আমরা সবাই ব্ল্যাক অ্যান্ড ম্যাটার : দেবাশিস দত্ত

fail

হামেশাই হয়, হয়ে থাকে, লিঙ্কনের দেশ, ডেমোক্র্যাসির আঁতুড়ে!! যেন অলিখিত এক নিয়ম গণতন্ত্রের পাশাপাশি বহমান, যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ-লালিত-পালিত-অনুসৃত একরাশ অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং রয়েছে সরকার আর প্রশাসনের প্রশ্রয়, সঙ্গে সমর্থক গুন্ডাবাহিনীর প্যারেড যার মিলিত যোগাভ্যাসের কসরত এনে দিয়েছে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন। বিদ্যুতের মত সেই আন্দোলনের বার্তা রটি গেল ক্রমে দেশ থেকে দেশান্তরে। উত্তাল হল মানুষ। এজন্যেই উত্তাল হল, বুঝতে অসুবিধে হয় না, বিষয়টি, বিষয়ের মর্মবস্তু তার উপাদান সেখানেও বিদ্যমান যা মানুষ মানবতা আশ্রয় প্রশ্রয় মান্যতা কোনটাই দেয় না। প্রতিবাদ সেজন্যেই, মূর্তি-ভাঙ্গায় যার অল্পবিস্তর বহিঃপ্রকাশ হলেও আক্রোশ বহমান, পাক খেতে খেতে পরিসরটা বাড়ে ‘আদার লাইভস ম্যাটার’ তার স্বাভাবিকভাবে পরিণতি। আমেরিকার অস্ত্র গোলা বারুদ কেবল দেশে দেশে ছড়ায় না আন্দোলনও ছড়ায়। আমেরিকায় আক্রোশের ভিত্তি বর্ণ কিন্তু সর্বত্র তা নয়। কোথাও বা ধর্ম কোথাও বা জাতপাত, অন্য কোথাও অন্য কিছু, মোদ্দা কথা – বৈষম্য, আয়ে বৈষম্য, ব্যয়ে বৈষম্য, অধিকারে বৈষম্য, ক্ষমতায় বৈষম্য, সামাজিক সম্মানে বৈষম্য, সংস্কৃতিতে বৈষম্য – এর অর্থ হল সামাজিক অর্থনৈতিক গঠন ও শাসনের ভিতেই রয়েছে বৈষম্যের বীজ। যারা এই বৈষম্যের শিকার তারা সবাই ‘আদার’ বা ‘অপর’রা ছড়িয়ে আছেন অত্র তত্র সর্বত্র – কমন ফ্যাক্টর সর্বত্র তারা দমিত, দলিত, শোষিত, পীড়িত লাঞ্ছিত এবং পদে পদে অপমানিত।

উদাহরণ আমেরিকা – সারা দুনিয়ায় সম্পদে-বৈভবে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে-সামরিক শক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে, সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার দাবিদারও বটে তবে সর্বমোটে একমেবাদ্বিতীয়ম কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন বা দ্বিমত থাকতেই পারে এবং আছেও। প্রশ্ন তো উঠতে পারে আজকের আমেরিকা অষ্টাদশ শতাব্দীতে এমনটা ছিল কি? আজকের আমেরিকা সেদিন ছিল ব্রিটিশের ১৩টি কলোনি সুবাদে এক উপনিবেশ তথা শাসিত এবং পদানত, দলিতর দলে। সেদিন অত্যন্ত ন্যায্য ভাবে আমেরিকানরা ব্রিটেনের জবরদখল মানে নি। স্বাধীনতার লড়াই তাকে লড়তে হয়েছিল, ৪ জুলাই ১৭৭৬ ডিক্লারেশন বা সনদের ভিত্তিতে যুদ্ধ (১৭৭৫-৮৩) লড়তে হয়েছিল, রেভলিউশন কেউ বলুন না বলুন, পরবর্তীতে সেটাই হল আমেরিকার সংবিধানের প্রস্তাবনা। প্রস্তাবনায় স্পষ্ট উচ্চারণে বলা হয়েছে:

“উই দ্য পিপল অব ইউনাইটেড স্টেটস, ইন অর্ডার টু ফর্ম অ্যা মোর পারফেক্ট ইউনিয়ন, এসটাব্লিশ জাস্টিস, ইনসিওর ডোমেস্টিক ট্রাঙ্কুইলিটি, প্রভাইড ফর দ্যা কমন ডিফেন্স, প্রোমোট দ্য জেনারেল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড সিকিওর দ্য ব্লেসিংস অব লিবার্টি টু আওয়ারসেলভস অ্যান্ড আওয়ার পসটারিটি – ডু অরডেন অ্যান্ড এসটাব্লিশ দিস কনস্টিটিউশন ফর দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।”

