করোনায় পরিযায়ী : প্রবীর রায়

fail

যারা যাযাবর, যারা বসবাসের জন্য অন্যদেশে যায়, তারা পরিযায়ী। শীতকালের চিড়িয়াখানার কথা মনে পড়ে। রায়গঞ্জের কুলিকের মত এই বঙ্গেরই বিভিন্ন জায়গায় নানা পাখি বিশেষ সময়ে আসে। এরা আসে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে। তারা আসে খাবারের সন্ধানে আর বংশ বৃদ্ধির জন্য।বিশেষ সময়ে তারা আসে, বিশেষ সময়ে চলে যায়। দুর দূরান্তরে কীভাবে যায় তারা? পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তাদের পথ চেনায়। এইভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তারা ছড়িয়ে পরে। কখনো কখনো ভাইরাস বহন করে তারা, রোগও ছড়ায় কোথাও কোথাও। এদের অজস্র প্রজাতি, তার কটিকেই বা আমরা দেখেছি। বিজ্ঞানীরা বলেন পৃথিবীর পাখি সংখ্যার প্রায় ১৯% এই প্রজাতির।

শুধু পাখি নয়, অন্য কয়েকটি প্রাণীও আছে এই তালিকায়। তিমির দল উত্তর আটলান্টিক থেকে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে যাতায়াত করে। কানাডায় মনার্ক নামের এক প্রজাপতি সুদূর দক্ষিন আমেরিকা অবধি যায়, আবার ফিরে আসে। এরা কেউ দেশের সীমারেখা জানেনা। ভারতবর্ষ বাঙলাদেশ আমেরিকা রাশিয়া তারা চেনেনা। এরা চেনে ঋতু ও প্রকৃতি।

এভাবেই আমাদের কাছে পরিচিত ছিল পরিযায়ী শব্দটি। করোনা পরিস্থিতি আমাদের সামনে এনে দিল নতুন শব্দবন্ধ, ‘পরিযায়ী শ্রমিক’। মনে হল পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে তাদের বিশেষ ভাবে চিহ্নিত করে আলাদা করে দেওয়া হল। আচমকা লকডাউন ঘোষণায় যারা অসহায় হয়ে পড়েছিল। তাদের কথা কারোরই মাথায় ছিলনা। দেশের মধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে তারা নিজেদের কাজ হারালেন। মাথা গোঁজার ঠাই হারিয়ে ফেললেন। প্রস্তুতির সময়ও পাননি তারা। ২৪শে মার্চ থেকে দেশে যে লকডাউন শুরু হল, তখন থেকেই এইসব শ্রমিকের দুর্দশা লক্ষ্য করেছে দেশবাসী।

এক অসহনীয় অবস্থা থেকে নিজেদের ও পরিবারকে রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠলেন শ্রমিকেরা। এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে যাওয়ার রাস্তা না চেনায় এবং মূল পথে প্রশাসনের কড়া নজর থাকায় বিভিন্ন রাজ্য থেকে রেললাইন ধরে পায়ে হেঁটে এক প্রায় অসম্ভব যাত্রা শুরু করলেন অনেকেই। দীর্ঘ পথ চলায় ক্ষতবিক্ষত হল তাদের পা। ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে তারা শুয়ে পড়েছেন রেললাইনের ওপরেই কখনও কখনও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এমনই পনেরো জন মধ্যপ্রদেশের শ্রমিক মহারাষ্ট্রের আওরাঙ্গাবাদে একটি রেললাইনে ঘুমন্ত অবাস্থায় মালগাড়ীর চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। ষোলোই মে উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনউ থেকে দুশ কিলোমিটার দূরে দুটি ট্রাকের ধাক্কায় চব্বিশজন শ্রমিক মারা যান।

এছাড়াও বাড়ী ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠা শ্রমিকদের ওপর পীড়নের সংবাদও ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। বিজেপি শাসিত রাজ্য সুরাতে শ্রমিকেরা বাড়ী ফেরার দাবীতে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল। লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে সেই বিক্ষোভ থামায় পুলিশ।

