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল ইহুদিরা। তারপর কমিউনিস্টরা। সোশালিস্টরা তারপর। ডেমোক্র্যাট , লিবারেল একে একে সবাই। পোল্যাণ্ড আক্রমণের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর ইওরোপ জুড়ে ইহুদি নিধন যজ্ঞ। প্রায় ছয় লক্ষাধিক ইহুদিদের হত্যা করা হয়েছিল। এর মধ্যে লক্ষাধিককে মেরে ফেলা হয়েছিল গ্যাস চেম্বারে। সরাসরি হত্যা করা হয়েছিল তিন লক্ষাধিক সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সারা দুনিয়ায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় এক কোটি মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ইওরোপ এবং এশিয়ার বহুদেশ। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল দুনিয়া জুড়েই। আর এরফলে মারা গিয়েছিল আরো কয়েক লক্ষ মানুষ। এরপরেও যুদ্ধ থামেনি। হত্যালীলা চলেছেই। আমাদের দেশেও যুদ্ধবিলাসী লোকের অভাব নেই। যাইহোক, যুদ্ধ তো কাউকে ছেড়ে কথা বলেনা। ব্যক্তিমানুষ, যতই অরাজনৈতিক বা নিরপেক্ষ হোক না কেন, যুদ্ধ তাকেও ছাড়েনা। তার ব্যক্তিজীবন, সাংসারিক জীবনে গভীর ছাপ ফেলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যা চূড়ান্তভাবে হয়েছিল। এই লেখাটা ওই যুদ্ধে নিয়োজিত দু’ জন কাল্পনিক কবিকে নিয়ে , একজন জার্মানির আরেকজন সোভিয়েত । একজন কবি যখন তার প্রেমিকা বা বন্ধুকে চিঠি লিখতো, কী থাকতো সেই চিঠিগুলোয়? এরকম কিছু চিঠির নমুনা আছে ইন্টারনেটে। তবে সেগুলো চিঠিই, কবিতা নয়। আমি একটু গভীরে গিয়ে ভেবেছি একজন তরুন কবির প্রতিক্রিয়াগুলো। আর লেখার চেষ্টা করেছি তাদের কাল্পনিক প্রেমিকা আর বন্ধুর সংগে, তাদেরই বয়ানে চিঠি আর কবিতার আদানপ্রদান । হ্যাঁ, পুরোটাই আমার বানানো। তবে যুদ্ধটা নয়। যেদিন আমরা বুঝতে পারবো যুদ্ধ কাদের বানানো সেদিন সারা দুনিয়ায় আর যুদ্ধ হবেনা।]

কাল্পনিক চরিত্রলিপি:

স্কোল ফিশার – কবি। জার্মান যুবক। প্যানৎজার ডিভিশন-৬ এর সদস্য। এই ডিভিশন পোল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্সে যুদ্ধ করার পর ১৯৪১-১৯৪৫ অবধি ‘ইষ্টার্ণ ফ্রন্টে’ নিযুক্ত হয়। এই গোটা ডিভিশন যখন স্তালিনগ্রাদে ‘রেড আর্মি’র কাছে ঘেরাও হয়ে পড়ে ‘হিটলার’ এই বাহিনীর প্রধান ‘ফ্রেডরিখ উইলহেলম এর্নেস্ট পাউলাস’কে আত্মসমর্পন করার নির্দেশ না দিয়ে লড়াই জারী রাখতে বলে। ‘পাউলাস’কে ফিল্ড মার্শাল করে দিয়ে অপ্রত্যক্ষভাবে বলা হয় আমৃত্যু লড়াই করে যেতে অথবা আত্মহত্যা করতে। ‘পাউলাস’ হিটলারের নির্দেশ না শুনেই ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘রেড আর্মি’র কাছে আত্মসমর্পন করেন। আমার কাল্পনিক চরিত্র স্কোল ফিশার এই এই হতভাগ্য ডিভিশনের সদস্য ছিল।

