আয়না ভাঙা অক্ষর – নারী কলমে বিগত সত্তর বছরের যুদ্ধ-কাহিনি : অরিত্র সান্যাল

fail

আয়না ভাঙা অক্ষর: নারী কলমে বিগত সত্তর বছরের যুদ্ধ-কাহিনি

গল্প নির্বাচন, সম্পাদনা ও প্রাক-কথন: অদ্বয় চৌধুরী
গল্পের নাম: একটি পেলব পতন
গল্পকার: রাশা আব্বাস
রাষ্ট্র: সিরিয়া
মূল ভাষা: আরবি
অনুবাদের সোর্স ভাষা: ইংরেজি
বাংলায় অনুবাদক: অরিত্র সান্যাল

দ্বিতীয় কিস্তি

সিরিয়ার সাংবাদিক এবং লেখিকা রাশা আব্বাসের জন্ম ১৯৮৪ সালে। তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ২০০৮ সালে প্রকাশিত হলেও ২০১১ পরবর্তী সময়ে বা’থ পার্টির বাশার আল-আসাদের শাসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সন্ধিকালে সিরিয় সাহিত্যের যে নতুন জোয়ার এসেছে তাতে রাশা আব্বাস এক স্ফুলিঙ্গের নাম। সিরিয়ার সিভিল ওয়ার শুরু হলে তিনি সরকার-বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ফলত ২০১২ সালে লেবাননে এবং ২০১৪ সালে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। বর্তমানে তিনি জার্মানিতেই আশ্রিত রয়েছেন। রাশার একলেক্টিক, গভীর, কখনো-কখনো সাইকিডেলিক গল্পগুলি পাঙ্ক নান্দনিকতার পরিধির ভিতরে আবৃত হয়। গল্পগুলির নিজস্ব এক স্বপ্নিল বুনোট আছে যার মাধ্যমে সেগুলি হাইপার-রিয়েলিজমের সেই স্তরে পাঠকদের নিয়ে যায় যা শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোতের জন্ম দেয়।
২০১৯ সালে অ্যালিস গুঠরির ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য জিস্ট অফ ইট’ নামক গল্প সংকলনের অন্তর্গত ‘ফলিং ডাউন পোলাইটলি’ গল্পটি একটি টিনএজ মেয়ের মস্তিষ্কের অন্দরে পাঠকদের নিয়ে যায় যে আর পাঁচটি সমবয়সী মেয়ের মতই সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিশ্বায়িত গণ সংস্কৃতির অস্থিরতায় যাপন করে। এ হল গল্পটির বহিরঙ্গ। গল্পটির রাজনৈতিক আন্তর্পাঠ উঠে আসে যখন দেখা যায় মেয়েটি আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং কঠিন এক বাস্তবের সম্মুখীন হচ্ছে— একটি কাটা মুন্ডু, রাস্তার ওপারের থানা থেকে ভেসে আসা পুলিশি অত্যাচারের আর্তনাদের সম্ভাবনা, মেয়েটিকে ঘিরে থাকা বাস্তবিক অথবা কল্পনাপ্রসূত ভয়াল জিনিসপত্র। এ হল লড়াইতে বিধ্বস্ত সিরিয়ার চিত্র, যে লড়াই এখনও চলছে— যে লড়াইতে কয়েক হাজার মানুষ খুন হয়েছে, তার থেকেও বেশি মানুষ হয়েছে বন্দি ও অত্যাচারিত।
স্বপ্নের এক কাব্যিক চলন থাকে। কিন্তু যা কিছু স্বপ্নময় তা ছন্দবদ্ধ নয়। রাশার কাব্যিক উপস্থাপনায় চাঁদের সেই উলটো পিঠের ছবিটাই উঠে এসেছে এখানে। এ এক দুঃস্বপ্নময় যাপনচিত্র।

একটি পেলব পতন

শুধুমাত্র এক রাউন্ড গুলি নিয়ে বন্দুকটা নিজের মাথায় তাক করে নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে কেরদানিটা কোথায়? তার চেয়ে ছ’টি চেম্বারই ভরে রেখে প্রতিটা বুলেটকেই সুযোগ দেওয়া উচিৎ আপনাকে মারার, একের পর এক।

