অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার

fail
অর্ধেকের খোঁজেঃ নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ
রাধিকার কাছে কৃষ্ণের সমর্পণঃ মুদ্দুপলানির ‘রাধিকা সান্ত্বনম’-এর নির্বাচিত অনুবাদ

নবম কিস্তি : অন্তিম পর্ব

এই সংখ্যায় রইল ‘রাধিকা সান্ত্বনম’-এর চতুর্থ তথা শেষ অধ্যায়ের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ। এই অধ্যায়ের প্রায় পুরোটা জুড়ে রয়েছে কৃষ্ণের রাধার কাছে আকুতি। নিজের স্ত্রী, সংসার, আত্মীয় সবাইকে ছেড়ে এসে কৃষ্ণ হয়ে উঠেছেন রাধার কাছে সমর্পিত হতে চাওয়া এক অস্তিত্ব। এই অধ্যায়ের প্রায় পুরোটা জুড়ে একইসাথে রয়েছে রাধার আত্মগরিমাজাত অভিমান। এই আত্মসম্মানবোধ হেতু তিনি কৃষ্ণকে সরিয়ে রাখতেও পিছপা হন না। এমনকি দ্বিধা বোধ করেন না ঈশ্বর-কেন্দ্রিক পুরুষতন্ত্রের প্রতিভূ কৃষ্ণের মাথায় লাথি কষাতে। এবং এই লাথিটি রাধা- কৃষ্ণের কাহিনির শেষ অংশটিকে মুদ্দুপলানির ইচ্ছা অনুযায়ী বিনির্মিত হতে সাহায্য করে। কৃষ্ণ এখানে রাধাকে ত্যাগ করে নিজ সংসারে ফিরে যান না , সংসার ত্যাগ করে রাধার সঙ্গে থেকে যাওয়ার সিধান্ত নেন। মূল কাহিনিকে পালটে দেওয়ার এই মানসপট অবশ্যই মুদ্দুপলানির রাধিকাকে অনান্য আখ্যানের রাধিকার চেয়ে স্বতন্ত্র করে তুলে। এই অধ্যায়ে রাধিকা যখন আপাত নিরীহ সংসারী মানুষগুলির লুকিয়ে থাকা হিংস্র সত্তার পরিচয় তুলে ধরেন কৃষ্ণের কাছে তখন সোশ্যাল-নর্ম্যাটিভিটি এবং গৃহস্থালি হিংসার পারস্পরিক সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চতুর্থ তথা অন্তিম অধ্যায়

ব্রহ্মা যার প্রশংসা করেন
সিদ্ধিপ্রাপ্ত সকল যোগশক্তির উৎস
ধ্যানমগ্ন বাল গোপাল
শুয়ে আছেন আদি শেষনাগের উপর

***

‘শুনুন প্রিয় রাজন’,
জনককে বলতে লাগলেন ব্যাসপুত্র
‘মধুর চেয়েও মিষ্ট এই অলৌকিক অভিজ্ঞতা’ ।

***

তারপর শ্রীহরি তাঁর অন্তর প্লাবিত যাতনাকে সংযত করে দিনমানের কাজ শুরু করলেন। স্নানের পর পরলেন রেশমি কাপড়। সুন্দরী যুবতীদের পরিবেশিত সুস্বাদু খাবার খেয়ে, শ্বশুর শাশুড়ীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তাদের আশীর্বাদ নিয়ে বিদায় সম্ভাষণে বললেন, “বহুদিন ধরে আপনাদের আতিথেয়তা তৃপ্ত করেছে আমায়। ইলাদেবীকে যেন কিছুকাল পরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়”, এমত নির্দেশ দিয়ে যে আত্মীয়রা উপহার নিয়ে এসেছেন তাদের উপহার নিয়ে, সকল স্বজনকে বিদায় জানিয়ে স্বর্নরথে আরোহণ করলেন শ্রীকৃষ্ণ। অতি দ্রুত বেগে পৌঁছলেন বৃন্দাবনে। জ্ঞানী ও সন্তদের দর্শন করেই তিনি দেখা করলেন নন্দ ও যশোদার সাথে। তারা তাঁকে ভরিয়ে দিলেন আদরে সোহাগে। সমস্ত সময় জুড়ে প্রতিক্ষণ ভাবলেন প্রিয়ার কথা। অপেক্ষা করতে থাকলেন রাত্রি নামার।

