নির্মল বর্মা-র গল্পের অনুবাদ : শুভদীপ মৈত্র

fail

[নির্মল বর্মা (১৯২৯ – ২০০৫) : জন্ম সিমলায়। হিন্দী ‘নয়া কাহানী’ আন্দোলনের একজন মুখ্য লেখক। ভারতের অন্যতম আধুনিক কথাকার লিখেছেন উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ। হিন্দিতে অনুবাদ করেছেন কুন্দেরা থেকে কাপেক, বহু বিশ্বসেরা সাহিত্যিকের লেখা। ‘কাক ও কালাপানি’ গল্পসংগ্রহের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি পান। এছাড়াও পান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। তার উপন্যাসের সংখ্যা পাঁচ, যার মধ্যে ‘সেই দিনগুলো’ ও ‘লাল টিনের ছাদ’ উল্লেখযোগ্য। গল্পের বইয়ের সংখ্যা বারো, যার মধ্যে ‘পরিন্দে’, ‘কাক ও কালাপানি’ প্রসিদ্ধ ও পাঢক সমাজে আদৃত।]

জীবন এখানে ও ওখানে

আর তখন টেলিফোনের ঘন্টা বেজে উঠছিল, আর ও ভেবেছিল এটা নিশ্চয়ই সে – দৌড়ে ও ঘরের মধ্যে যায়, ‘হ্যালো’ বলে ফোনের মধ্যে, ‘আমি বলছি’। উল্টো দিকে নৈঃশব্দ, ‘হ্যালো!’ ও আবার বলে, যেন সে তার উৎকণ্ঠিত, ভাঙা ভাঙা শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছে। ‘হ্যালো!’, গলা খাকড়ে সে আবার বলল, ‘কে বলছেন, আপনি কে বলছেন?’
ও ফোনের উপর তাকাল। ফাঁকা দেওয়াল, জানুয়ারি মাস, একটা জানলা, জানলার উপর পর্দা ওঠানো ছিল। আমি দশ পর্যন্ত গুনব, মনে মনে ভাবল হয়তো সে রেখে দেবে তার মধ্যে, বিপদ কেটে যাবে। ও মনে মনে গুনতেও শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গেই তার গলা শোনা গেল, ঘাবড়ানো, নার্ভাস, ফোনের কালো নৈঃশব্দকে চিড়ে ‘ফ্যাটি? পরিস্কার করে কথা বলছ না কেন? আমি তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি না।”
“আমি নম্বর গুনছিলাম” হাসিহাসি গলায় বলল ও। “কী বললে? গুনছিলে?” সেও ধীরে হাসল – একটা ছোট্ট হতাশ হাসি – যেটা রিসিভারে ডানা ঝটপটাচ্ছিল আটকে পড়া পাখির মতো। “দেখো, আমি না আজ তোমার বাড়ি যেতে পারব না,” সে বলল, “লাইব্রেরিতে থাকব – তুমি আসতে পারবে?” মনে হল বলে দিই – ইরা আজ নয় আজ কাজ আছে আমার। কাজ? সে আওয়াজ থেকেই ধরে ফেলবে, নিঙরে বের করে ফেলবে মিথ্যেটা – ঘরে একা থাকাটা কোনো কাজ নাকি? সে বিশ্বাসই করবে না – সে ভাববে, তাকে জ্বালানোর জন্য করছি, কী আশ্চর্য, যখন তাকে বলেছ যে একা থাকতে চাও – এটা জেনেও যে তুমি একলা বাড়িতে থাকো – সে কখনো তোমার কথা বিশ্বাস করে না। যদি তুমি সত্যিই একা – তো একা কী করে থাকতে পারো।

কোনো লাভ নেই। রিসিভারটা দুহাতে আঁকড়ে ধরল যেন সেটা তার ছোট্ট মাথা! চুল নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত, কপাল কানো টিপ, সজল চোখ, “না না, আমার কোনো কাজ নেই, আমি যাবো। কনট সার্কাসে আমার একটা কাজ আছে। কাজ শেষ হলেই আমি যাব – কী বললে শুনতে পেলাম না? একটু জোরে বলো।”
“আমি সারাদিন আছি লাইব্রেরিতে” হঠাৎ তার গলার স্বর নিস্তেজ হয়ে গেল, ফরফরে ওড়া পাখিটা যেন এবার ভিষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে এলিয়ে গেছে, “তুমি যখন ইচ্ছে আসতে পারো, আমার…” বলে সে কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে আবার বলল, “আমার তোমার সঙ্গে দরকার রয়েছে – আমার….” বলে সে চুপ করে গেল। ও দেখতে পাচ্ছিল তার স্বরের সেই বিবর্ণ রঙগুলো যা ফোনের নৈঃশব্দে ছিটকে এসে লাগছিল – ডুবে যাচ্ছিল, তার গুঞ্জরণের ছবি দেওয়ালে আঁকা হচ্ছিল।

তুমি কী এখনো আছো?

জানি না, সে কী ভাবছিল? সে জিজ্ঞেসই করত না। সে দেখতেও চাইত না। সে মাঝামাঝি একটা রাস্তা নিয়ে নিত – দেখা আর জিজ্ঞাসার মাঝখানে – যাকে সে ‘জানা’ বলত। কিন্তু কখনো কখনো সে ভুলে যেত। সে ভাবত, সে ওর সাথে আছে। মাঝে মধ্যে লাল বাতি জ্বলে যেত আর সে আটকে যেত। পিছনে ফিরে সে দেখত যে সে নেই। পরে দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করার সাহসই পেত না ও সেখানে আদৌ ছিল কি না।

সে পরের দিন ফোন করত – আর ও ঘরেই থাকত। ওর ঘরে থাকাটা – একটা পাকা, মজবুত ব্যাপার। তাই কোনো সন্দেহই ছিল না সে ফোন করবে আর ওকে বাড়িতেই পাবে। সে হামেশাই কনট প্লেসের একটা পাবলিক বুথ থেকে ফোন করত। ডায়াল ঘোরাত – আর ঘণ্টা বেজে উঠত। সে বুথের কাঁচ দিয়ে বাইরেটা দেখত – ভিজে অগস্ট মাস প্রকাশিত কনট প্লেসের উপর, লনে বসে থাকা লোকজন…. ও শিঁড়ি দিয়ে উঠছে হয়তো এখন। এত বড় একলা একটা বাড়ি, ফাঁকা ঘর – ফোনের ঘণ্টা সেখানে পরিত্যক্ত, ভাঙাচোরা গির্জায় যেন প্রার্থনা, তার পাথরে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে ফিরে আসে। বৃষ্টির দিনে বুথের কাঁচে ফোঁটা ফোঁটা জলকণা ছিটকে লাগে – ধুসর মেঘ যেন তার ছাতের উপর ঘুরে চলে – দিল্লীকে তখন দেখায় একটা টিমটিমে দীপের মতো – কুয়াশার ঢেউয়ের উপর তিরতির করছে, হ্যালো, হ্যালো – আমি বলছি, তুমি….?”

আমি এখানে।
এখানে – আমার ঘরে…। এখানে জুনের সন্ধে মন্দ নয়, আকাশ থেকে ঝরে পরে ছাই আর সূর্য এক উপেক্ষিত কোণে জ্বলে। সে লাইব্রেরির এক কোণে বসে থাকে আর ও – তার চিলেকোঠার ঘরে। আর এখন কোনো ফোন আসবে না…. ও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে। আলো নিবিয়ে দেয়। পাখার দয়ায় সমস্ত পীড়াকে যেন ঘামের সঙ্গে সে ঝরিয়ে দিতে চায়।

আর কেউ আসবে। সে চলে গেছে। ও তাকে যেতে দেখেছে। ও মাসগুলোকে উলটো গুনছিল – জানুয়ারিতে এসে থামল। সব সময়ই ওই একই মাসে – যেন ব্যাগাডুলির গুলি চার দিকে ধাক্কা খেতে খেতে বার বার একই গর্তে পড়ছে। সে ছিল শীতের দিন আর ও বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল। তার ঘরের আলো জ্বলছিল – কাঁপছিল – ঘুম আসছিল না – সে এক অন্য সময় – ঘুমের মতোই এক ছায়াময় ঝাড়ের পিছনে দাঁড়িয়ে – সে তার ঘরখানা দেখছিল – সেই লেবু গাছের ঝাড় আর ছোটো মতো লন – খালি ও জনশূন্য। ওখানে আর কেউ থাকে না।

বিশ্বাস হয় না আমি সেই লোক, যে চারমাস আগে ছিল। তার বাড়ির বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিলাম। ফ্যাটি, তুমি সেই – সত্যি! তুমি সেই এবং একদম বদলাওনি, আমিই বদলে গেছি, সেই আমি যে পয়ত্রিশ বছর আগে যে এই পৃথিবীতে এসেছে। যদি তারা বেঁচে থাকত, তাহলে একদম এভাবেই চিনত। যদি তুমি বহু বছর পর বাড়ি ফেরো তাহলেও একদম চিনে ফেলত সবাই – কিন্তু তারা জানত না, তুমি কোথা থেকে ফিরেছ। তারা কখনো ভাবতেও পারবে না যে এত যন্ত্রণা সহ্য করে যাকে জন্ম দিয়েছে তাকে বড় হয়ে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে – সেই জন্য তারা চলে যায়। নিজের সন্তানের আগে চলে যায়। শেষ হয়ে যায়…. মরে যায়!