বুলেট ১

শোয়ার ঘরের স্টিরিয়ো সেট থেকে যাঁর গলা এখন ভেসে আসছে তিনি কার্ট কোবেইন বা জিমি হেন্ড্রিক্স প্রমুখ আদত জিনিয়াসদের মতো সাতাশ বছরে মারা যাননি ঠিকই— রোজ সকালে তবু আপনি তাঁরই গান শোনেন।
পর্দা সরিয়েই আপনি দেখতে পেলেন একটা কাটা মাথা আপনার জানালায় সাজানো টবে রাখা আছে। চুল নেই; চোখ দুটো শান্তিতে বোজা। যতদূর আপনার মনে পড়ে, শত্রুদের-কাটা-মুন্ডু-সাজানো আল মুৎআমিদ ইবন আব্বাদের সেই মধ্যযুগের বাগানে আপনি যাননি যে সেখান থেকে বেছে একটা মাথা তুলে এনেছেন, অথবা হতেও পারে এই তবে আলজাইমারের শুরু— আপনার মায়ের থেকে পাওয়া। অথবা আল মুৎআমিদ খোদ কাল রাত্রে এসেছেন দামাস্কাসে— সঙ্গে দুটি মাথা— উপহার— কাল কনভয়ের ভেতর স্বপ্নঘোরেও তো তা-ই দেখা গেল— তখন কনভয় হাজার খানেক বাঁকানো তলোয়ারের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে, বাব শারকি শহরের পুরোনো সদর গেট হয়ে যে রাস্তাটা যায়— সেটা পুরো অবরুদ্ধ। আপনি একবার ওখানে একটা কাঠের চেয়ারে বসেছিলেন, একেবারে ফুটপাতের ওপরেই, তখন লোক দেখানো গা জোয়ারিতে গাদাগুচ্ছের নেশা ভাং করে একেবারে নেতিয়ে পড়া অবস্থা; এক জার্মান পর্যটক আপনার ভ্রুয়ের ওপরে ভেজা নেকড়া চেপে ধরেছে, বলছে, “চাঙ্গা হয়ে যাবে”, তার বলার ধরনে জার্মান ইংলিশের একটা তাচ্ছিল্য মিশেছিল। তারপর আপনি একটা ট্যাক্সি ধরলেন, ফতুর বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে ট্যাক্সিতে উঠে ভাঙা হিব্রুতে (শুধু অক্ষরজ্ঞান মাত্র সম্বল) ওল্ড টেস্টামেন্টের বাণী ভুলভালভাবে আউড়ে তাদের বেজায় ভয় খাইয়ে দিলেন— সে সময় ট্যাক্সিওয়ালা রিয়ারভিউ আয়না দিয়ে সন্দিহানভাবে আপনাকে দেখছেন। যেন সেই বিহ্বল দৃষ্টির উত্তরেই আরবিতে তাঁর উদ্দেশ্যে আপনি বলে উঠলেন— “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন!”, অতঃপর গোঁজামিল দেওয়া হিব্রুতে বাণীর লাইনটি আপনি শেষ করেন “কেই… লেইয়াওলাম… খাসডু” (তাঁর যে দৃঢ় প্রেম অনন্তকাল সহ্য করে)।
এখন, যখন আপনি এক জগ ঠান্ডা জল নিয়ে জানালায় এসেছেন আর নতুন মাথাটির মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছেন, আপনি চাইছেন কোনো এক মুগ্ধ প্রণয়প্রার্থী আপনার ওপর লুকিয়ে নজর রাখুক, যে আপনাকে বিমোহিত করার আর অসহ্য কোনো উপায় খুঁজে পায়নি কাটা মাথা পাঠানো ছাড়া, যেন সে প্রমাণ করতে চায় সে-ও বিকারগ্রস্থ, আপনার মতোই।

বুলেট ২

আপনি গান শুনে চলেন, আর ভাবেন কী কী কারণে টিভির থেকে ইউটিউব আপনার বেশি পছন্দ। টিভিতে তো সেই এক রান্নার শো, নয়তো সেই গানগুলোই চালানো হয় যেগুলো কেবল ওদের ভালো লাগে, আর হয় সেখদের কথা, নয়তো আর এক রাশ মৃতদেহ; আর সত্যি বলতে কী, কোনো বিকৃত কল্পনাতেও মৃতদেহ নিয়ে আপনার কখনোই কোনো গোপন বাসনা নেই, সুতরাং আপনার ইউটিউবই ভালো— নিজের মতো হেন্তাই অ্যানিমের ক্লিপিং দেখা যায়, ফ্রি। সেখানে গোলাপি চুলের মেয়েদের তো যে সে এসে করে দিয়ে যায়। শুধু নীল চুলো, চশমা-ওয়ালা, সভ্য ভদ্র দেখতে যুবকরাই নয়— বিকট দর্শন দানব, বিচিত্র যন্ত্র, আধা-মানুষ গাছ— কিস্যু বাদ নেই। মেয়েগুলির শরীর পুরো নিখুঁত আর ঝকঝকে, আর থাকে এই মিঠে ছেনালি; এইসব ফিল্ম আপনার বড় দরকার— মহিলাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হয়— বিশেষত সেক্সের সময় সেই চড়া মুখভঙ্গী যদি বিরক্তিকরও লাগে— তবু। এই হেন্তাই মেয়েরা সর্বদা যন্ত্রণায় থাকে। কেন?
ফিল্ম চলতে চলতেই আপনি ঘুমে ঢুলে পড়লে বেড়ালের স্বপ্ন শুরু হয়ে যায়— গতবছর প্রতিদিন যা দেখেছেন— আদুরে বেড়াল, আপনাকে ঘিরে রাখে, চটকায়। হাতে খাবার মতো কিছু থাকলে ওদের আপনি খাওয়ান, কিন্তু ওরা সবকিছু নিয়ে টানাটানি করে, কামড়ায়— টাকা হলে টাকাও। আপনি আপনার ক্ষিপ্র বন্ধুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন— আধা মানুষ, আধা মার্জার— তিড়িং বিড়িং করে ছাদ থেকে ছাদে লাফিয়ে, রাস্তায় রাস্তায় খেলে বেড়াচ্ছে তারা— কী রাজকীয় বাধাহীন তাদের বিচরণ; কেউ বেড়ালদের গুপ্তখুন করার কথাও ভাবে না, গরু চরানো ইলেক্ট্রিক যন্ত্র দিয়েও কেউ মারে না তাদের। ঘুমের মধ্যেই আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন— আজ থেকে বন্ধুত্ব যদি রাখতেই হয়— তো একমাত্র বেড়ালদের সঙ্গে রাখবেন, নচেৎ নয়।

বুলেট ৩

কাটা মাথার ওপর আপনি আবারও জল ঢালছেন, যদিও প্রতিবারই শুকিয়ে যাচ্ছে— বোঝা যাচ্ছে জল খেতে চাইছে না, কিন্তু আপনার জানাও নেই এ অবস্থায় করণীয়টা কী! আপনি জানালার বাইরে মাথা ঝুঁকিয়ে দেখছেন ওই রাস্তায় একটা পুলিস স্টেশন, কান পেতে শুনছেন কেউ এখন মার খাচ্ছে কি না— কোনো শব্দ নেই।
স্টিরিয়োর আওয়াজ বাড়ালেন আপনি— কেউ হয়তো কোথাও গান শুনবার জন্য ছটফট করছে— আর আপনি আবার নিজের চিরপরিচিত ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে থাকেন; নিজেকে সেই ফিল্মটার ওই হতভাগা চরিত্রটি মনে হয় যাকে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সারা পৃথিবী দেখে এমন একটা রিয়্যালিটি টিভি শোয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল, আর যেন এই মুহূর্তেই আপনাকে সারা পৃথিবী জুড়ে ঘরের আনাচে কানাচে লুকোনো ক্যামেরার সরাসরি সম্প্রচারণে দেখা হচ্ছে। ঘরে একা একা নাচবার সময় আপনাকে দেখে অথবা যখন বোকার মতো আয়নার সঙ্গে কথা চালান— সেই দেখে লোকে নির্ঘাৎ হেসে লুটোপুটি। আপনি ভয়ে ভয়ে পুতুলটির দিকে তাকালেন, ওর চোখ আপনার দিকে ঘোরানো এবং আপনি স্টিরিয়োর আওয়াজ আরও বাড়িয়ে দিলেন। তারপর— বড় তুচ্ছতার বোধ নিয়ে ওই মাথাটার ওপর জল ঢালতে লাগলেন, শুকিয়ে আসা নীল শিরাগুলো এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

