মরীচিকায় আলোর উৎস সন্ধান : তপতী দত্ত

fail

আজ এই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিপর্যের দিনে কিছু ভালোলাগা মুহূর্তকে যদি জোর করে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখা যেত তবে বেশ হতো। আজ আমরা শারীরিকভাবে সমাজে একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টায় মেতেছি। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বোধহয় তা নয়। আচ্ছা শেষ কবে আমরা এমনভাবে ঘরের ভিতরে একে অপরের সাথে একসাথে সময় কাটিয়েছি, মনে পড়ে? না মনে পড়ে না, কারণ সত্যিই আমরা এভাবে কোনোদিন সময় কাটাইনি।

আমরা এখন বাড়িতে সবাইমিলে গল্প করছি,টিভি দেখছি , পেপার পড়ছি, অনেক দিন আগে পড়া পুরনো বইকে আবার নামিয়ে ভালো লাগা জায়গাগুলোয় আবার চোখ বোলাচ্ছি, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি, আবার তুমুল কথাকাটাকাটির সাথে জমিয়ে ঝগড়াটাও করছি। ইচ্ছে হলে বিরিয়ানি পোলাও খাচ্ছি, আবার ইচ্ছে হলে সেদ্ধ ভাতও খাচ্ছি । অন্তাক্ষরি খেলছি, ক্যারাম, দাবা, লুডো, তাশও খেলছি। খেলা নিয়ে তুলকালাম করতে করতে কে কাকে চিটিং করলো বলে কান্নাকাটিও হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ধুলো ঝেড়ে হারমোনিয়াম নামিয়ে অনেকদিন পরে গলাটা একটু সেধে নিচ্ছে, কেউ তবলা বা তানপুরা নিয়ে বসছে । কেউ কেউ পুরোনো আলমারির নীচে থেকে ভুলে যাওয়া কবিতার খাতা বের করে হারিয়ে যাওয়া মানুষটার চিন্তায় ব্যাকুল হচ্ছে। কেউবা টবের গাছগুলোকে যত্ন করার সময় পেয়েছে বলে আবার ফুল ফোটানোর খেলায় মেতেছে। কতদিন পরে আবার বিকেলের ছাদে সবাই মিলে চায়ের আড্ডায়। কেউবা আবার পুরোনো রঙ তুলিতে নতুন ক্যানভাস। এমন অজস্র হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিতে আরও একবার নিজের অজান্তে চোখের জলে ভেসে যাওয়া অলস সময়কাল বেয়ে। এগুলো সত্যিই আমরাই করছি। ভীষণ ভীষণ ব্যস্ত সময়ের মানুষ আমরা আজ গৃহবন্দি সময় কাটাচ্ছি আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জনের সাথে। বাবা মা সন্তানের সাথে। এই ভালোলাগার রেশটা বড্ড ধরে রাখতে ইচ্ছে হয়। জানি এর বিপরীত দিকটাও আছে কিন্তু এখন না হয় সেটা নাইবা ভাবলাম। সেটা না হয় অন্য কোনদিন অন্য কোনখানে।

কোভিড-19/ করোনা ভাইরাস। বহুল ব্যবহৃত এই শব্দদুটো আজ সমস্ত পৃথিবীতে আট থেকে আশি সবাই জানে। শুধু জানে বললে সঠিক বলা হবেনা, সমস্ত বিবরণ সহ জানে। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে ২১০ টারও বেশি দেশ এই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই দৈত্য আজ সমগ্র পৃথিবীকে শাসন করে চলেছে। আমার বিশ্বাস প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। পৃথিবীতে সবথেকে বুদ্ধিদীপ্ত প্রজাতি আজ অসহায় বিপন্ন। এই ভাইরাসের দানবীয় আক্রমণে এই মানুষ প্রজাতিটির শারীরিক ও মানসিক দৈনন্দিন জীবন আজ বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত। এমনকি তার বেঁচে থাকাটাই একটা বিশাল প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে । সমস্ত শ্রেণীর মানুষই এক বোবা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। উচ্চ নীচ ভেদাভেদহীন ভাবে। না, কোন অর্থনৈতিক বিপন্নতার কথা বলছিনা। আমরা সবাই সেটা জানি এবং উপলব্ধি করতে পারি এবং পারছি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ঘটনা আমাদের মানসিকতাকে আঘাত করেই চলেছে। আর এই আঘাতের বিপরীতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে কিছু অপরাজেয় মানুষ। বিশ্বাস রাখি আমরা জিতবই।
সেদিন আমার এক পরিচিত স্বাস্থ্যকর্মী বান্ধবী জানালো , সে আজ বাইশ দিন পরে তার বাচ্চাটাকে দেখছে। মেয়েটি ডিভোর্সি। বাচ্চাটাকে একাই বাবা মা দুজনের অভাব পূরণ করে মানুষ করে চলেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কি অপরিসীম মানসিক দৃঢ়তায় এই বিরুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বুকের ভেতরে যতই সমুদ্রের গর্জন হোক না কেন বাইরে কোথাও তার সামান্যতম ঢেউও আছড়ে পড়তে দিচ্ছে না। মাত্র একটি দিনের ছুটিতে সে বাচ্চাটার কাছে ছুটে এসেছিল। একদিন পরেই আবার কর্মস্থলে ফিরে যাবে বাচ্চাটাকে প্রতিবেশী এক বাড়িতে রেখে। না, মেয়েটির মুখে কোথাও কোন অভিযোগ করার কথা শুনিনি আমি।
বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই বাস্তব । অনেক চেষ্টাতেও সেই অসাধারণ মেয়েটির সাথে নিজেকে কোথাও মেলাতে পারিনি আমি।