***

চারিদিকে ঝকমকে রূপো বিছিয়ে
চাঁদ উঠলো যখন
আধফোঁটা যুঁইয়ের সুগন্ধ
ঢেকে দিলো বাগানের পর বাগান
অধীর আকুল প্রভু
পা বাড়ালেন রাধার বাড়ি

***

“কোথায় চললে?” যুবতীরা শুধায়,
“হাত বাড়ালেই আমি, আগে আমায় নাও, পরে যেও ক্ষণ”
ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে কৃষ্ণ দূরে সরান যুবতীদের।
“আমার জন্য দাঁড়াও, আমি তোমার সঙ্গে যাব”,
এগোতেই বলে বাকিরা।
আমন্ত্রণ জানায়, “আমার কাছে এসো”।
প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে
“সে তোমাকে ছেড়ে গেছে, যেও না তার কাছে”।
পিছুডাকের অমঙ্গলে ভয় হয় তাঁর
তড়িঘড়ি চলেন যাদবশ্রেষ্ঠ
মন নিবদ্ধ রাধায় ।

***

দূর থেকে শ্রীহরিকে আসতে দেখে
ডানা ঝাপটায় টিয়া,
চেঁচিয়ে তাঁর আসার খবর দেয়
মুহূর্তে দাসীদের ডেকে হুকুম করে রাধা
“কিছুতেই যেন সে আসতে না পারে
তাকে আটকাস যেভাবেই হোক”।

***

রাধার জন্য আকুলতা বেড়েই চলে
সৌরি চারপাশের উপদেশ
ভুলে গিয়ে রাধার দুয়ারে পৌঁছায় বিশ্বাসে ভর করে
তখনই তার পথ আটকায় দাসী।

***

“দাঁড়াও! এখানে ঢুকে পড়ছো কেন?”
“আমি এই বাড়ির কেউ নই?”
“আহ! আরেক বার বল! বেরিয়ে যাও!”
“আমাকে চলে যেতে বলছো? ইতর দাসী!”
“তা কেন এসেছো এখানে?”
“কোনো কারণ না থাকলে কেন আসবো?”
“ওহ! এসব পুরোনো কথায় চিঁড়ে ভিজবে না, যাও!”
“কেন? ভাগ্নে তার মামীর কাছে আসতে পারে না? পর নয় সে”
“কিন্তু মুরারি তুমি এসেছো রাতের লেনদেন সারতে”
“কারণ দিনের দেওয়া নেওয়া ফুরিয়েছে গো মেয়ে!”
“এ তো এতোলবেতোল কথা… শিখেছো কোথায় এ’সব?”
“তোমার কর্ত্রী ঠাকরুণের কাছেই সবের শিক্ষা!”

***

“এমন গা-জ্বালানো কথা কয়ে জিততে চাও!”
“নতুন শিখছি, মাফ করে দিও আর এই মিঠে খুনসুটি বন্ধ কর”
“মিঠেই যদি লাগে , তাহলে বন্ধ করতে বলছো কেন?”
“কিন্তু যদি উনি শুনতে পান, তুমি তো তার রাগ জানোই। বেরোও এক্ষুনি!”
“কিন্তু দেবীই যদি অপ্রসন্ন, কোথায় যাই তবে?”
“তোমার ইলার কাছে, তার সঙ্গেই আনন্দে থাকো!”
“কে? কে ইলা? কে আমি?”
“তুমি আবার কবে থেকে এমন ধারার কথা বলছো?”
“যবে থেকে তোমার মত সুন্দরীর সঙ্গে কথা বলছি!”
“ওহ! তামাশা করছো আমার সাথে গোয়ালার পো!”
“কিছুই কি ফেরত দেব না তোমায় সুন্দরী?”

