রাজস্থান ডায়েরিস : সিন্ধু সোম

fail

পর্ব-১২

রাজস্থান ডায়েরিস—২৩

ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ। “শোন শোন শোন মজার কথা …”! একটা হনুমান মায়ের লেজ জাপটে ঝুলছে। কদমের শিষ। আতাগাছে মৌতাত। মাধবীলতার থোকা ঝুলছে। সাদা বকের রাজ্যজয়। প্রত্যাবর্তন। সোনার থোক। দেয়াল বয়ে বেড়ায় শতদ্রু। পাঁজর থেকে পাঁজরে। ঝর্ণা হয়ে হেডিসের গভীরতা পাল তোলে। কালো অন্ধকারে বুক চাপড়ায় স্থৈর্য। একে একে বিধবার বুকে উল্টো রিলের মতো ফিরে আসে সংকীর্ণতা।আবর্ত। ঠকঠক। ঠকাঠক। মাঝির মাস্তুল কাটে কাঠঠোকরা। নাচিয়ে বেড়ায় দুপুরের মাদারী। ছিয়াত্তরের মরা মাংসের চানাচুর মনে পড়ে। মূর্খের দল জানলোই না কোনও দিন। শিবের কোনো লিঙ্গ হয় না। ঊমার ভিখারিরা জন্মে জন্মে মাধুকরীর আশায় ফেরে। সভ্যতার ছাই অহং-এর মতোই চিনতে দেয় না তাকে।

সত্যজিৎ তাকান ঋত্বিকের দিকে। শেষমেশ ভূতের নাচ। ও বাদে প্রবাদ হয়ে ওঠে না কেউ। গলা চুলকাতে চুলকাতে কুলকাঁটার বিস্ময়। পৌঢ়ার টিপে অপেক্ষার বীজমন্ত্র। গতির আহুতিতে বেঁচে থাকা বাসা বাঁধে অভ্যাসের ঘরে। ওষুধের দোকানের পাশে থিরথির করে কাঁপে কালো একটা মেয়ে। চাদরে জড়ানো শরীরের ছাপ। আস্তে আহ্‌স্তে। ব্রেক মারে নোংরার গাড়ি। একটা তোরণ। খুদের সঙ্গে বিক্রি হয় টিকিট। পাহাড়ের বুকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে শহর। গতরাতের স্মৃতি। ভাঙাচোরা টুকরো বয়ে বেড়ায় আইসক্রিমের গাড়ি।

ঝুপ। নিভে আসে প্রেক্ষাগৃহ। দোলনচাঁপার মোটা পাতায় ঝাউ তার অস্বস্তি ছড়ায়। ভিজে ওঠে পাম। ছোঁয়াচে অশ্বত্থ পাতা। খাঁজ বেয়ে নীরব জোৎস্না। সুপুরি মুখে পিক ফেলে কেউ। বটের ফলে ঠোঁটের কালি। আমি বিবাহিতার আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে নিই শ্রদ্ধা, স্নেহ, পাপ। পাহাড়ের গায়ে কাঁটা দেয়। রোয়ার বিছানায় গান ধরেন প্রতুলবাবু। “করি বাংলায় হাহাকার…”! আমার পাথরছেঁড়া পংক্তি সুর খোঁজে বিবাহিতার বুকে। কৃষ্টি চেয়ে থাকে অবাক হয়ে। জর্জের গলায় ঋত্বিকের লিপ। অসহনীয়তা মাথা টিপে দেয় কালবৈশাখীর। মোনালিসা আদুরে গলায় কাজে যেতে মানা‌ করে। ক্র্যাঁঅ্যঅ্যাঅ্যাচ। চাকা ঘোরার আওয়াজে সরে গেল পর্দা। আমরা এক কোমর উষ্ণতা নিয়ে দেখি সারি সারি রাজা, মন্ত্রী, সেপাই। শুরু হল ভূতের নৃত্য।