আর সন্তানেরা? তাদের কোনো তাড়া নেই – একটা খালি বাড়ি আর অন্তহীন সময়। আমিই তো শেষ। আমি রয়ে গেছি বেঁচে। আমার কোনো তাড়া বেই।

শুরুতে এমন ছিল না। ও সবমসয়েই তাড়াহুড়োতেই থাকত। যখন ও একাও থাকত তখন মনে হত কেউ না কেউ ওর সঙ্গে রয়েছে, একটা কুকুরের মতো আশেপাশে ঘুরছে। সে রাস্তার মাঝে হঠাত দাঁড়িয়ে পড়ত যেন কাউকে দেখতে পেয়েছে – গাছের নিচে কোনো অদ্ভুত পোকা, সুর্যের আলোয় চান করা কোনো প্রজাপতি – অথবা পিয়ানো থেকে বেরনো কোনো সুর, যাকে শুনে সে পাশের দেওয়ালে সেঁটে যেত। হাসতে শুরু করত – আমার মনে হত যে সে এমন একজন একা লোক যে একা হয়েও সঙ্গে নিয়ে চলেছে সারা পৃথিবীটা। আমার মাঝে মধ্যে ভীষণ ইচ্ছে করত একবার তার ওই দেওয়ালের পিঠে চরে নিচে তার একাকীত্বকে ঝুঁকে দেখি…. ও কার সঙ্গে কথা বলে, কোথায় যায় – কেন হঠাৎ হেসে ওঠে।

কিন্তু আমি লাইব্রেরিতে বসে থাকতাম আর ওকে দূর থেকে দেখতাম। যখন লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম, ডেস্কে মাথা দিয়ে – নিজের থিসিসের কথাও ভুলে যেতাম – তখন মনে পরত সেই সব দিনের কথা – যখন শহরে ঘুরে বেড়াতাম আমি। দিল্লী বড় শহর, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় কয়েকজনের বারবার দেখা মিলত। আমি ঘর থেকে বেরতাম… যেমন কিছু লোক জুয়া খেলে বা রেসের মাঠে যায়, তাদের বার বার কী ঠিক তাস মেলে ? কোন ঘোঁড়া প্রথম হবে জানা যায়? আমি নিজের সঙ্গে তেমন খেলতাম….. ও কী আসবে এই কনসার্টে? রবিবার ন্যাশানাল মিউজিয়ামের হলে আমার মনে হত, ও কোথাও পিছনে আছে, সপ্তম শতাব্দীর কোনো মূর্তি দেখছে। আচমকা তার দেখা পাওয়া যেত – আমি জিতে যেতাম। আমার বুক কেঁপে উঠত, কোনো নাটক থেকে বেড়িয়ে বা মিউজিক কনফারেন্স, যা শীতের রাতে বেশ দেরিতে ভাঙত…. আমি ট্যাকসির খোঁজে একদিকে দাঁড়িয়ে দেখতাম ও বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছে – যেখানে স্কুটার দাঁড় করানো থাকে।

দিল্লী এক আজব শহর – কিছু এমন জায়গা আছে – যেখানে ওকে সবসময় দেখতে পাওয়া যায় – এমন চলমান এক জগত যার সদস্যরা একে অপরকে চেনে না – তাও দেখা হয়ে যায়, অন্ধকার হলে হাততালি দেয় – কিন্তু একে অপরকে জানে না, স্পর্শ করে না – তামাশা শেষ হতেই যে যার নিজের কোণে আবার ফিরে যায়।

তারপর গ্রীষ্ম আসে, লোকে বাইরে যেতে শুরু করে – নৈনীতাল, মুসৌরি, শিমলা – সেই সব মৌসুমি পাখিদের মতো যারা সিজন বদলালেই নিজেদের বাসা ছেড়ে উড়ে যায়। দিল্লীর রাস্তায় তাও ভিড় – কিন্তু সেই সব লোক যাদের আমরা জানি – তাদের আর দেখা যায় না। থিয়েটার হল বন্ধ থাকে – মিউজিয়ামের অলিগলি উজার – যেন বাইরের সময়টাও – ভিতরের অচেতন কলাকৃতির ঘুমে যোগ দিয়েছে…..
একদিন বিচিত্র ঘটনা ঘটল। আমি লাইব্রেরিতে বসে ছিলাম…. পিছনের সিটে – যেখানে বাতিদান থেকে আলো সোজা ডেস্কে এসে পড়ে। একটা চড়াই সে বাতিদানের কাঁচের ভিতর খড়কুটো জড়ো করছিল – আর তার ছায়া আমার নোটস-এর উপর পড়ছিল – আমার এই ডিটেল ভাল মতো মনে আছে – কারণ আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল কেউ এসে সেই চড়াইয়ের ছায়াটা কেটে দিল, যেন ঢেকে দিল একটা পর্দার আড়ালে। আমি মাথা তুললাম, তাকে দেখতে পেলাম। এই প্রথমবার যখন তাকে আমি এত কাছ থেকে দেখি।

সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল…. যেন সে ভুল দিকে এসে পড়েছে আর ফিরে যেতে চাইছে….. আমি কি আপনাকে বিরক্ত করলাম? আমি মাথা নাড়ারালাম আর কাগজগুলো জলদি গুছোতে লাগলাম, যেন আমি ওদের লুকোতে চাইছি। কিন্তু তার চোখ ছিল আমার দিকে আর চাহনিতে ছিল এক সুদূর প্রশ্রয় – আমি হেসে উঠলাম। ‘কেন কিছু দরকার আছে?’ আমি প্রশ্ন করলাম – সে একটা দলা-মোচড়ানো কাগজ আমার নোটসের উপর রেখে দিল। আমি দেখেই বুঝতে পারলাম সেটা কোনো স্টেটমেন্ট, বা পিটিশান বা ‘ওপেন লেটার’ ধরনের কিছু – ভগবান জানে, এমন জিনিস তখন কত কত বেরোত। আমি মন দিয়ে পড়তে লাগলাম সেটা, কিন্তু আসলে আমার মন ছিল তার দিকে… সে এখনো দাঁড়িয়ে। আমায় কী করতে হবে? আমি তার দিকে তাকালাম। কিচ্ছু না, সে বলল, আপনি যদি একমত হন তো সই করে দিন। এতে কোনো লাভ হবে? আমি একটু রাগাতে প্রশ্ন করলাম যাতে সে একটু নিজের খোলস ছেড়ে সামনে আসে। কেন হবে না… সে বলল – লাভ হবে না হয়তো, কিন্তু যদি ওদের নজরে আনা যায় অন্যায়টা… অন্য কেউ বললে হয়তো হেসে ফেলতাম, কিন্তু সে লাইব্রেরির আধো অন্ধকারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে – বাইরে জুনের উষ্ণ সন্ধে। এমন সময় ন্যায় অন্যায়ের কথা আমার কাছে হিমালয়ের কোনো চটির মতো মনে হল, শীতল, শাদা পবিত্র অধরা – কিছু শব্দ যেন ভীর থেকে আলদা হয়ে যায় – নিখোঁজ, দায়হীন প্রেম ও পাপ, ঈশ্বর, মিথ্যে এবং ন্যায় এবং মৃত্যু – স্থির জলে আলদা আলাদা করে ঝকমকে, সুডৌল, নিটোল পাথরের মতো। আমি তাড়তাড়ি কাগজটা তুলে অন্য নামগুলোর তলায় সই করতে শুরু করলাম… তখন মনে হল – আমার সঙ্গে ওর আবার দেখা হবে – কোনো একদিন কারণ আমার নাম একটা দুটো নামের তলায় ছিল, একে যাতনা বলে।

কিন্তু এ অনেক পরের কথা এবং সেদিন আমি তাকে জানতে পারিনি।

সেসব দিনে আমাদের হামেশাই দেখা হত। দিল্লীর জুন মাস এক অলৌকিক চমক নিয়ে আসত – ধুলোর পর্দার উপর সূর্য মোমবাতির মতো পিছলে যেত তো কখনো কোনো মেঘ একটা ঘুঁড়ির মতো উড়ে ঢেকে দিত তাকে। ক্ষণিকের জন্য শহরকে ঘিরতো অন্ধকার – আর একটা ফাটাফাটা ফ্যাকাশে রঙে ভরে যেত লাইব্রেরি। সে বড়ো হলের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে দরজা খুলে দিত। সে তার ক্লান্ত চোখ ডেস্কে রেখে বুঁজত।

সে বাড়ির শিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। মাঝে কত রাস্তা পড়ে আর সে তাদের বাঁচিয়ে কনট প্লেসের গলিতে চলে গেল। নিকষ অন্ধকার গলিতে সে চলতে লাগল। বাইরে রোদে বসে মহিলারা মুলো চিবোচ্ছে – রসালো, ঝাল – তাদের পেরিয়ে গুলমোহর গাছের উপর রোদ ঝলসাচ্ছে।

