চিত্তপ্রসাদ ? সেটা আবার কে ! : অর্ক দেব

সবচেয়ে ক্লিশে সত্যগুলির একটি হল, সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ। কথাটি বহু ব্যবহারে জীর্ণ হলেও মিথ্যে নয়। সমাজের ক্লিন্নতা, মোটা দাগের সংস্কার কাগজে তোলা হয় অবিরল। মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ পদ্ধতিতে জ্যোতিষেরও প্রচার হয় আবার পরিযায়ী শ্রমিকের গ্লানির কথাও লেখা থাকে। ডিজিটাল যুগে মানুষের স্মৃতির ঘনত্ব এত কম যে একটি ঘটনার অভিঘাত আমাদের ঘিরে রাখে না। মুহুর্মুহু ঘটনার স্রোতে কী ধরব কী ছাড়ব আমরা বুঝে উঠতে পারি না। তুমুল সাইক্লোনে মানুষের অস্তিত্ব হারানোর যন্ত্রণা, পরিযায়ী শ্রমিকের চোখের কোটরে জমা জল ধরতে পারে না বাজারি কাগজ। গুরুলঘু ভেদও থাকে না। এই নাভিশ্বাস থেকে উত্তরণের জন্যে সময়ের দলিল লেখা দফতরি শিল্পীর অভাব অনুভব করি। একজন আর্টিস্ট যিনি নক্ষত্রদোষে একগুঁয়ে একা হয়ে এঁকে, লিখে যাবেন দুর্দশার আখ্যান।

অথচ বাস্তবে পেইন্টিংয়ের জনপরিসরে কোনও গুরুত্বই তৈরি হল না। গ্যালারিসর্বস্ব বিষয় হয়ে রইল আর্ট। তাকে রবিবার দুপুরে দড়িতে ব্যালেন্সের খেলার মতো করে রাস্তায় নামানো গেল না। মেক্সিকোয় এই কাজটি নিপুণ তারিকায় করেছিলেন দিয়েগো রিভেরা। প্রশাসনিক ভবনের দেওয়ালও ছবিতে ছবিতে ভরিয়ে দিয়েছিলেন রিভেরা ও তাঁর দলবল যাতে অপেক্ষমাণ দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সঙ্গেও আর্টের একটা যোগাযোগ তৈরি হয়। আর আমরা দেখলাম রাস্তার ছবিগুলিকেও শিল্পীর মৃত্যুর পর গ্যালারি কিনে নিল। ছবি আঁকাকে ঘিরে একটা নোংরা ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা গেল। মানে যার অর্থ আছে তাঁর বাড়ির পায়খানায় সফিউদ্দিন, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোড়ের ছবি ঝুলতে পারে। উল্টোদিকে যিনি ক্ষমতাবান তার অ্যামেচার আঁচড়ও ছবি হিসেবে গণ্য হবে আর আর্ট কলেজের গুণী ছেলেরা কাজের খোঁজে সোল খুইয়ে ফেলবে। এরকম একটা দমবন্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমি বারবার হাতড়াই চিত্তপ্রসাদের ছবি।

চিত্তপ্রসাদের ছবি দেখতে শেখার একটা প্রস্তুতি আছে। সেই প্রস্তুতিটাই লিখব এখানে। মনে করুন, শিশুপাঠ্য ইতিহাস বইতে একটা ছবি থাকত। ঝুঁকে থাকা মানুষ কী ভাবে ক্রমে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটছে। সাধারণ দেখা মিলিয়েও গেছে স্মৃতি থেকে। কিন্তু অনেক পরে মনে হয়েছে আরে এটা তো আসলে শ্রমের ইতিহাসের সমান্তরাল একটা ইতিহাস আছে, মেওনিজ ও ওবেসিটির। আমদের শিল্পীরা এই শ্রমনিবিড়তাকে ছবির বিষয় করে তোলেননি খুব একটা। ব্যতিক্রম চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোড়, জয়নুল আবেদিনরা।