আর এতগুলো দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতেও সেই বাচ্চাটি যে সহৃদয় পরিবারের কাছে পরম যত্নে এবং নিরাপদে ছিল এবং আছে। সেই পরিবারের মানুষগুলোও কোনরকম অসন্তোষ প্রকাশ করেননি একবারও। তারা কেউই তার রক্তের সম্পর্কিত কোন আত্মীয় নন।
আর সেই ছোট্ট শিশুটি একবারও কোন নালিশ জানায়নি কারও কাছে। তার মানে তো এই নয় যে তার মনখারাপ অথবা কষ্ট হচ্ছে না। কি অপরিসীম সুস্থ মানসিকতায় তৈরি হচ্ছে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। সত্যিই ভালো লাগছে।

এমন অজস্র কাহিনি আজ অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরা কতটুকু তার খবর রাখছি। ঘটনাপরম্পরায় একটি কবিতার কয়েকটি লাইনে আবারও ধাক্কা খেলাম কিছুক্ষণ–
“আজ ঈশ্বরের কাছে মৃত্যুর চাহিদা প্রার্থনা জানাচ্ছি
ইচ্ছে থাকলেও কেউ ভিড় করতে পারবেনা শবদেহ নিয়ে!
নিয়মের নামে মুখরতাময় মিথ্যে শোকের নাটকে”।-
উপরের লাইন তিনটি একজন শিক্ষিকার একটি কবিতার লাইন। সম্পূর্ণ বিপরীত আঙ্গিকে নিজের মনের কথা লিখেছেন।
প্রচারিত শোকের প্রকাশ আর পরবর্তী অধ্যায়ে লোকাচারের নামে উল্লাস।
কোনটাই কাম্য নয়।

মৃত্যু এক নিঃশব্দ সমাপতন হোক জীবনের শেষ লগ্নে। শোকের উন্মাদনা বন্ধ হোক। কিন্তু এগুলো সমাজ ব্যবস্থার অঙ্গ এবং সেটা এই মানুষেরই সৃষ্টি। আজ এই সময়ে যে কোন মৃত্যুই নীরব। এমনকি খুব কাছের মানুষও শোকাচার তো অনেক দূরের কথা শেষ দেখাটুকু ও দেখতে আগ্রহী নয়। তাই আজকের মৃত্যু, শান্তি কামনা করুক অথবা না করুক, তাকে একাই চলতে হবে। আমরা এমনই এক বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

এতকিছুর পরেও আজ ভাবতে ভালো লাগে যে, এই সঙ্কটের সময়ে অনেক মানুষই বিভিন্ন স্তরের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ঠিকই তো, মানুষই তো মানুষের পাশে থাকবেন আর এটাই স্বাভাবিক মানবিকতাবোধ। কর্তব্য কখনোই ধন্যবাদের আশা করেনা।

কিন্তু সামনে আরও বেশি সঙ্কটের মুখোমুখি হতে চলেছি আমরা। সেই সময়ও যেন আমরা আমাদের কর্তব্য থেকে পিছিয়ে না আসি এটুকুই মনে রাখার দায়িত্ব আমাদের।
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার্থে এই মানব প্রজাতির কত সংখ্যক প্রয়োজনীয়তা আছে সেটা বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। কিন্তু মানুষ নিজের পরিচয়টুকুর প্রমাণ রেখে চলুক। যতই থমকে যাক পৃথিবী সময়েরসাথে তাল মিলিয়ে পথ চলার গতি সমান্তরালই থাকবে। সব মন্দলাগার ভেতরেই ভালোলাগাগুলো কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকেই। তাকে খুঁজে নিয়েই আমাদের আগামীর পথচলা।

[লেখিকা – পশ্চিমবঙ্গের সরকারি নার্স।]

Facebook Comments

Leave a Reply