কিল মারার গোঁসাই : ড. কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

fail

অন্ধকারের বর্ণনা

ড. মুখার্জির ফোনটা কিছুক্ষণ পরপরই বেজে যাচ্ছিল। সময়ের ঘড়িতে তখন সকাল এগারোটা। সাধারণত এই সময় তিনি অফিসেই থাকেন। আজ অবশ্য রবিবার না হলেও তিনি অফিসে যাননি। কারণ এখন তাকে আর রোজ অফিস যেতে হয় না। করোনার জন্য তিনি এখন ঘর থেকেই অফিস সামলাচ্ছেন। তবে আজ কাজের কম চাপ থাকায়, ‘ঘর থেকে অফিস’ না সামলিয়ে, সামলাচ্ছিলেন তিনি গিন্নির রান্নাঘর। যেটাকে মজা করে তিনি সর্বদাই ‘বউকে সময় দেওয়া’ বলে থাকেন।
দুপুর সাড়ে বারোটার পর ড. মুখার্জি দোতলায় তার কাজের জায়গায় ফিরে এলেন। ল্যাপটপের পাশেই পড়েছিল ফোনটা। মিসড্ কল অ্যালার্টে দেখলেন, এই দু’ঘন্টায় গোটা পাঁচেক কল তাকে করা হয়েছে। যার মধ্যে তিনটে অচেনা নম্বর হলেও হাসান সাহেব তাকে বার দুই কল করেছেন।
হাসান সাহেব খুবই বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। বার তিনেকের এম.এল.এ, এবং বার চারেকের এম.পি। সেটা কম কথা নয়! তার ওপর মুখার্জিবাবু আজ যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, হাসান সাহেব সেই প্রতিষ্ঠানের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট ছিলেন প্রায় দীর্ঘ কুড়ি বছর।
পুরো নাম সাদাত হাসান খান। এলাকার লোক তাঁকে ‘হাসান সাহেব’ বলেই ডাকে। আড়ালে আবডালে লোকে তাঁকে ছোগলখোর বললেও এবং নিজের ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেওয়ার অপবাদ দিলেও, সামনে থেকে কেউ কখনও তেমন অসম্মান করেছে বলে মুখার্জিবাবুর জানা নেই। এই প্রতিষ্ঠানে বারো বছরের জীবনে অন্তত তেমন কোন ঘটনাও ঘটেছে বলে মুখার্জিবাবু শোনেননি।
অবশ্য লোকটাকে ড. মুখার্জির প্রথম দিকে তেমন খারাপ না লাগলেও, যত সময় বয়েছে লোকটার কূটচাল মুখার্জির নজরে এসেছে। ক্ষমতায় না থেকেও পিছন থেকে কলকাটি নাড়ানোর অভ্যাস যে লোকটার আছে, তাও মুখার্জি জানেন। ধান্দার রাজনীতিতে লোকটা যে দুর্নীতির সঙ্গে সহজেই আপোষ করতে পারেন এবং সংস্থার ডিরেক্টর যে তাঁকে হাতে রেখেই চলতে চান, অথবা পরিচালনব্যবস্থায় থাকা মিস্টার পান্ডে ও শাসক দলের প্রতিনিধি মিস্টার পাল যে তাঁর ইশারাতেই কথা বলেন, তাও মুখার্জির অজানা নয়।
তা এই লকডাউনের বাজারে হঠাৎ মুখার্জিকে স্মরণ, কি প্রয়োজনে? এই ভাবনায় কল লিস্ট দেখতে দেখতেই ড. মুখার্জির কপালে ভাঁজ পড়লো। তিনি ভাবলেন আগে অচেনা নম্বরগুলোর কথা সেরে ফেলা যাক। তারপর না হয় হাসান সাহেবকে ফোন করা যাবে। পরক্ষণেই ভাবলেন, সেটা ভুল হতে পারে। যদি হাসান সাহেব তার নম্বর থেকে কল করার পর অন্য কোন নম্বর থেকে কল করেন, যেটা এখানে সেভ করা নেই, তাহলে একটা ভুল বার্তা যাবে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে যে হাসান সাহেবের কলটা ধরেননি সেটা সত্য না হয়েও হাসান সাহেবের বিশ্বাসে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে।
অগত্যা হাসান সাহেবকেই কল ব্যাক করলেন ড. মুখার্জি। কোভিড নিয়ে সরকার কেমন লড়ছে এবং আমাদের লড়াই রোগের সঙ্গে, রোগীর সঙ্গে নয়, সেই সতর্ক বার্তার অনিবার্য রিংটোন শেষ হওয়ার আগেই ফোনটা ধরলেন হাসান সাহেব।
এই অতিমারির ঘোর সঙ্কটের সময় আছেন কেমন? কোথায় আছেন? এছাড়াও বাড়ির সকলের খবর সংক্রান্ত দু’একটা কুশল বিনিময়ের পরই তিনি যা বললেন, সেটা শুনে ড. মুখার্জির পিত্তি চটকে গেল।
