উত্তর স্বাধীনতা ও রামায়ণ : দেবাশিস দত্ত

fail

সদ্য পেরলো স্বাধীনতা দিবস। আমরা এখন স্বাধীনতা মাসেই আছি। তিয়াত্তরটা ‘স্বাধীনতা’ দিবস আমরা পেরিয়ে এসেছি। পরিক্রমার শুরু সাতচল্লিশে। ঐদিন থেকে নতুন পর্বে পথ চলা শুরু যেদিন মধ্য রাতে ‘দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে’ প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। সেই দিন থেকে প্রধানমন্ত্রীর এটা প্রিভিলেজ, বা একটা অভ্যেস বা ‘পুজো-পাব্বন’-এর মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যিনিই তখতে থাকুন জাতির উদ্দেশ্যে ‘লাল কেল্লা’ থেকেই তিনি ঐদিন, সেজে গুজে আসবেন কিছু না কিছু বলবেন এবং বাকি মানুষ তা শুনবেন। বক্তৃতার মাঝে করতালি শোনা যাবে, বক্তা ও শ্রোতা উভয় পক্ষকেই তা উদ্দীপ্ত করবে। এতকাল ধরে ‘কেল্লা’ থেকে বক্তাপক্ষই বলে এসেছে, শ্রোতা-পক্ষ কখনও বক্তা হয়ে উঠতে পারেনি। এতকাল যা বলা হল তা যদি দু’মলাটে আনা হয়, কেউ যদি সে কষ্ট স্বীকার করেন তবে দেখা যাবে ভিন্ন ভাষ্যে অসংখ্য ‘রামায়ণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বক্তব্যের সাথে ব্যাখ্যা টিকা যুক্ত করলে সপ্ত-কাণ্ড ‘রামায়ণ’ রচয়িতা বাল্মীকি থেকে তুলসীদাস সবাই যা লিখেছেন তা থেকে আধুনিক ‘রামায়ণ’ রচয়িতা নেহেরু থেকে দামোদর মোদীর পাল্লা হেসে-খেলে ‘একুশ কাণ্ড’ ছাড়িয়ে যাবে। যদিচ মূল বিষয়টা – ক্ষমতা হস্তান্তর – রাজা টু রাজা, প্রজার হাতে কক্ষনো নয়, চিত্রনাট্য হবে এমনই টান টান। অন্যথা ঘটবে না। প্রজা কেবল দুই ষাঁড়ের লড়াই প্রত্যক্ষ করবে, তালি দেবে অবসরে রামধুন গাইবে – এটাই চলবে যতদিন না অন্য রামায়ণ লেখা হয়!!

 

‘আত্মা’র অনুসন্ধান

 

অনেক দিনের প্রকাশ্য অথবা গোপন ‘অভিসার’ আমাদের ‘স্বাধীন রামায়ণ’ কাহিনীর শুরু। সেখানে রাজা (they) ও প্রজা (we) দুই পক্ষের অবস্থান, দুইয়ের অস্তিত্ব তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব বিরোধ ও লড়াইয়ের নিষ্পত্তি বা অবসানে (!) শান্তিপূর্ণ-সহাবস্থান-সম্পর্ক স্থাপন ও নির্ধারণে একমাত্র ইনস্ট্রুমেন্ট হল ‘সংবিধান’ যার প্রস্তাবনায় বলা হল “উই দ্যা পিপল অব ইন্ডিয়া সলেমনলি অ্যাফার্ম” ইত্যাদি। অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে ‘উই’ (we) ‘দে’ (they) অস্তিত্ব বিলোপের চেষ্টা হল। হলো কিনা বা ওভাবে অস্তিত্ব বিলোপ হয় কিনা সে প্রশ্ন ভিন্ন। জানা নেই ওঁরা জানতেন কিনা “Accumulation of wealth at one pole is at the same time accumulation of misery, agony of toil, slavery, ignorance, brutality, mental degradation, at the opposite pole.” জানা না থাকার কথা নয়, তবে তা থাকলে সে রয়্যালটি প্রাপ্য রাজা বা রাণী ভিক্টোরিয়া থেকে প্রজাবৎসল রাজা ‘রাম’ ওরফে দামোদর মোদীর !