সোফিয়া ওয়াগনার – স্কোল ফিশারের প্রেমিকা।

বেন বেকার – কবি। স্কোল ফিশারের বন্ধু। যুদ্ধের সময় গেস্টাপো বাহিনীতে যোগ দেয় বুদ্ধিজীবি প্রচারক হিসেবে। গেস্টাপোর প্রধান কার্যালয় ছিল ‘নিয়েদেরকির্শনারস্ত্রাবে’ তে। স্ত্রাবে মানে রাস্তা। বেন এখানেই কর্মরত ছিল।

আলেক্সেই ফেদোরভ (আলিওশা) – সোভিয়েত রাশিয়ার সেনাদলের ২৮ নম্বর ডিভিশনের সদস্য। কবি। পলিটিকাল কমিশার, যাদের কাজ ছিল নাৎসি আক্রমণের যাবতীয় ভয়ংকরতার মধ্যে লাল ফৌজের মনোবল অটুট রাখা। হিটলারের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল পলিটিক্যাল কমিশারদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে গন্য না করে ধরা পড়লেই গুলি করে হত্যা করার।
তানিয়া- আলেক্সেই ফেদোরভ-এর প্রেমিকা।

আলেক্সেই ফেদোরভ, আলিওশার কাল্পনিক চিঠি / কবিতা

প্রিয় তানিয়া,
আজ ঠিক সন্ধ্যার আগে আমি ভোল্গা পেরিয়ে ২৮ নম্বর রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দেবো। তুমি মস্কোতে। দেশ আক্রান্ত। তুমি নার্স, তোমার হাতের সেবায় লালফৌজের আঘাতগুলো সেরে উঠুক। আমি জানিনা আর দেখা হবে কিনা। আমার কাজ, তুমি জানো পলিটিকাল কমিশারের। নাৎসিরা স্তালিনগ্রাদে হা্মলা করার আগে বার্লিন থেকে যে বারোশো কিলোমিটার ‘ব্লিৎসক্রেইগ’ আক্রমণের ঝড় তুলে ঢুকে এসেছে তার প্রতিটি ইঞ্চিতে রয়েছে অমানবিক অত্যাচারের হাড় হিম করা চিহ্নগুলো। নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে আমার মত ‘পলিটিকাল কমিশার’দের। এটা নাকি হিটলারের নির্দেশ। বলশেভিকদের একজন নেতাও যেন বেঁচে না থাকে! বেলোরুশে তারা সাতশোর কাছকাছি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। কিভাবে জানো? মহিলা, বাচ্চা সহ বিবাহিত সব পুরুষদের কোন একটি গুদাম ঘর বা স্কুল ঘরে আটকে বাইরে থেকে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।জ্যান্ত অবস্থায় পুড়তে পুড়তে তারা চিৎকার করেছে, আর্তনাদ করেছে, কেউ শোনেনি। উচ্চতর জাতি নাৎসিরা বরং উল্লসিত হয়েছে নিম্নজাতির এতজন মানুষকে নিশ্চিহ্ন করতে পেরে। এসব করার আগে তারা রেপ করেছে, লুঠ করেছে। আমাদের কাছে খবর আসছিল, তোমার সঙ্গে এ নিয়ে কথাও হত। যদিও খুব কম সময় পেতাম আমরা। তবে আমরা জানতাম সামনের দিনগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠবে। আমি সঙ্গে ডায়েরিটা নিয়েছি। লিখবো, কবিতা যদি পারি , নইলে দিনলিপি। যদি বেঁচে থাকি দেখা হবে।
ভালবাসায়,
আলিওশা (১,অগাস্ট ১৯৪২)

তানিয়া,
স্তালিনগ্রাদ ধ্বংসস্তূপ এখন। এক সপ্তাহ ধরে নাৎসিদের ৬ নম্বর ইনফ্যানট্রি আর ৪ নম্বর প্যানৎজার বাহিনী আমাদের কোনঠাসা করে চলেছে। ওদের ‘লুফৎওয়াফা’ থেকে ফেলা হাজার হাজার বোমায় স্তালিনগ্রাদ ধ্বংসস্তূপে পরিনত। আমরা প্রত্যাঘাতের জন্য তৈরি হচ্ছি। কমরেড স্তালিনের নামের এই শহরেই নাৎসিদের হার মানতে হবে। একথাই মাটির নিচে, ট্রেঞ্চে আমি বলে চলেছি। আর ভাবছি তোমার কথা। আমরা ‘বারমালে ফাউন্টেন’ থেকে হেঁটে চলে যেতাম ‘ভোল্গা-ডন ক্যানালে’র দিকে। নদীর হাওয়ায় তোমার চুল উড়তো। আমি বলতাম, চুল নয়, প্রজাপতি। আর আমরা সাইকেল মাটিতে ফেলে দু জনে, দুজনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম চুমু খাওয়ার আগে! এখানে এসে, এই যুদ্ধের ভেতরেও আমি লিখছি। আমি তো কবিতা লিখিনা নাতাশা, আমি তোমাকে লিখি।
তোমার,
আলিওশা। ১৮ অগাস্ট, ১৯৪২



