বিবর্তনের ধারায় মুখোশ নৃত্য : মৌ মুখার্জী

টোটেমকে কেন্দ্র করেই বিবিধ বিধি-আচার বিধি-নিষেধ ও অনুষ্ঠান যা পরবর্তী কালে ধর্মেরই রূপ নেয় বলে মনে করা যায়। যতদিন পর্যন্ত মানুষ টোটেম ভুক্ত ছিল ততদিন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে কোনো প্রভেদ ছিল না, মানুষ তখন পূজা-অর্চনাও করতে শেখেনি এবং মানুষ দেবতা ও ধর্ম বলেও কিছু জানতো না। কিন্তু যে সময় থেকে নিজস্ব টোটেম ভুক্ত দলের মধ্যে যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হল, তখন থেকে ভিন্ন টোটেমে বিবাহের রীতি প্রচলিত হতে শুরু হয়, যা গোষ্ঠী থেকে জাতি এবং তা থেকে সমাজের বা বৃহত্তর সমাজের প্রতিষ্ঠা ঘটালো; অর্থাৎ, টোটেম সংক্রান্ত ট্যাবুর কারণে কৌম বা গোষ্ঠী সমাজ ক্রমেই বড় হতে হতে জাতিতে পরিণত হল। একই সঙ্গে এই সময় গোষ্ঠী গুলি গোষ্ঠীর দলনেতার নামে পরিচিতি লাভ করতে থাকলো এবং এক গোষ্ঠী আর এক গোষ্ঠীকে পরাজিত করতে থাকলো, আর ক্রমে ক্রমে কোনো গোষ্ঠী হয়ে উঠলো চরম শক্তিশালী। অর্থাৎ, কোনো এক টোটেম চিহ্ন অন্য চিহ্নদের পরাজিত করে হয়ে উঠলো প্রধান বা প্রভু। এরপর পরাজিত গোষ্ঠী পরিণত হল দাসে। অর্থাৎ, তৎকালীন সমাজ থেকেই তৈরি হল দাস প্রথার। অন্যদিকে এই জয়ী দল নেতা ক্রমে ক্রমে দেবতা বলে চিহ্নিত হতে থাকলো। একই সাথে টোটেম চিহ্নটিও দেবতার মর্যাদা লাভ করে চললো, আর পূজিত হল। অর্থাৎ, বহু দেবতাবাদও টোটেম প্রথা থেকেই এসেছে বলে মনে করা যায়। এছাড়া, মানুষ ও পশুর মিলিত মূর্তিকেও দেবতা জ্ঞানে পূজা করা হত৷ এর পরবর্তী যুগে মানবদেহী দেবতা ও পশুদেহী বাহনের সৃষ্টি হতে দেখা গেলো। আবার, কখনো কখনো বিশেষ কোনো পশু, পাখি বা গাছ-পালাকেও দেবতার হিসেবে দেখা হত। অর্থাৎ-এর থেকেই বলাযায় যে টোটেম ও মান্যা থেকেই দেবতার উত্তরণ ঘটল। এক একটি দেবতা কোনো না কোনো এক গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হল, আবার গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজেও ধর্মের প্রকাশ ঘটল। অন্য ভাবে বলাযায় ক্রমে ক্রমেই পূর্বের মান্যা ও টোটেম বিশ্বাসই পরিবর্তিত হল ধর্ম বিশ্বাসে। এরপর ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হল দেবতা, স্বর্গ, পাপ, পূণ্য, পরলোক ভাবনা ইত্যাদি। তবে টোটেম এবং দেবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। দেবতাকে মানুষ তার মনবাসনা জানায় এবং তিনি তাদের মনস্কামনা পূরণ করেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু, টোটেম হল কোনো দলের প্রতীক চিহ্ন যা মানুষের পূর্ব-পুরুষ। অর্থাৎ, টোটেম ও মানুষ দুজনেই এক। টোটেম দলভুক্ত থাকা কালীন মানুষরা সকলে ছিল সমান, এদের মধ্যে বড়লোক-গরীব বা রাজা-প্রজার মধ্যে কোনো প্রভেদ ছিল না। এই দলে অবশ্যই একজন প্রধান বা দলনেতা থাকতো। যার দলের প্রতি দায়িত্বও ছিল অনেক, তবে তা প্রভুত্ব স্থাপন করত না, টোটেম দলের সব শক্তিই দলভুক্ত সকলের মধ্যেই সমান ছিল। এরপর শক্তিশালী কোনো টোটেম্ দল যখন অন্যান্য টোটেম দল বা গোষ্ঠীকে ক্রমাগত পরাজিত করতে থাকলো তখন বিজয়ী দলের শক্তি ধীরে ধীরে একজন মানুষের কাছেই জমা হতে থাকলো এবং এই ভাবেই আদিম টোটেম্ ব্যবস্থা ভেঙে গেলো এবং তার পরিবর্তে জন্ম নিল রাজা। এই রাজা হল দেবতারই সন্তান বা দেবতারই প্রতিনিধি। সেই সময় বড়লোক এবং গরিব লোকের তফাৎ প্রকট ভাবে দেখা দিল, আবার দেখা দিল রাজায় ও প্রজায় তফাৎ। তখনই মানুষের মনে দেবতা – পূজা – পাঠ ইত্যাদির বিশ্বাস জন্মাল।
এই বিষয়ে আরও বলা যায় যে জাদুগরের জাদুবিদ্যা জাদুগরকে দিনে দিনে করে তুলেছিল সুবিধাভোগী। এই সময়ই মানুষের মধ্যে তৈরি হল পাপ পূণ্য বোধ। মানুষ দেবতাকে প্রার্থণার দ্বারা সন্তুষ্ট করতে চাইলো, সাথে চাইলো দয়া, আশীর্বাদ ইত্যাদি। ধর্মীয় প্রতিনিধিরা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকলো এবং পুরোহিতরা হয়ে উঠল সমাজ ব্যবস্থার সর্বময় কর্তা। পুরোহিত চালিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ম তৎকালীন সমাজ সংস্কৃতিকে গ্রাস করলো। এই সময়ই সমাজ ব্যবস্থার শ্রেণী বিভাজন ও চোখে পড়ে। জাদু ও ধর্ম বহু যুগ ধরে অবিচ্ছিন্ন ও অপরিহার্য ভাবে মানবজীবনের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সাহায্য দান করে ছিল। তবে জাদু ও ধর্মের মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক থাকলেও এদের মধ্যে পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়। জাদুর সাহায্যে কোনো শক্তিকে অনুনয় বিনয় করে তুষ্ট করা হয়না, এর মধ্যে থাকে এক দৃঢ় কার্য-কারণ সম্পর্ক বা বাধ্যতা মূলক মতবাদ (Method of compulsion)। অন্যদিকে মানুষের প্রাত্যহিক সমাজ ব্যবস্থায় ঘটে যাওয়া কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে, অনুনয় বিনয় করে তার থেকে রেহাই পাওয়া থেকেই ধর্মের সৃষ্টি। প্রাচীন মানব জাতি এই জাদু ও ধর্মের সাহায্যেই তাদের সকল কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করত। আদিম কালে তাই জাদুগর পুরোহিতের ভূমিকা পালন করতো এবং জাদু ও ধর্ম ক্রমশ একই সঙ্গে মিলেমিশেও গিয়েছিল। অথবা বলাযায়, জাদু ও ধর্মীয় ভাবনা সমাজে একই সাথে সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলেছিল। উদাহরণ স্বরূপ বলাযায় বৈদিকযুগে ঋগ্বেদে মান্যার মত এক রহস্যময় শক্তির উল্লেখ বার বার করা হয়েছে, যাকে ব্রাহ্মণ নামে বলা হয়েছে। বৈদিকমন্ত্র উচ্চারণকে জাদুশক্তি বা ‘ব্রাহ্মণ’ নামে বলা হয়েছে, আবার কখনো এক অলৌকিক বৈদ্যুতিক শক্তি, কখনও ধর্মচেতনাকারীর মনও বলা হয়েছে; অর্থাৎ ব্রহ্মকে যে লাভ করেছে সেই ব্রাহ্মণ। তিনি একাধারে পুরোহিত আবার জাদুকরও; এবং তার উচ্চারিত বৈদিকমন্ত্রের মধ্যেই জাদুশক্তি নিহিত থাকে বলে মনে করা হত। পৃথিবীর সকল প্রাচীন ধর্মেই জাদুর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু পরবর্তী কালে জাদু আর ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রইলো না।
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে আবার বলাযায় যে – জাদু ও ধর্ম এই দুটিই মান্যা থেকে সৃষ্টি হয়ে মানব সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ অর্থাৎ, নৃত্য, গীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য এই সব। এই সবই ব্যবহারিক জীবনের প্রয়োজনে উপস্থাপিত হত এবং এর থেকেই জাদু বিশ্বাস ও ধর্ম বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ রূপে সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপকেও দেখতে পাই। এরই একটি অংশে অর্থাৎ নৃত্যের মধ্যে আলচ্য বিষয় মুখোশের ব্যবহার বিশেষ ভাবে রয়ে গেলো। তবে পরবর্তী কালে অনেক অংশেই মুখোশের ব্যবহারিক মূল্যের পরিবর্তন ঘটলেও কোনো কোনো জনজাতির ক্ষেত্রে মুখোশের মূল্য এখনও বিশেষ ভাবে লক্ষ করা যায়। আবার, ধর্মের সঙ্গে আচার কেন্দ্রিক বা ধর্মীয় আচার কেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের যোগ বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়, আবার এই সকল অনুষ্ঠানে অনেক সময়েই মুখোশের ব্যবহারও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে লক্ষ করা যায়, যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বৌদ্ধ ধর্মের মুখোশ নৃত্য ছামের ব্যাপারে।
ভারতবর্ষের ইতিহাসেও মানব জাতির বিবর্তন ও বিকাশের সূচনা পর্বের ধারাটিও ছিল এই একই রকম। প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানব জাতির আগমন ঘটেছে, যারা বর্তমানের আধুনিক ভারতবাসীদের পূর্বপুরুষ ছিল। সেই মানব জাতির বিবিধ মিশ্রণ ও স্তরীকরণের ফলশুতি স্বরূপ ভারতীয় ভূখন্ডে অবস্থিত মানব জাতিকে বিভিন্নতাও দান করেছে। তবে ভারতে মানব জাতির বিবর্তন ও বিকাশের সূচনা হল নব্য প্রস্তর (Neolithic Period) যুগে। ভারতে নব্যপ্রস্তর যুগের চিহ্ন মেলে কাশ্মীর, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, মহীশূর, অন্ধপ্রদেশ, ওড়িশা, আসাম, ছোটনাগপুর অঞ্চল সহ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাকুড়া, মেদিনীপুর, বর্ধমান, দার্জিলিং ও নদীয়া জেলায়। এই সময় মানব সমাজের সামাজিক জীবনযাত্রায় এলো বিবিষ যুগান্তকারী পরিবর্তন। শুরু হল নিম্ন-প্রস্তর যুগ বা নব্যপ্রস্তর (Neolithic Period) যুগের কাল। এই যুগ ভারতের ভূখন্ডে অনেক দিন স্থায়ী ছিল। নব্য প্রস্তর (Neolithic Period) যুগের পূর্ববর্তী সময় মানুষ পুরোপুরিভাবে শিকার ও সংগ্রহের মধ্যে তার জীবন অতিবাহিত করে। তবে নব্য প্রস্তর যুগ (Neolithic Period) থেকে মানব জাতির শিকার কেন্দ্রিক জীবন ধারায় এলো আমূল পরিবর্তন। এই নব-প্রস্তর যুগ থেকেই মানুষ স্থায়ী ভাবে কোথাও কোথাও অবস্থান শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ যাযাবর থাকলেও পশুর সংখ্যা শিকারের জন্যে ক্রমশ কমে যাওয়ার কারনে তারা আর আগের মত পশু শিকার করত না এবং খাদ্যের অন্বেষণের জন্য ঘন ঘন বাসস্থান পরিবর্তনও করত না। এই সময় এদের মধ্যে পশুপালনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেলো, আর মানুষ তখনই শিখেছিল বন্য পশুকে গৃহপালিত করার কৌশল, এদের মধ্যে কিছু কিছু জনজাতি কৃষিকাজেও বিশেষ অগ্রগতি করে, তাই এই মানুষেরা আর খাদ্য অন্বেষণ করে না, এরা এখন কিছু কিছু খাদ্য উৎপাদন করে। আবার কৃষিকাজ ও পশু পালনের সুবিধার জন্য এই সময় মানুষকে কখনো কখনো তার বাসস্থান পরিবর্তন করতে হত উন্নত ও উর্বর কৃষি জমির খোঁজে। অর্থাৎ এদের জীবন ধারণের প্রধান রসদ হল কৃষিকাজ ও পশুপালন; এবং কিছু ক্ষেত্রে মাছ ও পশুপাখি শিকার। আবার লক্ষ করা যায় যে এই সময় কালেই বিভিন্ন টোটেম দল একটি আরেকটির সঙ্গে মিশে গড়ে তুলতে থাকে আরো বড় এক জাতিতে, যারা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলে ছিল তাদের সভ্যতা ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রাকে, এরা নদীর উর্বরতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের সমাজকে গড়ে তুললো এক কৃষিভিত্তিক নদী মাতৃক নগর সভ্যতায়। চাষাবাদের দ্বারা আরা শসা উৎপাদন পদ্ধতি, পাথর ও পোড়ামাটির দ্বারা পাত্র তৈরি করার পদ্ধতি, পোষাক বোনার পদ্ধতি ইত্যাদিও তারা শিখেছিল। এই সকল কারণেই যাযাবর জীবন থেকে মানুষ উন্নীত হল এক স্থায়ী নগরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে। পশ্চিমবঙ্গের নিম্ন-প্রস্তর বা নব্য প্রস্তর (Neolithic Period) যুগের মানব জাতির সভ্যতার ধারাও আমরা পাই। পশ্চিমবঙ্গের বহু স্থান ও গ্রামে নদ-নদী কেন্দ্রিক উপত্যকা বা তীরে নব্য প্রস্তর যুগের মানব জাতির দ্বারা ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যায়। এর মধ্যে কৃষি সামগ্রীরও চিহ্ন পাওয়া যায় যেমন – তামার কুঠার ও পোড়া চাল ইত্যাদি। অর্থাৎ, এরা কৃষিকাজ ও তামার ব্যবহার জানতো। এই বিষয় গুলি থেকেই বলাযায় যে মানব সভ্যতার বিবর্তনের পথ ধরেই এসে ছিল সামাজিক জীবন বিন্যাসের স্তর, যা গুহা মানবের স্তর থেকে প্রাচীন মানব স্তরে এবং প্রাচীন মানব স্তর থেকে উপজাতি মানব স্তরে, আবার উপজাতি মানব স্তর থেকে গ্রামীণ বা লোক মানব স্তরে ও সর্ব শেষে লোক স্তর থেকে আধুনিক নাগরিক স্তরে উপনীত হয়।
পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের মত একই ভাবে আমাদের ভারতবর্ষেও গড়ে ওঠে উর্বর পলি যুক্ত নদী কেন্দ্রিক নগরসভ্যতার। এই নগর সভ্যতা সিন্ধু নদীকে কেন্দ্র করেই কেবল গড়ে উঠে ছিল তা নয়, ভারতের প্রায় সব জায়গাতেই নদীকে কেন্দ্রকরে নদী কেন্দ্রিক সভ্যতা প্রসারের প্রমান পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার কংসাবতী নদীর তীরে এবং দামোদর ও সুবর্ণরেখা নদী তীরে, পশ্চিম বর্ধমান জেলার দামোদর নদীর তীরে, পূর্ব বর্ধমান জেলার অজয় নদীর তীরে, বাঁকুড়া জেলার গন্ধেশ্বরী নদীর তীরে, বীরভূম জেলার কোপাই-এর তীরেও এই রকম মানব সভ্যতার প্রমান পাওয়া যায়। এই মানুষেরা নদীর তীরে বা কখনো কখনো পাহাড়ে গুহামানববাসী হয়ে বাস করত, তবে আগেই বলা হয়েছে যে এরা হয়তো সম্পূর্ণরূপে যাযাবর ছিল না; এবং এরা দলবদ্ধ ভাবে জীবনযাপন করত। এরা ঐন্দ্রজালিক বা জাদু বিশ্বাস করত, যা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় প্রকৃতিকে শান্ত করার জন্যে বা অন্য কোনো সামাজিক বিশ্বাসের কারণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে ছিল। তবে কৃষি কেন্দ্রিক মানব সমাজের ক্ষেত্রে কৃষির সাফল্যের জন্য ও ভূমির উর্বরতা-শক্তি বৃদ্ধি করার প্রক্রিয়া হিসেবেই ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার প্রয়োগ কৃষি ক্ষেত্রে করত। এই সময় থেকেই বছরের প্রথম ফসল তোলার উৎসব অর্থাৎ ‘নবান্ন’ উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে মনেকরা হয়, যা আজও বাঙলার সংস্কৃতিতে বিদ্যমান এবং এই উৎসবকে কেন্দ্র্র করে আজও সারা বাঙলায় মুখোশ নৃত্যের উপস্হাপনা লক্ষ করা যায়। প্রাচীন কালেই এই উৎসবকে কেন্দ্র্র করে ভূমির উর্বরতা-শক্তি বৃদ্ধি ও কৃষি কাজে সাফল্যের জন্য লিঙ্গপূজা ও ভূমি পূজার সূচনা হয়। যা পরবর্তী কালে শিব-শক্তি পূজা ও তন্ত্রসাধনার উদ্ভবের কারন হয়েছিল বলে ধারনা করা হয়।
আদিম মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারা থেকে শুরু করে পরবর্তী ধর্মীয় কালের সূচনা পর্বে ও তার পরবর্তী সময়েও নৃত্য কেবল ধর্মীয় ও কিছু সামাজিক বিষয়ের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ, প্রাচীন যুগে নৃত্য মোটামুটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল, সামাজিক ও ধর্মীয়। মানব জাতির সমাজ জীবন ও ধর্মকে জুড়ে ছিল এই নৃত্য, যা বর্তমানেও সংস্কৃতির প্রধান একটি ধারা হিসেবে প্রযোজ্য। এই সকল প্রকার নৃত্যের প্রতিফলন আজও আমরা পৃথিবীর বিবিধ নৃত্য শৈলীর মধ্যে দেখতে পাই এবং সামাজিক জীবন