***

“তা তোমার চোখ অমন লাল কেন?”
“রাধার কথা ভেবে রাত্তিরে ঘুম আসে না!”
“এই আঁচড়ের দাগ কীসের?”
“তার জন্য গোলাপ খুঁজতে গিয়েছিলাম ঝোপে!”
“তবে এই দাঁতের দাগ কার?”
“এই যাতনার জন্য ব্রহ্মাকে দুষেছি। আর নিজেই দংশন করেছি নিজেকে”
“তোমার কাপড়ে লেগে থাকা এই লম্বা চুল কার?”
“এ’গুলি তো মন্মথের তীর, বৃষ্টির মতো ঝরেছে আমার উপর”
“তোমার গা থেকে যে সুবাস আসছে?”
“তপ্তদেহ জুড়ানোর তরে চন্দন লেপেছি”
“কিন্তু পদ্মনাভ, তোমার রেশমের কাপড়ে এমন বাহার কীসের?”
“জানো না, আমি সর্বদাই পীতাম্বর পরি”

***

“তাহলে আমি ভিতরে যাব, রাধার কমলচরণ স্পর্শ করবো”
“তুমি যাও, ইলার পায়ে ধরো!”
তার কথা শুনে নাছোড়বান্দা শ্রীধর
জোর করে ঢুকতে চেষ্টা করলেন
তা দেখে দাসীরা চেঁচিয়ে সতর্ক করলো।

***

“ওগো মেঘকুন্তলা
ও মীনাক্ষী, ও মধুর অধরা সুন্দরী,
ওগো দীর্ঘগ্রীবা, সুগোল স্তন,
সুঠাম উরু, ক্ষীণমধ্যা যিনি
যার কোমলচরণ, মন্দগতি
সাবধান, সাবধান, সাবধান
সেই ননীচোরা এখানে এসেছে আবার”

***

নানা ইঙ্গিতের মাঝে বিহ্বল শ্রীহরি
দাঁড়িয়ে রইলেন; যেন বিভ্রান্ত হস্তী
হাস্যমুখী যুবতীরা ঘিরে ধরলো তাকে
কারো বুক ছুঁয়ে রইলো তাকে
কারুর বা লম্বা চুল, নখের দাগ রয়ে গেল কারুর।

***

যুবতীরা খালি খুনসুটি করে চলে
এরা কোনো কাজে আসবে না বুঝে
কৃষ্ণ চেঁচিয়ে উঠে শুনতে যাতে পায় রাধা

***

“বাইরে বেরিয়ে এসো, শোনো
ও আমার মারুভাম ফুলের পাঁপড়ি
ও আমার সম্পাঙ্গী সুগন্ধী প্রিয়া
শোনো লক্ষ্মীটি”

***

“যদি এতই অসুখী তুমি,
তবে কেন বেরিয়ে আসছো না?
জঙ্ঘার মাঝে বন্দী করো আমায়
চেঁচাও, চড় কষাও আমার গালে
তোমার চুল দিয়ে আঘাত করো আমায়।
তা না করে আমায় এই
দুর্বৃত্ত যুবতীদের হাতে সঁপে দিয়েছো! ও রাধিকা!”

***

“দয়া করো, ক্ষমা করো, বাহু ডোরে বাঁধো আমায়
মান রাখো আমার প্রেমের, একটু ভালোবাসো
আনন্দে ভরে দাও, ভুলে যাও ক্রোধ
আমি সইতে পারছি না আর!
ভিক্ষা দাও হে রাধিকা!”

***

বধির কানে মিনতি পৌঁছায় না
উত্তর আসে না কোনো
সৌরি শুককে নম্রভাবে বলে,
“প্রিয় শুক, তোমার সাহায্য চাই আমি!”

***

“ছোট্ট পাখি, তুমি রেগে আছো?
শোনো, একটু সহানুভূতি দেখাও আমায়
তার প্রেম ফিরিয়ে আনো
আমার জন্য তার ভালোবাসা ফিরিয়ে আনো”
অনুরোধ শুনে স্তম্ভিত পাখি
দু’পা পিছিয়ে যায়
চিরকাল রাধার প্রতি বিশ্বাসী সে
সান্ত্বনা দিয়েছে ধীরে
ডানা ঝাপটিয়ে সে হরিকে বলে।

***

“বাহ! বাহ! কে এ?
আহা! এ সেই কালা
চাঁদপানা মুখ যার
প্রেম উছলায়
তীক্ষ্ণ কটাক্ষ, মুক্তোর মত দাঁত আর সবল দুই বাহু যার!”

