শোভন ভট্টাচার্য-র কবিতা

fail

‘জীবাণু-সন্ত্রাস’

তোমার ধ্বংসের বার্তা তোমারই বিজয়-ব্য্যভিচারে;
মানুষকে মানুষ নয়, ভেবেছ গ্ল্যাডিয়েটর তুমি;
শিকল-গোঙানি যত শুনেছে তোমার মাতৃভূমি;
যত মৃত্যু, রক্তপাত, উদযাপিত অ্যাম্ফিথিয়েটারে…

মানুষের মুণ্ডু কেটে তোমরাই তো খেলেছ ফুটবল;
প্রথম সূর্যের দেশে ছুড়ে এসছ পরমাণু বোমা;
কোথাও খইয়ের মতো ছড়িয়েছ মিসাইল তোমার;
জ্বলন্ত ক্ষুধার মুখে তুমি গুঁজে দিয়েছ পিস্তল।

তোমার মরণ দেখে প্রকৃতিবিধাতা আজ হাসে।
মাটিতে লুটোয় আকাশের হাসি— হাসে কালপুরুষ—
তিনিও হাসেন, ঘরে ঘরে যার টাঙিয়েছ ক্রুশ—
তুমি কিনা কাঁপছ পারমাণবিক সামান্য ভাইরাসে?

তোমরাই তো চেয়েছিলে ধ্বংসাত্মক ‘জীবাণু-সন্ত্রাস’;
এখন কে কাকে মারবে? কে কবর দেবে কার লাশ?

পরিযায়ী

অসুখ উড়িয়ে আনলে, সব সুখের পায়রা এল দেশে;
যতদিন না জান-জাহান ছেয়ে গেল পর্যাপ্ত জীবাণু।
কে তুমি সরকার আর এ তোমার কী ‘কালাকানুন’
পরিযায়ী শ্রমিকেরা দেশের ভেতর গেল ফেঁসে।

ভিনরাজ্যে, কর্মহীন, অনাহারে, অনিশ্চয়তায়;
লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি, লক্ষ-কোটি ক্ষুধাক্লিষ্ট প্রাণ
পড়ে থাকল, পচতে থাকল একা— অসহ্য পেটের টান
সামলাতে না পেরে কেউ, বাড়ির আলেয়া-পথ পা’য়

হাঁটা শুরু করল— পথে ঝরল কত মেহনতী লোক;
তারাই দেশের চাকা ঘোরাত লকডাউনের আগে;
তাদেরও বাড়ি-ফেরার জন্য যে কয়েকটা চাকা লাগে
কে চায় সে-কথা ভাবতে? তাদের মরণে কার শোক?

ত্রাণের প্লাস্টিকে ছাপা মন্ত্রীর প্রধান-মুখ্য মুখ
দেখায়— মহামারির চেয়ে কত গভীরে অসুখ।

‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’

এত যে অজস্র পাপড়ি ঝরা পথ, হলদে-লাল-নীল;
এত যে বৈশাখ-বেলা বৃথা যায় পথে গড়াগড়ি;
এত যে কালবৈশাখী সন্ধ্যা বাঁধে মেঘের কবরী;
দেখবে কে, মানুষ আজ ঘরে, দোরে দিয়ে শক্ত খিল।

মানুষের জানলা-দরজা বন্ধ আজ জীবাণুর ত্রাসে;
পাড়ায় পাড়ায় কড়া নাড়ে অসুখের ঘূর্ণিটান;
একা কাঁদে খালপাড়ের পরিত্যক্ত চায়ের দোকান;
এমনকী চাপাকান্না ঘন গাছপালার দীর্ঘশ্বাসে।

ভাগ্যিস একজন লোক, পুলিশের চোখে দিয়ে ধুলো
লকডাউন ভেঙে আসে এতদিন পর এ-রাস্তায়;
পথ-কুকুররাও যেন আলাপের অবকাশ পায়;
নড়েচড়ে বসতে দেয় শূন্য বুকে ফাঁকা বেঞ্চগুলো।

চেনা প্রকৃতির কাছে সে-ও তো অচেনা লোক নয়,
সামাজিক দূরত্বই যার চিরদিনের আশ্রয়।

Facebook Comments

Leave a Reply