দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলঙ্কময় যৌন সন্ত্রাস-কাহিনীঃসমীক্ষা – শঙ্কর রায়

fail

গত বছর ৯৬ বছর বয়সে প্রয়াত ইন্দোনেশিয় নারী-নির্যাতন প্রতিবাদী ইয়ান রুফ ও’হার্ন মধ্য-১৯৯০ দশকে সাংবাদিকদের সম্মুখে নিজেকে ‘যৌন ক্রীতদাসী’ হিশেবে চিহ্নিত করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিজে তাঁর বাবার ইক্ষু বাগিচায় তাঁকে দখলদার জাপানী সৈন্যরা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে।লন্ডনের ডেলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেনঃ “We weren’t ‘comfort women.It means something warm and soft and cuddly. We were Japanese war rape victims, ” She said her first assailant threatened to kill her with his samurai sword if she did not submit to him. বলেছিলেন , তাঁর প্রথম আগ্রাসী ধর্ষণোন্মুখ জাপানী অফিসার হাতে তরোয়াল নিয়ে বলেছিল, তার কাছে সমর্পণ না করলে তাঁর দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেবে। অসহায় সদ্য তরুণী ভীত সন্ত্রস্থ অবস্থায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। তাঁর মা-বোনেদের অন্যত্র নিয়ে গিয়েছিল জাপানী জল্লাদেরা।
ইয়ান ২০০৭ সালে মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের এক কমিটির সামনে মর্মন্তূদ ভাষায় যৌন ক্রীতদাসত্ব কাহিনী তুলে ধরেছিলেনঃ ‘All single girls from 17 years up had to line up in the compound. The officers . . . paced up and down the line, eying us up and down, looking at our figures and our legs, lifting our chins. They selected ten pretty girls. I was one of the ten. We were told to come forward and pack a small bag. The first things I put in my bag was my prayer book, my rosary beads and my Bible. I thought somehow these would keep me strong. And then we were taken away….We were a very innocent generation.The horrific memories of opening night of the brothel have tortured my mind all my life’

তাঁর নিজের অমানিশাময় রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে ছিলেনঃ “I curled myself into a corner like a hunted animal that could not escape. I made him understand that I was not afraid to die. He could kill me. I would not give myself to him, But I pleaded with him to allow me to say some prayers, and at that moment, I felt very close to God. While I was then praying, he started to undress himself, and I realized he had no intention of killing me. I would have been no good to him dead.He then threw me on the bed and ripped off all my clothes,” she continued. “He ran his sword all over my naked body and played with me as a cat would with a mouse. I still tried to fight him, but he thrust himself on top of me, pinning me down under his heavy body. The tears were streaming down my face as he raped me in the most brutal way. I thought he would never stop.”
অর্ধশতাব্দী পরে ইয়ান তাঁর কথা লিখেছিলেন “Fifty Years of Silence,” যার ভিত্তিতে ১৯৯৪ সালে একটি তথ্য চিত্র নির্মিত হয়েছিল। তাঁর কথায় -“It’s something that’s been bottled up for 50 years, There have been times where I’ve been wanting to scream it out to the world and yet you can’t do it because it is too terrible. Then all of a sudden, phewt, that’s it: it’s out and it’s a release and that’s good.”
টোকিও-তে গিয়েও সাংবাদিক সম্মেলনে তোজো-আমলে জাপানিদের কলঙ্কিত অধ্যায় বিবৃত করেছিলেন। এক ব্রিটিশ জওয়ান টম রুফ-এর সাথে ১৯৪৬ সালে তাঁর পরিণয়। তাঁরা থাকতেন। টম সব জেনে শুনে তাঁকে বিয়ে করেন, তাঁদের দাম্পত্য ছিল সুখের।
ইতিহাসবিদদের আনুমানিক হিশেব মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অন্তত দু’লক্ষ কোরিয়, চীনা ও পার্শ্ববর্তী দেশের (সাম্রাজ্যবাদী জাপান দখলে থাকা) নারীদের যথেচ্ছ ধর্ষণ করেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এরকম বা তার চেয়েও বেশী যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটিয়েছিল নাৎসি ও ফ্যাসিস্ত সেনারা, কিন্তু জাপানী সেনাদের নারকীয় ভূমিকা আমাদের কাছে অনেকটাই অজানা। তবে ফ্যাসিস্তরা অনার্য,ইহুদি ও ফ্যাসিবিরোধী গণতন্ত্রী ও বামপন্থীদের প্রতি যে বিভীষিকাময় আবহ তৈরি করে হাজার হাজার নিরীহ মানুশ-মানুষীদের গ্যাস চেম্বারে মেরে ফেলেছিল ভার সাথে যৌন ক্রীতদাসত্বকে এক করে দেখা যাবে না। এর মধ্যে কোনটি বেশী মানবসভ্যতাবিধ্বংসী সে প্রশ্ন অবান্তর। এই আলোচনা যৌন ক্রীতদাসত্ব নিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সেনারাও কিছু কম যৌন সন্ত্রাসকার্যে লিপ্ত হয় নি। তাতে লাল ফৌজের সৈন্যদের নারকীয়তাও এখন প্রকাশিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত জানা গেছে অন্তত ৮৬০,০০০ জর্মন নারী (যাদের একটা বড় অংশ ছিলেন তরুণী), কিশোরী, কিশোর ও পুরুষেরাও এই বিকৃত কাম এবং রাজনৈতিক হিংসার শিকার হয়েছিলেন। স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধে লাল ফৌজ ও সোভিয়েত জনগণের ইতিহাসসৃষ্টিকারী বিজয়লাভের পরে মিত্রবাহিনী (মার্কিন, ব্রিটিশ, সোভিয়েত, ফরাসী, বেলজিয়াম, পোলিশ, চেক ও সার্বিয়ান) সেনারা রাইখ অঞ্চলের সর্বত্র প্রবেশ করে – তার উত্তর-পূর্বে, দক্ষিণ-পশ্চিমে সব জায়গায়; আল্পস-এর দক্ষিণতম প্রান্তেও। সেই সব তথ্য লিপিবদ্ধ আছে জর্মন ইতিহাসবিদ মিরিয়াম গেবহার্ডের Crimes Unspokenঃ The Rape of German Women at the End of the Second World War গ্রন্থে,যা ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন নিক সমার্স । মানবেতিহাসের লজ্জাকর অধ্যায়ের এক মর্মস্পর্শী দলিল।
তাঁর করুণ স্মৃতিকথার ভিত্তিতে একটি তথ্য চিত্র হয়েছিল। এই গ্রন্থের ভূমিকাতে প্রথমেই গেবহার্ড সেই ছবির কথা বলেছেনঃ It is as if a single frame in a film has been frozen
in our collective memory. It shows a Russian with Asiatic features yelling ‘Urri, Urri’, but demanding not only the watch but also the woman. We have all seen it on television: blonde woman, played by Nina Hoss, amid the rubble, with a slavering Mongol waiting in the shadows. Is there still anything important to say on this subject?”

