এই পথে আলো জ্বেলে… : তাপস কুমার দাস

করোনাভাইরাস সংক্রমন মন্দীভূত করার জন্য ভারতবর্ষে সরকারি ভাবে লকডাউন শুরু হয় দু হাজার কুড়ি সালের পঁচিশে মার্চ। লকডাউনের মহড়া হিসেবে বাইশে মার্চ জনতা কার্ফ্যু হয়। সরকারের তরফ থেকে নিদান দেওয়া হয়েছিল সেদিন থালা বাজানোর। চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী যাঁরা করোনা সংক্রামণ আটকাতে দিনরাত লড়াই করছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ই এই বাসন বাদ্যের উদ্দেশ্য, দেশবাসীকে রাষ্ট্রপ্রধান সেরকম ই বলেছিলেন।

বিশ্বহিন্দু পরিষদের মুখপাত্র গিরিশ বনসল তেরো বার করে রামনাম জপ করে সুরক্ষিত থাকার দাওয়াই দেওয়ার পরেও যখন থালাবাটি বাজানোর নিদান হাঁকা হলো স্বাস্থ্যকর্মীদের দের সম্মান দিতে, প্রাথমিক ভাবে তখন মনে করা হয়েছিল এতে বিজ্ঞানের নৈতিক জয় ই প্রতিষ্ঠিত হলো রামলালার অলৌকিক শক্তির ওপরে। ফলে আপ্লুত হয়ে জনগণ থালা বাজালো, শাঁখ বাজালো, উলু দিলো।

কিন্তু যখন প্রকৃত প্রয়োজন পড়লো, তখন দেখা গেলো সম্মান দেওয়ার ব্যাপারটা অতটা সহজ নয় যতটা সহজ কাঁসর বাজানো। সম্মান তো দূরস্থান, এমনকি স্বাস্থ্য কর্মীদের পাশে দাঁড়াতেও নারাজ হলো বহু মানুষ। হাসপাতালের নার্স রা বাড়ি ঢুকতে পারলেন না। তাঁরা করোনা ছড়াবেন সেই ভয়ে আবাসনের লোকরা তাদের ঢোকা বন্ধ করে দিলেন। বেশ কিছু জুনিয়র ডাক্তারের অবস্থাও হলো তথৈবচ। ভুবনেশ্বরের এক আবাসনে এক মহিলা ডাক্তার কে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হলো বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য – তিনি নাকি করোনা ছড়াতে পারেন যেহেতু তিনি করোনার রোগীর চিকিৎসা করছেন [১]। দেশজুড়ে এক ই ছবি দেখা গেলো।

সম্মান দেওয়ার মুখোশটি যখন টুক করে খসে পড়লো, কোভ-সার্স২ এর রোগীর সংখ্যা যখন হু হু করে বাড়ছে, বাজার থেকে উবে গেছে চাল ডাল দুধ বেবিফুড অত্যাবশ্যকীয় আরো অন্যান্য পণ্য, পরিযায়ী শ্রমিকরা এক এক করে মুখ থুবড়ে পড়ছেন রাস্তায়, মারা যাচ্ছেন কেউ দুশো কেউ আড়াইশো কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে, তাদের বাড়িরই লোক না খেতে পেয়ে বনে জঙ্গলে গাছের পাতা ছিঁড়ে চিবোচ্ছেন, এমনকি গণিকালয়ের লাইনেও গিয়ে দাঁড়ানোর উপায় নেই তাঁদের – এই মহাভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র আবার হাজির হলো তার নতুন `অনুরোধ’ নিয়ে – বাতি নিভিয়ে জ্বালিয়ে রাখতে হবে মোমে প্রলিপ্ত দীপশিখা, পাক্কা নয় মিনিট ধরে! আর কে না জানে রাষ্ট্রের অনুরোধ মানেই আদেশ, তাই নয় মিনিট মোম জ্বালালে কি পরিমান পরিবেশ দূষণ হতে পারে (অদগ্ধ বা অর্ধদগ্ধ কার্বন কণার নিঃসরণের জন্য), সহসা লকডাউনের বাজারে মোমবাতি জোটানো যাবে কোথা থেকে, যখন ঘরে থাকাই বিধেয় তখন মোমবাতি কিনতে দোকানে ভিড় করলে সংক্রমণের ভয় বাড়বে কিনা – এইসব প্রশ্ন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে মানুষজন পথে নেমে পড়লো ছোটমাপের দীপাবলি উদযাপন করতে। আশ্চর্য, ফাটল প্রচুর আতশবাজি ও। এই সংকটকালে, কোথা থেকে, কি এভাবে এলো এতো আতশবাজির যোগান, সেই নিয়ে কোনো প্রশ্ন পর্যন্ত উঠলো না নাগরিকমনে।

৫ ই এপ্রিল রাত্রি ন’টার সময় যা ঘটলো, তার তুল্য নৃশংস ঘটনা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষ সম্ভবতঃ কোনোদিন দেখেনি। বহু রোগীর মৃত্যু, তার চেয়েও বেশি সংখ্যায় ভুখা মানুষের মৃত্যুকে সমাজ নির্লজ্জ ভাবে, পাশবিক নিষ্ঠুরতায় সেলিব্রেট করলো ঢাক ঢোল পিটিয়ে আতশবাজি জ্বালিয়ে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, অতি সাধারণ মানুষ, যাঁদের সাথে রাজনীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই, এবং উচ্চশিক্ষিত মানুষ, যাঁরা সমাজের বিশিষ্ট অবস্থানে আছেন, তাঁদের অনেকেই সাগ্রহে অংশ নিলেন এই কদর্য রাজনৈতিক খেলায়, বুঝে অথবা না বুঝে। যাঁরা সামিল হতে চাননি এই নিষ্ঠুরতায়, তাঁদেরকে অনেক জায়গায় জোর করা হয়েছে আলো নিভিয়ে ফেলতে। কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে তাঁরা মোমবাতি কেন জ্বালাচ্ছেন না। জোর করেছেন সেইসব এলাকার অন্যান্য সাধারণ মানুষেই।

দেশব্যাপী এই সঙ্কটে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করে জাতীয় অর্থনীতি টিঁকিয়ে রাখ। শাসক তা না করে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে দেশবাসী কে। এটা রাষ্ট্রের অপরাধ, প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার। সোশ্যাল মিডিয়াতে রাষ্ট্রের এই অকাল দীপাবলির সপক্ষে বিভিন্ন যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন বহু বোদ্ধা, তাঁদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বড়ো ডিগ্রি আছে, এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত। নৃশংসতা করতে, অতএব, রাষ্ট্রকে সবসময় সরাসরি হাত নোংরা করতে হয়নি, নাগরিকরাই সে কাজ সুচারু ভাবে সম্পন্ন করেছেন সর্বাঙ্গে ক্লেদ মেখে।

সাধারণ মানুষ, যাঁদের অনেকেই প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত নন, এমনকি যাঁদের অনেকের ই নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এবং তাঁরা কিনা রাষ্ট্রের দ্বারা’ই নিপীড়িত – কিভাবে তাঁরা রাষ্ট্র প্রচারিত এই হুজুগে মেতে ওঠেন? কিভাবে অতি সহজেই হয়ে ওঠেন ক্ষমতালোভী রাষ্ট্রের ক্রীড়ণক?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে বুঝতে হবে রাষ্ট্র কিভাবে নাগরিকের অজ্ঞানতাকে কাজে লাগায় সমাজের ওপরে অন্যায্য অনুশাসন চাপিয়ে দিতে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ (সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বললেও অতিকথন হয়না সম্ভবতঃ) সাহিত্যিক লেভ নিকোলায়েভিচ (লিও) তলস্তয়ের কিছু রচনার ইংরেজি অনুবাদ একত্র করে গ্রন্থিত রয়েছে রাইটিংস অন সিভিল ওবিডিয়েন্স এন্ড নন ভায়োলেন্স [২] শীর্ষক পুস্তকে। সেখানে তলস্তয়ের লেখা একটি চিঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদে চিঠিটির শিরোনাম – আ লেটার টু (রাশিয়ান) লিবারেলস [৩]। চিঠিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদই শুধু নয়, ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য (anti-state utterance) হিসেবে চিঠিটির বিশেষ ভূমিকা আছে। এপোলোজি অফ সক্রেটিস [৪], সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স [৫] , এবং আনটু দ্য লাস্ট [৬] এর সাথে তলস্তয়ের এই চিঠিটিকেও অবশ্যপাঠ্যর তালিকায় রেখেছিলেন মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং – উনিশশো উনিশ খ্রীষ্টাব্দের তিরিশে জুনে প্রচারিত `সত্যাগ্রহীদের প্রতি নির্দেশ’ পড়লে জানা যায়:

`…literature such as Thoreau’s Civil Disobedience,Hind Swaraj, Defence of Socrates by me, Tolstoy’s Letter to Russian Liberals and Ruskin’s Unto this Last should be widely distributed….’ [৭]

কি ছিলো এ. এম. কালমিকোভা নামক জনৈক মহিলা কে লেখা তলস্তয়ের সেই ব্যক্তিগত চিঠিতে যার জন্য সম্পূর্ণ অন্য এক মহাদেশে, এক সম্পূর্ণ নতুন ধরণের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গে সেটিকে এতোটাই গুরুত্ব দিয়েছিলেন গান্ধীজি? প্রখ্যাত ভারতবিদ্যা বিশেষজ্ঞ (Indologist), মস্কোর রাশিয়ান স্টেট হিউম্যানিটারিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সার্জি সেরিব্রিয়ানির লেখা পড়লে তার বিশদ বিবরণ পাওয়া যাবে [৮]। রাশিয়ার এক সময়ের সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের (শাসনকাল সতেরশো বাষট্টি থেকে সতেরশো ছিয়ানব্বই খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে সে দেশে একটি অর্থনৈতিক কমিটি ছিল, যার একটি শাখা `কমিতেত গ্রামত্সনস্তি’ (ইংরেজিতে দ্য লিটেরেচার কমিটি)। রাশিয়ার জনগণের মধ্যে সাহিত্যবোধ জাগিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন বই বিলি করা, পাঠাগার স্থাপন ও পরিচালনা, ইত্যাদি কাজের ভার নেয় সেই সমিতি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে লিটারেচার কমিটির সাথে তৎকালীন সরকারের মতদ্বৈধ শুরু হয় কি ধরণের সাহিত্য জনগণকে পড়ানো হবে তাই নিয়ে, এবং রাষ্ট্র তার নিজের নির্দেশ মতো বিষয়ের বই বিলি করার কথা বলে। মানুষ কি পড়বে, সেই ব্যাপারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে লিটারেচার কমিটি শাসকের বিরাগভাজন হয়। ফলস্বরূপ সমগ্র অর্থনৈতিক কমিটিকেই অন্য্ দপ্তরের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। গ্রামত্সনস্তি’র সদস্যা কালমিকোভা তলস্তয় কে চিঠি লিখে জনগণের শিক্ষার ব্যাপারে রাষ্ট্রের অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপের বিষয়ে তাঁর সাহায্য চান। সেই চিঠির উত্তরই তলস্তয়ের আ লেটার টু (রাশিয়ান) লিবারেলস।

সেই দীর্ঘ পত্রালাপের বিশদ বিবরণ এখানে নিষ্প্রয়োজন – শুধু এটুকুই বলার যে তলস্তয় জোর সওয়াল করেছিলেন জনগণের শিক্ষার, চেতনার, চিন্তার স্বাধীনতার ওপরে রাষ্ট্রের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে। সেই চিঠিতে তলস্তয় এক অতি গুরুত্ব্বপূর্ণ মন্তব্য করেন, ইংরেজিতে অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায়:

The strength of the government lies in the people’s ignorance, and government knows this, and will, therefore, always oppose true enlightenment. It is time we realized that fact.

সহজ ভাষায়, মানুষের অজ্ঞতা শাসকের ক্ষমতার উৎস। শাসক তা বোঝে। ফলতঃ জনগণ প্রকৃত শিক্ষিত হোক, যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে শিখুক (অর্থাৎ বিজ্ঞান মনস্ক হোক), রাষ্ট্র তা কখনোই চাইবে না।

এই অজ্ঞতা আমাদের যুক্তিবোধ কে আচ্ছন্ন করে রাখে। যুক্তিবোধ, যা কিনা প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানমনস্কতারই চর্চা, তার ই অভাব আমরা আজ সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্রের অন্যায্য অনুশাসনের প্রতিবাদ বেশিরভাগ মানুষ তো করছেনই না, উল্টে তাঁরা রাষ্ট্রকে সহায়তা করছেন সংখ্যালঘু সেই সব যুক্তিবাদী নাগরিকের মুখ বন্ধ করে দিতে, যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন আরোপিত অনুশাসনের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

এ অতি ভয়ঙ্কর প্রবণতা। এ এক অন্ধকার সময়।

আমরা কী এরকমই ছিলাম? এইরকম যুক্তিবোধরহিত গড্ডলিকা প্রবাহের একটি সংখ্যামাত্র হিসেবে ব্যক্তিমানুষের টিকে থাকা কি ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তর্লীন গঠনের মধ্যেই নিহিত ছিলো? বিশেষ করে বাঙালির? যাদের কিনা নবজাগরণের এক মহান পশ্চাৎপট আছে?

অবশ্যই এই যুক্তিহীন দিশাহীন চরিত্র বাঙালীর আবহমান কাল ছিল না। ছিল গর্বের অতীত, যা আমরা ভুলতে বসেছি, এবং সম্ভবতঃ প্রায় সম্পূর্ণ ভুলেছি। নীরদ চন্দ্র চৌধুরী’র পুস্তকের শিরোনাম ধার করে বলা যায়, বাঙালি আজ সত্যিই আত্মঘাতী, আত্মবিস্মৃত জাতি। এবং বৃহত্তর প্রেক্ষিতে, ভারতবাসী ও।

যুক্তিবাদের সেই স্বর্ণময় অতীত আমরা কিভাবে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি, সেটি বোঝার চেষ্টা করা যাক।

সময়ের অক্ষ বরাবর মাস ছয়েক পিছিয়ে যাওয়া যাক। গত বছরের (২০১৯) ১০ ই নভেম্বর, রবিবার, বছর পঁচিশ বয়সের পশ্চিমবঙ্গবাসী এক বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি জানান তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়েছে বছর পাঁচেক আগে, মা’র বয়েস পয়ঁতাল্লিশ। সেই যুবকের ইচ্ছা তাঁর মা আবার বিবাহ করুন। তিনি বড়ো হয়ে গেছেন, নিজের কাজকর্ম রয়েছে, ফলে মা একা হয়ে পড়েছেন মানসিকভাবে, তাই মা যদি কোনো সঙ্গী খুঁজে পান তাহলে ছেলে হিসেবে তিনি অত্যন্ত সুখী হবেন। ফেসবুকে তিনি তাঁর মার সাথে একটি ছবি ও দেন সেই পোস্টে, এবং যোগাযোগের জন্য নিজের মোবাইল নাম্বার ও পোস্ট করেন সেখানেই।

মুহূর্তে ভাইরাল হয় সেই পোস্ট। বর্তমান প্রতিবেদন তৈরি করার সময়ে, দেখা যাচ্ছে, সেই পোস্টে তেরো হাজারের ও বেশি লাইক পড়েছে, পোস্টটি শেয়ার হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের ও বেশিবার। প্রায় সাড়ে পাঁচশো নেটিজেন কমেন্ট করেছেন ভদ্রলোকের পোস্টে। এই পোস্ট এতটাই সেনসেশন তৈরি করে জনমানসে, যে, বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া সেই নিয়ে খবর করে [৯]। তেরোই নভেম্বর এই নিয়ে খবর করে বিবিসি র হিন্দি বিভাগও। বাংলাদেশের বহু সংবাদ পত্রেও এই খবর প্রচারিত হয়। ষোলোই নভেম্বর বাংলাদেশের মিনার টিভি তে মুফতি ইউসুফ মাহমুদী এই ঘটনার সমর্থনে একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখেন (বর্তমান প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত, প্রায় সাড়ে সাঁইত্রিশলক্ষ মানুষ সেই অনুষ্ঠানের ক্লিপিং দেখেছেন), এবং এই ঘটনায় যে পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন সেই যুবক, এমন বক্তব্য ও রাখা হয়েছে সংবাদ মাধ্যমে [১০]।

