কতটা ‘ধর্ম’ বুঝলে তবে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বোঝা যায় : প্রসঙ্গ পশ্চিমবঙ্গ – সৌরভ রায়

fail

কতটা ‘ধর্ম’ বুঝলে তবে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বোঝা যায় : প্রসঙ্গ পশ্চিমবঙ্গ

ঈশ্বর আছেন কি নেই সে সব তত্ব ঘেঁটে, তিনি থাকলেও তাঁর বুক-ছাপানো সাদা দাড়ি আছে কিনা, বা তিনি লাল বেনারসী পরে সিংহে চড়েন কিনা তা যাচিয়ে, আর তারপর তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক ঠিক কিভাবে হবে, তার দাবিসনদ খতিয়ে দেখে, একদম সব কিছু পাকাপোক্ত করে নিয়ে তারপরে মানুষ ধর্ম অবলম্বন করে না।
প্রথমে হিন্দু ধর্মের কথা ধরা যাক। কে হিন্দু, কে হিন্দু নয়, কাঞ্চা ইলিয়াকে মানবো, না শশী থারুরকে জানবো এত কিছু তর্কে যাবার আগে এখনো অব্দি আমাদের পাওয়া হিন্দু হবার সবচেয়ে মজবুত সংজ্ঞাটা দেখে নেওয়া যাক – হিন্দু তাঁরাই যাঁরা বেদ-পুরাণ মানেন, জাতিভেদপ্রথা (ওরফে ব্রাহ্মণের জাতিশ্রেষ্ঠত্ব) মানেন আর তৃতীয়ত, সবচেয়ে জরুরী, যাঁরা তাঁদের জীবনের দশটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ‘দশ সংস্কার’ পালন করেন। (Von Stietencron, Heinrich, “Hinduism : On a Proper Use of a Deceptive Term” G. D. Sontheimer, and H. Kulke (Editors). Manohar, New Delhi, “Hinduism Reconsidered.” (1989): pp. 11 – 27 ) দশটির মধ্যে প্রথম তিনটি সংস্কার হল গর্ভাধান আর জন্ম আর অন্নপ্রাশন। এর সাথে তুলনা করুন মুসলিম ধর্মের ‘সুন্নত’ বা সারকামসিশন বা খ্রিস্টান ধর্মের জলসংস্কার বা ‘ব্যাপ্টিজম’-কে। যেমন ছোট বাচ্চাদের ল্যাক্টোজেন খাওয়ানো হবে, না শুধু বুকের দুধ আর তাদের ঠিক কোন কোন টীকা দেওয়া হবে এই ব্যাপারে তাঁদের বাবা-মা তাঁদের সাথে মিটিং করেন না, তেমনি তাদের হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিস্টান করা হবে কিনা তার সিদ্ধান্ত বাচ্চাদের বিনা অনুমতিতেই করা হয়ে থাকে। ‘ধর্মবিশ্বাস’ শিরোনামাঙ্কিত একটি সাদা কাগজে আপনার সই আপনার হয়ে অভিভাবকরা করে দেন আর আপনার জীবনের পর্বে পর্বে সেই সাদা কাগজে নতুন নতুন শর্ত লেখা হ’তে থাকে, কারণ আপনার সই ও আনুগত্যের অঙ্গীকার আগে থেকেই নেওয়া আছে।

ধরা যাক, আপনার উপনয়নের আগে বা আপনার ইন্টারফেথ বিবাহের আগে বা আপনার কুইয়ার পার্টনারের সাথে সন্তান দত্তক নেবার আগে, ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠানের ক্রূরতা, পাশবিকতা, নিষ্ফলতা ইত্যাদি সম্পর্কে আপনার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল ও আপনি এই আফিমের গুলি সজ্ঞানে জীবনভ’র খেতে অস্বীকার করলেন। সানুষ্ঠানে বা নীরবে, নিরাড়ম্বর ভাবে আপনি ধর্ম ত্যাগ করলেন, যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিক পাপাত্মা কমিউনিস্ট হলেন বা নিওলিবারাল নিউএজ স্পিরিচুয়ালিস্ট হলেন বা ঘোর নীল আম্বেদকরি হলেন, ইত্যাদি। কিন্তু ধর্মকে আপনি ছাড়লেও ধর্ম নামক কমলি আপকো নেহি ছোড়তি। যেমন ধরুন, ধর্ম ছাড়ার পরেও হয়তো আপনি খাওয়ার পাতে মেনে চলেন হিন্দুদের এঁঠো নিয়ে গভীর ও জটিল নিয়মাবলী যাকে আমরা আধুনিক যুগে ‘হাইজিন’-এর আড়ালে মান্যতা দিই। কিন্তু পৃথিবীর অন্য সমস্ত ধর্ম এবং জাতির মধ্যে এর অনুপস্থিতি দেখে যদি এটা নিয়ে তদন্ত করতে শুরু করি তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে এর ভিত শুদ্ধাচার বা ‘রিচুয়াল পিউরিটি’-র ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেই একই ভিতের ওপর, মনু-কর্তৃক উক্ত ঋগ্বেদীয় পুরুষসুক্ত, ব্রাহ্মণের জাতিশ্রেষ্ঠত্ব আর জাতিভেদপ্রথা দাঁড়িয়ে আছে। যেই একই যুক্তিতে ব্রাহ্মণের পায়ের ধুলো হয় পদরেণু আর দলিতের হাতের ছোঁয়া হয় বিষ। অতএব বেদপুরাণের জ্ঞান আপনার পেটে একতিল না থাকলেও, দশসংস্কারের জাল কেটে আপনি বেরিয়ে আসলেও, হিন্দু হবার সনদের দু’ নম্বর শর্তের নীচে আপনার সই কিন্তু আপনার অজান্তেই রয়ে গেছে। আর আপনার দৈনিক জীবনযাপন সেই সইয়ের ওপর দাগা বুলিয়েই চলেছে। একেই নৃতত্ববিদ বালমুরলী নটরাজন ‘কালচারাইজেশন অফ কাস্ট’ ব’লেন (Natrajan, Balmurli. The culturalization of caste in India: Identity and inequality in a multicultural age. Routledge, 2011. )। জাতিভেদের সামাজিকতা বুঝতে গিয়ে আমরা শুধু পরম্পরাগত বৃত্তি, শুদ্ধতার উপর-নিচ, খুঁটিনাটি, আচারবিচার আর অন্তর্বিবাহ (জাতের মধ্যে বিয়ে) নিয়েই চর্চা করি। জাতিভেদের রাজনীতিক দিক বুঝতে গিয়ে আমরা জাতিসভা আর দলিত রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করি। আর জাতিভেদের অর্থনৈতিক দিক বুঝতে গিয়ে আমরা ধনতন্ত্রের প্রকৃতি আর বৃত্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে একই জাতি কিভাবে নানা শ্রেণীতে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা করি। ‘কিন্তু কালচারাইজেশন অফ কাস্ট’ বা জাতিভেদের সংস্কৃতিকরণের মাধ্যমে জাতিভেদ আর তার মাধ্যমে হিন্দুধর্ম বেঁচে থাকে। ‘এনিহিলেশন অফ কাস্ট’ দূর-অস্ত রয়ে যায়। জাতিভেদ ম’লেও যায় না মরে। আর এই উদাহরণটি ছিল নেহাতই এক্সিবিট এ।
কিন্তু ধর্মের বেঁচে থাকার এই শিকড়বাকড়ের ক্রমনবায়নের গল্প শুধু হিন্দুধর্মের নয়। যেহেতু আমার হিন্দু পরিবারে জন্ম এবং হিন্দু বিদ্যালয়ে পড়াশুনো (মানে হিন্দু স্কুল নয়, রামকৃষ্ণ মিশন) এবং গবেষণার কাজে হিন্দুধর্মকে নিয়ে নাড়াচাড়া তাই নানাদিক থেকে এই জ্ঞান আমার মধ্যে জমা হয়েছে। কিন্তু আমার ‘ধার্মিক’ বা ‘অধার্মিক’ মুসলিম বা খ্রিস্টান বন্ধু বা বিশেষ পরিচিতদের মধ্যে আমি এই শিকড়বাকড়ের গল্পের খুব একটা ব্যত্যয় দেখিনি। কোনও ধর্ম অবলম্বন করা মানে শুধু সেই ধর্মের পুঁথি পড়া, তার আচার-বিচার-পবিত্র ক্ষেত্র-তীর্থ ইত্যাদি মান্য করা আর অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে কোঁদল করাই যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন ধর্ম, তা ১৭০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের বৈদিক ধর্মই হোক আর ১৯৭৫-এ প্রতিষ্ঠিত ‘জয় সন্তোষী মা’-র দলধর্মই হোক এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন ও জীবনধারা – লাইফকোডের একটা ফুল প্যাকেজ – দিতে চায়, বাঁচার-ভাবার-খাবার-শোবার-দেখার-ঘুমনোর পুরো কোর্স এবং তার পরিবর্তে দাবি করে দান, বশ্যতা, মান্যতা, উৎসাহ। আর আগেকার যুগে ধর্মের মুরোদ যখন আরও বেশী ছিল, বা যে যে ধর্মের মুরোদ এখনো বেশী আছে, তারা এর সাথে সাথে দেয় জীবিকার যোগাড় আর জীবনধারণের নানা যোগান – ইস্কুল থেকে শুরু করে শেষকৃত্য পর্যন্ত, আনন্দের, স্বেচ্ছাসেবার, ও জীবনের মানে খোঁজার নানারকম উপাচার, নিজের থেকে বড় একটি যূথের অংশ হবার মানুষী ইচ্ছার এক তৃপ্তি ইত্যাদি। এখন সেই সুযোগগুলি রামকৃষ্ণ মিশন বা আল-আমিন মিশন যতটা দিতে পারবে, পাড়ার শনিপূজোর হোয়াটসএপ গ্রুপ যে ততটা দিতে পারবে না সেটা বলাই বাহুল্য। সেদিক থেকে দেখলে, ধর্ম মানুষের তৈরি যেকোনো সামাজিক-রাজনৈতিক-ঈডিওলজিকাল প্রতিষ্ঠানের থেকে – সে প্রতিষ্ঠান ভার‍তরাষ্ট্রই হোক বা পিপলস স্টাডি সার্কল – খুব একটা আলাদা নয়।