পুনঃ লেখাগুলো দিলাম-
…………..
ক’জন মরেছে জানিনা
ক’জনকে মেরেছি জানিনা
বেঁচে আছি!
…….
আমি তোমায় প্রথম দেখি কোমসোমলের সভায়
আমি তোমায় শেষেও দেখতে চাই
আমি শেষ দেখতে চাই
..
যদি না থাকি, আমি তোমায় দেখবো না
তুমি দেখবে, কিন্তু কিভাবে?
কিভাবে তুমি দেখবে যে আমি তোমার পছন্দ মত রোজ শেভ করতাম
আমার গালটা চকচক করছিল মরার সময়

আমার শহর ধুলোয়
কিন্তু ধুলোগুলোও তো আমার
আমার ধুলো জমে উঠছে এখন
ঝড় হবে বলে..
……..

তানিয়া,
মস্কোর অবস্থা, স্তালিনগ্রাদের অবস্থা, সারা দুনিয়ার অবস্থা পাল্টাবে যদি আমরা নাৎসিদের শেষ করতে পারি। আর আমরা তা করবোও। আমরা এমন এক নেতার অধীনে লড়ছি যিনি জার্মানদের হাতে বন্দী নিজের ছেলে ‘ইয়াকভ’কে বাঁচাবার জন্য কোনও সমঝোতা করেন নি। জার্মানরা একজন ‘রাইখমার্শাল’-এর মুক্তি চেয়েছিল তাঁর ছেলের মুক্তিপন হিসেবে। স্তালিন উত্তর দিয়েছিলেন, আমরা একজন জুনিয়র অফিসারের সঙ্গে (এক্ষেত্রে তাঁর সন্তান) একজন ‘রাইখমার্শাল’-এর বিনিময় করিনা। আর আমার সৈনিকেরা সবাই আমার সন্তান। গোয়েবলস ‘ইয়াকভ’কে নিয়ে নানা মিথ্যা কথা ছড়িয়েছে, তুমি জানো। তবে, আমরা সত্যিটা জানি। আর এটাও জানি, যোশেফ স্তালিন, মার্শাল জুকভ আর জেনারেল চুইকভের নেতৃত্বে আমরা স্তালিনগ্রাদে নাৎসিদের হারাবোই। তুমি লিখেছ মস্কো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। চরম খাদ্য সঙ্কট। পানীয় জলের হাহাকার। স্তালিনগ্রাদে আমরা ভোলগার ওপার থেকে এখনো অবধি সরাবরাহ চালু রাখতে পেরেছি। শহরের প্রায় পুরোটাই নাৎসিদের কবলে, কিন্তু ওরা আর এগোতে পারছে না। ওরা চাইছে ভোল্গা পার হয়ে আমাদের সরবারহ বা সাপ্লাই লাইন বন্ধ করে দিতে। ওরা পারবে না নাতাশা। এটা আমাদের দেশ। স্তালিনগ্রাদ ফ্রন্টে ২৮,৫১,৫৭,৬২ আর ৬৪ নম্বর বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাচ্ছে। জার্মানদের অস্ত্র শস্ত্র আমাদের চেয়ে উন্নত কিন্তু আমাদের মনোবল ওদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। একটা আক্রমণাত্মক , হিংস্র, পাশবিক সেনাবাহিনীকে আমরা হারাবোই। মৃত্যুভয় স্তালিনগ্রাদের কোথাও আর নেই। আমরা বিভিন্ন ভেঙে পড়া অট্টালিকা, স্কুলঘর, কারখানায় ঘাঁটি গেড়ে জার্মানদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলছি। ওরা এধরণের যুদ্ধে অভ্যস্থ নয়। আমার ‘নোট বুকে’ যুদ্ধের আগুনে সেঁকা কলম যা লিখল, তোমায় না পাঠিয়ে পারি?
……………
বুলেট লাগা আর না-লাগার দুনিয়ায় পাখি আর তার নরম মাংস ফুটে উঠল
আমরা খেলাম
যুদ্ধে এই হয়, খেতে হয়, নরম মাংসের স্বাদ নিতে নিতে মনে হয় কাল আবার ভোর হবে, হয়ত গান গাইবে আরেকটা পাখি
আমার সেদ্ধ মাংসের দিকে তাকিয়ে..
………………………………………
সারাদিন বিকেল সন্ধ্যা সারারাত
সারারাত সন্ধ্যা বিকেল সারাদিন
সাররা স বিকে সারাদি
সারাদি বিকে স সাররা
সারা বি স সার
সার স বি সারা
সা সা
সা
একা বেরিয়ে এলাম হাইডআউট থেকে, জার্মানরা পালাচ্ছে…
………
স্কুলের ঘন্টা বাজলেই আমার একটা পাটকিলে পাখির উড়ে যাওয়া মনে হত
এখন বুলেট ওড়ে
ঘন্টা বাজে
ওই বুলেটে যার নাম লেখা, তার জন্য
….
কাল আর আজ, আজ আর কাল
জীবন
আজ আর কাল, কাল আর আজ
মৃত্যু
এর ভেতরে কোথাও ‘জন্য’ শব্দটা
তোমার জন্য
শুয়ে আছে
……..