ধারার প্রায় সকল স্তরই নৃত্যের দ্বারা প্রকাশিত হয়। যার ফলে আদিম নৃত্য ধারাকে ক্রমশ আদিবাসী নৃত্যে, আদিবাসী নৃত্য থেকে লোকনৃত্যে, লোকনৃত্য থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যে ও শাস্ত্রীয় নৃত্য থেকে বর্তমানের আধুনিক ভাববস্তুর রূপায়িত নৃত্যের ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এই প্রত্যেকটি ভাগেরও বিবিধ নৃত্য শৈলী বর্তমান। আবার নৃত্য শৈলীর এই প্রকারভেদ পৃথিবীর সকল দেশের নৃত্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এই আলোচনার মুখোশ নৃত্য তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখোশ নৃত্যের বিষয়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাই আলোচনা সাপেক্ষে এই স্থানের আদিবাসী নৃত্য ও লোকনৃত্যের বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হল। কারন ভারতীয় নৃত্য ধারাকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয় আদিবাসী নৃত্য, লোকনৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ও বর্তমানের আধুনিক ভাববস্তু রূপায়িত নৃত্যে। এই চার ভাগের প্রথম দুই ভাগেই কেবল মুখোশ নৃত্যের প্রচলন লক্ষ্ করা যায়। অর্থাৎ, আদিবাসী ও লোকনৃত্য পর্যায়ে। কোনো ভূখণ্ডের আদি বসবাসকারী মানুষ তথা বংশধরদেরই আদিবাসী বোঝায়। আবার অন্যদিকে লোক অর্থে আমরা বুঝি একটি জনশ্রেণি বা জনগন, অথবা জাতি সমূহকে। গ্রাম বা নগরসংঘ অর্থেও গণ শব্দের ব্যবহার হয়ে থাকে। একই ভাবে নৃত্য বলতে আমরা বুঝি ছন্দোবদ্ধ দেহের অঙ্গ-ভঙ্গিকে। এই উভয়ের মিলিত রূপই হল – আদিবাসী নৃত্য ও লোকনৃত্য। আদিবাসী নৃত্য প্রধানত সুপ্রাচীন কালের মানব জাতির সামাজিক জীবনযাত্রা, ধর্মবিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতিকেই চিহ্নিত করে। একই ভাবে লোকনৃত্যও কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসকারী মানব জীবনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাতিগত ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবিকে উপস্থাপন করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবন বিভিন্ন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী কালে এসে লোক জীবনে অন্তর্ভুক্তি ঘটে, এবং তার ফলে লোকনৃত্যের প্রসার ঘটে, যা লোকনৃত্যকে আরো সমৃদ্ধশালী করে তোলে। কিন্তু আদিবাসী সমাজের নৃত্যে বহুকাল ধরে অন্য কোনো বহির জগতের সাংস্কৃতিক উপকরণের প্রবেশ না ঘটায় তা ধিরে ধিরে বৈচিত্র্যহীন হয়ে গেছে। আদিবাসী থেকে লোক সংস্কৃতির এই রূপ পরিবর্তন পৃথিবীর সকল দেশের নৃত্যের ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়। একই ভাবে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের লোকনৃত্য তার ব্যতিক্রম নয়। মুখোশের দ্বারা অনুষ্ঠিত নৃত্যকেও আবার বিভিন্ন কারণ বশত বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। এই প্রকারভেদ গুলো হল – যুদ্ধ নৃত্য, আচার নৃত্য, ধর্মীয় নৃত্য, প্রমোদ নৃত্য অথবা লোকনাট্যের নৃত্য পর্যায় সমূহ। অর্থাৎ, এই বিষয় সমূহকে কেন্দ্র করেই পশ্চিমবঙ্গে মুখোশ নৃত্যের ব্যবহার হয়ে থাকে।

[ক্রমশ]

[লেখক – কুচিপুড়ি নৃত্যশিল্পী। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোশনৃত্য নিয়ে গবেষণারত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক সময়ের অধ্যাপিকা।]

Facebook Comments

Leave a Reply