এই হাত আগুনের (মেটাফর): ভারতীয় প্রতিস্পর্ধী কবিতার অনুবাদ : তনুজ ও শর্মিষ্ঠা

fail

এই হাত আগুনের (মেটাফর) : ভারতীয় প্রতিস্পর্ধী কবিতার অনুবাদ
নির্বাচন, অনুবাদ ও প্রাক-কথন : তনুজ ও শর্মিষ্ঠা

উৎসর্গ : এই দুনিয়ার সমস্ত শাহিনবাগকে

তৃতীয় কিস্তি

বিনোদ কুমার শুক্লের কবিতা
মূল ভাষা ও অনুবাদের সোর্স ভাষা: হিন্দি

শুধু বিনোদ কুমার শুক্লকে পড়ার জন্যই একটি ভাষাকে আত্মস্থ করা যায়। তাঁর তিলিস্মি ও কুহকী লেখনসুরাহির মুখোমুখি হলে বারবার এই অনুবাদকদ্বয় নিজেদের সরলতম (সহজতমও) এককে ভেঙে যেতে দেখে। আর তাদের মনে এই বিশ্বাস ক্রমে গাঢ় ও প্রশস্ত হয় যে, যে কোনো ভাষাতেই লেখার প্রসঙ্গে, লেখকের প্রসঙ্গে একজন লেখক থাকেন—হিন্দিতে যেমন তিনি—এর সাথে যোগ করার বিশেষ কিছু নেই—আমরা এই আদিগন্ত শুক্লবোধির সামনে আমাদের যাবতীয় অনুবাদ-পদ্ধতি ও ওতপ্রোত কলমের শির নামিয়ে রাখতে চেয়েছি মাত্র।

উল্লেখযোগ্য কবিতার বই : ‘অতিরিক্ত নহি’(অতিরিক্ত নয়), ‘কভি কে বাদ অভি’ (কখনোর পরে এখন), ‘কবিতা সে লম্বি কবিতা’ (কবিতার চেয়ে দীর্ঘ কবিতা), ‘লগভগ জয়হিন্দ’ (প্রায় জয়হিন্দ) ও উপন্যাসের মধ্যে ‘দিওয়ার মে ইক খিড়কি রহতি থি’, (দরজায় একটা জানালা থাকত), ‘নওকর কি কমিজ’ (চাকরের কামিজ) প্রমুখতম।

এই দেয়ালে কখনও একটা খিড়কি থাকত

এই দেয়ালে কখনও একটা খিড়কি থাকত
একটা ঝুপড়ি, দুটো পাকদন্ডী, নদী একটা
এবং একটা-দুটো পুকুর
একটা আকাশের সাথে তাদের সবার এই
মিলেমিশে এক হতে থাকা, থাকত
লোকেদের আসা-যাওয়া থাকত কখনও সখনও
গাছ আর গাছে পাখিরা থাকত
খিড়কি থেকে খিড়কির বাইরের সবকিছুও থাকত
না থাকার মধ্যে শুধু খিড়কিটা খোলা থাকত না
আর থাকার মধ্যে খিড়কিটা খোলা থাকত
আর খিড়কি থেকে চোখ একটু সরতেই
দেয়ালে একটা লোক থাকত।

হতাশায় একজন বসে পড়েছিল

হতাশায় একজন বসে পড়েছিল
সেই লোকটিকে আমি চিনতাম না
তবে তার হতাশাকে চিনতাম
তাই আমি সেই লোকটির কাছে গেলাম
হাত বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে
আমার হাত ধরে সে উঠে দাঁড়ালো
আমাকে সে চিনত না
তবে আমার হাত বাড়িয়ে দেয়াকে চিনত
আমরা দুজন তখন থেকে পাশাপাশি হাঁটছি
যদিও দুজনে একে অপরকে চিনতাম না
তবে এই পাশাপাশি হেঁটে চলাকে চিনতাম।