ভদ্রলোকের উদ্যেশ্য মহৎ, মনোজগৎ কুসংস্কার মুক্ত, এবং চিন্তায় যুক্তিবাদের ছাপ পরিষ্কার। তাঁর এই প্রয়াস এবং বক্তব্য, অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই, বহুল প্রশংসার দাবি রাখে। যা তিনি পেয়েওছেন অনেক নেটিজেনদের থেকে। সেটা তাঁর অবশ্যপ্রাপ্য।

সমস্যা টা অন্য জায়গায়। বর্তমানের নেটিজেনরা এই ঘটনাকে আকাশ থেকে নেমে আসা এক দেবদূতের অলৌকিক কান্ড হিসেবে দেখেছেন। তাঁরা ভেবে দেখেননি, বা ভুলে গেছেন, অথবা, খুব সম্ভবতঃ, তাঁরা কেউ খবর ই রাখেন না যে এই মানবতাবাদী চিন্তা এবং যাপন, যা কিনা প্রকৃতপক্ষে যুক্তিবাদের চর্চা থেকেই আসা সম্ভব, তা বাঙালির ঐতিহ্যেই আছে। এমন নয় যে এ ঘটনা এ পোড়া দেশে এই প্রথম ঘটলো। এই যুক্তিবাদ থেকে উৎসারিত মানবতা বাঙালির নবজাগরণের ফসল।

এবং তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর শ্বশুর ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী দুর্গামোহন দাস (১৮৪১ – ১৮৯৭)। আঠেরোশো পঁয়ষট্টি খ্রিস্টাব্দ নাগাদ থেকে ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ব্রজসুন্দর মিত্রের সাথে জুটি বেঁধে তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বিধবা বিবাহের সমর্থেন আন্দোলন শুরু করেন, তাঁদের সাথে ছিলেন বরিশালের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার আনন্দচরণ খাস্তগীর, এবং গিরিশচন্দ্র মজুমদার ও সর্বানন্দ দাস [১১]। সেই সময়ে দুর্গামোহনের দাদা কালীমোহন দাস বরিশাল শহরে ওকালতি করতেন। আঠেরোশো পঁয়ষট্টি খৃস্টাব্দেই (বারোশো একাত্তর বঙ্গাব্দ) তিনি বরিশাল শহরে দুই কায়স্থ বালবিধবার বিবাহ দেন নিজের খরচে। সে কারণে তিনি বরিশালের বহু মানুষের বিরাগভাজন হন। তাঁকে সামাজিক ভাবে বয়কট করা হয়। তাঁর প্রাণসংশয় ও হয়েছিল এই উপলক্ষে, ঈশ্বরচন্দ্রের মতই, কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র দমে যান নি তাতে। পূর্ববঙ্গে সেই প্রথম বিধবা বিবাহ [১২]।

দুর্গামোহনের জন্মদাত্রী মা মারা যান অতি অল্প বয়েসে। পরে তাঁর বাবা কাশীশ্বর দাস দ্বিতীয় বিবাহ করেন। কাশীশ্বরের মৃত্যু হলে, দুর্গামোহন নিজে উদ্যোগ নিয়ে তাঁর বিমাতার বিয়ে দেন নিজেরই এক চিকিৎসক বন্ধুর সাথে। সেই সময়ে, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মায়ের বিয়ে দেওয়ার মতো মহাভয়ঙ্কর পাপ করার ফলে, সমগ্র সমাজ দুর্গামোহনকে বয়কট করে। তাঁর জীবনধারণের সংকট দেখা দেয়। তা সত্ত্বেও দুর্গামোহন নিরস্ত হননি, হেরেও যাননি। তাঁর যুক্তি ছিলো অন্য যে কোনো মহিলা যেমন সুস্থ সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন, তাঁর বিমাতা কেন তা পারবেন না।

দুর্গামোহন দাসের মতো আরও অনেকের যুক্তিবাদী কর্মকান্ডের বিবরণ, ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় তেজেশচন্দ্রের প্রেমপর্বের সংক্ষিপ্তসার। কলকাতার প্রখ্যাত, বিলেতফেরত এলোপ্যাথি চিকিৎসক কুলীন-ব্রাহ্মণ তেজেশচন্দ্র গাঙ্গুলি আঠেরোশো ছিয়াশি খ্রিস্টাব্দে ভালোবেসে বিয়ে করেন এক শূদ্র নার্সকে। আজ থেকে দেড়শো বছরের ও বেশি আগে, জল অচল সমাজে এই প্রবল অসবর্ণ বিবাহের ফলাফল হয় ভয়াবহ। তেজেশচন্দ্র এবং তাঁর স্ত্রীর সমর্থনে এগিয়ে আসেন রবিঠাকুরের জামাইবাবু (স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী) জানকীনাথ ঘোষাল এবং সেই সময়কার বিখ্যাত পত্রিকা ইন্ডিয়ান মিররের সম্পাদক নরেন্দ্রনাথ সেন।

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, দু হাজার ঊনিশের যে ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় হলো, সেই এক ই ধরণের বিভিন্ন সমাজবিপ্লব, আরো অনেক বেশি বিপদ এবং প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে যাদের কুশীলবদের, ঘটেছিলো আজ থেকে দেড়শো বছরেরও আগে। বেদনার বিষয়, বাঙালির যুক্তিবাদের সেই ঐতিহ্য আমরা ভুলে গেছি। আজ যাঁরা দু হাজার ঊনিশের ওই ঘটনায় পুরুষতন্ত্রের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য ঘটনার নায়ককে বাহবা দিচ্ছেন, তাঁরা কি আদৌ জানেন সেই বেড়া ভেঙে ফেলা হয়েছিল দেড়শো বছর আগেই? বর্তমানের বাঙালি নারীবাদীদের মধ্যে কতজন দুর্গামোহনের নাম আদৌ শুনেছেন সে নিয়ে সম্ভবতঃ তর্কের অবকাশ আছে। কেশবচন্দ্র সেনের মতো যুগন্ধর পুরুষ পর্যন্ত যখন ব্রাহ্ম সমাজের প্রার্থনায় নারী ও পুরুষ আলাদা বসার বিধান দিয়েছিলেন, তখন দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির সাথে জুটি বেঁধে এই দুর্গামোহন’ই আঠেরোশো চুয়াত্তর সালে কেশব সেনের বিরোধিতা করেন এবং মহিলাদের একই শ্রেণীতে বসতে দিতে বাধ্য করেন।

এই যে বাঙালির যুক্তিবাদের এবং প্রগতিশীলতার ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিস্মরণ, এর ফলাফল ঋণাত্মক হতে বাধ্য। আজ যদি জাতিগত ভাবে আমরা আমাদের অতীত জেনে কোনো প্রগতিশীল কাজের প্রশংসা করি, তাহলে আমরা তা করবো এই ভেবে, যে, সেই প্রগতিশীল পদক্ষেপ নেওয়াটাই আমাদের ঐতিহ্য, সুতরাং কাজটি করা স্বাভাবিক ভাবেই উচিৎ। ফলে আমরা যারা সেই কাজকে সমর্থন করবো, তারাও অনেকেই সেই কাজ করতে এগিয়ে যাবো প্রয়োজনে। কিন্তু ইতিহাস বিমুখতা যদি আমাদের পেয়ে বসে, তাহলে কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করার অর্থ দাঁড়াবে হুজুগমাত্র। আমরা পরমুহূর্তে তা ভুলে যাবো, নিজেরা কখনো সেই কাজ করতে এগিয়ে আসবো না, এবং সামান্য প্ররোচনাতেই সেই কাজের উল্টো কাজ করার দিকে ঝুঁকে পড়বো, এমন সম্ভাবনা রয়ে যাবে।

