দুঃস্বপ্নের মহাকাব্য : সৌম্য মণ্ডল

fail

হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথ হাঁটার কথা লিখেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। অর্থাভাবে প্রবাস থেকে ঘরে ফিরতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে হেডি ওয়েস্ট লিখেছিলেন “ফাইভ হানড্রেড মাইলস” গানের লিরিক। লকডাউনের পর কালো পিচ রাস্তা ধরে ভারতের শ্রমজীবীরা যখন হাজার মাইল দুরে বাড়ি ফেরার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন, যখন হাঁটতে থাকা ক্লান্ত শ্রমিকদের পুলিশ কান ধরে উঠবস করালো, যখন হাঁটতে হাঁটতে লরির চাকায় থেঁতলে, রেলের চাকায় টুকরো টুকরো হয়ে বা নিতান্ত ক্লান্তিতে সহযাত্রীদের মৃত্যু দেখতে হল এবং তার পর আবার হাঁটা শুরু করতে হল, যখন দীর্ঘ পদযাত্রার পর ক্লান্ত শ্রমিকরা আপন বিছানায় টানা ঘুম দেবেন ভাবছেন কিন্তু সরকার তাদের স্নান করিয়ে দেয় বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে অথবা করেন্টাইনের নামে গ্রামে ঢুকতেই দেওয়া হল না, ঠাঁই পেল গাছের ডালে ঝোপ জঙ্গলে, যখন অভিজাতরা সংক্রমণ ছড়াবার জন্য এই ঘরে ফেরা মানুষদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ প্রচার করলো, তখন বাস্তবের মাটিতেই জন্ম নেয় দুঃস্বপ্নের মহাকাব্য।

এই মহাকাব্যে আপন খেয়ালে চলা কোনও রাজাধিরাজ নেই। আছে নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যা দুনিয়ায় বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। এই বৃহত্তম গণতন্ত্র লকডাউনের আগে উচ্চবিত্ত, ধনীদের গোলার্ধের উল্টো দিক থেকে বিনামূল্যে উড়িয়ে নিয়ে এলো। কিন্তু শ্রমজীবী নাগরিকদের দেশের ভেতরে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পৌঁছে দিতে পারলো না! খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলো না! হাত পেতে বেসরকারি দয়া ভিক্ষা নিতে বাধ্য করা হল খেটে খাওয়া মানুষদের। দু মাস পরে যখন ট্রেনের ব্যবস্থা করা হল তখন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হল। তারপর নজিরবিহীন অপদার্থতা দেখাল রেল, একের পর এক চল্লিশটা শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন নাকি পথ ভুল করে অন্য কোথাও চলে গেল। হিন্দুস্থান টাইমস জানাচ্ছে রেল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ৯ মে থেকে ২৭ মে এর মধ্যে রেলের এক্তিয়ারের মধ্যে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভিন রাজ্যে আটকে থাকা শ্রমিকদের সরকারি ভাবে খাবার ব্যবস্থা করা হয়নি। অন্যদিকে ট্রেনে বেশী ভাড়া নিয়ে শ্রমিকদের পরিবেশন করা হয়েছে অখাদ্য। এমন সব ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে ট্রেন চললেও শ্রমিকরা ট্রেনে চাপতে না পারে। এসব সরকারি অপদার্থতা নাকি মালিক শ্রেণীর চাপে, সরকার চায়নি যে শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফিরুক? অথচ ভিন রাজ্যে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বাঁচার রসদটুকুও সরবরাহ করা গেলনা! নথিভুক্ত তথ্যগুলোকে যোগ করলে দেখা যাবে ভারতে ১২০ জনের বেশী শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হয়েছে করোনার জন্য নয় বরং করোনা ঠেকাবার রাষ্ট্রীয় পদ্ধতির জন্য। এই বৃহত্তম গণতন্ত্র পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে ঘরে আটকে রেখে তার নাগরিকদের সুস্থ রাখতে চায়! অবশ্য পুলিশ যখন রাস্তায় বেরুতে বাধ্য হওয়া নগ্ন পায়ের জনগণের উপর লাঠি বর্ষণ করে বা ধমকি দিয়ে অর্জিত ক্ষমতার পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছিল তখন কিন্তু ধনীদের পাড়াতে পুলিশ নেচে কুঁদে প্যারোডি গেয়ে শোনাচ্ছিল!