যারা আমার ঘরে কখনও আসবে না

যারা আমার ঘরে কখনও আসবে না,
তাদের সাথে দেখা করতে বরং
আমিই তাদের কাছে চলে যাবো।
একটা উচ্ছল নদী কখনও
আসবে না আমার চৌকাঠে,
তাই নদীর মতন মানুষদের সাথে দেখা করতে
আমিই নদীতীরে চলে যাবো।
কিছুটা না হয় সাঁতরে পেরোনো যাবে,
কিছুটা না হয় ডুবে যাবো।
এই পাহাড়, টিলা, পাথর, পুকুর আর
অসংখ্য গাছ ও খেত,
এরা কখনোই আসবে না আমার ঘরে,
তাই খেত-খলিহানের মতন লোকেদের সাথে দেখা করতে
আমিই বরং গাঁয়ে গাঁয়ে,জঙ্গলে জঙ্গলে যাবো
বিরামহীন, যারা ব্যস্ত রয়েছে কাজে,
তাদের কাছে
কোনো ফুরসতে নয়,
একটা জরুরি কাজের মতন
বারবার যেতে থাকবো আমি।
এবং তাকেই নিজের একমাত্র ও শেষ ইচ্ছে মনে করে
আমার প্রথম ইচ্ছের মতন
ছুঁয়ে থাকতে চাইবো।

থাকার প্রসঙ্গে একটা ঘর ছিল কোথাও

থাকার প্রসঙ্গে একটা ঘর ছিল কোথাও
তেমনি তেষ্টার প্রসঙ্গে তাতে
একটা ছোটো পাত্রে ভরে জল রাখা ছিল
বহুদিন ধরে তা জমানো ছিল’র কারণে
পাত্রটা পুরনো হয়ে গেছিল
জানি না কি ছিল’র কারণে
কিছু ছিল যা এখন আর মনে পড়ছে না
যা মনে পড়ছিল, তা শুধু এই ছিল যে
তার প্রসঙ্গও অনেকানেক ছিল
আশপাশ ছিল, দূর ছিল
কেটে যাওয়া রাতটায় এখন দিনের সময় ছিল
আর না কাটানো, আগামী রাতটা
ছিল দিনের সময়ে
চতুর্দিকে জীবন ছিল আর
সংসারের প্রসঙ্গে পাত্রটা ছিল ছোটো
যে কেউ, যে কারোর ঘরে তখন
জল চাইতে যেতে পারত
তাই ছোটো পাত্রটার বদলে
একট বড় পাত্র থাকার প্রসঙ্গ ছিল।

সেই লোকটা গায়ে নতুন গরমকোট চাপিয়ে চলে গেল বিচারের মতন

সেই লোকটা গায়ে নতুন গরমকোট চাপিয়ে চলে গেল বিচারের মতন।
আর রবারের চপ্পল পরা আমি পিছিয়ে পড়লাম।
শীতের সকালে ডুবে,ভেজা জামাকাপড়ের সকাল ছয়টার সময়,
সকাল ছয়টার সময়টা ছিল সকাল ছয়টারই মতন।
গাছের নিচে লোকটা ছিল।
কুয়াশার ভেতর সেই ছোপ ছোপ লোকটার অভ্যন্তরে সেই লোকটা ছিল।
গাছের ছাপটা ছিল অবিকল গাছের মতন।
এবং ডানদিকের রদ্দিমার্কা ঘোড়ার ছাপটা ছিল
ওই রদ্দিমার্কা ঘোড়ার মতন।
ঘোড়াটা ক্ষুধার্ত ছিল, তাই
তার জন্য ঘাসসদৃশ কিছু কুয়াশা গজিয়েছিল, হাওয়ায়।
আর বেশ কিছু বাড়ি, কিছু গাছ, কিছু সড়ক ইত্যাদির মধ্যে কেউ ঘোড়া ছিল না।
একলা একটা ঘোড়া ছিল। আমি ঘোড়া ছিলাম না।
কিন্তু হাঁপাতে থাকা আমার শ্বাস হুবহু কুয়াশা প্রজাতির ছিল।
যদি একই জায়গাতে, গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মালিকটা ছিল মানুষ,
তবে তার জন্য আমি দৌড়তে থাকা, জুতো পরা কেউ ছিলাম,
যার জুতোয় ঘোড়ার পায়ে যেমন থাকে, নাল ঠুকে দেয়া ছিল।

