“মানুষ ছাড়া , ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি” : কান্তিরঞ্জন দে

fail

এপিসোড – ১ ।।

চৈত্র মাসের শেষাশেষি। বাড়ির লাগোয়া ছড়ানো জমিতে পাতাপুতা হাবিজাবির জঞ্জাল জমেছে। ব্যাখারির বেড়া দেওয়া বাউণ্ডারির চারপাশে তো আগাছার জঙ্গল। গোপালবাবু যতীনকে কাজে লাগিয়ে অফিস চলে গেছেন।

যতীন রুহিদাস। কুচকুচে কালো রঙের পেটানো চেহারা। কাঁধ অব্দি তেল চুকচুকে বাবড়ি চুল। সারাবছর এর ওর তার বাড়িতে ফাইফরমাস খাটে, ঘরামির কাজ করে। পুজোর পাঁচদিন শক্তি সংঘের প্যাণ্ডেলে ঢাক বাজায়। সেই কোন সকাল থেকে কাজ করতে করতে যতীনের সারা শরীরে এখন দরদরে ঘাম।

এখন বেলা দুটো। নীহারকণা বাড়ির পেছনদিকের টানা বারান্দায় ছেলেমেয়েদের খেতে দিয়েছেন। উঠোনে নেমে হাঁক দিলেন।
— যতী…ন, খাবি আয়।
কুয়োতলায় এসে যতীন ভালো করে হাত পা ধুয়ে নিল। পশ্চিম দিক থেকে একটা বিশাল কচুপাতা কেটে নিয়ে ধুয়ে-মুছে উঠোনের এককোণে এসে দাঁড়াল।
—কচুপাতা দিয়া কি করবি ?
—আপনে খাইতে দিবেন, কইলেন?
—তার লাইগ্যা কচুপাতা লাগবো কিসে? ক্যান্, আমার বাড়িতে থালা বাসন নাই? বারান্দায় উইঠ্যা আয়।
—আমি যে ছোটজাত। জাতে চামার, নমঃশূদ্র। বাপ-ঠাকুরদায় চামড়ার কাম করতো। আমারে ছুঁইলে আপনেগো যে পাপ হইব, মাসিমা।

নীহারকণা রাগে এবার উগ্রচণ্ডী রূপ ধরলেন।
—হারামজাদা, আমারে পাপপুণ্য শিখাইতাসো? জানস, আমি দুই ব্যালা গীতা পাঠ করি? আমার ঠাকুরের আসনে লক্ষ্মী-নারায়ণ প্রতিষ্ঠিত? প্রত্যেক পুন্নিমায় সত্যনারায়ণরে শিন্নি দেই? আমারে তুমি পাপপুণ্য শিখাইতে আইসো, বান্দর ??
বারান্দায় উইঠ্যা আয় কইলাম। খাইতে বয়।

যতীন হাতের কচুপাতাটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বারান্দায় উঠে এসে টানা শতরঞ্চিতে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে এক সারিতে খেতে বসে।

এক হাতে পেতলের থালা বাটিতে টাল করা ভাতের পাহাড়, ডাল, তরকারি, মাছ আর অন্যহাতে পেতলের জলভরা গ্লাসে বছর চল্লিশের নীহারকণা তখন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। কপালে জ্বলজ্বল করছে ইয়াব্বড় সিঁদুরের টিপ। হাত ভর্তি শাঁখা-পলা, নোয়া আর কয়েকগাছা সোনার চুড়ি-বালা।

এপিসোড – ২ ।।

” শোনো, কাল কলেজের পরে তুমি আমার নিউ আলিপুরের বাসায় চলে আসবে। একমাস থাকবে। তোমার যেটুকু খামতি আছে, পার্ট ওয়ান পরীক্ষার আগেই আমি সেটুকু ঠিকঠাক করে দেব। তোমার বাবার সঙ্গে আমার আজই কথা হয়ে গেছে ।
—এক মা—স থাকব ?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ। চিন্তা কি? কাকু-কাকিমার বাড়িতে থাকবে মনে করেই আসবে। তোমার বাবা আর আমি তো ছোটবেলার বন্ধু। চাঁদপুরে তোমাদের আর আমাদের দেশের বাড়ি ছিল রাস্তার এপার -ওপার।
পার্ট ওয়ান পরীক্ষার্থী ছেলেটি সবই জানে। ছোটবেলা থেকে দুই পরিবারের হৃদ্যতার অনেক গল্প সে শুনেছে। তবুও প্রেসিডেন্সি কলেজের বিভাগীয় প্রধান বলে কথা। সদ্ ব্রাহ্মণ। উঁচু বংশ। সংস্কৃত আর দর্শনশাস্ত্রে সুপণ্ডিত। ভালো এস্রাজ বাজান। সপরিবারে ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথের শিষ্য। ছেলেটি সবই জানে। তবুও মফস্বলী আড়ষ্টতা কাটতে চায় না যেন।
—আরে, এত কিন্ত কিন্তু করার কি আছে? শুধু একটা ধুতি আর একটা গামছা নিয়ে চলে আসবে, ব্যস্।

প্রথম দিন সকাল। কাকিমা ঘুম থেকে তুলে ডেকে চা-এর জন্য ড্রয়িংরুমে আসতে বলে গেলেন। চোখে মুখে জল দিয়ে ছেলেটি পাশের ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই বিভাগীয় প্রধান কাকু আর্তনাদ করে উঠলেন —
— একি ? একি করেছ তুমি ?
কাকুর ইঙ্গিত ছেলেটির পরণের ধুতির দিকে। এই যাহ্ , ধুতিতে কোনও নোংরা লেগে গেল নাকি?
— এরকম মোল্লাদের মতো করে ধুতি পরেছ কেন? লুঙ্গি তো মুসলমানেরা পরে। এ ঘরে স্বয়ং গুরুদেবের ছবি দেখতে পাচ্ছ না? ছি , ছি, ছিঃ। যাও, এক্ষুণি কাছা দিয়ে ধুতি পরে এস।
ছেলেটি তাই করেছিল। করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে, সেদিন সকালে তার গলা দিয়ে চা নয়, তরল অপমান ঢুকেছিল যেন।

অপমানের আরও খানিক বাকি ছিল দুপুরবেলায় খাওয়ার সময়। মেঝেতে চারটি শেতলপাটি-র আসন। তিনটি পাশাপাশি। একটি ঠিক উল্টোদিকে। বেশ কিছুটা দূরে। আনমনে ছেলেটি তিনটি আসনের একটিতে বসতে যাচ্ছিল। কাকিমা আঁতকে উঠলেন—
— ওগুলোতে নয়। ওগুলোতে নয়। তোমার বসার জায়গা ওই যে, দূরে।
— কেন? ছেলেটির গলায় প্রশ্নটা কাঁটার মতো বিঁধে গেল।

সুপণ্ডিত কাকু সেটা আন্দাজ করেই হাসি মুখে ব্যাপারটা খোলসা করলেন। তুমি তো ব্রাহ্মণসন্তান নও। তোমরা হলে গিয়ে কায়স্থবংশ। এমন কি, কুলীনও নও। ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ এক পংক্তিতে ভোজন, শাস্ত্রে নিষেধ আছে। আমার গুরুদেবও পছন্দ করেন না।
— পূর্ণদা কি করে আপনাদের সঙ্গে এক পংক্তিতে বসবে? সে তো আপনাদের আশ্রয়ে থাকে। আপনাদের ফাইফরমাস খাটে। টিউশনি করে পড়ার খরচ চালায়।
— আহা, ফাইফরমাস খাটে তো কি হয়েছে? ও হচ্ছে, পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ। আমাদের সঙ্গে এক আসনে বসে ভোজন করবার অধিকার ওর আছে।

ছেলেটি সেদিন হাসবে, না কাঁদবে ভেবে পায় নি। তবে সারা রাত অসহ্য অপমানে বিছানায় ছটফট করেছিল মনে আছে। যন্ত্রণায় চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছিল।

এপিসোড – ৩ ।।

একটি ছেলে একটি মেয়ে। অনীশ আর তাজ। তাজ বেগম আর অনীশ গাঙ্গুলি। পার্ট ওয়ান পাশ করে দুজনেই পার্ট টু -র জন্যে তৈরি হচ্ছে। তিমির স্যরের কাছে তারা সকালের ব্যাচে ফিজিক্স পড়তে আসে। দুজনেরই ফিজিক্সে অনার্স ।
নরসিংহ দত্ত কলেজের ফিজিক্সের অধ্যাপক হিসেবে এলাকায় তিমিরদা- র খুব নামডাক। প্রতিদিনই সকাল সন্ধ্যায় দু-ব্যাচে প্রায় ২৫-৩০ জন ছেলে মেয়ে পড়ে বিনা পয়সায়। এ সব ক্ষেত্রে যা হয়, প্রতিদিন একই সঙ্গে পড়তে পড়তে তাজ আর অনীশের মধ্যে পদার্থ বিজ্ঞানের বাইরেও কি যেন একটা রসায়ন ঢুকে গেল। দুজনের কলেজ কলকাতার দু- প্রান্তে, এটা আর কোনও বাধাই রইল না। দেখা সাক্ষাৎ, সিনেমা-থিয়েটার, রেস্টুরেন্ট, ব্যাণ্ডেল চার্চ ইত্যাদি পর্বের মধ্যেই তারা পার্ট- টুতেও চমৎকার রেজাল্ট করল। দুজনের দুজনকে না হলে আর চলছে না। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে তো কি হয়েছে? বিয়েটা সেরে ফেলতে দোষ কি?
তবে লুকিয়ে চুরিয়ে নয়। দুজনের কেউ-ই বাবা মাকে কষ্ট দিতে চায় না ষ। অথচ বাবা- মাকে সরাসরি বলতেও লজ্জা। অতএব, তারা দুজনেই গিয়ে তাদের প্রিয় তিমিরদাকে ধরল। তিমিরদা তো খুব খুশি। চমৎকার সামাজিক দৃষ্টান্তমূলক কাজ হবে একটা। এই বিয়ে হওয়া দরকার। তিমিরদা দু-বাড়ির মধ্যে দূতিয়ালিতে এক কথায় রাজি হলেন।

আসল গল্প এবার শুরু। তাজ-এর বাবা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের রিজিওনাল ম্যানেজার। তিনি বললেন —
— আমার তো এ বিয়েতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু বিয়ের পর আমার মেয়ে যখন ও বাড়ির বউ হয়ে যাবে, মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন পাড়া প্রতিবেশীর টিটকিরি আর ঘেন্না উপেক্ষা করতে পারবে কি? সে ব্যাপারে সিওর না হয়ে, আমি আমার মেয়েকে অশান্তির মধ্যে ঠেলে দিই কি করে?

অনীশের বাবা রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিক। মা হাইস্কুলের টিচার। দুজনেই আমতা আমতা করে বললেন—
— তাজকে আমরা দেখেছি। খুবই সুন্দরী। পড়াশুনোতেও ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু, পাড়া-প্রতিবেশী মিলিয়ে আমাদের তো সমাজেই থাকতে হবে তিমিরবাবু। কি করব বলুন, সবাই তো আর আপনার মতো বামপন্থী প্রগতিশীল উদারমনা নন। সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টাটা আমাদের পক্ষে বড় বেশি রিস্কি হয়ে যাবে।

তারপর? তারপর আর কি? ইউনিভার্সিটি কমপ্লিট করার আগেই তাজকে জোর করে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল। এর প্রায় ২৫-২৬ বছর পর ভুল বিবাহের কারণে শরীরের ওপর অত্যাচারে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা গেল অনীশ। আর তাজ? কি জানি? সে সম্ভবত কোনও এক প্রবাসী বড়লোকের নিঃসঙ্গ বন্দিনী গৃহিনী।
সামাজিক দৃষ্টান্তের নটে গাছটি অঙ্কুরে এভাবেই মুড়িয়ে গেল।

