ব্রাত্যরা অবাধ্য হলে : মৃন্ময় সেনগুপ্ত

fail

কত শ্রমিক মরলে রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙ্গে জানা নেই। আদৌ কি ঘুম ভাঙ্গে? লক ডাউন পর্বে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণে সন্দেহ জাগে। শুধু কেন্দ্র বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকারই নয়। বিচার ব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম – রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভের উদাসীন আচরণে এই সন্দেহ জন্মানো অমূলক নয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বভাবসুলভ নাটকীয় ভঙ্গিতেই মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে লক ডাউন ঘোষণা করে দেন। অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তার আগেই রাজ্যে লক ডাউন ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। লক ডাউন ঘোষণার আগে হিসেব মতোই বিদেশ থেকে ধনীদের দেশে ফেরার বন্দোবস্তে কোনো ত্রুটি ছিল না। অর্থের বিনিময়ে মধ্যপ্রদেশে নতুন সরকার গঠন, ট্রাম্পের ভারত সফর, তারমধ্যেই দিল্লীতে দাঙ্গা সবই চলেছে নিয়ম মেনে। সরকারি নিয়মকেই এখন রাষ্ট্রের নিয়ম বলে মানতে হবে। কারণ অন্যান্য স্তম্ভগুলির স্বাতন্ত্র নেই বললেই চলে। সবকিছু হিসেব কষে করার পরেই লক ডাউনের ঘোষণা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে থাকা মানুষদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নাই বা হল।
রাষ্ট্রের এই ছককে বানচাল করতে বেমক্কা শ্রমিকরা বিদ্রোহ করে বসবেন তা কেই বা জানত? তাঁরা যে বাড়ি ফিরতে এমন মরিয়া হয়ে উঠবেন, জান কবুল করে প্রয়োজনে হেঁটে হলেও বাড়ি ফিরতে চাইবেন সেটা বোধহয় রাষ্ট্রনেতাদের জানা ছিল না। পেটের টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাওয়া এসব শ্রমিকরা রাষ্ট্রের পরিকল্পনাতে স্থান পান না। সেই ব্রাত্যজনেরাই দেখিয়ে দিলেন প্রতিবাদ করতে জানেন। রাষ্ট্রীয় ছকের বাইরে হাঁটার স্পর্ধা দেখান। ২৮ মার্চ দিল্লীর আনন্দ বিহারে বাড়ি ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের জমায়েত আমাদের হতবাক করে দিয়েছিল। তার কিছুদিন পরেই মুম্বাইয়ের বান্দ্রা রেলস্টেশনে শয়ে শয়ে শ্রমিকের জমায়েত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ। মোদির রাজ্য গুজরাটেও তাঁরা পুলিশী নিপীড়নের শিকার হলেন। অনেককে জেলেও পোড়া হল। কর্ণাটকে বিজেপি সরকার তাঁদের ফিরতে না দেওয়ার জন্য ট্রেন পর্যন্ত বাতিল করার মতলব করেছিল। দিল্লীতে আশ্রয়হীন শ্রমিকদের যমুনার পারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার দৃশ্যও সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যম আমাদের জানিয়েছে। ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের স্প্রে করা, মাঝরাস্তায় আটকে দেওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের অত্যাচার করতে রাজ্য সরকারগুলি পিছপা হয় নি।