পণ্ডিত নেহেরু ‘স্বাধীনতা’র পুণ্যলগ্নে ঐ লালকেল্লায় দাঁড়িয়ে বাহাত্তর মিনিট জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে যাত্রাপথ ছকে দিলেন। সেটাই সূত্রপাত। তিনি সেদিন বললেন: “Long years ago we made a tryst with destiny, and now the time comes when we shall redeem our pledge, not wholly or in full measure, but very substantially. …. Freedom and power bring responsibility. …. That future is not one of ease or resting but of incessant striving so that we may fulfil the pledges we have so often taken and the one we shall take today. The service of India means the service of the millions who suffer. It means the ending of poverty and ignorance and disease and inequality of opportunity. The ambition of the greatest man of our generation has been to wipe every tear from every eye…”

শুধু ভাষণ নয় পণ্ডিত নেহেরু ‘জাতীয় পতাকা’ উত্তোলন করলেন। জাতীয় পতাকা একটি দেশ ও জাতির পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে কোন দেশ ও জনগণের পরিচয়, তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য, তাদের স্বপ্ন, আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বাভিমানের প্রতীক হল জাতীয় পতাকা যার সম্মান ও ঐতিহ্য রক্ষায় ও দায়বদ্ধতা প্রমাণে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। আমাদেরও তাই। বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত এই পতাকার অনেক লম্বা রক্তক্ষয়ী ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস পরিক্রমায় এখানে বিরত থেকে জাতীয় পতাকা সম্পর্কে দু’চার কথা বলা আবশ্যিক। জাতীয় পতাকা সম্পর্কে জাতির ‘পিতা’ হিসেবে মান্য মহাত্মা গান্ধীর একটা ভাবনা ছিল। তাঁরই কথায়: ‘অ্যা ফ্ল্যাগ ইজ অ্যা নেসেসিটি ফর অল নেশনস। মিলিয়নস হ্যাভ ডায়েড ফর ইট। ইট ইজ নো ডাউট অ্যা কাইন্ড অব আইডোলেট্রি হুইচ উড বি অ্যা সিন টু ডেসট্রয়। ফর, অ্যা ফ্ল্যাগ রিপ্রেজেন্টস অ্যান আইডিয়াল দ্যা আনফারলিং অব দ্যা ইউনিয়ন জ্যাক ইভোকস ইন দ্যা ইংলিশ বেষ্ট সেন্টিমেন্টস হুজ স্ট্রেংথ ইট ইজ ডিফিকাল্ট টু মেজার। দ্যা স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস মিন অ্যা ওয়ার্ল্ড টু দ্য আমেরিকানস। দ্যা স্টার অ্যান্ড দ্যা ক্রিসেন্ট উইল কল ফোর্থ দ্যা বেস্ট ব্রেভারি ইন ইসলাম।” আবারও বলেছেন: “ইট উইল বি নেসেসারি ফর আস ইন্ডিয়ানস মুসলিমস, খ্রীস্টানস, জিউস, পার্সিস, অ্যান্ড অল আদারস টু হুম ইন্ডিয়া ইজ দেয়ার হোম – টু রিকগনাইজ অ্যা কমন ফ্ল্যাগ টু লিভ অ্যান্ড টু ডাই ফর।”