দুটো গলির মাঝে বড় রাস্তা – আর সেটা পেরতে সে ওর হাত ধরে নেয় – ততক্ষণ ধরে থাকে – যতক্ষণ না আবার অন্ধকার করিডরে প্রবেশ করে। প্রথমবার একে অপরকে এমনভাবে ছুঁয়েছিল যেন – ভীত – রাস্তা পেরতে গিয়ে। এটা একদম ঠিক হয়নি। এ এমন এক অপয়া ব্যাপার যা ছায়ার দিকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায়। পরে, যখন আমি একলা রাস্তা পেরতাম, খালি হাতটা ভারি লাগত, পুরনো ছোঁয়ার অভ্যাসে – একজন প্রতিবন্ধীর মতো, যেন কাটা অঙ্গ মনে পরে যায় – এটা একটা ছোটখাটো মৃত্যুর মতো। লোকে বড় আস্তে আস্তে মরে।

আমি মরব না – ফ্যাটি ভাবল। এখনই না। আমার বাবা সত্তর বছর বেঁচে ছিলেন। আর মা এই কিছুদিন হল। আমাদের পরিবারে লোকে বেশ অনেকদিন বাঁচে। মরে গেলেও তারা যায় না – তারা থেকে যায় এখানে, হস্তক্ষেপ করে না, কথা বলে না – কিন্তু যখন আমি কিছু হারিয়ে ফেলি, দুঃখ পাই – তখন তারা অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে আসে আমার দুঃখ তাদের ঝোলায় পুরে ফেলে। আমার বেঁচে থাকার না হলেও মরে যাওয়ার ভাগীদার তারা নিশ্চয়ই হতে তৈরি – যেন আমার কানে ফিসফিস করে বলে – ভয় পেও না। তুমি আমাদের ভুলে যেতে পারো, আমরা তোমায় ভুলতে পারি না।

সে অন্ধকার করিডর থেকে বেরিয়ে এল – তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। একটুক্ষণ কিছু দেখতে পেল না – তারপর ধীরে কেউ তার হাত ধরল আর বলল – ডু ইউ নিড চিপ এয়ার টিকিট টু নেপাল?

নেপাল? সে চোখ খুলল আর হাসতে লাগল। সে বহু মাস পিছিয়ে গেছে – যখন ওরা একসঙ্গে ছিল। ওরা তোমায় বিদেশী ভাবে – ও বলল। আমায় দেখে নয় – ও বলল – যখন তুমি আমার সঙ্গে থাক না, তো কেউ ডলার চায়, তো কেউ নেপালের টিকিট বেচতে চায়। আমায় দেখে? সে হয়রান হয়ে গেল – হয়তো মিছিমিছি বা সত্যি অবাক হয়ে গেল, মাধার স্কার্ফ খুলে চুলগুলো বেঁধে নিল। সে বেশ লম্বা, চশমার পিছনের চোখগুলো ছিল কৌতুহল ভরা। কাঁধের থেকে একটা থলি ঝুলত আর তাতে নীল ফাইলে ফুলস্কেপ কাগজ আর লাইব্রেরির বই ফুলে থাকত। ঈশ্বর জানেন আর কী কী থাকত ওই ব্যাগে।

‘তুমি নিয়ে নিলে না কেন?’ হেসে সে চোখ তুলল, ‘এত সস্তায় নেপাল যেতে পারতে।’

‘শোনো আমি সামনে গ্রীষ্মে যেতে পারি…’ সে খুশি খুশি গলায় বলল।

সামনের গ্রীষ্মে? তার গলায় হালকা বিস্ময়। সেটা থিসিসের শেষ দিন ছিল… আর সে ভাবছিল না শীতের কথা না গ্রীষ্মের। লাইব্রেরি থেকে বাড়ি বাড়ি থেকে লাইব্রেরি – এই ছিল তার ছোট্ট পৃথিবী, কিন্তু কত বড়ো! এর মধ্যে নেপাল এক স্বপ্নের মতো। কিন্তু তখন – সেই কনট প্লেসের অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে – একটা অদ্ভুত সুখানুভূতি হল। মনে হল আমিও এই পৃথিবীর বাইরে বেরোতে পারি।

সুখ? এমন কোনো জিনিস আছে কী যার উপর আঙুল রেখে বলা যায়, এটাই সুখ? ফ্যাটি একটা থামের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে – বাইরে কনট প্লেসের ফোয়ারাকে লাগছিল দিয়ালির বেদানার মতো – ঝলমলে রোদে সাদা ফেনা ওপরে উঠছে, বিচে পড়ছে – না, সুখ বলে কিছু হয় না, কেবল মনে পড়া থাকে – বহু যাতনার মধ্যে – যখন মনে পরে এটা জুন মাস, আর ওটা ছিল জানুয়ারি। তুমি ভেবেছিলে, সে চলে যাওয়ার পর তুমি এই শহরে থাকতে পারবে না। কিন্তু তুমি জীবিত, তুমি শ্বাস নিচ্ছ…. মানুষের চামড় কী মোটা! সব কিছু সহ্য করে নেয়। জলে ডুবেও একটা কুকুরের মতো বেড়িয়ে আসে, গা-ঝাড়া দিয়ে সব কিচু একবারে ঝেড়ে ফেলে…. জলের ভিতরের সেই অন্ধকার আর কতক্ষণই বা মনে রাখে?

সে স্টেটসম্যান বিল্ডিং-এর সামনে এসে দাঁড়াল – লাল বাতিটা সবুজ হওয়ার অপেক্ষা – মাথার উপর দিয়ে তোতা পাখির ঝাঁক উড়ছিল – কার্জন রোডের গাছগুলোর থেকে উড়ে মিন্টো রোডের ব্রিজের উপর, হাওয়ার মধ্যে ঢেউয়ের মতো তারা যাচ্ছিল।

একবার পুলের উপর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছিল আর আমরা বাসে ছিলাম। মিন্টো রোডের উপরের পুলটা। ‘তুমি কিছু চাইলে?’ সে উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকাল – ‘এই সময় তুমি যাই চাইবে তাই পাবে।’ আমি হেসে ফেললাম – আমি জানতাম না সে এইসব জিনিসে বিশ্বাস করে। ‘জলদি, নাহলে ট্রেন চলে যাবে।’ এক মুহূর্তের জন্য আমরা চুপচাপ বসে ছিলাম। সে ছিল এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা আর তার গায়ে দেখলাম বিষন্ন আলো ছড়িয়ে রয়েছে। ‘বলো তুমি কী চাইলে?’ সে আমার দিকে তাকাল উদাস চোখে – আমি মুখ ফিরিয়ে বাসের বাইরে তাকালাম। সেই সন্ধে – মিন্টো রোডের পুলের নিচে – দুজনে একই জিনিস চেয়েছিল, দুজনের থেকে আলাদা হতে – ওরা দুজন যতটাই একে অপরকে চাইত ততটাই ছটফট করত একে অপরের থেকে নিষ্কৃতি পেতে, যেন চাওয়াটা একটা পাপ, দুঃস্বপ্ন – আর তখনই সিগনাল সবুজ হল, আর ওরা রাস্তা পেরতে লাগল, কার্জন রোদের গাছের তলায় এখন। তার নিচ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ল কে বলেছিল, যাদের কাছে আছে তারা আরো পাবে আর যাদের কাছে কিচু নেই তাদের শেষটুকুও কেড়ে নেওয়া হবে।

জানি না, এর মানে কী ছিল?

আমি এখনি যাব আর তাকে এটাই প্রশ্ন করব…. আর তখনই আমার মনে এল একটা ধুসর ছবি – সে লাইব্রেরির এক কোণে বসে আছে, রিসার্চের কপিতে ডুবে। সে হয়তো ভাবছে – আমি আর আসব না। সে আরেকবার ফোন করবে – ঘরে কেউ নেই – বাড়ির শূন্য ঘরে বিনা কারণে চিৎকার করবে ফোনের আওয়াজ – কারণ আমি এখনে কার্জন রোডের গাছের বিচে। উপর দিয়ে তোতার ঝাঁক গোধুলীর আলোয় মিন্টো রোডের ব্রিজের দিকে যাচ্ছে, বাইবেলের স্রেফ একটাই বাক্য আওড়াতে আওড়াতে… যার কাছে আছে …. যার কাছে নেই।

এটা একটা খেলা ছিল যা তারা খেলত – বিশেষ করে সেই সব দিনগুলো যখন তারা ক্লান্ত হয়ে যেত। লাইব্রেরি থেকে এসে ঘরে শুয়ে পড়ত। সে ঘরের দরজা খুলে দিত – নিচের ঘরে তখন নৈঃশব্দ, বন্ধ দরজার ভিতর।

সেটা একটা খেলা ছিল – জাদুকরি – যখন একটা শব্দও না উচ্চারণ করে একে অপরের ইচ্ছেগুলো বুঝে নিত। একে অনেকে টেলিপ্যাথি বলে – যখন দুই আলাদা ব্যক্তি একই সময় একই কথা ভাবে। সে যখন ওর ঘরে আসত, তখন সে অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ত – ক্লান্ত ও নিদ্রালু। সে হিটারে জল গরম করে রাখত – তারপর পাশে এসে বসত। দুজনে একে অপরে নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনত।

‘শোনো, আমি তোমার বাবাকে কখনো দেখিনি।’

‘তুমি জানো না, উনি মারা গেছেন।’

‘জানি,’ সে বলল, ‘কিন্তু তুমি তাঁর ছবিও দেখাওনি।’

সে উঠে বসত – আর খেলা শুরু হয়ে যেত। সে এক বিচিত্র খেলা, কিছুক্ষণের জন্য একে অপরকে ভুলে যেত… সেই সময় থেকে বেরিয়ে যেন আরেকটা সময়ে চলে যেত, যেখানে আমার বাড়িটা ধীরে ধীরে জেগে উঠত। বন্ধ ঘরের দরজা খুলে যেত, যেন একটা বন্ধ মিউজিয়াম, আমি গাইড – আর সে চুপচাপ চোখ বড় বড় করে সব জিনিস দেখত… আমি আলমারি খুলতাম, ছবিটা কোথাকার, সে ছবি তিরিশ বছর আগে তোলা। এমনভাবে খুঁজতে খুঁজতে অন্য সব জিনিস বেরিয়ে পড়ত। আমি তাদের লুকনোর চেষ্টা করতাম আর সে আমার হাত সরিয়ে দিত – আমার মনে আছে, মায়ের নথটা সে মন দিয়ে দেখত। আমি তাকে ঘৃণা করতাম, মায়র নাক সে ছিঁড়ে ফেলেছিল যেন, আলমারির অন্য দিকে বাবার নকল দাঁত ছিল, গেলাসে রাখা, সে বের করে রাখে পাশে। দাঁতের ভিতর তখনও দালরুটি লেগেছিল…. যা আগের রাতে খেয়েছিলেন….

