পরিযায়ী – ক্রেংকার তুলে ওঠা শব্দ গভীর নিঃসঙ্গতার শিকার : শুভংকর গুহ

fail

পরিযায়ী। আমাদের মধ্যে এই বিশেষ শব্দটি ক্রেংকার তুলে আনে। ক্রেংকার শব্দটির পাঠক হদিস পেয়েছিলেন, ননী ভৌমিকের রাশিয়ান সাহিত্য অনুবাদকর্মের মাধ্যমে। ক্রেংকার শব্দটির সাথে সাবেরিয়ার বিশেষ প্রজাতির হাঁস বা সারস জলাশয়ের ওপর থেকে এক নৈসর্গিক ডাক দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার আগে বিরল পাখসাটের সশব্দ বিরল দৃশ্য। যা কি না রাশিয়ার মহান সাহিত্য আখ্যানের সাথে নিবিড় পাঠকের কল্পনার সহবাস। ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার এই ছবি আমাকে আজও এক বনভূমির জলাশয়ের আস্বাদ দিয়ে যায়। আর পরিযায়ী এমন এক শব্দ যার সঙ্গে ঋতু বিশেষে পাখির এক গভীর সম্পর্ক আছে। ইংরেজি সাহিত্যেও মাইগ্রাণ্ট শব্দটির সাথে নিসর্গ নির্জনতার যাপন আছে।

উচ্চবিত্ত মানুষ স্বভাবতই তার নগর বা সমাজজীবনে ব্যক্তিবৃত্তে থাকার বিলাস যাপন করে। কিন্তু অতিমারি বা নির্দয় ব্যাধির শিকার যখন গোটা বিশ্বসমাজ তখন বিশ্বায়নের আধিপত্যবাদের সংক্রমণকে তুচ্ছ করে দিয়েছে কোভিড – ১৯ এর ভয়াবহতা। এই একই প্রকার কুব্যাধি বিশ্ব অর্জন করেছিল ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর মাধ্যমে। এরও পূর্বে দুইটি অতি মহামারী বিশ্বকে অতিক্রম করতে হয়েছিল। সেই নিষ্ঠুর ইতিহাসের ব্যাপ্তি বহু চর্চিত।

বিগত শতাব্দীর আটের দশকের সূচনায় আর্থিকভাবে তলিয়ে থাকা, সব হারানো মানুষজন, প্রতিদিন কাজ হারানো ওয়ার্কিং ক্লাস বিশ্বায়নের কুফলের সঙ্গে সহবাস করেছে। প্রবলতর দীর্ঘশ্বাস দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের নিঃসঙ্গ জীবনের এক নতুন ভাষা দিয়েছে।

অতি মহামারী কালে বিশ্বব্যাপী লকডাউন পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণির কাজ হারিয়ে ঘরে ফেরার বেদনার ও ভয়াবহতা প্রতিদিন দেখেছি, তা এই জীবন্ত গ্রহের সবচাইতে মর্মান্তিক নিঃসঙ্গতার ছবি। রাষ্ট্র যখন তাদের ঘরে ফেরার দায় নেয় না, তখন শ্রমিক শ্রেণির সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অসহায়তা কি ভাবে সংজ্ঞায়িত হবে ?

আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্রের ব্যাখ্যার চাইতেও রাষ্ট্রের ভুমিকার ব্যাখ্যা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ রাষ্ট্র ও মিডিয়া যে ভাষা সৃষ্টি করছে আমরা তার বিরোধ করতে পারছি না। আমরাও সেই ভাষাকে অনায়াসে অনুসরণ করে চলি। ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ – কথাটি বলার মধ্য দিয়ে, রাষ্ট্রের একপ্রকার দায়মুক্ত হওয়ার প্রবণতাকে লক্ষ করা যাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র পুঁজির দোসর, আর ভারতবর্ষের গনমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে বৃহত্তর পুঁজির একাংশ।

গোটা ভারতবর্ষের ভারতীয় নাগরিকের যেখানে সেখানে গিয়ে কাজ করার মৌলিক অধিকার আছে, সেই ওয়ার্কিং ক্লাসকে রাষ্ট্রযন্ত্র মাইগ্রান্ট বলে কুৎসিত নিশানা করেছে। কাজের অধিকার যখন মৌলিক অধিকার, ভারতবর্ষের কোথায় গিয়ে কেউ কাজ করবে, তা তার কাজের দক্ষতা ও শ্রমের ওপরই নির্ভর করে। দিনমজুরের ক্ষেত্রেও একই কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ দৈহিক শ্রম দেওয়াই তাদের একমাত্র চূড়ান্ত দক্ষতা।