রাগে ফুঁসে উঠলেন ড. মুখার্জি। দীপ্ত কন্ঠে বললেন, “দেখুন হাসান সাহেব দুর্নীতিটা আপনারা করাচ্ছেন। করতে মদত দিচ্ছেন। নিজের বাড়ির লোককে চাকরিতে ঢোকাতে ঘুষ দিতেও পিছপা হচ্ছেন না! আর আমাকে বলছেন, সকলের স্বার্থে সাংবাদিককে ন্যায়ের বার্তা দিয়ে ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিতে? কিসের স্বার্থে? আপনার বাড়ির লোকের স্বার্থে? নাকি আপনার চেলাদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে, যারা দুর্নীতিটা করেছে? স্পষ্ট শুনে রাখুন। আমি কাউকে সার্টিফিকেট দিতে পারবো না। মিথ্যাও বলতে পারবো না। আমাকে যদি কিছু বলতেই হয়, তবে আপনার তাবেদারদের বিরুদ্ধে পরিচালন কমিটির মিটিঙে সেদিন যা বলেছিলাম, আজও তাই বলবো। প্রয়োজনে আমার মোবাইলে তোলা সেই সব ছবি, ভিডিও ক্লিপিংস, আমি সাংবাদিকদের দিয়ে দেবো। রিজোলিউশনে আমায় যে জোর করে সই করতে বাধ্য করেছিলেন তাও বলে দেবো। …”
হাসান সাহেব কথা বাড়াননি। টেলি-সংযোগ আগেই কেটে দিয়েছিলেন।
ড. মুখার্জি প্রথমে বোঝেননি যে কলটা আর সচল নেই। উত্তেজনার ঝোঁকে তাই তিনি বকেই চলছিলেন। যখন বুঝলেন, তখন থামলেন ঠিকই, তবে তাঁর ভাবনা থামল না। তিনি আপন মনেই সামনের সাদা দেওয়ালকে বলে চললেন, “কি অদ্ভুত জগতে আমরা বেঁচে আছি, তাই না! যে ঘটনায় আমাদের দুঃখ পাওয়া উচিৎ, কাঁদা উচিৎ, সেখানে আমরা হেসে চলেছি। আর যেখানে আমাদের আনন্দ পাওয়া উচিৎ, সেখানে আমরা কাঁদি। যে তার নিজের স্ত্রীর প্রতি একটু চোখ তুলে তাকায় না, সে বারবনিতার সঙ্গে মন খুলে কথা বলে। কয়লার দালালী করে যার সর্বাঙ্গ কালিমালিপ্ত, সেই আবার রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছে কেমন স্বচ্ছ চেহারায় ঘুরে বেড়ায়। যে দিনের আলোয় কিছুটি দেখে না, সেও রাতের অন্ধকারের বর্ণনা দেয়। লজ্জার আবরণীর প্রতি যার কোন আগ্রহ নেই, সে দেখে বেড়ায় অন্য মানুষের নগ্নতা। হায় মানব সভ্যতা! তুমি কেমন করে অপর জীবনের মূল্য ও তার সম্ভ্রমের গুরুত্ব বুঝবে?”

সূর্যতামসী

মিস্টার দাস আজ বাজারে যাবেন। আজ তাকে বেরুতেই হবে। গিন্নির হুকুম তামিল না করলে আজ আর রক্ষে নেই। রান্না বন্ধ, খাওয়া বন্ধ, বন্ধ হবে সাংসারিক শান্তির কলরোল। গিন্নি আজ বলেই দিয়েছেন যে রোজ রোজ আর আলু সেদ্ধ ভাতে তার মন ভালো থাকছে না। সেই কথা শুনে মোবাইল থেকে মুখ তুলে দাসবাবু যেই না বললেন, “আমার তো ভালোই লাগে। হজমও ভালো হয়। এই গরমে…”
কথাটা পরতে সময় দেয়নি কুহকী। হাত থেকে কাঁসার থালা পড়লে যেমন ঝনঝন আওয়াজ ওঠে। কুহকীর বাজখাই চিৎকারও তেমন ভাবেই মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে আগুণ ঝরায়।
“তোমার সংসার তুমি করো। আমি আজই ভাইয়ের বাড়ি চললুম। প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে যাবো। ধরুক আমায় করোনা, তাতে তো তোমার কিছু যায় আসেনা। আমি মরলে তবেই তো তোমার শান্তি। বলি, আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা কবে মূল্য পেয়েছে তোমার কাছে? আমি তো বারো হাত কাপড়ের নেংটা। সারাটা জীবন তো জ্বলে মরলাম। ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিয়েছিলে না? এতো বছরে কী দায়িত্ব পালন করলে শুনি?”