‘মারা যাওয়ার আগের রাতে?’ সে জিজ্ঞেস করে। সে আমার পিছনে দাঁড়িয়েছিল, যেন সে আমায় বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। আমি বহু বছর ওই বাড়িতে একা থাকতাম, আমি তার প্রতি কোণ চিনি।

আমাকে বাঁচানোর প্রয়োজন নেই।

‘এই পালঙ্ক দেখছ… এই বিছানা, সে বলল ‘এখানে তারা শুতো। আমি উপরে – বর্ষাতিতে – যেখানে তুমি আসো।’

আমি তার পিছন পিছন চললাম। একটা লম্বা হলঘর। কোণে একটা তেপায়া রাখা ছিল। পিছনে কাপড়ের ওয়াড্রোব। সে জানলা খুলল – আর তখনি আলোর বন্যা ভিতরে, যেন বহুদিন ধরে বাইরে অপেক্ষা করছিল। বিছানার উপর আলো পড়েছিল – একটা তাকিয়া, দুটো কম্বল আর তার মাঝে পাশ বালিস – যেন কেউ শুয়ে ছিল – এক্ষুনি বেরিয়েছে।

‘এটা ওদের বিছানা ছিল?’

আমি তার দিকে তাকালাম – আমার বুক ধুকপুক করে উঠল। মনে হল, আমি কোনো প্রেতকে দেখছি – কোণে দাঁড়িয়ে – হাসছে। আমার তখন মনে পড়ল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে মাঝে মধ্যে এভাবে হেসে ওঠে – নিজের মনেই – যেন সে কোনো অদৃশ্য কিছু দেখেছে – ভিতরের পৃথিবী থেকে বাইরে আসতে – সে আনমোনা হয়ে উঠত। নিজের মনে কথা কইতে লাগত….

‘ফ্যাটি’ আমি তার কাঁধ ধরে ঝাঁকালাম। সে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি একটা কাঁচ যা ভেদ করে সে দেখছে, ‘হ্যাঁ ওরা এখানেই মারা গেছে, সে বলল, ‘আমি ওঁর তিপাইয়ের উপর ওষুধ রাখতাম, পেচ্ছাপের বোতল পরিস্কার করে দিতাম। আমি মাথার দিকের জানলা খুলে দিতাম। তুমি জানো না দিল্লির আগস্টের রাত কী পরিস্কার, শোয়ার আগে আকাশ গঙ্গা দেখত। কখনো ঘুমের ওষুধের দরকার হয়নি। উনি বলতেন তারাদের ভিতর শাদা ওই লাইনটা দিয়ে যেতে যেতে ঘুম এসে যায়। আমার দিকে অমনভাবে তাকিও না – সত্যি সত্যি এমন বিচিত্র মানুষ ছিলেন। যেদিন উনি জানতে পারলেন আমি লেখালিখি করি উনি নিজের রেজিস্টার দেখালেন আমায়, মারা যাওয়ার দুদিন আগে। প্লিজ, টার্ন টু পেজ নাইন্টি সেভেন… উনি নিজের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ইংরিজিতেই কথা বলতেন। আমি খুললাম, শাদা পাতা, উপরে শুধু লেখা – লাইফ হিয়ার অ্যান্ড হিয়ার আফটার! আমি ওঁর দিকে তাকালাম, উনি মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন… এটা টাইটেল – উনি বললেন। যখন উঠে বসতে পারব তখন সব কিছু লিখব। আমি ওনেকটাই ওঁর মতো। আমার বড়দি বলে আমার আর বাবার মধ্যে একটা সুক্ষ সুতোর পার্থক্য রয়েছে যেদিন তা ছিঁড়ে ফেলব আমি ওঁর মতোই হয়ে যাব। একদম নিদোর্ষ ও পবিত্র… এদিকে দেখো, এই ছবিটা এবার তুমি ওঁকে দেখতে পেলে….

এদিকে নয়, ওখানে জানলার কাছে যাও। আলোতে দেখো… আমার বয়স সাত হবে তখন। তুমি হাসবে – কিন্তু আমি সারা দিন কেঁদেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আমার শেষ সময় এসে গেছে। আমার অন্ধবিশ্বাস ছিল ফটো তুললে ভিতরের ‘ফুরনা’ ( এটা মায়ের শব্দ, যার মানে বোধহয় আত্মা। যখন আমি রেগে গিয়ে খেতে চাইতাম না, তখন বলত রাতে শুলে ফুরনা বেরিয়ে যাবে আর খিদে-তেষ্টায় ঘুরতে থাকবে) – তো সেই ফুরনা ফটোতে আটকে যাবে – যেমন কোনো প্রজাপতি অ্যালবামের কাগজে আটকানো থাকে। আমার ভয় ছিল ফটোটা তুলতেই আমি মরে যাব কারণ একজন একসঙ্গে দুজায়গায় কী করে থাকে। এই জন্যই আমি ছবিতে এমন আতঙ্কিত, ভিতু চোখে তাকিয়ে। মা চেয়ারে বসে, বাবা পিছনে দাঁড়িয়ে। আমি আগে, না পিছনে, দুজনের থেকে আলাদা হয়ে চেয়ারের হাতলে রেখে ঘাতক নিয়তির দিকে তাকিয়ে। মোটা ছেলেদের এমনিতেই ট্র্যাজিক দেখতে লাগে – সেই থেকে আমার নাম ওমন, এখনো তাই আছে, তোমার মনে আছে আমি যেদিন পিটিশান নিয়ে গেছিলাম লাইব্রেরিতে তোমার কাছে , তুমি ভেবেছিলে আমি কেউ…

সে শুনছিল না। সুদূর দৃষ্টিতে সে তিন অদ্ভুত প্রাণীদের দেখছিল যারা তিরিশ বছরের পুরনো ফটোয় নিঃশ্বাস নিচ্ছিল – তাকে দেখছিল, যেন প্রশ্ন করছে – কে এই অচেনা মেয়ে তাদের বাড়িতে এসেছে, জানলার আলোয় তাদের অন্ধকারকে নিরীক্ষা করছে – লাইফ হিয়ার অ্যান্ড হিয়ার আফটার! কোন জীবন – এখানকার না ওখানকার – যেখানে ওরা আছে – আমি যখন আলো জ্বালাতে উঠলাম, তখন সে আমার হাত ধরে বসিয়ে দিল… এমন ঘরে আস্তে আস্তে অন্ধকার নামাটা ভাল লাগল – জুন মাসের হলদে অবশেষ বিছানার উপর ছড়িয়ে গেল, আর আমি তার হাঁটুর উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। ভাবলাম, কে জানে সে বাবা মার সম্পর্কে কী ভাবছে! যখন তুমি কোনো মেয়েকে ভালবাস – তখন ভিতরের পট্টিগুলো খুলে যায় – আর তোমার ভয় হয় যে তার মুখ থেকে ঠাট্টা বা ঘেন্না না বেরিয়ে আসে। একটা বয়সের পরে তুমি তাদের ( মা-বাবাকে) একটা খোলা জখমের মতো বয়ে নিয়ে চলো। তারা বেঁচে থাকলে ঠিক আছে। তারা নিজেদের বাঁচাতে পারে। যদি না থাকে, যে কেউ তাদের ছাই তালুতে নিয়ে ফুঁয়ে ওড়াতে পারে।

‘শোনো,’ সে ধীরে বলল – তার গলা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল – আমি তার স্বর চিনতাম – যখন খুব কড়া, ভয়ঙ্কর কিছু বলত – তখন তার স্বর নরম হয়ে যেত।

‘ফ্যাটি…’ সে বলল, ‘আমার ধারণা ছিল না তুমি এত বদলে যাবে।’

‘কীভাবে?’