আড়াইশো বছর পর এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ফ্লয়েডয়ের এমন মৃত্যুর পর এমন প্রশ্ন উঠবে না সেদিনের সংবিধানের শপথ গ্রহণকারী সেই “উই” (we) কারা? “উই” থাকলে “দে” (they) থাকবে ব্রিজ খেলার দস্তুর তাই! এখানেই মূল প্রশ্ন: ফ্লয়েডদের অবস্থান কোন পক্ষে ছিল ‘উই’ না ‘দে’? উত্তর স্পষ্ট। সমস্ত বাঁটোয়ারা সম্পন্ন হয়েছে “উই” এর মধ্যে যেখানে ‘ফ্লয়েড’রা ছিল অনাহুত, ব্রাত্য।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ভারতের স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্তমিত হয়। আর ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ চিহ্নিত হল প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে। সারা দুনিয়ার হাজারো দেশে ছিল ব্রিটিশ বানিয়াদের আধিপত্য সুবাদে কলোনি বা উপনিবেশ। ভারত হোক বা আমেরিকা বা অন্য কোন দেশ – জনগণের মধ্যে ব্রিটিশের শাসন শোষণ পীড়ন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে লড়াই বাঙময় হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে যে আমেরিকা ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়েই স্বাধীনতা লাভ করেছে সেই আমেরিকাকে অভিবাদন সেদিন থেকে আমেরিকা নিজেরাই নিজেদের শাসন করেছে। সংবিধান প্রস্তাবনার আদলে ‘গণতন্ত্র’ নির্মাণ করেছে। সেই গণতন্ত্র যা আব্রাহাম লিঙ্কন সূত্রায়িত করেছিলেন ‘গভর্নমেন্ট ইজ ফর দ্যা পিপল, অব দ্যা পিপল অ্যান্ড বাই দ্যা পিপল’ বলে। সত্য আমেরিকা দীর্ঘ সময়ে অনেকানেক সাফল্য অর্জন করেছে। এতদসত্ত্বেও প্রশ্ন হাজারো। ওয়াশিংটন-লিঙ্কনের দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত অসভ্য বর্বর বোম্বেটে মার্কা সংস্কৃতির একজন সেই মহান দেশের রাষ্ট্রপতি হয় কী করে? গভীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মন্দা ও সঙ্কটের এক দৈত্য সমস্ত ব্যবস্থাটাকে গ্রাস করে কেমন করে!! গল্পটার শেষ নেই, নেইয়ের শুরু, এক নতুন ধারাপাত লিখল সাদা পুলিশের দুই হাঁটুর চাপে ২৫ মে ২০২০ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর, মৃত্যুর আগেও যিনি বলেছিলেন ‘আমার দম আটকে আসছে, আমি শ্বাস নিতে পারছি না – তবু ছাড় পায়নি!! ‘সাস ভী কভি বহু থী’র – পুনরাবৃত্তি! আলবাত ডেভিড জানে না আমেরিকার সংবিধান, সংবিধানের পাঠ, আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন, শোনে নি জর্জ ওয়াশিংটন বা এবং আব্রাহাম লিঙ্কনের নাম। দরকার হয় না হয়তো! কৌশলী প্যাঁচে কালো মানুষ নিধনের যোগ্যতাই হয়তো পুলিশে চাকরির মাপকাঠি হয়ে উঠেছে!

সম্প্রতি কোভিড-১৯ সারা দুনিয়ায় মহামারি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কোন একটি দেশে নয় সারা দুনিয়ায়। এখন (জুলাই ১৩) পর্যন্ত কোভিড সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি, ৩০ লক্ষ +, তার মধ্যে আমেরিকায় ৩৪ লক্ষ ১৪ হাজার + এবং মৃত্যুর সংখ্যা মোট ৫ লক্ষ ৭২ হাজার +, মৃত্যু ১ লক্ষ ৩৭ হাজার + যা হল একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি! সেটাও অন্ধকারের মতই কালো রেকর্ড। কই এই অন্ধকারকে কোন পুলিশ কোন প্রেসিডেন্ট আড়াইশো অ্যারেস্ট করতে পারল না তো! বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-ব্যবস্থাপনার চিত্রনাট্য এতো দুর্বল কেন? রাষ্ট্রপতির কোন হেলদোল নেই কেন? এখানে ইতি নয়। নেতির গল্প আরও বিশাল, ব্যাপক এবং গভীর। যারা মরল তারা কারা অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে শুধু কালো নয় রাষ্ট্র-নায়কের কদর্য এক চেহারা এবং সেটা আজকের এই আমেরিকাতেই! সংবাদের পাঠ বলছে “The racial wound at the center of the coronavirus pandemic in the US continues to fester, with latest data showing that African Americans have died from the disease at almost three times the rate of white people.” [সূত্র: The Guardian 20.5.20 ED Pilkington in New York]