অথবা সরকার যখন লকডাউন ঘোষণা করলো তখন হয়ত খেয়ালই ছিল না পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যে শ্রেণী থেকে আসেন, তাদের এই অনুভূতিটাই নেই যে চড়া রোদে কোলে কাঁধে পিঠে ব্যাগ আর বাচ্চা বয়ে অন্তত ১০০ মিটার হাঁটতে কেমন লাগে! বা টাকার অভাবে না খেয়ে থাকা বা মালিক তাড়িয়ে দেওয়ার পর ব্রিজের তলায় দিনযাপন কেমন হয়! নেতা মন্ত্রীদের ঘুস নেওয়ার থ্রিলিং অভিজ্ঞতা থাকলেও দিনের পর দিন হাত পেতে দয়া নিতে বাধ্য হওয়ার অনুভূতি তাদের অজানা। শ্রমজীবী মানুষের সাথে রাষ্ট্রের এই মানসিক বিচ্ছিন্নতাকেই হয়তো আমরা অপদার্থতা ভাবছি! করোনা কালে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি প্রশাসনের এই অবহেলা, হয়রানি, অপমান নির্দেশ করে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতি বৃহত্তম গণতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গিটা কিরকম। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা আদৌ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার নৈতিক দাবি করতে পারে কিনা? কারণ এই পরিযায়ী শ্রমিকরাতো কৃষক বাড়ির সন্তান। আর ভারত কৃষক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশ। এই পরিযায়ীরা কিন্তু এখনো মুকেশ আম্বানী বা রতন টাটার মতই আইনের চোখে সম-অধিকার বিশিষ্ট ভারতের একজন নাগরিক। সব নাগরিকের একটাই ভোট। আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্বটাও এক বার চলে গেলে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে তার আন্দাজ আমরা করতেই পারি। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই রাষ্ট্রীয় অপমান, হয়রানি কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় দেখে হয়নি। শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক সরকারটিও কিন্তু খুবই সেকুলার আচরণ করেছে।

বহু সংবেদনশীল মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন কেন এই শ্রমজীবী মানুষদের পরিযায়ী তকমা দিয়ে পাখির স্তরে নামিয়ে আনা হবে! কেনই বা একই দেশের ভেতর এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেলে মাইগ্রেন্ট বা পরিযায়ী তকমা পেতে হবে। ১লা জুন আনন্দবাজার থেকে জানা যাচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য জয়তিকা কালরা বলছেন, “পরিযায়ী শব্দটি সম্মানজনক নয়। শুধু কর্মী বা শ্রমিক বলা হোক। কিন্তু যেহেতু এই বিষয়ে আইন রয়েছে, তাই তার সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কারও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দেই কিছু যায় আসে না।”

পরিযায়ী পাখিরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়ে বেড়ায়। শীত কালে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে সারসেরা উড়ে আসে সাঁতরাগাছির ঝিলে। পাখিদের জগতে আকাশকে কেউ কাঁটা তার দিয়ে কেটে ভাগ করে রাখেনি। পাসপোর্ট ভিসারও বালাই নেই। বর্ডার পার হওয়ার অপরাধে কোনও কোনও পাখি অন্য কোনও পাখিকে গুলি করে হত্যা করে না। পাখিদের কোনও দেশ নেই। তাই দেশান্তরেরও প্রশ্ন ওঠেনা। মানুষ তার বিষয়ীগত অবস্থান থেকে বা বোঝার সুবিধার জন্য পাখিদের উপর দেশান্তর বা পরিযায়ী শব্দ আরোপ করেছে। পাখিরা পরিযায়ী হয় প্রাকৃতিক নিয়মে। কোনও পাখি অন্য পাখিকে পরিযায়ী হতে বাধ্য করেনা। বা পাখিদের পরিযায়ী হওয়ার সাথে অন্য পাখির ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। কিন্তু সভ্য মানুষের দেশান্তরের বেলায় ব্যাপারটা ঠিক উল্টো।

লুম্পেন শব্দটার আভিধানিক অর্থ ভুঁইফোড় বা ভাগ্যান্বেষী। কিন্তু বিভিন্ন ডিকশনারিতে লুম্পেনের সাথে অবধারিত ভাবে প্রলেতারিয়েত শব্দটাকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেন সমাজ পিরামিডের নিচের তলার মানুষরাই শুধু লুম্পেন হতে পারে। কিন্তু ১৯৭২ সালে লাতিন আমেরিকার তাত্ত্বিক আন্দ্রে গুন্দ্রে ফ্রাঙ্ক “লুম্পেন বুর্জোয়া” বলে একটা শব্দ বন্ধকে সমাজতত্ত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাম্রাজ্যবাদের হাত ধরে গড়ে ওঠা ফাটকাবাজ পুঁজিপতিদের লুম্পেন বুর্জোয়া বলা হয়েছে। ফ্রাঙ্ক তার “লুম্পেন বুর্জোয়াজি এন্ড লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট” বইয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে উন্নত এলাকা গুলো অনুন্নত এলাকার অনুন্নয়নের জন্য দায়ী।

উন্নত এলাকাতে বৃহৎ বুর্জোয়ারা শিশুর পেটের ফিতা কৃমির মত তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের পুষ্টি বা উদ্বৃত্ত শুষে নিয়ে অনুন্নত অঞ্চলের অর্থব্যবস্থাকে শুকিয়ে দেয়। শুকিয়ে মারে তার সমাজকে। বেঁচে থাকার রসদের খোঁজে অনুন্নত অঞ্চলের মানুষের উন্নত অঞ্চলে পরিযান ঘটে। পরিযায়ী শব্দটা অন্তত এই বাস্তবতার স্বীকৃতি যে এই মানুষদের নিজেদের এলাকায় কাজ নেই।