পশ্চিমবঙ্গের সরকার তো তাঁদের এই রাজ্যে ঢুকতে না দিতে প্রথম থেকেই সচেষ্ট ছিল।মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে মনে হবে এনারা যেন রাজ্যে ভাইরাস সংক্রমণের জন্যই ঘরে ফিরছেন।
রাজ্যের মানুষকে বাড়ি ফেরানোর দায় অস্বীকার করে তাঁদেরই খলনায়ক বানাতে চেয়েছে সরকার। যে রাজ্যগুলিতে এনারা কাজ করতেন, সেইসব রাজ্যের সরকারও (একটি, দু’টি বাদ দিয়ে) কোনো দায় নেয় নি। অবশেষে বাড়ি ফিরতে চাওয়া শ্রমিকরা যখন রাস্তায় অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন, দূর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন, আমাদের দেশের শৈশব বেঘোরে মরছে, তখন কিছুটা হলেও নড়েচড়ে বসতে সরকার বাধ্য হল। কিন্তু সরকারের সেই সুবন্দোবস্তের ফাঁকটাও আড়াল করা গেল না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভিড়ে গাদাগাদি করে কোনোক্রমে তাঁদের ট্রেনে চাপিয়ে দেওয়া হল। ট্রেনেও অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। রেল পুলিশের হিসেবে শুধুমাত্র মে মাসের ৯ থেকে ২৭ তারিখের মধ্যেই ট্রেনে ফিরতে গিয়ে আশি জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিহারের মুজঃফরপুর স্টেশনে মৃত মার ঘুম ভাঙানোর জন্য অবোধ সন্তানের চেষ্টা সপাটে চড় কষালো রাষ্ট্রকে। মধ্যবিত্ত মননকে ঘাড় ধরে দেখাল আসল ভারতের চিত্র। ইন্ডিয়ার বিকাশের অশ্লীল চিৎকারে মজে যে স্বদেশকে আমরা ভুলতে বসেছিলাম।
শ্রমিকের মৃত্যুমিছিল নিয়ে গণতান্ত্রিক দেশের বিচার বিভাগ কী ভূমিকা গ্রহণ করলো? প্রথমে তো বেমালুম এই শ্রমিকদের সমস্যার কথাই অস্বীকার করে বসেছিল। সরকার পক্ষের উকিলের (স্বয়ং সলিসিটর জেনারেল) মিথ্যা বক্তব্যকেই মান্যতা দিয়েছিল। সলিসিটর জেনারেল বললেন যে, কোনো শ্রমিকই নাকি বাড়ি ফেরার জন্য পথে হাঁটছেন না। সরকার পক্ষের বক্তব্যকে বিশ্বাস করে আদালত বলেও বসেছিল যে, সরকার যখন এইসব শ্রমিকদের খাবার দিচ্ছে, তখন এদের আর অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সামনে চলে এসেছিল রাষ্ট্রের স্তম্ভ হিসেবে আদালতের শ্রেণি চরিত্র। সংবিধান যাই শোনাক না কেন, বিচার ব্যবস্থা শ্রেণি নিরপেক্ষ হতে পারে না। লক ডাউনের পঁচাত্তর দিন পর চক্ষুলজ্জার খাতিরেই আদালত এই শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে সরকারকে নির্দেশ দিল। বলা যেতে পারে শুধু দেশ নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও অন্ধকার ভারতের চিত্রটা বেআব্রু হওয়ায় এছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু ততদিনে ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের অধিকাংশই বাড়ি ফিরে এসেছেন, বা পথে মরেছেন।
বাড়ি ফিরতে গিয়ে পথে শ্রমিকের হেনস্থা হওয়া, মারা যাওয়ার নিউজ ভ্যালু আছে। এসবের ভালো বাজার আছে। তাই সংবাদ মাধ্যমে এইসব ঘটনা স্থানও পেয়েছে। কিন্তু তারই সঙ্গে এনারা ফিরে আসাতে কীভাবে সংক্রমণ বাড়ছে, তারও প্রচার চলেছে সমান তালে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম তো আক্রান্তদের মধ্যে কতজন ঘরে ফেরা ‘পরিযায়ী” তারও আলাদা হিসেব দিয়ে চলেছে। এরথেকে অবমাননাকর আর কী হতে পারে!