‘ফটোতে তোমায় কী নিষ্পাপ দেখায়।’

ও সেটাই বলেছিল, নিষ্পাপ – শুনে আমার মনে হল আমি নোংরার মধ্যে ডুবে আছি – তিরিশ বছরের পাপ, মিথ্যে আর শঠতায়। আমি হাসতে লাগলাম, ‘ইরা, এই ফটো তিরিশ বছর আগের – আমার তখন সাত বছর বয়স’

‘আমি জানি,’ সে বলল।

‘তুমি কিচ্ছু জানো না!’ আমার শরীর রাগ আর ঘামে থরথর করছিল। সে আমার মাথা তার হাঁটুর উপর থেকে সরিয়ে দিল – আলাদা করে দিল যেন আমার কোনো ছোঁয়াচে রোগ হয়েছে। মনে হল, উঠে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিই, একবার তার চোখে আবার নিজেকে দেখি – ব্যাঙ্কের যে খাতায় আমি প্রেম জমা করেছি তার থেকে একটা বিশ্বাসের শিকিও ছুঁতে পারব না? কিন্তু আমি উঠলাম না। আমি অন্ধকারেই বসে রইলাম। আমার সন্দেহ হল সে আমায় দেখছে – এমন অনেক সময় হয় যখন অন্ধকারে আমরা কাউকে দেখতে পাই না কিন্তু বুঝতে পারি সে দেখছে, মাপছে, পরখ করছে – আর আমরা কিছুই করতে পারি না, কোনো দলিল, প্রমাণ আমাদের বাঁচাতে পারে না – সে বোধহয় বুঝতে পেরেছিল। সে অন্ধকারে তার হাত তুলল, তা দিয়ে আমার শরীর ছুঁয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল… আমি তার হাত ধরে নিলাম, ‘শোনো’ সে বলল, ‘তুমি কী আমায় সত্যিই ভালবাস… তোমায় কী আমি সত্যিই ভরসা করতে পারি?’

এমন হতাশ, কাতর ও সম্পূর্ণ একটা প্রশ্ন ছিল যে আমি তাড়াতাড়ি তার হাত সরিয়ে দিলাম… যেন হঠাৎ রাস্তায় কেউ জিজ্ঞেস করেছে, ‘ফ্যাটি তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?’ একটা অদ্ভুত ভাবনা এল – এর জবাব দিতে না পারলে যেন তুমি বেঁচে নেই – তুমি বহু বছর আগে মরে গেছ, যখন তোমার ফটো তোলা হয়েছিল – তোমার ‘ফুরতা’ কোথায় এখন, তোমার মনেও নেই রাস্তায় কোথায় ফেলে এলে। আমি অন্ধকারে তাকে জড়িয়ে ধরলাম – কাছে টেনে নিলাম – আমরা দুজনে বহুক্ষণ বসে থাকলাম ভিত বাচ্চাদের মতো, যারা রাস্তা ভুলে ফুটপাথে বসে থাকে – অপেক্ষা করে কেউ হাত ধরে বাড়ি পৌছে দেবে।

বাড়ি ছিল না কোথাও … ছিল দুঃখ। এমন দুঃখ যার কোনো ফল নেই, যারা নিজেদের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে শেষ হয়ে যায় – যতক্ষণ না সম্পর্ক প্রায় অর্ধেক জলে ডুবছে তার আগে দেখিওনি তাকে – তখন ঘাবড়ে গিয়ে, ভয়ে জলে ঝাঁপাই আমরা তাকে উদ্ধারের জন্য – কিন্তু কিছু হয় না – যতটা দুঃখ আমরা বের করতে পারি তার চেয়ে বেশি ফুটো দিয়ে ভিতরে চলে যায়। তারপর আমরা এক জায়গাতেই ফিরে ফিরে আসতাম, আমার ঘর, বাবার বিছানা, মায়ের খালি চেয়ার – আর জুন মাস। সে লাইব্রেরিতে বসে স্টেটমেন্ট তৈরি করত… ন্যায় আর মিথ্যের বিষয়ে এমন কিছু একটা – যা ফুটোটা বন্ধ করতে পারে, জলকে আটকাতে পারে।

জুলাই মাস এল। আমি বুঝলাম সুখ কাকে বলে। যদি কখনো দিল্লীর আকাশ দেখে থাকেন – মানে আমি বলছি – জুলাই মাসে – টেলিফোন বুথের কাঁচের বাইরে, যখন মেঘেদের পিছনে হালকা আলোর রেখা দেখা দেয় – না দেখা না, শুধু আভাস – কোনো জিনিস যেন চমকাচ্ছে। ওটা সূর্য, না সূর্যের এক সংক্ষিপ্ত কেচে আসা প্রেত। আমার সুখও তেমন ছিল। একটা দপদপ করতে থাকা আলোর মতো ভ্রম, মায়া আর সত্যির মাঝে একটা ছায়া। সে আমার বাড়ির উপরে এসে থাকত – আর আমি আমার চাটাই আর চাদর বের করে আনতাম। অল্প বৃষ্টির ফোঁটা ছাদের ধুলোকে জড়িয়ে ধরত আর একটা ধোঁয়ার মতো উড়ে বেড়াত হাওয়ায়। আমি একা শুয়ে থাকতাম ছাদে। আমার ভয় ছিল না যে কেউ আমার সুখকে দখল করবে – কারণ তারা বহু আগে মারা গিয়েছিল সব ঘর, আলমারি আর বাড়ির ছাদগুলো আমার হাতে সঁপে দিয়ে।

সুখের চিন্তা ছিল না আমার। সে তার টিফিন-কৌটো আমার হিটারের উপর রাখত। ডিমের ভুজিয়া, আলু, টোস্ট – আর যখন তার মা খুব আনন্দে থাকতেন – তখন পোলাউ যাতে মটর পড়ত। আমার কাছে সুখী জিনিস থাকত – ডবল রুটি, চিজ, মাছ। কখনো কখনো আমি ওকে বিরক্ত করতাম ওকে বাইরে ছাদে টেনে এনে বসিয়ে – চোখে রুমাল বেঁধে দিতাম যাতে সে ভিতরটা না দেখতে পায়… চিজ আমলেট ভেজে সামনে আনতাম। সে অবাক হয়ে যেত খেতে খেতে, আমি ওর চোখের পট্টি খুলতাম যাতে আমায় ভাল করে দেখতে পায়।

‘এসব রাঁধা কে শিখিয়েছে তোমায়?’ সে প্রশ্ন করল – যেন অমলেট বানানো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য, ‘কেউ না, যখন বাইরে ছিলাম তখন নিজেই সব বানাতাম।’

‘তুমি নিজে হাতে সব করতে?’

‘হ্যাঁ… কেন?’ আমি ভাবতে পারিনি এমন মামুলি জিনিস তাকে এত ছুঁয়ে যাবে।

‘আমি কিছুই বানাতে পারি না।’ সে বলল – আর আমার কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিল। তার মাথা আমার গলার নিচে – আমি তার প্রোফাইল শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম – আধখানা মাথা, কপালের চুল, আর খোলা ঠোঁট – যেভাবে কোনো বাচ্চা চিন্তায় পড়লে মুখ খোলে তেমন, ‘তুমি ভাবছ আমি বাইরে গেলে নিজে নিজে থাকতে পারব কি না।’

‘বাইরে কোথায়?’

‘কোথাও – বিদেশ না… কিন্তু বাড়ির বাইরে।’

‘কী করবে?’ আমি ধীরে তার মাথাটা তুললাম – ওর চোখের দিকে তাকালাম যা আমাকেই দেখছিল, ‘তুমি কী বাড়ি ছেড়ে দেবে ভাবছ?’

হঠাৎ তার শরীর কুঁকড়ে গেল। এই সময়গুলো খুব ভয়ঙ্কর, যখন সে নিজের মধ্যে কুঁকড়ে যেত – আমি তার চিন্তা ভাবনার থৈ পেতাম না। তার শরীর আমার সঙ্গে সেঁটে কিন্তু সে স্বয়ং আমায় ছেড়ে গেছে… অনেকটা সেই জন্তুদের মতো যারা বিপদের আভাস পেলেই রঙ বদলায়। গাছ, পাতা বা ঘাসের মধ্যে সেও তাই হয়ে যায়, দেখা যায় না তাদের। ‘ইরা,’ আমি তাকে ঝাঁকাতাম, সে আবার ফিরে আসত – হয়রান হয়ে চারদিকে দেখত, যেন সে বুঝে উঠতে পারছে না কোথায় নিজের বাড়িতে না আমার ছাদের ঘরে।

সে ঘরের ভিতর যেত – কিন্তু আলো জ্বালাত না। ঘরের ভিতর মিহি বালির মতো আলোয় রাঙাতো – জুলাইয়ের রোদ। আমি বাইরে থেকে তাকে দেখতাম – একটা স্বপ্নীল সিল্যুয়েট – ওর মুখ দেখতে পেতাম, ঠোঁটে ক্লিপ ধরা, চেয়ারে বইয়ের পাশে তার জিন্স, কুর্তা, কাঁধের থলি, থলিতে নীল ফাইল যার থেকে কাগজ বেরিয়ে থাকত। এখন মনে হয়, সে যে জুলাইয়ের সন্ধে দেখেছিল তা ভুল, মিথ্যে… কারণ পিছনে যখন তাকাই তখন সব সন্ধ্যাই একটা স্মৃতিতে আটকে যায় – আর ভ্রম হয় ওটা জুলাইয়ের একটা সন্ধ্যায় হয়েছিল – যদিও তাতে অগস্ট, সেপ্টেম্বর, আর অক্টোবরের সব সময়গুলোও রয়েছে – একটা প্রাচীন ফসিলের মতো, যা উপর থেকে স্রেফ একটা পাথর, কিন্তু ভিতরে পরতে পরতে বহু পুরনো যুগের হাড়-গোড় স্মৃতি।

সে আলো জ্বালিয়ে দরজার বাইরে মুখ বাড়িয়ে ডাকত, ‘ফ্যাটি!’