সত্যি বলতে কি, ধর্ম জিনিসটাকে আমরা যে নীরবে বইপত্তর পড়ে আমাদের মাথার ভেতর ইন্টেলেকচুয়ালি পালন করি আর এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা অশিক্ষিত ছোটলোকির বা বিপজ্জনক গোঁড়ামির বা ‘ফলস কনশাসনেস’-এর লক্ষণ, এই মত বহুলাংশে আধুনিকতা এবং বিশেষতঃ আধুনিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দান। আর এই আধুনিকতার প্রসাদের ভাগ যে শ্রেণী যত বেশী পেয়েছে, যেমন আমরা আলোকপ্রাপ্ত বাঙালী মধ্যবিত্ত শ্রেনী, ধর্ম নামক আফিমটির প্রতি ভয়-মিশ্রিত অবজ্ঞা তাদেরই সবচেয়ে বেশী। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের আগে সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এককাট্টা হবার অন্যতম প্রধান ঈডিওলজি ছিল ধর্ম। আর রাষ্ট্রের পতাকাতলে নতুন দল গড়তে গেলে হয় পুরনো দলের নতুন নাম দিতে হয়, অর্থাৎ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হয় আর নইলে পুরনো দল ভেঙ্গে নতুন দল গড়তে হয়। সমাজতাত্বিক আদিত্য নিগম একেই ‘আনমার্কড সিটিজেন’ বা ‘চিহ্নহীন নাগরিক’ তৈরির পদ্ধতি বলেন। (Aditya Nigam, The Insurrection of Little Selves: The Crisis of Secular-Nationalism in India (New Delhi: Oxford University Press, 2006)) আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতে যুক্তির আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিমানুষ কোনওভাবেই অন্য কোন ধার্মিক-সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক জগতের আশ্রিত হয়ে থাকতে পারে না। তাঁদের রাষ্ট্রপূর্ববর্তী সমস্ত ‘সঙ্কীর্ণ’ জগতের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তিই স্বাধীন রাষ্ট্রের একজন স্বাধীন নাগরিক হবার পূর্বশর্ত। আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য রাষ্ট্র-ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত যূথবদ্ধতা ভেঙ্গে একজন আদর্শ বিমূর্ত ব্যক্তিনাগরিকের উৎপাদন অত্যন্ত জরুরী, কারণ ব্যক্তিনাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের কাছে সর্বাগ্রগণ্য। যে ব্যক্তিনাগরিক তার সব রকম সুযোগ সুবিধে আর দাবি-দাওয়া নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে আসবে, আর কোথাও যাবে না। তারা গণপরিসর ও গণমাধ্যমে যুক্তিপূর্ণ ভাবে নানা সমস্যা নিয়ে বিতর্ক করবে, ও শেষ পর্যন্ত আইন ও সংসদের কাছে যাবে (যে দুটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চমানের বিতর্কসভা), আর এভাবেই সব সমস্যার সমাধান হ’বে। অর্থাৎ ভারতের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই যে, সংখ্যাগুরু ‘সেকুলার’ হিন্দু নাগরিকের মত যে নাগরিক বাহ্যতঃ চিহ্নহীন হতে পারে না, যেমন মুসলিম বা দলিত, নানা পাকে চক্রে রাষ্ট্র তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার ব্যবস্থা করে। কারণ তার পূর্ণ আনুগত্য রাষ্ট্রের প্রতি আছে কি না, সে বিষয়ে রাষ্ট্র তাকে কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারে না। কারণ যদি এত রাষ্ট্রানুগত্য থাকত, তাহলে তার গায়ে এখনো পুরনো দলের চিহ্ন কেন?
ভারতের ইতিহাসে ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের এই ‘ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি’ নীতির ইতিহাস স্বাধীনতার অনেক আগের। গরুর আর শুয়োরের চর্বির গুজব থেকে জ্বলে ওঠা ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহের আগুন যখন নেভানো হ’ল, দেশে কোম্পানীর শাসন চলে গিয়ে রাণীর শাসন জারি হ’ল। সেই মর্মে লাগু ‘গভর্ণমেন্ট অফ ইন্ডিয়া এক্ট ১৮৫৮’-র অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতবাসীর ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তাকে প্রকাশ্যে না ঘাঁটানো এবং সরকারি ভাবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বজায় রাখা। কিন্তু যথারীতি অপ্রকাশ্যে ধর্মের রাজনীতিকে শাসনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা বজায় ছিল। এটি ছাড়াও আরও স্বল্প আলোচিত আধুনিকতার অভিঘাতে ব্রিটিশ ভারতে ঘটে যাওয়া শত শত ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ঘটনা যা – কোন কোন একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মে একচেটিয়া ভাবে ঘটে নি। এই অজস্র ধর্মসংস্কার আন্দোলন নিয়ে ঐতিহাসিক কেনেথ ডব্লিউ জোনসের করা বিরাট কাজকে বিহঙ্গদৃষ্টি দিয়ে দেখলে (Kenneth W. Jones, The New Cambridge History of India, III.1, The Socio-religious Reform Movements in British India (New York : Cambridge University Press , 1989)) আমরা বুঝি যে জনমানসে ‘ধর্ম কি?’ তার সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল এই সব সংস্কার আন্দোলন। ধর্মকে ভাগ করে দিয়েছিল ব্যক্তিগত আর গণগত এই দুই ভাগে। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাগে ধর্ম নিয়ে চর্চা, আচার, বিচার, আলোচনা চলে লোকচক্ষুর আড়ালে চার দেওয়ালের বা নিজের ধর্মমতের চৌহদ্দির ভেতরে। আর ধর্মের আদর্শ গণগত বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা সামাজিক গণহিতৈষণার কাজে বা ত্রাণের কাজে, যা আদতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই ধর্মকে একদিকে মুছে দিয়ে আর আরেকদিকে জিইয়ে রাখায় রাষ্ট্রের স্বার্থ বিলক্ষণ আছে। বিশেষ করে সেই ধর্ম যদি রাষ্ট্রের বকলমে নাগরিকদের আত্মিক মালিকানার দেখভাল করে।
