উনবিংশ শতকে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজ এবং জীবিকা-সাংবাদিকতা : পৃথ্বী সেনগুপ্ত

fail

উনবিংশ শতকে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজ এবং জীবিকা-সাংবাদিকতা

প্রথম পর্ব

সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস বা আরো অন্যান্য এ ধরণের বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ণে আর্থ-সামাজিক, জীবিকা, ধর্ম প্রভৃতি বিষয়গুলির ওপর ভিত্তি করে মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট শ্রেণী-বিভাজন সম্পর্কিত যেকোনো আলোচনাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার কারণ, কার্য-কারণের সম্পর্ক নির্ণয়ে তা সঠিক পথ দেখায় ৷ এবং যেহেতু যেকোনো সমাজের আর্থ-সামাজিক এবং ধর্মের বৈশিষ্ট্যের স্বরুপকে সঠিকভাবে না জানলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগরক্ষাকারী সমাজ-সম্পর্কিত আলোচনা সার্বিকভাবে অসম্ভব তাই এগুলিকে এড়িয়ে যাওয়াও উচিত নয় ৷
ভারতের ক্ষেত্রেও উনবিংশ শতকে, বাংলার ও বাঙালীর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব তথা বিকাশ কিভাবে ও কেন হয়েছিল এবং তার পরবর্বতী ঘটনা-পরম্পরাগুলি কি-কি, সে সম্পর্কিত আলোচনা সবসময়েই আলাদা গুরুত্বের দাবীদার ৷ এবং তার কারণ একাধিক ৷ সংক্ষেপে এখানে বলা যেতে পারে, সারা পৃথিবীর ক্ষেত্রেই বিট্রিশ শাসনের অধীনস্হ দেশ ও জাতির সংখ্যা অনেক ছিল, এখনো পরোক্ষে কিছু আছে ৷ এবং সেই শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পরও তা মাঝেমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে, ভবিষ্যতেও আসবে ৷ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর অবস্হান এবং সিন্ধান্তের ক্ষেত্রে এই দেশের ভূমিকা, সংস্কৃতিগত বিষয়, শিক্ষার মান ইত্যাদি ৷ এই ইংল্যাণ্ডের অন্যতম উপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত তথা বাংলার ভূমিকা উনবিংশ শতকে একটা আলাদা জায়গা জুড়ে আছে, কারণ অখণ্ড বাংলায় সেই সময়কার মেধাশক্তির প্রাচুর্য্য, জাতিগত সত্ত্বার তেজ এবং প্রতিভার নানা ক্ষেত্রে বিকাশ, যা সেই সময় শাসকের কপালে ভাঁজ ফেলেছিল ৷ পরাধীন ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি ৷ যার জন্য শুধু সাংবাদিকতা নয়, আমরা প্রতিভার উৎকর্ষতা লক্ষ্য করেছিলাম বিজ্ঞান-শিল্প-ব্যবসা-সাহিত্য প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রেই ৷ আর এটাও সবসময়েই প্রাসঙ্গিক, প্রতিভার বিকাশ যখন সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ কলমের জোরে হয় তখন তা বিশেষ সমীহেরও জায়গা করেই নেয় ৷