দুদিকে লাল মোরাম। কালো টিকার মতো পথের শেষ চোখে পড়ে না। আখেরন বুকের হাওয়ায় আদর জন্মায়। টিপ পরেছে পথের বুড়ি। শনের মতো রুক্ষতা তার ধুলোর চুলে। লাইট হাউস। লাইট হাউস। “মরুভূমিতে? ধ্যাত!” গা ঠেলে বিবাহিতা। “কূলটার জন্যে বাতিঘরের ব্যবস্থা করে সমাজ। চিরদিন।” আমার মুখে বাস্তবের থুতু বেরোয়। মুখ নামিয়ে নেয় বিবাহিতা ঝটিতে। তারপর মরুভূমির দৃষ্টি। চোখের ওপর চোখ। ঠোঁটের উপত্যকায় নেমে আসে সিঁদুরে মেঘের ছায়া। বলে, “বাতিঘরে সন্ধেপ্রদীপ জ্বালিয়েছি। আমার নাও পথ না ভুললে, সমুদ্র অমরত্ব পায় না গো!” সাদা পর্দা টানা তখন মঞ্চে। ঝম ঝম। পায়ের সাথে তাল রাখছে কৈলাস। মরুর বুকে খনির প্রেক্ষাগৃহ। কাঁধে তিল কাঁপে দুরু দুরু দুরু। রাজা উজির খোঁজা সামন্ত। মোটা ভূত রোগা ভূত। আধা ভূত গোটা ভূত। আমার বুকে এটা ভাঙা আধুলি ফেলে দিয়ে উঠে পড়ে বিবাহিতা। হলুদ উগ্র আল ধরে হাঁটতে থাকি আমরা। নদীর একাকী তীরের সঞ্চয় নিয়ে। ভূতের নাচের একটা অনুরণন আছে। আমাদের ঘিরে নাচতে নাচতে চলেছে দুটো ভুতুড়ে ছায়া। প্রাকৃত ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ছায়াবাজীতে বিশ্বের পরকীয়া ঊরু ছোঁয় শীতের কম্পনের। কুয়াশা নামে, কুয়াশা নামায়, কুয়াশা নামান্তর ঘটায় সাজাঁর শিশিরের। টুব টুব টুব। ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা। ফোঁটা ফোঁটা। ফোঁটা।

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
৩১শে অক্টোবর ২০১৮
দুপুর ১২টা ৪১

বাগানপাতা দেখেছ? হয় কি? আর তুমি বল সমগ্রতা!

রাজস্থান ডায়েরিস—২৪

মাটির বুক চেরা। গোলাপি পাথর। চাষ হয় মাদকতা। জেয়পুর। একটা গোটা উপত্যকা গিলে খেয়েছে বাবলার জঙ্গল। মোবাইল টাওয়ারের সিঁথিতে অলঙ্কার দিয়ে যায় ধূসরতা। নরখাদক চিতার দাঁত। আমার রূদ্রপ্রয়াগ মনে পড়ে। করবেটের মতো কলোনিয়াল(?) ব্যক্তিত্ব হাজার হাজার বছর বেঁচে থাক। আমি মরুভূমির প্রান্তে হেঁটে যাব। গাড়ির কাঠামোতে ছিট ছিট দাগ। বুকে হেঁটে আসছে উদারতা। রঁদ্যার আগুন। পাথর মোমে জন্মদাগ বয়ে বেড়ায় স্নায়ু। আকাশবাণী-

“দোষ, দোষ, দোষী……কেউ সমস্ত তোমার মন ভেঙে
ছড়িয়েছে টুকরো টুকরো এই ক্ষেতে-মাঠে
কোনোটি জোনাকপোকা হল তার, কোনোটি ফড়িং
উড়ে উড়ে দিনরাত্রি কাটে।

কেউ লিখতে ডাকল না। খাতা খাতা উপন্যাস লিখে
শুয়ে পড়লে ট্রামের তলায়
বুক থেকে চাকা ঠেলে উঠে পড়ল লেখা সব—-
লাইনের পাশে
কাটা সমালোচক গড়ায়।

আমরা তার রক্তমাখা মুখ থেকে শেষ হাসি পান করলাম
আমাদেরও গ্লাস রক্ত ভরা
ঠোঁট তুলে থমকে আছি দু-এক সেকেন্ড—
এক্ষুনি আরম্ভ হবে পানোৎসব, হুল্লোড়, মশকরা।

তার আগে জোনাকপাখি, কোন ফাঁকে তার আগে ফড়িং
ঢুকে এল? ধর, ধর, এক যোগে হুমকি খেয়ে ধরে দেখি,
মরা!
দোষ, দোষ, দোষী……কেউ কবির সমস্ত মন
দলে পিষে ভেঙে
একটু একটু করে গড়ছে, প্রতিদিন এই বসুন্ধরা।” [১]

জীবনানন্দের ট্রাম আমায় দিতির কথা বলে। চূড়া করে বেঁধে রাখা বাজরা। এক একদিন ভোরের জলছবি। ওমনি করে চুল বাঁধত দিতি। আমি তাতে রঙ ডুবিয়ে নিতাম। মোনালিসা পিছু ডাকে। আমি লিওনার্দোর অগ্নাশয়টা বোঝার চেষ্টা করি। চারটে বিচ্ছু। জোরে জোরে হাত। ক্লিপ ক্লিপ। তুড়ির ফাঁকে টানা পাখা। মাকড়সার মতো কাঁটা গাছ। দিতির চুল আমি খুলে দিতাম একটানে। দূরে হারিয়ে যাওয়া রাস্তার মোহনার মতো বৃদ্ধা বাঈজী। বকর বকর। লোকে ভাবে পাগল। সে তাল কাটলে উত্তমের মতো বলার কেউ নেই—”কিরে! থামলি কেন? বাজা!” রাজস্থান রক্তের দেশ। তার কর্ষনে পলি নেই, নিষিদ্ধ পল্লীর ঠোনা ফুটে ওঠে।