আর ভারতে ধর্ম যেহেতু রাষ্ট্রের থেকে অনেক পুরনো একটি প্রতিষ্ঠান অতএব তার প্রাতিষ্ঠানিকতার আর প্রয়োজনীয়তার শিকড়-বাকড় রাত বারোটার ডেস্টিনি বদলের মত এত সহজে বদলানো যায় না। বিশেষতঃ যখন কংগ্রেস-পরিশাসিত আর মোদ্দা অংশ হিসাবে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী-পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলন বকলমে একটি হিন্দুপ্রাধান্যবাদী আন্দোলন। সেই স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে সৃষ্ট ‘জাতীয়তাবাদ’ যা ঐতিহাসিক শবনম তেজানীর মতে (Shabnum Tejani, Indian Secularism: A Social and Intellectual History (1890-1950) (Ranikhet: Permanent Black, 2007)) স্বাধীনতা-পরবর্তী ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ বা সেকুলারিজমে ভোলবদল করে, তা মূলধারার ছুপা-হিন্দুপ্রাধান্যবাদী, অর্থাৎ শিক্ষিত-শহুরে-স্বচ্ছল-সাবর্ণবাদী। এই ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ যেকোনো ধর্মভিত্তিক জোট দেখলেই তাকে ‘কমিউনাল’ বা ‘সাম্প্রদায়িকতাবাদী’ হিসেবে ডরায়। আর তার মধ্যে ভারতমাতার অখণ্ড দেহ থেকে নতুন নতুন টুকড়ে-টুকড়ে পাকিস্তানের জন্ম নেওয়ার অশনিসংকেত দেখতে থাকে।
যেকোন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের ধর্মপালনের যে আদর্শ কল্পনা – অর্থাৎ ধর্ম শুধুই ব্যক্তিমানুষের এক ব্যক্তিগত বিশ্বাস, তা হয় বৌদ্ধিক ভাবে মানুষের মাথার খুপরির মধ্যে, বা আচারগত ভাবে ঘরের আর ধর্মস্থানের চার দেয়ালের মধ্যে পালিত হবে এবং গণপরিসরে আর গণমাধ্যমে পালিত যেকোনো ধর্মোৎসবকে শুধুই সাংস্কৃতিক উৎসব হিসাবে দেখা হবে – সেই কল্পনাকে এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখলেই বোঝা যায় যে ভারতবর্ষের পক্ষে তা ঘোর অবাস্তব। ধর্ম শুধু কয়েকটি পুঁথি, কয়েকটি আচার-নিধান, আর কিছু উৎসব দিয়ে গড়া জাদুঘরের শো-পিস নয়, তা এক ক্রমনবায়মান, ক্রমবিবর্তমান জ্যান্ত মানুষের গড়া রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা এমন অনেক রশদের জোগান ভারতের মানুষকে দিয়ে চলে যা আধুনিকতা বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তাকে দেওয়ার মুরোদ বা সদিচ্ছা নেই। অতএব তাকে চোখ ঠেরে, ভাবের ঘরে চুরি করে বেপাত্তা করে রাখলে সে নানারূপে আসিবেই ফিরিয়া। ধর্মপালন যেমন কিছু সেকেলে লোকের গোঁড়ামির ওপর ভর দিয়ে চলে না, ‘সাম্প্রদায়িকতাবাদ’-ও তেমনি নেহাত কিছু বদলোকের নষ্টামির ওপর বা অর্থনৈতিক মতলববাজির ওপর ভরসা করে সদাবর্তমান থাকে না।
ধর্মকে এক তুড়িতে গণপরিসর থেকে হাওয়া করে দেওয়ার খোয়াব যে বাস্তবের কতটা পরিপন্থী তা বোঝা যায় আশগর আলি ইঞ্জিনিয়ারের করা ১৯৫০ থেকে ২০০২ অব্দি ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া সমস্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খতিয়ান দেখলে (Engineer, Asgharali, ed. Communal riots in post-independence India. Universities Press, 1997. ) যার পাতায় পাতায় রায়টের মূল ইন্ধন হিসেবে লেখা আছে ভারতের প্রান্তে প্রান্তে হিন্দু বা মুসলিম উৎসবে মাইক ‘বেশী জোরে’ বাজানো বা শোভাযাত্রায় ‘অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস’ দেখানোকে। কতটা বেশী, বেশী আর কতটা অতিরিক্ত, অতিরিক্ত যা যথারীতি নির্ধারিত হয়ে এসেছে কোন মহল্লায় কোন ধর্মগোষ্ঠীর সংখ্যাগতভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, ভোটারসংখ্যাগতভাবে ও প্রশাসনিকভাবে জোর কত, তার ওপরে।
এতটা অব্দি ধর্ম বুঝেও পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িকতাকে বুঝতে আরও বেগ পেতে হবে কারণ বঙ্গে ইসলামের ও মুসলমানির আগমন বহু আগে থেকে, ঠিক করে বলতে গেলে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে। (Eaton, Richard Maxwell, and Richard M. Eaton. The rise of Islam and the Bengal frontier, 1204-1760. Vol. 17. Univ of California Press, 1993. ) একমাত্র কেরালা ছাড়া (যেখানে ইসলামের আগমন বাণিজ্যসূত্রে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে) ভারতের আর কোথাও হিন্দু ও মুসলমান এত শ’ বছর ধরে সহাবস্থান করে নি। আর ‘সাম্প্রদায়িক সংঘাত’ বলতে আমরা হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বকেই সাধারণতঃ বুঝে থাকি। ‘সহাবস্থান’ শব্দটি শুনেই আমাদের মনে হেথায় সবাই এক দেহে হ’ল লীন-এর রেকর্ড বেজে ওঠে। এই সুরকে পণ্ডিতরা ‘ নানা ধর্মের সহাবস্থানের ফলে সংকরায়ন’ বা ‘সিঙ্ক্রেটাইজেশন’ বলে থাকেন। কাগজে, টিভিতে, বইতে আমরা এই সংকরায়নের উদার উদাহরণ হরবখত শুনে থাকি, হিন্দু-মুসলমানের নানা মিশ্র আচার, হিন্দু প্রতিমা তৈরির মুসলমান কারিগর, হিন্দু-মুসলমানের একই পীরের থানে বা এক দেবতার থানে মাথা ঠেকানো, ইত্যাদি। এই সব গল্প শুনে আমরা যে লিবারেল তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি তাতে অনেকগুলো মুশকিল আছে। প্রথমতঃ, সামাজিক ও ধার্মিক সহাবস্থান মানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপদের অনুপস্থিতি নয়। দ্বিতীয়তঃ, শিক্ষিত-শহুরে-স্বচ্ছল-সাবর্ণবাদীরা যে ‘সেকুলার আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’-র মন্ত্রোচ্চারণ করে থাকেন তার মূলে যে হিন্দুপ্রাধান্যবাদ আছে এবং তার বহুত্ববাদ যে জাতিবাদের মত, অর্থাৎ একধরণের ‘স্ট্রাকচারড সোভরেনিটি’ অর্থাৎ ধাপবন্দী শর্তসাপেক্ষ স্বাধীনতা, সেই গূঢ় সত্যকে অস্বীকার করা হয়। আর তৃতীয়তঃ, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক, তা “ভারতে-সব-ধর্ম-মিলে-মিশে-আছে-শুধু-কিছু-দুষ্টু-লোক-সাম্প্রদায়িকতা-ছড়ায়” ক্ষমতার ও রাষ্ট্রের এই গুলগল্পের ভাষ্যকে এই তৃপ্তির ঢেঁকুরে মান্যতা দেওয়া হয়। ধার্মিকতা ও সাম্প্রদায়িকতা যে শুধু বিজেপি- আর এস এস-এর নষ্টামি নয়, তার সাফল্যের শিকড় যে আরও গভীরে, সেই সন্ধান শুরু করাই পিপলস স্টাডি সার্কলে আমাদের ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করার প্রধান উদ্দেশ্য।