***

“এই সেই মহৎ গোপাল? তাই না?
কোথায় থাকো তুমি?
আমরা তোমায় বহুদিন দেখি না এখানে? নয় কি?
তোমার চরণকমল দেখে ধন্য হয়েছি আমরা
সব মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল আজ!”

***

পরিহাস শুনে হরি
শুককে তার বাহুতে নেয়
আদর ও চুম্বন করে আহ্লাদ করে
ধীরে ধীরে বলে

***

“শুক মধুর বচন বলে
শুকই মন্মথের বাহন
কামদেবের পিতাকে তার অপমান করা কি সাজে?
প্রিয় পাখি আমার, এইসব বন্ধ করো
রাধাকে বোঝাও যেন সে দয়া করে একটুখানি”
তার কথা শুনে টিয়ার বুলি ফোটে,
“ও লো মেয়েরা, তোরাই বল, যে আমায় ফেলে
অন্যের সঙ্গে মেতেছিল, তার সঙ্গে কী কথা কব?
আমার স্থানে সে রেখেছে অপরে, দিয়েছে তারে প্রেম
তোরাই বল, তাকে আমি কেন দেখবো আবার?
সকল শর্তই ভেঙেছে সে।
তোরাই বল সখী আর কোনোদিন বিশ্বাস করা যায় একে?
সবার মাঝে সভামাঝে যে অপমান করে
তাকে সখা ভাবি কেমনে?”

***

কৃষ্ণের পানে চেয়ে টিয়া বলে,
“জ্বলন্ত শলাকায় বেঁধা সাপের মতো
হিসহিস করছে সে রাগে, তুলছে ফণা
কী করে তার কাছে নিয়ে যায় তোমায়?
সব জেনেও আমার সাহায্য চাইছো!
কিন্তু জেনে রাখো সব বদলে গেছে
কিছুই নেই আর আগের মতো
তোমাদের দু’জনকে এক করতে আমি পারবো না”।

***

এ’সকল শুনে রাধার
উচ্চকিত ক্রোধ ঝমঝমিয়ে ওঠে নূপূরে,
মুখ ফিরিয়ে চলে যায়
যেন শুনতেই পায়নি টিয়ের বুলি

***

“শিগগির এসো, মুহূর্তের সুযোগ!”
ফিসফিসিয়ে ওঠে টিয়া।
দাসীদের সরিয়ে কৃষ্ণের
পীতাম্বরে টান দেয় সে।
“কী বলবে সে? কেমন আচরণ করবে?
না জানি কী ভাববে? কীইবা বলব আমি?
কী করব?
এ বিপদ থেকে মন্মথই পারেন একমাত্র উদ্ধারিতে
কী করে একে অপরকে ভালো না বেসে থাকব?”
চিন্তিত, বিচলিত কেশব দ্রুত ভিতর পানে ধায়

***

ভয়ে কেঁপে উঠে রাখালরাজার ভিতর
রাধার ঘরে ঢুকতে বুক ধড়পড়ায়
সেইখানে বসে আছে রাধা, ফুলে ঢাকা শয্যা
যেন বা ফুঁসছে…

***

“সিনান হয় নি রাধে?
প্রসাধন কেন নাই?
কেন শূন্য কপাল তোমার?
অলঙ্কার কোথা?
চুলে কেন নাই ফুল?
সুগন্ধী কই?
কী অপরাধ আমার?
বল প্রিয়া, বল আমায়”।

***

“এমন ভয়ঙ্কর নৈঃশব্দ কখনো ছিল না
মধুরা, কথা কও না কেন?
যে অপরাধ করিনি তার জন্য দুষছো আমায়?
কেন মন খুলছো না?
সুন্দরী কেন উপেক্ষা করছো আমায়?
যে সম্পূর্ণ তোমাতে নির্ভরশীল
তাকে পায়ে ঠেলছো কেন কমলচরণ?
মন্মথও যেন প্রতিশোধ নিচ্ছেন!
দয়া করো, একটু ভালোবাসতে
পারছো না আমায়?”

***

তুমি বড়ো করেছো আমায়, ইলাকেও
শিখিয়ে পড়িয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছো তুমি নিজে
এখন এত ক্রোধ!
এটা কি ঠিক?