দাসবাবু আর কথা বাড়াননি। সুড়সুড় করে পেন্টটা গলিয়ে, কুড়ি টাকার মাস্কটা মুখে সেট করে, থলি হাতে বাড়ি থেকে বেরুলেন।
দাসবাবু জানেন তিনি যতই লকডাউনকে বাহানা বানান না কেন, আসল কারণ হল পকেটে টান। নিজের রোজগার সম্পর্কে তিনি কুহকীকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে যাই বলুন না কেন, আসলে কত যে তার দৈনিক আয়, তা তিনি নিজেই জানেন। তবে দু’জনের সংসার হওয়ায়, আর কুহকীর খরচের হাত তেমন না হওয়ার কারণেই সংসারে টানাটানির প্রয়োজনটা তেমন দেখা যায় না। প্রাচুর্য না থাকলেও সংসারে একপ্রকার স্বচ্ছলতা আছে বলতেই হয়।
ফলে দাসবাবু জীবনের সর্বপরিসরে তার চরিত্রের প্রকাশ এমন করে তুলেছেন যেখানে নিজস্ব দুর্বলতাকে মহত্ত্বের পরিচয়ে ফুটিয়ে তোলা সহজ হয়। জীবনের যন্ত্রণাগুলোকে আনন্দের মুহূর্ত দিয়ে ঢেকে ফেলা সম্ভব হয়। একে অপরের জন্যই যে বেঁচে আছেন, তা জীবনের অনুভূতিতে অনুরণিত হয়। রক্তমাংসের সুস্থ জীবনকে তিনি অস্বীকার করেন না। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে এমন এক প্রধান চরিত্রে দাঁড় করান যা কোন-না-কোন মহৎ তত্ত্বের উপায়হীন শিকার। আর সেটাও হয়তো দু’জনের সংসারে তাদের জীবনব্যাপী ভীরুতার কারণে, আর কুহকীর চরিত্রের মায়াবী গুণেই গড়ে উঠেছে।
যাইহোক, দাসবাবুর চরিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ করাটা এখানে মুখ্য নয়। তার ঐশ্বর্যশালী জগতের ঈর্ষাজনক মানব চরিত্র ফুটিয়ে তোলাও এখানে প্রধান লক্ষ্য নয়। লক্ষ্যটা তার বাজার করার করুণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
কী সেই বেদনাতুর অভিজ্ঞতা? সাতসকালে কিইবা এমন ঘটলো যাতে তার মনাকাশে মেঘভার গুমোট পরিবেশ জন্ম নিল?
ঘটে, এমনটা এই এলাকায় আজকাল একটু বেশীই ঘটে। দাসবাবু কিছু কুচো চিংড়ি কিনে যেই না কচুর দর করছেন, পাশের থেকে চেনা গলায় ছুটে এলো বাক্যবাণ – “যে যেটা চেনে, সেটাই কেনে। জাতের লক্ষণ কি লুকিয়ে রাখা যায়? কি বলেন দাসবাবু?”
দাসবাবু বুঝলেন যে স্কুলমাস্টার গাঙ্গুলীবাবু তাকে ঠেস দিলেন। শুয়োরের সঙ্গে তুলনা করলেন। নীচু জাতের কথাও বোঝালেন। সবটা বুঝেও হাসি মুখে ঘাড় ফিরিয়ে, মুখের ঢাকনাটা না সরিয়েই দাসবাবু বললেন, “কানে পৈতে না ঝুলিয়ে আজকাল মাস্ক ঝোলাচ্ছেন? তা ভালো।”
দাসবাবু আর কথা বাড়ালেন না। একরাশ চাপা ক্ষোভ নিয়ে বাজার না করেই বাড়ি ফিরলেন।
বাড়িতে এসে বউকে মিথ্যে বললেন। করোনার কারণে, আর পুলিশের জুলুমে, বাজার তেমন বসেনি। এই মিথ্যে কথাটা তিনি কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন। মনে মনে মাপ চাইলেন কুহকীর কাছে। গাঙ্গুলীবাবুর শ্লেষ মেশানো কথাটা মাথায় ঘুরতে থাকলো।
জানালার কাছে বসে আকাশে দিকে চেয়ে বিড়ি ধরালেন। কালো হয়ে আসছে পুবাকাশ।
কুহকী চা দিয়ে গেল। বিড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে কুণ্ডলী পাকাতে থাকে দাসবাবুর মনে আসা শত প্রশ্ন। তিনি ভেবে চললেন, পেশায় শিক্ষক গাঙ্গুলীবাবু যে বিদ্বেষের বার্তা দিলেন, তা কি সত্যিই সমকালীন সমাজচিত্র? যদি তাই হয়, তবে কি শিক্ষককুল আজকাল বিদ্যা নামক পণ্যের বিক্রেতা? তাঁরা সামাজিক প্রভেদ দূর না করে, কেন এই পণ্যায়নের অংশীদার হতে চাইছেন? নতুন করে কি তাঁরা জাতের বৈষম্য বাড়াতে চাইছেন? কীভাবে এনারা একটা শ্রেণীকক্ষের সকল শিক্ষার্থীকে সমান চোখে দেখেন? এই পেশার সঙ্গে কি তবে আজ আর জ্ঞানবোধ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, কোনোভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়? বৈধ-অবৈধের পার্থক্য তবে কে বা কারা করবেন? কীভাবে করবেন? অন্যকে খোঁচা মেরে, আঘাত করে কি পান এনারা?