যেমন এই ‘ধর্মের সহাবস্থান হেতু সংকরায়ন’-এর তত্ব নিয়ে নৃতত্ববিদ র‍্যালফ নিকোলাস (বাংলার হিন্দুধর্ম নিয়ে যিনি সারা জীবন গবেষণা করেছেন) বলেন এই সংকরায়নের তত্ত্ব দুটি ধর্মের মধ্যে নানা সমান্তরাল আর নানা মিশ্র আচার-বিচারের জটিলতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্মতাত্বিকদের প্রয়োজন থেকে সৃষ্ট। নানা ধর্মের নানা টুকরো কাছাকাছি রাখলেই তা আমে-দুধে মিশে যায় না। পাশাপাশি থাকলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক সস্ত্বাগত ভাবে আলাদা থাকা যায়। (Nicholas, Ralph W. Thirteen Festivals: A Ritual Year in Bengal. By Ralph Nicholas. New Delhi: Orient Black Swan, 2015. )
এই অতিসরলীকৃত এবং অতিসুবিধাবাদী সংকরায়ন তত্ত্ব নিয়ে ভীমরাও রামজী আম্বেদকরের মতামত আরও তেতো এবং কড়া। তাঁর মতে, একরকম আচার-বিচার সমাজে এক হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট বাঁধন নয়। ভারতীয় অর্থাৎ হিন্দু সমাজ যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের কথা বারংবার বলে, সেই ঐক্য হল গোঁড়ামি-গত ঐক্য (মূলত জাতিভেদ) আর বৈচিত্র হল সেই গোঁড়ামির নানা রকমফের। নানা ধর্মের নানা সংস্কারের যে মিল দেখা যায়, তা আসলে বছরের পর বছর পাশাপাশি থেকে যার যার নিজের জাতের প্রথা মেনে চলার ফল। যে সমান্তরাল বা মিশ্র ধার্মিক ঐতিহ্যকে এত মান্যতা দেওয়া হচ্ছে, তা আসলে এক জাতি থেকে অন্য জাতিতে প্রবাহিত বা সংক্রামিত কিছু মামুলি অভ্যেস। (Soumyabrata Choudhury, Ambedkar and Other Immortals : An Untouchable Research Programme, (New Delhi: Navayana, 2018)) আম্বেদকরের যুক্তিক্রমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যেও নানা বকলমে জাতিব্যবস্থার প্রাদুর্ভাব।
ধর্মের এই মিশ্রতা-সংকরতা-একীকরণকে না মানলে, তাহ’লে কি চুল চিরে চিরে আলাদা আলাদা করে পড়বো পশ্চিমবঙ্গের নানা ধর্মকে, পশ্চিমবঙ্গের ‘সাম্প্রদায়িকতাকে’ জলের মত করে বোঝার জন্য? সেকেলে স্কলাররা যেমনভাবে পড়তেন, প্রথমে মুখ্য কয়েকটি বিভাগ করে, তারপর প্রত্যেকটি বিভাগের মধ্যে মুখ্য-গৌণ উপবিভাগ করে, আর তার মধ্যে উপ-উপবিভাগ করে। যেমন ১৮৬২ সালে এচ ডব্লু উইলসন তাঁর ‘রিলিজিয়াস সেক্টস অফ দি হিন্দুস’-এ প্রথমে বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত এই তিনটি মুখ্য বিভাগ (অক্ষয় কুমার দত্ত আবার পরে তার সাথে সৌর এবং গাণপত্য জোড়েন) আর তারপর দন্ডী-দশনামা, যোগী, পরমহংস, জঙ্গম, উর্ধবাহ-আকাশমুখী-নলখৈশ, করলিঙ্গ, রুখরস-সুখরস-উখরস, গুরুরস, সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী-অবধূত, গণপতি, স্বরপতি, নানকশাহী, জৈন, বেবালি, প্রাননাথী, সাধু, শতনামী, শিবনয়নী, শূণ্যবাদী এই আঠারোটি সম্প্রদায়ে ভাগ করেন। এইভাবে আমাদের পড়াশুনা করার মুশকিল হল, ধর্মতাত্বিকদের কাছে মুখ্য ধর্মসম্প্রদায় আর গৌণ ধর্মসম্প্রদায় প্রধানত ঠিক হয় কোন ধর্মসম্প্রদায়ের শাস্ত্রিক ভিত্তি, আচার-বিচারের, নিয়ম-বেনিয়মের লিস্টি অন্যদের থেকে কতটা পাকা আর কতটা আলাদা মানে মোটের ওপর সেটা কতটা কোডিফায়েড তা দিয়ে। আর আধুনিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যা আধুনিক ভোটভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে চলে, সেই কান্ডারীদের কাছে মুখ্য ধর্মসম্প্রদায় আর গৌণ ধর্মসম্প্রদায় প্রধানত ঠিক হয় প্রতিটি ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষদের মাথাগিনতি দিয়ে। আর সেই মাথাগিনতি যেকোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মাথাগিনতির মতই বছর বছর বদলাতে থাকে। অতএব মুখ্য-গৌণের হিসাবের এই গরমিল মেলানোর জন্য কি আমরা তাহলে আদমসুমারীর ধর্মভিত্তিক ডেটা ব্যবহার করবো? শেষ পর্যন্ত সেটা করতে হলেও তাতে মুশকিল কম নেই। আদমসুমারীর তথ্য পাঁচ-দশ বছরের বাসি হবার মুশকিল ছেড়ে দিলেও তা্তে ধর্মের মুখ্য-গৌণ সম্প্রদায়ের মাথাগিনতির সমস্যা যায় না। আদমসুমারীর নিজস্ব মুখ্য-গৌণ শ্রেণীবিভাগ আছে। খুব কম মানুষই নিজেকে ‘শুধু হিন্দু’ বা ‘শুধু মুসলমান’ বলে থাকেন। কোন মুসলমান নিজেকে শুধু সুন্নি বা শিয়া বা ইসমাইলি না বলে হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি, হাম্বলি, জাহিরি, জাফরি, জায়েদি, ইবাদি মাযহাবের বা সুফি শাহ জালাল, হযরত শাহ মখদুম, বা শাহ মখদুম রূপোশ বা হযরত শাহপরানের অনুগামী বলতে পারেন। এইসব শ্রেণীবিভাগ হয়ত সুমার-এর তালিকাতেই নেই। আর বিংশ শতাব্দীতে বহুবার আদমসুমারী হয়ে হয়ে ভারতীয়দের নিজের নিজের ধর্মসম্প্রদায়ভুক্তির চেতনা মজবুত হবার আগে, অনেকে যেমন নিজের পেশাগত জাতিপরিচয়কেই নিজের ধর্ম বলেন, তা এখনো হতে পারে। “তোমার ধর্ম কি?” “বাবু, আমি চাষি।” এমত প্রশ্নোত্তরের উদাহরণ ভারতের আদমসুমারীর ইতিহাসের পাতায় ঢের ছিল, আছে ও থাকবে। এসব মুশকিল কাটিয়েও আদমসুমারীর মুখ্য-গৌণ সংক্রান্ত তথ্যের আঁকড়া বিশ্বাস করা মুশকিল। যেখানে শূদ্র-দলিত-বহুজন নিজেদের হিন্দু বলছে কিনা তার ওপরে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাফল্য নির্ভর করেছে। যেমন ১৯৪১-এর সেন্সাসে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভা মিলে হিন্দু ধর্মের দ্বারা নিপীড়িত ‘হরিজন’-দের বাধ্য করেছিল সেন্সাসবাবুদের কাছে নিজেদের হিন্দু বলতে, যাতে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরা মাথাগুনতিতে অনেক এগিয়ে থাকতে পারে।
এসব থেকে সরে এসে আমরা যদি ধর্মকে মূলবাদী-প্রতিবাদী (অর্থোডক্স-হেটেরোডক্স) এইভাবে দেখি তাহলে আমাদের সমাজে সাম্প্রদায়িকতার চলন বুঝতে সুবিধে হবে। সংক্ষেপে ধর্মের মূলবাদী-প্রতিবাদী প্রকৃতি বোঝাতে গেলে বলতে হবে যে, মূলবাদী বা মূলধারার ধর্ম যখন তার অধিকাংশ অবলম্বনকারীদের জন্য খুব চাপের হয়ে ওঠে, তার বিপ্রতীপে সেই ধর্মের থেকে একটু আলাদা বা বেশ আলাদা কোন ধর্ম গড়ে উঠলে পুরনো ধর্ম ছেড়ে মানুষ ধীরে ধীরে নতুন ধর্মের শরণাগত হয়। তারপর প্রতিবাদী ধর্ম বাড়তে বাড়তে মূলবাদী হয়ে ওঠে, তার বিপ্রতীপে আরেক প্রতিবাদী ধর্ম গড়ে ওঠে। যেমন ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিপ্রতীপে বৌদ্ধধর্ম এবং থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের বিপ্রতীপে মহাযান। বা ওয়াহাবী ইসলাম ধর্মের বিপ্রতীপে সুফী ইসলাম। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক রাজনৈতিক দল ভাঙ্গাভাঙ্গির মত বা কোষবিভাজনের মত এত সরলসাদা নয়। জাতিবাদের প্রতিবাদে ভক্তিবাদী যে সমস্ত ধর্ম আন্দোলন মধ্যযুগীয় ভারতের কোণে কোণে গড়ে ওঠে তাদের গঠন-চলন-পালন মূলবাদী ব্রাহ্মণ্যধর্মের থেকে এতটাই আলাদা যে তাদেরকে কোনভাবেই নেহাত প্রতিবাদী শাখানদী বলা যায় না। বা ব্রিটিশযুগে পশ্চিমী আধুনিকতার অভিঘাতে যে ভূরি ভূরি নতুন ধর্ম আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল তারা সবসময়ে মোটেও একে অপরের প্রতিক্রিয়া নয়। বা একবিংশ শতাব্দীতে নতুন নতুন ব্র্যান্ডের মত নতুন নতুন ধর্মদল ও ধর্মগুরু গজিয়ে ওঠেন, তাঁদের জীবনচক্রের যুক্তি অনেক আলাদা।
কিন্তু সাম্প্রদায়িকতাকে এই মূলবাদী-প্রতিবাদী আলোচনার চশমা দিয়ে দেখার আরেকটি সুবিধে হল “সব ধর্মের মূল কথা এক, সবার ওপর মানুষ সত্য” ইত্যাদি ছেঁদো কথার দার্শনিকতাকে বন্ধ করা। নানা ধর্ম-মতের আচারে-বিচারে-দর্শনে-যাপনে-আহারে-বিহারে বিস্তর ফারাক আছে, যেই বিভেদের পরিখা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কখনো ব্যবহার করে, কখনো চওড়া করে, কখনও বা নতুন করে সৃষ্টি করে। যাঁদের কাছে ধর্ম শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক বা বৌদ্ধিক বস্তু, তাঁরাই এসব ‘হাম সব এক হ্যায়’-এর ছেঁদো দার্শনিকতা করতে পারেন।
আরও চেনা ভাষায় বলতে গেলে, প্রতিটি ধর্মদলের শ্রেণীচরিত্র আছে। যুগে যুগে প্রতিটি ধর্মগুরু ও ধর্মপ্রচারক চেয়েছেন যেই শ্রেণী তাঁর ধর্মকে আপন করে নিচ্ছে বা নিতে পারে তাঁদের জীবনদর্শন ও জীবনচর্যার সাথে তাঁর প্রচারিত ধর্মের আচার-বিচার-চাহিদাকে খাপ খাওয়াতে। গরিব খেটে খাওয়া মানুষের ধর্ম শ্রমকে সম্মান করে, তত্ত্ব ও তথ্যের চেয়ে কাজ, আনন্দ-উৎসব ও পরিবারকে বেশী মান্যতা দেয়। আবার আকবরের দীন-ই-ঈলাহী যা এক সর্বধর্মসার মুঘল সেকুলার ধর্মের থেকে অনেক বেশী আকবরের পার্সোনালিটি কাল্ট ছিল, তাতে সম্রাটকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করতে হত, আর মেম্বারশিপ টোকেন হিসেবে আকবরের ছবি-ওলা লকেট দেওয়া হ’ত। যস্মিন ধর্মে যদাচার!
কিন্তু এতক্ষণ ধরে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে আমরা যেমন ধর্মপালনের আপাতসরলতাকে ভাঙ্গলাম বা কেতাবি ভাষায় প্রবলেমাটাইজ করলাম, তাতে হয়তো চাদর দিয়ে মাথা ঢাকতে গিয়ে যেমন ঠ্যাং বেরিয়ে যায়, সেরকম একটা ব্যাপার হয়েছে। মানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটা অনিচ্ছাকৃত অতিসরলীকরণ হয়েছে। অর্থাৎ যেন মনে হচ্ছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটা হাতে-গরম নীল নকশা আছে। সুবিধেমত একটি বড়সড় ধর্মদলকে বেছে নিয়ে তাঁদের সবাইকে এককাট্টা করে অন্য ধর্মদলের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দিলেই যেন কেল্লা ফতে। যেমন দেবেশ রায়ের ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’-এ আমরা হিন্দু মহাসভার একটা নীল নকশা পাই, যেটা আর এস এস এখনো ব্যবহার করে। কিন্তু তার মানেই এই নকশা যে সর্বস্থানে, সর্বকালে ১০০% সাফল্যের গ্যারান্টিসহ, তা কিন্তু নয়।
এর প্রথম মাত্রা ছিল হিন্দুত্ববাদী কাজকর্মের জন্য স্থাননির্বাচন, ও সেখানে মঠ-অফিস খুলে মোটা মাইনে দিয়ে শিক্ষিত, শহুরে, বলিয়ে-কইয়ে দেখনদার লোক মোতায়েন। “মিশন বা সংঘ বেছে-বেছে এই সব জেলাতেই আসছে…যেখানে হিন্দু বসতির চাইতে মুসলমান বসতি অনেকগুণ বেশি। তাঁরা মধ্য ও উত্তরবঙ্গের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলিতে যাচ্ছে না…মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, বীরভূম – এইসব জিলায় তো সিকিভাগ মুসলমানও নেই। তাই সেখানে (হিন্দু) মিশনও নেই। এমনকি যেখানে আট-আনি মুসলমান, সেখানেও নেই, মুর্শিদাবাদ-দিনাজপুরে।” এই স্থাননির্বাচনের প্রধান কারণ হল, হিন্দুদের মনে সংখ্যালঘুত্বের ভয় প্রতিষ্ঠা করা এখানে সহজ। দ্বিতীয় মাত্রা ছিল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা কম্যুনাল রায়টের ডিসকোর্স সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। যেহেতু কলকাতা শহরে বাংলা কাগজপত্র বেশীর ভাগ বর্ণহিন্দুদের হাতে ছিল, মুসলমানদের হাতে ছিল ইংরিজি আর উর্দু কাগজ, তাই পুর্ববঙ্গে নানা জায়গায় ক্রমান্বয়ে রায়টে হিন্দুরা আক্রান্ত এই খবর ক্রমাগত শহুরে ও গ্রাম্য বাঙালী বর্ণহিন্দুদের মধ্যে জাহির করা খুব একটা শক্ত ছিল না। এই খবর বেশীর ভাগ সময় ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ভুলে ভর্তি, কিন্ত সেই ভুল – জায়গার ভুল নাম, জাতিওয়াড়ি ও ধর্মওয়াড়ি জনসংখ্যার ভুল অনুপাত – এগুলো খুব বিচক্ষণ স্থানীয় লোকপ্রতিনিধি ছাড়া কারোর বোঝার উপায় নেই। কিন্ত এই সুনির্মিত ‘ফেক নিউজে’ কোন খুনের কথা থাকত না, বরং সরকারবাহাদুরের সেপাইরা যে ঠিক সময়ে গিয়ে খুনি মোল্লাদের আটকেছে সেই কথা থাকত। নইলে সরকারপক্ষ থেকে হিংসক গুজব ছড়ানোর অপরাধে সম্পাদকের গ্রেপ্তার হবার ভয় ছিল। কিন্তু এই খবরগুলি পুরোপুরি হাওয়া থেকে তৈরি মনে করা ভুল হবে, গাঁয়ে বিশেষতঃ গরীব মানুষের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি-খুনোখুনি লেগে থাকে, যার প্রধান কারণ বেশিরভাগ সময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক, ধর্মভিত্তিক নয়। এই নানা ঘটনার টুকরো টুকরো মালা গেঁথে তাতে সাম্প্রদায়িকতার রং লাগিয়ে তাকে রায়ট বলে চালানো হত। দুই বিরোধী পক্ষে দুই ধর্মের দুটি নাম পাওয়া গেলেই হল। আনন্দবাজারও এই কাজে পোক্ত ছিল বলে শোনা যায়।