সংসারে ‘অপর’, সমাজে ‘বিযুক্ত’ : সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

আপনাদের ইন্দির ঠাকরুনের কথা মনে পড়ে? বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’-র ইন্দির ঠাকরুনের থেকে কি বেশি মনে পড়ে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র চুনীবালা দেবীর ইন্দির ঠাকরুনকে? তা যদি পড়ে, তাহলে তো নিশ্চয়ই মনে পড়বে ভাইপোর অনুপস্থিতিতে ভাইপো-বৌ সর্বজয়ার সংসারে কিভাবে তাকে ‘অপর’ হয়ে থাকতে হয়েছিল! ‘থাকতে হয়েছিল’ লিখে একটু বিড়ম্বিত হচ্ছি। বরং লেখা উচিত কিভাবে তাকে বারবার বিতাড়িত হতে হয়েছিল। শেষ অবধি তাঁকে মরতে হয়েছিলও পথের ধারে। ‘হরি, দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার কর আমারে …’!
সংসারে ‘অপর’ হয়ে থাকা এমন মানুষের কথা বলা কি বিদ্বেষ, বিভাজনের কারণে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের কাহিনী বর্ণনার এই সংখ্যায় ‘অরাজনৈতিক’ হয়ে যাচ্ছে? তবে যে আজকাল গার্হস্থ্য হিংসা নিয়ে খুব কথা হচ্ছে, বলা হচ্ছে অন্দর আর বাহিরের সীমারেখা মুছে যাওয়ার কথা তাহলে কি সে-সব শুধুই কথার কথা? ‘অপর’ না হলে কি আর ‘পরের সংসারে’ থাকার কথা বলা হ’ত!
‘পরের সংসারে’ থাকা না হয় বোঝা যায় কিন্তু তথাকথিত ‘নিজের সংসারে’ পর হওয়া মানুষের ‘গার্হস্থ্য হিংসা’য় অপর হয়ে থাকার দৃষ্টান্তও নেহাত কম নয়। কাগজে তো হামেশাই পড়া যায় ‘বধূ নির্যাতন’-এর খবর। মেলে ‘বয়স্ক’ নিপীড়নের কথাও। সেই নিপীড়ন যখন সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বা প্রোমোটারের হুমকি এবং শারীরিক আঘাতের মত প্রবল হয় তখন তা ‘খবর’ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঘরের মাঝে রোজকার নিপীড়ন-নির্যাতনের খবর তো আর খবর হয়ে ওঠে না! তাহলে কি অসহায়তাই অন্যকে ‘অপর’ করে দেয়? কর্তৃত্বর চাপে যেকোনো ক্ষমতাহীন মানুষই দুর্বল। এক্ষেত্রে শারীরিক দুর্বলতার কথাটাও ভুলে গেলে চলবে না। যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তাঁদের বয়সজনিত কারণে প্রাকৃতিক কৃত্যাদির বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম তাঁদের সেই দুর্বলতায় প্রয়োজন সামান্য সমানুভূতি। কিন্তু সেই সমানুভূতি যে কতটা দুর্লভ তা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন।
পরিবারে গার্হস্থ্য হিংসায় শুধুই বয়স্ক মানুষ এবং নারী, নির্যাতনের শিকার তা মনে করলে ভুল করা হবে। এই তালিকায় শিশুরাও আছে। নিশ্চয়ই শুনেছেন, পরিবারের ছোট্ট সদস্যকে কোনও কিছু করতে (বা না করতে) বলা হচ্ছে! সেই ছোট্ট সদস্য স্বভাবগত কৌতূহলে প্রশ্ন করছে, ‘কেন?’ বড়র উত্তর : ‘বড়দের মুখে মুখে কথা! কেন! আমি বলছি তাই।’ এই শিশু ক্ষমতাতন্ত্রের যে পাঠ জীবনের প্রারম্ভে পরিবারে পেল তারপর ক্ষমতাবিন্যাসে সে যখন অন্যকে ‘অপর’ করার ক্ষমতা করায়ত্ত করবে তখন নির্দ্বিধায় তা বলবত করতে পারবে। গণতন্ত্রের ভাবনা তার মাথাতেও আসবে না।
আবার পরিবারে দুই সহোদরের মধ্যেও চলে ‘অপর’ করে দেওয়ার কাজ, মূলত মা-বাবার তরফ থেকে। অনবরত তুলনা করা, তেমনই এক পদ্ধতি। এছাড়াও রয়েছে চেনা লিঙ্গবৈষম্য (ছেলের জন্য মাছের বড় টুকরো, মেয়ের জন্য নয়)। কখনও ছোট ভাই বা বোনের প্রতি বড়দের স্নেহের আতিশয্য দাদা বা দিদিকে সংসারে ‘অপর’ করে তোলে।
এইসবই আজকালকার ছোট পরিবারের গল্প। অবশ্য এখন তো ‘সাকুল্যে তিনজন’-এর পরিবার। সেখানে কবেই ‘অপর’ হয়ে গিয়েছে আত্মীয়-স্বজন। সাকুল্যে তিনজনে অপর হয়ে যায় আগের প্রজন্ম। আর ‘যে কারণে বাপ-মা নেই, সেই একই কারণে বিধবা পিসিও থাকতে নেই। বাউণ্ডুলে কাকা কিংবা বেকার ভাগ্নেও থাকতে নেই।’ (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সাকুল্যে তিনজন)। সাকুল্যে তিনজনের এই পরিবারেও ‘অপর’-এর ওপর কর্তৃত্বর গল্প থাকে না তা নয়। নয়নের মণি সন্তানকে সব বিষয়ে চৌকস হতেই হবে আর তাই নিয়েই চলে দড়ি টানাটানি! মা-বাবা কারুর কাছে যদি সেই সন্তান আশ্রয় পেয়ে যায় তবে ক্ষমতাশালী অন্যজন তার কর্তৃত্ব ফলান দুর্বলকে ‘অপর’ করে দিয়ে। ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না’-এর মত ‘কে কতটা সময় সন্তানকে দিচ্ছে’ তা নিয়েও চলে চাপানউতোর। একসাথে থাকতে পারার শিক্ষা পাওয়া হয়না বলেই বিয়ের কয়েক দশক পরেও একে অন্যকে শুনতে হয় – ‘তোমার জন্য আমার এই … এই… হল না…’। সংসারের মধ্যে কর্তৃত্বর ছুরি দিয়ে এই অপরীকরণের গল্প বেশিরভাগ সময়ই অনুল্লেখিত আর অনুচ্চারিত থেকে যায়।
