শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়-র কবিতা

অসাড়লিপি ১২

এইখানে আমরা স্পষ্ট হয়ে উঠি
ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা দেশ
আমাদের গলায় তার আঙুলের ছাপ
বন্ধ নিঃশ্বাসে তার পুরনো সুর
আমরা গলা তুলে চিৎকার করছি এক ছাই দিয়ে ভরা ফিসফিস
আমরা সেই ধর্মহীন মানুষ
আমরাই সেই ধার্মিক মানুষ
আমাদের হাতের ছাপ সমস্ত দাসপাচার বন্দরে
আমাদের পায়ের তলায় সমস্ত কাদা
এই যে দীর্ঘ অসাড় প্লাবন
সমস্ত রকম শিলা ও ছবি ভুলে যাওয়া
জাতি সমূহের উপর নেমে আসছে
বিরাট এক গর্ত গাছ            গভীর খাদ
যখন অসাড় ওঠে
এইসব পায়ে চলা রাস্তা
সকাল মানে ছোট পাখিদের
মাটিতে গেঁথে যাওয়া ঠোঁট
বিকেল মানে বরফ হয়ে আসা আজান
কাচ হয়ে যাওয়া আরতির আলো
এইখানেই সমস্ত চিৎকার গুলো
লোহিত তপ্ত শলাকার জলে ডোবা: কি দরকার তোর শুয়োরের বাচ্চা?
কোথায় কখন বেরিয়ে ছিলি সাধু হতে?
তুই তো হুইচেয়ার রাষ্ট্রের খাবলানো মাংস
কুষ্ঠ পায়ে মন্দিরের চাতাল
প্রতিদিন একটু করে এগিয়ে আসছে বিশিষ্ট বাড়ি
এক লাফে আগুন ধরেছে অজস্র লঙ্কায়
আমাদের ধুলো প্রধান বাক্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না
আমাদের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে বালির শব্দেরা
আর কোনদিন মহৎ কোন কবিতা রচনার হবে না
কোথাও কারো কোন কবিতার দরকার পড়বে না
এমনকি সাংবাদিক সত্য হাইওয়ের পাশে তোবড়ানো বিয়ার এর ক্যান
আমরা ক্রমশ বেঁকে যাওয়া গুলো নিয়ে ঘরে ফিরবো
সঙ্গমহীনতা খাদ্যাভ্যাস
খাদ্য নিয়ে রসিকতা করবে বাজার
বাজার ক্রমশ ছোট হতে শুরু করবে সমুদ্রের ঝাঁঝে
ওই তো কাল একটা আস্তরণ পড়ে আছে
ওই তো ফ্যাকাশে কিছু মুখোশ পড়ে আছে
মাটি রঙের বালতি তে কোথায় পালাবে বলো?
সামান্য দেশলাই হাতে যে কোন পাতি ভিলেন
তোমাকে সাবাড় করে দিতে পারে
শুকিয়ে আসার অভ্যাস নিয়ে বড্ড বেশি ভাবো তুমি
তোমার বিকেলের রক সন্ধের স্নানের আগে
তুমি নিশ্চিত আড্ডায় গিয়ে ভুলে গেছো
বড্ড বেশি চাপ আজকাল তেমন কেউ আড্ডায় আসে না
তেমন কেউ জুত করে আলুর চপ ভাজে না
আহা কী ঝাঁঝ সেই ঘানি থেকে আনা তেলে
মুড়ির সান্ধ্য সাদায় লেগে থাকা লালচে
মিশে যেত বিকেলের অ্যালুমিনিয়ামে
তুমি বোঝনি বা ভাবনি
তোমার সামনে দিয়েই নিশ্চিত পদক্ষেপে
রক্তের গতিতে উধাও হয়ে গেছে কিছু
রোজকার ব্যবহারের শব্দ
রোজকার খাবারের কিছু ফোড়ন
শুধু একটা পিচের রাস্তা ভাগ করে দিয়ে গেছে
কিছু পাড়াঃ কবে থেকে জল অচলের বীজ পোঁতা?

এখানেই বিকট সব গানগুলো শুরু হয়
বিকট সব হাসির ছররা
কোমল কুয়াশা             ছড়ানো অসাড়
আমাদের সমস্ত পায়ে চলা
আমাদের সমস্ত ছুরি
গিঁথে আছে মাটিতে
আর কোনওদিন তোলা যাবে না

এখানেই স্বীকার করব সমস্ত দোষ
আমার কাজই ধর্মহীনতা
যখন অসাড় আমাদের সম্পূর্ণতা দিয়েছে
তখন দেখেছি এ-দেশের ফুসফুস বমির সঙ্গে
সূর্যকে বেরিয়ে যেতে
যখন প্রাত্যহিকের সামনে মেলে দিচ্ছি
আমাদের স্বাভাবিকতা, প্রতিটা ঘর থেকে
বেরিয়ে আসছে আশ্চর্য গান
তখন মনে হচ্ছে হ্যাঁ এই সেই মুহূর্ত
জরাভার মহাদেশগুলোকে ভেঙে দেওয়া হোক
ভয়ংকর আমাদের গ্রীষ্মতাপের সামনে
মেলে দেওয়া হোক হাজার বছরের ফোসকা
আমাদের ভাষা শুকিয়ে দেওয়া
তীব্র আগুনের থাবা ও জৃম্ভন
হ্যাঁ, ভাষা ঢুকে গেছে ইটভাটার গহ্বরে
ভেঙে দিয়েছে সমস্ত জলজ দরজা
সেদ্ধ হয়ে গেছে সমস্ত অভ্যাসের তাজা ফল
ঝলসে গেছে অভিধান ও তার বিস্মৃতি
তৃণভূমি, নদী, তীরে চরা পশু, মানুষ ও গ্রাম
সবকিছু বেরিয়ে আসবে তীব্র পোড়ামাটির দুনিয়ায়

Facebook Comments

Leave a Reply