আমি চুপ করে থাকতাম ছাদের একটা অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে।

‘ফ্যাটি,’ সে আবার ডাকত, উত্তর না পেয়ে বেরিয়ে আসত দরজা দিয়ে, এদিক ওদিক খুঁজত তারপর দাঁড়াত জলের ট্যাঙ্কের সামনে। কলটা খুলে কুর্তার হাতা গুটিয়ে মুখ ধুত। আমি দেখতাম, কীভাবে জল তার মুখের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে তার নাকের উপরে একটা বিন্দুর মতো স্থির, চমকাচ্ছে, যেন ও এক ফোঁটা আটকে পড়া চোখের জল। আমি তার কাছে যেতাম, সে চমকে উঠে পিছনে তাকাত, আমার তপ্ত ঠোঁট তার মুখের শীতলতা শুষে নিত, দুঃখের ভিতর কোনো ভয় থাকে না, কিন্তু আমরা যাকে সুখ বলি, তা আমাদের ভয় দিয়ে ঘিরে রাখে। তার যাওয়ার সময় চলে আসত – যদিও আমরা একই শহরে থাকি, যাওয়ার আগে মনে হত ছিঁড়ে খুঁড়ে, টুকড়ো-টুকড়ো হয়ে যাচ্ছি আমরা। আমি তালা-চাবি খুঁজতে লাগতাম, আর সে খালি টিফিন বক্স ঝোলায় পুড়ত। ‘ফ্যাটি,’ সে বলল, ‘তুমি বসে থাকো, আমি চলে যাব একাই। এমন কিছু দেরী হয়নি।’ ‘দেরী? তুমি দেখেছ কটা বাজে?’ আমি এক হাতে ওর ঝোলাটা তুলে অন্য হাতে টর্চ জ্বালিয়ে নামতাম – পিছনে তার পাতলা, ক্ষীণ ছায়া – মাঝের তলাগুলোয় দাঁড়াতাম – একদম খালি। সে সবকটা ঘর চিনত, আমি তাকে গাইডের মতো দেখিয়েছিলাম – সেই ঘরটা যেখানে দিদি থাকত বিয়ের আগে, সেই ঘর যেখানে বাবা মারা গেছেন, তার পিছনের জানলা, যেখান দিয়ে আকাশ গঙ্গা দেখা যায়… আর সেই চেয়ার খালি, ভাঙ্গা – এক আর্মচেয়ার!

সে শিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিল – শাদা এবং স্তব্ধ – বারান্দার আলো তার চুলের উপর পড়েছিল। সে প্রতিবার বেরনোর সময় এই চেয়ারটাকে দেখত, যেটা মাঝের বারান্দায় পড়ে থাকত। তোমার মনে আছে? সে নরম গলায় প্রশ্ন করত, ‘হ্যাঁ,’ আমি বলতাম, ‘আমি এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম, আর ওরা এই চেয়ারে বসেছিল।’

‘তাঁর শেষ কথা কী ছিল?’

‘কোন শেষ কথা?’ আমি তার দিকে তাকালাম।

‘তুমি যখন বাইরে যাচ্ছিলে।’

কতবার বলেছি তোমায়।’

আমি আবার শুনতে চাই – তুমি বিদেশ যাচ্ছিলে। তিনি বারান্দায় বসে তোমায় দেখছিলেন….’ সে বলল – যেন সে স্বপ্ন দেখছে।

‘টিকিটের বিষয় বলেছিল…’ আমি বললাম, ‘আমায় প্রশ্ন করল, টিকিট পকেটে রেখেছি না ওয়ালেটে…. ওর সবসময়ই মনে হত আমি টিকিট হারাব।’

কিছু ক্ষণ সে খালি চেয়ারটা দেখতে থাকল।

‘আর তুমি তাঁকে হারালে।’

‘বুড়ি হয়ে গেছিল,’ আমি বললাম, ‘কিচ্ছু মনেও থাকত না।’

‘ফ্যাটি,’ তার গলা কেঁপে গেল, ‘তিনি একলা বাড়িতে মারা গেছিলেন।’

আমি তার দিকে তাকালাম – চোখে এক বিস্মিত আতঙ্ক ছিল তার – কোথাও একটা আয়না ছিল, গাছে ঘেরা ভিক্টোরিয়া স্ট্রিট আর তার মাঝে ছোট একটা পার্ক, বাচ্চারা খেলা করছে, লন্ডনের হলদে আলো… বেঞ্চে আমি বসে হাতে একটা কেবল, একটা লাল কাগজের টুকরো, যার ভিতর ধেকে পাঁচটা কালো শব্দ উঁকি মারছে – মাদার ডায়েড উইদাউট এনি পেইন, আর আমি শব্দগুলো বার বার আউড়াচ্ছি, উইদাউট পেইন, উইদাউট এনি পেইন, একজন তিব্বতী ভিক্ষুর মতো, যে প্রার্থনার মালা ঘোরাতে ঘোরাতে পৌছে যায় – যেখানে বহু সত্য রয়েছে, বহু ঈস্বর, বহু শুন্য একাকীত্ম – এক ওয়ান্ডারল্যান্ড যা এলিস উঁকি মেরে দেখেছিল।

‘একলা? হ্যাঁ একলা,’ আমি বললাম, ‘কিন্তু বিনা কষ্টে, উইদাউট এনি পেইন – ওঁর শেষ সময়ে কোনো দুঃখ ছিল না, ইরা উনি শেষ দিন একা কাটিয়েছেন, কিন্তু আনন্দে কাটিয়েছেন,’ আর তখন আমার মনে হল, সে কাঁদছে, থরথর করে কাঁদছিল – আমি তাকে ছুঁতে গেলাম সে আমায় ঠেলে সরিয়ে দিল, দেওয়ালে সেঁটে দাঁড়িয়ে ত্রস্ত চোখে দেখছিল আমায় – অদ্ভুত ঘৃণা – ঘৃণাটাও সাধারণ নয়, বরং ঠাণ্ডা পাথুরে তীরস্কার লুকানো, ‘তুমি এখানে কী করছ ফ্যাটি?’ সে ধীরে বলল। ‘তুমি এই বাড়ি বিক্রি কেন করে দিচ্ছ না..’ সে বলেছিল, ‘এটা তোমার বাবার বাড়ি – আর তুমি এখানে জোঁকের মতো আটকে রয়েছ।’ সে ধীরে ধীরে ওই ফোঁড়ার পাশে নখ ফেরাতে লাগল, একটা ফুলে ওঠা গুটলি, যাকে সে নিঙরোতে থাকল। ‘ যাচ্ছ না কেন – তুমি এখানে সুরক্ষিত বলে?’ চোখের জলের মাঝেও হেসে উঠল – ডিয়ার ফ্যাটি, ডিয়ার ডিয়ার ফ্যাটি – এখন সে ছুঁচের তলায় আধমরা জীব, যার ধর আলাদা হয়ে গেছে লেজ এখনো আটকে দেওয়ালে। নিজের যন্ত্রনা লুকোতে কত আয়োজন – আলমারিতে রাখা বাবার দাঁত, মায়ের নথ – সে তার পিছনে লুকতো, কবিতার বই, স্টেটমেন্ট, রেকর্ড – নিজেকে বাঁচানোর জন্য কত কিছুই সে জড়ো করেছিল। কিন্তু সে বেরোত যেন কোনো টিকটিকি বা ইঁদুর তার অন্ধকার কোণ ছেড়ে বেরচ্ছে – পৃথিবীর নিষ্ঠুর আলোতে – দেওয়ালের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটে ছুটে, হাঁফাতে হাঁফাতে….

সে বাইরে এল – বাইরে – যেখানে জুলাইয়ের অন্ধকার দিল্লীর ছাদগুলোয় আটকে। সে স্কুটার চালাত আর বাড়ির থেকে দূরে চলে যেত – কনট প্লেস, ইন্ডিয়া গেট, পুরানা কেল্লা – সবাই একেক করে চলে যায়। উপরে শুধু মেঘ আর ইতিউতি তারা। না কোনো পুল না রেলগাড়ি – যার তলায় মনস্কামনা করা যায়।

সে চাবি বের করল, গেটের তালা খুলে ভিতরে চলে গেল। ছোট্ট লন, লেবু গাছ, ইঁটের দেওয়াল – এটা তার বাড়ি। সে কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল জানলা খোলা ছিল – পাপা টেলিভিশন দেখছিল – মা কাপড়জামা ইস্তিরি করছিল। ওরা জানত সে এসে গেছে – কিন্তু সে ঘরে ঢোকার সাহস পেত না – সাইডে গিয়ে টিফিন কৌটো রাখত, মুখ ধুতো – আর দৌড়ে নিজের ঘরে চলে যেত। তাড়াতাড়ি কোনো রেকর্ড চালিয়ে জামা না বদলেই বিছানয় ঢুকে যেত। এভাবে গেল সময় – অগস্টের খোলা দিন আর সেপ্টেম্বরের উদাস আলো – ঝাড়ি আর ঘাসের গাছেরা রঙ বদলাতে শুরু করে – সে তার ক্লান্ত চোখ বালিশে রাখে….