একটি জাতির প্রগতিশীল চরিত্র, অতএব, সেই জাতির যুক্তিবাদের ইতিহাস চর্চা এবং নিজের যাপন প্রক্রিয়ায় তার অনুসরণ, এই দ্বিবিধ কাজের ওপরে নির্ভরশীল। না হলে সমস্তই হুজুগে পরিণত হয়, এবং রাষ্ট্রের পক্ষে অতি সহজ হয় নাগরিকের ওপরে যে কোনো অবিজ্ঞানমনস্ক অনুশাসন চাপিয়ে দেওয়া।

বিজ্ঞানমনস্কতার কথা খুব স্বাভাবিকভাবেই এই আলোচনায় আসে, কারণ বিজ্ঞানমনস্কতা যুক্তিবাদের নিয়ন্ত্রিত চর্চা বই কিছু নয়। বিজ্ঞানসংক্রান্ত চর্চার আলোচনায় আমরা যে প্রাথমিক ভুলটি করে থাকি, তা হলো বিজ্ঞানচর্চা কে শুধুমাত্র একধরণের পেশা ভেবে নেওয়া। বিজ্ঞানচর্চার সাথে যুক্তিবাদের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক নিয়ে তাই আমরা মাথা ঘামাই না তেমন। তাই চন্দ্রযানের উৎক্ষেপণের আগে মন্দিরে গিয়ে পুজো দেন ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (ইসরো, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত প্রধান সরকারি সংস্থা) সর্বাধ্যক্ষ, এবং সস্ত্রীক ভারতের রাষ্ট্রপতি। শ্রীহরিকোটা থেকে রিস্যাট-২বি উপগ্রহ নিয়ে ইসরোর রকেট পিএসএলভি-সি৪৬ মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার আগে ইসরোর সর্বাধ্যক্ষ ছোটেন তিরুপতি বেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে, পিএসএলভি-সি৪৬ রকেটের প্রতিরূপ মন্দিরের দেব-বিগ্রহের পায়ের কাছে রেখে বিশেষ পুজোর আয়োজন করতে। ইসরোর মহাকাশযান উৎক্ষেপণ কক্ষটি, সতীশ ধবন স্পেস সেন্টার যার নাম, তার মিডিয়া সেন্টার – তৈরী হয় বাস্তুশাস্ত্র (বাস্তুশাস্ত্রর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, এটি একটি অপবিজ্ঞান) মেনে। মঙ্গলগ্রহে রকেট পাঠানোর প্রকল্প `মঙ্গলায়ন’ এর উৎক্ষেপণ সময় ঠিক করা হয় কেরালার এক জ্যোতিষীর মত অনুসারে পঞ্জিকা মেনে যাতে রাহুর দৃষ্টি থেকে মুক্তি পেয়ে সাফল্য লাভ করে এই প্রকল্প, এবং সেই রকেট ওড়ানোর আগে তার মিনিয়েচার মডেল নিয়ে তিরুপতির স্বামী ভেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে পুজো দিয়ে দেবতার আশীর্বাদ চাইতে যান ইসরোর র সর্বাধক্ষ।

যে দেশে কয়েক লক্ষ শিশু অপুষ্টি তে মারা যায়, এক থালা ভাতের বিনিময়ে বিকিয়ে যায় নারীশরীর অথচ গনেশ ঠাকুরের খাওয়ার জন্য দুধের বরাদ্দে হাত পড়েনা কখনো – হাত পড়েনা শিবরাত্রির দিন হাজার হাজার লিটার দুধ প্রাণহীন পাথরের খন্ডের মাথায় ঢেলে অপচয় করার, যে দেশে বাবা, গুরু, এবং তাঁদের চ্যালাদের কথায় ওঠবোস করেন দেশ ও মানুষের ভাগ্যনিয়ন্তা রাজনীতিবিদ রা, সেই দেশে, সেই দুর্ভাগা দেশে, জনসাধারণের করের পয়সা ব্যবহার করে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার অশ্লীল প্রক্রিয়া রমরম করে চলা সেই ঘৃণ্য ও নির্লজ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থায় – বিজ্ঞানকে পেশামাত্র হিসেবে দেখার বদলে মানুষের মধ্যে প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতা, অর্থাৎ যুক্তিবাদ, গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।

দুঃখের বিষয়, বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় সেভাবে গুরুত্ব পায়না, পায়ওনি কোনোদিন। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠক্রম পর্যন্ত যত জীবনী আমরা পড়ি বিজ্ঞানীদের, বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা করেছেন সেরকম মানুষের জীবনী, তুলনায়, আমরা পড়ি না বললেই চলে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা এবং আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু সাধারণভাবে শিক্ষিত বাঙালির আইকন আধুনিক ভারতের বৈজ্ঞানিক হিসেবে। আমরা তাঁদের জীবনী পাঠক্রমের ভিতরে এবং বাইরে (ছোটদের জন্য বিজ্ঞানীর জীবনী গ্রন্থমালা ধরণের বইতে) পড়ে থাকি, তাঁরা বহুল পরিচিত ও চর্চিত চরিত্র, বাংলা ভাষায় লেখা অজস্র বই আছে তাঁদের নিয়ে। কিন্তু প্রফুল্লচন্দ্র রায় কে নিয়ে লেখা যেটুকু আছে, সেটুকু তাঁর রসায়ন শাস্ত্রে অবদান নিয়ে। তিনি যে তাঁর সময়ের থেকে বহু এগিয়ে থাকা একজন ছকভাঙা যুক্তিবাদী এবং প্রখর সমাজসচেতন বিজ্ঞানমনস্ক পুরুষ ছিলেন, তা নিয়ে খুব একটা বেশি চর্চা হয় বলে মনে হয় না। আধুনিক ভারতের, অর্থাৎ নবজাগরণ পরবর্তী এবং স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতের বিজ্ঞানীদের নিয়ে লেখার মধ্যে বরং তুলনায় স্বাদেশিকতার সুরটাই প্রকট থাকে। পরাধীন জাতির থেকে এই অভিগমন হয়তো স্বাভাবিক, উনিশশো এগারো সালে মোহনবাগানের শিল্ড জয় আর জগদীশচন্দ্রের রয়েল সোসাইটি তে বক্তৃতা দিয়ে `সাহেব’ দের মুগ্দ্ধ করে দেওয়ার উপাখ্যান তাই একইসুরে বর্ণিত হয় সাধারণত।

এই জাতীয়তাবাদের প্রবল আস্ফালনে যুক্তিবাদের মূল ধারাটি হারিয়ে গেছে সম্ভবতঃ। সত্যেন্দ্রনাথ, মেঘনাদ, জগদীশচন্দ্র র জীবনীর ভিড়ে আজ পর্যন্ত জায়গা করে নিতে পারলেন না মহেন্দ্রলাল সরকার। অথচ, নবজাগরণ-উত্তর বাংলায় তাঁর থেকে বড় যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ আর কেই বা জন্মেছেন? পরাধীন ভারতে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রকৃত দিশারী বলতে মহেন্দ্রলাল কেই বোঝায়। বাঙালির অনন্ত দুর্ভাগ্য, আধুনিককালে বাংলা ভাষায় মহেন্দ্রলাল কে নিয়ে লেখা পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ মাত্র দুটি [১৩ক-১৩খ], তার মধ্যে একটিতে প্রধানতঃ শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ভূমিকার ওপরেই জোর দেওয়া হয়েছে, মহেন্দ্রলালের বিজ্ঞানমনস্কতার ওপরে নয়। এই দুটি বই ছাড়া, ইতস্তত ছড়ানো কয়েকটি জীবনিসঙ্কলন ধরণের বাংলা বইয়ে মহেন্দ্রলালের ওপরে কয়েক পাতা খরচ করা হয়েছে। ব্যাস, এইটুকুই।

যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা থেকে উৎসারিত হয় মানবতার ফল্গুধারা, যার অন্যতম অভিক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায় নারীপ্রগতির বিষয়ে মহেন্দ্রলালের চিন্তাভাবনায়। দুর্গামোহন দাসের কন্যা অবলা (পরবর্তী কালে লেডি অবলা বসু, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর পত্নী) প্রথম বাঙালি মহিলা হিসেবে ডাক্তারি পড়তে শুরু করেন মাদ্রাজে। তাঁকে ডাক্তারি পড়তে পাঠানোর ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন মহেন্দ্রলাল। অবলাদেবী যদিও দ্বিতীয় বছরের পর আর পড়েননি, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ই প্রথম ডাক্তারি পাশ করা বাঙালি মহিলা। কাদম্বিনীর ডাক্তারি পড়ার ব্যাপারেও মহেন্দ্রলালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ভূমিকা আছে সরলা দেবীর পদার্থবিজ্ঞান পড়ার ব্যাপারেও। রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করতে চেয়েছিলেন। সেইসময়ে কলকাতার কোনো কলেজে মেয়েদের বিজ্ঞান পড়ানোর উপযুক্ত পরিকাঠামো ছিল না। মহেন্দ্রলাল সরলা কে নিয়ে যান তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সে। সেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার ইউজিন ল্যফোঁ’র তত্বাবধানে সরলা পদার্থবিদ্যার চর্চা শুরু করেন। সরলা পরে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন বেথুন কলেজ থেকে।

আজ যেখানে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানে মহিলাদের অবদান নিয়ে চর্চা চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে, সাধারণভাবে ভারতীয় নারীবাদ চর্চায় মহেন্দ্রলালের (এবং সরলা ও স্বর্ণকুমারীর ও) প্রায় কোনো উল্লেখ ই না থাকা দুর্ভাগ্যজনক।

মহেন্দ্রলালের সঙ্গেই নাম করতে হয় অক্ষয়কুমার দত্তের। এককালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত বাঙালির বিজ্ঞান মানসিকতার ব্যাপ্তি ঘটাতে সর্বশক্তি ব্যায় করেছিলেন। তিনি ই প্রথম বাংলাভাষায় বিজ্ঞানসংক্রান্ত লেখালেখি শুরু করেন। সমাজ এই দুজনের ওপরেই খড়গহস্ত ছিলো। তবে মহেন্দ্রলাল এবং অক্ষয়কুমার দুজনেরই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচর্চার বিষয়ে আমাদের সবার ই অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। কিন্তু ক’জন জানি যে তাঁর দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর বিপুল অবদান আছে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় এবং বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ প্রচারে ? একশো বছরের ও বেশি অবহেলিত থাকার পর সাহিত্য সংসদ সম্প্রতি ওঁর যাবতীয় বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা (প্রধানত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞান বিষয়ক) একত্র করে `স্বর্ণকুমারী দেবীর বিজ্ঞানরচনা সংগ্রহ’ শীর্ষক বইটি প্রকাশ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, দেবেন ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পরিচালনায় `বালক’ নামে যে ছোটদের পত্রিকা বেরোতো, সেখানে ঠাকুরবাড়ির আরেক বধূ নরেন্দ্রবালা দেবী বিজ্ঞান বিষয়ে লিখতেন। সম্ভবত সেগুলিই প্রথম বাংলা ভাষায় ছোটদের জন্য বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা [১৪]।

মহেন্দ্রলাল, অক্ষয়কুমার, স্বর্ণকুমারী, পারুলবালা, এবং এরকম আরো অনেককে আত্মবিস্মৃত বাঙালি মনে রাখেনি। আমাদের মনে রাখানো হয়নি। যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানচেতনার যে দীপটি এঁরা জ্বালিয়েছিলেন, তার আলোয় চেতনা আলোকিত করতে পারিনি আমরা। সেই নিভে যাওয়া, বা অকালে ক্ষীণ হয়ে যাওয়া দীপশিখা, শাসক কে সাহায্য করেছে অতিমারীর ক্রান্তিকালে অবৈজ্ঞানিক অনুশাসন চাপিয়ে দিতে। প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্কতার অভাবে, তলস্তয় যেমন লিখেছিলেন, নাগরিকসমাজের অজ্ঞতা আজ রাষ্ট্রের হাত শক্তিশালী করেছে।

বিজ্ঞানমনস্কতা এবং যুক্তিবাদ সমার্থক, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। বিজ্ঞান শিক্ষা শুধুমাত্র একটি ভালো মাইনের চাকরি পাওয়ার জন্য পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার জন্য নয়, তার প্রয়োজন প্রকৃত চেতনার উন্মেষ ঘটাতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের শোষণ রোধ করতে। শিক্ষার বুনিয়াদি স্তর থেকে তাই বিজ্ঞান কে শুধু মাত্র কিছু তথ্যের সমাবেশ হিসেবে না পড়িয়ে, পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বিজ্ঞানের দর্শন এবং বিজ্ঞানের ইতিহাস, যা কিনা, প্রকারান্তরে, বিজ্ঞানচেতনার উন্মেষের ইতিহাস। বাঙালীর নবজাগরণের ইতিহাস পড়ানো প্রয়োজন সেই সূত্রে। পাঠ্যসূচির এবং শিক্ষাক্রমের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। একমাত্র এভাবেই আমরা প্রতিহত করতে পারি ভারতীয় ঐতিহ্য বলে তুলে আনা `ব্যাদে সব আছে’ [১৫] র পদাঙ্ক অনুসরণ করে দুহাজার কুড়ি সালে বসেও রাষ্ট্রের দ্বারা অনুমোদিত অপবিজ্ঞানের চর্চা, যেখানে রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী বাসুদেব দেবনানি বলতে পারেন নিউটন নয়, তার এক হাজার বছর আগেই ব্রহ্মগুপ্ত মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন এবং স্কুল লেভেলের পাঠ্যপুস্তকে সেই তথ্য ঢোকানোর দাবি জানাতে পারেন। এমনকি এ’ও বলতে পারেন গরুই একমাত্র প্রাণী যা অক্সিজেন ত্যাগ করে নিঃশ্বাসের সাথে। অন্য পরে কা কথা, স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান ই বেদের যুগে প্ল্যাস্টিক সার্জারির বিধান আওড়াতে দ্বিধাবোধ করেন না `ভারতীয় ঐতিহ্যের’ প্রচারে।

এই অপবিজ্ঞানই যে ভারতীয় ঐতিহ্য নয়, বরং ভারতীয় ঐতিহ্যের মূলসুর হিসেবে যে প্রখর যুক্তিবাদ আবহমান কাল ধরেই ছিলো – চার্বাক ও লোকায়ত বস্তুবাদ [১৬-১৮] অনুসরণে সেই সত্য তুলে ধরতে গেলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরে যুক্তিবাদের প্রবর্তন প্রয়োজন। তার জন্য যেমন বিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমে বিজ্ঞানমনস্কতা চর্চার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তৃণমূল স্তরে যুক্তিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটানো গণবিজ্ঞান আন্দোলন ইত্যাদির মাধ্যমে। না হলে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ প্রকৃতই অন্ধকার। রাত্রি ন’টার সময় নয় মিনিট মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই অন্ধকার দূর করা তো দূরস্থান, তাকে আরো নিকষ কালো’ই করে দেওয়া হবে।