একটা জলে ভেজা ঝোড়ো হাওয়া ঘরটার মধ্যে কিছুক্ষণ খেলে বেড়ালো।

ক্ষণ-বসন্ত

শ্রেয়া আজকাল খবরের কাগজ নেয় না। এই কয়েকদিন আগেও বাড়িতে দু’তিনটে কাগজ আসতো। খুব সকালে ওঠার অভ্যাসটাও তার ঐ কাগজ পড়ার নেশা থেকেই তৈরি হয়েছিল। শীত ভোরে যখন কুয়াশা পড়তো, শ্রেয়া তখন তার দোতলার বারান্দায় অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতো, কখন কাগজ আসবে। বাসি খবরে ভরা কাগজের টাটকা গন্ধে শ্রেয়ার সকালটা অন্য মাত্রায় শুরু হতো। ঠান্ডা লাগার ভয় তাই তার মনে কাজ করতো না। সেই ভয় নিয়ে মায়ের চিৎকারও শ্রেয়া শুনতে চাইতো না।
তার কাজল কালো দুই চোখ তখন কুয়াশা ঢাকা আলো-আঁধারি রাস্তার আবছা ছায়ায় কাগজওয়ালাকে খুঁজে বেড়াতো। আর দড়িতে গোল পাকানো কাগজের লাঠিটা যখন কুয়াশার জাল ভেদ করে তীরের মতো দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বারান্দায় ঝপাত করে পড়তো, তখন সকল আশা পূরণ হওয়ার আনন্দে শ্রেয়ার টোল-পড়া গালে ভোরের রঙিন আলোর আভা খেলে বেড়াতো।
বিশ্বের বার্তা তখন তার হাতের মুঠোয়। এবার তার চা করার পালা। মায়ের টেবিলে চায়ের কাপটা রেখে, সে নিজের এক কাপ চায়ে গুলে নিতো সারা পৃথ্বীর উত্তেজনা, আবেগ, হিংসা, রাজনীতি, প্রতিবাদ, জ্ঞান চর্চা, বিনোদনের খুঁটিনাটি, আর পালাবদলের গল্পকথা।
চায়ের সঙ্গে তার এই খবর চিবুনোর অভ্যেস নিয়ে বড়ো মাসি তাকে কম খোঁটা দেয়নি! এই খোঁটা অবশ্য তাকে মজাই দেয়। ছোট মাসির মেয়ে নিশা তো একদিন বলেই ফেললো, “কিরে দিদি তুই নাকি উত্তমদার প্রেমে পড়েছিস? আর কোন ছেলে জুটল না তোর কপালে! শেষ পর্যন্ত একটা ফেরিওয়ালাকেই পছন্দ হল তোর?
অবাক হয়নি শ্রেয়া। প্রেম যখন খবরে, তখন তার বাহকের প্রতি একটু পিরিত থাকবে না, তা কেমন করে সম্ভব!
কিন্তু সেই প্রেমে ছেদ পড়লো মাস তিনেক আগে। সম্ভবত তারিখটা ছিল ২রা এপ্রিল। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে রান্না ঘর থেকে মা বলেছিলেন, “শ্রী দ্যাখতো কে এলো?”
দরজা খুলে শ্রেয়া উত্তমকে বিল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। উত্তম এসেছে মার্চের বকেয়া বিল নিতে। বিলে টাকার অঙ্কটা দেখে শ্রেয়া ভেতরে যায়, গুনে গুনে ৬১৩ টাকা এনে উত্তমের হাতে দিয়ে বলে “আজকের কাগজগুলোর দাম যোগ করে পুরোটাই মিটিয়ে দিলাম। কাল থেকে আর কাগজ দিতে হবে না।”
উত্তম অবাক হয়েছিল। কাগজ দিতে কয়েক মিনিট দেরি হলে যে রাগ করতো, সে কিনা বলছে কাল থেকে কাগজ বন্ধ! অনেকেই তো করোনার ভয়ে কাগজ বন্ধ করছে, এক্ষেত্রেও হয়তো তাই! কিন্তু আমাদের চলবে কীভাবে? কে ভাববে? কথাগুলো বলতে চাইলেও, উত্তম কথা বাড়ায় না। পা বাড়ায় ফেরার পথে।
শ্রেয়া খবরের কাগজ নেওয়া বন্ধ করলো করোনার কারণে নয়। সে জানে কাগজ প্রিন্ট হওয়া বা তার প্যাকিং হওয়ার সময়, সেখানে ভাইরাস থাকে না। উত্তমের মতো মানুষেরা যতই গ্লাবস পড়ুক, তাদের কারণে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা কিছুটা থাকলেও, শ্রেয়ার মতো ক্রেতারা সে বিষয়ে সতর্ক। শ্রেয়ারা এও জানে এবং মানে যে এই কাগজ কেনা বন্ধ করা মানে উত্তমের মতো মানুষ থেকে সুখেন কাকুর মতো সাংবাদিকদের অবস্থা কি হতে পারে! তবু শ্রেয়া কাগজ নেওয়া বন্ধ করে।