সে পা টিপে টিপে হল ঘরে আসে – উপরে পাপা আর মা ঘুমচ্ছে – সে আলোও না জ্বালিয়ে ডায়াল করে – অন্য দিকের ঘণ্টা শোনা যায়, সে ঘুমচ্ছে বোধহয়, খালি ঘরের নৈঃশব্দ চিড়ে যায় আওয়াজে, ‘হ্যালো, হ্যালো..’ ফ্যাটির গলা তাকে চমকে দেয় সে বলে ‘ফ্যাটি, আমি বলছি, আমার তোমার গলা শুনতে ইচ্ছে করছিল…’

সেটা ছিল নভেম্বর মাস – আর তার গলার আওয়াজ দিল্লীর হাওয়া ধরে নিয়ে রাস্তায় উড়ত। পথচারীরা ক্ষণেকের জন্য চমকে উঠত – কে এই ফ্যাটি – কিন্তু শহরের হাওয়ায় এত নাম, এত চোখের জল এত দীর্ঘশ্বাস ওড়ে – কে কাকে ডাকছে জানা যায় না, তাই তারা মাথা নাড়িয়ে এগোয়, ভিড়ে মিলিয়ে যায়।

কিন্তু সে কখনো ভুলতে পারেনি – ‘এটা আমার সবচেয়ে বড় সিক্রেট – সে ভাবছিল – ‘সবচেয়ে বড় রহস্য – ফ্যাটি – আমায় দেখো বুঝতে পারবে যে তুমি সবচেয়ে বড় হিপোক্রিট মেয়েকে দেখছ – তুমি হাসছ? দাঁড়াও – তোমায় কিছু দেখাতে চাই। দেখ এই আমার থলি, খোলো, খোলো দেখো – থিসিস, নোটসগুলো না – কবিতার বইগুলো, পেঙ্গুইন ক্লাসিক – পেসোয়া, আনা আখমাটোভা, নেরুদা। না এগুলো না, কাগজ, নোটস, সনেটস না … তাহলে, তাহলে কী?

‘শোনো – তোমার বাড়ি থেকে যখন নিজের বাড়িতে ফিরি তখন অনেকক্ষণ নিচে দাঁড়িয়ে থাকি – অন্ধকারে উপরে তাকাই – হলদে ইঁটের দেওয়াল, সবুজ জানলা তার থেকে ঝুলন্ত লতাগাছ – একটা বাংলো পুরো – তারা এই সব ছেড়ে যাবে আমার জন্য – আমি চোখ খুলে দেখি জানলাগুলো, হাওয়ায় উড়তে থাকা পর্দাগুলো – তারা এখন ডাইনিংরুমে বসে আছে। ততক্ষণ খালি প্লেট ছেড়ে উঠবে না যতক্ষণ না আমি ফিরি, তাদের একমাত্র মেয়ের অপেক্ষায়, আধা ঘুমন্ত আধা জাগা – ফ্যাটি তুমি যেমন নিজের বাবা মায়ের কথা ভাব আমিও ভাবি – একদিন তারা যখন থাকবে না, আমি তাদের উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে যাব, একটা সাপের মতো – যে এই সব সম্পত্তি, বাড়ি, গয়নার উপর ফণী দুলিয়ে বসে থাকব। একটা কীটের মতো তাদের হাড় মাংস কুড়তে কুড়তে যতক্ষণ কোনো চিহ্ন না থাকে – এর উপর বসে আমি একদম ওই লোকগুলোর মতো হয়ে যাব যাদের সব জায়গায় দেখা যায় – তুমি ওদের দেখো না – নৈনীতাল আর মুসৌরীর রাস্তায় ঘোঁড়ায় চড়ে…? দুপুরে আধবোঁজা চোখে সময়কে কুড়েকুড়ে খেতে – তাদের পোশাক হয়তো আলাদা – দিল্লীর রাস্তায় – গরিবী নিয়ে কথা বলে – তারা ভালগার নয় – তারা কথা বলে, লেখে, আঁকে। আমি ওদের একজন, আলাদা নই, ওরা কি পরিস্কার, নির্দোষ! ফ্যাটি আমি ওদের একজন, আমি সব দেখতে পাই, আমি পালাতে থাকি, চেঁচিয়ে উঠি, গেটের কাছে আসি – কিন্তু গেটের তালা বন্ধ – আর তুমি বাইরে রাস্তায়, বাড়ি ফিরে যাচ্ছ – আমার মনে পড়ে যায় সেই দুপুরের কথা, লাইব্রেরিতে তুমি একটা স্টেটমেন্ট নিয়ে এলে, তোমায় এখানে ওখানে দেখতে পেতাম গাছের নিচে, স্কোয়ারের ঘাসে – সেই কনসার্টে যেদিন প্রথম ইহুদিন মেনুহিন ভারতে প্রথম বাজালেন… তোমায় দেখতাম আর ভাবতাম, না বিস্মিত হতাম কী করে লোকে অন্যের উপকারের জন্য ঘোরে, যেমন পরমহংসদেব, মার্টিন লুথার, মাদার টেরিজা… ওরা হয়তো কাঁধে হাত রাখে – আর সব কিছু বদলে যায় – যেদিন তোমায় আমি দেখলাম লাইব্রেরিতে সেদিন ভাবলাম ওই কাগজে নাম লিখলে আমি হয়তো বেঁচে যাব – তারপর আমি তোমায় দেখলাম, হঠাৎ মনে হল। আমি তোমার থেকে ভগ্যবান… আমি যখন ইচ্ছে বাড়ি ছাড়তে পারি, দিল্লীর বাইরে যেতে পারি। অন্য দিকে দেখো, তুমি আমার থেকে ভাগ্যবান, তোমার নিজস্ব নির্জনতা আছে, একটু টানাটানি করলেই সেটা চকমক করে, আলোর টায়রা যেন, যাকে তুমি যখন ইচ্ছে বের করতে পারো – পুরো একটা মিউজিয়াম – যা কার্জন রোড থেকে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত। না, সত্যি তুমি আমার থেকে ভাগ্যবান, তুমি একদিন তোমার ঘরের কোণায় ‘সেই দিন’গুলোর পুঁটলিও রাখবে, যে দিনগুলো আমি তোমার সঙ্গে কাটিয়েছি।

সে ওই পুঁটলি নিজেই সঙ্গে এনেছিল – যাওয়ার আগে সেটার দায়িত্ব দিয়ে যেতে চেয়েছিল। ওতে মার্চের পট্টি জমে ছিল, জুলাইয়ের রাত, গুলমোহরের ফুল, বইয়ের দোকান আর ফোনের বুথ… মিন্টো রোডের ব্রিজ – যার তলায় একদিন দুপুরে ওরা দুজনের থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছিল।

এমন কোনো অসুখ আছে, যা এই শহরের কোণ থেকে বেরিয়ে বাইরে আসে না?

সে লাইব্রেরি থেকে বেরল – আর দরজায় ফ্যাটিকে দেখতে পেল। সে তাড়াতাড়ি ওর কাছে গেল – ওর মন কেমন করে উঠল, ‘তুমি কখন এলে? খুব ক্ষীণ গলায় বলল। ‘আমি কখন থেকে দাঁড়িয়ে…’ সে বলল, ‘তুমি লিখছিলে – আমি বাইরে থেকে দেখছিলাম তোমায়।’, ‘আমি তোমাকেই লিখছিলাম….’ সে বলল আর ধীরে হাসতে লাগল। ‘আমায় লিখছিলে? দেখাও।’ ‘এখন না’ মাথাটা বুকের উপর সে নামাল, শান্তি পেত তাতে, যেন সারা দিন উড়ে একটা পাখি তার বাসা খুঁজে পেয়েছে, ‘কী লিখছিলে?’ সে তার চুলের উপর ঠোঁট রাখল, ‘একটা ধাঁধা, সে বলল, ‘একটা রহস্য’ – ‘তুমি এই জন্য আমায় ডেকেছিলে?’ সে তার মুখ তুলল – সে তখন নিস্তেজ – তার চোখ চকচক করছিল যেন সদ্য কেঁদে উঠেছে, জ্বর হয়েছে, ঘুমের ঘোরে হাঁটছে। ‘ইরা!’ সে বলে উঠল, ‘ইরা!’ – তার মুখ চাপল হাত দিয়ে, ‘চলো, লোকে দেখছে আমাদের।’

ওরা বাইরে এল। কার্জন রোডের আলো জানুবারির কুয়াশায় টিমটিম করছিল। ফ্যাটি ওর থলিটা টেনে নিয়ে নিজের কাঁধে রাখল। সে মন দিয়ে তাকে দেখছিল, যেন প্রথমবার – ছোট ছোট পায়ে পেশোয়ারি চপ্পল, কালো কর্ডুরয়ের প্যান্ট, লম্বা ঢিলে সোয়েটার, যা নিচের দিকে ফেটে যেত আর কালো সুতো দিয়ে সে সেলাই করে নিত।

‘অটো নেব?’