এ অন্ধকার বহুবছরের সঞ্চিত অন্ধকার। আলো জ্বালানোর কাজটি সহজ নয় ফলত। তাড়াহুড়োর ও নয়। চটজলদি কোনো সমাধান নেই। বরং সেভাবে চেষ্টা করলে ফল উল্টো হতে পারে। সাধারণ মানুষকে যুক্তিবাদ ও নাস্তিকতার (প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যার চর্চা একান্ত প্রয়োজন) শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর প্রক্রিয়াটি বহুমাত্রিক। শুধু যে ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী লড়াই জারি থাকবে সেই প্রক্রিয়ায় তা নয়, থাকবে বহু শতাব্দীর লোকায়ত ধর্ম এবং কৃষ্টি থেকে সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব বার করে আনার প্রচেষ্টা। দ্বিতীয় কাজটি করতে হবে অত্যন্ত সাবধানে – লোকসংস্কৃতি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। লোকায়ত সংস্কৃতিতে শুভশক্তি, পুজো এবং উত্সব একাকার হয়ে আছে স্মরনাতীত কাল থেকে। হয়তো একদিন তারা বুঝতে পারবে প্রাতিষ্ঠানিক, পুত্তলিকামূখী, বা নিরাকার ধর্মের অসারতা । আল্লা ভগবান কাউকেই আর প্রয়োজন হবে না সেদিন । কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসার আগে লোকসংস্কৃতি কে ঘাড় ধরে হুকুম করে বস্তুবাদ শেখাতে গেলে বিপদ আছে। এ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে ধর্মব্যবসায়ীদের ঘৃণা করতে হবে – নিপীড়িত, ধর্মাচরণ করা, সাধারণ মানুষদের না।

ধর্ম নিপীড়িত জনগনের আফিম – বলেছিলেন মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক মহৎ চিন্তক [১৯]। আফিম উৎপাদকদের ঘৃণা করতে গিয়ে নিপীড়িত জনতাকেই দেগে দেবো অশিক্ষিত ধার্মিক বলে, এই অমার্জিত ঔদ্ধত্য দেখালে সাধারণ মানুষ দূরেই সরে যাবে আরো, এবং রাষ্ট্রের সুবিধা হবে তাদের টেনে নিতে নিজের তাঁবেতে। এলিট নাস্তিক বা যুক্তিবাদী সাজার উন্নাসিকতায় সেই ভুলের ফাঁদে পা বাড়ালে সর্বনাশ ত্বরান্বিত হবে। আমাদের বুঝতে হবে জনগনেশের ওপরে জোর খাটালে তাদের ছোট করা হয়। আমরা যদি তাদের মূর্খ ভেবে ‘শেখাতে ‘ যাই, তাহলে সেই ডিসক্রিমিনেশনাল প্রক্রিয়ায় গুরুবাদের আঁশটে গন্ধ লেগে থাকবে । প্রকৃত সাম্যবাদীর সে রাস্তায় হাঁটা ঠিক হবে না । লোকসংস্কৃতির অভিমুখ ঘোরানো পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের একটা । রূঢ় হলে, ছোটো করলে জনগন কে, বিরূদ্ধবাদীর ই হাত শক্ত হয়। দিনের শেষে আমরা জনগণের গুরু নই, সাথী। এটা ভুললে সমস্যা আছে। একজন প্রকৃত মানবতাবাদী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কর্তব্য প্রথমে নিজের যাপন কে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা, তারপর জনসাধারণকে মমতার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের, অন্ধবিশ্বাসের, অপবিজ্ঞানের এবং কুযুক্তির অসারতা বোঝানো। মানুষের প্রতি রূঢ় হলে তারা আতংকিত হবে । বিরুদ্ধবাদ লুটে নিয়ে যাবে নাগরিক আনুগত্য।

`অল অজলু মিনা শয়তান!’ – ফারসি তে এক প্রবাদ আছে, অর্থ হলো `অতি দ্রুত চলা মানে শয়তানের রাস্তায় চলা ‘ [২০]। এই প্রবাদ প্রতি মুহূর্তে মাথায় রাখতে হবে তৃণমূল স্তরে যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা চারিয়ে দেওয়ার সময়, কারণ আমাদের কাজ করতে হবে এমন সমস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে যারা বহু শতাব্দী বঞ্চিত শিক্ষার আলোক থেকে। সেই অজ্ঞানতা তাঁদের ইচ্ছাকৃত সীমাবদ্ধতা নয়। তাঁরা বংশানুক্রমে রাষ্ট্রের দ্বারা শোষিত। তাঁদের কাছে শিক্ষার আলো যাতে না পৌঁছয় সে ব্যাপারে রাষ্ট্র সবিশেষ সচেতন থেকেছে ক্ষমতার স্বার্থে। সেই জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করতে গেলে অনন্ত ধৈয্যের প্রয়োজন।

সুফী সাধকরা লোকশিক্ষার জন্য অসংখ্য ছোট গল্পর প্রবর্তন করে গেছেন। সুফী দরবেশদের হালকা চালে বলা সেই গল্পগুলোর মধ্যে গভীর মানবতাবোধ এবং জটিল মানব মনস্তত্ত্বের সারাৎসার লুকিয়ে আছে। এরকম ই একটি গল্প, আশির দশকের গোড়ার দিকে, `তরমুজ শিকারী’ নামে বাংলা ভাষায় বেরিয়েছিল `অমর চিত্র কথা` সিরিজের কমিক্সে। ইংরেজিতে গল্পটি দ্য ওয়াটারমেলন হান্টার, কোথাও বা আবার দ্য গ্রেট ওয়াটারমেলন স্লেয়ার [২১] নামে পরিচিত। গল্পটা এরকম :

কোন এক গ্রামের মানুষ কখনো তরমুজ দেখেনি। কোনো এক সময় পাখির মুখ থেকে এসে পড়া বীজে সেই গ্রামের এক ক্ষেতে বিশাল বিশাল তরমুজ ফললো। গ্রামের মানুষ সেই দেখে ভয়ে আঁতকে উঠলো। তরমুজগুলোকে ভাবলো রাক্ষস ! তারা সেই ক্ষেতের ধারে কাছে যেতোনা ভয়ে। ইতিমধ্যে একদিন গ্রামের বাইরে থেকে একজন ঘুরতে ঘুরতে সেই গ্রামে এলো। সেই লোকটি তরমুজ আগে দেখেছে। তরমুজ কে ভয় পেতে দেখে সে গ্রামবাসীদের মূর্খ বলে উপহাস করে, তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ছুরি দিয়ে তরমুজ কেটে খেতে লাগলো। সেই দেখে গ্রামবাসীরা প্রচন্ড ভয় পেয়ে ভাবলো, যে রাক্ষস কে কেটে খেতে পারে সে তো তাদের ও খেয়ে নেবে! দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা সেই বহিরাগতকে পিটিয়ে মেরে ফেললো। কদিন বাদে এক সুফী সাধক সেই গ্রামে এলেন। তিনি তরমুজ কি তা জানতেন। এবং বুঝতেন মানবচরিত্র ও। তিনি তাই আগের মানুষটির মতো বোকামো করলেন না। তার বদলে গ্রামবাসীদের নিয়ে, যেন খুব ভয় পেয়েছেন, সেভাবে পা টিপে টিপে তরমুজের ক্ষেতের দিকে এগোলেন। তারপর সবার সাথে ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে এলেন। দ্বিতীয় দিন আবার সেভাবে গেলেন সবাইকে নিয়ে, কিন্তু এবারে তরমুজের দিকে, আগের দিনের থেকে বেশি এগোলেন, এবং দৌড়ে পালিয়ে আসার সময় আগের দিনের থেকে কম দূরে পালিয়ে গেলেন। গ্রামবাসীরাও তাঁর সাথে সাথে তাই ই করলো। এইভাবে এক এক দিন করে আস্তে আস্তে তরমুজের দিকে আরো আরো এগোতে এগোতে শেষে তিনি গ্রামবাসীদের সাথেই তরমুজ কেটে খেলেন। তরমুজ খেতে খেতে গ্রামবাসীরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে লাগলো এই বলে, যে – ইশ! তারা কি বোকা ছিল এতদিন, খাওয়ার জিনিটাকে রাক্ষস ভাবছিলো!