সংসারের পরের ক্ষেত্র হল কর্মক্ষেত্র – কাজের জায়গা। ছোটদের ক্ষেত্রে বাড়ির বাইরের প্রথম বাড়ি স্কুল। সেখানেও অপরায়নের হরেক আয়োজন। সেই কবেকার বিদ্যাসাগরীয় ‘গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্ব সমাস’। ‘গোপাল অতি সুবোধ বালক’। সুবোধ বালক তৈরির কারখানায় ভাল ছেলের বিপরীতে অন্যরাই ‘অপর’। আর শিক্ষকদের গুডবুকে না থাকা ছাত্রদের কিভাবে স্কুলের নানান কাজ থেকে বিযুক্ত হয়ে থাকতে হয় তা তো ভুক্তভোগীরা অবশ্যই জানেন। হাল-আমলে আবার আর এক গল্প জোরালো হয়ে উঠেছে। ভালর দল শুধুই পড়াশোনা করে। আর খুব কম জন সবকিছুতেই আগুয়ান। এই আগুয়ানদের কেউ স্কুল শেষের পরীক্ষায় ভালর দলের থেকে বেশি নম্বর পেয়ে গেলে বিযুক্তরা নিজেদের জয় ভেবে খুশি হয়ে ওঠে। তাকে অভিনন্দন জানায় নিজেদের পিঠ চাপড়ানোর মত করেই। তবে সব গল্প এত স্বপ্ন পূরণের হয় না। বহু ছাত্রই চিরবিযুক্ত অপর হয়ে থেকে যায়; ‘অমলকান্তির রোদ্দুর’ হয়ে ওঠা হয় না।
শুধু পড়াশোনা দিয়ে যে বিভাজন হয় তা নয়। স্কুলে নির্যাতনের এক বড় কারণ অনন্যতা। যে আর সবার মত নয় সেই অপর, সেই বিযুক্ত। হতে পারে সেটা শারীরিক; তাই প্রত্যেক ক্লাসেই দেখা মেলে ‘রোগা’, ‘মোটু’, ‘লম্বু’ ‘নাটা’-দের। হতে পারে তথাকথিত ‘যৌন’ পরিচয় জ্ঞাপক; ছেলেদের স্কুলের প্রতি ক্লাসেই মিলবে ‘লেডিজ’ নামের কাউকে যে তার সহপাঠীদের বিচারে যথেষ্ট ‘পুরুষালি’ নয়। আর বাসের কন্ডাক্টরদের মত তারাও তাদের সেই সহপাঠীকে ডাকে ‘লেডিজ’। শরীর এবং লিঙ্গ বিভাজনের পরে আসে পরের বিভাজক জাতপাত এবং শ্রেণী। তাই ইতিহাসের অধ্যাপক মেরুনা মুর্মু তাঁর স্কুলবেলার গল্প বলতে গিয়ে লেখেন, তাঁর স্কুলে শোনা প্রশ্নের কথা; ‘তুমি কি এস. টি?’
আর শ্রেণী? এখন স্কুলে শ্রেণী পরিচয় অনুযায়ী অপরীকরণ দুর্লভ। সে ছিল কয়েক দশক আগে। স্কুল ড্রেসের মধ্যেও কাপড়ের মান আর টিফিন বক্সের টিফিন দিয়ে শ্রেণী বিভাজন ঘটে যেত। আর এখন তো শ্রেণি অনুযায়ী স্কুল বিভাজনই ঘটে গেছে। পাড়ার ইস্কুল, বাংলা ইস্কুল গরীবের আর ঝাঁ-চকচকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল বড়লোকদের। স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেতে হবে গরিবের ইস্কুলে কারণ সেখানে মেলে সরকারি বেতনহার আর নিজের ছেলেমেয়েকে পড়াতে হবে বাহারি ইংলিশ মিডিয়ামে। এটাই এখন শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দ্বিচারী দর্শনের দস্তুর।
জাত-পাত আর শ্রেণিভিত্তিক অপরীকরণ এখন স্কুলের বদলে প্রকট হয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংরক্ষিত আসনের শিক্ষার্থীরা উচ্চবর্ণের, গরিবরা উচ্চবিত্তদের, বাংলা মিডিয়ামরা ইংলিশ মিডিয়ামদের, গ্রামীণরা নাগরিকদের টার্গেট সেখানে। স্কলারশিপ পাওয়া সংরক্ষিত ছাত্রকে ‘জলপানি পাওয়া ছাত্র’ বলে উচ্চবর্ণের ছাত্রের বিদ্রূপ করার সাক্ষ্য ছড়িয়ে থাকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও।
শুধু ছাত্র মহলে নয়, উচ্চশিক্ষার উচ্চমহলেও অপরীকরণ চলে। কলেজের টিচার্স রুমে যান। ভিন্ন হাঁড়ির মত সেখানে টেবিল ঘিরে ভাগের চেয়ার। এক জায়গায় কলেজ সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আসা অধ্যাপকবৃন্দ আর অন্যদিকে পার্মামেন্ট পার্ট টাইমার, গেস্ট লেকচারার (এখন অবশ্য এই অন্য দল ‘স্টেট এডেড কলেজ টিচার’ নামক এক ছাতার তলায়)। যে অধ্যাপক ক্লাসে গিয়ে সাম্যের অধিকার পড়াবেন তিনিই হয়তো তাঁর আচরণে এই অন্য অধ্যাপকদের প্রতি সম-আচরণ করতে পারলেন না। ‘সমকাজে সমবেতন’-এর বিচারবিভাগীয় আদেশের কথা বললেও সবাই কি তা বিশ্বাস করেন?
ভেদের কি আর শেষ আছে? একদল মনে করছেন, টিক মারা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যিনি জালে ধরা পড়েছেন অর্থাৎ নেট পেয়েছেন তিনি ফাঁকতালে চাকরি পেয়েছেন। আবার আর একদল ভাবছেন যিনি পি. এইচ. ডি করে কলেজে পড়াচ্ছেন তিনি নেট ফাঁকি দিয়ে চাকরি পেলেন কি ক’রে! মোট কথা, শিক্ষার জগতেও এই ‘অপর’ করে ‘বিযুক্ত’ করার প্রক্রিয়া এক ধারাবাহিক কাহিনী।
সমাজের চিরাচরিত ভেদকাঠি ধর্ম আর জাতপাতের কথা এখানে আর বিশেষ কিছু বলছি না। ‘বাঙালি এবং এবং মুসলমান’ পরিচয়ের মধ্যে যে বিভেদবীজ এ বাংলায় ছড়িয়ে তারই উল্টো পিঠ ওপার বাংলায়, ‘বাঙালি এবং মুসলমান’।
কাজেই এই বিভেদ-বিদীর্ণ সমাজ-সংসারে জন্মে এবং বড় হয়ে হঠাৎ কী কেউ সাম্যবাদী হয়ে উঠতে পারে! শুধু ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ নয়; সত্যিই, অনেক কিছুই ‘ম্যাটার করে’!
শেষে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ।। উপরে উল্লেখিত বিভাজন-চিত্র আর অপরীকরণই সমাজের একমাত্র চিত্র নয়। ব্যতিক্রমী ছবিও আছে, নিশ্চয়ই আছে। আর আছে বলেই ‘অপরজন’-এর এই বিভেদ বিরোধী বিশেষ সংখ্যা বের হচ্ছে।

