অপরজীবন : সবাই, আত্ম এবং অপর – প্রবুদ্ধ ঘোষ

fail

ভারতবর্ষের প্রান্তভাগে যে সকল অসভ্য বন্যজাতীয় লোক থাকে, ব্রাহ্মণেরা তাহাদিগের মধ্যে গিয়া বাস করিতেছে, এবং ক্রমে ক্রমে তাহাদিগকে শান্ত, ত্যাগী এবং নম্র স্বভাব করিয়া তুলিতেছে। একটী উদাহরণ দিতেছি। ভারত সাম্রাজ্যের উত্তর-পূর্ব্ব প্রান্ত সীমায় আসাম নামে একটী প্রদেশ আছে। সেই প্রদেশে প্রকৃত ভারতবর্ষীয় ভিন্ন অপর কতকগুলি বন্য জাতীয় লোক বাস করে, তাহাদিগের নাম মিকি, আবর, গারো, নাগা, মিস্‌মি প্রভৃতি। আমি ঐ প্রদেশে গমন করিয়া দেখি, ঐ সকল জাতীয়দিগের মধ্যে ব্রাহ্মণেরা পর্ণকুটীর নির্ম্মাণ করিয়া আছেন, এবং নিরন্তর অকৃত্রিম ব্যবহার দ্বারা তাহাদিগের বিলক্ষণ প্রীতিভাজন হইতেছেন। (ভূদেব মুখোপাধ্যায়, স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস, ১৮৭৫ থেকে প্রকাশিত)