জাতীয় পতাকার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ-লালিত-পালিত-অনুসৃত এক স্বপ্ন, ভাবনা, ব্রিটিশের বিশ্বস্ত তল্পিবহনের কলঙ্ক থেকে জনগণের দীর্ঘশ্বাস ও রক্তাক্ত সংগ্রাম, ত্যাগ ও আত্মবলিদানের ইতিহাস – সংগ্রামী ধারার যথার্থ স্থান তার প্রকাশ ও অনুল্লেখ সত্ত্বেও, সগর্ব প্রকাশ ঘটেছে জাতীয় পতাকায়। তেরঙ্গা পতাকার বিবরণে সংবিধান বলছে: “দ্যা কালার অব দ্যা টপ প্যানেল শ্যাল বি ইন্ডিয়া স্যাফরন (কেশরিয়) অ্যান্ড দ্যাট অব দ্যা বটম প্যানেল শ্যাল বি ইন্ডিয়া গ্রিন। দ্যা মিডল প্যানেল শ্যাল বি হোয়াইট, বিয়ারিং অ্যাট ইটস সেন্টার দ্যা ডিজাইন অব অশোক চক্র ইন নেভি ব্লু কালার উইথ টোয়েন্টি ফোর ইক্যুয়ালি স্পসড স্পোকস।” ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে:”স্যাফরন কালার, ইন্ডিকেটিং দ্যা স্ট্রেংথ অ্যান্ড কারেজ অব দ্যা কান্ট্রি। দ্যা মিডল ব্যান্ড ইন্ডিকেটস পিস অ্যান্ড ট্রুথ উইথ ধর্ম চক্র। দ্যা লাস্ট ব্যান্ড ইজ গ্রিন ইন কালার সোজ দ্যা ফার্টিলিটি, গ্রোথ অ্যান্ড অসপিসাসনেস অব দ্যা ল্যান্ড।”

বিষয়টা সংবিধানের এক্তিয়ারে এলো। প্রণীত সংবিধানের প্রস্তাবনায় লক্ষ্য উদ্দেশ্য সবটাই লিপিবদ্ধ হল। বলা হল: “উই দ্যা পিপল অব ইন্ডিয়া, হ্যাভিং সলেমনলি রিজলভড টু কনস্টিটিউট ইন্ডিয়া ইনটু অ্যা সভারেন ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অ্যান্ড টু সিকিওর টু অল ইটস সিটিজেনস: জাস্টিস, সোশ্যাল, ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল; লিবার্টি অব থট, এক্সপ্রেশন, বিলিফ, ফেথ অ্যান্ড ওয়ারশিপ; ইক্যুয়ালিটি অব স্ট্যাটাস অ্যান্ড অব অপরচুনিটি অ্যান্ড টু প্রমোট এমাঙ্গ দেম অল ফ্র্যাটারনিটি অ্যাসিওরিঙ্গ দ্যা ডিগনিটি অব দ্যা ইনডিভিজুয়াল অ্যান্ড দ্যা ইউনিটি অব নেশন …” ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ এই অভিধায় খ্যাত হল ভারতের অভিসার।

এত কথা বলা কেন? এইজন্যে বলা যে স্বাধীন ভারতের এই সংবিধানই নব রামায়ণ-এর মর্ম বস্তু হিসেবে দেখা দিল পোহালে শর্বরী! তারপর তিয়াত্তর বছর ধরে গোপনে প্রকাশ্যে চলল পঠন-পাঠন, অনুসরণ, অনুগমন, পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং নিয়মিত সংস্কার। ফলে কোন স্তর কাণ্ড বা অধ্যায়ে নব রামায়ণ-এর উত্তরণ ঘটল, রাম কী রূপে লালকেল্লা থেকে আজ দর্শন দিলেন তার নাতিদীর্ঘ পরিক্রমায় একরকম আবশ্যিক হয়ে পড়ে।

 

রাম-এর রূপ

 

কল্পিত রাম এক বস্ত্রধারী ছিলেন না। থাকা সম্ভব নয়। তিনি গৃহী হোন বা যোগী। প্রজাবৎসল প্রমাণে ও মনোরঞ্জনে রাজাকে নানা বেশ ধারণ করতে হয়, আত্মীয়ের মত হতে হয়, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল ছেড়ে আসতে হয়! এখনও তা প্রত্যক্ষ করা যায়। কথায় বলে ‘পহলে দর্শনধারি পিছে গুণ বিচারি’ বা ‘ড্রেস ফার্স্ট অ্যাড্রেস সেকেন্ড’। এই বাক্যটি কেবল একটি প্রবচন মাত্র নয়। শিকারের জন্য এক মোক্ষম শেল শৈলী ও কৌশল। এটা না বোঝার অক্ষমতা দর্শনধারির গুণ বিচারের অধ্যায়ে প্রবেশে আজও প্রবল বাধা হয়ে রয়েছে। আর তাই আধুনিক ধনুর্ধর রাম ক্ষমতার কেন্দ্র অর্থাৎ পুঁজিপাটা সব কিছু। ভক্ত (এখন অবশ্যই মোদী) কারও পোশাক দেখেই তিনি কে কি এবং কেন অর্থাৎ তার কুষ্ঠি বিচার করে জানিয়ে দিতে পারেন, ভেতর-বার সবটাই বুঝতে পারেন, নিদেন হাঁকতে পারেন। অথচ রাম-ভক্তর পোশাকের অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত কেউ বুঝে উঠতে পারেন না। এই দূরত্ব ও ফাঁক দিয়েই ঘটতে চলেছে এক ভয়ঙ্কর পট পরিবর্তন!