একজন মহিলা উবু হয়ে ধান বিছন দিচ্ছেন, পিঠে বাচ্চা নিয়ে যিনি তিনটি পাতা একটু কুঁড়ি তুলছেন, ইটভাঁটায় ৯ ঘণ্টা কাজ করছেন যিনি, কাজ নেই তবু ময়লা চোখে রাত জাগছেন সোনাগাছির যে মেয়ে, কাঁখে বাচ্চা বলে দাম কমে গেল যাঁর, এদের সমস্ত গ্লানি ও ঘামের যোগফলই আমাদের লাটিমটা ঘুরছে। এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখান জার্মান গ্রাফিক শিল্পী হারবার্ট জান্টবের্ক। আমরা তাঁর থেকে পেয়েছি ১৬ টি ছবি। এই ১৬ টি ছবিই বুঝিয়ে দেয় কারা কাজ করে, কারা সেই কাজ ভোগ করে, অতি উৎপাদন কী, কী ভাবে কর্মীর দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, কী ভাবে না খেতে পাওয়া মানুষ অস্ত্র ধরে। সব প্রশ্নের জবাব লা-জবাব ১৬ টি ছবি। দেখলে প্রথমে হবে আত্মদর্শন, তার পর হবে বিশ্বরূপ দর্শন।

এই কাজটাই ভারতবর্ষে করেছিলেন চিত্তপ্রসাদ। বছরের পর বছর রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, এঁকে, লিখে, ছবি তুলে তিনি মূলত ধরতে চেয়েছেন কর্মী মানুষের জীবনের বহতা, কাজের স্রোত, কী ভাবে মহামারি আসে, কী ভাবে স্থানচ্যুত হতে হয় একজন কর্মীকে, কী ভাবে গ্রাম ভাঙে, জব শিফট হয় এই সব চিত্তপ্রসাদের ছবির আকর হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট পেশা, সে পেশায় জড়িত মানুষের গাধার মতো ভারবহনের দায় তাঁর চোখে আটকে গেছে। আমরা দেখেছি একটি ছোট্ট ছেলে হয়তো দুর্ভিক্ষে অনাথ, গ্রাম থেকে শহরে এসেছে, জুতো পরিষ্কার করছে অন্ন জোগাড়ের জন্যে। চোখ জোড়া সংশয় ভয়। আমরা দেখেছি ওবেসিটি আক্রান্ত বাবু ও বিবিকে টানা রিকশায় বইছে একজোড়া বলিষ্ঠ হাত। শোলাপুরে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মুখই যেন আসলে মহারাষ্ট্রের বাঁজা মাটি। দেখেছি গ্রাম থেকে শহরে এসে ঘাড় গুঁজে কাজ করছে যুবক। দেখে ভ্রম হয়েছে, এ হরিহর পুরুতের ছেলে অপু না?


মহিলার মাথায় মাল তুলে দিচ্ছেন সহকর্মী

চিত্তপ্রসাদের ছবিতে দেখি মহিলার মাথায় মাল তুলে দিচ্ছে পুরুষ। চিত্তপ্রসাদই দেখান, মানুষের চেয়ে বেশি তাঁর পিঠে চাপানো মাল, এই মালই তো মাটিতে ফেলে উঠে দাঁড়াবে বলিউডের কুলি! দেখেছি দিনের শেষে ক্লান্ত মানুষ গাইছে ধর হাতুড়ি তোল হাতে শাবল, চেরাগী পাহাড় ভাঙার গান। বলছি দেখেছি, দেখেছি কী ? হাতে হাতে সেই ছবি ফিরলে জীবনের জেন্দ আবেস্তা, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো পড়া হয়ে যেত। শ্রমিকেরা জানত পৃথিবী নামক আমলকীর সবুজ তারই করতলে তিরতির আজও। মেকি বামপন্থীরা তাঁকে দলছাড়া করতে পেরেছেন, না খেতে পাওয়ার বন্দোবস্ত করতে পেরেছেন, কিন্তু ছবিগুলি ঘরে ঘরে কেউ পৌঁছে দিতে পারেননি আজও। এখানে জান্টবের্ক ও চিত্তপ্রসাদের ছবি দুটো রাখলাম।

