পরিযায়ী না অভিবাসী? : অনুরাধা কুন্ডা

fail

শ্রমিকদের রাজ্যে কাজ জোটে। অথবা জোটে না। অতএব তারা অর্থের প্রয়োজনে ভিনরাজ্যে গিয়ে কাজ খোঁজে। তাদের পরিযায়ী বলা হবে না অভিবাসী বলা হবে, আমার কাছে সেটা প্রশ্ন। তবে বড় প্রশ্ন নয়। আমার কাছে বড় প্রশ্ন, তাঁরা কি ভিনরাজ্যে নিরাপদে আছেন? ঠিকমত বেতন পাচ্ছেন? চিকিৎসা নিরাপত্তা আছে তো? নিজে খেয়ে পরে থেকে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছেন? প্রথমত ওয়াটস ইন নেম? নামে কি এসে যায় অথবা কিছু হয়তো এসে যায়। কিন্তু করোনাকালে যখন ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের, যাদের দিনের মজুরি সম্বল, তাদের বলা হল বাড়িতে ফিরে যেতে, তখন আমি নিশ্চিত তাদের কারোরই মনে হয়নি যে তাদের কি নামে ডাকা হবে। পরিযায়ী না অভিবাসী। তাদের প্রয়োজন ছিল খাদ্য। চিকিৎসা। বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা। যদি যেতেই হয়। চারঘন্টার নোটিশে লকডাউনে সেটা সম্ভব ছিল না। এই যে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, জীবনধারনের তাগিদে ভিনরাজ্যে পাড়ি জমান, করোনা হানা দেবার আগে কি এঁদের কথা কেউ ভাবেনি? একটি অতিমারী আমাদের মনে করিয়ে দিল যে একরাজ্যের শ্রমিক অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করে সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে। যে সংস্থাতে এঁরা কাজ করেন, তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই। তাই যদি না থাকল, তবে কি নামে ডাকা হবে ভাবা বিলাসিতা।
করোনা দেশে এলো প্লেনে চেপে। বিদেশ ফেরত বিমানচারীদের হাত ধরে। তাতে সেলিব্রিটিরাও বাদ পড়লেন না। তারপর ভাইরাস ছড়ানো শুরু হল। বোঝা গেল এ সাধারণ কোনো জ্বর নয়। নিউমোনিয়া নয়। কোভিড নাইন্টিন নিয়ে এসেছে অতিমারী। ঘোষণা হল প্যান্ডেমিক। প্রথমে স্কুল কলেজ বন্ধ। তারপর দেশব্যাপী লকডাউন। চারঘন্টার নোটিশ। যে সমস্ত সংস্থায় এই ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের কাজ জুটেছিল তাঁরা হাত তুলে নিলে।
আপাতত ভারতবর্ষে সর্বাপেক্ষা বেশি কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা মহারাষ্ট্রে। এবং পনের লাখ ভিনরাজ্যের শ্রমিক, যারা বিহার, উত্তরাখন্ড, ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে কাজ করতেন, যাঁরা পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে বা শ্রমিক ট্রেনে অতি কষ্টে বাড়ি ফিরেছেন, কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রে আছেন, তাঁরা আর মহারাষ্ট্রে সহজে ফিরতে চাইবেন না। গুজরাটের ক্ষেত্রেও প্রায় এক অবস্থা।
এই কাজে ফিরতে না চাওয়ার পিছনে অনেকগুলো ভীতি কাজ করবে।
প্রথমত কোভিড আতঙ্ক এখনো বেশ কিছুদিন জনমানসে থাকবে। থাকবেই।
দ্বিতীয়ত, এই অতিমারীকালীন অভিজ্ঞতায় এঁরা বুঝে গেছেন যে এঁদের খাদ্য, সংস্থান, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায়িত্ব এঁদের কর্মসংস্থাও নেবে না। রাষ্ট্রও নেবে না। যা ব্যবস্থা হবে তাতে এঁদের প্রাণ হাতে করে নিজেদেরটা নিজেদের বুঝে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, এঁরা অর্থনৈতিক সমস্যায় এতটাই ভারাক্রান্ত থাকবেন এবং রাজ্যে ফিরে আসার পরে আবার নতুন করে যে কর্মসংস্থানের ক্রাইসিস হবে সেটা এক ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করবে।
সবমিলিয়ে কোভিড শ্রমিকদের স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অরাজকতার একটা চরম খারাপ অবস্থানে নিয়ে যাবে। মহারাষ্ট্রে যে বিপুল সংখ্যক ভিনরাজ্যের শ্রমিকরা কাজ করতেন, তাদের অধিকাংশই যেতেন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ বা উত্তরপ্রদেশ থেকে। এদের বাসস্থান মুম্বইয়ের শাস্ত্রীনগরে । বান্দ্রা ইস্টের পাশে যে মসজিদ আছে সেখান থেকে শুরু হয় চওলের প্রথম গেট। প্রথম চওলে বাস করেন মূলত মুসলমান আর দলিত সম্প্রদায়। তারপর জয় ভীম চওল থেকে শুরু দুই আর তিন নম্বর চওল। এইসব চওলগুলিতে যারা থাকেন তারা বেশির ভাগ কন্স্ট্রাকশনের কাজ করেন। বা কাঠমিস্ত্রি। রঙমিস্ত্রি। মুসলমান দরজি আছেন। এঁরা ভোর পাঁচটার সময় কাজে বেরিয়ে যান। সকাল আটটার মধ্যেই শাস্ত্রীনগর ফাঁকা হয়ে যায়। চার ঘন্টার নোটিসে লকডাউনে এঁরা সকলেই প্রায় বাড়িতে, নিজের রাজ্যে ফেরার সিদ্ধান্ত নেননি। এঁদের ধারণা ছিল যে প্রথম পর্যায়ের লকডাউনের পর অবস্থা স্বাভাবিক হবে। কাজ শুরু হবে। শুধু এঁরা কেন। দেশের আশি শতাংশ নাগরিক তাইই ভেবৃছিলেন। অতিমারী সম্পর্কিত তথ্য কতজনের কাছেই বা ছিল এবং হু নির্দেশিত সাতাত্তর দিনের লকডাউনের নিয়মই বা কতজন জানতেন! কিন্তু এই প্রাথমিক লকডাউন কালেই শ্রমিকরা বুঝে যান যে কেউ তাঁদের অন্ন সংস্থানের দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাবে নেবে না। গুজরাতে যে শ্রমিকরা সূচীশিল্পের সঙ্গে জড়িত, দরজির কাজের সঙ্গে জড়িত তাঁদের মালিকপক্ষ প্রথম পর্যায়ে কিছুদিন একবেলার রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারপর যে যার নিজের ম্যাও নিজে সামলাও। রেশন নিতে দূরদূরান্ত পাড়ি দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে ফিরে আসা। এই রেশন হিন্দুর। এই রেশন মুসলমানের। কোভিড আতঙ্কও এ বিভাজন কাটাতে পারল না। অতএব হিন্দু শ্রমিক, মুসলমান শ্রমিক, দলিত শ্রমিক …এইসব বিভাজন পিঠে বহন করে শ্রমিকরা নিজেদের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। তাঁদের অজান্তে কপালে অন্য একটা ট্যাগ বসে গেল। পরিযায়ী শ্রমিক। যাঁরা দিনের পর দিন না খেয়ে, রোগে ভুগে, পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়ে ভারতবর্ষের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পাড়ি দিলেন, তাঁরা কি পরিযায়ী শব্দের অর্থ জানতেন ?
উনিশশো সাতচল্লিশের পর শ্রমিক আইনে আরো দুশো বিধি যুক্ত হয়, যাতে রাজ্য ও শ্রমিকের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি করা যায় । আটত্রিশের এক ধারা বলছে রাজ্যর ওপর দায়িত্ব শ্রমিকদের সর্বাঙ্গীণ কুশলের ব্যবস্থা করা। আটত্রিশের দুই বলছে সবখানে বৈষম্য কমিয়ে আনা। বিশেষ করে উপার্জনের ক্ষেত্রে । একচল্লিশ নম্বর ধারা অনুসারে কাজে অধিকার, বিয়াল্লিশ ধারাতে রাজ্যের ওপর দায়িত্ব যাতে শ্রমিকরা কাজের সবরকম সুবিধা পান এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর হয়। তেতাল্লিশ নম্বর ধারাতে শ্রমিকদের এমন বেতন দানের কথা বলা হয়েছে যাতে তাঁরা সম্মানজনক ভাবে বাঁচতে পারেন। তেতাল্লিশের এ বলছে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার সাপেক্ষে ম্যানেজমেন্ট তাদের কাজের পদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
শুনতে চমৎকার । পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরা শ্রমিক দল, শ্রমিক ট্রেনে খাদ্য,জল সরবরাহ ব্যতীত ঠাসাঠাসি করে ফেরা শ্রমিক, সাইকেলে হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া শ্রমিক, সর্বস্ব বিক্রি করে মোটরসাইকেল কিনে দূরপাল্লা পাড়ি দিতে গিয়ে অ্যাক্সিডেন্টে থেৎলে যাওয়া শ্রমিক, ট্রেনলাইনে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ট্রেনের চাকাতে পিষে যাওয়া শ্রমিক, হাঁটতে হাঁটতে মরে যাওয়া জামালো। এরা কি এইসব আইনি অধিকারের কথা জানতো?
আমাদের শিক্ষাবিহীন শ্রমিকদের কাছে তাদের আইনি অধিকারের কথা জানান দেবার কথা ইউনিয়নের। অতিমারীতে ইউনিয়ন কি ভূমিকা পালন করেছে?
প্রচুর শ্রমিক বাইরে থেকে ফিরে স্টেশনে না নেমে রেলগেটের আগে নেমে পড়ে চুপচাপ রাতের অন্ধকারে বাড়িতে ঢুকে গেছেন।
হোম কোয়ারেন্টাইনে আমাদের দেশে শ্রমিকদের পক্ষে থাকা সম্ভব? যেখানে একটি ঘরে দশ থেকে বারোজন লোকও থাকে?
কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে সাপের কামড়ে মৃত্যু হয়েছে কোভিড পজিটিভের। ডাক্তার এসেছেন ঠিক মত?
আমরা একটা সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে বাস করছি। শ্রমিকরা “পরিযায়ী” না “অভিবাসী” এই প্রশ্নর চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন হল, তাঁদের ন্যূনতম অধিকারগুলি কি? স্বাস্থ্য। চিকিৎসা। খাদ্য। বাসস্থান। রাজ্যে কাজ পেলে, পর্যাপ্ত মজুরি পেলে তো ভিনরাজ্যে যাবার দরকার পড়ে না। আর ভিনরাজ্যে গেলে, তখন দায়িত্ব কার? সংস্থা না সেই রাজ্য? না রাষ্ট্র? শ্রমিকদের এইসব তথ্য জানার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। সেটা পালিত হয় কি?
এতৎসত্ত্বেও বলি। “পরিযায়ী” শব্দটি শ্রমিকের মর্যাদা, মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। পাখির মত তাদের ডানা নেই। কাজেই ওড়ার শখ থাকার কথা নয়। শ্রমিক মানুষের মর্যাদা পাক। বিদেশ থেকে প্লেনে করে যাঁরা ফেরেন তাঁরা যদি পরিযায়ী নন, দেশের মধ্যে এই বিভাজন কেন! হোয়াইট কলার জবের হ্যাং ওভার? কোভিড সময়ে অন্তত সেটা দূর হোক। নিতান্ত পেটের তাগিদে এবং সামান্য স্বচ্ছলতা পাবার আশায় মানুষগুলো বাড়িঘর, স্ত্রী সন্তানদের ছেড়ে অন্য রাজ্যে পাড়ি দেন।আবার কেউ কেউ স্ত্রী সন্তান নিয়েও যান। মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুরের প্রচুর শ্রমিক দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাত চলে যান কাজের আশায়। শিক্ষক বা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার যখন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যান, তাঁরা কি “পরিযায়ী” আখ্যা পান? একেবারেই নয়। বিদেশে উড়ে যাওয়া মানুষ এন আর আইয়ের তকমা লাগিয়ে ঠাঁটে ফেরেন দেশে। করোনার কালেও ফিরে এসে বেমালুম অসুস্থতা চেপে সামাজিক মেলামেশা করে বেড়ান। অসুখ ছড়িয়ে পড়ে। উলুখাগড়াদের প্রাণ যায়। যখন লকডাউন ঘোষণা করা হয়, তখন কি এঁদের কর্মস্থলেই রেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেত না? আর যদি ফেরত পাঠাতেই হয়, তবে অন্তত আটচল্লিশ ঘন্টা সময়, পর্যাপ্ত ট্রেন, খাদ্য, জল, চিকিৎসা ব্যবস্থা তো প্রয়োজন। সভ্যতা মানে দৈত্যাকার শপিং মল, আইনক্স, ওভারব্রিজ বা মেট্রো রেল নয় তো। সভ্যতা যখন মাটির কথা ভুলে যায়, তখন তার ঘোর বিপদ। মানুষের চেয়ে মেশিনের কদর বেশি তাই শ্রমিকট্রেনের যাত্রী মৃত মায়ের আঁচল ধরে টানা শিশুর ছবি ভাইরাল হয়। কর্মস্থানে এঁরা কতটা ভালো থাকতেন সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। পুঁজিবাদের কায়েমি স্বার্থ মানুষকে নিংড়ে তার কার্যসিদ্ধি করে নিচ্ছে।করোনাকাল সেই মুখোশ খুলে দিল। অভিবাসী শব্দ দিয়ে শুধু মন ভোলালে হবে না। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পরিকল্পনা করতে হবে। নিজের রাজ্যে। নতুবা যে নামেই ডাকো, পেট ভরবে না ।

[লেখক – নাট্যনির্দেশক, লেখক, চিত্রনির্মাতা, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা, মালদা কলেজ।]

Facebook Comments

Leave a Reply