এই গল্পের অভিঘাত সুদূরপ্রসারী। মানবমনের অতলান্ত জটিলতা, অজানা জিনিসের প্রতি ভীতি, এবং শেষে তাকে জয় করা – এই গল্পের মুখ্য উপজীব্য। মানুষকে তাদের জায়গায় দাঁড়িয়েই বুঝতে হবে, নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নয়, বা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে চাওয়া হচ্ছে সেই ফাইন্যাল ডেস্টিনেশনে দাঁড়িয়ে নয় – একমাত্র তাহলেই মানুষকে উত্তরণের রাস্তায় পথিক করে নেওয়া যাবে। এই সরল সত্যকেই বোঝান হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সুফী গল্পের মধ্যে দিয়ে। মনোচিকিৎসায়, ধীরে ধীরে বিশ্বাস অর্জন করে রোগীর বিভিন্ন ধরণের ভয় (ফোবিয়া) ভাঙ্গাতে এই গল্পে বর্ণিত দর্শনের বিশেষ ভূমিকা আছে [২২]।

যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্কতা সমাজের প্রতিটি মানুষের অন্তরে বুনে দিতে গেলে গল্পের ওই সুফি সাধকের মতোই এগোতে হবে, বহিরাগতর মতো না। মনে রাখতে হবে, নিজেকে এলিট যুক্তিবাদী ভেবে, লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়া বা তুষ-তুষলীর ব্রত [২৩] করা সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্গ করলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমিত সংখ্যক কিছু পিঠ চাপড়ানি পাওয়া যেতে পারে বটে, কাজের কাজ কোনোদিন ই কিছু হবে না। এই তথাকথিত `এলিট নাস্তিকতা’ নির্বোধের দর্শন। তা অকর্মণ্যের দর্শন ও বটে – কারণ মানুষকে নিরন্তর বুঝিয়ে মাঠে নেমে কাজ করার বদলে, সেখানে নিজেকে উচ্চাসনে বসিয়ে চটজলদি সমস্যা সমাধান করার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। মার্ক্সবাদী দার্শনিক নিকোলাই বুখারিন এবং অর্থনীতিবিদ ইয়েভগেনি প্রেরোব্রাঝেনস্কি তাঁদের বইয়ে [২৪] ধর্মাচরণ করা সম্পর্কে যথেষ্ট কঠোর মনোভাব পোষণ করে বলেছেন `কম্যুনিজম ইজ ইনকম্প্যাটিবল উইথ রিলিজিয়াস ফেথ’। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, সাধারণ মানুষকে কি ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বেড়াজাল থেকে সরিয়ে আনতে হবে সেই প্রক্রিয়া বিষয়ে তাঁরা যথেষ্ট ধৈর্য্যশীল এবং সহানুভূতিশীল হতে বলেছেন, এবং তাঁদের প্রতি রূঢ় বা ব্যাঙ্গাত্মক ব্যবহার কি ভাবে মানুষকে দূরে ঠেলে দেবে সে বিষয়ে সাবধান করেছেন:

`But the campaign against the backwardness of the masses in this matter of religion, must be conducted with patience and considerateness, as well as with energy and perseverance. The credulous crowd is extremely sensitive to anything which hurts its feelings. To thrust atheism upon the masses, and in conjunction therewith to interfere forcibly with religious practices and to make mock of the objects of popular reverence, would not assist but would hinder the campaign against religion. If the church were to be persecuted, it would win sympathy among the masses, for persecution would remind them of the almost forgotten days when there was an association between religion and the defence of national freedom; it would strengthen the antisemitic movement; and in general it would mobilize all the vestiges of an ideology which is already beginning to die out.’ [২৫]

মানবতাবাদ, সুতরাং শেষ কথা। শেষ কথা সংবেদনশীলতা, বিনয়, সহনশীলতা, ধৈর্য্য, পরিশ্রম। এবং অবশ্যই, আত্মত্যাগ! একমাত্র তাহলেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে সাধারণ মানুষের কাছে। সম্ভব হবে প্রকৃত জনজাগরণ। যুক্তিবাদ এবং বৈজ্ঞানিকমনস্কতার আলোকে সেদিন হাওয়ায় উড়ে যাবে রাষ্ট্রের অন্ধকার অনুশাসন, ক্ষমতার অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা। `এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’ [২৬]।

আমরা কি পারবো না, সেই `ক্লান্তিহীন নাবিকের হাত’ গড়ে দিতে?

——————
তথ্যপঞ্জী ও টীকা
—————–

[১] `Doctor in Odisha asked to vacate flat, threatened with rape over Covid-19 fear’. The Times of India, Bhubaneswar, March 29, 2020.

[2] বার্গম্যান প্রকাশনী, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬৭ সংস্করণ। এছাড়াও অন্যান্য প্রকাশকের তরফ থেকে ছাপা অন্যান্য সংস্করণ ও আছে। এই বইয়ের রচনাগুলি প্রথম সংকলন করা হয় টমাস ওয়াই করোয়েল এন্ড কোম্পানির আঠেরোশো নিরানব্বই সালের কপিরাইটকৃত তলস্তয়ের রচনাবলী থেকে।

[৩] চিঠিটি লেখা হয়েছিল আঠেরোশ ছিয়ান্নব্বই খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে অগাস্ট। তলস্তয় বিশেষজ্ঞ, এবং ওঁর প্রায় সমস্ত লেখার সম্পাদক, ভ্লাদিমির গ্রিগোরিয়েভিচ চার্টকোভ আঠেরোশো সাতানব্বই সালে সেটির ইংরেজি অনুবাদ লন্ডনে প্রকাশ করেন। উনিশশো সতেরো সালে একটি চটি বইয়ের আকারে চিঠিটির বয়ান রাশিয়ায় প্রকাশিত হয়।

[৪] `এপোলোজি (অফ সক্রেটিস)’, তিনশো নিরানব্বই খ্রিস্টপূর্বাদে প্রকাশিত সক্রেটিসের বিচারের সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি যা বলেছিলেন তার ওপরে ভিত্তি করে প্লেটোর লেখা।

[৫] এমেরিক্যান দার্শনিক হেনরি ডেভিড থরো র লেখা প্রবন্ধ `সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ আঠেরোশো ঊনপঞ্চাশ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রথমে এর নাম ছিল `রেজিস্টেন্স টু সিভিল গভর্নমেন্ট’।

[৬] ঊনবিংশ শতকের বিশিষ্ট ব্রিটিশ চিন্তক জন রাস্কিনের লেখা প্রবন্ধ `আনটু দ্য লাস্ট’ আঠেরোশো ষাট খ্রিস্টাব্দে কর্নহিল পত্রিকায় চারটি পর্বে প্রকাশিত হয়। পরে বই হিসাবে প্রকাশিত হয় আঠেরোশো বাষট্টি খ্রিস্টাব্দের মে মাসে।

[৭] Article 6(a) of the INSTRUCTIONS FOR SATYAGRAHIS IN TERMS AND IN VIRTUEOF THE RESOLUTION OF THE COMMITTEE OF THE SABHAPASSED ON THE 15TH JUNE ’19 – Instructions for Satyagrahis, June 30, 1919, Unpublished, Mumbai, M. K. Gandhi.