***

“ক্ষমা করেছো অতীতে
জড়িয়েছো বুকের মাঝে
ঠোঁট জুড়ে গেছে আমাদের
ধীরে ধীরে জাগিয়েছো লোভ,
শরীরে মিলিয়েছো শরীর, রঙ্গিনী!”

***

“আরেকটি বার ভাববে না?
শুনবে না অনুরোধ?
তাকাবে না আমার দিকে? বলবে না?
আসবে না কাছে? পাশে বসবে না?
করবে না করুণা? বাসবে না ভালো?
আর সইতে পারছি না
ক্ষমা করো, প্রিয়া”
ভিক্ষা করে কৃষ্ণ
রাধিকা কঠোর, নিরুত্তাপ
রাগ ও কামনায় তছনছ
হতে হতে সামলে ওঠে কেশব।
বলেঃ

***

“মন্মথ পুত্র আমার, শ্যালক চন্দ্র,
বিষ্ণু আমি স্বয়ং, মিতা আমার বায়ু
এরা আমার কী ক্ষতি করবে?
যদি জীবন চাও, হাসিমুখে দেব তা প্রিয়া”

***

“আমরা কি ভাবিনি ভালোবাসার মানুষকে হারাবার যন্ত্রণা যেন শত্রুকেও পেতে না হয়? নিন্দা করিনি তাদের যারা প্রেমাস্পদের থেকে দূরে থাকে? চারিপাশের লোকেরা আমাদের দেখে ঈর্ষান্বিত হত না? রাত্রিদিন উন্মাদবৎ রতিতে মাতিনি আমরা? কিন্তু সে’সবই অতীত। যখন প্রেম আমাদের ছিলো। সব বদলে গেছে এখন। হয়তো পরিস্থিতি শুধরালে দেখা হবে আবার! আপাতত বিদায়। অনুমতি দাও”।

***

সাপ যেমন খোলস ছাড়ে
ঘোমটা সরায় রাধা
ভ্রূকুটি কুটিল, উত্থিত স্তন
চোখ জ্বলে, কাঁপে ঠোঁট
রক্তচক্ষু রাধে অদৃষ্টপূর্ব ক্রোধে
তার ইতর প্রেমিকের মুখপানে চায়ঃ

***

“কে ডেকেছে তোমায়?
কেন এসেছো এখানে?
কে আমি? তুমি কে?
আমরা কে কার?
তুমি এখানে এসেছো
জানলে তোমার প্রেমিকা বিরক্ত হতে পারে
যাও, এক্ষুনি ফিরে যাও, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে!
আমাদের একসঙ্গে কেউ দেখে ফেললে হাসির খোরাক হতে হবে”।

***

“আমাদের সম্পর্ক আমাকে সততই করেছে মোহিত
এক লহমার তরেও তোমাকে মন থেকে সরাইনি
দুঃখ ছাড়া কী জুটেছে?
ভেবেছিলাম রামকে পেয়েছি আমি
কিন্তু তুমি কৃষ্ণ
তুমি বন্ধু হবে কেমনে?”

***

“শ্রীহরি, সেই রাধাও ছিল অন্য কেউ
সেই কৃষ্ণও ছিল অন্য একজন
এই রাধা অন্য একজন,
এই কৃষ্ণও অন্য কেউ
পুরনো কথা ভেবে কী হবে?
সেই মান আর সেই মানভঞ্জন…
সে সুখের দিন মনে আনাও কঠিন”।

***

“তখন তুমি আমার মন ভোলাতে
কাছে আসতে
কথা দেওয়া নেওয়া হল, বিশ্বাস জন্মালো
ভেবেছিলাম, পেয়েছি তোমায়।
কিন্তু বুঝিনি আমি ভেক আর তুমি কালসর্প”।

***

“তোমায় মানুষ করেছি আমি
যাতে পিঁপড়ায় না কাটে
যাতে মশা না কামড়ায়
আজকের তোমাকে তুমি করার জন্য
করেছি সকলই
তোমাকে নিজ থেকে বাদ দিয়ে আমি কি সুখী?
বলো মুরার হন্তারক” ।

***

“অন্য পুরুষেরা তাদের প্রেয়সীকে চুম্বন করে না?
অন্য পুরুষেরা তাদের প্রেয়সীকে ত্যাগ করে না?
অন্য পুরুষেরা পত্নীদের সঙ্গে কামে মাতে না?
তারা তোমার মতোন সমস্ত পৃথিবীকে জানিয়ে এমন করে?”

