কাশবনের ভাস্কর্য : শুভংকর গুহ

fail

নিজের কিছু কথা ভোরের পাখির মতো সত্য হয়, এই পড়ে পাওয়া জীবনে অস্বীকার করি কি করে? নিজের স্মৃতিকথার সাথে এক ঝাঁক ছাতারে উড়ে আসার দৃশ্যকে মেলাতে গিয়ে দেখি, সবটাই বাতাসে উড়ে যাওয়া খইয়ের মতো লুটোচ্ছে বসতখানার উঠোন জুড়ে। কিছু কথা তুলে নিলে অনেক কথাই আবার যেন থেকে যায়, বাকি শুধু কল্পনা কৃষিজমি কর্ষণের মতো এক অভ্যাস, আত্মকথাকে ক্রমশ উর্বর করে তোলে।”কথাসাহিত্যিক শুভংকর গুহের আত্মকথা ‘কাশবনের ভাষ্কর্য’। বাবার কর্মসূত্রে পানাগড়, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ, মথুরা, কানপুর, এলাহাবাদ সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছেন লেখক। সেই যাপনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এক সময়ের দলিল নিঃসন্দেহে।

কাশবনের ভাষ্কর্য - শুভংকর গুহ

হ্যাঁ। আজ্ঞে হ্যাঁ। অনে, নিজের কিছু কথা বলার জন্য তেমন উৎসাহী আমি কোনোদিন ছিলাম না। কিন্তু পড়ে থাকা কথাগুলি ক্রমশ ঘন কাশবনের গভীরে একটি শরীর হয়ে উঠেছে। ভাঙ্গাচোরা মূর্তির মতো, বুনো ছায়ার অন্তরালে থেকে যাওয়া অনেক কথাই মরা শামুকের খোল হয়ে উঠছে। চারদিকে ছড়ানো লাল মাটির নুড়ির মধ্যে কথাগুলি অনাপ্লুত ভাস্কর্য।

নিজের কিছু কথা ভোরের পাখির মতো সত্য হয়, এই পড়ে পাওয়া জীবনে অস্বীকার করি কি করে ? নিজের স্মৃতিকথার সাথে এক ঝাঁক ছাতারে উড়ে আসার দৃশ্যকে মেলাতে গিয়ে দেখি,  সবটাই বাতাসে উড়ে যাওয়া খইয়ের মতো লুটোচ্ছে বসতখানার উঠোন জুড়ে। কিছু কথা তুলে নিলে অনেক কথাই আবার যেমন থেকে যায়, বাকি শুধু কল্পনা কৃষিজমি কর্ষণের মতো এক অভ্যাস, আত্মকথাকে ক্রমশ উর্বর করে তোলে। যত অতীতের পিছনে যাই, স্মৃতিগুলি অনেকটা জলের ওপরে বৈঠার দাগ কেটে যাওয়া যেন। প্রথমে ছায়া, তারপরে অনেক আলোর দাগ, সেই  সঙ্গে ছেলেবেলার শরীরের গন্ধ, দুধের বাটিতে লাল পিঁপড়ের সমাহার। পিতলের বড় থালা জুড়ে ডাল ভাতের চরা পাশে কাঠের টুকরোর মতো শক্ত উপাদান ও লোনা, সাদা ফতুয়ার পকেট জুড়ে জামের বেগুনি কষ্টা দাগ, আর ভাঙ্গা স্লেটের ওপরে চকের দাগ,  পাগলা কুকুরের তলপেটে কার্তুজের ক্ষত। অনিয়মিত কথা টোকা দিয়ে যায়,-পরের পর কথাগুলিকে রেখে যাই – খাটাস, সাদা ও বাদামি খরগোশ, গোখরো, কাশবন, সামরিক বাহিনীর টিনে মোড়া ছাউনি, রাইফেলধারী সৈনিক, আর পুজোর উপহার বাদামি চামড়ার নতুন ফ্লেক্স কোম্পানির জুতোর গন্ধ।

গোটাটাই ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া। পানাগড়ের বেসকম্যান্ডার এরিয়া, মানুষের স্বাভাবিক জনজীবনের বাইরে। এক অন্য জীবন, সর্বক্ষণ অনুশাসনের ব্যস্ততা নিয়ে, যুদ্ধ যুদ্ধ প্রস্তুতি। সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সামরিক বাহিনীর ব্যস্ততা, মোটর সাইকেলের ভুট ভুট তীব্র ব্যস্ততা। ভারি ভারি ট্রাকের রাস্তা জুড়ে দখল, পিলখানার দেওয়ালের স্পটে সৈনিকদের রাইফেলের নিশানা। বন্দুকধারী সৈনিকের হিন্দুস্তান কি কসম… সামরিক আবাসনের দেওয়ালে দেওয়ালে সুবেদার জ্ঞানবন্ত নায়েকের পাগলা উন্মাদ কুকুরের ছায়া খুঁজে যাওয়া।

বারান্দার থামের ওপরে বসে কাশবনের লকলকে আগুন দেখছিলাম। বছরে দুইবার, সামরিক বাহিনীর কর্তাদের নির্দেশে কাশবন পুড়িয়ে ফেলা হয়। সাদা খরগোশকে দেখা যায় উল্কার মতো ছুটে যেতে। যে খরগোশ পারে না, গর্তের ভিতরে সেদ্ধ হয়। এদিক থেকে সেদিক, অথবা সুড়ঙ্গ ফুঁড়ে ভেসে যায় অন্য ফাঁকা মাঠের দিকে।

দেখছিলাম, শূন্যে বাতাসে কেমন বিহারি রমণীর ওড়নার রঙ ধুলোপথ ভাঙ্গছে। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, লাঠিতে ভর দিয়ে, হাতের লোহার চকচকে বালা ঠোকাঠুকি করছে। তার মরদ যাকে ফৌজি অফিসার ও সৈনিকরা পণ্ডিতজি বলেন, তিনি গেছেন ক্যাপ্টেন সাহেবের দপ্তরে। ব্রাহ্মণ বিহারি পণ্ডিত, তুলসিদাসি রামায়ণ গীতা ও মহাভারতের কথাসাগর কণ্ঠস্থ। ক্যাপ্টেন সাহেব শ্রদ্ধাভরে বলেন,– আপনাকে এত ব্যস্ত হতে হবে না। ধুলো ময়লা পরিষ্কার করার লোক আছে আলাদা। ক্যাপ্টেন সাহেব চেল্লাতে থাকলেন,– রামস্বরূপ… রামস্বরূপ… রামস্বরূপ…

পণ্ডিতজি বললেন,– এখানে গীতা রাখব বলে, একটু ঝেড়ে নিলাম।

গীতা ও গঙ্গা মাইয়ার তর্পণের শ্রদ্ধাঞ্জলি এক স্থানে রেখে ক্যাপ্টেন সাহেবের কাজ গুছিয়ে দিতে হয়। ফাইলপত্তর, ছড়ানো ছেটানো কাগজপত্তর টেবিলের ওপরে যাবতীয় গুছিয়ে দেওয়া, তোয়ালে টুপি আর বার্ণিশ করা কাঠের রুলার ক্যাপ্টেন সাহেবের হাতের কাছে রেখে দেওয়া। সুবেদার হরভজন অরোরা প্রবেশ করে, জানিয়ে গেলেন, বেস এরিয়াতে বিকেলে আজ পাঠ আছে, পণ্ডিতজির আমন্ত্রণ আছে।

ক্যাপ্টেন সাহেব বললেন,– তাঁবু টানিয়ে নেবে সুবেদার। বিকেলের দিকে ঝড় বৃষ্টি হতে পারে।

দপ্তরের ভিতরে বাবার টাইপ মেশিনের খটাখট টরেটক্কা শব্দ। শর্টহ্যান্ডের লিপি দেখে বয়ান টাইপ হচ্ছে। সেন্ট্রাল স্টোর্সের বিভাগের তালিকা গুছিয়ে উঠছে বাবার আঙ্গুলের টোকায়। আর্মি ট্রাক, আর চলতি ভাষায় দাওয়াইয়ের গোছানো তালিকা। প্রতিদিনের পিলখানার নিশানার জন্য কার্তুজের সংখ্যা, এই সব গুছিয়ে ওঠা তালিকা ক্যাপ্টেন সাহেবের খাস তদারকিতে।

প্রতিদিন সকাল দশটার পরে বাবার দপ্তরে মায়ের হাতের প্রস্তুত করা খাবারের লাঞ্চবক্স বাবার অফিস ঘরের পিছন দিকের ডেস্কে রেখে দিয়ে এসে, কোয়ার্টারের থামের ওপরে বসে, কাশবনের আগুন ছড়িয়ে পড়া দেখতে দেখতে ভাবতাম, আমার বেড়ে ওঠা ঠিক এইখানেই থেমে গেছে। এইসব ছেড়ে বাকি পড়ে থাকা জীবন আর কতদূরে যাবে ? কিন্তু জীবন যে এক বড় রসিকতা তখন জানব কি করে ?

সময় যেন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়, তুমি যেতে না চাইলেও তোমাকে যেতে হবে, নিজের বাসখানার থামের ওপরে বসে, কাশবন দেখার বিলাসিতা বর্জন করতে হবে।

ধুধু কাশবনের ওপারে ইস্পাত কারখনার চিমনির ধোঁয়া, রাতের দিকে ইস্পাত কারখানার বয়লারের লাল আগুন, সন্ধ্যার আকাশকে পুড়িয়ে দেয়, লোহা গলে যায়, মানুষ আকার দেয় টিনের চাদরের। লোহার রডের। লোহাকে মানুষ শাসন করে, আর সুযোগ বুঝে নিজের গুণকে মহিমান্বিত করার জন্য গর্বে বলে ওঠে,–“লোহার মতো কঠিন”।

এখন প্রখর রোদ ও গরম। মাটি শুকিয়ে চট্টানের মতো। পণ্ডিতানি আসছিলেন। আমাদের বাড়ির দিকেই। পণ্ডিতজির পত্নী। অধিকাংশ ফৌজি বা সৈনিকরা তাকে মাইজি বলেন। মাতাজি বা মা। পণ্ডিতানির হাঁটাচলায় মায়ের সর্বজনীন প্রকাশ মুগ্ধ করে দেওয়ার মতোই। ক্যান্টনমেন্ট বা সামরিক বাহিনীর ছাউনির মধ্যে পূজা পার্বণ বা যে কোনো প্রদেশিক উৎসবে পণ্ডিতানির আগ্রহ তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতোই। নিজের ঘরে বসে তিনি সারাদিন নানান পিঠে বানাতেন। তার মধ্যে তার হাতে তৈরি করা, চিনির রসে চোবানো মঠ বিখ্যাত ছিল। ময়দা চিনি আটা ও নানান সংমিশ্রণে এক ধরণের বিহার প্রদেশের পিঠে। ভীষণ সুস্বাদু। কর্নেল সাহেব থেকে মেজর ক্যাপ্টেন ও সুবেদার মেজর সাহেব সবাই পণ্ডিতানির হাতে তৈরি করা মঠের স্বাদ পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। একটি বড়সড় পিতলের থালা যাকে তিনি বলতেন, পরাত, সেই পরাতের ওপরে সাজিয়ে নিতেন থরে থরে গোল আকৃতির ভারি পিঠে। ক্রুশে বোনা সাদা ঝালর দিয়ে, ঢেকে আনতেন। ক্যান্টনমেন্ট এরিয়ার চিফ ক্যাপ্টেন মিস্টার ব্রজেন মিশ্রা নিজেই এগিয়ে এসে কুর্ণিস করে বলতেন,– সব ভালো তো মাইজি, অনেকদিন পড়ে মনে পড়ল ?

না বেটা, নাঃ… একদম না। এই নাও রাখো। অনেকদিন পড়ে সত্যিই এলাম। তিনদিন ধরে ঘরে বসে তোমাদের জন্য তৈয়ার করলাম।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্র বললেন,– এই সামান্য ফৌজি জীবনে মায়ের উষ্ণতা আমাদের কর্মজীবনকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। আসুন। আপনি এইখানে বসুন।

আর্দালি এসে একটি কুর্সি এগিয়ে দিলেন। তোয়ালে দিয়ে মুছে দিলেন।

পণ্ডিতানিজি বললেন,–না সাহেবজি অনেক কাজ। আমার অনেক ছোটা ফৌজি আছে, ওদের জন্যও আছে। ওদের দিয়ে আসি, রোদ থাকতে থাকতে নিজেরা বাটোয়ারা করে খেয়ে নিও।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রা হাসতে হাসতে বললেন,-এক মঠের খণ্ডেই যুদ্ধ জয়। কিন্তু মাইজি আপনি আমাকে সাহেব বলছেন কেন ? বলুন,-“বেটা”।

আমার মায়ের রন্ধন পদ্ধতি চলছে এ্যাসবেস্টসের নিচে। টিনের ছাউনিকে গোল করে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, বড় বড় ঘর, হাওয়া বাতাস হুম হুম করে। কিছুক্ষণ আগে মাধবীলতার জংলার নিচে শহর সাজিয়ে এসেছি। শহরের অনেক গল্প শুনেছি, শহরে জন্ম হলেও চেতনায় শহর দেখে মনে রাখার মতো মস্তিস্ক তখনও গড়ে ওঠে নি। নানা টিনের টুকরো ঢিল পাথর ও কাঠের শুনো চৌকো দিয়ে শহর শহর খেলা এখনও মনে পড়ে, মনে পড়ে ভাঙ্গা আয়নার টুকরো ফেলে সরোবর বা পুকুর রচনার হাস্যকর খেয়াল। হলুদ রঙয়ের বালু ফেলে রাস্তা রচনা ও পাশে কাশফুলের অজস্র ছেঁড়া টুকরো ও শুকনো ঘাস কাঠকুটো পাশাপাশি রেখে বনভূমি গড়ে তোলার  অদ্ভুত প্রয়াসকে এখন যেন বহু বছর আগের ফিল্মি গানকে মনে করিয়ে দেয়, …দুখ ভরে দিন বিতে রে ভাইয়া… অব সুখ আয়ও রে… রঙ জীবন মে নয়া লায়ও রে… মনে করিয়ে দেয় ব্যাঙ্গের ছাতা রেখে, আবাসন স্থাপনের অদ্ভুত ইচ্ছাকে। একবার মনে আছে এক চড়ুই দম্পতি আমার নিজের হাতে গড়ে তোলা শহরের ভিতরে আস্তানা গড়ে তুলল, পাখনা ফুলিয়ে পিঠে চড়ে আদর করল, জ্যেষ্ঠজন বলল,-বিরক্ত কোরো না, ডিম দেবে। সেই সময় থেকে বুঝেছিলাম, চড়াই পাখির পালকে এক প্রকার নোনতা গন্ধ থাকলেও নুনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

পণ্ডিতানিজি, থামের খুব কাছে এসে বললেন,– নেমে আয় বেটা।

আমি তার হাতের রেকাবিতে পিঠে দেখতে পেয়ে হাত তুলে নিয়ে নেচে উঠলাম। তিনি আমার মুখের মধ্যে, একটি মঠ আদরে ঠুসে দিয়ে বললেন,– খা লে বেটা। তোদের সবার জন্য এনেছি। আমার সমস্ত মুখ জুড়ে তার ময়দা আটা চিনি ও ঘিয়ের আদর টুপ টুপ করছে। কি চমৎকার মঠ। তার পিঠে যেন স্বর্গীয় স্বাদের অনুভূতি।

পণ্ডিতানিজি আবার বললেন,– কালকে সকালে আমার বাড়িতে যাবে। আমি তোমাদের জন্য আরও কিছু খাবার করে রাখব।

এই কথা বলার পরে, তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এল। মা রান্নাঘর থেকে এলেন একবাটি মেটে আলুর কষা নিয়ে। বললেন,– পণ্ডিতজিকে দেবেন। আমাকে অনেকবার তিনি বলেছেন, মেটে আলু যদি কড়াইয়ে নাড়ো, তা হলে একটিবার এক কটোরি মনে রেখ।

দেখেছ পণ্ডিতজি কত লালচি।

মা লজ্জা পেয়ে বললেন,– সীতারাম মাথুর পণ্ডিতজিকে দেখলে, একসাথে নাম নেওয়া হয়ে যায়। তিনি লোভী হলে তাকে তুষ্ট করার মধ্যেও আমার পুণ্য অর্জন থাকে মাইজি।

আমি  মাকে বললাম,– দেখেছ পণ্ডিতানিজির চোখে জল ?

হ্যাঁ রে তাই তো ?

পণ্ডিতানিজি লজ্জা পেয়ে বললেন,-না, না, এমনি। ভাবছি তোমাদের না দেখে থাকব কি করে ? এই মাত্র অর্ডার শুনে এলাম যে ?

কি শুনে এলেন ?

ভাইসাহেবের বদলি হয়ে গেছে। রামস্বরূপ… আমাকে কানে কানে বলল।

হ্যাঁ, আপনার ভাইসাহেব গতকাল রাত্রে তাই বলছিলেন আমাকেও। কলকাতায় হেস্টিংস্ যাওয়ার অর্ডার হয়েছে। অর্ডার কি বেরিয়ে গেছে ? আপনি কি আরও শুনে এলেন কিছু ?

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজির অফিসে গেছিলাম মঠের পরাত নিয়ে। অনেকদিন ফৌজি ভাইদের নিজের হাতের তৈরি মিঠাই খাওয়াই নি। দেখলাম ভাইসাহেব একমনে কাজ করে চলেছেন। সেখানেই শুনে এলাম।

আমি ওদের কিছু কথা বুঝতে পারছিলাম, বাকিটা বুঝতে পারছিলাম না। যে ভাষায় আমি কথা বলি, সেই ভাষার নাম বাংলা। কিন্তু চারদিকে গড়গড়িয়ে বংলায় কথা বলার লোক নেই। অধিকাংশই অবাঙ্গালি। বিহার উত্তরপ্রদেশ পাঞ্জাবি হিমাচলি গোর্খা গাড়োয়াল প্রদেশের মানুষজন। কারণ আমি ভাবতেই পারছি না, এখানে থাকার ব্যবস্থাটি যে একটি অর্ডারের মাধ্যমে অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আমি বিস্মিত হয়ে মায়ের দিকে আর পণ্ডিতানিজির মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম।

আমার বোধ, আমার চেতনা, আমার নিজের মনে রাখা বা স্মৃতিগুলিকে ধারণ করার ক্ষমতা যখন আর সব মানুষের মতোই উপলব্ধ করছি, তখন নিজের মনেই পানাগড়ের সামরিক বাহিনীর আবাসনকে চিরন্তন ভেবে রেখেছিলাম। আমাদের জীবিত জীবনের পাকা আস্তানা। সামনে ধু ধু সীমানাহীন কাশবন, মাঝে মাঝে খরগোস ছুটে যাওয়ার এক ঝিলিক দৃশ্য, বিকেল পড়ে এলে, আলোর সঙ্গে অন্ধকারের শরীর মিশে এলে, পশ্চিমদিকে ইস্পাত কারখানার বয়লারের আগুন, মাধবীলতার মাচার নিচে আমার নিজের হাতে গড়ে তোলা শহর, আর ভাঙ্গা পরিত্যক্ত রেলওয়াগনের ভিতরে সবাই একসাথে বসে বালুসাই ও কাঁসার পালির ঢোঁক ঢোঁক জলের সাথে ডালমুঠ গালে ফেলে দেওয়া। রাতের বেলায় বাবার কাছে বসে ইংরাজি শিক্ষার বইয়ে রিভার নেচার ফরেস্ট হাউস আর বাটারফ্লাইয়ের ছবিগুলি দেখতে দেখতে ভাবতাম ছবির চাইতেও সুন্দর আমার চারপাশের বাস্তব বিবরণ আর দেদার প্রকৃতি। এই সব একান্তভাবেই আমার নিজের পাওয়া। এই সব কিছুই আমার স্থায়ী।

বাবা বিকেলের দিকে যখন ফিরলেন, মাকে বললেন,– সামনের সপ্তাহেই আমাদের চলে যেতে হবে কলকাতায়। বদলির অর্ডার হয়ে গেল। আমি ঝুঁকে পড়ে কিছু লিখছিলাম কাঠপেন্সিল দিয়ে। বাবার কথা শুনে কাঠপেন্সিল আঙ্গুলের ফাঁক গলে খাতায় পড়ে গেল, পাশে ছিল আসন্ন শারদ উৎসবের বাবার কিনে দেওয়া বাদামি চামড়ার নতুন ফ্লেক্স কোম্পানির জুতো। নাকের কাছে নিয়ে নতুন চামড়ার গন্ধ শুঁকতে থাকলাম।

পরের দিন বিকেল গড়িয়ে আসার অনেক আগে বাবার সাইকেলের পিছনে কেরিয়ারে বসে গেলাম বুদবুদের মাছের বাজারে। বাজার ঠিক নয় যেন, খোলা মাঠের ওপরে কয়েকজন মেছুয়া কাঠের পাটাতনের ওপরে বসে ঢাউস ঢাউস মাছ বিক্রি করছিল। বাবা আমার উচ্চতা সমান একটি, চিতল মাছ কিনলেন। তারপরে সেই মাছবিক্রেতা গোটা মাছটিকে সাইকেলের কেরিয়ারে বেঁধে দিলেন। আমি বাবার পিছনে সাইকেলে বসে চিতল মাছের বিস্ময়কর দীর্ঘ সামলাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, আমাদের অনুসরণ করছে এক জোড়া শেয়াল।

শেয়াল কি মরা মাছ খায় ?

বাবা বললেন, গোটা কাশবন পুড়ে গেছে। খরগোশ সব পালিয়ে গেছে। শেয়াল হল কুকুরের জাত। সহজে স্থান পরিবর্তন করে না। ওরাই বা খাবার পাবে কোথায় ? তাই আমাদের পিছন নিয়েছে।

আমি বাবাকে বারে বারে সতর্ক করে যাচ্ছিলাম। শেয়াল দুইটি সাইকেলের খুব কাছে এসে পড়েছে। বাবাও বুঝতে পারছিলেন। বাবা সাইকেল চালাতে চালাতে দেখতে পারছিলেন শেয়াল দুইটির ছায়া আমাদের গতিকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে।

বাবা হঠাৎ ব্রেক কষে বললেন,– নামো তো।

আমি নেমে যেতেই দেখলাম বিস্ময়কর দৃশ্য।

বাবা সাইকেল থেকে নেমে, সাইকেলটিকে পিছনের চাকায় ভর রেখে সামনের চাকাটি তুলে ধরলেন নিজের শরীরের উচ্চতা থেকে অনেক ওপরে। সাইকেলের সামনের চাকাটি ঘুরে যাচ্ছিল। শেয়াল দুইটি চক্রাকারে দ্রুত ঘুরে যাওয়া সাইকেলের চাকাটিকে দেখে তিন লাফে সরে গেল কাশবনের ভিতরে। বাবা হাসলেন তারপরে বললেন,– এই ভাবে রাঁচিতে খাটো চিতা বাঘ যাকে আমরা গুলে বাঘ বলতাম, তাড়িয়ে ছিলাম। তখন তোমার জন্ম হয়নি।

ভাবলাম আমার জন্মের আগে কত বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেছে।

আমরা চিতল মাছ নিয়ে ফিরে এলাম। অত বড় চিতল মাছ দেখে মা আত্মসমর্পণ করে বললেন,– এ আমার সাধ্যের মধ্যে হবে না।

বাবা বললেন,– তুমি কেন পারবে ? আমি ফুলেশ্বরকে খবর দিয়ে এসেছি।

ফুলেশ্বর সন্ধেবেলার দিকে ছাইপাশ গেলে। ফুলেশ্বর যখন চিতল মাছটির মুড়ো ধরে আঁশ ছাড়াচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, এই আকারের মাছ কুটে ফেলা তার কাছে জলভাত। তার শরীর ও মুখ দিয়ে একপ্রকার গন্ধ ছড়াচ্ছিল। বারান্দার হাই পাওয়ারের আলোটির মধ্যে আমি দেখছিলাম, একটি বড়সড় ডগা নড়ছে। বাবা ছুটে গেলেন রান্নাঘরের ভিতরে। শুকনো লঙ্কা কাগজের ওপরে রেখে আগুন দিলেন।

ফুলেশ্বরের মাছ কাটা হয়ে গেলে, সে চলে গেল একটি সজনে গাছের নিচে। গাছের গুঁড়িতে পিঠ রেখে, হেলান দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে চিৎকার করে উঠল, তার গোটা শরীরকে জড়িয়ে ধরেছে কালো রঙয়ের ভয়ানক শুঁয়োপোকা।

রাতের দিকে ক্যাপ্টেন সাহেব ব্রজেন মিশ্রা এলেন। তাকে দেখে আমার মনে হল বইয়ের ছবিতে যেমন দেখেছি, একজন ক্লান্ত নাবিক যেন বন্দরে নেমে এল। রাতের অন্ধকারে আর হাই পাওয়ার ডুমের আলোর নিচে তার মুখটি অসম্ভব রকমের বাদামি লাগছিল। সম্ভবত মায়ের জন্য কিছু খাস উপহার এনেছিলেন। পরে জানতে পেরেছিলাম একটি রূপোর হার।

মা বললেন,– বিকেলে কোয়ার্টারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এ্যাকোরডিয়ান বাজাচ্ছিলেন। ভারি সুন্দর বাজান আপনি। আমি শুনছিলাম। অদ্ভুত এক প্লাবনের সুর ছিল আজ।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজি বললেন,– এ্যাকোরডিয়ান এমন একটি যন্ত্র মনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে, নিজের ভিতরে ইচ্ছাকে ঈশ্বর করে তোলে। কিন্তু আপনি শুনছিলেন জানতে পারলে রোমিও জুলিয়েটের থীম বাজাতাম। সেই থীমের মধ্যে বুরিয়াল গ্রাউন্ডের সমাধির ওপরে ফুল পতনের টুপটাপ শব্দ পাওয়া যায়।

আসুন আমার সঙ্গে, পিছনে মাধবীলতার জংলা আছে। আপনাকে দেখাই।

আমিও মায়ের পিছনে পিছনে গেলাম। ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজির হাতে সেই উপহারের প্যাকেটটি তখনও আছে। মা তাকে মাধবীলতার জংলা দেখিয়ে কেমন আহ্লাদিত হয়ে গেলেন।

মা বললেন,– দেখুন কি চমৎকার থোকা ঠোকে ফুল আর গন্ধ। এখন আমি যেন আপনার এ্যাকোরডিয়ানের মিহি সুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজি মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেন। মায়ের খোপাতে মাধবীলতার গুচ্ছ গেঁথে দিলেন। তারপরে উপহারের প্যাকেটটি মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,– এটি আপনার এ্যাকোরডিয়ান শোনার পুরস্কার।

আমার মা সেই মুহূর্তে যেন নরম তুলোর মতো হয়ে গেলেন। মাকে সেই আধো অন্ধকারে কেমন জানি পুতুল পুতুল মনে হচ্ছিল। আমি মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাশবন থেকে শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ বুনো শেয়ালের শরীরের গন্ধ তুলে আনছিল। মনে হচ্ছিল ওদের দুইজনের মাঝে তুলো কাটার তকলি রেখে দিই। তুলো থেকে মিহি সুতো বাহির হয়।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজি বাবাকে বললেন,– খুব বড় মাছ নিয়ে এলেন যে ?

আপনি দেখলেন ?

হ্যাঁ, দেখেছিলাম আমি তখন কোয়ার্টারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এ্যাকোরডিয়ান বাজাচ্ছিলাম।

মেজর চ্যাটার্জী এখনও এলেন না যে ?

দেখে এলাম উনি ফাউনটেন কলম নিয়ে খুব ব্যস্ত আছেন।

কলম নিয়ে ?

হ্যাঁ, খাতার ওপরে কালো কালি দিয়ে পানাগড় আঁকেন।

বাঃ। আপনার এমন কোনো শৌখিনতা ?

আমি গ্যারিবল্ডি পড়ছি।

তা হলে গ্রন্থ আপনাকে পিছু টানে ?

অনেকটা।

আমাকে এ্যাকোরডিয়ান আর প্রেম।

আপনি শেক্সপিয়র পড়েন জানি।

চার্লস ডিকেন্সও পড়ি। চমৎকার মাছের গন্ধ পাচ্ছি। কিন্তু ঝাল কম হবে। মরিচ কম দেবেন। মাছের আঁশটে গন্ধ যেন না থাকে। উলটি মানে বমি আসে। কড়া করে ভেজে নেবেন। আমরা উত্তরপ্রদেশের মিশ্রা, মাছে আমাদের তেমন অভ্যাস নেই। ফৌজিতে কাজে এসে আর আপনাদের সঙ্গে থেকে থেকে একটু অভ্যাস হয়েছে।

আপনার প্রিপারেশন মেজর চ্যাটার্জী খাবেন না, আপনার আলাদা হচ্ছে। বাসন্তি আপনারটা প্রস্তুত করবে। চিন্তা নেই।

মা একটু হেসে বললেন,– আমি জানি আপনি ঝাল খান না।

ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজি আলতো নরম হাসলেন।

বেশ রাতে সবাই চলে গেল। অনেক রাত হল। শরীর দিয়ে মায়ের মাছের ও ঝাল মশলার গন্ধ ছাড়ছিল বলে, গা ধুয়ে নিলেন।

বাবা মাকে বললেন,– ভালো করে চারধার দেখে নিও। জলের ড্রামের পাশে গোখরো আসে কিন্তু। সাপটির সঙ্গে তোমার যে কি গোপনীয়তা আছে ?  তুমি যখনই বাথরুমে যাও গোখরোটি আসে। জানিনে। টর্চ নিয়ে যাও।

আমার ঘুম আসছিল না। ঘরের ভিতরে এক প্রকার পারফিউমের গন্ধ ছড়াচ্ছিল। অনেকটা কাঠচাপালির মতো গন্ধ। বেস কম্যান্ডারের মাঠে নাটক হল একবার, নায়িকার শরীর দিয়ে এরকম গন্ধ ছড়িয়ে গেছিল। মঞ্চের চারধারে। বড়ই অমায়িক ছিল পরিবেশ। শুনেছিলাম শহর থেকে পেশাদার নাটকের দল এসেছিল। লাল নীল কাঁচের রাংতার মতো কাগজের পটভূমি থেকে রঙ্গিন আলোর রোশনাই মায়া করে তুলেছিল মঞ্চের সামনে। কত কিছু যে মনে পড়ছিল, একটি চকচকে ইস্পাতের মতো চাকা গড়িয়ে যাচ্ছিল পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে। পিছনে একটি ছেলে দৌড়ে যাচ্ছিল, যাকে সবাই বলত, হাতুড়ির আঘাতের শব্দ, সে অনেকটা রহস্যময় ছিল। যে কোনো মানুষ তাকে যখন কল্পনা করত, সে এসে হাজির হত–ইস্পাতের চাকা ঘুরিয়ে। অনেকটা বইয়ে দেখা ছবির মতো দেখতে ছেলেটিকে, আমি যতবার তার কাছে যেতে চাইতাম, ততবারই সেই এক বাজনার শব্দের ছন্দ সারস পাখির মতো গলা উঁচিয়ে দিত আকাশের দিকে। তারপরে ছেলেটি সরে যেত বনভূমির গভীরে। স্তূপ স্তূপ মাটির গর্তের মধ্যে, সে এক অনাবিষ্কৃত লিপির মতো হারিয়ে যেত। মা এলেন ঘরে, ভেজা চুল, পিতলের বেল বাজালেন, পিছন দিকের মাচা থেকে মাধবীলতার জংলার গন্ধ নিয়ে বললেন,– এখনও ঘুমিয়ে পড়ো নি কেন ?

ঘুম আসছে না।

আমি বালিশের কোণ খুঁটছিলাম। কানে ভেসে আসছিল, ক্যাপ্টেন ব্রজেন মিশ্রাজির কথা। তিনি শুধু বলে যাচ্ছিলেন। মা বাবা চুপ করে তার কথা শুনছিলেন। তিনি বলছিলেন, আর বারে বারে আমার নাম করছিলেন। বলছিলেন, আপনার আরও চারটি সন্তান আছে। ওকে নিয়ে পাঁচজন। আপনার ওই সন্তানটি আমাকে দিয়ে দিন। আপনারা জানেন আমি নিঃসন্তান। অনেক কিছুই তো করলাম, কিন্তু ম্যাডাম আমাকে একটি সন্তান উপহার দিতে পারলেন না।

আমি চমকে উঠলাম, তিনি পরে যে কথাটি বললেন,–পাখির পালকের মতো আদরে রাখব। আমারই নিজের সন্তানের মতো। আপনার পোস্টিং হয়ে গেছে মিঃ গুহ। সামনের সপ্তাহে আপনাকে পানাগড় ছেড়ে চলে যেতে হবে। যাওয়ার সময় ওকে আমার কাছে রেখে যান বলব না, একেবারেই দিয়ে যান। আগামী দিনে আমার পরিচয় আমি ওর পিতা এবং আমার ম্যাডাম ওর মা। আপনারা ওর সামনে আর নিজেদের পরিচয় দিতে পারবেন না। পিতৃ ও মাতৃ পরিচয় দিতে পারবেন না। কিন্তু দেখা করতে চাইলে আমার নিজের কোনো আপত্তি থাকবে না।

বাবা কিছু বলছিলেন না। কারণ তিনি জানতেন মিশ্রাজি অত্যন্ত সজ্জন মানুষ। ভালোমানুষ। মানুষটির অভ্যন্তরে এক দয়ালু মানুষ তার জীবন জুড়ে ভ্রমণ করে যাচ্ছে। বাবা মায়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন। মা কিছু বলছিলেন না। পায়ের নোখ দিয়ে মেঝে খুঁটছিলেন। আমি ওদের পরবর্তী কথা কিছু কথা বুঝতে পারছিলাম, বাকিটা বুঝতে পারছিলাম না।

এক সময়ে মা বললেন, দৃঢ় অথচ মৃদু স্বরে,– আপনার কাছে থাকা মানে আমাদের কাছেই থাকছে, তা নিয়ে আমার ভিতরে কোনো সংশয় নেই। আমি যে ভাবে ওকে স্নেহ দিয়ে গড়ে তুলব, আপনিও তাই দেবেন, কিন্তু ও আমার গর্ভজাত। মায়ের গর্ভ তো আপনি জানেন ? মায়ের চেতনা রক্ত মাংসের মাতৃত্ব দিয়ে একটি সন্তান গাছের মতো বেড়ে ওঠে তার গর্ভের ভিতরে। সেই পরিচয় কি মুছে ফেলা যায়। আমরা যে ভাবে, ওর কাছে বাবা মা হিসেবে আছি তাই থাকবে। যখন মনে হবে, তখন আপনার কাছে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরব। সে আমার তৃপ্তির এক ঘন  নীল আকাশ। আমরা মানে আমি আমার দাবিকে কি করে অমান্য করব ?

আমি বাইরে বারান্দায় চলে এলাম। রাতের গভীর রাতের প্রবল বুনো বাতাস। কাশবন থেকে পোড়া মাটির গন্ধ উড়ে আসছিল। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম। ইস্পাতের কারখানা থেকে বয়লারের আগুন আকাশের পশ্চিম কোণটিকে লাল করে রেখেছিল। কেন জানি মনে হচ্ছিল, আমাকে মিশ্রাজি দাবি করে, তার নিজের মনের ইচ্ছেটিকে প্রকাশ করে, আমার বেঁচে থাকার অবস্থানকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন। আমি যেন একটি ভাঙ্গা বিস্কুটের টুকরো হয়ে গেলাম। বাবা মা আমাদের মধ্যেই অপাংক্তেয় কেউ। মিশ্রাজির এই ইচ্ছে, আমাকে আমার থেকে অনেকদূরে বিচ্ছিন্ন করে দিল।

এরপরে যা ঘটেছিল, বহুদূর ভবিষ্যতে আমি আমাদের মধ্যে একপ্রকার অন্য হয়ে গেলাম, নিজের খেয়ালে নিজের মনে নিজেকে পাখিরঙ বলে, ড্রয়িং বোর্ডে দাগ দিয়ে যেতাম, গভীর সবুজ রঙয়ের বোতলে তুলি ডুবিয়ে, সাদা পাতায় এঁকে চলেছিলাম ঘাস আর বহুদূরে একটি বাদামি রঙয়ের কাঠের বাড়ি।

পরেরদিন সকালে রান্নাঘরের পাশে জিভ বার করে, লাকি আমাদের পরিবারের পোষ্য সারমেয়টিকে একজন সিপাহি যার নাম জ্ঞানবন্ত নায়েক নিশানা করে কার্তুজ পুঁতে দিল তলপেটে। রক্ত গড়িয়ে পড়ল ওর শরীর জুড়ে। দুপুরের দিকে, গোলাপি জিভ বার করে, বিশ্রাম নিচ্ছিল লাকি। আমি চিৎকার করে আকাশের দিকে গলা তুলে পাহাড়ি গ্রামের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম। পূর্বপুরুষদের দিকে  তাকিয়ে খুব খুব কান্না করলাম। মা ছুটে এলেন। আমাকে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের শরীর থেকে আমি আমার আদিম বাসার গন্ধ পেলাম। সেই দিন বুঝতে পেরেছিলাম, মায়ের গর্ভের কি সুন্দর গন্ধ হয়। এতদিন… এতদিন… এই গন্ধ পাই নি কেন ? কেন ? আমি মায়ের তুলোর মতো নরম শাড়ির ভাঁজে মুখ গুঁজে কান্না করতে করতে মায়ের সমস্ত শরীরকে ভিজিয়ে দিলাম। একটি সারমেয়র হত্যা আমাকে আমার ‘মা’ উচ্চারণের গভীরে ভাসিয়ে দিল। বহু বছর পড়ে আমি মাক্সিম গোর্কির ‘মাদার’ পড়িয়ে শুনিয়েছিলাম যখন মাকে তখন আমি আমার সেই অনুভূতি ফিরে পাওয়ার পড়ে মধ্যরাত্রির রেললাইনের ওপরে বসে দেখেছিলাম রেললাইনের ইস্পাতের চক চক করছে। সেই কথার প্রসঙ্গে আমাকে আসতেই হবে আমার জীবন প্রবাহে একটি জংলি নদীকে যখন আবিষ্কার করে ফেলব।

কেন না আমি আমার মায়ের শরীর থেকে যে গন্ধ পেয়েছিলাম,- মায়ের থেকে এই জগত সংসারে বড় বিপ্লবী কেউ নেই। মিশ্রাজির কথায় বাবা যে প্রতিবাদটি করতে পারেন নি কিন্তু মা মিশ্রাজির কথার প্রতিবাদ করেছিলেন তার মাতৃত্ব দিয়ে। মায়েরা এই জগতে নিজের গর্ভকে কোনোদিনই অস্বীকার করতে পারেন না।

বিকেলের দিকে বাবা ফিরে এলেন বেস কম্যান্ডারের অফিস থেকে। মা বাবাকে বললেন,– একজন সিপাহি এসে লাকিকে গুলি করে মেরে দিয়ে গেল কেন ?

বাবা বললেন,– কমাণ্ডার সাহেবের অর্ডার আছে। কুকুর থেকে বেস এরিয়াতে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ভয়ংকর রোগ ছড়াচ্ছে। কিছুই করার নেই। ওপরওয়ালার অর্ডারকে বিরোধ করার আমাদের পাওয়ার নেই। আহা বেচারা লাকি।

এরপরের কয়েকদিন আমরা খাবারের গরস গলা দিয়ে নামাতে পারি নি। যখনই ভাতের থালা নিয়ে বসতাম, তখনই ভাতের থালায় লাকির বাদামি শরীর ভেসে উঠত। আর তার মোলায়েম পা ফেলে পাপোষের ওপরে গড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমাকে ক্রমাগত আহত করে তুলেছিল।

[ক্রমশ]

Facebook Comments

2 thoughts on “কাশবনের ভাস্কর্য : শুভংকর গুহ Leave a comment

  1. বেশ ভালো লাগলো। পরবর্তীর অপেক্ষায়।

    1. লেখা থেকে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জন্মায়। এক্ষেত্রেও তাই ।

Leave a Reply