বুলেট ৪

স্টিরিয়ো যে কত জোরে বাজছে তা বলতে এবার আপনার মা দরজা খুলে ঢুকে এলেন, সেই ফাঁকে আর-একখানা বেড়াল গলে ঢুকে পড়ল ঘরে। আপনি তৎক্ষণাৎ ধন্ধে পড়ে গেলেন— যদি মা জিজ্ঞেস করেন এই কানফাটা আওয়াজের মানে কী, অথবা ওই কাটা মুন্ডুর কথা আর পুতুলের চোখ কেন পট্টি দিয়ে বাঁধা আর রাজ্যসুদ্ধু বেড়ালই বা হঠাৎ কেন আপনাকে ঘিরে আছে: আপনার কাছে কোনোকিছুরই সদুত্তর নেই। এর একটা সমাধান এই হতে পারে যে আপনি পাগল হয়ে গেছেন অথবা শীতকালীন ডিপ্রেসন আপনাকে গ্রাস করছে অথবা ফ্লু-এর জন্য খাওয়া ওষুধের কারণে এইসব— কিন্তু আপনার মা আদৌ কিছু জিজ্ঞেসই করেন না। বলার মধ্যে ছিল ওই একটাই কথা— এই বেড়ালগুলোর মধ্যে একটা বেড়াল আছে যার গাছপালা সম্বন্ধে ধ্যান ধারণা বেশ ভাল। আপনার মা হাতটা জানলার দিকে প্রসারিত করে বললেন, “দেখো” — বেড়ালটা কাটা মুন্ডুর ঠোঁট চেটে নিচ্ছে, গোলাপি হয়ে উঠছে গাল দুটো। আপনার মা ঠিক বলেছেন, বেড়ালরা অনেক কিছুই বোঝে যা আমাদের বোধের অগম্য। এর কারণ বুঝতে হলে মায়ের সঙ্গে সময় কাটালে চলবে না, থাকতে হবে বেড়ালদের সঙ্গে।

বুলেট ৫

দশটা চোখ বাঁধা পুতুল আর ফুটফুটে বেড়াল ভর্তি ঘরে আপনি ল্যাপটপ খুলে বসলেন এই ভাবতে যে কেন টিভির থেকে ফেসবুক আপনার বেশি ভালো লাগে। কোনো যথার্থ কারণ আপনি খুঁজে পান না, আর অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন— মনে সন্দেহ ভিড় করে আসে পুতুলটাকে নিয়ে— কালো কাপড় দিয়ে সেটার চোখ বাঁধা থাকলেও আপনার সমস্ত বোকা আচরণ ওটার মধ্যে থাকা ক্যামেরা দিয়েই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা পার্ক চৌমাথায় একটা বিশাল টিভির পর্দায় ফুটে উঠছে।
ল্যাপটপের ক্যামেরা লেন্সটাকে আপনি দ্রুত ঢেকে দেন এক টুকরো কাগজ দিয়ে। কোথায় যেন একবার শুনেছিলেন, ওই সব ক্যামেরা হ্যাক করা যায়।
উইমেন্স ম্যাগাজিনের ওয়েবসাইট বলছে: “যদি এই অচেনা ছেলেটিকে তোমার ভালো লাগে, তোমার উচিৎ তাকে বোঝানো যে তোমার সামাজিক জীবন প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ, হাজার বন্ধু, পার্টি আর …” ধুত্তোর এইসব ম্যাগাজিন, এইসব বাতুলতার জন্য আপনার সময় নেই, আপনার কত বেড়াল আছে তাদের পরিচর্যা করতে হবে— কত বেড়াল, রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাজারগণ্ডা বিপদের মুখে— আর ওই সুন্দর কাটা মুন্ডুটি জানালায়, যেকোনো মুহূর্তেই সেটা শুকিয়ে মরে যেতে পারে, আর আপনার পাড়াতেই রয়েছে একটা পুলিস স্টেশন, আর আছেন আল মুৎআমিদ যিনি কাল রাত্রেই দামাস্কাসে এসে পৌঁছেছেন— আপনার এতসব নিয়ে ভাবনা বাকি।
হাঁপিয়ে উঠে আপনি ওই জোকার পুতুলটাকে ছুঁড়ে ফেললেন, বড় কাছে চলে এসেছিল কম্পিউটার স্ক্রিনের— যেন ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা মনিটর করতে চাইছিল। যখন ওটাকে আপনি আছেড়ে ফেললেন, ওর মাথাটা মেঝেতে ছিটকে পড়তেই বেড়ালগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল। আপনার ক্রোধের গন্ধ তাদের নাকে এসে ধাক্কা দিয়েছে। ওহ, বেড়াল! আপনি ঠিক করে নিলেন যদি আর সামান্যও সময় বেঁচে থাকে, আপনি এদের সঙ্গেই বুড়িয়ে উঠতে চান, সবক’টার সঙ্গে এক বাড়িতে থেকে যেখানে আর কেউ থাকবে না, আর তারপর সবক’টার নাম দেবেন নিজের নামে। ফেসবুক চ্যাটে ওই ছেলেটিকে অনলাইন দেখাচ্ছে, আপনি ভূমিকা না করে সোজা প্রসঙ্গে চলে এলেন। “শোনো, খুব ইচ্ছে করছে তোমার সারা শরীরে চেডার চিজ মাখিয়ে খেতে।“ ছেলেটি হঠাৎ চ্যাট লিস্ট থেকে উধাও হয়ে যায়, আর আর-একটু পরেই দেখা গেল ফ্রেন্ডলিস্ট থেকেও সে হাওয়া, আর তাই তাকে আবার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে আপনি অপেক্ষা করেন, ভাবেন ও বিবাহিত তো কী হয়েছে, আর একদিন যদি ও “ডিভোর্সড” লিখে স্ট্যাটাস আপডেট করে সেখানে একটা চটুল “লাইক” দিতে আপনার লজ্জা হবার কোনো কারণ নেই— তবে এ সবকিছুই হতে পারে যদি ও আপনাকে আগে ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড করে। বেড়ালদের ধস্তাধস্তির সুযোগে জোকার পুতুলটা নিজের চোখ থেকে পট্টি খুলে নিয়েছে— কপাল! নিশ্চয়ই সব দেখে নিল।