এপিসোড – ৪ ।।

সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো এবার একটু পেছিয়ে যাই। প্রথম এপিসোডের মাস ছয়েক পরের দৃশ্য এটি।

বিশাল বড় ক্লাব ‘মহাদেশ পরিষদ’। খেলাধুলা, নাচগান, ব্যায়ামাগার মিলিয়ে অনেকগুলো শাখা। বিশাল সংগঠন। ক্লাবের অ্যানুয়াল ফাংশানে অংশ নেবে নাচের বিভাগের ছেলেমেয়েরাও।
কিন্তু, চিত্রাঙ্গদা করবে কে? কেন, সজল আছে না? ক্লাস এইটে পড়ে। পড়াশুনোয় দারুণ। আবার নাচের ক্লাসেও দুর্দান্ত। ভরতনাট্যম কুচিপুড়ি দুটোতেই। রঙটা সামান্য চাপা। মেক আপে ঠিক করে নেওয়া যাবে। গড়ন-চলন বেশ মেয়েলি। কথার ঢঙেও একটা মেয়ে মেয়ে ভাব। সুরূপা কুরূপা চিত্রাঙ্গদার দুটো চরিত্রের জন্য সজলই একমাত্র ফিটেস্ট। নাচের মাস্টারমশাই শৈলেনবাবু তাই একদম নিশ্চিন্ত।
তিনমাস টানা রিহার্সালের পর মঞ্চস্থ হল চিত্রাঙ্গদা নৃত্যানুষ্ঠান। মায়ের লাল বেনারসী আর শিফনের লাল ওড়নায় সজলের সুরূপা চিত্রাঙ্গদার নাচে দর্শকেরা একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। মুহুর্মুহু হাততালিতে ফেটে পড়ল হল। কিন্তু , মুস্কিলে পড়ল সজল। পরের দিন থেকে গোটা এলাকায় ওর নাম হয়ে গেল— বৌদি। বৌদি সজল। কেউ বলল— লেডিস। কেউ বলল— লণ্ডা । কেউ কেউ বলল — মাকড়া। মহিলামহলের অনেকেই বলল — হিজড়ে।

সেদিন থেকে ঘরের চার দেওয়ালই হয়ে গেল, সজলের সবচেয়ে বড় বন্ধু। স্কুল, কলেজ, অফিস— সজল ভৌমিক যত বড় হতে লাগল তাকে নিয়ে টিটকিরি, লাঞ্ছনা- গঞ্জনা, উপহাস তত বাড়তে লাগল। মা মারা যাবার পর সজল একেবারে একা হয়ে গেল। বোনের বিয়ে বাবা মা-ই দিয়ে গিয়েছিলেন। ভাইয়েরাও অন্য জায়গায় বাড়ি করে আলাদা হয়ে গেল। নিঃসঙ্গ সজল একবার ভেবেছিল, সুইসাইড করবে। সাহস করে উঠতে পারেনি।

পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন যদি জানত, মানব প্রজাতিতে অ্যাণ্ড্রোজিনি বলেও একটা প্রজাতি আছে। যারা দেহে পুরুষ কিন্তু মনে নারী। বাংলায় আজকাল যাদের বলে, তৃতীয় লিঙ্গ। অবশ্য জেনেই বা কি ঘোড়ার মাথা হত? তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি ঘৃণা আর হাসাহাসি আজও কিছু কমেছে নাকি?

এপিসোড – ৫ ।।

এটাও খুব পুরনো এপিসোড। কিন্তু আজও খুব ঘনঘন রিপিট টেলিকাস্ট হয়।

বুলুদি -র খুব ধুমধাম করে বিয়ে হল। আমরা সবাই খুব আনন্দ করে নেমন্তন্ন খেয়ে এলাম । বুলুদিদের দেশপ্রিয় পার্কের কাছে বিশাল বাড়ি। বুলুদি- র বাবা সি ই এস সি তে খুব উঁচু পোস্টের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। বুলুদি-র দাদাও একই কম্পানিতে ভালো পোস্টে চাকরি করে।
ওমা !! মাসছয়েক পরে শুনি— বুলুদি পাকাপাকিভাবে বাপের বাড়ি চলে এসেছে। জামাই বুলুদিকে পছন্দ করে না। শাশুড়ি বুলুদিকে দু চোক্ষে দেখতে পারে না। কেন? কেন আবার? বুলুদি-র গায়ের রঙ যে কালো। মুখশ্রী যতই দুর্গাপ্রতিমার মতো ঢলঢলে হোক না কেন, কালো বউকে ও বাড়ির কারোরই পছন্দ নয়।
বুলুদি-র বর শৈবালদা আই আই টি – কানপুরের প্রাক্তনী। বছরখানেকের মধ্যেই অ্যামেরিকা চলে যাবে। বুলুদি- র শাশুড়ি ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি- র ইতিহাসে এম এ। তাতে কি হয়েছে? ইতিহাস ধুয়ে কি শাশুড়ি জল খাবেন? মেয়ে কালো, কালো, কালো। এটাই তার যথেষ্ট অপরাধ।
তাহলে বিয়ের সময় খাট-পালঙ্ক, বাসন-কোষন, গয়না-গাঁটি নিলেন কেন?
আমরা নিতাম নাকি? মেয়ের বাবা মা-ই তো আমাদের অত জোরাজুরি করলেন।

বুলুদি আজ বহুবছর মেন্টাল পেশেন্ট। নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টেরা আজও কলকাতার, পশ্চিমবাংলার শতশত বুলুদিদের সারিয়ে তুলতে পারেন নি।
আচ্ছা, বুলুদিদের স্বামীদের, শাশুড়িদের একবার চিকিৎসা করালে হয় না?

মহা এপিসোড

“ব্ল্যাক লাইভস্ ম্যাটার” বলে একটা আন্দোলনের নাম অ্যামেরিকায় ইদানীং খুব শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। এটা নাকি ওই দেশের বহু পুরনো আন্দোলন।
আবার, তার বিপরীতে “অল লাইভস্ ম্যাটার” বলে একটা আন্দোলনও অ্যামেরিকা – ইউরোপে অনেকদিন ধরেই আছে। কেউ কেউ বলেন, অল লাইভস্ ম্যাটার আন্দোলনটা একটা হোয়াক্স। শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে কালো মানুষদের বহুবছরের আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতেই নাকি এই প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনের জন্ম।

আমরা ভারতবাসী। অতশত বুঝি না। অল লাইভস্ আবার কি? সব মানুষকেই পাত্তা দিতে হবে নাকি? ও বাবা, তাহলে দেশ চালাব কি করে? রাষ্ট্র চলবে কি দিয়ে? দেশের মানুষকে শত শত টুকরোয় যদি আলাদা আলাদা করে না রাখি, তাহলে সমাজ ধর্ম সব যে রসাতলে যাবে।
হুঁ হুঁ বাবা, ভারতবর্ষের সভ্যতা কত প্রাচীন জানো? ভারতবর্ষের সভ্যতা যত হাজার বছরের পুরনো, ভারতবর্ষের অ-সভ্যতাও ঠিক তত হাজার বছরেরই পুরনো।

তাই তো মঙ্গলগ্রহে মহাকাশযান পাঠানোর পাশাপাশি এই ২০২০ সালেও প্রাচীন অ-সভ্যতাগুলোকেও আমরা পুরনো আলমারি ঘেঁটে, পুরনো পুঁথিপত্র ছিঁড়েখুঁড়ে টেনে টেনে বার করে আনছি। বার করছি, আর ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছি গুজরাটে, মহারাষ্ট্রে, কর্ণাটকে, পশ্চিমবঙ্গে— সুমহান ভারতবর্ষের প্রতিটি কোণায় কোণায়। ভারতমাতা কি জয় বল্ শালা, নইলে পেঁদিয়ে অযোধ্যা দেখিয়ে দেব।

কি বললেন দাদা? ডঃ অমর্ত্য সেন তাঁর “পরিচিতি ও হিংসা (আইডেন্টিটি অ্যাণ্ড ভায়োলেন্স)” বইতে মানুষে মানুষে বিভেদ করতে বারণ করেছেন? যেমন বারণ করে গেছেন চণ্ডীদাস থেকে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী? ধ্যুর, ছাড়ুন তো মশাই, ওসব পুরনো কাসুন্দি। আর , তাছাড়া কে অমর্ত্য সেন? ফুঃ! নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তো কি হয়েছে? সারা পৃথিবী তাঁকে সম্মান করে বলে আমাদেরও তাঁকে মাথায় নিয়ে নাচতে হবে নাকি? আমরা রামভক্ত হনুমান। আমাদের বুদ্ধিশুদ্ধির লেভেল বোঝার ক্ষমতা অমর্ত্য সেনবাবু-র আছে?

অতএব আমরা মানুষে মানুষে হিন্দু -মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, ব্রাহ্মণ-নমঃশূদ্র-চণ্ডাল- দলিত, মেয়েলোক-পুরুষলোক, মেয়েলোক – হিজড়ে, ফর্সা- কালো সবরকমের তফাৎ করতেই থাকব, করতেই থাকব, করতেই থাকব— যতদিন না দেশে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়।

কি বললেন? আসল তফাৎ ওইসব রামা কৈবর্ত- হাসিম শেখ আর আম্বানি – আদানিদের মধ্যে ? ধ্যুর মশাই, ছাড়ুন তো ওসব জ্ঞানের কথা, তত্ত্বের কথা, বইয়ের কথা? মশাই লাল পাট্টি মনে হচ্ছে? বড়লোকেরা ছোটলোকেদের কান্না- ঘাম-রক্ত বেচা পয়সায় বড়লোক হয়েছে তো কি হয়েছে? গো-মাতার অভিশাপে এমন তো হবেই। তাছাড়া, যতদিন আমরা আমাদের ভাগেরটা পেয়ে যাব, ততদিন এ নিয়ে বলার কি আছে? ছাড়ুন, ছাড়ুন। যতসব আঁতেলের দল। যান, যান, জাতীয় গণতান্ত্রিক, না জনগণতান্ত্রিক, না নয়া গণতান্ত্রিক— তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল, ওইসব আঁতেল কূটকচালিতে মেতে থাকুন গে।

আপনারা আগে নিজেদের মধ্যে বিভেদ মেটান, তারপর আমাদের জ্ঞান দিতে আসবেন। বুদ্ধিজীবীর ঝাড় সব। দেব শালা পেটে ত্রিশূল ঢুকিয়ে, তখন বুঝতে পারবি, ভারতমাতার কি মহিমা।

আমরা এখন গো-মাতার দুধ থেকে সোনা বার করতে ব্যস্ত আছি। এই সুবর্ণ সময়ে বিভেদ-ফিভেদ নিয়ে ভ্যাজর ভ্যাজর করে আমাদের ডিস্টার্ব করবেন না। যান্।

THE END

অন্ধকার দেশের এককোণায় দাঁড়িয়ে এই গোটা সিরিয়ালের দর্শক ছেলেটি আজও অপমানিত বোধ করে। নীরবে চোখের জল ফেলে, আর আপন মনে গুনগুন করে, প্রায় দুশো বছর আগে লেখা একটি আধুনিক গান—

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
মানুষ ছাড়া, ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।”

[লেখক – প্রাবন্ধিক, আলোচক এবং চিত্রনাট্যকার।]

Facebook Comments

Leave a Reply