সবচেয়ে গরীব লোকটি

সবচেয়ে গরীব লোকটির
সবচেয়ে কঠিন অসুখ সারাতে
সবচেয়ে বড়ো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসুক,
যার ফিস হবে সবচেয়ে কম।
সবচেয়ে বড়ো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারটি
সেই গরীব লোকটির ঝুপড়িতে এসে
ঝাড়ু মেরে দিক,
যাতে কিছুটা নোংরা অন্তত পরিস্কার হয়।
সামনের দুর্গন্ধময় নালাটাকে
সে সাফ করে দিক,
যাতে দুর্গন্ধ কম হয় কিছু।
সেই গরীব লোকটির ঘটিতে
দূরের মিউনিসিপালিটির কল থেকে
একটু বিশুদ্ধ জল ভরে আনুক সে।
তার অসুখের জামাকাপড়গুলোকে
ঘরের পাশের ডোবার সবুজ,ঘোলা জলে না ধুয়ে
সে চলে যাক অন্য কোথাও।
সে রোগীটিকে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার
পরামর্শ না দিক।
কৃতজ্ঞ হয়ে সেই সবচেয়ে বড়ো ডাক্তারটি
সেই সবচেয়ে গরীব লোকটির চিকিৎসা করুক
আর তার কাছে ফিস চাইতে ভয় পাক।
কেননা সবচেয়ে গরীব লোকটির কাছে
সবচেয়ে সস্তা ডাক্তারও
অনেক অনেক দামী।

গুজরাতি আমার জানা নেই

গুজরাতি আমার জানা নেই
তবে মনে মনে জানি,
গুজরাতি জানা আছে আমার
সে খুন করে পালাচ্ছে—
এটা একটা গুজরাতি বাক্য।
দয়া করো,দোহাই তোমাদের, আমাকে মেরো না,
ঘরে ছোটো ছোটো বাচ্চা রয়েছে আমার,
মেয়ের বিয়েও দিতে পারিনি এখনও
বিয়ের জন্য তুলে রাখা মেয়েটিকে
ধর্ষণ করে মেরা ফেলা হল—
এগুলো সবই গুজরাতি বাক্য।
যেমন ‘আর্তি’ একটা গুজরাতি শব্দ।

দাঙ্গার দিনগুলোতে লোকেরা যখন

দাঙ্গার দিনগুলোতে লোকেরা যখন
আতঙ্কে দরজা বন্ধ করে
লুকিয়ে বসে থাকবে ঘরের ভেতর,
আমি তখন শহরে বেরোতে চাই।
আমাকে দেখতে
না হিন্দুদের মতন,
না মুসলমানদের মতন।
যদি কোনো মুসলমানের হাতে
মারা যাই আমি,
আমাকে হিন্দু না ভেবে
মুসলমান ভেবে নিও
আর যদি কোনো হিন্দুর হাতে খুন হই,
তবে মুসলমান না ভেবে তোমরা
আমাকে হিন্দু ভেবো।

যারা প্রকৃতির সবচেয়ে কাছে রয়েছে

যারা প্রকৃতির সবচেয়ে কাছে রয়েছে,
এই প্রকৃতি তাদের।
আদিবাসীরা রয়েছে জঙ্গলের সবচেয়ে কাছাকাছি,
তাই এই জঙ্গল তাদেরই।
আর এখন তাদের বেদখল হওয়ার সময় এসেছে।
এটা ঠিক সেই সময়,
যখন সমগ্র আকাশের আগে
একটা তারা বেদখল হবে।
যখন গাছ থেকে বেদখল হবে পাখিরা ও
আকাশ থেকে চাঁদনি।
যখন আদিবাসীরা জঙ্গল থেকে বেদখল হবে।

এই কম দুঃখটা যেন কী?

এই কম দুঃখটা যেন কী?
শোনো! যদি দুদিন পর তুমি খেতে পেতে,
যখন পেটে ভীষণ ক্ষিদে থাকত তোমার
কিন্তু খেতে পেতে আধখানা রুটিই।
না,এটাও নয় কম দুঃখ।
ভালো হত, যদি দুদিনের বদলে
তিনদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর
অর্ধেকের বদলে
একটা পুরো রুটিই খেতে দেয়া হত তোমাকে।
না, না, এটাও কম দুঃখ নয়।
বরং পুরো তিন দিন ক্ষুধার্ত থাকার পর যদি
আধখানা রুটি খেতে পাওয়া যেত।
তবে এও নয় কম দুঃখ।
ধরো যদি এমন হয় যে
তুমি পাঁচ দিন আগে
অর্ধেকটা রুটিই খেয়েছিলে
আর আজ সবেমাত্র তার দ্বিতীয় দিন চলছে।

আমার পেটে আমার মগজ

আমার পেটে আমার মগজ
আমার পেটে,
একা আমি
গর্ভস্থ।
পেটের ভেতর,
নিজের উচ্ছিষ্ট খেয়েই
বেঁচে আছি
আমি।
পেন্সিলের গলা চিবিয়ে
পেটভর ভেবে যাই।
আর আমার পেটে,
আমার মগজ
প্রস্ফুটিত হতে থাকে
বাগিচার মতো।