লালকেল্লা থেকে সটান দাঁড়িয়ে গত বছর স্বাধীনতা দিবসে (তিয়াত্তর তম) ভাষণটি মোদীই দিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর পরনে ছিল পাগড়ি ও উত্তরীয়। উত্তরীয় ও পাগড়িতে ছিল তিনটি রং – গেরুয়া, সাদা ও সবুজ যা মোটা দাগে জাতীয় পতাকায় দৃশ্যমান। এবারের স্বাধীনতা দিবসের পোষাকেও ছিল পাগড়ি ও উত্তরীয়। কিন্তু দৃশ্যমান ছিল দুটি রং গেরুয়া ও সাদা, তৃতীয় রং অবশ্যই সেটা ‘সবুজ’ – বেমালুম গায়েব। এই থাকা এবং না থাকা কি এমনি এমনি নাকি পেছনে রয়েছে কোন গোপন ‘অভিসার’! এর কোন অর্থ আছে কি নেই! অর্থ খুঁজবো কিনা! কেউ বলতেই পারেন পোশাক ব্যক্তিগত অভিরুচির বিষয়। অবশ্যই সেটা ঠিক, কিন্তু ‘ক্ষমতা’ যদি পোশাক দিয়ে কাউকে চিহ্নিত করে, সেই ‘কেউ’ যদি কোন না কোন ধরণের অসহিষ্ণুতা, হয়রানির শিকার হয় তবে ‘ক্ষমতা’র পোশাক আতস কাচের তলায় আসবে। বার্তাবহ হবে। তার পেছনে গূঢ় অভিসন্ধির কথা নস্যাৎ করে দেওয়া যাবে না। ‘সবুজ’ বাদ কারণ ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের পতাকায় রয়েছে সবুজ! ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তান ওরফে মুসলমানদের প্রতি বৈরিতা, অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণা প্রকাশে সবুজ বর্জন একই সংগে যে শেল ও শৈলী, তাতে সন্দেহ থাকে না। আমাদের সংবিধানে বর্ণিত গ্রিন “কালার সোজ দ্যা ফার্টিলিটি, গ্রোথ অ্যান্ড অসপিসাসনেস অব দ্যা ল্যান্ড”-এর ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়ে। অভিমুখ হয়ে ওঠে এক রাষ্ট্র, এক পতাকায় এক রং (গেরুয়া)’র দিকে পদক্ষেপ, তিন থেকে দুই, দুই থেকে এক – সন্দেহের অবকাশ কম, এটাও রিস্ট্রাকচারিং!! ‘মনসা চিন্তিতং কর্ম বচসা ন প্রকাশয়েৎ’ অথবা ‘ইসারা কাফি হ্যায়’ ধারায় রিস্ট্রাকচারিংয়ের এই ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে অনেক কাল আগে থেকে। ৫ আগস্ট ভারতের মানচিত্রে পরিকল্পিত কাশ্মীর ব্যবচ্ছেদ মায় ধাঁচা বিলোপ এবং সেই ৫ আগস্ট তারিখেই রাম মন্দির নির্মাণার্থে ‘ভূমি পূজন’ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। লক্ষ্য ১৯২৫! হিন্দু রাষ্ট্র গঠন যেখানে বিজ্ঞান নয়, অন্ধ বিশ্বাস আর স্বৈরাচার হবে একমাত্র চালিকা শক্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রিটিশের খোলাখুলি তল্পিবহন আর বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও ক্ষমতার অলিন্দে নিরঙ্কুশ অধিকার স্থাপন – এর চেয়ে বড় ‘রিস্ট্রাকচারিং আর কী হতে পারে!! এই তো রামায়ণ!! বীর রসের আখ্যান।

 

ক্ষমতার প্রতিশ্রুতি এবং চ্যালেঞ্জ

 

ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হবার প্রাক লগ্নে পণ্ডিত নেহেরু জাতির প্রতি তাঁর প্রথম অভিভাষণে বললেন: “The service of India means the service of the millions who suffer. It means the ending of poverty and ignorance and disease and inequality of opportunity.” অর্থাৎ দেশ সেবার মানে হল দেশের লক্ষ লক্ষ পীড়িত মানুষের দুঃখমোচন। এর অর্থ হল দারিদ্র, নিরক্ষরতা, রোগ থেকে মুক্তি এবং সকলের জন্য সমান সুযোগদান। এই অভিমুখেই সংবিধানের প্রস্তাবনা ও বিশদে তা প্রণীত এবং গৃহীত হল। ‘সেকুলার, সমাজতন্ত্র’ ইত্যাদি শব্দ বা ধারণার কথা সেদিন উচ্চারিত হয় নি। ক্ষমতা হস্তান্তর পর্বে মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেস দল ভেঙ্গে দিতে বলেন। তার দুটি কারণ অনুমান করা যায়। এক) কংগ্রেস কোন রাজনৈতিক দল ছিল না, একশিলাও ছিল না, ছিল বিভিন্ন ভাবধারা ও মতাদর্শের একটা মঞ্চ, স্বাধীনতা অর্জন ছিল যার একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। সুতরাং কংগ্রেস রাখার প্রয়োজন নেই। দুই) কংগ্রেসের আভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং কোন শক্তির হাতে ক্ষমতা যাচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তিনি হয়তো চান নি সেই সব শক্তির হাতে ক্ষমতা যাক। অনতিবিলম্বেই তার প্রমাণ মিলল। দুটি ঘটনা – এক) ক্ষমতার হাতেই দ্বিখণ্ডিত হল ভারতের শ্রমিক শ্রেণির প্রথম কেন্দ্রীয় সংগঠন এআইটিইউসি। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও সংগঠনকে ভেঙে দিতে ক্ষমতা সেদিন দুবার ভাবে নি। দুই) অপরদিকে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আরএসএস সৈনিক নাথুরাম গডসে গান্ধীজীকে দিবালোকে দাঁড়িয়ে খুন করলেন; এই খুন ছিল তার কাছে গর্বের বিষয় যা গডসে নিজেই আদালতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরএসএস ভারতের রাজনীতিতে তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করলো। ‘সামাজিক’ সংগঠন হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, দোদুল্যমানতার আস্কারায় এই শক্তি ‘ক্ষমতা’ অর্জন করেছে, ক্ষমতার ‘বিকল্প’ হয়ে উঠেছে, রামায়ণ-এর এর অংশ হয়ে উঠেছে বটে!! পেছনে পড়ে রইলো আর এক রাম, একটা দীর্ঘশ্বাস “… after being shot at, Bapu folded his hands and I heard him utter ‘hey Ram'”.(Tushar Gandhi quotes Sardar Gurbachan Singh.) ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর পড়ে যমুনা পাড়ে যেখানে গান্ধীজীকে দাহ করা হয়েছিল সেখানেই গড়ে তোলা স্মৃতিসৌধে লেখা আছে ‘হে রাম!’ তথাপি বাপু ‘হে রাম’ বলেছিলেন কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে! ‘রাম’ আর কারো নয় ‘রাম’ নামে ‘ক্ষমতার মনোপলি’ প্রতিষ্ঠায় তৎপরতা এতটাই ইতিহাসের কোন বিকৃতিতে তারা পিছু পা নয়। এটাও রামায়ণ বটে!!

কোথায় গিয়ে দাঁড়াল দারিদ্র মোচন থেকে নিরক্ষরতা থেকে মুক্তি? সকলের জন্য সমান সুযোগ? গেলো কোথায়? কিছুই কি হয়নি তিয়াত্তর বছরে!! আসলে এখানেই লুকিয়ে আছে সফট বা হার্ড রাম-ভক্তদের ফ্রড। জোচ্চুরি। কারসাজি, ভোজবাজী। স্বাধীন-রামায়ণ অর্থনীতি-মুক্ত নয়। তার সমীক্ষা হয়। সেই সব সমীক্ষার ফলাফল উঠে এসেছে জেএনইউ’র বিশিষ্ট অধ্যাপক হিমাংশু লিখিত প্রবন্ধে। রাম রাজ্যের সে সব তথ্য উঠে এসেছে তা নিচে দেওয়া হল।

এক) “ইট ইজ এস্টিমেটেড দ্যাট 77 পারসেন্ট অব দ্যা টোটাল ন্যাশনাল ওয়েলথ ইজ হেল্ড বাই দ্যা টপ 10 পারসেন্ট অব দ্যা পপুলেশন। দ্যা রিচেস্ট পারসন ইন ইন্ডিয়া ইজ বিজনেসম্যান অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার মুকেশ আম্বানী, উইথ অ্যা নেট ওয়ার্থ অব অ্যাবাউট 47.3 বিলিয়ন ইউএস ডলারস” (অর্থাৎ 24 আগস্টের হিসেবে ভারতীয় মূদ্রায় 35,40,99,62,50,000 টাকা)।
ক’জন সংখ্যাটা পড়তে পারবে?

দুই) “হোয়াট ইজ পার্টিকুলারলি ওরিং ইন ইনডিয়া’জ কেস ইজ দ্যাট ইকনমিক ইনইক্যুয়ালিটি ইজ বিং অ্যাডেড টু এ সোসাইটি দ্যাট ইজ অলরেডি ফ্র্যাকচারড্ অ্যালং দ্যা লাইনস অব কাস্ট, রিলিজিয়ন অ্যান্ড জেন্ডার।”

তিন) “73% অব দ্যা ওয়েলথ জেনারেটেড ইন 2017 ওয়েনট টু দ্যা রিচেস্ট 1%, হোয়াইল 67 মিলিয়ন ইন্ডিয়ানস হু কমপ্রাইজ দ্যা পুয়োরেস্ট হাফ অব দ্যা পোপুলেশন স ওনলি অ্যা 1% ইনক্রিজ ইন দেয়ার ওয়েলথ।”

চার) “দেয়ার আর 119 বিলিয়নার্স ইন ইন্ডিয়া। দেয়ার নাম্বার হ্যাজ ইনক্রিজড ফ্রম অনলি 9 ইন 2000 টু 101 ইন 2017। বিটুইন 2018 অ্যান্ড 2022, ইন্ডিয়া ইজ এস্টিমেটেড টু প্রোডিউস 70 নিউ মিলিয়নার্স অ্যাভরি ডে।” অর্থাৎ এখন 100 কোটির বেশি সম্পদের মালিক রয়েছে 119 জন। 2000 সালে ছিল 9 জন 2017 সালে সেটা দাঁড়ায় 101 জনে। রাম রাজত্ব প্রতিদিন 70 জন লক্ষপতি তৈরির লক্ষ্য গ্রহণ করেছে।

পাঁচ) “বিলিয়নার্স ফর্চুনস ইনক্রিজড বাই অলমোস্ট 10 টাইমস ওভার অ্যা ডিকেড অ্যান্ড দেয়ার টোটাল ওয়েলথ ইজ হায়ার দ্যান দ্যা এনটায়ার ইউনিয়ন বাজেট অব ইন্ডিয়া ফর দ্যা ফিসক্যাল ইয়ার 2018-19, হুইচ ওয়াজ অ্যাট আইএনআর 24,422 বিলিয়ন।”

ছয়) “ম্যানি অর্ডিনারি ইন্ডিয়ানস আর নট এবল টু অ্যাকসেস দেয়ার হেলথ কেয়ার দে নীড। 63 মিলিয়ন অব দেম আর পুশড্ ইনটু পভার্টি বিকজ অব হেলথকেয়ার কজ এভরি ইয়ার অলমোস্ট টু পীপল এভরি সেকেন্ড।”

সাত) “ইট উড টেক 941 ইয়ার্স ফর অ্যা মিনিমাম ওয়েজ ওয়ার্কার ইন রুরাল ইন্ডিয়া টু আর্ন হোয়াট দ্যা টপ পেইড ইক্সিকিউটিভ অ্যাট অ্যা লিডিং ইন্ডিয়ান গারমেন্ট কোম্পানি আর্নস ইন অ্যা ইয়ার।”
(সূত্র: লেখক: জেএনইউ’র বিশিষ্ট অধ্যাপক হিমাংশু / অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনাল / https://www.oxfam.org)।

এটাই হচ্ছে রাম-রাজ্যের আসল চেহারা এবং আধুনিক রামায়ণ-কথা। অর্থাৎ এই মুহূর্তে মুকেশ আম্বানী হলেন দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী, দুনিয়ায় চতুর্থ। তিনি হঠাৎ করে হন নি। দীর্ঘকাল ক্ষমতার আনুকূল্য তিনি পেয়ে এসেছেন। তা ছাড়াও দেশের মোট সম্পদের ৭৭ শতাংশ যদি ১০ শতাংশ মানুষের কব্জায় থাকে আর বাকি ২৩% সম্পদ রয়েছে ৯০% মানুষের হাতে! ভাবা যায়!! সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল আর্থিক বৈষম্যের মধ্যেও এখন জাত পাত ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ বিচার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে সৃষ্ট মোট সম্পদের ৭৩ শতাংশ পেয়েছে ১ শতাংশ ধনী; আর সবচেয়ে নীচে থাকা ৬৭ বিলিয়ন মানুষের বেড়েছে 1 শতাংশ হারে; এখন ভারতে রয়েছে ১১৯ জন ধনকুবের এই সংখ্যা বাড়াতে প্রতিদিন ৭০ জন লাখপতি বানানোর লক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে; একজন সিইও এক বছরের বেতন = ন্যূনতম মজুরি প্রাপ্ত শ্রমিকের ৯৪১ বছরের বেতন!!

এরই অভিঘাতে দেশের শ্রমজীবীদের আয় + ব্যয় + ন্যায় + সুবিচার + অধিকার + শিক্ষা + স্বাস্থ্য + আশ্রয় থেকে শুরু করে সামাজিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে দেখা দিয়েছে সেই অতি চেনা ছবি যার জন্মদাগ হল দারিদ্র, বেকারি, ভুখমারি, অপুষ্টি, অশিক্ষা, কুসংস্কার, বঞ্চনা, ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, অত্যাচার, অপমান, অসম্মান বৈষম্য, জীবন যাপনে অনিশ্চয়তা ও বিপন্নতা। এসব তো আর আকাশ থেকে পড়েনি! সংবিধানকে সামনে রেখে তারই পশ্চাতে তিয়াত্তর বছর ধরে গড়ে তোলা হয়েছে এই আধুনিক রামায়ণ। রাজা এসেছে রাজা গেছে, মুখ বদলেছে কনটেন্ট বদলায়নি। সম্পদের চলন নির্ধারণ করেছে তার নিয়তি – একদিকে আগ্রাসন, বল্গাহীন আক্রমণ, অমানবিক, নির্মম, পাশবিক লুণ্ঠন, শোষণ অপরদিকে ভজন-পূজন-সাধন – যে পরিণতি বুঝে ওঠা যায়নি! যারা সম্পদ সৃষ্টি করবে তারা অভুক্ত থাকবে, যারা যত বেশি মেহনত করবে তারা তত বেশি দরিদ্র হবে। শুরুতে বলা কার্ল মার্ক্স এর সেই কথা: “অ্যাকুমুলেশন অব ওয়েলথ অ্যাট ওয়ান পোল ইজ অ্যাট দ্যা সেম টাইম অ্যাকুমুলেশন অব মিজারি, অ্যগনি অব টয়েল, স্লেভারি, ইগনোরেন্স, ব্রুটালিটি, মেন্টাল ডিগ্রেডেশন, অ্যাট দ্যা অপোজিট পোল” – আজও সত্য, কেউ খণ্ডন করতে পারেনি। সে রামায়ণ লেখার কাজ থেমে নেই।

 

[লেখক – ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, সমাজকর্মী। ‘অপরজন’ পত্রিকার সম্পাদক।]

Facebook Comments

Leave a Reply