অন্য জীবনের মান্যতায়: ভিক্টর সার্জ ও তাঁর পরিব্রজন – সন্দীপ ঘোষাল

fail

“১৯৪৭-এর নভেম্বর মাসের এক সকালে মেক্সিকো সিটি শহরে, আমার বাড়িতে বাবা একটি কবিতা নিয়ে আসেন। আমি বাড়ি ছিলাম না। সুতরাং উনি বাড়ি ছেড়ে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন এবং কেন্দ্রীয় পোস্ট অফিস থেকে ওই কবিতাটা আমাকে ডাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। এর কিছুক্ষণ পর, একটা ট্যাক্সির মধ্যে বাবা মারা যান। সেই রাতে এক বন্ধু আমাকে খবরটা দেয়। আমি বাবাকে দেখি, পুলিশ থানায়, আধো অন্ধকারে, একটি টেবিলের উপরে শায়িত। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে বাবার জুতো ছিল ছেঁড়া এবং আমি ব্যাপারটা মেনেও নিতে পারিনি। কারণ বাবা কমদামী জামা কাপড় পড়তেন কিন্তু তাতে দারিদ্রের ছাপ থাকতো না। এর পরদিন আমি বাবার ছবি আঁকার চেষ্টা করি, কিন্তু কিছুতেই বাবার মুখটা আঁকতে পারছিলাম না। কারণ থানায় বাবার মুখ মুখের উপর ওরা মৃতদেহের মুখোশ পরিয়ে দিয়েছিল। আমি শুধু বাবার হাতদুটো আঁকার চেষ্টা করেছিলাম; বাবার হাত দুটো বড় সুন্দর ছিল। এর কিছুদিন পর আমি বাবার কবিতাটা ডাকযোগে পাই, কবিতার নাম “হাতদুটো,” – ভ্লাদিমির সার্জ, মেক্সিকো ১৯৮৯

#

ভ্লাদিমির সার্জ, একজন প্রায় হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নদ্রষ্টা বিপ্লবী – আজীবন রাষ্ট্রহীন নাগরিক, ভিক্টর সার্জের পুত্র। ভিক্টর সার্জের আসল নাম ভিক্টর লভোভিচ কিবালচিচ; প্রকৃতপক্ষে নাগরিকত্বহীন সার্জ, ১৮৯০ থেকে ১৯৪৭, মাত্র ৫৭ বছর বেঁচে ছিলেন, দুই মহাদেশে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সফল এবং ব্যর্থ তিনটি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন।
ছেলেবেলা কেটেছে বেলজিয়ামে। আদতে রাশিয়ার বাসিন্দা সার্জের পরিবার, জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এড়াতে, বেলজিয়ামে পাড়ি দেন। দারিদ্র্যের কারণে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা তেমন হয়নি। ছোট ভাই শৈশবেই মারা যান অনাহারে। কৈশোর থেকেই সার্জ, ক্রোপোটকিনের নৈরাজ্যবাদী চিন্তায় আকৃষ্ট হন। সারাজীবন বিভিন্ন বিচিত্র পেশায় যুক্ত ছিলেন – সাংবাদিক, অনুবাদক এমনকি ছাপাখানায় প্রুফ দেখার কাজেও। বেলজিয়ামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয় পরে ১৯১১-১২সালে ফ্রান্স পৌঁছে নৈরাজ্যবাদী মুখপত্রে কাজ শুরু করেন।
প্যারিসে নৈরাজ্যবাদী কার্যকলাপে যুক্ত থাকার কারণে এবং গোপন নৈরাজ্যবাদী বোনো গ্যাং-এর সমর্থনে লেখালেখির অভিযোগে ১৯১২ জানুয়ারি মাসে গ্রেপ্তার হন এবং পাঁচবছরের কারাবাস। ১৯১৭-এ অতঃপর সার্জ পাড়ি দেন স্পেনের বার্সেলোনায়। সেখানেও বামপন্থী এবং নৈরাজ্যবাদী দলে যুক্ত হয়ে ১৯১৭-তে বার্সেলোনা ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার জন্য কারাবাস। অত:পর ১৯১৮-তে ক্লেমেন্সি সরকারের সঙ্গে রাশিয়ায় সরকারের বন্দিবিনিময়ের হেতু রাশিয়ায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এসে পড়েন।