***

“আমার শাশুড়ি যেন গোমাতার বেশে বাঘিনী
আমি শুনি না ননদিনীর বারণ
স্বামী ক্রোধে উন্মত্ত
শ্বশুর আরোই ভয়ঙ্কর
ভাসুর বাঘের সমান গর্জায়
দেওর ছুরি শানায়
ননদিনী তেড়ে গাল দেয়
প্রতিবেশিরা যেন যমদূত
নিজের ভায়েরা যেন মেষ বেশে বাঘ”

***

“তাদের বোকা বানিয়ে, ছল করে
তোমার সঙ্গে দেখা করেছি
তোমার প্রেমে মেতেছি
আর এখন! এই তোমার ব্যবহার, শঠ!
সঠিক মূল্য চুকিয়েছো!”

***

“বাতাসের নিষেধ না মেনে
সকল সীমা লঙ্ঘন করে
সব বাধা চূর্ণ করে
আমি তোমায় ভালোবেসেছি,
কত কঠিন সময় পেরিয়েছি,
কিন্তু ভেবে দেখতে হত
গোয়ালার সঙ্গে পিরিতি করে
কে কবে থেকেছে ভালো?”

***

“সুতরাং এখন তোমায় দেখলাম
যা বললে, শুনলাম।
এবার যেতে পারো।
যে দিন অতীত তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করো না।
তোমার ইলার কাছে ফিরে যাও কমলনয়ন”।

***

“তোমার সঙ্গ পেয়ে
তোমা বিহনে বেঁচে থাকা অসহনীয়
পরমকে পাওয়া কেবল হারানোর জন্য!
আর এ যন্ত্রনা সইতে পারবো না গোপাল!”

***

“তোমার কামনায় ডুবে
দম আটকে মরছিলাম
আমি একা!
তখন তুমি ছিলে না গোপাল
এখন কেন এসেছো? অনেক দেরি হয়ে গেছে!”

***

“আত্মসম্মানবোধই সম্পদ, আশীর্বাদ স্বরূপ
আত্মগরিমাই নারীর অলঙ্কার,
তা যদি একবার চলে যায়, চিরতরেই হারায়
তখন বেঁচে কী লাভ? পদ্মনেত্র!”

***

রাধিকার সকল কটু কথা শুনে মুরা নাশন
শ্রদ্ধায় নত, “ প্রিয়া” সম্ভাষণে শুরু করে,
“ভৃত্যের অপরাধ বিনা প্রতিবাদেই ক্ষমা করা উচিত”।
এ কথা শুনে সেই ময়ূরপুচ্ছধারী মৌয়ের ঝাঁকের মতো
এলিয়ে পড়ে রাধার চরণকমলে।

***

কৃষ্ণ তার পায়ে আসা মাত্র
এক ঝটকায় বাঁ পা তুলে
নুপুর নিক্কণে সজোরে পদাঘাত করে রাধা
সেই মস্তকে যা ময়ূরপুচ্ছে শোভিত,
দ্বিজগণ যার পূজা করেন সস্মমানে
শিব ও সজ্জন জ্ঞানীদের যা পূজ্য
যেন ভবিষ্যতে সত্যভামার ক্রোধের সম্মুখীন
হওয়ার শিক্ষা দিল সে কেশবকে”।

***

নির্বিকার, সংযত যাদবকূলশ্রেষ্ঠ
উঠে দাঁড়ায়,
দু’হাত বাড়িয়ে ধীরে বলেঃ
“সুন্দরী, ধন্য হয়েছি আমি
কিন্তু আমার কঠিন শির
তোমার পায়ে আঘাত করেনি তো?
প্রিয় রাধা!”

***

“প্রেয়সী, তোমার উরু থরথর করে উঠছে
শাড়ি খসে গেছে, বুক ফুলে ফুলে উঠছে
গোড়ালি কেঁপেছে যে মুহূর্তে তোমার
পা স্পর্শ করেছে মস্তক আমার!
আমার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠেছে আনন্দে
এ আনন্দ বোঝাবো কেমনে!”