[লেখক – এ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়।]

Facebook Comments

2 thoughts on “সংসারে ‘অপর’, সমাজে ‘বিযুক্ত’ : সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় Leave a comment

  1. সব্যসাচী, আপনাকে ধন্যবাদ লেখাটির মনো-সামাজিক বিশ্লেষণ ভঙ্গীর জন্য। আমাদের (দেশ কাল নিরপেক্ষ) বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপনার আলোচনাটি যতার্থ এবং নির্দেশকের ভূমিকা পালন করছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মধ্য-উত্তর কালে এই বিভাজন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে তা আপনার লেখায় আলোচিত। সমসাময়িক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমিকা বাধ্য করেছে “বিভেদ-বিদীর্ণ সমাজ সংসারে” সাম্যের জয়গান করেও অসাম্যের অন্ত-সলিল দশায় জীবন কাটাতে। আপনার ইতিহাস প্রজ্ঞায় বিস্বস্ত থেকেও বলা যায় মানুষের প্রজ্ঞা যে মুহূর্তে জ্ঞান ও চেতনাকে হাতিয়ার হিসেবে মেনেছে, তার বিচিন্তা ( দেশ কাল পাত্র ভেদে) অপরজন ও অপরীকরণ আপনার বর্ণিত “অপর সমাজে বিযুক্ত” হওয়ার শুরু।

Leave a Reply