রিক্সাওয়ালা : চিত্তপ্রসাদ

জান্টর্বেকের আঁকা ছবি

২০১১-১২ সাল, বাংলার তখত-এর দখলদারি নিয়ে যুদ্ধ চলছে। একটা লম্বা আলোচনার শেষে শুভেন্দু দাশগুপ্ত বললেন – চিত্তপ্রসাদ যেদিন মারা যান, সেদিন শ্মশানে চারজন ছিলেন অর্ক। কমিউনিস্ট পার্টির সদর দফতরে খবর দেওয়া হয়েছিল, কেউ আসেনি। নিজেকে একজন শববাহী ভেবে নিয়ে আমি চিত্তপ্রসাদকে বোঝার চেষ্টা শুরু করি সেইদিন। অনেক গুলি বছর পেরিয়েছে, সেই পথে ফিরে দেখে নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধী মনে হয়।

১৯৫০ সালে আঁকা। স্বাধীনতার পর ঔপনিবেশিক,সামন্ততান্ত্রিক আর স্থানীয় পুঁজিবাদী ক্ষমতার মহাজোট।

চিত্তপ্রসাদের জন্ম ১৯১৫ সালে নৈহাটি শহরে। বাবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন গ্রামীণ সমবায় ব্যাঙ্কের একজন সরকারি হিসাব-পরীক্ষক। বদলির চাকরি ফলে সংসারও জাহাজের মতো আজ এ বন্দরে তো কাল সে বন্দরে। সেই ভ্রাম্যমাণ সংসারের জ্যেষ্ঠ সন্তান চিত্তপ্রসাদ। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজে। জীবনানন্দ বা কমলকুমারের মতো, চিত্তপ্রসাদের হয়ে ওঠার প্রথম কারিগর তাঁর মা ইন্দুমতী দেবী। বিপ্লববাদের আঁতুড়ঘর চট্টগ্রাম। সূর্য সেন, অনন্ত সিংহের নিঃশ্বাস এই জলহাওয়ায় মিশেছে সেখানে একজন সংবেদী তরুণের হৃদয় যে রক্তক্ষরণ হওয়ার কথা, চিত্তপ্রসাদের ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছিল। ১৯৪২ সালের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে বোমা ফেলে জাপান। চট্টগ্রাম বাঁচাও আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন চিত্তপ্রসাদ। একজন দুর্দশার দলিল আঁকিয়ে হিসেবে জীবন শুরু হল । কলকাতায় এসে চিত্তপ্রসাদ জনযুদ্ধ পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। দুর্ভিক্ষের বছর সেটা। চিত্তপ্রসাদ ছুটলেন মেদিনীপুর। বাংলার গ্রামে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকছেন, লিখছেন ‘হাংরি বেঙ্গল’। সিরিজের প্রথম এডিশনে পাঁচ হাজার বই ছাপানো হয়। ছাপানোর সাথে সাথে হাতে হাতে ঘুরতে থাকে বইখানা। ব্রিটিশ সরকার বিপদ বুঝে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বইটি পাওয়া গেলেই শ্রীঘরের হুলিয়া জারি হয়। সব বই নষ্ট হয়েছে, কিন্তু বই পোড়ালেই বই নষ্ট হয় কি?

দুর্ভিক্ষের ছবি

দুর্ভিক্ষের ছবি

দুর্ভিক্ষের ছবি

চিত্তপ্রসাদ অপরাজেয়, চিত্তপ্রসাদ মুসাফির। এই সময়েই নির্বিকার চিত্তে কক্সবাজার, বিক্রমপুর ঘুরছেন। পকেটে নোটবুক আর চারকোল। ১৯৪৬ সালে পার্টি হোলটাইমার হিসেবে বোম্বে যাত্রা করেন তিনি। ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে। মাস্টারমশাই নন্দলালের কাছে ছবি আঁকতে চাইলে তিনি বলেন, তোমার তো সব শেখা হয়ে গিয়েছে। আক্ষরিক স্বগতোক্তি, চিত্তপ্রসাদ ভাবলেন উপহাস। অতএব প্রথাগত ট্রেনিং আর নেওয়া হয়নি। অনেক পরে ভুল ভাঙে নন্দলালের একটি চিঠিতে, সারাক্ষণ সঙ্গে থাকত ওই চিঠিখানি।