#

বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের উদ্দীপনার ঝোড়ো দিনগুলি সার্জকে জড়িয়ে ধরে। ১৯১৯-এর অক্টোবরে বিপ্লব যখন সবদিক থেকেই আক্রান্ত তখন পেট্রোগ্রাড-কে রক্ষা করার জন্য পুলকোভো হাইটস-এ পাহাড়ের শ্বেত সৈন্যদের রুখে দেওয়ার লড়াই-এ ছিলেন সার্জ। ১৯১৯-এ রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে জিনোভিয়েভের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটিতে একসঙ্গে কাজ করেন। কমিন্টার্নের কাজের সূত্রে, প্রথমে পেট্রোগ্রাড পরে মস্কো তারপর বার্লিন এবং শেষে ভিয়েনা। ১৯২৩-এ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক-এর সদস্য হিসেবে জার্মানিতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানেও তিনি।
ইতিমধ্যে ১৯২১-এর জুলাই-এ মস্কোয় কমিন্টার্নের তৃতীয় কংগ্রেস যোগ দেন সার্জ। কিন্তু হতাশ হন বিদেশি প্রতিনিধিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং বিশ্লেষণী চিন্তার অভাব দেখে। সবাই যেন সব মেনে নেওয়ার জন্য হাজির। যা হোক করে একমত হওয়াই যেন অভ্যাস। একই সঙ্গে একদিকে, কংগ্রেসের বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য দেওয়া আতিথেয়তা এবং অন্যদিকে, বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অনটন—এই বৈপরীত্য তাকে বিচলিত করে।
১৯২৫-এ সোভিয়েত ইউনিয়নে ফেরা। কমিন্টার্নের তৃতীয় কংগ্রেসের পরেই সার্জ ঠিক করেন তিনি গ্রামে চলে যাবেন এবং নিভৃতে লেখালেখি করবেন। যদিও এই সময় সার্জ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিতে বামপন্থী বিরোধী ব্লকের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৬-১৯২৮ বামপন্থী বিরোধীদের সঙ্গে আন্তঃপার্টি সংগ্রামে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯২৮-এ সার্জ সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত এবং বন্দী হন।
১৯২৮-এ প্রথমবার কারামুক্তির পর সার্জ বুঝতে পারেন তাঁর রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেন বাকি জীবন তিনি লেখালেখি করেই কাটাবেন। কিন্তু সেসব তুখোড় পোলেমিক্যাল লেখা নয়, যাতে তিনি অভ্যস্ত। মস্কো বিচারের প্রহসন, বলশেভিক পার্টির তথাকথিত শুদ্ধিকরণ এবং সমাজতান্ত্রিক দেশে পার্টির আমলাতন্ত্রের উত্থান হবে তাঁর তথ্যভিত্তিক উপন্যাস লেখার বিষয়।
বহুবছর পর, পুত্র ভ্লাদিমির মনে করতে পারেন যে তাঁর লেখক বন্ধুদের অনেকেই মনে করতেন যে সার্জ আসলে একজন সাহিত্যিক। অথচ নভেম্বর বিপ্লবের গোড়ার দিকে সার্জ ঠিক উল্টোটাই ভেবেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন বিপ্লবের সন্ধিক্ষণে সিরিয়াস সাহিত্য রচনার চাইতে বলশেভিক বিপ্লবকে রক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফরাসি পত্রিকা ইনপ্রেকর-এর সম্পাদক এবং বিভিন্ন ফরাসি রাজনৈতিক পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লেখক সার্জ তাই নভেম্বর বিপ্লবের প্রথম দিনগুলো নিজেকে গৃহযুদ্ধে এবং ব্যর্থ জার্মান বিপ্লবের বিশ্লেষণী লেখায় নিয়োজিত রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি বরাবরই মনে করতেন তাৎক্ষণিক এইসব লেখার কোন চিরস্থায়ী মূল্য নেই বরং তাঁর নিভৃত চিন্তা এবং বৃহত্তর ভাবনার সঙ্গে অনেক অংশেই এই তাৎক্ষণিক লেখার বিরোধ আছে। আত্মসমীক্ষায় সার্জ তার রাজনৈতিক লেখাগুলিকে বরাবরই কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন।
১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ স্ট্যালিনের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পর্বে তিনি প্রায় একাই বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে টিঁকে থাকেন, যেখানে বিরোধিতার গড়পড়তা পরিণতি ছিল মৃত্যুদণ্ড, আত্মধিক্কার অথবা শ্রমশিবিরে নির্বাসন। ১৯৩৩-এ গোয়েন্দা পুলিশের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে ওরেনবুর্গ শিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সার্জের স্ত্রী, পরিবারের ওপর ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং সার্জের পক্ষে তাঁর পরিচর্যা করা সম্ভব হয় না। তিনি লেনিনগ্রাদে ফিরে যান।
১৯৩৩-এ গ্রেপ্তার এবং তার আগে দীর্ঘ জেরার সময় সার্জের অবস্থান খুবই কৌশলী ছিল। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে জেরার মোকাবিলা করেন। একদিকে প্রাণদণ্ড অন্যদিকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি—এই দুই ভবিতব্যের মাঝখানে নিজের সত্তাকে বাঁচিয়ে রেখে সার্জ কমিউনিস্ট আমলাতন্ত্রকে বুঝিয়ে দেন যে তাঁর প্রতিবাদ কোন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর চক্রান্ত নয়, তিনি একক মুক্তচিন্তক এবং প্রতিবাদী। বিস্ময়করভাবে, সার্জের কেবলমাত্র মধ্য-এশিয়ায় নির্বাসনের মত আপাত-লঘু শাস্তি হয়। এই নির্বাসন কালে সার্জ বুঝতে পারেন যে আত্মসমর্পণ না করলে সোভিয়েত রাষ্ট্রে একদিকে তাঁর রাজনৈতিক মৃত্যু অন্যদিকে তাঁর মতো করে সাহিত্যকর্ম চালানো দুষ্কর। যদিও তাঁর ফরাসীতে লেখা প্রথম তিনটি উপন্যাস “মেন ইন প্রিজন’, ‘কনকার্ড সিটি’ এবং ‘বার্থ অফ আওয়ার পাওয়ার’ এবং তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ‘ইয়ার ওয়ান অফ রাশিয়ান রেভলিউশন’ ইতিমধ্যেই ফ্রান্সে বিক্রি হচ্ছিল। ১৯৩৪-এর শীতকালে স্ত্রী লিউবা বা এবং পুত্র ভ্লাদি, ওরেনবুর্গে সার্জের সঙ্গে থাকতে আসেন। সঙ্গে আনেন টাইপরাইটার এবং তাঁর কিছু বই। লিউবার মানসিক অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না এবং এই সময় থেকেই পুত্র ভ্লাদি সার্জের সঙ্গে থাকতেন।