আসলে রাষ্ট্র এই শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে চায় নি। নিছক উদাসীনতা বা পরিকল্পনাহীনতা নয়, রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবেই এই আচরণ করেছে। আজকে যাদের পরিযায়ী বলে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে তাঁরাই পুঁজির কাছে খুব প্রয়োজনীয়। এঁরাই সস্তা শ্রমের বড় যোগানদার। সস্তা শ্রমের জন্যই তো পুঁজি দুনিয়াব্যাপী ঘুরে বেড়ায়। উৎপাদনের উপাদানগুলির মধ্যে একমাত্র শ্রমই মূল্য সৃষ্টি করে। শ্রমশক্তি বিক্রি করে দিন গুজরান করে। পুঁজি চায় যত কম দামে সম্ভব এটা কিনতে। উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করেই পুঁজি পরিমাণে বাড়ে। পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। শ্রম ছাড়া পুঁজির চলে না। শ্রমের ওপর পুঁজির এই নির্ভরতা আড়াল করা হয়। বলা হয়, মালিক ছাড়া শ্রমিক বাঁচবে না। বিনিয়োগ যত বাড়বে, শ্রমিকের তত মঙ্গল। নয়া উদারনীতিতে শ্রমের মূল্য কম করাই উন্নয়নের মাপকাঠি বলে বিবেচনা করা হয়। মজুরি, কাজের নিরাপত্তা নিয়ে শ্রমিকের দর কষাকষি মহাপরাধ। উন্নয়নের মহাযজ্ঞে নিজেদের বলি দেওয়াই যেন শ্রমিকের মহান কর্তব্য। অসাম্যের দুনিয়ায় সচরাচর সস্তা শ্রম বাহিনীর অভাব হয় না। কিন্তু কোনো কারণে সেই যোগানে ঘাটতি হলে, পুঁজি বিপদে পড়ে। শ্রমিকদের বিশাল অংশ ঘরমুখো হলে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাই সঙ্কটে পড়বে। ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকদের প্রতি এই আচরণ আসলে পুঁজির এই অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ।
আজ ‘পরিযায়ী’ শ্রমিক বলে যাদের দেগে দেওয়া হচ্ছে তার সিংহভাগ বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। অনেকেই পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের জিডিপি’র অর্ধেকেরও বেশি এই ক্ষেত্র থেকে আসে। শিল্পক্ষেত্রেও অনেক ‘পরিযায়ী” শ্রমিক রয়েছেন। আবার খেতমজুরের কাজ করতে ভিনরাজ্যে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়। কেবল পুরুষই নন, বহু সংখ্যক মহিলাও কাজের জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকেই বহু মহিলা গৃহ সহায়িকার কাজ করতে অন্য রাজ্যে যান। লকডাউনের জন্য ঘরমুখো হলে, পরে কাজের জায়গায় তাঁরা নাও ফিরতে পারেন। বিকল্প জীবিকা বেছে নিতে পারেন। তাই পুঁজিরই স্বার্থে তাঁদের আটকে রাখা দরকার। কিন্তু আটকে রাখতে গেলে কিছু দায়ও তো স্বীকার করতে হত। আজ যদি লক ডাউন পর্বে তাঁরা মজুরি, থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা পেতেন, তাহলে বাড়ি ফেরার জন্য এমন মরিয়া হতেন না। প্রথমে মালিক বা তার দালাল সরকার কেউই সেই দায় স্বীকার করে নি। বেকায়দায় পড়ে এখন কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। যাদের ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয় নি, তাঁদেরই এখন ঘর থেকে কাজের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মালিক গাড়ির ব্যবস্থা করছেন। এমনকী আকাশপথে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও অনেকে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কেউ ট্রেনের টিকিটের পয়সা দিয়ে দিচ্ছেন। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন রাজ্যে কোম্পানিগুলি তাঁদের মজুরিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন দেশজুড়ে মজুরি কমাতে, ছাঁটাই অবাধ করতে শ্রম আইনে বদলে দেওয়ার বা কার্যকরী না করার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, তখন সত্যিই এ যেন এক উলটো পুরাণ। মালিকপক্ষ শ্রমিককে আশ্বস্ত করছে, ফিরে এলে কাজ থাকবে।