১৯৪৬ এ নৌসেনাদের বিদ্রোহ ভারতেতিহাসে এক সমুজ্জ্বল অধ্যায়। চিত্তপ্রসাদ বিরাট ক্যানভাসে লাল রঙে নৌ-সেনাদের সেই আগুনকে ধরেছিলেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে, চিত্তপ্রসাদ তেলেঙ্গানা বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। আসলে একজন রাজনৈতিক শিল্পীর শরীর মনে যে অস্থিরতা, যা তাঁকে কিছুতেই ঘুমোতে দেয় না, ভূতগ্রস্ত করে রাখে, তা চিত্তপ্রসাদকে তাড়িয়েছে অবিরাম। ১৯৪৯ এ পার্টির সাথে মনোমালিন্য বাধলে চিত্তপ্রসাদ দল ছাড়েন। রাজনীতি নয়। প্রসঙ্গত এর কয়েক বছর পরেই ঋত্বিক কুমার ঘটককেও ট্রটস্কাইট বলে দল থেকে তাড়ানো হবে। জীবনের একটা বড় অংশ পার্টিকে দেওয়ার পর পার্টি খেদালে মানুষের মনের অবস্থা কেমন হয়, তা পার্টি যদি বুঝত! চিত্তপ্রসাদ অবশ্য থামেননি। সোমনাথ হোড় বারোমাস পত্রিকায় ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় চিত্তপ্রসাদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লেখেন-

“৫০-এর পরে রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে একান্তভাবে ছবি আঁকায় নিবিষ্ট হন। এটা অনিবার্য ছিল। জনজীবন থেকে ছবি আঁকার রসদ নিতেন। সেখানেই রইলেন, ওপর থেকে রাজনীতি ছবিতে ছাপাবার চেষ্টা করলেন না। পরবর্তী অধ্যায়ে যা কিছু এঁকেছেন — প্রায় সবই জীবনের জয়গান। আত্মপ্রত্যয় ছিল অগাধ। তাই কখনো দিশেহারা হননি। আপন জীবনীশক্তি ছবিতে প্রতিবিম্বিত। ওঁর ব্যবহার, কথা এবং লেখায় (ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে) হতাশার স্থান ছিল না।”

অ্যাঞ্জেলস উইদআউট ফেয়ারিটেলস

পার্টি ছেড়ে চিত্তপ্রসাদের লাভ-ক্ষতি দুইই হল। লাভ এই যে, জীবনের আরও আরও গভীরে যাতায়াত হল অবাধ। জেলেদের জীবনের কাছাকাছি গেলেন। যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে সামিল হলেন। ক্ষতি হল গ্রাসাচ্ছাদনের। চিত্তপ্রসাদ এসবকে পাত্তা না দিয়েই নিজেকে ভাঙছেন, টুকরো করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ১৯৫১ সালে বাস্তুহারা ছিন্নমূল শিশুদের ছবির সিরিজ তৈরি করা শুরু করলেন তিনি। সে বছরই মে মাসের মধ্যে শেষ করেন ১২টি ছবি। তখন এর নাম দিয়েছিলেন ‘ইন্ডিয়ান চাইল্ড ইন সার্চ অব হিউম্যান সোসাইটি। পরের বছর এর সঙ্গে আরও কয়েকটি ছবি যোগ করে নাম দেন ‘এঞ্জেলস উইদাউট ফেয়ারি টেলস। এই চিত্রমালার সতেরোটি ছবি প্রথম ছাপা হয় জার্মানির ‘টেগ বাক’ পত্রিকায়, ১৯৫২-র ডিসেম্বর সংখ্যায়। লিনোকাটে চিত্তপ্রসাদের আন্তর্জাতিক খ্যাতির সূচনা তখনই। ভাঙনের কথা বলছিলাম, বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চিত্তপ্রসাদ নিজেকে ক্রমাগত নিরীক্ষায় ঠেলে দিয়েছেন। একটা অ্যানালগ ক্যামেরা নিয়ে চললেন শোলাপুর। দুর্ভিক্ষ বিধ্বস্ত শোলাপুরে তখন ক্ষুধার্ত মানুষ পারলে মানুষের মাস খায়। এই সময় বোম্বের বস্তিতে নিজের তৈরি করা পুতুলে পুতুল নাচ দেখিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আর শরীর ভাঙছে চক্রবৃদ্ধি হারে।