স্কোল ফিশারের কাল্পনিক চিঠি / কবিতা

সোফিয়া,
রাশিয়া খুব বড়। হারিয়ে যাবো মনে হয়। মাইল মাইল বাসি মড়ার গন্ধ। আমি বেঁচে আছি, বুলেটটা লাগেনি বলে। আমি স্তালিনগ্রাদের খুব কাছে, তোমার থেকে অনেকদূরে। খুব বড় রাশিয়া, যদি হারিয়ে যাই? বাইরে চাঁদ আলো ফেললে ইচ্ছে হয় বলি আহা, বারুদের গন্ধ ভক্‌ করে বেরিয়ে আসে…ভাল থেকো, – তোমার স্কোল। ৩ নভেম্বর, ১৯৪২
বেন,
কবিতা আছে না নেই? মানুষের মাথা থেঁৎলে যাওয়ার পরেও চাঁদ ওঠে। ইহুদিদের শেষ নিশ্বাস ঢুকে গেছে কলমের ভেতরে, এখন ঢুকছে রেড আর্মির। কি একটা ঝাঁঝ নিয়ে বিকেল ঘা ঘা করে। ঘিলুর রেশম বোনে পাৎলা নভেম্বর। রাশিয়া কি কিছু বুনছে, ভোলগার জল কি আরো গভীরের সেই লেবরেটারি, যেখানে ফ্যুরারের পায়ে চাপা দেয়া চিৎকার সুর হয়ে যাচ্ছে, রেড আর্মি গাইছে পাতালছাড়া আকাশফাড়া গান। জানিনা, জিতলে কি হয়, হারলে কি হয়, জানিনা। মানুষের কাছে মানুষের পাশে একটা গাছ, একটা রান্নাঘর আর একটা পিয়ানো যদি রাখতে পারতাম!
স্কোল, ৫ নভেম্বর, ১৯৪২