আসলে শ্রেয়ার কাছে খবরের কাগজ ছিল বেঁচে থাকার অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল। শেষ কয়েক মাস খবরের কাগজ পড়ে সে সেখান থেকে ঐ অক্সিজেনের বদলে পেয়েছে হাইড্রোজেন সালফাইড। কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে তার মন ভার হয়েছে। তার মনে হয়েছে ঘরের ও বাড়ির পরিবেশটা কেমন উৎকট দুর্গন্ধে ভরে যাচ্ছে। কমছে আত্মবিশ্বাস। এই ভ্যাপসা গরমেও সে অনুভব করেছে একটা স্যাঁতস্যাঁতে, বিষাক্ত পরিসরের, যেখানে বেঁচে থাকাটাই একটা চ্যালেঞ্জ।
খবরের নামে মিথ্যাচারের এই সীমাহীন দ্যোতকের বিরুদ্ধে সে নিজেই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। তার সেই প্রতিবাদ পত্র কাগজের মালিকেরা ছাপেনি। সৌজন্যমূলক কোন প্রত্যুত্তরও দেয়নি। অথচ তার সাংবাদিক বাবা একদিন সত্যকে অর্থের বিনিময়ে বিকৃত সংবাদে পরিণত করেননি। আপোষ করেননি। ছেপে দিয়েছিলেন আসল কথাটা। আর সেই অপরাধেই তাঁকে সেদিন খুন হতে হয়েছিল, যখন শ্রেয়া ছিল একজন টডলারের ছাত্রী।
আজও সেই কারণেই শ্রেয়া খবরের কাগজে তার বাবার গায়ের গন্ধ খোঁজে। কোন নিজস্ব সাংবাদিক তার বাবার মতো লিখছেন তা বোঝার চেষ্টা করে। পায় না। ক্ষমতার স্তাবকদের কলমে আজ ঘুণপোকার ঘনঘটা।
আজকের সেই পরিসরে দাঁড়িয়ে সে ভাবে, খোশামোদহীন খবর কি পাঠকের স্থুলত্বে আঘাত করে? তাই কি এমন দ্বেষের খবর প্রতি পাতায় দুই-তিন-চার কিম্বা পাঁচ কলমের জায়গা পায়? কে কাকে মারল, খুনি কোন ধর্মের, ধর্ষক কোন দলের, চোর কোন জাতের – এর বাইরে যে সমাজ থাকতে পারে, অপরাধ প্রবণতার আর্থ-সামাজিক রূপ বিশ্লেষণটা যে জরুরী, সেই কথাগুলো কি শুধু অলীক কল্পনায় থেকে যাবে? সরকারের নীতির বিরোধিতা করা মানে যে দেশদ্রোহী হয়ে যাওয়া নয় তা আমরা কখন ও কবে বুঝবো? কখন আবার মানুষ পরিচয়ে সমাজ তার গণতন্ত্রিক সুশাসনে ফিরতে চাইবে? মেয়েরা আর কবে তাদের মানব পরিচয়ে, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সফল হবে? দলিত আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কবে তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষায় কথা বলবে?
আজও তো দেখি গ্রাম ভারতে নতুন করে প্রচলিত হচ্ছে সেই সব সাবেকী রেওয়াজ, যেখানে পান থেকে চুন খসলে মেয়েদের উলঙ্গ করে গাধার পিঠে চড়িয়ে গোটা মহল্লায় ঘোরানো হয়ে উঠছে সামাজিক রীতি। বিধর্মীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। উন্নয়ন ও বিকাশের নামে বিরোধীদের কন্ঠ চেপে ধরা হচ্ছে। পাল্টে ফেলা হচ্ছে পাঠক্রম। রাজনৈতিক স্বার্থে মুছে ফেলা হচ্ছে সেই সব জরুরী ধারণাগুলোকে যেগুলো শাসককে প্রশ্ন করতে অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। আর সংবাদপত্র ও তার সাংবাদিক মুখরোচক করে তুলছে সারবত্তাহীন ঘটনাক্রমকে! গণমাধ্যম যে বসন্তের বার্তাবাহক হচ্ছে, সে যে ক্ষণ-বসন্ত!