[৮] S. D. Serebriany, `A letter to (Russian) liberals (1896): Lev Tolstoy’s text which is little known yet in Russia’, RSUH/RGGU BULLETIN Series Philosophy, Social Studies, Art Studies, 2017; (4/2): 252-260।

[৯] উদাহরণ হিসেবে, বারোই নভেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে হাওড়া ও হুগলি জেলা বিভাগে শ্রী প্রকাশ পালের লেখা প্রতিবেদন টি পড়ে দেখা যেতে পারে।

[১০] `.. broke patriarchy with social media post to marry off his widowed mother’, Get Bengal অনলাইন নিউজ পোর্টালে ১৪ ই নভেম্বর প্রকাশিত এই বিষয়ে প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো এটি।

[১১] `দ্য ব্রাহ্ম মুভমেন্ট ইন বরিশাল, আ ক্রিটিক্যাল স্টাডি’, কানাইলাল চট্ট্যোপাধ্যায়, প্রসিডিংস অফ দ্য ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, ১৯৯৪, পঞ্চান্নতম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৯৫।

[১২] `হিস্ট্রি অফ দ্য ব্রাহ্ম সমাজ’, প্রথম (১৯১১) ও দ্বিতীয় (১৯১২) খন্ড, শিবনাথ শাস্ত্রী, আর চ্যাটার্জি, ২১০/৩/১ কর্নওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা, থেকে প্রকাশিত।

[১৩] (ক) `জাতীয় বিজ্ঞানচর্চার জনক মহেন্দ্রলাল সরকার’, চিত্তব্রত পালিত, কৃতি প্রকাশনী, ২০১৪।
(খ) `শ্রীরামকৃষ্ণের ডাক্তার মাহেন্দ্রলাল সরকার’, ডক্টর জলাধিকুমার সরকার, উদ্বোধন কার্যালয়, কলিকাতা।

[১৪] `ঠাকুরবাড়ির বিজ্ঞানভাবনা’, পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, পারুল প্রকাশনী।

[১৫] মেঘনাদ সাহা উবাচ। ঢাকার আইনজ্ঞ অনিলবরণ সাহার বক্তব্যের বিরোধিতায় ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে মেঘনাদ সাহা এই উক্তির উল্লেখ করেন `একটি নতুন জীবন দর্শন’ নামক প্রবন্ধে, যা তেরোই নভেম্বর উনিশশো আটত্রিশ সালে মাসিক ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মেঘনাদ সাহা বিদেশ থেকে ঢাকা ফিরে আসার পর ঢাকার এই আইনজীবী কার্যপ্রসঙ্গে তাঁর সাথে দেখা করেন এবং কথাপ্রসঙ্গে বলেন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচর্চা অর্থহীন, কারণ আধুনিক বিজ্ঞানবিষয়ক সমস্ত কিছুই বেদে বলা আছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, যাবতীয় শাস্ত্রাজ্ঞার `বিজ্ঞানসম্মত’ ব্যাখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টার শুরু সম্ভবতঃ অবিভক্ত বাংলায় ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের হাত ধরে নব্যহিন্দুত্ববাদ চর্চার সময়। কাশিমবাজারের রাজার সভাপন্ডিত শশধর তর্কচূড়ামনি (১৮৫০-১৯২৮) এই ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক (pseodu-science) মত প্রচারে অগ্রণী ছিলেন। তাঁর সাথে যোগ দেন কৃষ্ণপ্রসন্ন সেন, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব প্রমুখ তৎকালীন গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীরা। তর্কচূড়ামণির যাবতীয় `বিজ্ঞানসম্মত’ ব্যাখ্যা একত্র করে, আঠেরোশো চুরাশি – পঁচাশি খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পাঁচখন্ডে `ধর্মব্যাখ্যা’ নামে বই প্রকাশ করেন ভূধর চট্যোপাধ্যায়।

[১৬] `লোকায়ত, আ স্টাডি ইন এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান মেটেরিয়ালিজম’, দেবীপ্রসাদ চট্যোপাধ্যায়, প্রথম সংস্করণ, ১৯৫৯, পিপল’স পাবলিশিং হাউস, নিউ দিল্লী।

[১৭] বাংলায় – `লোকায়ত দর্শন, দেবীপ্রসাদ চট্যোপাধ্যায়, প্রথম প্রকাশ অগাস্ট ১৯৫৬, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা।

[১৮] `চার্বাক দর্শন’, লতিকা চট্টোপাধ্যায়, প্রথম প্রকাশ জুলাই, ১৯৮২, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা।

[১৯] `Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people.’ – কার্ল মার্ক্স, `ক্রিটিক অফ হেগেলস ফিলোজফি অফ রাইট, ১৮৪৩।

[২০] `দেশে বিদেশে’, সৈয়দ মুজতবা আলী , প্রথম প্রকাশ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ।

[২১] `টেলস অফ দ্য দরবেশেস: টিচিং স্টোরিস অফ দ্য সুফী মাস্টার্স ওভার দ্য পাস্ট থাউজ্যান্ড ইয়ার্স’, ইদ্রিশ শাহ, ই পি ডাটন এন্ড কোম্পানি ইনকর্পোরেটেড, নিউ ইয়র্ক, ১৯৬৯।

[২২] `এডভ্যান্সড টেকনিকস ফর কাউন্সেলিং এন্ড সাইকোথেরাপি’, ক্রিশ্চিয়ান কন্টি, ২০০৯, নিউ ইয়র্ক, স্প্রিঙ্গার পাবলিশিং কোম্পানি।

[২৩] `বাংলার ব্রতকথা’, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার।

[২৪] `দ্য এবিসি অফ কম্যুনিজম’, মূল রাশিয়ান `আজবুকা কম্যুনিজমা’, ইডেন এবং সিডার পল দ্বারা ইংরেজি তে অনূদিত, ১৯২২ সালে গ্রেট ব্রিটেনের কম্যুনিস্ট পার্টির কার্য্যালয় থেকে প্রকাশিত, মূল রাশিয়ান বইটি ১৯২০ তে প্রকাশিত।

[২৫] উপরে বর্ণিত `দ্য এবিসি অফ কম্যুনিজম’ পুস্তকের `কম্যুনিজম এন্ড রিলিজিয়ন’ শীর্ষক একাদশ অধ্যায়ের অংশবিশেষ।

[২৬] `সুচেতনা’, বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের অন্তিম কবিতা, জীবনানন্দ দাশ, প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ১৯৪২।

[লেখক – ভারত সরকারের পরমাণু শক্তি গবেষণা বিভাগে কর্মরত মহাকাশবিজ্ঞানের অধ্যাপক।]

Facebook Comments

3 thoughts on “এই পথে আলো জ্বেলে… : তাপস কুমার দাস Leave a comment

  1. অসম্ভব ভালো লেখা। প্রচুর তথ্য, তবে তা ভারে না কেটে ধারে কাটে। এই অন্ধকার সময়ে এ লেখার বহুল প্রচার হোক।

  2. অসাধারণ তথ্য সমৃদ্ধ লেখা, সাধারণের মধ্যে চাই এর ব্যাপক প্রচার।

  3. লেখকের পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত, এবং তার যথেষ্ট প্রতিফলন ওনার লেখার প্রতি ছত্রে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমার একটি খুবই বিনীত বক্তব্য আছে। আজকে এই অতিমারীর পরিবেশে, সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা যখন এই সংক্রমণের উৎস সন্ধান ও তার চিকিৎসার বিবিধ চেষ্টা করে চলেছেন, এবং মোটামুটি ভাবে ধরে নেওয়া যায় যে এই রোগ প্রতিরোধের vaccine অন্ততঃ এক বা দেড় বছরের আগে বেরোবে না, যখন রাষ্ট্র নেতারা ও সরকার বাবাহাদুরের বিদ্বগ্ধ অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা সবাই কিংকর্ত্যব্য বিমূঢ়, যখন সরকারী হাজার আশ্বাস সত্বেও PDS কার্য্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে, যখন হতাশায় জ্ঞানশূন্য হয়ে উত্তর প্রদেশের এক মা তার পাঁচ শিশু কে গঙ্গায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, তখন মানুষের সকরুণ বিশ্বাস, মন্দিরে, মসজিদে তার আকুল প্রার্থনাই তার এক মাত্র সম্বল। সান্ত্বনা। থাক না তারা এই টুকু নিয়ে। যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের আস্ফালন না হয় তত দিন মুলতুবি থাক যতদিন তারা জানছে যে বিজ্ঞানীরা টিকা বের করে ফেলেছে, আর তাদের আস্তাকুঁড়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকতে হবে না, তারা স্বাধীন। তারা আবার তাদের জীবন ধারণের প্রয়োজনে রাস্তায় নামতে পারবে। যুক্তি তক্কো শিক্ষিত লোকজনের জন্য। অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষত জন সাধারণের কাছে তাদের বিশ্বাসই অবলম্বন। আমাদের রাষ্ট্র নেতারা সে বিষয় বিশেষ ওয়াকিবহাল।

Leave a Reply