সোফিয়া,
গালের পাশে বুলেট আর প্রজাপতি। আমি গর্তের ভেতরে, জার্মানির জন্য পেতে দিতে চাইছি একটা জাল, যদি বুলেট আমার একগাল থেকে অন্য গালে যাওয়ার সময় একটু জড়িয়ে যায়। সামান্য আদুরে হয়। পাখায় রাখে খেয়ালহারা রঙ, উদাসীনা হয়। আমি বাড়িয়ে বলছি, কাল মরে গেলে, এই বাড়িয়ে বলাটা কেউ না কেউ শুনবে। প্রজাপতিকে আলাদা করে রাখলে, ফুল ফোটে। গোঁফের দু দিকে রাখলে, কান্না। কান্না উঁচু জাতির। নীচু জাতির। রক্ত লাশ পোহাতে পোহাতে পোকা। পোকারা গান গায়। বারুদ শোঁকে। জার্মান আর রাশিয়ান, সব লাশকেই মনে হয় এই দুনিয়ার নাগরিক। শুধু মরার আগে ওরা বোঝেনি। আমি ফিরবো কিনা জানিনা, সোফিয়া দীর্ঘশ্বাস রেখো, ছোট্ট জীবনে যা দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে।
স্কোল, ১২ নভেম্বর, ১৯৪২

প্রিয় বেন,
আজ, ‘ক্রিস্টলনাখ্‌ট’ মনে আছে। ভাঙা কাচের রাত্রি। দুশোটা ‘সিনাগগ’, আমরা পবিত্র করে দিচ্ছিলাম। ভেঙে। ইহুদিদের উপাসনালয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম খাঁটি জার্মান রক্তের মাঞ্জা। লুঠ করা হল আট হাজার বাড়ি। হাজার হাজার ইহুদি যখন ভোরে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রওয়ানা দিচ্ছে, আমরা গাইছিলামঃ
রাস্তা এখন মুক্ত , বাদামি সেনারা, এগিয়ে চলো
রাস্তা এখন ফাঁকাই ঝটিকা বাহিনি এগিয়ে যাচ্ছে
লক্ষকোটি ক্ষুধিত মানুষ স্বস্তিকাকে চাইছে
সেই শুভ দিন শুরু সাথী, রুটি রুজি আর মুক্তির

ইহুদিরা তাদের দরজা জানলার ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। এদিকে ওদিকে কয়েকটা মৃতদেহ। বেজন্মা ইহুদিদের। আমরা গান গাইছিলাম, চলে যাওয়া শয়তানগুলোর দিকে তাকিয়ে।বেন, আমি আর তুই একটা হারমোনিকা বাজাচ্ছিলাম। একটা ইহুদি বাচ্চা, কপালে জমাট রক্তের দাগ।যেতে যেতে দেখল আমাদের। হাসল। হাত নাড়লো। বেন, আমি আর তুই একসঙ্গে বলে ছিলাম, হেইল হিটলার। বাচ্চাটা তখনো হাসছে, সূর্য টপকে এল তখন। আমরা চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। মনে আছে বেন?
স্কোল, ১৪ নভেম্বর,১৯৪২

…………….

সোফিয়া,
আর কিছু করার নেই। নেই, নেই। বারবার লিখলাম কারণ মাথার ওপরে সারাক্ষণ বুলেট। স্প্লিন্টার। ধোঁয়ায় উড়তে থাকা সৈনিকের শরীর, কাল একটা আঙুল এসে পড়ল। তাতে এনগেজমেন্ট রিং। আমি ভাবতে পারছি না আর। স্তালিনগ্রাদে যারা আমাদের শত্রু, তারা এই দেশের নাগরিক। তারা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষা করছে, যে যেখানে আছে রুখে দাঁড়াচ্ছে। মেয়েরা স্নাইপার হাতে লড়াই করছে ঘরের ভেতরে, ট্রেঞ্চে, ফক্সহোলে। এদের পেছনে গোটা দেশ আর আমরা এক মূর্খ একনায়কের হাস্যকর রাজনীতিকে সমর্থন করে সর্বনাশের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের বোমারু বিমানের হানায় বিধ্বস্ত স্তালিনগ্রাদের প্রতিটি ক্ষত বিক্ষত বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা আর মানুষ আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। এই লড়াই আমি আগে দেখিনি। আমরা জার্মানরা জানিই না কিভাবে ঘরে ঘরে ঢুকে যুদ্ধ করা যায়। আমরা হেরে যাচ্ছি। সোফিয়া, আমরা এখানে এসেছি কেন? ‘বার্গফ’-এ বসে একটা শয়তান এই সুন্দর পৃথিবীটাকে শেষ করতে চাইছে।লোকটা আমার দেবতা ছিল। আজ আমি ঘৃণা করি শয়তানটাকে। ঘৃণা করি নিজেকে। আমি জানি ‘রেড আর্মি’র সৈন্যরা আমায় ঘৃণ্য নাৎসি ছাড়া আর কিছুই ভাববে না মারার আগে। আমার মৃত্যু হবে, আমি শুয়ে থাকবো , তুষার ঢেকে দেবে আমায় ধীরে ধীরে। যেমন দিচ্ছে আমার সহযোদ্ধাদের। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো। আমি আর লিখতে পারিনা। গতকাল হিটলার রেডিওতে ভাষণ দিয়ে জানিয়েছে যে আমাদের ৬ নম্বর ডিভিশনের আত্মত্যাগ জার্মানির মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। সোফিয়া, এর মানে কী জানো? আমাদের বলি দিয়ে দেওয়া হল। স্তালিনগ্রাদের এই রুক্ষ তুষারপ্রান্তরে আমাদের জন্য কোন সাহায্য আসবে না। আমাদের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দেওয়া হল। আমদের রেড আর্মি ঘিরে ফেলেছে। আজ পয়লা জানুয়ারি, ১৯৪৩। নতুন বছর। আমাদের কোন উদযাপন নেই। খাওয়া, ওষুধ, অস্ত্র শেষ হওয়ার পথে। আমরাও…শুভ নববর্ষ প্রিয়তমা।