‘না, পায় হেঁটে যাব… আমি তোমায় কিছু বলতে চাই…’
‘কী কথা ইরা?’ সে রাস্তার মাঝে থমকে গেল – সে চলতে থাকল, মাথায় একটা স্কার্ফ বাঁধা, ধুসর রঙের কুর্তা, কপালে কালো টিপ – সে নিজের ভিতরের কাঁপুনি সামলে নিত, যেভাবে লাফানোর আগে শরীরকে কুঁকড়ে নিজের মধ্যে গোটায় কেউ। এই সেই ক্ষণ, সে ভাবল – সেই সুযোগ, এখন না ঝাঁপালে সারা জীবন কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ‘ফ্যাটি,’ সে এক পা এগল, তারপর আরেক পা, তারপর তার সোয়েটার আঁকড়ে ধরল – সে চোখ বন্ধ করে এগল, এখন সে হাওয়ায়, এখন সে ঝাঁপিয়েছে, ‘আমি দিল্লী ছাড়ছি,’ সে বলল।

সে শান্ত ছিল। সব কিছু শান্ত। জানুয়ারির সন্ধ্যা ছিল সেটা আর তারা চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে ইন্ডিয়া গেটের সামনে দাঁড়াল, ‘কবে?’ সে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’ সে দাঁড়িয়ে পড়ল…. কুয়াশার ভিতরে একটা শিখা জ্বলছিল – কোনো অজ্ঞাত সৈনিকের উদ্দেশ্যে, যে আগেই লড়াইয়ে মারা পড়েছে। ‘আমি এখনো কিছু ভাবিনি’ সে বলল, ‘ভারত বড় দেশ,’ সে ধীরে হাসল তারপর হাত ধরে বলল, ‘ফ্যাটি, আমি যেখানে ইচ্ছে যেতে পারি।’

‘বাড়ি ছাড়বে?’

এক মুহূর্ত সে ফাঁকা রাস্তায় চমকে উঠল – মনে পড়ল – এখন তার মা ইস্তিরি করছে নিজের ঘরে, খাবার টেবিলে তিনটে প্লেট, পাপা টেলিভিশন দেখছে – আমি এদের ছেড়ে দিচ্ছি – বাড়ি নয়, তাদের টাকা পয়সা নয়, না খেয়ে মরব না… আমি সেফ, সেফটি ফার্স্ট…. এক অসীম হতাশায় সে ইন্ডিয়া গেটের দিকে তাকাল – চাঁদের অল্প আলোয় তাকে বালির টিলা মনে হচ্ছিল – চারদিকে লম্বা ঘাস, হাওয়ায় দুলছে… ‘ফ্যাটি, আমার একটা কথা রাখবে?’

‘কী, ইরা?’ সে খুব ধীমে স্বরে বলল। সে দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘তুমি কখনো নিজের বাড়ি ছেড় না?’

‘কিন্তু সেদিন তুমি..’ আবাক হয়ে সে তাকাল, ‘তুমি আমায় বেরিয়ে আসতে বলেছিলে।’

‘বেরিয়ে?’

‘হ্যাঁ – বাইরের পৃথিবীতে।’

‘আমি জানি,’ সে মাথা নাড়ল, ফ্যাটির মাথার এলোমেলো চুলগুলো উপর দিকে তুলে দিল, ‘তখন আমি জানতাম না ওরা তোমার মধ্যে রয়েছে… বাড়িতে আছে।’
‘ওরা?’ ফ্যাটি চিৎকার করে উঢল ‘ওরা কবে মরে গেছে ইরা।’

‘মারা গেছে!’ সে ধীরে হাসল… বারান্দায় রাখা চেয়ার, বিছানার পিছনে আকাশ, মিল্কি ওয়ে… ওরা ওখানে আছে, ওরা চিরদিন ওখানে থাকবে… ফ্যাটি আমার দিকে তাকাও,’ আর সে তার মুখ উপর দিকে তুলল – একটা শ্বাস বেরল – সে তাকে এক ঝটকায় টেনে নিল যেন – হলুদ জোৎস্নায় তার চোখ উপর দিকে উঠল আর সে বলল, ‘আমি কী বেঁচে আছি?’

কুয়াশা উঠছিল তখন, গাছগুলো কাঁপছিল। রাতের হাওয়ায় সবকিছু অবাস্তব লাগছিল, বাঁচা, মরা, বাড়ি ছাড়া… ‘ফ্যাটি’ সে বলল, ‘তোমার বাবার একটা রেজিস্টার ছিল। তিনি কিছু লিখতে চেয়েছিলেন…. তোমার মনে আছে?’

ফ্যাটি উপরে তাকাল, কুয়াশার উপর দিয়ে কয়েকটা তারা ইতস্তত জ্বলছে… এক মিহি আলো গাছের পল্লবে ছড়িয়ে পড়েছিল. ‘লাইফ হিয়ার অ্যান্ড হিয়ার আফটার! কিন্তু দুটো এক সাথে একই দুনিয়াতেই কী নেই, জীবন এখানে ও ওখানে, ওরা আমাদের সঙ্গে বাঁচছে, আমরা ওদের মৃত্যুতে সামিল?’

সে তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। ফটক খোলা ছিল – দুদিকে ইউক্যালিপ্টাসের সাড়ি – মাঝে নুড়ি বেছানো রাস্তা – একটা লেবু গাছের ঝাড়। ‘ফ্যাটি তোমার মনে আছে?’ ‘কী বিট্টি?’ কখনো কখনো সে তাকে বিট্টি বলে ডাকত ভালবেসে – একটা নিঃসহায় বাচ্চা যেন, যে তার হাত ধরে দিল্লীর রাস্তায় পেরোত। ‘কী মনে থাকবে?’ সে জিজ্ঞেস করল – আর তখন দেখল ইরা দরজার পাল্লা ধরে ভিতরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে…

‘আরেকবার বলো…’ সে বলল।

‘কী?’

‘যা এক্ষুণি বললে।’

‘বিট্টি!’

সে তার দিকে তাকাল – তার দৃষ্টি ওকে খুঁজছিল, ‘আমাদের গত জানুয়ারিতে দেখা হয় – আমি তোমায় ফোন করেছিলাম। তুমি গুনছিলে। পুরো বারো মাস হল…’

লনের ভিজে ভিজে কুয়াশাচ্ছন্ন আলোয় সে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

তুমি আজ কী লিখছিলে?’

‘লাইব্রেরিতে?’ সে ফ্যাটির দুহাত নিজের গালের উপর রাখল – যেভাবে দেশলাইয়ের শিখাকে বাঁচাতে হাতের মধ্যে লুকোই আমরা – আর তা হাওয়ায় কাঁপতে থাকে – নেবা আর জ্বলার মধ্যে চিরচির করতে করতে, ‘একটা স্টেটমেন্ট,’ সে বলল, ‘একটা প্রার্থনাপত্র, ফ্যাটি আমি নিজেকে লিখছিলাম, তারপর আমার হঠাৎ মনে হল যে কেউ কোনো পাপের কনফেশন করলে, তখন তা নিজের জন্য নয়, ঈশ্বরের জন্যও…. আর আমার মনে হল, তুমিও আছো এর মধ্যে, যেমন এক বছর আগে যে স্টেটমেন্টে আমি সই করেছিলাম – জানো তাতে আমার নামের আগে কার নাম ছিল?’

‘কার বিট্টি?’

‘যন্ত্রণার…’ সে ধীরে বলল, ‘তুমি যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলে, তখন আমি ভাবলাম, আবার তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে….’

অন্ধকারে চাবির আওয়াজ হল – আর ওরা দুজন আলাদা হয়ে গেল। লন্ঠনের আলোয় চৌকিদারের মুখ দেখা গেল। ‘বিবিজি গেট বন্ধ করতে হবে,’ বলে সে স্নেহপূর্ণ চোখে ফ্যাটির দিকে তাকাল – সে বহুদিন ধরে এদের দুজনকে দেখছে।

ফ্যাটি তার ঝুলি কাঁধ থেকে নামাল – ঝুলি – যার ভিতর থিসিস, ফাইল, বই – সবচেয়ে নিচে টিফিন কৌটো থাকত।

‘তুমি আসবে?’ সে চৌকিদারের কান এড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমি তোমায় দেখব।’

গেট বন্ধ হলেও সে ওখানে দাঁড়িয়েছিল – নুড়ির রাস্তার উপর চপ্পলের আওয়াজ শোনা গেল। তারপর সে দৌড়তে লাগল – বাংলোর হাতার বাইরে একটা লন ছিল – সেখান থেকে তার ঘর দেখা যেত, টেরেসের উপর একটা দীপ জ্বলত – বাযি ফেরার আগে সে সব সময় তাকে দেখত।

অনেকদিন পর ওই বাড়িটা খালি হয়। এখন ওখানে অন্য লোক থাকে – কিন্তু ফ্যাটি যখনই ওর পাশ দিয়ে যায়, এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার লনে দাঁড়ায়…. যেমন সে বহুদিন আগে দাঁড়াত। সেই ইউক্যালিপ্টাস গাছগুলো, সেই লেবুর ঝাড়, লনের উপর তার ঘর… সে অপেক্ষা করত, সে হয়তো ফিরেছে, আলো জ্বালিয়েছে ঘরের, রেকর্ড চালিয়ে বিছানায় শুয়েছে – একটা অলৌকিক আওয়াজ ইঁটের দেওয়াল হয়ে, কাঁচে ধাক্কা লেগে, তার কাছে এসে পৌঁছত, জড়িয়ে ধরত, ধীরে ফিসফিস করে বলত, ‘ফ্যাটি, আমি এখানে – এখানে – আমি এখানে ফ্যাটি।’

Facebook Comments

Leave a Reply