ভূদেব মুখোপাধ্যায় বাংলার নবজাগরণ যুগের অন্যতম নাবিক। বাঙালির রুচি-আদর্শ-মূল্যবোধ-ভদ্রসভ্যতা তৈরি করার জন্যে যে ক’টি উচ্চবর্গীয় সাহিত্যিক মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছিলেন, ভূদেব তাঁদেরই অগ্রগণ্য। বাঙালির এক ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্ব ছিল ঊনিশ শতকের বৃহদংশ জুড়ে- দেশীয় নাকি বিলাতি, রক্ষণশীল নাকি আধুনিক, চণ্ডীমণ্ডপীয় সমাজ নাকি ভিক্টোরিয়ান মর‍্যালিটি এবং দেশি নৈতিকতা-মূল্যবোধ নাকি যুক্তি-প্রতিযুক্তির ইউরোপীয় তাত্ত্বিকতা? বঙ্কিমচন্দ্র থেকে মধুসূদন থেকে বিদ্যাসাগর বা ঈশ্বর গুপ্ত এই দ্বন্দ্বকালীন জল মাপতে মাপতে ‘নবজাগরিত বাঙ্গালি’কে নির্মাণ করেছেন; বলা ভাল, ‘অধঃপতিত’ ‘অবোধ’ উপনিবেশিতদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। ভূদেবই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেন, ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’। ভূদেব বঙ্কিমচন্দ্রের মতোই শাস্ত্রীয় আচার, ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পাখিপড়া ক’রে বোঝাতে চান স্বজাতিকে আর, তৈরি ক’রে দেন ‘অপর’-এর ধারণা। ওই যারা ‘অসভ্য বন্যজাতীয়’, ওই যারা ‘প্রকৃত ভারতবর্ষীয়’ নয়- তারাই তো আদর্শ অপর। তাদের উদ্ধার করে কে? পতিতোদ্ধারী বামুনরা! শিক্ষা দিয়ে, শাস্ত্র দিয়ে- যে কথা উহ্য রাখেন ভূদেব, তা হল, দমনমূলক আধিপত্য দিয়ে, দখলদারি দিয়ে। ‘আত্ম’রা গিয়ে ‘অপর’দের জমি দখল ক’রে নেয়, সংস্কৃতিকে হো-হো ঠাট্টায় উড়িয়ে দেয়। ‘প্রকৃত ভারতবর্ষীয়’ মাপকাঠিতে আঁটেন না যাঁরা, তাঁদের জন্যে কোন ভারতবর্ষ পড়ে থাকে তবে? ওই ‘অপর’দের ভারতবর্ষ কি আজও সেই ভানুমতীর প্রশ্নের মধ্যেই রয়ে গেছে? তবু, ‘বিলক্ষণ প্রীতিভাজন হইতেছেন’- এটুকু শান্তির জল না ছেটালে পাঠক তৃপ্ত হয় না, কারণ, পাঠককেও ‘আত্ম’-র অবয়বে গড়েপিটে নেন লেখক। এভাবেই সাহিত্যের স্বস্ত্যয়নধারা চলতে থাকে।
যে যুক্তি তৈরি হয়ে যায়- ওরা অসভ্য, তাই ওদের সভ্য করা দরকার; ওরা অশিক্ষিত, তাই ওদের শিক্ষার প্রয়োজন; ওরা কালো, তাই ওরা আদিম বর্বর; ওরা মেয়ে, তাই পুরুষদের সমক্ষমতা কখনোই পাবে না; ওরা সংখ্যালঘু, ওদের মতামতের কোনওই দাম নেই; আর, নেশন গড়ে ওঠে রাষ্ট্র নির্মাণ হয় আলো-ভাল-সভ্য-পুরুষ-আধুনিক দিয়ে, অতএব যাদের ‘ওরা’ বলে ছাপ্পা মেরে দেওয়া গেল তারা ব্রাত্য। এই সবই চালিয়ে দেওয়া হয় স্বাভাবিকতার নামে, এমনটাই রীতি হলে শোষণতন্ত্র মজবুত হয় আরও। নারীরা দুর্বল, কালোরা খারাপ, ইহুদীরা অকর্ম্মণ্য, আদিবাসীরা বর্বর, ভারতে মোল্লারা করোনা ছড়ায়- সংস্কৃতি সাহিত্য গণমাধ্যম এই বয়ানগুলোই বিভিন্ন মোড়কে আমাদের মাথায় বিশ্বাসের গজাল মেরে গেঁথে দেয়। ওই সেটগুলোর একটার সঙ্গেও আমার-আপনার সেটের এলিমেন্টগুলো না মিললেই ‘ওরা’ তৈরি হয়ে যায়! তারপর অপর-জীবন কতটকু মূল্যবান? জর্জ ফ্লয়েডের ঠিকরে-বেরোনো চোখ, প্রতিদিন অপমানে নিভে যাওয়া পায়েল তদ্‌ভির মুখ, হাসপাতালের বেডে শিকলবন্দি ভারাভারা রাওয়ের পেচ্ছাপে-ভাসা শরীর, জামলো মাড়কামের মৃত শরীর…

#

দেরিতে হাজির হবার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কোনো এক গৃহভৃত্য তাঁর বাবুকে বলেছিলেন- “আজ্ঞে, ভোজন করছিলাম!” আর যায় কোথা! বাবু চোখ পাকিয়ে বললেন- “তোর আস্পর্ধা তো কম নয়! তুই ব্যাটা ভোজন করবি কি রে? ভোজন করি আমরা, ভদ্রলোকেরা, আর তোরা তো গিলিস্‌ কেবল গোগ্রাসে!” (সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, সরস্বতীর ইতর সন্তান, ২০১২)

