দেবাশিস মজুমদার-এর কবিতা

fail

রাবণের রণসজ্জা ও স্মিথ সাহেবের প্রশ্ন

১.

আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি
বাড়িতে জড়ো হওয়া বা বড় হওয়া
ছোটবাচ্চারা স্বাধীনতার আনন্দে
প্রাণভরে মারপিট শুরু করলে
ঠাকুমা বা দিদিমারা রেগে গিয়ে বলতেন –
“কী শুরু করসে দ্যাখো, কথা কওনের জো নাই, যেন রাম-রাবণে যুদ্ধ চলতাসে।”
সে বয়সে দিদা-ঠাকুমার মুখে কথাটা শুনতে শুনতে শিখে গিয়েছিলাম
– রাম রাবণের যুদ্ধ মানেই রামায়ণ।

আর বাড়িতে পাকা ছেলেরা তাণ্ডব জুড়লে
ক্ষুব্ধ দাদু-দিদারা তকমা লাগাত –
“কী দুষ্টু! কী দুষ্টু!
যেন লঙ্কার হুনুমান আইছে
পিছনের ল্যাজখান শুধু নাই।
কী কাণ্ডটা করে সারাটা দিন
যেন লঙ্কাকাণ্ড চলতাছে বাড়িতে।”
লঙ্কাকাণ্ড বাধানো বাচ্চারা কিভাবে
হনুমান হয়ে যায় তাও অনেকটাই অবোধ্য ছিল শৈশবের রামায়ণ দর্শন-এ।

দুপুর রাতে ঠাকুমা-দিদার পাশে শুয়ে
ঘুম নিয়ে আসা গল্পের মাঝে
রাজা দশরথ, রাম, লক্ষণ, ভরত, কৈকেয়ী
কিংবা রাম রাবণের যুদ্ধের যে গল্প শুনে বড় হয়েছি
তাতে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করা এক ক্ষমতাবান প্রশাসক রাম
নেহাতই এক গল্প বা উপন্যাসের নায়ক হয়ে উঠত
কিন্তু বিষ্ণু ভগবানের অবতার শ্রীরামচন্দ্র
আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে
সেভাবে কোনওদিনই প্রভাব ফেলেনি।
অদূরে থাকা রামসীতা মন্দিরে
পুজো দিতে যেতেও বাড়ির লোকেদের খুব একটা দেখিনি।
কিংবা এলাকায় রামনবমীর দিনের মিছিল
বা দুর্গা পুজোর ভাসানের মিছিলের বদলে
দশেরার নামে দশ মাথার রাবণ পোড়ানো শুধু দিল্লিতেই দেখেছি
খুব জোর গঙ্গার পারের মাঠের মধ্যে দেখা শীতের রাতের রামযাত্রা আর যাত্রা শেষে রামসীতার মালা বিক্রি দেখতাম
দুচোখের উৎসাহ নিয়ে।

রামের সেনা হনুমান সঙ্কটমোচন বা বজরংবলী হয় জানতে পেরেছিলাম
সেই দিনই যেদিন বেনারস থেকে আসা ছোটকাকিমা ঐ ফটো মাকে উপহার দিয়ে বলেছিল –
‘রাখো দিদি ঘরের বিপদ কাটবে।’
আমার গোঁড়া ঠাকুমাকে সেদিনই বলতে শুনেছিলাম —
‘ও তো হিন্দুস্থানী ঠাকুর গো, ঘরে বসাইয়ো না, বাড়ির বাইরের বারান্দায় বসাও।
নইলে ঘরের বাচ্চাগুলান বান্দর হইবো।’
সেদিন বুঝেছিলাম হিন্দুস্থান বলে আলাদা কোনও দেশ আছে আর আমরা হিন্দুস্থানী নই।
অন্ততঃ রাম আর তার সেনাবাহিনীর দৌলতে।