বোবাকাহিনী

আড্ডা জিনিসটার মধ্যে একটা নির্ভেজাল আনন্দ আছে। এটা কোন অলস বিনোদন নয়, আবার কোন খোশগল্পের অবসরও নয়। আড্ডায় ক্লান্তি ছাড়া আপনি সব কিছুই পাবেন। বহু জটিল সমস্যার সমাধান আপনি যেমন পাবেন, তেমনই আপনার মনের অসুখ সারাতে হলে আপনাকে আড্ডাপ্রিয় হয়ে উঠতে হবে। মানুষ যেদিন থেকে সমাজবদ্ধ হয়েছিল, সেদিন থেকেই আড্ডা তাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিল।
বাঙালি মাত্রই আড্ডাবাজ। আড্ডার প্রতি প্রীতি তার জন্মলগ্ন থেকে। দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সমকালীন সকল আর্থ-সামাজিক ও সাহিত্যের বিষয় বাঙালির আড্ডায় উঠে আসে। কার গান ভালো, কে ভালো ছবি আঁকছেন, কোথায় সস্তায় বেড়াতে যাওয়া যেতে পারে, কোন্ সিনেমায় কি সমস্যা, কোন্ বিতর্কটা অমূলক, কে খারাপ খেললেন বলে দলের হার হল – সবেরই চুলচেরা বিশ্লেষণ এই আড্ডায় হয়। সহমত ও ভিন্নমতের পরিসর যেমন সেখানে থাকে, তেমনই জ্ঞানদা থেকে অজ্ঞদাও সেই আসরে সিরিয়াস বিষয়কে হাল্কা চালে, অথবা হাল্কা বিষয়কে গম্ভীরভাবে পরিবেশন করে থাকেন। নতুন শব্দের রসালো হাজিরা আড্ডাকে জমিয়ে রাখে।
আড্ডাকে যেমন উপাদান বিচারে বর্গীকরণ করা যায়, ঠিক সেই ভাবেই এর আবার স্থান-কাল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে বয়সের মাপকাঠিতে আড্ডা যে সব সময় সমবয়স্কদের মধ্যে হবে তেমনটি নয়। যেমনটি আমাদের এই ঘোষপাড়ায় বিষ্ণুর চায়ের দোকানের আড্ডা। এই ঠেকে ভোর সাড়ে চারটে থেকে রাত প্রায় এগারোটা পর্যন্ত আড্ডা চলে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রুপ এখানে আসে, আড্ডা হয়। সেখানে প্রসঙ্গ ওঠে, আবার এক প্রসঙ্গ থেকে আর এক প্রসঙ্গে কথা চলে যায়। এ যেন সমুদ্রে তার ঢেউয়ের খেলা।
আগের গ্রুপের কেউ থাকলে সেও পরের কথায় যুক্ত হয়, অথবা হয় না। দোকানী বিষ্ণুর কাছে এগুলো সবই মায়া। তার কাজ হল ভালো চা দেওয়া, আর কে সাদা পান খায়, কার পছন্দ মিঠা পাতা, কার লাগে জর্দা, কার কোন ব্রান্ডের সিগারেট, কোন কোম্পানির বিড়ি পছন্দ – সেই সব মনে রাখাটাও বিষ্ণুর কাজ।
করোনার কারণে হওয়া লকডাউন কিছুদিন সেই সব কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। এপ্রিলে খুললেও দোকান ঠিক জমছিল না। কিছু মানুষ আসছিলেন ঠিকই, তবে তারা চা-পান-সিগারেট-বিড়ি নিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছিলেন। সকলেই যেন বলে যাচ্ছিলেন, “চা খেতে এসেছি, আড্ডা মারতে নয়। চা খাওয়া হয়ে গেলেই বাড়ি চলে যাবো।”
ঘটনাবহুল পুরনো দিনগুলোকে বিষ্ণু শুধু তার স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সুদিনের আশায় বুক বাঁধছিল সে।
সেই দুঃসময় অবশ্য বেশী দিন টেকেনি। মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই আড্ডাপ্রিয় বাঙালি করোনাকে পাশবালিশ করে চলতে শিখে গিয়েছিল। এই এলাকাতে করোনা এক্সপ্রেস ঢুকলেও, করোনা ঢোকেনি। ফলে আবার নতুন করে জমে ওঠে বিষ্ণুর চায়ের ঠেক।
জুন মাস থেকে ধীরেধীরে ফিরে আসে পুরনো চেনা ছন্দ। জুলাইয়ের এক সন্ধ্যায় বন্ধুদের নিয়ে চলছে এক জমাটি আড্ডা। একে একে সকলেই আসছে। যে বা যারা তখনও আসেনি, তাদের ফোন করা হচ্ছে। “বউয়ের ধমক”, নাকি “করোনার মৃত্যুভয়” – কোনটা না আসার কারণ তা জানতে চাওয়া হচ্ছে। সেই সময় এলো বরুণ সেন। বরুণ আসা মাত্রই রঙ্গন বলে উঠলো, “রঙ্গমঞ্চে প্রবেশিল ড. সেন, এখন শুনিব মোরা তিনি কি কহেন!”
বরুণ দুই হাত ওপরে তুলে নাটকীয় ভঙ্গিমায় গলা কাপিয়ে বলল, “হে স্বাধীনতা, তোমার নামে কত অপরাধই না অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে!”
“গুরু, গুরু কি দিলে! আজ বৌদি কি বাটা মাছের ঝোলটা ভালো রেঁধেছিল? নাকি, বাসন মাজতে হয়নি?” – শুভ বলে উঠল।
“এই সব বুঝবি নারে শুভ। ফরাসী বিপ্লবের উত্তুঙ্গ অধ্যায়ে গিলোটিনের নীচে মাথা রেখে মাদাম রলাঁ এই কথা বলেছিলেন, জানিস? পড়াশোনাটা মন দিয়ে কর, তা হলেই জানবি যে করোনার হাড়িকাঠে মাথা রেখে সকলের গায়ে গা ঘেঁষে বসে চা খেলে, ওটা স্মরণ করতে হয়। যাইহোক, আজ কিন্তু সকলের চা-সিগারেটের দাম দেবে অধ্যাপক মন্ডল।”
ড. সেনের এই কথায় সকলেই সুজিত মন্ডলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। কিন্তু সুজিত নির্লিপ্ত ভাবে বলল, “বাংলায় টাকার জোগানটা চিরকাল সেনেরাই দিয়ে এসেছে দাদা। তুমি সেই গৌরীর বংশধর। তাই তুমি থাকতে আমি সেটা ভাঙবো কীভাবে? এতে রাজ্যপাল অপমানিত হতে পারেন!”