এই পরিযায়ী শ্রমিকরা ঠিকা পদ্ধতিতে কাজ করেন। নেই শ্রম আইনের সুরক্ষা। ফলত নেই মালিকের সাথে আইনি দরকষাকষির অধিকার। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ভাষার শ্রমিকরা কাজের জন্য এক জায়গায় জড় হন । আবার যে যার দেশে ফিরে যান। পরের বার একই জায়গায় কাজ করতে আসবেন কিনা বা কাজ পাবেন কিনা তার ঠিক নেই। ফলত আন্দোলনের জন্য সংঘটিত হতে সমস্যা। স্থানীয় লোক না হওয়ার জন্য যেমন কাজ হারিয়ে থেকে কর্মস্থলে থেকে গিয়ে আন্দোলন করার পরিস্থিতি অনুকূল নয়। আবার স্থানীয় না হওয়ার কারণে তাদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে সেখানকার মূলধারার রাজনৈতিক দল গুলোও ভাবিত নয়। জোটেনা স্থানীয় সমর্থন। স্থানীয়রা অন্য ভাষাভাষীর পরিযায়ীদের এক প্রকার অবাঞ্ছিত মনে করে। লকডাউনে ত্রাণের জন্য বর্তমান লেখক মুম্বাই দিল্লির সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শহরে আটকে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের সরকারি জেনারেল রিলিফ ফান্ড থেকে হকের ত্রাণ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলে কেউই ভয়ে যেতে চায়নি। এই শ্রমিকদের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন তাদের সাথে অত্যন্ত দুর ব্যবহার করে শুধু তাই নয় বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাভাষী দেখলে বাংলাদেশী তকমা দিয়ে হয়রানি করা শুরু হয়েছে। এই সমস্যা অন্য ভাষাভাষীর পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

পাল্টা হিসেবে ব্যবসার সূত্রে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পরা ব্যবসায়ীদের কি পরিযায়ী ব্যবসায়ী বলা যায়? যেতেই পারে। কিন্তু সেখানে পরিযায়ী শ্রমিকের “পরিযায়ী” অংশটার মধ্যে যে বিপন্নতা জমে আছে সেটা প্রকাশিত হবে না। পরিযায়ী শ্রমিকরা শ্রমিকদের মধ্যেও আরও বেশী শোষিত। এই বিপন্নতা ভাঙিয়েই অতিমুনাফার পাহাড় গড়া হয়। পরিযায়ী শব্দটা মুছে দিয়ে শুধু কর্মী বা শ্রমিক বললে এই অসহায়তা এই বিপন্নতাকে ঢেকে দেওয়া হবে, কিন্তু মুছে দেওয়া হবে না। ভাষা প্রয়োগের রাজনীতি আছে ঠিকই। কিন্তু ভাষা দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে ভেঙে দেওয়া যায় না। তার জন্য বাস্তবের সম্পত্তি সম্পর্ক, উৎপাদন এবং বণ্টন সম্পর্ক বদলাবার প্রয়োজন। আর বদলাবার জন্য প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতি, বাস্তব বৈষম্যের স্বীকৃতির।

এই মহাকাব্য শুধু দুঃস্বপ্নের নয়। আশার আলোও আছে। এই মহাকাব্যের কেন্দ্রে প্যারাসাইট শাসক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সুপার পাওয়ার ভারত রাষ্ট্র নেই। আছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। বাইপাস ধরে হাটতে থাকা শ্রমিকদের জন্য সাধ্যমতো খাবারের ব্যবস্থা করেছেন স্থানীয় জনগণ। পুলিশি হয়রানির ঝুঁকি নিয়ে গোপনে লুকিয়ে অনেকটা পথ পেরোতে সাহায্য করেছেন লড়ি ড্রাইভাররা। শাসক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা যখন ক্ষমতায় বসে বা বিরোধী কায়দায় বিচিত্র তত্ত্ব আউরে বিভিন্ন আইডেন্টিটির ভিত্তিতে জনসাধারণের মধ্যে বিভাজন আনছিলেন, তখন কৃত্রিম বিভাজনকে হটিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজনীতির কেন্দ্রে আবার প্রতিষ্ঠিত করলেন সমাজের প্রকৃত বিভাজন শ্রেণী প্রশ্ন কে। ভ্যানগার্ডরা যখন স্যোশাল ডিসটেন্সিং নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ঠিক তখনই মুম্বাই সুরাট হায়দ্রাবাদ সহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে নামলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ালেন। যারা ঘরে ফেরার জন্য হাজার মাইল হেটে ফেলেছেন, তারা এই হয়রানি, অপমান মাথায় নিয়ে আবার লং মার্চেই শহরে ফিরতে পারেন, গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরতে।

[লেখক – গণআন্দোলনের কর্মী।]

Facebook Comments

Leave a Reply