সরকারও আর তাঁদের প্রতি উদাসীন থাকতে পারছে না। প্রথমে রেশনের মাধ্যমে বিনামূল্যে চাল বা গম দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। মতলব ছিল, কাজের জায়গাতেই শ্রমিকদের আটকে রাখা। কিন্তু এখন ঘরে ফেরা শ্রমিকদের জন্য প্যাকেজ ঘোষণা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত এদের কথা মাথায় রেখেই মনরেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অথচ মোদি সরকারই একশো দিনের কাজের এই প্রকল্প তুলে দিতে চায়। যদিও, এই বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেবে এক কোটিরও বেশি শ্রমিক কাজের জায়গা ছেড়ে বাড়ি ফিরেছেন। এদের সকলকে নির্ধারিত মজুরিতে কাজ দিতে গেলে এরচেয়ে তিন গুণ অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। ছটি রাজ্যের ১১৬ টি জেলার ঘরে ফেরা শ্রমিকদের একশো পঁচিশ দিন কাজের জন্য অতিরিক্ত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। যদিও জেলাগুলি নির্ধারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সরকার প্রথমে ঘরে ফেরা শ্রমিকদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করছিল। তাঁদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, নিভৃতবাসে রাখা, খাদ্য দেওয়ার বিশেষ কোনো ব্যবস্থা কার্যত গ্রহণ করা হয় নি। বরং তাঁদের সঙ্গে গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের বিরোধ লাগিয়ে দেওয়ার স্থুল রাজনীতি করেছে। তাঁদের আর্থিক সহায়তা প্রকল্প নিয়েও অনিয়ম রয়েছে। পরবর্তীতে অবশ্য রেশনে চাল, ছোলা দেওয়ার, একশো দিনের প্রকল্পে কাজ দেওয়ার মতো কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। যদিও একশো দিনের কাজ যেমন সকলে পাচ্ছেন না, তেমন নিয়মের গ্যাঁড়াকলে ঘরে ফেরা অনেক শ্রমিককে রেশন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমাদের রাজ্যে কত শ্রমিক ঘরে ফিরেছেন তার সঠিক হিসেব সরকারের কাছে নেই। রাজ্য সরকারের হিসেব অনুসারে, ছয় লক্ষেরও বেশি শ্রমিক ট্রেনে করে রাজ্যে এসেছেন। তৃণমূলের যুবরাজের ট্যুইট বার্তা অনুসারে, প্রায় ১১ লক্ষ শ্রমিক এরাজ্যে বিভিন্ন উপায়ে ফিরেছেন। কেন্দ্রের সঙ্গে আর্থিক সহায়তা নিয়ে দর কষাকষির জন্য এখন তৃণমূল এই সংখ্যা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। আসলে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া প্রমাণ করে তৃণমূল সরকারের কর্মসংস্থানের গপ্পোটা কতটা মিথ্যে। মালিক পক্ষের মতো রাজ্যও চায় এনারা তাড়াতাড়ি কাজে ফিরে যান।
গ্রামেই এনারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে রোজগারের সুযোগ পেলে, কাজের জায়গায় নাও ফিরতে পারেন। আশঙ্কাটা অমূলক নয়। সংবাদ মাধ্যমও সেই কথা বলছে। রাজ্যের একটি বহুল প্রচারিত দৈনিক ঘরে ফেরাদের গ্রামেই কাজের সুযোগ দেওয়া প্রসঙ্গে বলছেঃ তাতে কি কারখানার শ্রমিকের অভাব হবে না? …… কিন্তু গ্রামে রোজগারের সুযোগ মিললে কারখানার মজুরি বেড়ে যাবে না তো?
( আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯.৬.২০) মালিক বা তাদের দালাল সরকার যে কথা মুখ ফুটে বলতে পারছে না, সেটাই বলল সংবাদমাধ্যম ( নাকি ঘুরিয়ে তাঁকে দিয়ে বলানো হল)। সোজা কথা, মানুষ যদি গ্রামে বা বাড়ির কাছেই রোজগারের সুযোগ পেয়ে যায়, তাহলে শিল্প বা পরিষেবা ক্ষেত্রে শ্রমিকের টান পড়বে। এমনকি খেত মজুরেও টান পড়বে। (শ্রমিকদের চাষের কাজে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঞ্জাব থেকে বিহারে বাসও পাঠানো হয়েছে)।পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের শহরে চলে আসার ইতিহাস। সে ইতিহাস বড় নির্মম, রক্তাক্ত।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এদের গ্রামে কাজ দেওয়ার জন্য এত পদক্ষেপ নিচ্ছে কেন? মালিকের প্রতি আনুগত্য ছেড়ে সরকার কি রাতারাতি জনদরদি হয়ে উঠল? বাংলায় একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ঠেলার নাম বাবাজি। ঠেলায় পড়ে সরকার এদের এখন সাহায্যের কথা বলছে, মালিক বাবাবাছা করে কাজে ফেরাতে চাইছে। এসবই সাময়িক। তিন/ চার মাস পর এই শ্রমিকদের গ্রামে রোজগারের কী ব্যবস্থা হবে? গ্রামে স্থায়ী জীবিকার কিন্তু কোনো ব্যবস্থা সরকার করছে না। মালিকও জানে সবাই ফিরতে শুরু করলে আবার মজুরি কমানো যাবে। তারকাছেও এই তোয়াজটা সাময়িক। যাদের মালিক, রাষ্ট্র, উন্নয়নের নেশায় বুঁদ হওয়া মধ্যবিত্ত সমাজ এতদিন ধর্তব্যের মধ্যেই আনে নি, তাঁরা আজ প্রাপ্য আদায় করে নিচ্ছে। পাল্টা চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছে। ভোটে মূল্য কম বলে, এতদিন যে ভোটবাজ রাজনৈতিক দলগুলি তাঁদের নিয়ে ভাবে নি, তারাও আজ ভোটের স্বার্থেই এসব নিয়ে বাজার গরম করছে।
ব্রাত্য এই শ্রমিকরাই আজ দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। দেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবে, রাষ্ট্র নিজে থেকে সেই অধিকার দেয় না। আজকে পরিযায়ী বলে দেগে দেওয়া এই শ্রমিকরাই সেই অধিকার দাবি করছেন। দাবি করছেন, নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নয়, পরিকল্পনামাফিক সংগঠিত হয়ে বা কোনো ভ্যানগার্ড পার্টির ছত্রছায়ায় নয়। স্রেফ রাষ্ট্রের প্রতি অবাধ্য হয়ে, বাড়ি ফেরার জেদে অবিচল থেকে। শ্রমিকরা যদি বাধ্য সন্তানের মতো রাষ্ট্রের নির্দেশকে মেনে নিত, বিচার ব্যবস্থার উদাসীনতাকে ভবিতব্য বলে জানত তাহলে কুঁকড়ে কুঁকড়ে তাঁদের জীবন কাটাতে হত। যে মালিকপক্ষ আজ জামাই আদর করে কাজে ফেরাতে চাইছে, সেই ছাঁটাইয়ের ভয়ে দেখিয়ে শ্রমিকদের মজুরি আরও কমিয়ে দিত। শ্রমিকরা ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হলে, অনাহারে মরলেও রাষ্ট্রের কিস্যু যায় আসত না। শ্রমিক জেদি হলে, লক্ষ্যে অবিচল থাকলে যে অসাধ্য সাধন করতে পারে, তাই আবার প্রমাণিত হল। অস্বীকার করার উপায় নেই, বাম রাজনীতির পরিসরেও এই শ্রমিকেরা ব্রাত্য রয়ে গেছেন।তাঁদের আইনি অধিকারগুলি নিয়ে কেউই বিশেষ সরব হন নি। এঁদের নিয়ে কোনো তথ্য ভান্ডার মূল স্রোতের বাম রাজনীতিতে বা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে ঠাঁই পায় নি। ব্রাত্য থাকা শ্রমিকরা দেখিয়ে দিলেন লড়াইয়ের এক পথ। সমাজ বদলের রাজনীতির ডিসকোর্সে কি এই লড়াই ঠাঁই পাবে? না কি রাষ্ট্রের মতো এই রাজনীতিও এরপরেও তাঁদের ব্রাত্য করে রাখবে? ভবিষ্যতই তার জবাব দেবে।

[লেখক – একজন রাজনৈতিক কর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply