বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায়-র কবিতা

সে এক না পড়া লিপি

বুকের আঁচল সরিয়ে দিয়ে আমি দেখালাম
ফোঁটাফোঁটা ঘাম কেমন আপনার নাম লিখতে বানান ভুল করছে
সেদিন সুতির আঁচলা ছিল। আর সামান্য সেমিজ
দেখিয়ে ফেলে আমার মনে হলো কিইই আলো!
এত আলোয় আর ফিরে তাকানো যাবে না
রাত কবে হবে?
আমি, আমার দুই অম্লগন্ধী বাঁট
প্রাণপণে রাতের অপেক্ষা করতে বসলো
কষ্টহীন রাতে –
চারপাশের বাড়িগুলো কেমন দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকে
চূর্ণচূর্ণ চাঁদের পাউডার আর অন্ধকার মেখে
সব দেখিয়ে ফেললে যে বুক খালি হয়ে যায়
অমনি চার দিক থেকে অনেক হাওয়া সেই চাপ খাওয়া খালি ভরতে
ছুটে ছুটে আসে
অলিগলি চোরাগলির দুধারে সারি সারি বাড়ি থাকলে
কাশীতেও, এমনকি নিউ ইয়র্কেও
এক অদ্ভুত হাওয়ার মেহফিল তৈরি হয়
শোঁ শোঁ ক’রে হাওয়া বয়
যেন অনেকগুলি বালক ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে
আপনার কবিতায় আমার ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে কোন ‘পান’ করতে হাত সরে না
এ কেমন কামনা, যা ইন্দ্রের হাজার চোখ হয়ে
কেবলই দেখতে চায়? কেবলই দেখতে?
আমার বুকেও অমন অনেক বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে
ছোটবেলার বাড়ি, ফেলে আসা বাড়ি, ছেড়ে যাওয়া বাড়ি
ইট গাঁথতে থাকা বাড়ি, যেটা কিছু আপনি কম পড়ায়
পরের বর্ষার জল খাচ্ছে
এই সব বাড়ির মধ্যে দিয়ে হু হু ক’রে হাওয়া বইছে
হাওয়াগুলি আপনার নাম বলছে ঠিক উচ্চারণে

ন্যূনতম

বিন্তিমাসিকে আমার ভালো লাগে
তার ছোট চুল, পাতলা ঠোঁট
হাতে কালো চামড়ার ঘড়ি
ব্লাউজ নৌকোর মতো কাটা
পছন্দের পারানি পেলেই
অকুণ্ঠে নৌকো ভাসাবে
বিন্তি মাসির বাড়িকে নাম দেওয়া যায় ন্যূনতম
সোফার জায়গায় একটা ডিভান
ডিভানের গদি পাতলা সরু
তার ফিনফিনে কব্জি মাফিক
প্রায়শঃই রোদ খায়
সকালের রোদ উঠলে প্রত্যেকটা আসবাব পরিস্ফুট
প্রত্যেকটি বাসন
মাঝে মাঝে তার বাড়ি থেকে জীবনবীমাকারী বেরোয়
যে পদ্যও পড়ে
মাঝে মাঝে তার বাড়ি থেকে যায় মূত্রের ডাক্তার
এরা কেউ বিন্তিমাসিকে বীমা গছাতে পারে নি
এরা কেউ বিন্তিমাসিকে খাওয়াতে পারেনি পেচ্ছাপের হলুদ ওষুধ
এরা কেউ বাড়িটার বাইরের রাস্তায় বিন্তি মাসির মুখ থেকে
হাসিটুকু খসাতে পারে না
বিন্তিমাসির উপরের দাঁত নীচের চাইতে পেছিয়ে
নৃতত্ত্ববিদরা বলেন সেটি নাকি সুপ্রাচীন খাদ্যাভ্যাস থেকে পাওয়া
যারা শিকার করতো আর জোগাড় করতো
তাদের হাতে নিজের মতো উপুড় বা চিৎ হবার অফুরন্ত সময়
গোলায় ভরার ধান, জমিতে উপড়োনোর আগাছা
কোন মহিলার মধ্যে শুক্রাণু ভরে দিয়ে
চিহ্নিত করবার নিষ্করুণ উদগ্র প্রয়াস
তাদের ছিল না
কাদার ডোবায় তারা অনন্তসময়
নিজেদের রোমশ শরীর
তার ধ্যানে ডুবে গিয়ে
একাএকা কাটাতে পারতো
তাদের গুহার নাম বিন্তি মাসির মতো
ন্যূনতম রেখে দেওয়া যেতো

নয়নতারার পেটেন্ট নিতে হতো

ঈশ্বর সেদিন খুব হালকা ক’রে জিগেস করলেন
‘তার কী খবর?’
এবার আমার রাগ হলো
মুখ বন্ধ ক’রে এই ডাঁই করা ফাইল গোছাই
তিনি তো জানেন আমি করণিক নই
নয়নতারার নক্সায় কিছু অবদান ছিল
আমারো- ডাগর
বাঙলার মেয়েদের মত ছিল ফুলটির চোখ
দেখলেই মনে হতো কার যেন গাল টিপে দিয়ে
মধ্যে ঠোঁটের লালটুকু কিছু ছড়িয়ে গিয়েছে
যেমন নক্ষত্র ফুটে ওঠে এই পৃথিবীকে একটু ঘোরালে
তেমনই প্রগাঢ় লাল মেসেজের নোটিফিকেশন
গোল সূর্যের মতো কতদিন আমার আসে না
তাঁর যে নক্ষত্র কারখানা
আমার কুটীরশিল্প তবু
ডাঁই করা ফাইলের মধ্য থেকে মুখ তুলে ঝেঁঝে
পুরনো সেক্রেটারি যেমন মেজাজ করে ওঠে
তেমন বলতে গিয়ে দেখি
মুখের একটি প্রা ন্তে খাপছাড়া মেঘের মতন
হাসি ঝুলে আছে
ছাদের কার্নিসেও উড়ে আসে একটি কপোত
তাহলে কি এইগুলি সিগন্যাল?
তালে আজ ছুটি?
তাহলে কি বাড়ি ফিরে দৈবিক পোস্টম্যান পাবো?
তবে কী এসেছে চিঠি, বলুন বলুন?
লজেঞ্চুসের মত একখানি এসেছে কি দেশে?
সততঃ গম্ভীর
সততঃ গম্ভীর তিনি তবুও ছুটির ঘণ্টা বাজে
উদাসীন পারাবত তখনো ছাদেই
এবং আকাশে এক খাপছাড়া হাসির মতন
মেঘও বসে আছে

Facebook Comments

Leave a Reply