তৃতীয় মাত্রা হল, যারা নিরক্ষর তাদের মধ্যে ইসলামবিদ্বেষের গল্প ছড়িয়ে দেওয়া। স্থানীয় কোন হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়ধন্য জনপ্রিয় পির-গাজী-দেব-দেবীর আখ্যানকে একটু বদলে তাতে ইতিহাস থেকে মুসলিম দ্বারা হিন্দু নিপীড়নের মালমশলা ঢুকিয়ে তাকে ‘ইতিহাসের আসল ভাষ্য’ বলে নানা ভাবে প্রচার ও প্রসার করা হত। বহুমাত্রিক দাঙ্গাকর্মসূচীর চতুর্থ মাত্রা ছিল এই সব কাল্পনিক দাঙ্গার মিথ্যা হিন্দু ভিক্টিম তালিকা তৈরি করা। বিরাট বড় এক তালিকা তৈরি করা হত, যেখানে একই জায়গার নাম নানাভাবে বদলে বদলে লেখা থাকত, যেমন একটা গ্রামের বিভিন্ন মহল্লার নাম আলাদা আলাদা গ্রাম হিসাবে লেখা থাকত। এইবারে হিন্দুদের কাছে গিয়ে জনে জনে বলা হত, শহর থেকে অনুদান এসেছে, আপনারা হিন্দু ভিক্টিম, রিলিফ নিন – টাকা, চাল, কাপড় ইত্যাদি। সৎ মানুষরা অবাক হয়ে বলতেন, না না আমরা ঠিকই আছি, কিসের দাঙ্গা, কিসের রিলিফ? নিয়ে যান, লাগবে না। তাঁদের জোরাজুরি করা হত, পাচ্ছেন, রেখে দিন, আমাদের হিসেব মেলাতে হবে। আর মতলববাজ হিন্দুরা বুঝে যেত এটা ব্যাসকূট, দাঙ্গা লাগান হবে, আর হিন্দু মিশনের পক্ষে লাঠি ধরার জন্য এটা আগাম ঘুষ। এতে হিন্দুত্ববাদী সংস্থাগুলির জন্য দাঙ্গার আরো একটা কাগুজে প্রমাণ তৈরি হত। শহুরে কাগজে এই দাঙ্গাবিদ্ধস্ত-দের দান-ধ্যানের কথা পড়ে বর্ণহিন্দুবাবুদের বুক দশহাত হত, সঙ্ঘের দানপেটী আরও উপচে উঠত। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এইভাবে দিনের পর দিন কাঠি করে যাওয়াতে, একদিন তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙত, এতদিন ধরে ফুঁকে ফুঁকে তোলা মিছে দাঙ্গার ফুল্কি, মিথ্যেবাদী রাখালবালকের গল্পের মত, একদিন সত্যি দাঙ্গার দাবানল হিসেবে দেখা দিত, তখন গেরুয়াবাদীরা সব দাঁত-নখ বের করে বলত, কেমন? আগেই বলেছিলাম কিনা! ইত্যাদি।
কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা ভোটের হাওয়া ঘোরানোতে সীমাবদ্ধ না। ঐতিহাসিক অন্বেষা রায় বাংলায় ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের
ছ’টি ধাপ দেখিয়েছেন – ১৯৪১-এর ঢাকা রায়ট, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ও তার ত্রাণ, বেংগল সেকেন্ডারি এডুকেশন বিল, আগস্ট ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, অক্টোবর ১৯৪৬-এর নোয়াখালি রায়ট আর ১৯৪৬-৪৭-ব্যাপী রায়ট নিয়ন্ত্রণে গান্ধীর ব্যর্থতা (Roy, Anwesha. Making Peace, Making Riots: Communalism and Communal Violence, Bengal 1940–1947. Cambridge University Press, 2018. ) এই প্রত্যেকটি ধাপের নাটের গুরু শুধুই হিন্দু এবং মুসলমান সাম্প্রদায়িকতাবাদী শক্তি তা অতিবড় সাম্প্রদায়িকতাবিরোধীও বলতে পারবে না।
মানুষের স্বত্বের বা আইডেন্টিটির যে শ্রেণী, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, রাষ্ট্র, দেশ, কৌম ইত্যাদি নানা অন্তর্ভুক্তি রয়েছে তার মধ্যে ধর্মের সুতো ধরে টান মেরে সবাইকে এককাট্টা করার জন্য বহু বছর বহু নদী-পুকুরের জল ঘোলা করতে হয়। কারণ মানুষের আইডেন্টিটি মাল্টি-সিমকার্ড মোবাইলফোন নয় যে, একবার এই নম্বর আর আরেকবার ঐ নম্বর ডায়াল করলে ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠবে। কান টানলে সব সময় মাথা আসে না। যেমন অক্টোবর ২০০৭-এ ঝিমিয়ে পড়া গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকে সুভাষ ঘিসিং-এর শাকরেদ বিমল গুরুং যখন নিজের হাতে নিয়ে নেন, তখন তার চাবিকাঠি ছিল প্রশান্ত তামাং নামক কলকাতা পুলিশের দার্জিলিং-নিবাসী একটি গোর্খা কন্স্টেবলের ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ নামক টিভি রিয়েলিটি শো-এ জয়। (Besky, Sarah. The Darjeeling distinction: Labor and justice on fair-trade tea plantations in India. Vol. 47. Univ of California Press, 2014. )
পশ্চিমবঙ্গে ধর্মদলের রাজনীতিকরণের ঘোরালো পদ্ধতি নিয়ে একটা কেস স্টাডি করা যাক মতুয়াদের নিয়ে। যাঁদের কথা আমরা আগেও আলোচনা করেছি।
মতুয়াদের শিকড় পূর্ববঙ্গে। এঁদের অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন দেশভাগের পরে। বাংলার নিজস্ব ধারার বৈষ্ণবতার অনুগামী মতুয়াদের সংখ্যা ২০১১ সালের আদমসুমারী অনুযায়ী এক কোটির ওপর, বর্তমানে সরকারি আন্দাজে পৌনে দু’কোটি, আর মতুয়া নেতাদের মতে তিন কোটি। এর একটা বড় অংশ তফসিলি জাতিভুক্ত শ্রমজীবী নমঃশুদ্র মানুষ। এখন পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ছ’টি লোকসভা আসনে এই সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের আছে তিনকোণা লাল পতাকা হাতে নিয়ে ডঙ্কা বাজিয়ে উচ্চৈঃস্বরে হরিবোল বলার প্রথা, আদ্যন্ত গার্হস্থ্যপালনের বিধি, হরিনামের মাধ্যমে নিরাড়ম্বর দীক্ষা, মামুলি অসুখ সারানোর জন্য তেঁতুল আর কাঁচালংকা দিয়ে ভাত খাবার বিধান, আর গলায় নারকেল মালার টুকরোর কন্ঠি যা চৈতন্যগাথা অনুযায়ী এক দিব্য ঘটনার পুণ্য প্রতীক। তাঁদের বিশ্বাস, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য শেষজন্মে মতুয়া ধর্মপ্রবর্তক ও ১৮৮০ সালের মাঝামাঝি পূর্ববঙ্গে মতুয়া মহাসংঘ স্থাপক হরিচাঁদ ঠাকুর রূপে অবতীর্ণ হন।
বাংলার নমঃশূদ্রের স্বত্বরাজনীতির চেতনা মতুয়াপন্থা প্রতিষ্ঠার আগেও ছিল। দ্বৈপায়ন সেন উল্লেখ করেন ১৮৭২ সালে নমশূদ্রদের সংগঠিত এক বর্ণহিন্দু বয়কটের কথা। (Sen, Dwaipayan. The Decline of the Caste Question: Jogendranath Mandal and the Defeat of Dalit Politics in Bengal. Cambridge University Press, 2018. ) ১৯০৯ সালের ‘প্রবাসী’-তে এক ‘হিতৈষী সমাজসচেতন’ সাবর্ণের বয়ানে আমরা পড়ি – “পূৰ্ব্ববঙ্গের নমশূদ্রের সমস্যা প্রতিদিন কিরূপ আকার ধারণ করিতেছে তাহা সকলেই জানেন। …এই সমস্ত দলের সভা সমিতি কাগজ পত্রে একটা কথা – খুব স্পষ্ট দেখা যায় এই যে হিন্দু সমাজের সঙ্গে কোনো রকম বিরোধ করা তাহাদের উদ্দেশ্য নহে—ইহারি আশ্রয় একটু সম্মানের সহিত তাহারা থাকিতে চায়।… নমশূদ্রদের এই আন্দোলনকে যাহারা হুজুগ বলিয়া উড়াইয়া দিতে চান, তাদের এই পর্যন্ত বলিতে পারি যে তাদের মধ্যে যে উৎসাহ দেখা যায় তাহা অনেক শিক্ষিত ভদ্রসমাজেও দুর্ল্লভ।…মনে রাখা দরকার ইংরেজ আমাদিগকে চিরায়ত্ত রাখিবার জন্য আমাদের কোন ছিদ্র পাইলেই স্বভাবতই তাহার সুযোগটুকু লইবার চেষ্টা করে। মুসলমান ইতিপূর্বে তাহার হাতে ধরা দিয়াছে, এখন যদি আমরা নমশূদ্রদের ন্যায্য অধিকার লাভে বাধা দিই তাহা হইলে একদিন সময় বুঝিয়া তাহারাও হিন্দুসমাজকে আঘাত করিতে ছাড়িবে না।