অপরায়নের বাঙ্গালিয়ানা, ঊনিশ শতকে। ভদ্দরলোকেরা আমরা-ওরা ক’রে নিল। সাহিত্যের ভাষা থেকে দেশীয় উপাদান ক্রমে বাদ যেতে লাগল, লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলো ‘ছোটলোকের সংস্কৃতি’ হয়ে গেল, ফারসি-আরবি থেকে সংস্কৃতায়িত হয়ে উঠল প্রকাশভাষা এবং হিন্দু-জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থানই হয়ে উঠল বাঙালির আত্মপরিচয়! এর বৈপরীত্যে যা কিছু তা-ই অপর। অপরায়নের রাজনীতিতে শাসকশ্রেণির মতাদর্শ দখল করে নেয় শাসিতের চেতনা, এক শাসিত অন্য শাসিতকে অপর, ইতর মনে করে, ভেঙে ভেঙে যায়। নির্মাণ হয় ‘বাবু’! এ একদিকে ব্যঙ্গ-অভিধা, উড়নচণ্ডী উচ্ছৃঙ্খল বখাটে; অন্যদিকে বগলের লোমের মতো পুষে রাখা সযত্ন অভ্যাস। গন্ধ হোক, তবু ছাঁটা যাবে না। রয়ে যায় সাহিত্য জুড়ে বাস্তব জুড়ে রাজনীতি জুড়ে কেন্দ্রাতিগে। সাহিত্যের আত্ম এরাই, এদের দোলাচলে আবর্তিত কাহিনী। রাজনীতিতেও; একের পর এক ব্লান্ডারাস সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনওদিনও সমাজের নাড়ি বুঝতে না পেরেও সব সিদ্ধান্ত এরাই নিয়েছে ও নেয়। নেতৃত্ব ক্ষমতা শাসন বিক্ষোভ- সবেতে এরাই আলোকিত মুখ, আমাদের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিরতিসুখে এরাই আমরা, আমরাই ‘আত্ম’। কুলীন পদবী, প্রতিষ্ঠিত পদবীর গ্রাম্ভারি ‘আত্ম’প্রতিষ্ঠা। আর, বাকিরা অপর। কারা? যাদের নাড়ির গতি আয়ত্ত্বে আনতে পারেনি বাবুরা, যাদের নামে বিল কাটা হয়েছে বিক্ষোভের অথচ যাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছে মিছিলের শেষে, যাদের কেন্দ্র থেকে ক্যামেরার সামনে থেকে সরিয়ে সরিয়ে উদ্দেশ্য-লক্ষ্য সব গুলিয়ে দিয়ে জড়দ্‌গব শান্তি-স্বস্তি বাচন শোনানো হয়েছে এবং এই বাবুদের দিকে তর্জনী তুলেছে বলে যাদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে- এরাই অপর। এদের জীবন ঢালুতে গড়িয়ে দেওয়া সহজ, বসাই টুডুকে মাটির ভাঁড়ে চা দিয়ে সামন্তর কাঁচের গ্লাসে চা খাওয়া স্বাভাবিক, রাধিয়া ধর্ষিতা হলেও তাকে ‘অ-ভারতীয় নারীসুলভ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া সহজ, তমিজের তেভাগার আকাঙ্খাকে নবগঠিত ধর্ম-রাষ্ট্রের তলায় কচলে দেওয়া রীতি- ওরা অপরায়নের বলি। অপরায়ন ছাড়া আত্ম-র নির্মাণ মসৃণ হয়না। চুনী কোটালকে এই সিস্টেম বারবার তার জাতিপরিচয়ে পিষতে থাকে- তাকে অপর বানাতে পারলেই সিস্টেমের শ্লাঘা-তৃপ্তির উদ্‌গার।