বৃদ্ধার নির্ঘুম চাকা কেশে কেশে ওঠে। শুকিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি আসে যায়। কৃষ্ণাঙ্গ চাবুকের দাগ লেগে থাকে কেবিনের গায়। বিবাহিতা দাঁড়ায় এসে পাশে। বোতল সামনে রাখি। শীতলা মন্দিরের গায় বাসা বাঁধে শ্যাওড়ার ঝাড়। হাজার বছরের সূর্য, একদিন এক বিকেলে তাকায় বোতলের চশমায়। বিবাহিতার হাতে পাত্র। য়ুগ য়ুগ য়ুগ। সাড়া জাগানো শব্দ। নিটের কবিতা। বিবাহিতা আবৃত্তি করে আমার প্রতিবিম্ব হয়ে—

স্বপ্নগাঁথার সে অমসৃণ ঘাসে, যদি
একান্তই যেতে হয় একদিন

রেখে তো যেতেও পারো,

পড়ে থাকা পড়ার টেবিলে,
একতিল সাদা কাগজ, তার কোন চেপে ধরে

ফালি ফালি
বিকেলের শেষ তরমুজ ও তার গায়ে আঁকা
কারাগার—
শেষের জন্য, অবশেষের আরো একবার উন্মুখ ঠোঁটরঙ মাখা
একটা স্কচের গ্লাস
আর দুটো বরফের চূড়া
আলগোছে…

দিতি আমার জন্মদাগ। আবিরের রঙে কান্না ছলকে ওঠে। আমাকেও যেতে হবে। একদিন সমস্ত দরজার আগল খুলে যায়। এমনই একটা সূর্যাস্ত জন্মের পর জন্ম বেগার খাটে। বিবাহিতা আলতো চাপ দেয় হাতে। কাজলের কলঙ্ক তার গালে। রোদ জড়িয়ে ধরে শেষবার। আবার শুরুর আগে। ওকে ছাড়িয়ে পিছনে সময় দেখি চুপ। মাথা নিচু। চিবুক তুলিনি। কানে ফুঁ দিলাম জোরে। শিউরে উঠল ভেজা মুখের রেণু। আমার আবার রাণুর কথা মনে পড়ল। “সে কি এল, সে কি এল…”। সময়ের ভয় নেই। বুকে লাগিয়ে ফেললে গলতে থাকা কাজল আর ঠোঁটরঙের দাগ। সাদা জামায় শুকিয়ে ওঠা রক্তের মতো। আমি বললাম,”এটা কি হল?” সে বললে,”ক্ষয়ের কাজ চিরদিন অক্ষয়ের মূল্য দেওয়া। তোমরা বুঝবে না!” পাগলী! আমার থেকে বেশি সময়ের আবর্তে রয়েছে কে? মোনালিসা একটু দূরে। লিও আসে নি। ওর জ্বরের ভান পেয়েছে। আমি মোনালিসার চোখে চোখ রেখে বললাম,”ভালো থেকো!” ওর হয়তো এর থেকে বেশি চাওয়ার উপায় ছিল না। ও চোখ নামিয়ে মাথা নেড়ে বললে, “আপনিও”! বিবাহিতা ওর মাথায় আঙুল বুলিয়ে দিলে। এদিকে আর চাইলে না। আমি গ্লাস টুকু শেষ করলাম বিবাহিতার। এগিয়ে চললাম ঘাটের দিকে। ক্লান্ত সূর্যের কপালে ঘাম ফুটে ওঠে।

সেই অপ্সরা। আজও চিনতে পারলে। ঝিলিক ঝিলিক নথ। “আবার এসেছ?” “আবার এসেছি।” “আবার আসবে?””আবার আসব।” ক্লান্ত পর্দার মতো দৃশ্যপট খসে গেল। নারকেলের খোলে করে যেন কেউ আবির ছড়িয়ে দিল আমার গভীর থেকে গভীরে। চারদিকে নাকাড়া বেজে উঠল। দ্রিমি দ্রিমি। আস্তে আস্তে ঘাটের তীরে জ্বলে উঠল প্রদীপ। দিতির নেশা আমার কানে কানে বলতে লাগলো,”খেয়া আসবে, খেয়া আসবে, খেয়া…খেয়া…”!

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
৩১শে অক্টোবর ২০১৮
বিকেল ৬টা ৩১

__________________________________________

তথ্যসূত্র:-
[১] জয় গোস্বামী

Facebook Comments

Posted in: July 2020 - Serial, PROSE

Tagged as: ,

Leave a Reply