…প্রার্থনা যে তাহারা এই সমস্যাটিকে বিশেষভাবে মীমাংসা করিবার ভার লউন। পূর্ববঙ্গের স্থানে স্থানে অবস্থা ক্রমেই সঙ্কটাপন্ন হইয়া উঠিতেছে। আমরা স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়াছি স্থানে স্থানে ভদ্রলোক ও নিম্নশ্রেণীর মধ্যে বিশেষ মন কষাকষি চলিতেছে, তবে এখনো তাহা কাজে প্রকাশ পায় নাই। নিজের ঘরেই যখন আগুন লাগিবার সম্ভাবনা তখন ঝগড়া করিয়া শক্তি এবং সময় নষ্ট করিলে এমনি কি লাভ হইবে?” (যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়)… “পূর্ববঙ্গে মুসলমানগণের তুলনায় হিন্দুগণের সংখ্যা অতীব অল্প এবং হিন্দুগণের মধ্যে নমঃশূদ্রের সংখ্যাই অধিক। (যথা) ফরিদপুর জেলার সমস্ত অধিবাসিগণ মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা মাত্র শতকরা ৩৭ জন এবং ইহার মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুর সংখ্যা এত ক্ষুদ্র যে তাহাদের অস্তিত্ব একরূপ অণুবীক্ষণ দ্বারা উপলব্ধি করিতে হয়। ১৯০১ সনে আদমসুমারী রিপোর্ট হইতে নিম্নে যে তালিকা প্রদত্ত হইল তাহা দ্বারাই পূর্বোক্ত উক্তির সত্যতা সম্যকরূপে প্রতীত হইবেক। জিলা ফরিদপুর – হিন্দু= ৭৩ ৩৫৫, ইহার মধ্যে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুর সংখ্যা, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ও বৈদ্য =১৪ ১৬৮, নমঃশূদ্রের সংখ্যা = ৩ ২৪ ১৩৫ মুসলমান = ১ ১৯ ৯৩৫৭ = মোট জনসংখ্যা ১৯ ৩৭ ৬৪৪। ইহার হইতে স্পষ্টরূপে দৃষ্ট হইতেছে যে ফরিদপুর জেলার হিন্দুগণের প্রধান শক্তি নমঃশূদ্রগণ। ”(শ্ৰীবিনোদলাল ঘোষ, বি. এল.)।
১৮৮০ থেকে ১৯২৫ বাংলায় পাটচাষ চালু হবার সুবাদে বাখরগঞ্জ-ফরিদপুর-যশোর-খুলনায় নমশূদ্রদের মধ্যে একটু সমৃদ্ধি আসে, “(হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র ) গুরুচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া আন্দোলন বেশ ছড়ায় গুছোয়।…তাঁরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন , তাঁরা স্বাধীনতার বিপক্ষে ও ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে।” গান্ধীবাবার অসহযোগ আন্দোলন বর্ণহিন্দু ভদ্দরলোকেদের জন্য, যাদের এক ভাই জেলে গেলে, অন্য ভাইরা তাঁদের চাকরির মাইনে আর জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাবে। কিন্তু নমশূদ্র চাষী জেলে গেলে, তার চাষ মার গেলে, ঘরপরিবার শুকিয়ে মরবে। নমশুদ্ররা চিরকালই খাটিয়ে-লড়িয়ে এবং হিন্দু উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তের সব হিংসামূলক কাজের পদাতিক সৈনিক। অতএব গুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশে হাতে-হাতে-সড়কিতে-লাঠিতে অসহযোগীদের মোকাবিলা করতে তাদের খুব একটা বেগ পেতে হল না। আর ব্রিটিশ শাসকের পুলিশের মদত তো তাদের সাথে ছিলই। তখন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে মুলধারার বয়ানে এই গৌণ ধর্মদলের প্রবেশাধিকার প্রথম সারির। পরে গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়াদের নামময়তার ধর্মে যোগ করেন নতুন বাণী ‘প্রয়োজন হলে করবে ভিক্ষা / ছেলেমেয়েকে দেবে শিক্ষা’। এরপর ‘মতুয়া ধর্মাদর্শমতে ক্রিয়াকর্মের বিধান’ বইতেও যুক্ত হল নির্দেশ – বিয়ের সময় দেখতে হবে পাত্রপাত্রীর এডুকেশন। ধর্মের বিধান মেনে চাঁদা তুলে স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা, ইংরেজ আমলেই ওকালতি, মাস্টারি এবং সব রকমের সরকারি চাকরির জন্য দরকষাকষি, পূর্ববঙ্গ ও আসামের নবনিযুক্ত ছোটলাট কে ‘অনুন্নত জাতি হইতে গভর্ণমেন্টকে সর্বপ্রথম অভিনন্দন পত্র’ পাঠানো, সবেতেই তাঁরা এগিয়ে ছিলেন। ‘ইহার ফলে বাঙ্গালার নমশুদ্র…জাতির রাজনৈতিক অধিকারে দাবি ও শিক্ষিত হইলে গভর্ণমেন্টের অধীনে চাকুরি পাইবার উপযুক্ততা গভর্ণমেন্ট কর্তৃক স্বীকৃত হইয়াছিল।'(বাঙালির ইন্দ্রিয়দোষ ও ছোটলোকের সংস্কৃতি – সোমব্রত সরকার; সিসৃক্ষা প্রকাশন; শ্রীরামপুর, হুগলী -৭১২২০৩; প্রথম প্রকাশ পৌষ ১৪২৪; ISBN 978-81-934722-8-6)
১৯৩৫ সালে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে তফসিলি জাতির জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষিত হ’ল। তার একটিতে জিতে এলেন হরিচাঁদ ঠাকুরের নাতি, গুরুচাঁদ ঠাকুরের পুত্র, মতুয়াদের মধ্যে প্রথম বিলেতফেরত ব্যারিস্টার প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর বা পি আর ঠাকুর। ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিমবঙ্গের ঠাকুরনগরে মতুয়া মহাসংঘের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন তিনিই। তাঁর স্ত্রী শতোর্ধ বয়সে সদ্যপ্রয়াতা বীণাপাণি দেবী বা ‘বড়মা’, মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শেষ একচ্ছত্র প্রধান। প্রথমে মতুয়ারা কংগ্রেসের সমর্থনে থাকলেও, ১৯৭৭ সালের পর তাঁরা ঝোঁকেন বামফ্রন্টের দিকে। কিন্তু নাগরিকত্ব, জমি অধিকার এবং শিক্ষার ইস্যুতে তাঁদের আশাভঙ্গ হয়। ২০০৯ সালে বাম এবং তৃণমূল, উভয় পক্ষই আলাদা আলাদা করে মতুয়াদের সমর্থন চায়। মতুয়ারা এবার মমতাকে বেছে নেন। ২০১০ সালে বড়মা মমতাকে মতুয়া মহাসভার মুখ্য পৃষ্ঠপোষক ঘোষণা করেন, ২০১১ সালে ঠাকুরনগরে সম্প্রদায়ের পুণ্য পুষ্করিণী কামোনাশাগার সংস্কারের জন্য অনুদান অনুমোদন করেন। ২০১৮ সালে বড়মা’র সঙ্গে দেখা করতে যান মমতা। কিছুদিন পর মতুয়া ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠন করার কথা ঘোষণা করে সরকার। অতএব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বড়মা ঘনিষ্ঠ, তাঁর পরিবারের অনেককেই ভোটে টিকিট দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক ভাবে বিভাজিত হয়ে গেছে এই পরিবার। ২০১৪ সালে বনগাঁ লোকসভা আসন থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন বড়মা’র ছেলে কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর। তাঁর মৃত্যুর পর সে আসন থেকে জেতেন কপিলকৃষ্ণের স্ত্রী মমতাবালা ঠাকুর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তাঁদের পরিবারের মধ্যেই। বড়মা’র আরেক নাতি সুব্রত দাঁড়িয়েছিলেন বিজেপির হয়ে। সুব্রতর বাবা, বড়মা’র ছেলে মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর, তৃণমূলের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি এবং সুব্রত দুজনেই বিজেপিতে যোগ দেন। মঞ্জুলকুমারেরই আরেক ছেলে বড়মা’র নাতি উঠতি নেতা শান্তনু ঠাকুর মোদীর কর্মসূচির সংগঠক। নরেন্দ্র মোদীকে ফেব্রুয়ারী ২০১৯-এ ঠাকুরনগরে ভাষণ দিতে ডেকেছিলেন তিনিই। ঠাকুরনগর বাংলাদেশ সীমান্তে, বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিলের ব্যাপারে শান্তনু ঠাকুর বিজেপির মূল বক্তা।(https://bengali.indianexpress.com/politics/why-matuas-are-important-for-both-trinamool-congress-and-bjp-explained-72317/) তাহলে এই মতুয়াদের নিয়ে রাজনীতি তাঁদের নমশুদ্রত্ব দিয়ে বুঝব, না মতুয়াত্ব দিয়ে বুঝব, না ভোটরাজনীতি দিয়ে বুঝব? তাঁদের নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি মতুয়া নেতারা করছেন, না কংগ্রেস আর বামরা করেছিল, নাকি তৃণমুল আর বিজেপি করে চলেছে? নাকি এর উত্তর ‘অল অফ দি এবাভ’? তাই যদি হয়ে থাকে, এই ‘অল অফ দি এবাভ’ উত্তর দিয়ে কি কাঁচকলা হবে? কিন্তু উত্তর যাই হোক, পুষ্কর্ণ সিংহরায়ের মতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা মতুয়াদের বামপন্থী শিবির পাকাপাকি ভাবে ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল তা আমাদের বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রথম ঘটনা – ২০০৩ সালে ঠাকুরনগরে ব্যাপারী পরিবারে এক মতুয়া গোঁসাই-এর মৃত্যু। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল কোন ব্রাহ্মণের উপস্থিতি ব্যতীত মতুয়ামতে তাঁর নিজের ভিটের উঠোনে সমাহিত হওয়া। সেই মতে তাঁর শেষকাজ সমাধা হ’লে, এই ‘মুসলমানি’ কান্ডে হিন্দুরা খেপে ওঠে, জোট বাঁধতে ও ঘোঁট পাকাতে থাকে। মতুয়া মহাসঙ্ঘ ব্যাপারী পরিবারের পাশে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়ানো সত্বেও পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় সে শাসক দলের প্রতিনিধি স্থানীয় সি পি এম নেতার হস্তক্ষেপ পরিবারের সুরক্ষার জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। তিনি পার্টির নির্দেশে গা ঢাকা দিলে, স্থানীয় তৃণমূল নেতা এই পরিস্থতি সামলান ও সেই পাড়ার ১৪টি পরিবার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। সমাহিত গোঁসাই-এর পুত্র সরোজ ব্যাপারী সগর্বে বলেন – “বিনিপয়সায় ছাগল বা ইন্দিরা আবাস যোজনায় ঘর পাওয়ার জন্য আমরা পার্টি বদলাইনি। আমরা মানবতার জন্য পার্টি বদলেছি।” দ্বিতীয় ঘটনা – ২০শে ডিসেম্বর ২০০৪-এ মতুয়াধর্মের সিদ্ধক্ষেত্র ঠাকুরবাড়ির সামনে পুলিশ পড়ে। কারণ গত পাঁচ দিন ধরে সেখানে শ’য়ে শ’য়ে মতুয়া ২০০৩ সালের সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট (যার ভিত্তিতে এখন এন আর সি হচ্ছে) রদ করবার দাবিতে ভুখহরতাল করছিল। পুলিশ বাহিনীর কর্ণধার হিসাবে সেখানের এস ডি ও এবং বি ডি ও সোজা বলেন যে, হরতাল না ভাঙ্গলে ঠাকুরবাড়ি তছনছ করে দেওয়া হবে। সেদিন মতুয়াদের প্রতিরোধে পুলিশ পিছু হঠতে বাধ্য হলেও আর ভুখ হরতাল আরও দু’দিন জারি থাকলেও এই হুমকি মতুয়ারা ভোলেনি। তৃতীয় ঘটনা হ’ল মতুয়াপ্রধান উত্তর চব্বিশ পরগণার বাগদার হেলেঞ্চায় বহুবছর ধরে প্রচেষ্টার পর ২০০৫ সালে ‘শ্রী শ্রী হরিচাঁদ গুরুচাঁদ কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করতে পারা এবং শেষ মুহুর্তে কলেজ কমিটিতে বামসরকারের আশীর্বাদধন্য সাবর্ণ প্রতিনিধিদের ভেটোয় সেই কলেজের নাম বদলে ‘ডক্টর বি আর আম্বেদকর শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়’-এ পরিবর্তন হওয়া। (Sinharay, Praskanva. “The Caste Question and the Decline of the Left in West Bengal” in Rakhahari Chatterji, Partha Pratim Basu (ed.s), West Bengal under the Left 1977-2011, 2018, (Kolkata: Levant Books), also Sinharay, Praskanva. “The politics of the Matua Mahasangha.” The Politics of Caste in West Bengal (2015): 147.) এত পাতা ধরে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে এত প্যাঁচাল পাড়া ও গলা শুকোনোর মূল উদ্দেশ্য একটিই। ধর্মপালনকে নেহাত একটি ‘ফলস কনশাসনেস’ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে তার ওপর ভিত্তি করে গড়া আরেকটি ‘ফলস কনশাসনেস’ অর্থাৎ গোদ ও তার ওপর একটি বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা যেন আমরা বন্ধ করি। কারণ গোদ আসলে গোদ কিনা সেই বিশ্লেষণের গোড়ায় যদি গলদ থাকে তাহলে বিষফোঁড়ার বিশ্লেষণ ও চিকিৎসা নির্ঘাত ভুল হবে। “মার্ক্সীয় ‘ফলস কনশাসনেস’-এর তত্ব একটি বাস্তব সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করে দেয়, তা হল যে মানুষের এই “ভুল বোঝা” নেহাত তার চেতনার বেগড়বাঁই নাও হতে পারে। নিজের পরিস্থতি নিয়ে নিজের ন্যায়-অন্যায় বোধের জন্য বাইরের গবেষক পণ্ডিতের অবরোহী তত্ত্বদন্ড ছাড়া তাঁর নিজস্ব কোন মাপকাঠিও থাকতে পারে।…তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর দেখার গরমিলের মূল তাঁর জীবনদর্শনের খামতি নয়, তাঁর মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধকেও ‘ফলস কনশাসনেস’ বলে তাঁর ল্যাঠা চুকিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু যতক্ষণ এই মূল্যবোধ তাঁকে রোজকার বাঁচায় মদত যোগায়, “রিএডুকেশন”-এর পথ আগলে বসে থাকে ও তাঁকে জীবনের মানে খুঁজে পেতে সাহায্য করে, ততদিন এই মূল্যবোধই তাঁর চিন্তা আর ভাবনাকে চালিত রাখবে, কোনও তত্ত্ব নয়। সে তত্ত্ব যতই তর্কাতীতভাবে সঠিক হোক না কেন। যদি আমাদের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হয় তাঁদের শোষিত হবার তত্বায়ন করা তবে সেটার শুরু নৈর্ব্যক্তিক কোনও মানদন্ড থেকে নয়, শুরু হওয়া উচিত ব্যক্তিমানুষ আর গোষ্ঠীমানুষের মূল্যবোধ থেকে।”(Scott (1976:160) in Besky, Sarah. The Darjeeling distinction: Labor and justice on fair-trade tea plantations in India. Vol. 47. Univ of California Press, 2014.)

[লেখক একজন ভিজুয়াল স্টাডিস গবেষক, সম্পাদক এবং ইন্টারনেটভাষা বিউপনিবেশিকরণ কর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply