জীবনের নাম সাদা-কালো : পৌলবী সরকার গুপ্ত

fail

১.

আজ বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। সোনাঝুরি গাছ বেয়ে এখনও ঝরে পড়ছে কয়েক পাপড়ি সোনালী রঙ। পশ্চিম পাড়ের নারকেল গাছটার মাথায় এখনও একই ভাবে কালো হয়ে আছে আকাশটা, ঠিক যেমন সেই দিনটায় ছিল…. বাবা চলে গেছিল চিরদিনের জন্য। চোখের সামনে ব্যথাতুর স্মৃতি ভীড় করে আসে অতুলের।

উত্তরমুখী রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গোবিন্দভোগ চালের ভাতের গন্ধ। আজ সোমবার। মায়ের স্বপাক নিরামিষাশী দিন। মনে পড়ে রান্নাঘরে মায়ের একটা মিটসেফ ছিল। সেটায় মা সরিয়ে রাখতো নিজের বারব্রত, উপবাসের সামগ্রী। সাবু, আলাদা করা চাল, ডাল, নুন, তেল। সকলের আমিষ রান্না সেরে মা রান্নাঘর সাফ করে নিজের রান্না চাপাত। রাখিকে কখনও নিজে রেঁধে খেতে হয়নি। চাকুরিরতা বউমা। হাতের সামনে জল, টিফিন, রোজের কাচা, ইস্ত্রি করা পোশাক সবই সাজিয়ে রাখতো মা। রাতুল হওয়ার সময়ে তো মা, রাখির পায়ে, পেটে তেল মালিশ থেকে শুরু করে, সময়ে সময়ে খেতে দেওয়া, কিছুই কমতি রাখেনি। তবুও… একদিনের জন্যও রাখি শাশুড়িমাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারেনি। ভাব বাচ্যেই কথা বলে গেছে নয়, কাকিমা বলে ডেকেছে। আসলে, রাখি আর অতুল স্কুল বেলারই বন্ধু। ইলেভেন, টুয়েল্ভ একসাথে, সায়েন্স।তাই, বিয়ের অনেক আগে থেকেই মা দেখে নিয়েছিল তার হবু বউমাকে। তখন থেকেই কাকিমা বলতো রাখি।অপলক দৃষ্টিতে প্রথমবার দেখেছিল মা, যেদিন বলেছিলাম, “মা, এই দেখো তোমার বউমা, পছন্দ তো?”
মায়ের চোখের পাতা পড়েনি সেদিন। রাখির সোনালী রূপের আভায় মায়ের মনও ভেসে গেছিল। সেদিনই মা তাকে বলে ছিল “তুই তো আমার মেয়ে রে। বউমা হ’বি কেন? প্রথম দিনই ‘তুই’ বললাম, কিছু মনে করিসনা যেন।”
রাখির মুখে তার চাকরি করার ইচ্ছার কথা শুনে আরও খুশি হয়ে মা বলেছিল, “নিশ্চয়ই চাকরি করবি। বাবা মা এত কষ্ট করে, এতদূর পড়াশোনা করিয়েছেন, বাড়ি বসে থাকবি কেন? আমি কী তোকে সারাদিন রান্নাঘরের হাঁড়ি ঠেলতে বলবো নাকি?”
সেদিন কী সরল একটা হাসি ছিল রাখির মুখে চোখে! কিন্তু সেই মেয়ে হঠাৎ করে এতটা বদলে গেল যে, বলতে পারলো, ” আমি সব বুঝি অতুল। আসলে তোমার মা শুধুই টাকা বোঝেন। আমি পড়াশোনায় ভালো,হাই কোয়ালিফিকেশন, তোমার মা বুঝেই গেছিল আমার চাকরি পাওয়াটা কোনও ব্যপারই নয়। তাই আমাকে হাতছাড়া করতে চাননি, আর এখনও এত মোটা টাকা হাতে পান,তাই আমায় এত তেল মারেন।”

এত বড় কথা…. এত বড় একটা কথা বলে দিল! আমার তো হাত উঠতে উঠতেও আটকে গেল কারণ এই পাথরে মোড়া অট্টালিকা যখন মাটির গ্রাম্য বাড়ি ছিল, গোবর নিকনো উঠোনে বসে মা’ই আমাকে শেখাতো, মায়েদের মূল্য, মেয়েদের মূল্য, তাদের সম্মান দেওয়ার কথা, কাউকে দোষারোপ না করে তার কথার পিছনে আসল কারণ খোঁজার কথা।
শহুরে, চাকরি করা, স্বাধীনচেতা মেয়ে রাখির এমন গ্রাম্য, কুসংস্কারী শাশুড়িকে পোষাবে কেন? বিয়ে করে যেদিন রাখিকে ঘরে আনি, মা বলেছিল, ” এটা তোর বাড়ি। তোর সংসার। তুই তোর মতো করে সাজিয়ে নিস”… কিন্তু সংসার সে কতটা করল জানিনা তবে, সাজানোটা ভালো মতোই করতে শুরু করেছিল।
প্রথমেই এলো ওয়াশিং মেশিন, যেটা ছোটঘরে রাখার জায়গা নেই বলে ব্যাকডেটেড শাশুড়ির মিটসেফটাকে বের করে দেওয়া হল। মা আবার রোজের ছোঁয়াছুঁয়ি রান্নার জিনিসে বারব্রত করতে পারতোনা। ভয় পেত, পাছে তার রাতু’র অমঙ্গল হয়! তাই সেদিনের পর থেকে মায়ের বারব্রতর দিনগুলো প্রায় উপোসীই কাটতো।ফল, জল, সরবৎ বা সাবু। এই ছিল আহার।
এরপর আধুনিক সোফা সেটের জায়গা না থাকায় বাবার পুরনো আলমারীটাও বের করে দেওয়া হয়। সে আলমারীতে থাকে থাকে সাজানো ছিল বাবার প্রিয় জামা কাপড়গুলো। আর ছিল একটা ছোট টিনের বাক্স, যেটাতে মা নিজের শৈশব ভরে রেখেছিল। আস্তে আস্তে সব কিছুই রিপ্লেস হতে থাকে নতুন আসবাবের ভীড়ে।

এভাবেই একটা একটা জিনিস ঘর থেকে বের করতে করতে রাখি একদিন মায়ের সবচেয়ে আদরের জিনিসটাকেই বের করে নিলো। রাতুল।

সে তো, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে। ওসব ভালো স্কুল এরকম ধ্যাদ্ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে কী করে থাকবে? ওসব পেতে গেলে কলকাতায় থাকতে হয়। আর তাছাড়া গ্রাম্য, অন্ধ বিশ্বাসী একজন ঠাকুমা কীই বা শেখাবেন নাতিকে! যদি শেখানও সবই তো ভুলভাল শেখাবেন।তাই, রিস্ক কমাতে কলকাতায় ফ্ল্যাট নেওয়া।
একে একে সে ঘরে নতুন কেনা আসবাব গুলোও বেরিয়ে গেল, কিন্তু তার বদলে পুরনো স্মৃতি জড়ানো মায়ের আসবাব গুলো তো আর ফিরলো না। একটা বড় শূন্যতাই শুধু থাবা গেড়ে বসে রইল সে বাড়ি জুড়ে।
– রাখি, এসব কী শুনছি?
– কী?
– তুমি নতুন ফ্ল্যাট কিনেছ কলকাতায়?
– হুম!
-আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
– দেখো, সামনের ডিসেম্বরেতেই রাতুলকে নতুন স্কুলে অ্যাডমিট করাতে হবে। আর আমার অফিসের চাপও খুব বেড়ে গেছে। তুমি প্লিজ একটু বোঝো সোনা! রাতুলের ভবিষ্যত তো আমাদেরই ঠিক করে গুছিয়ে দিতে হবে।
– মা কে বলেছ?
– না, তুমিই বলো।
– আমি কেন বলবো? তুমি ডিসিশন নেওয়ার আগে যখন আমাকে জানাওনি তখন, আমি কেন?
– ওকে, ইট’স ফাইন। তোমার মাকে আমিই জানিয়ে দেবো। ভেবেছিলাম তুমি ছেলে হিসাবে বলবে, আফটার অল রাতুর বেটার ভবিষ্যতের জন্য তো বাবা হিসাবে এটুকু ভাবা বা করাটা তোমারই কর্তব্য!

সেদিন মনে হয়েছিল, সত্যিই কী আমি বাবা হতে পারিনি? নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কি কিছুই ভাবিনি? সামনের ওই নারকেল গাছটার নীচ থেকে বেরিয়ে থাকা শিকড়গুলো দেখিয়ে বাবা শিখিয়েছিলেন একদিন, মাতৃভাষা আমাদের শিকড়। যেদিন শিকড় ছিঁড়ে যায় গাছটাও কিন্তু উপড়ে যায় মাটি থেকে। কিন্তু আমি কখনও আমার ছেলেকে এই শিক্ষা দিতে পারবো না বোধহয়! মনে পড়ে যায়, জানলায় চড়াই পাখি দেখে রাতুল বলে উঠেছিল, দেখো পাপা “বার্ড”, বাহারি পাতার গাছ দেখে বলেছিল, ” লিফ তো গ্রীন হয় পাপা, এগুলো একরকম রেড,ইয়েলো কেন?” অবাক হয়ে তাকিয়ে ভেবেছিলাম মাতৃস্তন্যদুগ্ধের মতোই মাতৃস্তন্য সম মাতৃভাষা থেকেও বঞ্চিত আমার সন্তান!

আমার সন্তান ভবিষ্যত প্রজন্মের থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে পড়বে বলে আমিও গড়-পরতা বাপেদের মতোই ভেবেছি।ওকে ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করার কথা, শহুরে জীবন দেওয়ার কথা, মায়ের মতো স্বাধীনচেতা হওয়ার কথা। অন্ধবিশ্বাস নয়, যুক্তি নিয়ে বাঁচার।কিন্তু আমি কি ঠিক? আমি তো মাটি থেকে নিজেই নিজের শেকড় উপড়ে নিয়েছি। রাখির ব্যয়বহুল জীবন, ছেলের স্কুলের মোটা অ্যাডমিশন তথা টিউশন ফিজ, ফ্ল্যাটের লোন এসবের পর হাতে প্রায় কিছুই থাকেনা তাই নিজের মায়ের পাতটাই মেরে এসেছি এতগুলো দিন ধরে। হ্যাঁ, মায়ের হাত খরচ দেওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছি।

গ্রামের এক স্কুল শিক্ষিকা ভাড়া থাকেন এখন শুনেছি। ছেলেকে স্কুল থেকে আনা, তার ড্রয়িং স্কুল, সুইমিং ক্লাস, টেবিল টেনিস ক্লাব, ঘরের টিউটর সব টাইম মতো মেইনটেইন করতে করতে,আমি নিজের মায়ের কাছে যাওয়ার সময়টুকু পাইনা। রাখির আই টি সেকটরে চাকরি। আমি সামান্য স্কুল শিক্ষক। নির্ধারিত সময় বাদে আমার হাতে অফুরান সময় নিজের ছেলেকে যুগপোযোগী মানুষ করার জন্য।
আমি তো তাকে শেখাতে পারিনা, গাছ হয়ে ওঠা! শেখাতে পারিনা, শিকড়ের মতো মাটি আঁকড়ে থাকা। শেখাতে পারিনা, ঠাকুমার ঝুলি পড়া, পুকুরের জলে ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙাচি ব্যাঙাচি খেলা, কালবৈশাখীতে কাঁচা আম কুড়ানো, বর্ষার জলে কগজের নৌকায় কিভাবে শৈশব ভাসাতে হয়, শেখাতে পারিনি।এসব এখন কেউ শেখায়না। শেখাতে নেইও বোধহয়।

রান্নাঘর লাগোয়া পুকুরপাড় দেখা যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে একছুটে চলে যাই মায়ের কাছে। তবু, কী যেন একটা বাধ সাধছে বুকের ভেতর।

বার্ধক্যের ভারে নুয়ে গেছে মা। যেন আরও একটু বেশিই মনে হচ্ছে । হাতে বেশ কিছু বাসন। পুকুর ঘাটে আস্তে করে নামতে গেল যেই, পিছন থেকে ছুটে এলো এক কৃষ্ণকায় তরুণী। অত্যন্ত সাধারণ,দীর্ঘ ও ছিপিছিপে গড়ন। কিন্তু চোখদুটো যেন সেই পুকুরের থেকেও গভীর আর ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বল।

মায়ের বাসনগুলো সে হাত থেকে নামিয়ে আসতে আসতে মায়ের হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়। একটু পরেই নিজে এসে পুকুরে সেই বাসন মাজতে শুরু করে।
-কই, কখনও রাখি তো এভাবে ছুটে আসেনি? আর রাখিকে দোষ দিয়ে কী হবে? আমি নিজে কী করেছি, এতগুলো বছর।
চোখের কোণগুলো চিকচিক করে ওঠে অতুলের। ঠিক তখনই মোবাইলের রিংটোনটা সম্বিৎ ফেরায়।
রাখির ফোন।
– হ্যালো। কোথায় আছো তুমি?
আমার একটা আর্জেন্ট মিটিং পড়ে যাওয়ায় আমি আজ আর রাতুকে আনতে যেতে পারবোনা। প্লিজ তুমি ওকে টিউশন থেকে আটটায় পিক করে নিও।
– কিন্তু আজ তো রোব….
কথা শেষ করার আগেই ওপারের কথা ফুরিয়ে যায়।হাত ঘড়িটার দিকে নজর যায় অতুলের। প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে। এতটা রাস্তা ড্রাইভ করে ফিরতে সাড়ে ছ’টা তো বাজবেই। মাঝে মাঝে জ্যাম হয় ভীষণ। আর দেরি করা চলে না। বাড়ির রাস্তা পিছনে ফেলে এগিয়ে চলে অতুল।

২.

সিলিং ফ্যানে ভালো করে ওড়নাটা বেঁধে চেয়ারে উঠে গলার কাছে ফাঁসটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে ময়ূরী। শান্ত, ক্লাম্ত, অবসন্ন। এই সময় বোধহয় চোখে জলও আসেনা। এত কান্নার শেষ বোধহয় এরপর। এত অপমান, এত যন্ত্রণা এমন একটা অপরাধে যেখানে, অপরাধী নিজে কোনও অপরাধ করেনি।
গায়ের কালো রঙ যখন জন্মদাতা ও দাত্রী মেনে নিতে পারেনা, বোঝা মনে করে, তখন সে জীবন রাখার কোনও মূল্য নেই। এই নিয়ে সাতটা ছেলে, পাত্রী দেখার নাম করে দিন মজুর বাপের পয়সা ধ্বংস করে যাচ্ছে, আমার জন্য। কেবল মাত্র আমার জন্য।
মাথা গলিয়ে ফাঁসটা ঢুকিয়ে ফেলে ময়ূরী।

হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়া শুরু হয়…
– দিদি, এই দিদি, কী করছিস? দরজা খোল।
মনটাকেও শক্ত করে ফাঁস লাগায় ময়ূরী। এবার শুধু পায়ের নীচের চেয়ারটা সরালেই হবে।
– দিদিরে, বাবা কেমন করছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।
বাবার নাম শুনে থমকে যায় ময়ূরী।
– দিদি… এই দিদি… শুনতে পাচ্ছিস না?বাবা ছটফট করছে বুকের যন্ত্রণায়।
এবার হুঁশ ফেরে ময়ূরীর। গলার ফাঁস আলগা করে কিছুক্ষণের জন্য ধপ করে বসে পড়ে চেয়ারে।
-বাবা!
বাবা যে তার সবচেয়ে প্রিয়জন এবাড়িতে। কালো শীর্ণ মেয়েটা, জ্ঞান হওয়া ইস্তক ঠাকুমার রোষের শিকার। বাবা’ই লড়েছে বারবার। পাড়ার বাকি মেয়েদের একে একে ভালো বাড়িতে বিয়ে হওয়া নিয়ে যতবার ভেঙে পড়েছে মা, বাবা’ই বলেছে, “এ মেয়ে সাধারণ মেয়ে নয় গো! ও আমাদের ছেলের চেয়েও বেশি।” হ্যাঁ, বাবা’ই শিখিয়েছে জাল বোনা, মাছ ধরা, লাঠি খেলা, ভ্যান টানা, টোটো চালানো। সকালে টোটো চালানো আর রাত জেগে জাল বোনা। কত কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে সেলাই মেশিনও কিনে দিয়েছে বাবা। শিখিয়েছে সেলাই। মা -ঠাকুমার সাথে চড়া গলায় ঝগড়া করে কলেজে পাঠিয়েছে পড়তে। আর সেই বাবা’ই আজ হেরে গেল, যখন বলে উঠল, “মুমু তোর গায়ের রংটা যদি টিনার মতো হতো…..” আর পারেনি সেই যন্ত্রণা সামাল দিতে।
কিন্তু এ কী শুনছে সে? বাবা…..
-দরজায় খটখটানী থেমে গেছে। বাইরে ইতস্তত মা আর বোনের গলার আওয়াজ।

দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো ময়ূরী।
– দিদি! বাবার কী হচ্ছে দেখ!

বাবার মুখটা একদিকে বেঁকে যাচ্ছে। অঘ্রাণের হালকা শীতেও ঘামে ভিজে গেছে জামা। বুকের বাঁদিক খামচে ধরে, ফ্যাকাশে হয়ে আসছে বাবার মুখ।
বুঝতে দেরি হলনা মুমুর।

দ্রুত ছুটে এসে মাকে বলে,
– কান্না থামাও মা। বাবাকে উঠিয়ে বসাও।
বালিশে ঠেসান দিয়ে ধীরে ধীরে উঠিয়ে বসায় মুমু। আলগা করতে থাকে তার জামা কাপড়। হাঁটু কিছুটা ভাঁজ করে সেখানে রাখে পাশ বালিশ।

– টিনা, ওষুধের কৌটোটা তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়।

কৌটো হাতড়ে বের করে ফেলে অ্যাসপিরিন। বাবার মুখে ভরে হালকা ভাবে চিবোতে বলে।
– মা, কিছু টাকা পয়সা নিয়ে রেডি হও। বেরতে হবে। এখুনি হসপিটাল যেতে হবে।
– হসপিটাল! কী করে যাবি?
পাশের বাড়ির শুকুদাও তো একমাসের জন্য বাইরে গেছে কাজে। এ পাড়ায় তো বাকি সবাই হয় বয়স্ক নাহয় তোর বাবার মুখের চোপায় আর এ বাড়ির দিকে ফিরেও চায়না।
– আহ! মা, এসব কথা বলে কী হবে? চলো তাড়াতাড়ি।

মুমু, মানে ময়ূরী, বর্তমানে ফিজিওলজি অনার্সে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট হওয়ায় পড়াশোনার খরচ তার স্কলারশিপেই চলে। আর দু-চারটে টিউশনি। কিন্তু প্র্যাক্টিকাল, প্রাইভেট টিউটরের খরচ আর চলছিল না। বাবার ইদানিং শরীর মাঝে মাঝেই খারাপ হওয়ায় বাবার জাল বুননের কাজেও সে হাত লাগিয়েছিল। পড়াশোনা আর টানতে পারা যাচ্ছিল না। তাই বিয়ের জোগাড় যন্ত্র। ভালো চাকরি পাওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন মুমুর ছোট্টবেলা থেকেই। বাবা যখন সারাদিন পর ক্লান্ত হয়ে ওর কোলে শুতো, মুমু বলে উঠতো, “বাবা, বড় হয়ে আমি চাকরি করবো। তখন তোমায় আর মাকে এত কষ্ট করতে হবেনা দেখো।” কিন্তু হায়! বাস্তব আর স্বপ্নের ফারাকটা বোধহয় অনেকটা বেশি।
মা চিন্তিত স্বরে আবার বলে ওঠে,
-হসপিটাল পাঁচ মাইল রাস্তা! এত রাতে কীভাবে যাবি? শুকুদা থাকলে না হয়…
– আহ! কথা বাড়িও না। উঠোনের কোণের আলো জ্বালো। আর টিনা, তুই বাবাকে আস্তে আস্তে তুলতে আমায় হেল্প কর।
– দাঁড়া, টোটোটা দরজার কাছে আনি, সুবিধা হবে।
– দিদি!
-হ্যাঁ আর দেরি করা সম্ভব নয়।নে, তুই আর মা বাবাকে নিয়ে সাবধানে বোস।
-তুই টোটো চালানো কবে শিখলি?
-শিখেছি। বাবা’ই শিখিয়েছে। এসব কথা পরে হবে ক্ষণ।