অবশ্য ধর্ষণের পরিসংখ্যান নিয়ে গেবহার্ডের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। তিনি ভূমিকাতেই তা ব্যক্ত করেছেন।“ According to my calculations, at least 860,000 women (and a good number of men) were raped after the war. At least 190,000 of them, perhaps even more, were assaulted by US soldiers, others by British, Belgian or French. Nothing has ever been said about these victims. Just as the misdeeds of ‘big brother’ were swept under the carpet in East Germany, West German society also kept silent about the attacks by its democratic liberators. The women raped by Russian soldiers were at least afforded some recognition, even if it was manipulated for ideological ends, being used to point a finger in the East–West conflict.” আরো বলেছেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জনগণ গণ ধর্ষণের স্মরণ ডান-বাম প্রশ্নে দাঁড়িয়ে গেছে। একদিকে পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা জার্মান শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংশোধনবাদী এবং ডানপন্থী কর্মী, যাদের কাছে নারীদের ক্লেশ ছিল বৃহত্তর জার্মানির স্বপ্নের অংশ এবং অন্যদিকে ছিল বাম-মার্গিরা, যারা সোভিয়েত সেনাবাহিনীর দ্বারা ধর্ষণকে আড়াল করেছিল সোভিয়েত বাহিনীর ‘মুক্তিদাতা’ তকমা দিয়ে।”
ইঙ্গ্রিড শ্মিট-হার্জবাচ, বারবারা জোহর এবং গারহার্ড রিচলিংয়ের সাথে গঠিত হেল্কে সান্ডারের সমীক্ষা টিম এর হিশেব মতে ধর্ষিত নারীদের মধ্যে ২০ শতাংশ গর্ভবতী হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ গর্ভপাত, এবং প্রায় ৫ শতাংশ শিশুরা বার্লিনে ১৯৪৫ এর শেষেও গ্রীষ্মে, যার জন্য রুশীদের দায়ী করেছিল। গেবহার্ডের হিশেবে সেই অভাগিনীদের অন্তত ১০,০০০ জন হয় সিফিলিসে আক্রান্ত বা অত্যাচারে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তিনি ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন, “On this basis, arrived at through random samples in Berlin hospitals and taking the figure of 1.4 million women living in Berlin at the time, it determined that around 110,000 women, or 7 per cent, had been raped by Red Army soldiers in early summer and autumn 1945.33 Of these, 10,000 had died or became seriously ill with gonorrhoea – which often made them infertile – or syphilis