লকডাউন ঘোষনার সময়ে যে সঠিক কোনও পরিকল্পনা ছিলনা,তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এইসব শ্রমিকেরা। টনক নড়ল প্রশাসনের। ট্রেনে করে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ফেরানোর উদ্যোগ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। এর আগেই ভারতীয় রেল করোনার বিরূদ্ধে লড়াইএর জন্য পি এম কেয়ার তহবিলে দেড়শো কোটি টাকা দিয়েছিল। অথচ অদ্ভুত ভাবে তারা এইসব শ্রমিকের জন্য কিছু ব্যয় করতে পারলনা। রীতিমত নির্দেশিকা জারী করে রেল জানিয়ে দিল যে ট্রেন ছাড়ার আগে যে রাজ্যে ট্রেন যাচ্ছে, তাদের প্রতিনিধিদের হাতে টিকিট দেওয়া হবে। শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা রেলকে দিয়ে দেবেন।

এখানেই শেষ নয়। এইসব শ্রমিক স্পেশালে জলের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিলনা। খাদ্যের অভাব ও অসুস্থতায় প্রাণ হারানোর মত অবস্থা হল অনেকের। সাতাশে মে একটি ঘটনার ছবি ভাইরাল হয়ে যায় সোশাল মিডিয়ায়। গুজরাটে কাজ করতেন এক মহিলা,বিহারে ফিরছিলেন।খাবার ও জলের অভাবে তিনি ট্রেনেই মারা যান। মজফফরপুর স্টেশনে পৌঁছলে তার দেহ প্লাটফর্মে নামিয়ে দেওয়া হয়। তার শিশুপুত্রটি সহ একটি ভিডিওটি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পরে।
বাড়ী ফেরার জন্য মরিয়া কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। ২৩শে মে তারিখে হায়দ্রাবাদ থেকে আসামগামী ট্রেনে উত্তরবাংলার কিছু শ্রমিক ছিলেন।তারা যখন এনজেপিতে নামতে চান, তাদের বাধা দেওয়া হয়।জলপাইগুড়ি স্টেশনে না নামতে পারায় একজন ট্রেন থেকে ঝাঁপ দ্যায় ।তাকে বাঁচাতে চেন ট্রেন থেকে নেমে পড়ে আরও কয়েকজন বেলাকোবা এলাকায়।

এইসব শ্রমিকেরা নিজেদের গ্রামে ফিরলেও ঘরে ফেরা হয়না। নিয়ম মত তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা। কিন্তু প্রতিবেশীদের আপত্তিতে অনেকেরই স্থান হয় জঙ্গলের লাগোয়া তাঁবুতে কিংবা খোলা মাঠে। এরই মধ্যে কিছু সচেতন মানুষের উদ্যোগে কিছু কিছু কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে তাদের জায়গা হয়। করোনা টেস্টে বেশ কয়েকজনের পজিটিভ রেজাল্ট পাওয়া যায়। সুতরাং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের কাছে সহজ হয়নি।

করোনার থেকেও এদের যন্ত্রণা ছিল আরও মারাত্মক। সেই কাহিনীর যেন শেষ নেই।

কেরল থেকে ফেরার পথে সন্তান হারালেন শ্রমিক দম্পতি।তারা জলপাইগুড়িগামী ট্রেনে পুরুলিয়া ফিরছিলেন।
ঝাড়খন্ডের কয়েকজন নারী শ্রমিক কর্নাটকে কাজ করতে গিয়ে লকডাউনে বাড়ী ফিরতে না পেরে জঙ্গলে পালিয়ে যান।ইতিপূর্বে তারা নির্মাণ সংস্থায় ধর্ষিত হয়েছেন।
কেশোয়ারীর পরিযায়ী শ্রমিককে খুনের চেষ্টা করা হয়েছিল। ঘাটাল কোয়ারেন্টাইনে সাপের ছোবল খেয়েছেন একজন।পরিযায়ী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে হোম কোয়ারেন্টাইনে ধূপগুড়িতে।

করোনা পর্বে এই লাঞ্ছনা আর মৃত্যু মিছিলের মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতির শেষ নেই। সুখের কথা এই যে বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা , কিছু সচেতন বিবেক সম্পন্ন মানুষ, সরকারী সাহায্যের বাইরেও যথাসাধ্য করেছেন।তবুও এদের কর্মসংস্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি এখনও সমাধানের অপেক্ষায়।

[লেখক – বিশিষ্ট কবি ও সম্পাদক।]

Facebook Comments

Leave a Reply