চিত্তপ্রসাদের ছবির লক্ষণগুলি নিয়ে কথা বলা যাক। গতিময়তা তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিদ্রোহী মানুষ তাঁর ছবির ফ্রেম ভেঙে বেরিয়ে আসে। নীচুতলার মানুষকে তিনি দেখেন মনুষ্যেতর অনির্বাণ প্রাণ হিসেবে। তাই ছবিগুলিতে লো অ্যাঙ্গেল হবে। শ্রমিকের চোখ জুড়ে থাকবে ক্রোধের বিস্ফার। মা ইন্দুমতী আলপনা আঁকিয়ে ছিলেন, ব্রতচারী করতেন। লৌকিকতার প্রতি ঝোঁক তাঁর ছবির পরতে পরতে। আর আছে শ্রমনিবিড় জীবনকে তুলে ধরা। চিত্তপ্রসাদকে প্রভাকর কোল্টে মিনিমালিস্ট বলেন। কত কম রেখায় কত গভীর ব্যঞ্জনা ধরা যায় তা তাঁর থেকে নতজানু হয়ে শেখার। জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে জল রঙ তেল রঙ ব্যবহার করেছেন নাগাড়ে। চারকোল কেন ব্যবহার করতেন? কালি হয়ে যাওয়া জীবনেকে আর কীভাবেই বা ছোঁবেন। আর লিনোকাট, সস্তা দরে ছবি বিলোতে। কার্টুনের কথা বলতে হয়। আস্তিনের এই ধারালো ছোরা তিনি সময়ে সময়ে ছুঁড়েছেন ব্রিটিশ সরকার অথবা সংসদীয় গণতন্ত্রের মসিহাদের বিঁধতে।

চিত্তপ্রসাদ পছন্দ করতেন না তাঁর ছবির এক্সিবিশন হোক। চেকোশ্লোভাকিয়ায় একটি প্রদর্শনীর পরে আসে একটি মোটা অঙ্কের চেক এবং আজীবন নাগরিকত্বের অনুরোধ। চিত্তপ্রসাদ দুইই ফিরিয়ে দেন। এত মৃত্যু দেখেছেন, সম্ভবত অনাহারে মৃত্যু তাঁর কাছে বড় শ্লাঘার বিষয় ছিল।

ভাবতে অবাক লাগে না যে মানুষ দো বিঘা জমিন এর পোস্টার বানায়, আইপিটি এর লোগো বানায় , শরীরের সব নুন দিয়ে দেয় নিরন্ন মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে থাকতে, তাঁকে না খেয়ে মরতে হয়? আন্ধেরিতে কাজের সূত্রে গিয়ে প্রভাকর কোলটের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি নিজে মুখে বলেছেন, সপ্তাহে একদিন শুটকি মাছ খাওয়া ছিল তাঁর সর্বোচ্চ বিলাসিতা। তারা যাজ্ঞিককে ভালোবাসতেন। অসুখের সময় সংসার সামলে তারা চিত্তপ্রসাদের সেবা করেছেন অকাতরে। দোঁহাগুলি ওকেই লেখা। এই নিয়ে মহারাষ্ট্রের কমিউনিস্ট মহলে কুৎসা চলত। চিত্তপ্রসাদের জীবনের সবচেয়ে গ্র্যান্ড ছবিটি তাঁর বাড়িতে বর্ষার দেওয়াল হয়েছিল, এই মহতী কমিউনিস্টরা এগিয়ে আসেননি।

দোঁহা

চিত্তপ্রসাদের মৃত্যুর পরে লিলি আর্ট গ্যালারি তাঁর ছবির একটি প্রদর্শনী করে। আমি চিত্তপ্রসাদকে জানতে ও চিনতে নেমে যা পেয়েছি তার একটা হিসেব দিই। বন্ধুরা, এখনও তাঁর বহু কাজ হাতের নাগালে আছে।

এন্টালিতে সিপিআই অফিসে আছে। কলাভবনে আছে। বোম্বে থেকে প্রকাশিত স্ক্রিন পত্রিকায় ছবি এঁকে এক সময় তাঁর পেট চলত। সেখানে অন্তত গোটা পনেরো ছবি আছে। রজনীপাম দত্তের অধুনালুপ্ত বইয়ের প্রচ্ছদ তাঁর করা, হাতের নাগালেই আছে। আমার বাংলা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই বইয়ের প্রচ্ছদ ওঁরই করা।

কমলকুমার মজুমদারের ছবি নিয়ে কাজ করার সময় একদিন সকালে শিল্পী অতীন বসাক সক্কাল সক্কাল ফোন করে বললেন, এই শোনো চিত্তপ্রসাদকে নিয়ে কমলবাবুর লেখা। পরে ডেকে চিঠিটির জেরক্স দিলেন। একবার শান্তিনিকেতনে নীহারদার কাছে (সুবর্ণরেখা), ওঁর আঁকা একটা রবীন্দ্রনাথ পেলাম। শুভেন্দুদাকে দেখালাম, বললেল আগে দেখিনি।

চিত্তপ্রসাদের ‘সেলফি’ ও আত্মপ্রতিকৃতি

ভারতবর্ষ শিল্পীদের দেশ। তাই যে চিত্তপ্রসাদ নিজেই মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য আজীবন লিনোকাট করেছেন, তাঁর ছবির দিল্লি আর্ট গ্যালারি যে দামে বিক্রি করে তা সারাজীবনে সাধারণ মানুষ কিনতে পারবে না। যে চিত্তপ্রসাদ খেতেই পেতেন না তাঁর নিজস্বী বিক্রি হচ্ছে ইন্টারনেটে। ছবিতে তিনিই ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির দাম তিন হাজার টাকা। চড়া দামে বিক্রি হয় সুদৃশ্য বাক্সে ভরা লিনোকাটের কপি। চেক চলচ্চিত্রকার প্যাভেল হোবল চিত্তপ্রসাদের জীবন ও ছবি নিয়ে তৈরি করেছেন তথ্যচিত্র। জার্মানি ডেনমার্ক, আমেরিকা, চেক রিপাবলিকে চিত্তপ্রসাদের ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে, কিন্তু চেনা মহলে তাঁর কথা তুলে শুনেছি, চিত্তপ্রসাদ কে?

আমি নিজেও কিছু করতে পারিনি তাঁর জন্যে, পাকস্থলীর চাপে।কাজের ফাঁকে নানা তথ্য জোগাড় করেছি। জেনেছি তাঁর আত্মীয়রাই তাঁর আঁকা ডাঁই করা বহু ছবি রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। ১৯৭৮ এর নভেম্বর মাসের এক বৃষ্টির বিকেলে তাঁর মৃত্যু হলে, কমিউনিস্ট পার্টির অফিস থেকে কেউ আসেননি শ্মশানে। একশো বছর পেরিয়ে গিয়েছে, জন পরিসরে তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনাই হয়নি, বন্ধুর বাড়ির দেওয়ালে দেখিনি তাঁর ছবি ঝুলতে।

সেদিন শ্মশানে ছিলেন খালেদ চৌধুরী, প্রভাস সেন। যারা ছিলেন না, তারা চিত্তপ্রসাদের ঘাতক। কমিউনিস্ট পার্টি, আমি, আপনি, আমরা সকলেই চিত্তপ্রসাদের খুনী।

শ্রমিক ঐক্য

Facebook Comments

Leave a Reply