বুলেট ৬

মা,
যদি এখন তুমি ফ্রিজের গায়ে সাঁটিয়ে রাখা আমার এই শ্রদ্ধায় গদগদ রচনাটি পড়ছ, তাহলে বুঝে নাও আমি আমার বাকি কাজক’টা সারতে পারলুম না, আমার জায়গায় তুমি সেগুলো করে নিলে ভালো হয়। আমার বেডরুমের দরজা থেকে যদি রক্তের দাগ দেখতে পাও, ঘাবড়ে যেও না, শান্ত ভাবে ঘরে এসো। একটা জোকার পুতুলকে সিলিং থেকে ঝুলতে দেখে আতঙ্কিত হয়ো না: ও নিজের উচিৎ শাস্তি পেয়েছে। বেড়ালদের লেজ বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে পা ফেলো; যদি দেখ রক্ত চেটে নিচ্ছে, চীৎকার জুড়ে বসো না, বা ওদের ভাগিয়ে দিও না। আমি এই বেড়ালদের কথা দিয়েছি মা— ওদের সঙ্গে আমি বুড়ো বয়সে নির্বাসনে চলে যাব, আর এখন আমি সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেল্লুম। জানালায় দেখতে পাবে জমকালো একটা টব মাটিশূন্য হয়ে পড়ে আছে, যেটির পাশেরটায় একটা কাটা মুন্ডু। ওতে কুমড়ো আর সূর্যমুখীর বীজ আছে: আমার মাথাটা নিয়ে ওখানে দিয়ে দাও। বীজগুলো রক্ত পাক। আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড দিয়ে দেখো তো চেডার চিজ ছেলেটি আমায় ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড করল কি না। একটা গানের লিংক বা কিছু একটা আমার স্ট্যাটাসে আপডেট করে দাও, আমার সব বন্ধুদের গুড মর্নিং বলো, আর মিছিমিছি বলে দাও আমি সবাইকে সমান ভালোবাসি।

________________________________________

বাংলা অনুবাদক
অরিত্র সান্যাল –  (জন্ম: ১৯৮৩) মূলত কবি, অনুবাদক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ পাঁচটি।

Facebook Comments

Leave a Reply