আর একটু বড় হয়ে মানে, আমাদের পাকাবেলায়
হিন্দুস্থান বা ভারতবর্ষকে চিনেছি
আমাদের বাড়ির পাশের গলির
বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের লাইন এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে
কিংবা সেখানকার শ্রমিক বস্তিতে
বেড়ে ওঠা ছেলেদের সাথে
গুলি ডাংগুলি খেলতে খেলতে
এই লাইন এলাকার পাশের খাটালে থাকত যে নাথুনি গোয়ালা —
যার একটা চোখ ছিল পাথরের আর বাড়ি ছিল ছাপড়া জেলায়।
সন্ধ্যেবেলায় তার খাটালে দুধ আনতে গেলে
দেখতাম – দুধ দুইয়ে নিয়ম করে
সুরের তালে দুলে দুলে পড়ত সে –
তুলসীদাসী রামায়ণ।
সামনে তার যত্ন করে টবে রাখা তুলসীগাছ
আর লাল সিঁদুর মাখানো শক্তিমান হনুমানজী
আর তার পাশে রাখা আবছা হয়ে যাওয়া
বাড়ির লক্ষ্মী নারায়ণের মতো একটা ফটো।
অনেক পরে বুঝেছিলাম ওনারা
লক্ষ্মী নারায়ণ নন, রামসীতা।

এই ছিল আমার ছোটবেলার রামজীবনপুরের রামায়ণ
আর তার নায়ক-খলনায়কদের রূপকথা।

আরও বড় হয়ে স্কুলের বৃত্তি-পরীক্ষার
পুরস্কার হিসাবে সুবলবাবু যেদিন
হাতে তুলে দিয়েছিলেন
সাহিত্য সংসদের মোটা ভারি
‘কৃত্তিবাসী-রামায়ণ’ বইটা।
সেই সদ্য গোঁফ গজানো বয়সে
মনে প্রশ্ন থাকলেও বুঝিনি
বাল্মিকী রামায়ণ ছেড়ে কেন কৃত্তিবাসী রামায়ণ?
আরও কয়েক বছর পরে
কলেজ জীবনের বাংলা ক্লাসে
অধ্যাপক অশোক পালিত
যেদিন পড়ালেন অনুবাদ সাহিত্য রামায়ণের গুরুত্ব ও কৃত্তিবাসের অবদান
সেদিন বুঝলাম বাংলা রামায়ণের বাঙালিয়ানা আর তুলসীদাসের ভক্তিরসকে —
যে রসে জাড়িত হয়ে শুদ্ধ জীবনের প্রতীক রামসীতাকে ভালবাসত
দুধ খাটালের নাথুনি গোয়ালা।

আরও কয়েকবছর বাদ প্রমোটার রাজের
পোষিত দালাল গুণ্ডারা নির্বিবাদী নাথুনি ভাইয়ের খাটাল উচ্ছেদের জন্য তাকে ধমকালে,
সে তার বাচ্চা মেয়েটার হাত ধরে, কাঁদতে কাঁদতে
আমাদের বাড়িতে ছুটে এসেছিল
সেদিন মার চীৎকার শুনেছিলাম – “এটা কী রামরাজত্ব? যা ইচ্ছে তাই করবে!”

২.

পরে কলেজজীবনে অধ্যাপক সিদ্ধান্ত বুঝিয়েছিলেন –
যা ইচ্ছা তাই করার মধ্যে
যেমন স্বেচ্ছাচারিতা থাকে
তেমনি সবাইকে নিয়ে চলার মধ্যেই তো স্বাধীনতার প্রকৃত সত্যটা লুকিয়ে থাকে
সেদিনই বুঝলাম ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা স্মিথ সাহেবের উক্তির তাৎপর্য কোথায়?
রামরাজত্বে না রাবণের রণসজ্জায়?

আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে অধ্যাপক রায়চৌধুরী শিখিয়েছিলেন – জনগণমন-র তত্ত্ব।
আর সতর্কও করেছিলেন এটা বুঝিয়ে –
পাওয়ার-এর চমককেই অনেকে বলে
আসল ক্ষমতার রসায়ন।
আর সেখানে প্রয়োজনে রাবণ সাজার স্বাধীনতা নাকি অনেক রাষ্ট্রনেতারা মৌলিক অধিকার বলে ভুল করে থাকেন।
সেদিনই বুঝলাম – রাবণরা কেন রণসজ্জায়
সজ্জিত হয়?

কলেজের রোগাপাতলা ছোট্ট মানুষ অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার জন্যই
মাঝে মাঝে বোঝাতেন –
ইতিহাসের ধারাকে – যা বোধহয় মেঘনাদ বধের মতনই
রাবণরাজার নায়ক জন্ম ঘটাত
কোশাম্বী-র ভারতে।
সে যুগে এই ছিল আমাদের
স্বাধীন ভাবনার রামায়ণ

আর মাঝবেলার এই উদার ভাবনার রামায়ণ প্রশ্নের মুখে পড়ল এই কালবেলায়
যেদিন আমার পুস্তকপ্রেমী বন্ধু ইন্দ্রজিৎ
মেঘনাদবধের ইন্দ্রজিতের মতোন বীরদর্পে বলেছিল —
‘যাই বলো, ওদের একটু টাইট দেওয়াই দরকার। ওটাই আসল উদ্দেশ্য।
সারাদেশ থেকে কাউকে কি কেউ তাড়াতে চায় না পারে?
বলো না?
সম্ভবও নয়। শুধু চাপে রাখা। আসলে ক্ষমতার গন্ধে ওদেরকে সবাই যেভাবে সুবিধা জুগিয়েছে তাতে একটু লাগাম পড়ানো। এ তো সাহসী
সিদ্ধান্ত বলতেই হবে। ওদের ইচ্ছায় তো সবকিছু চলতে পারে না, বলো না?
আর ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের পদ্ধতিতে ভুলটা কোথায়?’

সেদিন বুঝলাম –
ইনটেলেকচ্যুয়ল জিমন্যাসটিকস কি?
আর তার প্রভাবে নায়ক খলনায়কের
পোশাক কিভাবে বদল হয়?

৩.

পাড়ার সবজান্তা ক্ষ্যাপাদা
রামকে শুধুই বোতলবন্দী অবস্থায়
দেখতেই ভালবাসে।
এই রামভক্তও সেদিন রাতে আকণ্ঠ খেয়ে চীৎকার করে
বলে উঠেছিল –
রামায়ণের যুগের রাবণকে আবার
আজকে খুঁজতে গেলে পাবি না
দেখে নিস, কখনও এক হয় না হতে
পারে না।

সেদিন বাড়ি ফিরে বইয়ের তাকে
হাত বাড়িয়েছিলাম যোগবশিষ্ঠ
রামায়ণটা নতুন করে পড়ব বলে
হাতে ঠেকল মধুসূদন।
ক্ষ্যাপাদার কথাটা কানে বাজছিল
পাতা ওলটাতে ওলটাতে
নতুন করে পেলাম
আর এক রামসীতাকে, আর নতুন ইন্দ্রজিৎকে এক নবরূপের মেঘনাদী রামায়ণে।

এই নতুন মেঘনাদবধে
আমাদের ইন্দ্রজিৎরা সংশোধনী
রাজনীতির তত্ত্বে এক নতুন ইতিহাস
রচনা করতে চায় –
ওদেরকে চাপে ফেলার কৌশলে।

ভাল কথা –
‘আমরা সবাই রাজা’র রাজ্যে
এও এক নতুন রাজা
যার কাছে আমাদের দাবি
স্বাধীনতা দিবসের দিন আমার মতন
আমাদের অনেকেরই বুকটা খুব মোচড়
দেয় টুকরো হওয়া দেশটার জন্য, পতাকা
উত্তোলনের সময়ও না আমরাও পা-টা না
কাঁপে ওই ফেলে আসা –
পাবনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি
কিংবা আজাদ কাশ্মীর, সুয়ার্ত
ভ্যালি, নীলাম ভ্যালি
কিংবা নিদেনপক্ষে ওই মান্টো সাহেবের
দেশের বাড়িটার জন্য – যেগুলো একদম
আমাদের ছিল – বলতে পারতাম আমার বলে
প্লিজ, একটু দেখুন না –
আগামী স্বাধীনতায় এই বিভাজনটা মুছে
দিয়ে দেশটাকে আবার জুড়ে দেওয়া যায় না
ওটাও তো ছিল একটা ঐতিহাসিক ভুল
মানেন তো? এটাকেও শুধরে নিন না? বাকিগুলোর মতন?

আর একটা ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’র জন্য।

Facebook Comments

Leave a Reply