কোনও শাসক সংশয়ান্বিত গণতন্ত্রের দোদুল্যমান কাঠামোয় নির্বাচন জিতে সদম্ভে ‘আমরা-ওরা’, ‘আমরা ২৩৫, ওরা ৩০’ ঘোষণা ক’রে দেয়, ‘আমরা বিজয়ী ওরা বিজিত’। মেজরিটি কণ্ঠরোধ করে মাইনরিটির, জনতোষী নীতি চাপিয়ে দেয় গণসংহারের লক্ষ্যে। ‘অপর’ স্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় সমস্ত বিরোধী স্বর। ক্রমশঃ হেমন্তের বিকেলের মতো গণতন্ত্র মিলিয়ে যায়, আকাশপ্রদীপের ঢঙে নিদ্রাহীন শাসক। দমনমূলক আধিপত্য চেপে বসে আরও; ‘আদার লাইভস ডোন্ট ম্যাটার এনিমোর’, অপরদের জীবন আরও অন্ধকারে ঠেলে দিলেই শাসকের ‘আত্ম’ নিশ্চিন্ত হয়। বরফের মতো শীত গণতন্ত্রকে ডুবিয়ে দেয়, মরা মাছ যেভাবে খদ্দেরের দিকে চেয়ে থাকে। আত্ম-অপরের এই বিরোধাভাসে কত কাটামুণ্ডু, রক্তঝরা, ইউএপিএ, জেল, সিজার লিস্ট ঢুকে যায়। জেলের ভেতরে শহীদ হন ‘পিপলস্‌ মার্চ’ পত্রিকার সম্পাদক, জেল-হাসপাতালে শিকলে বাঁধা তেলুগু কবি, ২০১১-র নভেম্বরে বুড়িশোলের জঙ্গলে বুলেটে ঝাঁঝরা ক’রে দেওয়া হয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাকে, ২০১০-র জুলাইতে বাঁশের খুঁটোয় হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় সিধো সরেন, মালতী বাস্কের সবাক লাশ- আপাততঃ ওদের সবাইকে ‘অপর’ বলে দ্রোহী বলে দাগিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র মুখহীন নিরাবয়ব, তার রঙ সবুজ-লাল-গেরুয়া সবই হতে পারে। রাষ্ট্র নাগরিকদেরও গ্রাস করে ‘আত্ম’-র সংজ্ঞায় ঢুকিয়ে নিতে চায়। অর্থনীতি-সংস্কৃতি-ধর্ম-সাহিত্য-বিজ্ঞান রাষ্ট্রের পেতে রাখা বহু ফাঁদে অজান্তে আমরাও ঢুকে পড়ি; আমাদের ন্যাকা অবচেতন ‘কিন্তু, যদি, তবু’ আওড়াতে আওড়াতে ঢুকে পড়ে বাঁধা ফর্মুলায়। তখন আমরাই রাষ্ট্রের চোখ-কান, আমাদের দিয়েই বাকিদের অপর বানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে দেয় রাষ্ট্র। হ্যাঁ, গণতন্ত্রের মুখোশেই। আত্ম-অপরের দ্বন্দ্বে সমস্ত বিকল্প-পরিসর মুছে ফেলতে চায় রাষ্ট্র। ধীরে ধীরে সেই অপরের পরিসরে ঢুকে যায় অ-হিন্দু, অ-হিন্দিভাষী, না-রাষ্ট্রপ্রেমী, না-মাথানত প্রত্যেকে। আসলে, অপরের জীবন যতই তুচ্ছ হোক রাষ্ট্রের কাছে, তবু শাসক জানে যে, অপরের প্রত্যাখ্যান আছে। ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে ফেটে পড়া ‘না’ আছে। আপাততঃ ভারতরাষ্ট্র সেই ‘না’-কে মাওবাদী বলছে, নকশাল বলছে, কমিউনিস্ট বলছে, অবাধ্য বলছে, সিডিশন দিচ্ছে কিন্তু ‘জো-হুজুর’ বলিয়ে নিতে পারছে না!