এ নিয়ে অনেকগুলি বই লেখা হয়েছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য ফিলিপ স্লাভেস্কি-র The Soviet Occupation of Germany Hunger, Mass Violence, and the Struggle for Peace, 1945–1947।তিনি লিখেছিলেন,’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরূপ ধর্ষিতা জর্মন মহিলারা ভুল শিকার হয়েছিল …যারা মারা গিয়েছিল, পঙ্গু হয়েছিল বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল তাদের সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত ছিল না; কারণ তারা নাৎসি শাসনের শিকার না হয়ে বরং এর বিপরীতে হয়ত নাৎসি অপরাধে জড়িয়ে থাকতে পারে।’ তিনি নাৎসি বাহিনীর যৌন নিপীড়নের কথা যা যুদ্ধের সময় পার্শ্ববর্তী সোভিয়েত অঞ্চলে স্বভাবতই প্রবল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল।প্রতিহিংসার পথে প্রতিশোধের উস্কানিও দেওয়া হয়। স্লাভেস্কির ভাষায়ঃ “German forces took millions of Soviet women as slave labour to Germany, fewer as sexual slaves into the bordellos that dotted the Soviet occupation landscape. Where the bordellos did not suffice in number or taste, the Germans raped widely in the chasms between. Women’s labour was booty and their bodies a spoil of war. This sparked a fierce propaganda campaign in the Soviet press, calling soldiers to protect their womenfolk from the ‘fascist beasts’ and avenge those whom they could not।” হিটলারের পতনের পরে লাল ফৌজের (অন্তত একাংশের মধ্যে ) সেই প্রতিরোধ-স্পৃহা অনেক ক্ষ্রেত্রে লাগামহীন জিঘাংসা ও যৌন সন্ত্রাসের রূপ নেয়। স্লাভস্কি লিখেছেনঃ “…in the chaos of the advance and disintegration of military discipline where much became permissible, more direct, less symbolic reasons remained in play. Soldiers were often blind drunk, sex-starved for years and couldn’t be bothered looking for four standing walls in the rubble to rape women in private, German or not. In the place of slavery, forced starvation and mass exterminations – the hallmarks of the German occupation – rape became widespread in 1945.
Looting and wanton destruction more so. Soldiers marvelled at the solid-cut stone manors in the countryside of East Prussia, filled with preserved foods, polished furniture, and full-sized mirrors, filled with everything unavailable in their impoverished villages back home. Faced with the question of why such a rich nation as Germany would invade and try to enslave their own poor utopia, the soldiers simply smashed to pieces all the wonderful things they couldn’t loot. They razed the mansions to the ground and killed the remaining rich landowners as their fathers had done to their own back in 1917 at the time of the revolution.” (পৃ ২১-২২)।
সেই সময় জর্মনিতে কর্মরত রুশ যুদ্ধ সাংবাদিক নাতালিয়া গেস কবুল করেছেন, সোভিয়েত সৈন্যরা আট থেকে আশি বছরের জর্মন মহিলাদের বলাৎকার করেছিল।লাল ফৌজিদের ধর্ষণের তথ্য- পরিসংখ্যান নিয়ে অন্যমতও আছে। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হিচকক তাঁর The Bitter Road to Freedom: The Human Cost of Allied Victory in World War II Europe গ্রন্থে লিখেছেন প্রায় ২০ লক্ষ জর্মন মহিলা সোভিয়েত ফৌজিদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন। যাঁরা ৬০ থেকে ৭০ বার বিকৃত কামের শিকার হয়েছিলেন,তাঁদের সংখ্যাও অগণিত। অবশ্য ডেমোগ্রাফারদের এ নিয়ে সাধারণ অভিমত এই ধরণের শুমারি বা রাশিবিজ্ঞানগত নমুনা সমীক্ষা একেবারে সঠিক হবার সম্ভাবনা কম।

স্তালিন এসব জানতেন, কিন্তু এসব রুখতে চেস্টা করা তো দূরস্থান,বরং ইচ্ছে করে শুধু নীরব থাকেন নি, এদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেন নি। স্তালিন-পুরস্কারপ্রাপ্ত ও একদা মার্শাল যোসিফ ব্রোজ টিটোর ঘনিষ্ঠতম মিলোভান জিলাস (যুগোশ্লাভিয়ায় যাঁর স্থান ছিল টিটোর পরেই) এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে স্তালিনের বক্তব্য জানতে চাইলে স্তালিন বলেছিলেন,জিলাসের বোঝা উচিৎ হাজার হাজার কিলোমিটার রক্ত, আগুন ও মৃত্যুর পথ পেরুনো তরুণ সেনাদের মানসিক বিদ্ধস্ততার দিকটা -Djilas should “understand it if a soldier who has crossed thousands of kilometers through blood and fire and death has fun with a woman or takes some trifle।” (M. Djilas, Conversations with Stalin, trans. M. B. Petrovich, New York: Harcourt, Brace & World, 1962, পৃ ১১০)।

[লেখক – বরিষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিশিষ্ট মার্কসপন্থী চিন্তক।]

Facebook Comments

Leave a Reply