সরকার ও প্রশাসন যখন সর্বচ্চ স্তর থেকে লকডাউন ঘোষণা করলেন, এই উপমহাদেশে সমস্ত কাজের সুযোগের বিনিময়ে প্রতিদিনের রুজি রুটির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সংক্রমণের আতঙ্ক ও ভয়াবহতা গোটা দেশকে যখন বিহ্বল করে তুলেছে, সেই মুহূর্তে বিভিন্ন প্রান্তে থাকা দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষজন ক্ষুধার যন্ত্রণায় পথে নেমে এল। বিভিন্ন রাজ্যে থেকে পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের মনন ও চেতনাকে নিঃস্ব করে দিল। শত শত মাইল পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরার একমাত্র অবলম্বনকে সভ্যতার একপ্রকার বিমর্ষ ইতিহাস ছাড়া কিই বা বলা যেতে পারে। সরকার হাজার হাজার কোটি কোটি ব্যয় করে ডিটেনশন ক্যাম্প করতে পারেন, কিন্তু শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা করতে পারেন না। যখন করলেন, তখন বহু মানুষ পথের ওপরে পড়ে মারা গেছেন। হ্যাঁ, পুঁজির দ্বারা ব্যবহৃত শব্দগুলিই অর্থাৎ পরিযায়ী আমাদের পারলৌকিক ক্রিয়ার মন্ত্রের মতো সান্ত্বনা হয়ে উঠল।

আমাদের দেশে যারা কলে কারখানায় কাজ করেন, তাঁদের নিজেদের কাজের একটি ভাষা থাকে। নিজেদের কাজের অভ্যাসের মধ্য দিয়ে তারা সেই ভাষা গড়ে তোলেন। চটকল থেকে সুতোকলের সর্বস্তরের ওয়ার্কিং ক্লাসের ভাষার বিভিন্নতা আছে। বিভিন্নতা আছে, রেলকুলি থেকে চা বাগানের সর্বস্তরের কর্মীর মধ্যে। আমরা জানি সাধারণ ও প্রান্তিক শ্রমিকদের একটি কোঠার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে পরিবারের দশজন কি সাতজনের মুখ গুঁজে থাকার নিষ্ঠুর নিয়তি। তাঁদের ভোজন পদ্ধতি ও সামাজিক আচরণ, ব্যবহার চলমান ভদ্র সমাজের কাছে, তীব্র অস্বস্তির কারণ। তাঁদের অসুখ, রোগ, ক্রোধ ও আন্দোলনের পদ্ধতিকে উচ্চবিত্ত সমাজ ভালো চোখে দেখে নি। এই জন্যই ভারতবর্ষের মিডিয়া সাহস পেল ঘরে ফেরা ভারতীয় শ্রমিকদের পরিযায়ী হিসেবে চিহ্নিত করতে। এ এক পরিকল্পিত ভাষার আবিস্কার। পরিযায়ী কথাটির মধ্য দিয়ে মালিক শ্রেণি বা রাষ্ট্রের কোনো দায় থাকছে না। অথচ শ্রমিক শ্রেণির শ্রমের দ্বারা উৎপাদিত পণ্য রাষ্ট্র কব্জি ডুবিয়ে উপভোগ করছেন। মালিক শ্রেণি মুনাফা অর্জন করে, স্বৈর ও অবদমনের ডানা প্রসারিত করছে। পুঁজি ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করে এই সত্যটি বুঝে ওঠার শিক্ষা আমরা আজও অর্জন করতে পারি নি।

লক্ষ করলে দেখা যায়, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তিনি তাঁর উপন্যাসের আখ্যানে এই নিঃসঙ্গতার কথাই বলেছেন। যে ভাবে উচ্চবিত্তের সমাজ খেটে খাওয়া মানুষদের লেবার ও দিনমজুর বলে থাকে,-তাঁদের অন্য রাজ্য থেকে পায়ে হেঁটে বা পরবর্তীতে ট্রেনে ঘরে ফেরাকে সংক্রমণের মূল কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তাঁর থেকে বেদনাদায়ক আর কি হতে পারে ?

শ্রমিক শ্রেণির এই নিঃসঙ্গতা আজ কি কঠোর ও কঠিন বাস্তব। অতি মহামারীকালে এ আমাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। শুধু ভারতবর্ষই নয় গোটা বিশ্বে আজ শ্রমিক শ্রেণি প্রকৃতই নিঃসঙ্গ। আজ নিঃসঙ্গতা আর কোনো বিলাসী শব্দ নয়, এক কঠিন ও কঠোর অনুভব ও মানব চেতনার অনুভবের শব্দসঙ্গী।

[লেখক – বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।]

Facebook Comments

Leave a Reply