***

ধ্বস্ত রাধা আঁচলে মুখ ঢাকে
সৌরি চেয়ে থাকে তার দিকে
চন্দ্রাননা নারী কেঁদে চলে
চোখের জল বয় বুক ছাপিয়ে
যেন বা মেরুপর্বত থেকে নেমেছে ঝর্ণা

***

কাঁদতে দেখে, হরি আবার
ঝুঁকে পড়ে তার পায়ে
‘প্রেয়সী আমার, কাঁদছো কেন?
আমি কি তোমার চেয়ে বড়?
যদি তুমি এখনো রেগে থাকো,
বলো আমায় কী করবো আমি?
যা বলবে তাই করবো”
হরি রাধাকে জড়ালো দৃঢ় আলিঙ্গনে।

***

রাধা নিজেকে সঁপে দিল
প্রিয়তমার কাছে।
কৃষ্ণ তার ঠোঁটে ছোঁয়ালো ঠোঁট
গাল ছোঁয়ালো গালে
রাধা চুম্বন ফিরিয়ে দিলে হরি
তাকে স্পর্শ করে গভীর
কামদেবের প্রশ্রয়ে তারা মেতে ওঠে রতিখেলায়।

***

রতিখেলা সাঙ্গ হলে স্বেদে আনন্দে ভাস্বর
একে অপরের বাহুডোরে ডুবে থাকে
একে অপরের সুগন্ধে হয়ে থাকে মোহিত
দুষ্টুমিতে , তামাশায়, খুনসুটিতে
প্রশ্রয়ে ভরিয়ে তোলে নিজেদের।

***

ফুলের পাঁপড়ি যেমন ঝরে পড়ে
রাধিকা ঝরে কৃষ্ণের বুকের মাঝে
বাতাসের মতো তার চারপাশে ওড়ে
যেন কলের পুতুলের মতো তার চারদিকে ঘোরে
লাট্টুর মতো তাকে ঘিরে পাক খায়
কখনো পরিপাটি করে বেশবাস
কখনো গুমর করে
কখনো গালে ঠোনা দেয়
গঞ্জনা দেয় আদর করে
কখনো চুম্বনে ভরিয়ে দেয়
তার পুরুষাঙ্গ ছুঁয়ে তাকে জাগায় ধীরে
হরি ও রাধিকা রতিতে মাতে।

***

“তোমার বুকে কীসের দাগ, রাধা?”
“যেন তুমি জানো না কারণ কমললোচন!”
“তোমার ঠোঁট লাল কেন রাধা?”
“যেন তুমি জানো না কারণ দেবচূড়ামণি!”
“তোমার কাজল লেপটে গেল কী করে রাধা?”
“যেন তুমি জানো না কারণ, দেবশ্রেষ্ঠ!”
“কোথায় গেলো তোমার স্বর্ণ অলঙ্কার?”
“যেন তুমি জানো না কারণ, মন্মথপিতা!”

***

গোবর্ধন পাহাড়ের কোলে
বৃন্দাবনের শোভন বাগিচায়
মোহন লোভন প্রাসাদে
পারিজাত পুষ্পের কুঞ্জে
চিত্রিত প্রমোদ ভবনে
পুষ্পিত লতা বিতানের পাশে
ভীমা নদী তীরে
ফুলে ফুলে ছাওয়া কুঞ্জে
চাঁদের আলো চোঁয়ানো নগরে
প্রভু ও তার প্রেয়সী রাধিকা রইলেনঃ
প্রেমে।

***

সম্পদে ভরে উঠবে
সকল বাসনা হবে পূর্ণ
যদি কেউ পড়ে বা শোনে বা বিবৃত করে
রাধিকা সান্ত্বনম ।
কমললোচন প্রভু নিজে তাকে আশীর্বাদ করেন।

***

রাধিকা সান্ত্বনম সমাপ্ত হয় এই ক্ষণে। লেখা শেষ করলেন মুদ্দুপলানি সাহিত্য, সঙ্গীত এবং নৃত্যে যার দক্ষতা কৃষ্ণের আশীর্বাদে প্রশ্নাতীত।

Facebook Comments

Leave a Reply