আমেরিকার সংবিধানের প্রস্তাবনায় ” ইন অর্ডার টু ফর্ম অ্যা মোর পারফেক্ট ইউনিয়ন, এসটাব্লিশ জাস্টিস, ইনসিওর ডোমেস্টিক ট্রাঙ্কুইলিটি, প্রভাইড ফর দ্যা কমন ডিফেন্স, প্রোমোট দ্য জেনারেল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড সিকিওর দ্য ব্লেসিংস অব লিবার্টি টু আওয়ারসেলভস অ্যান্ড আওয়ার পসটারিটি – ডু অরডেন অ্যান্ড এসটাব্লিশ দিস কনস্টিটিউশন ….” প্রস্তাবনায় লিখিত এই পাঠ, আড়াইশো বছরের নির্মাণ কোথায় পৌঁছে দিয়েছে আমেরিকাকে, আমেরিকার জনগণকে, আমেরিকার শিক্ষা সংস্কৃতি সভ্যতাকে? সংবিধান আজকের এই অবস্থায় পৌঁছে দেয় না, দিতে পারে না। সংবিধানের পাঠ সত্য, যে বাস্তবতায় আজ দাঁড়িয়ে আমেরিকা সেও সত্য। এই বৈপরীত্য কীভাবে সম্ভব? সে এক অন্য গল্প। মুখ আর মুখোশের গল্প, লুণ্ঠনের গল্প, ব্রিটিশ হয়ে ওঠার গল্প – অস্তমিত সূর্যের গল্প – ব্যর্থতার গল্প … সব গল্পের অমোঘ সত্যটা এই স্থাপিত ব্যবস্থা নিরন্তর ব্যাপক অংশের সাধারণ মানুষকে, জনগণকে ‘অপর’ বানিয়ে রেখে চলেছে – যে নামেই হোক, হোক না তার নাম ‘গণতন্ত্র’ তাতে কী, আসলে সেটা ‘বর্ণতন্ত্র’ – পারস্পরিক বিদ্বেষ অসহিষ্ণুতায় লাগাতার তা দেবার যে তন্ত্র তার বলি – ‘ফ্লয়েড’। অন্য গল্পও আছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অনিকেত দে তাঁর এক লেখায় বলছেন তালিবান শাসনে কষ্ট আর লাঞ্ছনা সহ্য করে নানা সন্দেহ ও প্রশ্ন চিহ্ন বুকে সেঁটে মাথায় বয়ে আবুজার কেন আমেরিকায় পড়তে এলো এই প্রশ্নের উত্তরে “ছেলেটি বার বার বলে যে শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা আমেরিকার সর্বোত্তম কৃতিত্ব। যে দিন শিক্ষার ওপর এই দেশ যুদ্ধ ঘোষণা করবে, বুঝতে হবে এই দেশের অবক্ষয় শুরু হয়েছে।” অনলাইন কলেজগুলোর বিদেশি ছাত্রদের ফিরে যাবার নির্দেশ নিয়ে ‘বর্ডার পুলিশের নির্দেশিকা হাতে পেয়ে তার সাবধানবাণীটি মনে পড়ল। এ বার একেবারে কলেজগুলোর ওপর যুদ্ধ ঘোষণা: যেন তারা দেশের শত্রু হয়ে গিয়েছে, বিদেশি ছাত্রদের উটের মতো নাক গলিয়ে আমেরিকায় ঘাঁটি গাড়তে সাহায্য করছে। অঙ্কটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। দেশের প্রেসিডেন্ট ভালই জানেন যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাঁর ঘোর বিরোধী, অথচ তাঁদের গায়ে হাত দেবার বিশেষ উপায় নেই। সবচেয়ে ক্ষমতাবান কলেজগুলি বেসরকারি পুঁজিতে চলে, আর এই দেশে পুঁজির অজেয় শক্তি। এই তালে ভোটের আগে তাদের বেশ প্যাঁচে ফেলা গেল।” [আমাদের সাথে কত মিল, মনে পড়ে জেএনইউ, হায়দ্রাবাদ, দিল্লি জামিয়া মিলিয়া। তফাত একটাই এখানকার উচ্চশিক্ষায় পুঁজি যোগায় সরকার, তাই হস্তক্ষেপ অনেক সহজ। এখানেও সম্প্রতি এক দেশ এক শিক্ষা-ব্যবস্থার ওপর সুপ্রিম কোর্টের নিষেধাজ্ঞা বলবত হয়েছে। বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়ের পিআইএল মামলায় “Supreme Court on Friday refused to explore feasibility of establishing ‘One Nation One Board by merging ICSE and CBSE to ensure uniform education to all children ….. The school syllabus contains subjects bearing on the knowledge of rights, duties and governanance under the Constitution” – Reports PTI ]