মধ্যে থাকা

মধ্যে থাকা আসলে হচ্ছে
ঘেরা হয়ে থাকা।
যে কোনো একটা বাড়ি
বাকি বাড়িদের দিয়ে ঘেরা থাকে
এভাবে সমস্ত বাড়ি
সমস্ত বাড়িদের দিয়ে।
কোনো একজন লোক
বাকি লোকেদের দিয়ে।
প্রতিবেশী, প্রতিবেশী নয়,
ঘেরাও হয়ে এই থাকার এই ব্যবস্থায়
তারা সবচেয়ে নিকট, নিতান্তই
আর পরের বাড়িটাও
আড়ালে কান পেতে বসে আছে।
বেঁচে থেকে কতটা গুটিয়ে আনা যাবে?
যার কোনোই ঘর নেই, ঝুপড়ি নেই
তার কোনো কেল্লাও নেই।
যদি কেউ বাইরে সড়কে নেমে এসেছে
তবে সে এক অনবরত কারফিউ চলতে থাকা
শহরে নেমে এসেছে
এখন যতটা কদম সে হেঁটে যাবে,
তার মানে দাঁড়াবে এই যে,
মৃত্যু তার থেকে ঠিক তত কদম দূরে ছিল।

চোখ বন্ধ করে ফেললেই

চোখ বন্ধ করে ফেললেই
অন্ধের দৃষ্টি অর্জন করা যায় না,
যার ছুঁয়ে দেখার দূরত্বে থাকে পূর্ণতা।
যেমন তা থাকে দেখার দূরত্বে
অন্ধকারে একটা সর্বগ্রাসী সূর্যের উদয় হয় খুব সকালে
আর অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এক গভীর অন্ধকার
এই চন্দ্রতা অতিরিক্ত কালো দাগ হবে,
এই চাঁদ ও তারার তবে।
পরখ করতে করতেই জানা যেতে পারে একদিন
দিগন্তকে, দৃষ্টির ভ্রমকে
যদি তাকে কোথাও রাখা হয়েছে
জানা যেতে পারে যে তাকে কোথায় রাখা হয়েছে।
কোন অন্ধকার কোণে টাঙ্গিয়ে রাখা আছে
কোন নক্ষত্রের অন্ধকার।
চোখ বন্ধ করে দেখা
অন্ধের মত করে দেখা নয়।
ব্যস্ত সড়কের পাশে,গাছের ছায়ায়
একশো কিসিমের আওয়াজের মধ্যে
চেয়ার বুনতে থাকা অন্ধ লোকটাই
এই জগতকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে
সে কিছুটা জগৎ স্পর্শ করে
আর অনেক অনেক জগৎ স্পর্শ করতে চায়।

ডুবে যাচ্ছি এই আকাশটাকে দেখে

ডুবে যাচ্ছি এই আকাশকে দেখে
বাচাও! বলে আমি দু হাত ওপরে তুলি
হাত দুটো তবু অতল আকাশের নিচেই থাকে
আর আমি ডুবে যাই–
এ কেমন উচ্চতা!
একটা গভীর খাদ,
খাদে
ডানা মেলে
উড়বে কেউ,
হয়তো কোনো পাখি,
উড়ে উড়ে নামা
কোনো পর্বতশিখর থেকে নিচে–
এ কেমন উচ্চতা!
আমি পড়ে যাব তলায়–
অতলে এ কেমন ধরাতল!
বসে বসে, তারপর দাড়িয়ে আকাশকে দেখা
ফের উঠে বসা, তারপর অপরপ্রান্তে চলে যাওয়া।

তথা আশ্চর্য

তথা আশ্চর্যের
যে তথাগত আশ্চর্য
সে তো শুধু এক
সত্য বয়ান করছিল
সে সত্যি-সত্যি, সত্য বলছিল
তার সত্য শুনছিল সবাই
কেউ ছিল না তখন
যে শুধু তার সত্যই শুনছিল না
যদি কেউ থাকে, জানি না সে কে ছিল!
যারা শুনছিল,
তারা ভিড় করে শুনছিল তাকে
আর তারা সব,
সবাই ছিল বুদ্ধ
স্ত্রী-পুরুষ, বয়স্করা,
শিশুরাও—
এমনকি শিশুরাও সিদ্ধার্থ নয়,
বুদ্ধ ছিল।

Facebook Comments

Leave a Reply