পুনঃ আমার এই ছিন্ন বিছিন্ন লাইনগুলো তোমায় পাঠালাম।বন্ধু ‘বেন বেকার’ বেঁচে আছে কিনা জানিনা। পারলে ওর সংগে যোগাযোগ করে আমার কথা জানিও, বোলো, আর দেখা হবেনা। আমার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন কিছু লাইন, তোমার জন্য –

১. যদি ফিরে যেতে পারি, একটা পরিষ্কার বেডশিট যেন থাকে আর তুমি। আমার যুদ্ধবিরতি।
২. দাড়ি কামানো সময় নেই, রেজর নেই, নেল কাটার নেই, টুথ পেস্ট নেই। ইউনিফর্ম শেষ। স্নান নেই। আমরা মানুষ ছিলাম। এখন জন্তু।
৩. ‘ওয়াইন’-এর গন্ধ ছিল। ‘রাইন’ ছিল। তুমি ছিলে। নতুন বছরগুলো, ছিল। আমি ভাঙা জানলা দিয়ে রাতের আকাশ দেখছি, থাকবে তো?
৪. জার্মানি। জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র। জাতীয়তাবাদ। জাতীয়। জাতি। জা। যাঃ!, কিছুই নেই আর…
৫. যারা যুদ্ধের কথা বলবে এরপরেও, আরো মৃত্যু এরপরেও তাদের জন্য।
৬. ভোর চামড়া, সকাল পোড়া চামড়া। দুপুর থ্যাঁতলানো চোখ, বিকেল ওপড়ানো চোখ। সন্ধ্যা, অসমাপ্ত গ্রেনেড। রাত্রি, অশুভ। গভীর রাত্রি, মৃত্যুর…
৭. শিশু, আয়ু। শিশুর বাবা, পরমায়ু। মা, সেতু। কনভয় নিয়ে চলে যাচ্ছে..
৮. ট্যাঙ্কের ভেতরে পুড়ে যাচ্ছিল। পুড়ে যাচ্ছিল, আমার বন্ধু
৯. একটা বিন্দু আকাশ নয়, একটা আকাশ অনেক অনেক বিন্দুর
১০. মরার আগে সবাই কিছু না কিছু বলতে চায়। বাতাসে গোলা এইসব না বলা কথা। বারুদের গন্ধই সবটা নয়।
১১. রক্ত ছিলই, আমাদের, ওদের। রক্ত আছে। আমাদের, ওদেরও। বয়ে যাওয়ার জন্য..
১২. হাসি পাচ্ছিল। হিটলা্র ভাষণ দিচ্ছে ভেবে? না ঠিক তা নয়। ভাবছিলাম ওর হামাগুড়ি দেওয়ার কথা। এখন আবার দিচ্ছে ভেবে..

[চলবে …]

Facebook Comments

Leave a Reply