সুজন একটু হাওয়া দিয়ে বলল, “ঠিক। কাউকে অপমান করা ঠিক কাজ নয়। ঝ্যায় শিয়া রাম, মা-মাটি-মানুষ জিন্দাবাদ।”
প্রদীপ, সুজনকে একটু দাবড়ে দিল, “থাম তো। অর্ধেক জেনে পক পক করা তোর মতো অধ্যাপকদের অভ্যাস। আচ্ছা সেন দা, সুজিত কাটমানিটা কেন দেবে?”
“ওরে ও আজ ছেলের কাস্ট সার্টিফিকেটটা হাতে পেয়েছে। খাওয়াতে তো হবেই।”
এদিকে আর এক রাউন্ড চা এসেছে। চিত্তও এসেছে সেই মুহূর্তে। বিষ্ণুকে আর এক কাপ চা বাড়ানোর অর্ডার দিলো সুজিত।
সেই অর্ডার শুনে চিত্ত বলল, “চা আমি খাবো না, খাবো না আমি চা। নেপোটিজমের ফাঁদে পা, দিতে আমি চাই না।”
“আবার চায়না? এক ভাইরাসেই হাল খারাপ, তার ওপর যুদ্ধ লাগলে আমাদের হাল পুরো বেহাল হয়ে যাবে।” এতক্ষণ চুপ করে থাকা সুফি বিরক্তির সঙ্গে বলল।
“দেশদ্রোহীর মতো কথা বোলো না বন্ধু, কেস খাবে। আত্মনির্ভর হিন্দু রাষ্ট্রের পথে তোমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর।” – ইঙ্গিতবাহী মুচকি হেসে শুভ বলল।
“আমরা তো এখন সবেতেই দ্রোহকালের বাসিন্দা ভাই। কাফিল খানকে দেখো, তা হলেই বুঝবে। ডাক্তার খান ধর্ষক ছিলেন, না নীরব মোদিদের মতো ব্যাঙ্ক লুঠ করেছিলেন? খুন, সন্ত্রাস, জঙ্গি কার্যকলাপ, কিছুই করেননি। হাসপাতালে থাকা দুধের শিশুগুলোকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় উনি অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড়ের চেষ্টাটা ব্যক্তিগত স্তরে নিয়েছিলেন। এটাই ছিল তাঁর অপরাধ! আর তাতেই ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে তাঁকে বন্দী করতে হল। এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে যারা ছিলেন তাদেরও এই লকডাউনে জেলে ভরা হচ্ছে। সফুরার মতো গর্ভবতী মহিলাদেরও ছাড় নেই! কবি ভারভারা রাওকে ইউএপিএ তে আটক করে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। আন-ল-ফুল অ্যাকটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট কার্যকরী হচ্ছে কলমের বিরুদ্ধে! শোন ভাই, হিন্দু-মুসলিমটা বিষয় নয়। বিষয়টা হল ক্ষমতা। আর সেটা টিকিয়ে রাখতে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা। জনজাগরণ না ঘটলে ট্রাম্পের মতো কাউকেই আমরা বাঙ্কারে ঢোকাতে পারবো না। সব তো বিক্রি হয়ে …”
“থাম ভাই। রাজনৈতিক ভাষণ বন্ধ কর। যে সমাজে একজন মাকে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে ছেলের চিকিৎসা করাতে হয়, সেটা আর যাইহোক সভ্যসমাজ নয়। বুঝিস সেটা? ভামেদের মতো কেন্দ্র, কেন্দ্র, কেন্দ্র করিস না। রাজ্যটাকে দেখ। কোথায় গেল তোর একশো শতাংশ কাজের পিসি?” – সুফিকে থামিয়ে সুজন এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলল।
শুভ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। সেনের ইশারায় চুপ করে গেল। সকলেরই চোখ গেল দোকানের সামনে এসে দাঁড়ানো পুলিশের গাড়িটার দিকে। সামনে বসা ফর্সা অফিসার বেশ কর্কশ গলায় কিছুটা খিঁচিয়ে এখনই সকলকে বাড়ি যাওয়ার ও দোকান বন্ধের নির্দেশ দিলেন।
এলাকায় চার জনের করোনা পজিটিভ। অনির্দিষ্ট দিনের জন্য সব বন্ধ।
সকলেই উঠে গেল। বিষ্ণু গ্যাসটা নিভিয়ে বালতির জলে বাসন ধুতে লাগলো। দোকানের সাটারটা চিত্ত খানিকটা নামিয়ে দিল।
সাইকেলটা নিয়ে পুলিশের গাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চিত্ত তার স্বরচিত পুরনো গানটা আজ আবার ধরলো – “চিত্ত রে তুই ভয়যুক্ত, নত রে তোর শির/ বাপের জাতে ছেলের প্রতিষ্ঠা, নেপোটিজম গভীর।/ ও ভাই নেপোটিজম গভীর।/ তোমরা সবাই নিরপেক্ষ, গুছিয়ে নিয়েছ আজ/ আমি যে ভাই বোকা ষণ্ড, মরতেও পাই লাজ।/ ও ভাই মরতেও পাই লাজ।/ প্রতিবাদের কন্ঠ আকাল, ভুখা পেটে হয় না সকাল/ মিটিয়ে দে মা দেনা সকল, সয়না যে আর বাঁচার ধকল।/ আহা, সয়না যে আর বাঁচার ধকল।/ আকালের ডাকে গড় বাহিনী, নইলে রচবি বোবাকাহিনী/ সাড়া দে ভাই দেখে দোষ, নইলে তোরা ধুঁদুল চোষ।/ আহা, সবাই তোরা ধুঁদুল চোষ।/ ফ্যাত ফ্যাত সাঁই সাঁই, সবাই যে দেখি কিল মারার গোঁসাই/ চিত্ত রে তুই ভয়যুক্ত…”
বোস বাড়ির কুকুরটার চিৎকারে চিত্তর গানের তালটাও কেটে গেল।
ওদিকে বিষ্ণু দোকানে তালা দেয়। ভাবে, আবার কতদিন বন্ধ থাকবে দোকান, কে জানে! ওদিকে বউটাও তো আজ নন্দীদের বাড়িতে কাজে গিয়েছিল! ওদের বাড়িতেই তো তিন জনের রিপোর্ট এসেছে পজিটিভ! বউটার করোনা হল না তো? বউয়ের হলে তার নিজের হবে, সে নয় ঠিক আছে। কিন্তু তারপর?

গা-সওয়া কথা

সামাজিক অসাম্যের ধারাগুলো যখন সমাজের প্রতিটা স্তরে দীর্ঘকাল চলে, নবজাতক যখন তার শিশুকাল থেকে তাতে অভ্যস্ত হয়, তখন সেই বিভাজনের রেখাগুলো গা-সওয়া হয়ে যায়। একটু অন্যভাবে ভেবে দেখলে দেখবেন যে বৈষম্যের পরিসরগুলো প্রাচীনতায় ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। যেমন ধরুন শ্যামলের মা ঝি-এর কাজ করে, আমাদের বাড়ির চাকর হল গোপাল, অথবা মিজানুরের বউটা কেলে কুস্টি – এই ধরনের অর্থবহ বাক্যগুলোকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অবলীলায় বলে থাকি। বাংলা সাহিত্যে, এমনকি শিশু সাহিত্যেও এমন উদাহরণ ভুরিভুরি আছে। শিশু সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার, কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে বিশ্বকবি রবি ঠাকুরও বাদ যান না সেই উদাহরণ সৃষ্টিকারীর তালিকা থেকে।
যাইহোক, সমাজে প্রচলিত অসাম্যের ও বিদ্বেষের ছবিকেই ফুটিয়ে তোলে ওপরের চারটে সময়ের চিহ্ন। কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার, কোথাও সম্প্রদায়গত নিচু অবস্থানকে মনে করিয়ে দেওয়া, কখনও বাণিজ্য লিপ্সায় মিথ্যাচার, আবার কখনও সুযোগ-সন্ধানী মন, সেই ফাটলকে ঘরোয়া করে তোলে। এমন সমতাহীন অবস্থা, অতীত থেকে আজ, জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণী বিচারে সমাজে বেঁচে থাকে। আমরাও মরে বেঁচে থাকি সুদিনের অপেক্ষায়।
কখনও কখনও সেই জীবন্মৃত অবস্থার ঘোর কাটিয়ে কিছুটা সংবেদনশীল হই ঠিকই, কিন্তু তাও কোথাও নির্বাচনাত্মক বৈশিষ্ট্যে লঘু হয়ে পড়ে। আমাদের অস্থির হওয়া, শিউরে ওঠা, দুর্ঘটনার ঘনঘটায় আতঙ্কিত হয়ে পড়া – এই সবই জীবনের চাহিদায় বেলা শেষে কিছুটা বহিঃপ্রান্তীয় চরিত্রের হয়ে যায়। আমরা সামাজিক ঘটনার গভীরে গিয়ে সেটাকে নির্মূল করতে অগ্রণী সেনার ভূমিকা নিই না। সেই দুর্বলতার কারণেই হাজার অন্তঃবিভাজনে সমাজ সচল থাকে।
কোভিড-১৯ উত্তর সমাজ হিংসা, ঘৃণা ও অব্যবস্থাকে মুছে ফেলে স্নেহ, ভালোবাসা ও যত্নকে যদি করোনার মতো ছোঁয়াচে করে তোলে, তবে এই পৃথিবীতে মানব পরিচয় যে সর্বোত্তম রূপ লাভ করবে, সেটা বলাবাহুল্য। আজকের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্ন সচেতনে দেখলে, তবেই হয়তো অবচেতনে অপরের প্রতি আমরা দায়িত্বশীল হতে পারবো। সহমর্মিতাকে সহজাত করে তুলতে পারবো। স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে পারবো সমাজব্যবস্থার অন্যায্য ভিত্তিভূমিগুলোকে।

Facebook Comments

Leave a Reply