#

The Orient is not only adjacent to Europe; it is also the place of Europe’s greatest and richest and oldest colonies, the source of its civilizations and languages, its cultural contestant, and one of its deepest and most recurring images of the Other. In addition, the Orient has helped to define Europe (or the West) as its contrasting image, idea, personality, experience. Yet none of this is merely imaginative. The Orient is an integral part of European material civilization and culture. (Edward Said, Orientalism, 1978)

সাঈদ প্রাচ্যতত্ত্বের রাজনীতি মোড়কহীন করছেন। প্রাচ্যের অপর ছাড়া ইউরোপের আত্ম নির্মিতই হতো না! কোথায় পেত রসদ, কোথায় পেত বৌদ্ধিক পুঁজি, শ্রমযোগান, কোথায় পেত ইতিহাস-সংস্কৃতি খুঁড়ে তোলা রহ্‌স্টফ? এই ইতিহাস কয়েক শতক আগের, এই বর্তমান ভবিষ্যতের দিকেও গড়ায়। উপনিবেশিত ছাড়া ঔপনিবেশিকের বাইনারি প্রতিষ্ঠা পায়? প্রাচ্যের প্রতিটি প্রতিষ্ঠা ধ্বংস ক’রে তবে গড়ে ওঠে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ। বাইনারি- ০ আর ১, বাইনারি- আমরা আর ওরা।
যা আমি নই, তাই অপর। যা আমার সঙ্গে মেলে না, তাকেই অন্য করে দেওয়া যায়। যা কিছু বিরোধাভাস দেয়, সেই সব আলাদা। যা আমার শ্রমাভ্যাসে মেলে না, যা আমার সমাজনিয়ন্ত্রিত মেধাতালিকায় ঠাঁই পায় না, সেই সব জীবন কোনও গুরুত্ব রাখে না। তাদের কখনও পরিযায়ী শব্দে ডাকি। মেধাতালিকায় আমার বন্ধু আত্ম-র অংশ, সে প্রবাসী। অথচ, বহুদূর হেঁটে হেঁটে ঘরের কাছের হাইওয়েতে মরে যাওয়া জরিশ্রমিক অপর। শব্দের রাজনীতি নীরব কিন্তু ঘাতক। শব্দের রাজনীতি কালোকে ঘৃণার্হ করে, নারীকে দুর্বল করে, মূলবাসীদের ধ্বংস করে এবং সংখ্যালঘুকে লজ্জাবনত করে। আত্মকে বলীয়ান ক’রে অপরকে অবমানব করে। প্রবাসে বিপন্ন অতিস্বচ্ছল বিত্তবানেদের তড়িঘড়ি ফেরানো হয় ঘরে অথচ প্রবাসে বিপন্ন জামলো মাড়কাম ১৫০ কিলোমিটার হেঁটে মারা যায় ঘরে ফেরে না। আন্তঃরাজ্য উদাসীন শাসনে ঘরমুখো শ্রমিকেরা ট্রেনের চাকায় ছিঁড়েখুঁড়ে যান। আমাদেরই তো নির্বাচিত রাষ্ট্রনায়ক, আমাদেরই নির্মাণ করা রাষ্ট্র; তবু, কেন উদাসীন? কারণ, জামলো মাড়কামদের ‘অপর’ বানিয়ে দেওয়া গেছে স্বচ্ছন্দে- তাদের দিকে বিস্কুট ছুঁড়ে দেওয়া গেছে- তাদের কনও ওয়র্ক-ফ্রম-হোমের নিশ্চিন্তি দেওয়া হয়নি- তাদের ব্যবহার করা ফুরোলে খালি স্যানিটাইজার-বটলের মতো ফেলে দেওয়া গেছে, হাত ধুয়ে নিচ্ছে রাষ্ট্র। ‘অপর’-দের কোনও নিরাপত্তা, নিশ্চিন্তি, মৌলিক অধিকার জায়েজ নয়। আত্ম-অপরের দ্বন্দ্বে আমাদেরও কি ঝোঁক থাকে না শাসকমতাদর্শ-নিয়ন্ত্রিত আত্মর অংশ হয়ে যাওয়ার প্রতি? সেই সব সেটের সাবসেট হয়ে ঢুকে পড়ার অনুশীলনে ‘অপর’ সেটের এলিমেন্টগুলোকে নির্দিষ্ট ক’রে চিহ্নিত করি আমরাই, তাই না?
আমরা ওই ‘আত্ম’-র অংশ হয়ে উঠতে চাই প্রত্যেকেই, উত্তরণ চাই। শাসক-মতাদর্শ যে আত্মকে নির্মাণ করে, আমরা সেই আত্মকেই আত্তীকরণ করতে চাই। শাসকের বাঁধা গতে শ্লীল হতে চাই, সভ্য হতে চাই। নিরাপদ হতে চাই। শাসকের অনুশাসনে প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতামুখের এঁটো চেটে নিতে চাই, কারণ যেভাবে হোক নিজেদের শাসিত ‘অপর’ পরিচয় ঝেড়ে ফেলতে চাই। ‘আদার লাইভস্‌ নেভার ম্যাটার’ জেনে গিয়ে অপর পরিচয়টুকুর খোলস ছিঁড়ে ফেলতে চাই। অপরায়নের মধ্যে অপমান আছে, হেরে যাওয়া আছে, বাধ্যতঃ নতজানু হওয়া আছে, চিৎকার করতে করতে বোবা হয়ে যাওয়ার অসহায়তা আছে। কিন্তু, ওই প্রত্যাখানও কি নেই? ‘না’ সগর্বে সঘোষে বলে ওঠার প্রত্যয়টকু কি নেই?

#

What wrong have I done? Don’t we cut our nails? Don’t we cut our hair to suit our taste? Similarly, I altered my body a bit. Where’s the crime in that?
-That sounds reasonable, but they threw you out. That’s the point. Reasoning is one thing, reality is another. (Super Deluxe, Tamil thriller, 2019)

আত্ম-র ইতিহাস থাকে, অপর-এর কল্পনা আর গল্প। আত্ম-র বাস্তব হয়, অপর-এর সাজানো ঘটনা। আত্ম পোস্ট-ট্রুথে তথ্য-ইতিহাস-ছবি মুছে ফেলতে চায়, যাতে অপর-এর অভিযোগক্ষেত্র আরও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। শাসক হোহো হাসিতে উড়িয়ে দিতে পারে চুনী কোটাল অপরায়নের নিষ্ঠুরতায় শহীদ হন। আমার পদবীতে সেই হত্যার রক্তছিটে লাগে। রোহিত ভেমুলার শেষচিঠিতে আত্মনির্মাণের রাষ্ট্রপদ্ধতির গায়ে কাদা লাগে। সমস্বরের দোহাই দিয়ে জুনেইদ, ইকলাখদের অপর বানিয়ে খুন করে দেওয়া প্রশাসনিক ন্যায্যতা পেয়ে যায়। অপরায়নের পদ্ধতি গণসংহারকে ন্যায্যতা দেয়- রোহিঙ্গা জাতি মার খেতে খেতে টিঁকে যায়, সিঙ্ঘলীদের দ্বারা নিকেশ হয় তামিলরা। কাশ্মীর ‘অপর’ হয়ে রয়ে যায়; কাশ্মীরের পর্যটন, লাল আপেল আর গোলাপি-গাল-তরুণীর সঙ্গে ডাল লেকের শিকারায় যতটা আত্ম নির্মিত হয় ততটাই অপর ক’রে দেওয়া হয় কাশ্মীরের জাতিসত্তার আজাদির প্রশ্নে। জনতোষী চলচ্চিত্রে সাহিত্যে আর মিডিয়ায় উপস্থাপিত হয় আজাদি=সন্ত্রাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ=জঙ্গিহামলা; কাশ্মীরকে সেনাবুটের তলায় অবরুদ্ধ ক’রে রাখার প্রতিটা পর্যায়ে ভারতীয়রা কাশ্মীরিদের ‘ওরা’ বলে সম্বোধনতাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দেয়। ‘আমরা গতবছর কাশ্মীরে বরফ কুড়িয়েছিলুম’ আর, ‘ওদের ঘরে ঘরে জঙ্গি পয়দা হয়’ এই আমরা-ওরার বাচন ভরে থাকে রাষ্ট্রীয় মতাদর্শে। ভারতের বনভূমি তছনছ ক’রে, প্রাকৃতিক সম্পদ ছিনিয়ে নিতে, উদ্বাস্তু ক’রে বাঁধ তৈরি করতে আমাদের রাষ্ট্রনির্মিত ‘আত্ম’ জেগে ওঠে- আমাদের উন্নয়ন চাই! আর, সেই উদ্বাস্তুরা, তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির আহতরা সেই উন্নয়ন আর বিকাশের ফানুস ফুটো ক’রে দিতে প্রশ্ন তুললে- ওরা রাষ্ট্রদ্রোহী, ওরা বিপথে চালিত নকশাল।
জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে আধুনিক গণতন্ত্রের পীঠস্থান আমেরিকা আন্দোলিত। ঘরে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুমিছিল সয়ে গেছে ভারতীয় গণতন্ত্রে। সফুরা জারগারের জেলবন্দি অসহায়তার কথা জেনে ঘুমিয়ে পড়েছি আমরা। প্রতিদিন এক-দুজন দলিত ও আদিবাসী উচ্চবর্ণের হাতে খুন হবে- এই বাস্তবটা সহজপাচ্য ভাত-তরকারি হয়ে গেছে। মানিকম পরিচয় ছেড়ে লিঙ্গ বদলে নেয় শিল্পা; কিন্তু, প্রতিমুহূর্তে অপমানিত হয় সামাজিক ক্ষেত্রে, পুলিশ থেকে স্কুলশিক্ষক সবার চোখেই হাস্যকর ‘না-মানুষ’ বা যৌনতার ‘অবজেক্ট’-এ পরিণত হয়। বিধ্বস্ত শিল্পা বালক রাসসু কুট্টিকে বলে, “Live exactly how the world wants you to. Don’t think originally, don’t be unique. Blend with the crowd. Uniqueness is feared by the world. Fear leads to hatred, and the world will not be let you be.”- শিল্পাদের ‘আদার’ ক’রে অপমান করতে পারলেই আমাদের নীতি-মূল্যবোধ-পৌরুষ-স্থিতাবস্থা শান্ত থাকে। এঁদের বিপন্ন ক’রে ‘মূলধারা’ সংজ্ঞায়িত করে নিজেকে, স্টেটাস রক্ষিত হয়। আর, এঁরা বিপন্ন হয়ে যখনই যূথবদ্ধ হন, মূলধারাকে প্রশ্ন ক’রে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’, ‘দলিত লাইভস ম্যাটার’, ‘মাইগ্র্যান্ট লাইভস ম্যাটার’ সরোষে তুলে ধরেন ওপরে, তখনই কাউন্টার-হেজমনিকে গুলিয়ে দিতে ‘অল লাইভস ম্যাটার’ তুলে ধরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অনুসরণকারীরা। আসলে, ‘সবাই’ শব্দের মধ্যে কিছু ধূর্ততা থাকে; সবাই-এর মধ্যে ট্রাম্প থেকে ব্ল্যাক প্যান্থার, নাত্থাদাস থেকে টাটা, বামা থেকে বঙ্কিমচন্দ্র সকলেই ঢুকে পড়তে পারে। এতে সরলীকৃত হয়ে যায় বিরুদ্ধ-মতাদর্শ। অথচ, শোষিত হয় নাত্থাদাস, বামা, ইকলাখ, সোনি সরিরাই। তাঁরাই ‘আদার’ থেকে যান শ্রেণি-লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্ম বৈষম্যের সমাজকাঠামোয়। সবার জীবন নিশ্চয়ই দামী, কিন্তু ‘অপর’-দের জীবন কিছু কম দামী নয়- এই সরল অথচ না-বাস্তব বাক্য রাষ্ট্র বোঝেনা। রাষ্ট্রনির্মিত ‘আত্ম’ বোঝেনা। তাই, ‘অপর’দের প্রত্যাখ্যানের ভাষাও থাকে। আমাদের কান খুলে রাখা দরকার সেই প্রত্যাখ্যানের সমস্বরগর্জন শোনার জন্যে। অপরজীবন মূল্যবান- এই বোধশব্দের উচ্চারণ প্রয়োজন অন্ততঃ যতক্ষণ না আমাদের চেতনায় কড়া নাড়ে সেই বাক্য- “A new and sweeping utopia of life, where no one will be able to decide for others how they die, where love will prove true and happiness be possible, and where the races condemned to one hundred years of solitude will have, at last and forever, a second opportunity on earth.”

[লেখক – গবেষক, তুলনামূলক সাহিত্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়]

Facebook Comments

Leave a Reply