রাতের অন্ধকার চিরে বেরিয়ে যাওয়া টোটোর হেডলাইটের আলো। প্রত্যম্ত গ্রামের এক সাধারণ কালো মেয়ে। কালো রাতের মতোই কালো। সব গ্লানি, সব কষ্ট মুছে গেছে সেই কালো আঁধারের বুকে। দ্রুত, আরও দ্রুত ছুটতে হবে।সময়েরও আগে। বাবার জন্য। শুধু, বাবার জন্য।

পরের দিন ভোরের আলো নিয়ে এলো নতুন সকাল। ওটির বাইরে অপেক্ষারত তিনজন।

-পেশেন্ট ইজ সেফ।
ডাক্তারবাবু মায়ের দিকে চেয়ে বললেন, ” আপনি সৌভাগ্যবতী তাই, এমন এক মেয়ের জন্ম দিয়েছেন। ক’টা ছেলে এতটা তৎপর হয়ে এতকিছু সামাল দিতে পারতো, আমার জানা নেই।ও না থাকলে আপনার স্বামীকে ফিরে পেতেন না আজ।”

মা গুমরে ওঠে কান্নায়। বুকে জাপটে ধরে বলেন, “মুমু, তুই পড়।যেভাবেই হোক আমি তোকে পড়াবো। আর বিয়ের কথা তুলবো না।”

৩.

বর্ষার মেঘ মাখা সকালে, আমি, আমার রাতু আর লং ড্রাইভ। গাড়িতে হালকা সুরে বাজছে জন ডেনভার
“কান্ট্রি রোডস, টেক মি হোম…
টু দ্য প্লেস,আই বিলং…”

ঘরের সামনে পৌঁছোতেই ইলিশ ভাপার গন্ধটা নাকে এলো।
-আহা! কতদিন মায়ের হাতের ইলিশ ভাপা খাওয়া হয়না।
গাড়ি থেকে নেমেই ছোট্ট রাতুল, “ঠামু…. ঠামু…” বলে ছুটে যায় পুকুর পাড় বেয়ে। মায়ের আজ বিবাহ বার্ষিকীর পঞ্চাশ বছর। বাবা মারা যাওয়ার পরেও প্রতি বছর মা এই দিনটায় বাবার প্রিয় রান্নাগুলো নিজে হাতে করে বানায়। গ্রামের দরিদ্র শিশুদের খাওয়ায়। যথারীতি, রাখির এসব পয়সা নষ্ট করার ফুলিশ ইমোশন বলে মনে হয়।

গতবার রাতুলের টিউশন কামাই হবে বলে আসতে দেয়নি রাখি। রিকোয়েস্ট করাতে বলেছিল, “আমি নাকি ভালো বাবা হতেই পারবো না কখনো। ছেলের ভালো নাকি আমি মন থেকে কখনোই চাইনা।”
এবারেও বাধ সেধেছিল। সুইমিং ক্লাসের জন্য। নিজেও আসবে না। ল্যাপটপ নিয়ে সারাদিন খুটখাট করে কাটিয়ে দেবে তবুও। আজ বেরনোর আগে শুধু একবার বলে বেরিয়ে এসেছি রাতুলকে নিয়ে।
আমি নিজে ওর চেয়ে কম বেতনের চাকরি করি, সব সময় ওর কথা চিন্তা করি। ইগো নামক বিশেষ বিষাক্ত বস্তুটাকে আমাদের মাঝে দানা বাঁধতে দিইনি কোনও দিনই। তবুও, মানুষ বোধহয় ভালোমানুষীকে দুর্বলতা ভেবে ফেলে।

হয়তো আমি ভালো বাবা নই, তাই চার দেওয়ালে আটকে রেখে, বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা ছেলেকে দেখতে না পেরে খোলা আকাশ দেখাতে নিয়ে যাই। অঙ্ক কষতে কষতে মাথা ধরে এলে একসাথে গিটার নিয়ে বসি। ইঁট কাঠের শহরে তো আর সবুজ ছায়া ঘেরা দীঘি আর ঠাম্মুর আদর নেই, তাই তার অতি প্রয়োজনীয় সুইমিং ক্লাস ফেলে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে চলে এসেছি। মাঝে মাঝে এসব না করলে কি আর ” বাজে বাবা”র তকমাটা ঠিকঠাক প্রযোজ্য হয়? মনে মনেই হেসে ওঠে অতুল। লজ্জা দ্বিধা ভুলে “মা….” বলে হাঁক পাড়ে।

দরজার গোড়ায় ছলছল চোখে মা দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট রাতুল তখন গ্রামের তথাকথিত ” অশিক্ষিত, নোংরা” বাচ্চাদের সাথে খেলায় মত্ত। রাতুলের এত আনন্দোচ্ছল হাসি এর আগে কবে দেখেছিলাম ভুলে গেছি।

হাত ধরে মা নিয়ে গেল রান্না ঘরে।
– আমি জানতাম, তুই আসবি বাবু। দেখ আমি তোর জন্য জলপাইয়ের আচার বানিয়ে রেখেছি। তবে আজকের সব রান্না কিন্তু আমার হাতের নয়। কিছু কিছু নতুন দিদিমণিরও বানানো।
নতুন দিদিমণির নাম নিতে গিয়ে দেখলাম মায়ের চোখ আলোয় ভরে গেল।
-ময়ূরী…. ময়ূরী মা, দেখে যা, কে এসেছে!

সদ্য স্নান সেরে আসা সেই মেয়ে। এলো চুল কোমর ছাপানো। উজ্জ্বল চোখের আভায় সারা ঘর আলো করছে যেন। কালো মুখে সেই চোখ আর হাসি যেন আরও বেশি দীপ্ত। মা কালীর স্নিগ্ধ মূর্তি বোধহয় এমনিই হয়!

আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি তাকে। লজ্জাহীন, ভাবনাহীন এক সমর্পিত পুরুষ মানুষ হিসাবে। মা বলে চলল তার জীবন গাথা…
– ময়ূরী বড় গুণী মেয়ে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই বোধহয় সে পারে। বড় গরীব ঘরের মেয়ে। বাবার অসুস্থতার পর, টোটো চালিয়ে একসময় সংসার চালিয়েছে, পড়াশোনা করেছে। নিজের চেষ্টায় সরকারী চাকরি পেয়েছে।সেই টাকায় এখন বোনকে পড়াচ্ছে।এ গ্রামের কত দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের বিনা পয়সায় সরকারী চাকরির টিউশনি করায়।কিন্তু, চাকরিটা একটু দূরে হয়েছে এই যা। তা, ভালোই হয়েছে। ওই এখন আমার মেয়ে…. আমার ছেলে।

শেষ কথাটুকু বলেই থমকে যান আশালতা দেবী। চোখ নেমে যায় মাটির দিকে। ছেলে-বউ-নাতি চলে যাওয়ার পর নিয়তির এক অদৃশ্য খেলায় ময়ূরীর সাথে দেখা। সে যেমন তার পরিবারকে আগলায় তেমনই এই সর্বহারা বৃদ্ধাকেও।

ওদিকে, নিজের এত প্রশংসার কথা শুনে মুখ লুকিয়ে চলে যায় ময়ূরী বাচ্চাদের খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করতে।

অতুল দু’পা এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের সামনে। পায়ে হাত রেখে বলে ওঠে, “ক্ষমা করে দাও মা। আমি তোমার যোগ্য সন্তান হতে পারিনি। তবে কথা দিচ্ছি যোগ্য এক বাবা হয়ে দেখাবো।”

আশালতা দেবী বুকে টেনে নেন এতদিন কাছে না পাওয়া ছেলেকে। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে অতুলের চোখ চলে যায় ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া উঠোনে।
সারি বেঁধে বসে থাকা শিশুদের দল আর তাদের মাঝে রাতুল। গরম ভাতের গন্ধ মিশে যাচ্ছে তাদের হাসিতে। শ্যামা মা আজ অন্নপূর্ণা সেজে, পরম তৃপ্তিতে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। বাবার ছবিতে ঝোলানো নেই রজনীর মালা। দুপাশে ফুলদানিতেই সাজানো। সেই গন্ধে আরও ঘোর লেগে আসছে অতুলের। ভালোলাগার ঘোর। নতুন করে মাথা তুলে বাঁচার এক নেশা লাগা ঘোর।

Facebook Comments

1 thought on “জীবনের নাম সাদা-কালো : পৌলবী সরকার গুপ্ত Leave a comment

  1. জীবনের নাম সাদা কালো গল্পটা ভীষণ ভালো লাগলো ! এই গল্পে সাদা কালো ছাপিয়ে রামধনু খুঁজে পাওয়া যায় ।

Leave a Reply