বলশেভিক রাষ্ট্রে সঙ্গে নিরন্তর সংঘাত সত্ত্বেও সার্জ জীবনের শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রকে বর্জন করেন নি বরং ব্যক্তি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে কোথাও মেলাতে চেয়েছিলেন। একদলীয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনি প্রতিবাদ করেন এবং ১৯২৩-এ বহুদলীয় সরকারের কথা বলেন। যদিও বহুদলীয় সরকার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস্তব কিনা তা নিয়েও তাঁর সংশয় ছিল। কিন্তু লেনিনের নিউ ইকোনমিক পলিসি (নেপ) এবং স্তালিনের ক্রমবর্ধমান একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হিসেবে বহুদলীয় সরকারকেই সার্জ যথার্থ বলে মনে করেছিলেন। বহুদিন পরে ১৯৪২-এ ইউরোপীয় এবং ফরাসি নৈরাজ্যবাদীদের সঙ্গে যৌথ ইস্তেহারে সার্জ লেখেন, এমন এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা যেখানে মানুষ তার ব্যক্তিগত অধিকার এবং মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারবে, সততা এবং দূরদৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করবে এবং যে রাষ্ট্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এবং সংখ্যালঘুর মতকে মর্যাদা দেবে। সে রাষ্ট্রে লড়াই চলবে—মত প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, ব্যক্তিপূজার বিরুদ্ধে আর প্রশ্নহীন আনুগত্যের বিরুদ্ধে। ভিন্নমতকে দমন করার জন্য যে রাষ্ট্র মিথ্যা অপবাদ এবং গুপ্তহত্যাকে অবলম্বন করে—তার বিরুদ্ধেও।
১৯৩৬-এ আঁদ্রে জিদ, রোমা রোলার এবং আরো অনেক ইউরোপীয় শিল্পী-সাহিত্যিকদের উদ্যোগে সার্জ নির্বাসন থেকে মুক্ত হন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত হন সপরিবারে। তাঁর সোভিয়েত নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং পাণ্ডুলিপিগুলি ছাড়াই তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সোভিয়েত ইউনিয়নে সার্জের বোন, শাশুড়ি, তাঁর দুই শ্যালক এবং তাদের স্ত্রীরা সকলেই গুলাগে প্রেরিত হন এবং নিরুদ্দেশ হন বা মারা যান। ভ্লাদিমির সার্জের স্মৃতিতে, ট্রেনে চেপে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে আসার বিবরণে এক আশ্চর্য পরিহাস: সোভিয়েত ভূখণ্ডে শেষ স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়ায়। এরপর ভিক্টর এবং পুত্র ভ্লাদি চলে যাবেন ইউরোপে আর তাঁর স্ত্রী লিউবা এবং তাদের ১৪ মাসের সন্তান জেনি ফিরে যাবে লেনিনগ্রাদের দিকে। শেষ স্টেশনে, অন্তর্বাস আর পায়ের জুতো পড়ে ভ্লাদি যখন শেষ শারীরিক তল্লাশি জন্য মুখোমুখি হয় তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তার মোজায় কিছু লুকোনো আছে কিনা। ভ্লাদির উত্তর ছিল “হ্যাঁ, একটা সাবমেরিন।”

#

১৯৩৬-এ শুরু হয় সার্জের দ্বিতীয় নির্বাসন। কারণ ১৯১৯-এ সার্জ ফিরেছিলেন তাঁর স্বদেশে, প্রথম নির্বাসন অন্তে। পাঁচটা ভাষা জানতেন সার্জ, যদিও সমস্ত লেখালেখি করেছিলেন ফরাসি ভাষায়। কিন্তু এই দ্বিতীয় নির্বাসনে তিনি একজন আউটসাইডার। বামপন্থী, কমিউনিস্ট বা অন্যান্য কোন প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমে তাঁর ঠাঁই মিললো না। ইউরোপিয়ান কমিউনিস্ট পার্টিগুলো তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালায়। প্রথম দিকে ফ্রান্সে বসবাসের সুযোগ তিনি পাননি। অত:পর আবার বেলজিয়াম। একটি ছোট পত্রিকায় লেখালেখি করার সুযোগ পান। অন্যদিকে এ সময় তিনি সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির তথাকথিত শুদ্ধিকরণের প্রতিবাদ করতে থাকেন এবং মস্কো বিচারের প্রহসনের বিরুদ্ধে গঠিত কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেন। স্পেনের বিপ্লব-এর সমর্থনে গঠিত কমিটিতেও তিনি অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৩৬-এই ট্রটস্কির সঙ্গে দেখা এবং তাঁরই সুপারিশে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের আর্মস্টারডাম কনফারেন্সে যোগদান।
রাশিয়া টোয়েন্টি ইয়ারস আফটার (১৯৩৭) এবং পোর্ট্রেট অফ স্টালিন (১৯৩৯) ছাড়া সার্জের প্রায় সব গ্রন্থই প্রকাশিত হয় বা ইংরেজিতে অনূদিত হয় তার মৃত্যুর পর – দ্য কেস অফ কমরেড তুলায়েভ (১৯৬৭), বার্থ অফ পাওয়ার (১৯৬৭) মেন ইন প্রিজন ( ১৯৩০), মিডনাইট ইন সেঞ্চুরি (১৯৮২), আনফরগিভিং ইয়ার্স (২০০৮)। মস্কো বিচারের প্রহসনের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা সার্জের উপন্যাস “দ্য কেস অফ কমরেড তুলায়েভ” আর্থার কোয়েস্টলারের “ডার্কনেস এ্যাট নুন”–এর সমগোত্রীয়। কিন্তু সমসাময়িক ইউরোপে বা তার কয়েক দশক পরে আলেকজান্ডার সোলঝিনিৎসিন বা তার কিছু আগে বরিস পাস্তেরনাককে নিয়ে পশ্চিমী গণতন্ত্র যেমন উৎসাহী ছিল, সার্জ তেমনভাবে আকর্ষণীয় ছিলেন না – হয়ত একারণেই যে, সোভিয়েত এবং কমিউনিস্ট আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণ করলেও, কমিউনিস্ট বিরোধী জিগিরে সার্জ কোনদিনই গলা মেলাতে পারেননি।
সার্জ ১৯৪০ পর্যন্ত ছিলেন প্যারিসে। ইউরোপে বামপন্থার পশ্চাদপদসরণ এবং ফ্যাসিবাদের অগ্রগমন তাকে আরো বিচলিত করে। অন্যদিকে, সোভিয়েত-পন্থী কমিউনিস্ট পার্টিগুলির তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং বিরোধিতা তাঁকে মূল ধারার আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সোভিয়েত গোয়েন্দা পুলিশ এবং গেস্টাপো – দুইয়ের নজর এড়িয়ে দিন কাটে। এই সময় তিনি ইউনিয়নে স্ট্যালিন-বিরোধী গোষ্ঠীর প্রতিরোধ নিয়ে “মিডনাইট ইন সেঞ্চুরি” উপন্যাস লেখেন এবং ট্রটস্কির আত্মজীবনীর অনুবাদ করেন।
যদিও সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্যালিন-বিরোধী শিবির তাকে সন্দেহের চোখে দেখতো, তাঁর মুক্তি এবং দেশত্যাগ-কে স্ট্যালিনের একনায়কতন্ত্রের সঙ্গে গোপন বন্দোবস্ত বলে মনে করত। ইউরোপে ট্রটস্কি বা ফরাসি বামপন্থীদের সঙ্গে তাঁর সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ট্রটস্কির মধ্যেও দেখেছিলেন পরমত অসহিষ্ণুতার প্রকট লক্ষণ। পশ্চিমী-গণতন্ত্র তাকে গ্রহণ করেনি কারণ সার্জ সমাজতন্ত্র বা বিপ্লবের বিরোধিতা করেননি। সোভিয়েত পার্টির আমলাতান্ত্রিকতাকে তিনি মেনে নিতে পারেননি আবার একইসঙ্গে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানে তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।
ফ্রান্সের উত্তর সীমায় হিটলারের আক্রমণের পর তিনি দক্ষিণে মার্সাই-এ চলে যান। ফ্রান্স থেকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য ভিসার চেষ্টা করতে থাকেন। আমেরিকা ভিসা দিতে রাজি হয় না। কেবলমাত্র মেক্সিকো, যেখানে ট্রটস্কি শেষজীবন কাটিয়ে ছিলেন, সেখানেই সার্জ ও তাঁর পরিবারের থাকার অনুমতি মেলে। সার্জের ফ্রান্স থেকে মেক্সিকো আসার সমুদ্রের যাত্রাপথ ঘটনাবহুল ছিল। সরাসরি না গিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিক হয়ে মেক্সিকোতে ঢুকতে হয়।

#

২০১২-এ প্রকাশিত সার্জের ‘মেমোয়ার্স অফ এ রেভোলিউশনারি’ এবং ‘নোটবুক -১৯৩৬-১৯৪৭’ – ব্যক্তি, রাষ্ট্র, বিপ্লব এবং মুক্তচিন্তার জটিল রসায়নের আশ্চর্য আখ্যান। এখানে উপস্থিত এক পরাজিত নায়ক, যাকে সমাজতন্ত্র বা পশ্চিমী গণতন্ত্র কেউই মেনে নিতে পারেনি, যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে। এই আখ্যান জানিয়ে দেয়, রাষ্ট্রহীন, নাগরিকত্বহীন, প্রতিষ্ঠিত সমাজবাদ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত একজন প্রতিবাদীর জীবন মোটেই সুখকর নয়। দারিদ্র, অনাহার, অসুস্থতা, পুলিশের নজরদারি, অপবাদ এবং একাকীত্ব এইসবই সার্জের সঙ্গে সহবাস করেছে। নৈরাজ্যবাদ আর মুক্তচিন্তার সমাজতান্ত্রিক ধারণার মধ্যে অবিরত দোল খেয়ে গেছেন তিনি।
অথচ তাঁর চিন্তায় সতত উপস্থিত এক মুক্তমনা, প্রশ্ন মুখর, বিপ্লবী কমিউনিস্ট। লিখেছেন, এই মুক্তমনা কমিউনিস্টদের দায়িত্ব হবে কর্কশ সমালোচনার মধ্যে দিয়ে এবং কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রে পরিণত হওয়াকে রুখে দেওয়া। আজীবন স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি, মগ্ন ছিলেন নৈরাজ্যবাদের আত্মনেতিতে। কোনো প্রতিষ্ঠানকেই কোনদিন মেনে নিতে পারেননি, ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছিলেন নিজেকে। তাই সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দখলে বা আধিপত্যের লড়াইয়ে তিনি সবসময়ই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত।
চল্লিশের দশকে তাঁর মনে হয়েছিল “নৈরাজ্যবাদীরা সবসময়ই সমাজ বিপ্লবের সহযাত্রী। কোনরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই। তা যদি না হয় তাহলে নৈরাজ্যবাদের কোন মানে হয়না। “এবং” …..আবহমানকাল থাকবে সেই কমিউনিস্টরা যারা আরো অনেকের সঙ্গেই স্বাধীন চিন্তার প্রকল্পকে বহন করে নিয়ে যাবে। নিরন্তর সমালোচনা এবং প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই অগ্নিশুদ্ধ হবেন কমিউনিস্টরা। কমিউনিস্ট আমলাতন্ত্র বরাবরই থাকবে কিন্তু তার ভেতরে থাকবে সেই ভিন্নমতের, মুক্তমনা প্রশ্নাতুর কমিউনিস্টরা যারা আমলাতন্ত্রের আখের গোছানো গোষ্ঠীস্বার্থের এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বিরুদ্ধে সংঘাতে যাবেন চিরদিন।”
সার্জের উপলব্ধি, “৫০ বছরের কিছু বেশি এই যাপিত জীবনে আমি দশ বছর বিভিন্ন ধরনের বন্দিদশায় কাটিয়েছি। খুবই কষ্টকর এবং দীর্ঘ এই একাকীত্ব আমাকে শিখিয়েছে নিৎসের সেই অমোঘ প্রবচন – “যা আমাকে হত্যা করে না, তা আমাকে শক্তিশালী করে”।
সারাজীবন তাড়া খাওয়া স্বপ্নভ্রস্ট সার্জ বলেছেন “…এত কিছুর পরেও মার্ক্সবাদে নিহিত বিজ্ঞান চেতনায় এখনো আস্থা আছে। মার্ক্সবাদ আদর্শ এবং যুক্তির সেই আশ্চর্য মিশেল যা আমাদের সময়ের চৈতন্যকে ধারণ করে রেখেছে। কিন্তু আমার মনে হয় মার্ক্সবাদী-গোঁড়ামি, বিপর্যয়ের এক বিরাট সম্ভাবনা রেখে যায় এবং বিপ্লবোত্তর সমাজ পরিবর্তনে এক মহান দেশ যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে তখন সে বিপর্যয় আরো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। তত্ত্বের যাই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকুক না কেন, যে মুহূর্তে তা রাষ্ট্র-চালিত হয়, নিরপেক্ষ অন্বেষা তখন অসার হয়ে যায় আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির দোহাই প্রথমে শিক্ষাকে এবং তারপর রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত চিন্তাকে গ্রাস করে বসে”। মনে হয়েছে, “……শোষণহীন সমাজ তৈরি করতে গেলে মানুষকে বহু বহু বছর হাঁটতে হবে। বহু অনুমান, বহু ভ্রান্তি, বহু কল্পরাজ্যের মধ্যে দিয়ে এবং কিছু স্থায়ী কিছু অস্থায়ী পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে”।

#

পেট্রোগ্রাডে-এ পুলকোভো হাইটস-এ পাহাড়ে শ্বেত সৈন্যদের রুখে দেওয়ার যুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে সার্জ যে বিপ্লবকে রক্ষা করতে চেয়ে ছিলেন, বেঁচে থাকতেই তাঁর পরিণতিতে তিনি বিষণ্ণ হয়েছিলেন। সার্জ-গবেষক অ্যাডাম হক্সচাইল্ড ১৯৭৮-এ লেনিনগ্রাডে (বিপ্লবের সময় পেট্রোগ্রাডে) সার্জের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের তথ্য সংগ্রহ করতে পেট্রোগ্রাড শহরে হাজির হন। যে যৌথআবাসে সার্জ ভাড়া থাকতেন সেই বাড়ি হক্সচাইল্ড খুঁজে পান। যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেই ফ্ল্যাট তখনও রয়েছে। সার্জকে কেউ মনে করতে পারেন কি না – এই জিজ্ঞাসায়, বর্তমান বাসিন্দারা এ ওর দিকে তাকান। শেষে কেউ এক বৃদ্ধা বাসিন্দাকে ডেকে আনার কথা বলেন। তিনি বলেন তাঁর বয়স ষাট বছর এবং তাঁর নিজের সাত বছর বয়স থেকে তিনি ওই ফ্ল্যাটে আছেন। হক্সচাইল্ডকে তিনি হতাশ করেন এবং বলেন এমন কাউকে তিনি মনে করতে পারছেন না। যদিও সার্জের স্ত্রীর রুসাকভ-পরিবার যে সেখানে থাকতো তা তাঁর মনে আছে। কথা চলতে চলতে এক সময় সার্জের নাম আবার ওঠে। হঠাৎ চোখ ছোট করে বৃদ্ধা বলেন “আচ্ছা তিনি কি সেই নৈরাজ্যবাদী?” হক্সচাইল্ড উৎসাহিত হন “ও, তাহলে আপনার মনে পড়েছে?”। না, তা নয় বৃদ্ধা আবার পিছিয়ে যান। এই বিচিত্র কথোপকথনের রাতে হোটেলে ফিরে হক্সচাইল্ড বোঝার চেষ্টা করেন এই বৃদ্ধা যদি তাঁর বয়স সঠিকভাবে বলে থাকেন তাহলে যে রাতে সার্জ প্রথম গ্রেপ্তার হন তখন তাঁর বয়স ছিল দশ। আর তাঁর পনেরো বছর বয়সে, ওই রাস্তার মোড়ে, যে ওষুধের দোকান তখনো ছিল, সেখান থেকেই দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হন সার্জ। পনেরো বছরের স্মৃতি কি এতই অস্থায়ী যে শুধুই একজন নৈরাজ্যবাদী – সার্জকে এই অভিধায় মনে রেখেছেন এই বৃদ্ধা? তাও আবার তিনি থাকতেন একই যৌথ-আবাসে। হঠাৎ হক্সচাইল্ডের মনে আসে সার্জ লিখেছেন কুড়ির দশকের মাঝামাঝি তাঁর ওপরে নজরদারি করার জন্য এক গোয়েন্দা পুলিশ, তাঁর স্ত্রী, তাঁর কন্যাসন্তান এবং ঠাকুমাকে ওই যৌথ আবাসে নিয়োগ করেছিল। সেই বালিকাই কি এই বৃদ্ধা? রাষ্ট্র কি তাহলে স্মৃতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে?

#

সার্জ নিজেকে কোনোদিন নির্বাসিত মনে করেন নি। তিনি মনে করতেন দেশে দেশে তাঁর চিন্তার যাঁরা শরিক তারাই তাঁর সহ-নাগরিক। তবুও স্মৃতি-নির্বাসিত, রাষ্ট্র-প্রত্যাখ্যাত সার্জ ফিরে ফিরে আসেন, কারণ যতদিন রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অস্বীকার করবে, যতদিন অন্য জীবনের অধিকারের দাবি বিশ্বজুড়ে গলা তুলবে ততদিন ভিক্টর সার্জের গভীর, গোপন চলা, সে প্রতিবাদে নিভৃত সঙ্গ দেবে।

সূত্র:
১। মেমোয়ার্স অফ এ রেভোলিউশনারি/ ভিক্টর সার্জ / ভূমিকা অ্যাডাম হক্সচাইল্ড – নিউইয়র্ক রিভিউ বুকস
২। ভিক্টর সার্জ – এ পলিটিকাল বায়োগ্রাফি / সুসান ভাইজম্যান / ভার্সো ২০১৩
৩। মার্ক্সিস্ট ইনটারনেট আর্কাইভ-এ ভিক্টর সার্জ সম্পর্কিত তথ্য https://www.marxists.org/archive/serge/index.htm

Facebook Comments

Leave a Reply