ভারতের কথায়, আসা যাক আমাদের নিজেদের গল্পে। ওদের যেমন ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন ছিলেন, জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন ঠিক আমাদের ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু এবং অনেকে। পরাধীনতার গল্প, স্বাধীনতার জন্যে লড়াইয়ের গল্প, লাঠি, গুলি, জেল, কালাপানি, ফাঁসি – সব কমবেশি একই রকম ছিল। আমাদের বেশি যেটা ছিল তা হল নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, নানা খানপান, নানা বিশ্বাস, নানান সংস্কৃতির বিচিত্রতার এক মঞ্চ, এক আওয়াজ ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো। ‘স্বাধীনতা’ হস্তান্তর হল। সেই সব গল্পের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার গল্পও আছে। সেও বিচিত্রতার এক চরিত্র, স্বাধীনতার গামলায় এক ফোঁটা চোনা। আমাদের স্বাধীনতা তুলনায় নবীন কিন্তু পথের মিল অনন্য। উন্নয়ন এখানেও হয়েছে, তার অনেক গল্প আছে, আবার পেছন দিকে হাঁটার গল্প আছে, এক পা এগিয়েছে তো দু’পা দু’পা করে পেছনর গল্পও আছে। সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্র নির্মাণ; সমস্ত নাগরিকের জন্য সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার; সমান সামাজিক সম্মান ও সুযোগ এবং সকলের মধ্যে সদ্ভাব সম্প্রীতি সেটাই ছিল সংবিধান প্রস্তাবনায়। প্রস্তাবনার সেই পাঠে স্পষ্ট উচ্চারণে যা বলা হয়েছে আমেরিকার প্রস্তাবনা দূরত্ব কম, নৈকট্য বেশি, অমিল কম মিল বেশি। ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনার সাথে একটু মিলিয়ে দেখা যাক। এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে: “উই দ্যা পিপল অব ইন্ডিয়া হ্যাভিং সলেমনলি রিজলভড টু কনস্টিটিউট ইন্ডিয়া ইন টু অ্যা সভারেন, সোশালিস্ট, সেকুলার, ডেমোক্র্যাটিক, রিপাবলিক অ্যান্ড টু সিকিওর টু অল ইটস সিটিজেনস : জাস্টিস – সোশ্যাল, ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল; লিবার্টি অব থট, এক্সপ্রেশন, বিলায়েড, ফেথ, অ্যান্ড ওয়ারশিপ; ইকুয়ালিটি অব স্ট্যাটাস অ্যান্ড অব অপরচুনিটি; অ্যান্ড টু প্রোমোট দেম অল ফ্র্যাটারনিটি অ্যাসিওরিং দ্যা ডিগনিটি অব দ্যা ইনডিভিজুয়াল অ্যান্ড দ্যা ইউনিটি অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি অব দ্যা নেশন”। দুই মহান দেশের প্রস্তাবনা উচ্চারণে কত মিল! ডিগনিটি ইউনিটি ইন্টিগ্রিটি স্থাপনে ইমিউনিটির অভাবে ‘ওয়ারশিপ’ বলতে এরা যুদ্ধ জাহাজ বুঝল, কখনও পাকিস্তান কখনও চিনকে তাক করল, সবাই তালে তাল ঠুকল, মন্দির-মসজিদ যুদ্ধ সেকুলার সিটিজেন সংজ্ঞা নির্মাণে প্রাণিত করল। আগে পরে এক পথে যাত্রা – তথাপি পৃথক ফলের আশা, দেয়ালের লিখন, ভবিতব্য পড়ে ওঠা গেল না। তিয়াত্তর বছরের পরিক্রমার পরে ১৩০ কোটি মানুষের ৯৯% মানুষের জীবনযাপন-আশ্রয়-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সুরক্ষা কেবলমাত্র বিপন্ন নয়, বা যতটুকু বিপন্ন তার চাইতে হাজার গুণ বেশি বিপন্ন সংবিধানের ঘোষণাপত্রে লিখিত মন্ত্রের মত উচ্চারিত এক একটা শব্দ যেমন আমেরিকায় তেমন ভারতে। বীক্ষা একই। বিভক্তিও এক। ওখানে বিভাজন হোয়াইট অ্যান্ড ব্ল্যাক, এখানে হিন্দু অ্যান্ড মুসলিম, বর্ণ হিন্দু অ্যান্ড দলিত। একটা উদাহরণ:

বেদনা মুর্মুর কথায়: ‘মধ্যপ্রদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকের পদে নিয়োগ হয় সম্প্রতি। আসনটি ছিল অসংরক্ষিত (জেনারেল ক্যাটেগরি)। নির্বাচিত হন অন্যান্য পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীর (ওবিসি) এক মহিলা। এমন ঘটনা সেই রাজ্যে প্রথম মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সেই নির্বাচকদের প্যানেল ও তাঁদের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। সেই রায়ে স্থগিতাদেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট।’ এতদসত্ত্বেও এই সত্যটা খারিজ হয়ে যায় না যে দলিত আদিবাসীরা আজও সাধারণ ক্যাটেগরির যোগ্য নয় এই বিবেচনা কেবলমাত্র নিচু মহলে নয় হাইকোর্ট বা তারও ওপরে আজও হা-ডু-ডু খেলার মতই স্বাভাবিক।

‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন বিষয়ে ‘উইকি’ জানাচ্ছে “Black Lives Matter (BLM) is an organized movement in the United States advocating for non-violent civil disobedience movement in protest against incidents of police brutality against African-American people. An organization simply as Black Lives Matter exists as a decentralized network with about 16 Chapters in the United States and Canada, while a larger Black Lives Matter Movement exists consisting of various likeminded organizations … The broader movement and its related organizations typically advocate against police violence towards black people, as well as for various other policy changes considered to be related to black liberation.” আমাদের এখানেও ঘটে চলেছে হাজারো ভায়োলেন্স এর ঘটনা। রুটি রুজির মত অত্যাবশ্যক নানা বিষয় জরুরি বটে, শোষণ পীড়ন হিংসা অ সহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং তারই জন্যে জোট বাঁধা কম জরুরি নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলোর কথা ভাবার সময় এসেছে, হ্যাঁ এটাই সময়। ইতিহাস একটা সুযোগ দিয়েছে। নতুন করে বোঝার সময় আর যাই হোক নত হয়ে স্বাধীনতা আসে না। আর স্বাধীনতা না এলে না পেলে রুটি রুজি আশ্রয় শিক্ষা স্বাস্থ্য সামাজিক সম্মান সুরক্ষা অধিকার কিছুই অর্জন সম্ভব হয় না।

অনিকেত বলছেন “এখন মুষলপর্বঃ বিশ্বায়নের চাপে অন্দরমহলের দারিদ্রে ক্লিষ্ট আমেরিকা বিশ্বের ভার বওয়া থেকে মুক্তি চাইছে, পঞ্চাশের দশকে ব্রিটেনের মতো। কিন্তু ঘরোয়া রাজনীতির মাসুল বিদেশি ছাত্রদের চোকাতে হলে মার্কিন ইজ্জতের শেষ পরতটুকুও উঠে যাবে। শিক্ষার বিশ্বায়ন থেমে থাকে না। উনিশ শতকে নেতৃত্ব দিয়েছিল জার্মানি, বিশ শতকে আমেরিকা, একুশ শতকে হয়তো পড়ে থাকবে চিন।” দেশের অভ্যন্তরে? কারা করবে সেকাজ? ‘আদার লাইভস ম্যাটার’ প্রাসঙ্গিক ঠিক এখানেই। ভরসার জায়গাটা হারিয়ে যায়নি। অতিমারি বা ভুখমারি যেখানে ডেস্টিনেশন, হাজারে লাখে মরতে মানুষ বাঁচার জন্যই মরতে যেখানে প্রস্তুত, কুসংস্কারের অভিশাপ থেকেও মুক্ত হতে রাজস্থান হাইকোর্টের সামনে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে পূজিত মনুর মূর্তিতে যখন কালি স্প্রে করার সাহস দেখায়, আর কেউ নয়, দুই মহিলা—কান্তাবাই আর শীলা, একজন খেতমজুর, অন্যজন ঘরখাটা মজুর—তখন ভরসার জায়গা আছে বোঝা যায়। কিন্তু বোঝে ক’জন!

Facebook Comments

Leave a Reply