শ্রেণী-উদ্ভব, বিভাজন ও বাঙালী :
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব কোন একটি ধারণা মাত্র নয় ৷ বাংলার সমাজজীবনের ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সূচনা মাত্র এই শ্রেণী বিভাজন ৷ যার প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে ভারতবর্ষের প্রাচীন সমাজ গঠন ও বিভাজনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ৷ সেই সমাজ বিবর্তনের প্রক্রিয়া তথা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা আবশ্যিক, অন্যথা মধ্যবিত্ত শ্রেণী সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ণ করা সম্ভব নয়, সঠিকও নয় ৷ কেননা মানব সমাজ কোন অচলায়তন নয় ৷ মানুষ যেদিন থেকে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে বাস করতে শিখেছে নিজের আত্মরক্ষার প্রয়োজনে, সেদিন থেকেই সমাজ গঠনের প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ৷
কিন্তু তখনই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এই সমাজ কি শ্রেণীহীন ছিল ? উত্তরের খোঁজে আমাদের ফিরে যেতে হবেই প্রাচীন সমাজের বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যে যে ইতিহাসে ‘সমাজ’ কথাটি শুধুমাত্র তিনটি অক্ষরের সমষ্টি নয় ৷ আভিধানিক কিংবা ব্যুৎপত্তিগত অর্থ, যেদিক থেকেই দেখা যাক না কেন, যার মূল কথা, “সমানভাবে নিয়ে যায় যা”, তাই সমাজ ৷ তাহলে তো, মানব সমাজে কোন শ্রেণী বিভাগ থাকার কথা নয় ৷ একটি সমাজে যদি সবাই সমান হয়, তবে ‘সমাজপতি’ কথাটির উদ্ভব হওয়ার কথা নয় ৷ আসলে মানুষ যখন দলবদ্ধ কিংবা গোষ্ঠীবদ্ধ কিংবা সমাজবদ্ধ হয়েছে তখন থেকেই দল, গোষ্ঠী কিংবা সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে, সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজনের নেতৃত্বের প্রয়োজন, যা হাজার-হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমন আছে ৷ তার উদাহরণ, আমাদের ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাস ৷ যে ইতিহাসের পাতায়-পাতায় রয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া সমাজ গঠন ও পরিচালন-এর কাঠামোর ৷ কবে থেকে এর সূচনা তা দিনক্ষণ দিয়ে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয় ৷ কিন্তু এটা সত্য যে, বৈদিক যুগে আর্য-অনার্যের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও আদর্শগত সংমিশ্রণের ফলশ্রুতিতে গঠিত সমাজে যে শ্রেণী বিভাজন প্রথা ঘটেছিল, তার উদাহরণ রয়েছে, “….Which provides the germ of the developing castle system can be clearly recognized in the Purusa Sukta, one of later hymen of the Rigveda (X.90), there the Brahmais are said to have come from Purusa’s head, the ruling class from his arms, the common people (visa, agriculturalists, traders, etc.) from his Thighs and the sudras (menials) from his feet. In late Vedic texts we are repeatedly reminded that the lower two castes were to serve the upper, and the sudras, who in time came to be regarded as ‘untouchables’, were to serve all others”. (‘Subcontinental unity and regional diversity’ from the book ‘The Rise of civilization in India and Pakistan’-Bidget & Allchin, Page 355).
এই শ্রেণী বিভাজনের উৎপত্তি কতটা কাল্পনিক, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটা বাস্তব বাক্ষ্রণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র-তথা কর্মভিত্তিক শ্রেণীবিভাজন যে প্রকৃত সত্য – তার উদাহরণ রামায়ণ, মহাভারত মহাকাব্যের কাল পেরিয়ে, ধর্মভিত্তিক শ্রেণী বিভাজনে নিমগ্ন হয়েছে, জৈন ধর্ম-বৌদ্ধ ধর্ম-হিন্দু ধর্মের দর্শনজাত আচার-আচরণের বিধি-নিষেধের গণ্ডীতে ৷ যার সারমর্ম রবীন্দ্রনাথের রচনায় যথার্থ্যভাবে প্রতিফলিত ৷ ‘সমাজ’ গ্রন্হের ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ প্রবন্ধে (১৩ খণ্ড, ১৩১৫, পৃ: ৪২১) বলেছিলেন, “বর্ণের যে শুভ্রতা মলিন হইয়াছে ও এবং আর্যগণ শুদ্রদের সহিত মিশ্রিত হইয়া তাহাদের বিবিধ আচার ও ধর্ম, দেবতা ও পূজাপ্রণালী গ্রহণ করিয়া তাহাদিগকে সমাজের অন্তর্গত করিয়া লইয়া হিন্দুসমাজ বলিয়া এক সমাজ রচিত হইয়াছে; বৈদিক সমাজের সহিত কেবল যে তাহার ঐক্য নাই তাহা নহে অনেক বিরোধ আছে ৷”
ভারতবর্ষের মানবসমাজ যদি শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ থাকত তবে ভারতীয় সভ্যতাও সেই অচলায়তনে বাঁধা পড়ে থাকত ৷ সমাজ যেহেতু কোন অচলায়তন নয়, সেও কালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেকে পরিবর্তিত করেছে ৷ আর এই পরিবর্তনে ক্ষাত্রধর্মের আস্ফালন জন্ম দিল অন্য এক সমাজের ৷ যেখানে রাজার অত্যাচারের আর বীরত্বের অহংকার প্রজাসাধনের পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে ৷ জন্ম দিয়েছে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাজার ও রাজত্বের ৷ সমাজ সীমাবদ্ধ হয়েছে রাজা ও প্রজা – এই পরস্পর বিরোধী শ্রেণীর মধ্যে প্রতিনিয়ত সম্পর্কের অবক্ষয়ের মধ্যে ৷ আর এই অবক্ষয় আরোও ত্বরান্বিত হয়েছে রাজার সঙ্গে রাজার পরস্পর বিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৷ অস্ত্র আর বাহুবল নির্ভর বীরত্ব প্রদর্শনের অহংকারই, বৃহত্তর সমাজকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রত্তর করেছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে পরস্পরের থেকে ৷ এই ‘বিচ্ছিন্নতার ফাঁক দিয়া মুসলমান এ দেশে প্রবেশ করিল, চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল এবং পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এ দেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল’ – রবীন্দ্রনাথ ৷ কিন্তু শুধুমাত্র আপন করে নেওয়াতেই ভারতবর্ষের সমাজ থেমে থাকেনি ৷ হিন্দু ও মুসলমান, দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘাত তৈরী হয়েছিল সেই সংঘাতসঞ্জাত আবহাওয়া ভারতের সনাতন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধ্যান-ধারণার মূলেও আঘাত করেছিল-ফলস্বরুপ দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যসাধনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল ৷ হিন্দু ও মুসলমান সমাজের মিলিত ফসল অন্যমাত্রিক শ্রেণী বিভক্ত সমাজের জন্ম দিল ৷ আমরা পেলাম মানবপন্হী, কবিরপন্হী ও বৈষ্ণব সমাজ ৷ বহিরঙ্গে স্বতন্ত্র ধর্মমত ও পথের অনুগামী, কিন্তু অন্তরঙ্গে হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য অনুরাগী ৷ হিন্দুধর্মের ধ্বজাবাহক ব্রাক্ষণ্য সমাজ জাত যাওয়ার ভয়ে নিজের চারপাশে নানারকম বিধিনিষেধের দেওয়াল তুলে দিল ৷ এই সুযোগে মোগল সম্রাটেরা ভোগ-বিলাস আর সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় রাজকোষ সংগ্রহের অভিযানে নেমে পড়ল ৷ প্রজাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য নিয়োগ করা হল নবাব, নায়েব, সুবেদার, তহশীলিদার এমন বহুধা নামধারী খাজনা আদায়কারী বিভাগের ৷ জন্ম নিল সম্রাট ও প্রজাশ্রেণীর সূত্রধারী মধ্যস্বত্বভোগী বৃত্তিভিত্তিক শ্রেণী তথা হিন্দুধর্মের বর্ণভিত্তিক সমাজ আর মুসলমান সাম্রাজের ৷ বৃত্তিভিত্তিক সামাজিক কাঠামোয় অন্তর্মুখীন সংঘাত ভারতের সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে ৷ কিন্তু কালস্রোতের আবহে এই দুই ভিন্নধারার সংমিশ্রণ সঞ্জাত সমাজ সীমাবদ্ধ ছিল মূলতঃ ভারতবর্ষের পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ৷
বাংলাদেশে তার প্রভাব তখনো পড়েনি এমন নয় ৷ যে মুসলমান সভ্যতা ভারতের বুকে তার পা রাখে ১৯৬০ সালে সুলতান কুতুবদ্দীন্ আইবক এর হাত ধরে, সেই মুসলমান সভ্যতার হাতবদল হয় ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে মোগল সম্রাট বাবর যখন ইব্রহিম মোদীকে পাণিপথের ২য় যুদ্ধে পরাজিত ও হত্যা করেন ৷ ১৫২৬ থেকে ১৭৫৭ প্রায় আড়াইশত বৎসরের মোগল শাসন ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্হার এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে ৷ সেই শাসনের প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষ প্রভাব বাংলার অনার্য সভ্যতায় আচ্ছন্ন জীবনপ্রবাহকেও প্রবাহিত করেছিল ৷ কিন্তু কতটা প্রভাব ফেলেছিল তার স্বরুপ খুঁজতে গেলে সেই সময়কার ইতিহাসকেই খুঁজতে হবে ৷ যদিও সেই ইতিহাস যতটা তৎকালীন পাঠান সম্রাট ও তার সাম্রাজ্যের বিবরণে সমৃদ্ধ ততটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ছবিটি ৷ যদিও “একদিন ভারতের সমাজটাই ছিল প্রধানত পল্লীসমাজ ৷ এইরকম ঘনিষ্ঠ পল্লীসমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সঙ্গে সমাজগত সম্পত্তির সামঞ্জস্য ছিল ৷” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধ্যান ও ধারণায় এই সামঞ্জস্য বিধানের দ্রষ্টা আজও গ্রামবাংলার দারিদ্র ও শ্রেণী বিভক্ত সমাজের অন্তরে অন্তঃসলিলা ফল্গুর মত প্রবাহী হয়ে চলেছে ৷
অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকে প্রায় সত্তর বছর বাংলার সমাজজীবনে আমরা পেলাম, মজুমদার, তালুকদার, বকষী, মুনসী, তফাদার, খাস্তগীর, ওয়াদ্দাদার ও আরও অনেক রাজকর্মচারী, যা পরবর্তীকালে তাঁদের পদবী হয়ে দাঁড়ায় ৷ যে পদবী একবিংশ শতাব্দীতেও বর্তমান ৷ এই প্রসঙ্গেই আর একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বাংলায় বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা ঘোষ, বোস, মিত্র প্রভৃতির পদবীর উৎপত্তি কখন এবং কিভাবে হয়েছিল? যদিও সেই ইতিহাস স্বন্ত্রতভাবে গবেষণার দাবী রাখে ৷ কিন্তু একথা সত্য পঞ্চদশ কিংবা ষোড়শ শতকে চৈতন্যপূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে যে এইসব পদবীর জন্ম হয়নি তার সাক্ষ্য বহন করে তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ৷ যদিও সে ইতিহাসের চর্চা এখানে অপ্রাসঙ্গিক ৷ কিন্তু বাংলার নবাবী আমলের ইতিহাসে যে কর্মভিত্তিক শ্রেণীসমাজের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে তাকে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয় ৷ কেননা, ইতিমধ্যেই আমরা দেখলাম হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান ধর্ম সমন্বিত বাংলার সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসের একটি রুপরেখা ৷ তারসঙ্গে ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছে আরও একটি বিদেশী সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী খৃষ্টধর্মীয় মানবজাতির ভারতবর্ষের মাটিতে পদার্পণ ৷ এবং তা প্রচলিত সামাজিক অবস্হার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিল ৷ শুরুটা বাণিজ্যের তাগিদে ৷
১৫২০সালে হুগলীতে কুঠি স্হাপন করেছিল পর্তুগীজরা ৷ কিন্তু তাদের অসহনীয় অত্যাচারের জন্য ১৫৪৮ সালে শাহজাহানের রাজত্বকালে সেই কুঠি ধ্বংস করা হয় ৷ ১৫৯৯ সালে আকবরের আমলে ইংরেজরা বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরীর প্রথম প্রচেষ্টা করে ৷ সেই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি, ১৬১৩ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্হাপন ৷ ১৬৪২ সালে কাশিমবাজার, চুঁচুড়াতে ওলন্দাজ কুঠি স্হাপিত হয় ৷ ১৬৭২ সালে শায়েস্হা খাঁ এই বাংলার ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দেন ৷ তাঁরই আমলে ১৬৭৪ সালে চন্দননগরে ফরাসীরা বাণিজ্য কুঠী তৈরী করার অনুমতি লাভ করে ৷ এছাড়া এসেছে আর্মেনীয়রা ৷

লক্ষ্যণীয়, সমস্ত বাণিজ্যকুঠীই তৈরী হয়েছে সমুদ্র নিকটবর্তী অঞ্চলে এবং বাংলার নরম মাটিতে তাদের বাণিজ্য অভিযানে বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তা ঐতিহাসিক সত্য ৷ সেই সত্যের অনন্য উদাহরণ ১৬৯০ সালে, ইংরেজ বণিক জোব চার্ণকের সুতানটীতে পদার্পণ ৷ তখনও ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ রাজধানী কোলকাতার সমৃদ্ধি ভবিষ্যতের গর্তে ৷ যার অন্যতম কারণ, ১৬৯৮ সালে যখন ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী সুতানটী, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এই তিনটি গ্রামের খাজনা আদায়ের অধিকার লাভ করে তখন এই তিনটিই ছিল নগণ্য গ্রাম মাত্র ৷ ১৭০৬ সালে কোম্পানীকৃত বাড়ী ও রাস্তার জরিপে দেখানো হয়েছে তখন এই তিনটি গ্রামে মোট পাকা বাড়ীর সংখ্যা ছিল ৮, কাচাঁ বাড়ী ৮০০০, বড় রাস্তা ২ টি, গলি ২টি, কোন ছোট গলি ছিল না ৷ ১৭৫৬ সালে, অর্থাৎ মাত্র ৫০ বছরে এই ছবিটা সম্পূর্ণ পাল্টে যায় ৷ গ্রাম থেকে নগর হয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে ৷ “১৬৯০ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ তো কলকাতার ইতিহাস অন্ধকার যুগ বা প্রাগৈতিহাসিক যুগ ৷ এ যুগের বিশেষ কোন বিবরণ বা কাগজপত্র নেই ৷” (কলিকাতা দর্পণ, ‘আমার বক্তব্য’, রাধারমণ মিত্র, পৃঃ২৪) ৷

(চলবে…)

[লেখক – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত। স্বাধীন লেখক-গবেষক-কলামনিস্ট, গণজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতা বিষয়ে ইউটিউবার৷]

Facebook Comments

1 thought on “উনবিংশ শতকে বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজ এবং জীবিকা-সাংবাদিকতা : পৃথ্বী সেনগুপ্ত Leave a comment

Leave a Reply