রাজস্থান ডায়েরিস : সিন্ধু সোম

পর্ব-১৩

রাজস্থান ডায়েরিস-২৫

ঐ তার দূর চূড়া। তিনটে অতিষ্ট শালিক। খেয়ার অপেক্ষায় পা গেঁথে যাচ্ছে পাঁকে। তখনই বুড়ো স্টেশন মাস্টার ঘড়ঘড় শব্দে ঘাড় নাড়ে। বন্যা। আকাশ থেকে মরুর বুকে। নেমে আসে ময়ূরপঙ্খী। দৈত্যপুরী। আখেরনের সাবলীল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। খেয়া আসছে। লাভাগলা কৃষ্ণচূড়া। বাঁশি। একটু একটু করে কালো দাগ এগিয়ে আসে। গুমগুমির শব্দ। অন্ধকার চপলার মতো ঢলে পড়ে গায়ে। খেয়ায় চড়েছি।

জননাঙ্গের রঙের শহর। অন্যঘাটের বুকে। দিতির সঙ্গে বেরোনো মনে পড়ে। ভাটিয়ালি। মাঝির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। নজরুল। বাঁশি নামানো পাশে। আমার দিকে চেয়ে বলেন, “অনেক হুঁশিয়ারি দিলাম ভাই। ভেবে দেখলাম অন্ধের দেশে তাকানোটাই পাপ। বরং খেয়া পারাপার করি। দিব্যি সময়টুকু কাটে।” মনের ভুল। আবৃত্তি করে ফেলি,”বিদ্রোহী রণক্লান্ত, আমি সেই দিন…”। নজরুল বোবা চোখে তাকান আমার দিকে। ক্ষমা। ক্ষমা। এই নজরুলকে আমি চিনি। আমিই তাঁর স্রষ্টা। যে অহং-এর মোড়কে মোড়কে সংকল্পের রাঙতা, সেই অহং আবেগকে ধোপার মতো আছড়ায়। পাগল। দাঁত কিড়মিড়। সমাজ তাকে দিয়েছে কতটুকু ছোবলের পর ছোবল ছাড়া? নৌকোর পাটা দোলে। ঘটাং। তাকিয়ে দেখি অহং-এর বর্মের সিংহভাগ। লজ্জায় লাল। খসে পড়েছে। একটু খানি চোখের মাঝে লেগে। ভাবলাম, ব্লিচিং-এরও দাগ হয়। জল ক্রমশ সরে যাচ্ছে নীচে। কি? কি? নৌকো পাল তুলেছে। হাল তুলেছে। ভাসছে লালের পংক্তি ধরে। হাওয়ার দোলায় উড়ছে আকর্ষণ। রিক্ততার বেশে।
আমি কবির পাশে এসে বসি। ফসস্। লাল মুখ আরো পুড়ে ওঠে মুহূর্তে। বিড়ি ধরান কবি। সেই অস্তমিত বাস্তবের কাছা বদলে দেন নিজের হাতে। কাঁথাটা ভেজা। নৌকোর ছই-এ পায়ের চিহ্ন। কবি বলেন, “অনেক দিন হয়ে গেল ভাই, পারানি দেয় না কেউ! তুমি আমার জেলের গল্প শুনেছ?” ঘাড় নাড়িয়া বলি, “সে তো সবাই জানে!” নজরুলের অন্ধকার মুখের ওপর ধোঁয়ার নিস্তরঙ্গ তাজ। চোখ নাচিয়ে বলেন, “বাব্বাহ্! তা জেনে কি উদ্ধার হল? এখনও তো ঘানি টানছ। শুধু শুধু কবিতার একটা আবেগ হাতছাড়া…”। নিজেকে সামলাতে বলি, “তা, বলুন না, শুনি!” একটা কাঁচা খিস্তি শুনে মুখ তুলে দেখি। নজরুলের অন্ধকার ছায়া সরে এসেছে খানিকটা। সেখান থেকে উঠে আসছে একটা অবয়ব। পুরন্দর ভাট। “তোর সাধের পোষা ঢ্যামনা রে! যখন বলবি বমি করতে হবে? তখন ফণা ছিল কোথায়…”! উত্তর নেই। আমি মুখ নামাই। কাঁচা খিস্তিরও পাঁচালী হয়। আমি বাঁশিটায় ফুঁ লাগাই। বেশ মাথুরের রঙ লাগে।

ক্রমশ এগিয়ে আসে আলো। আমার নাব্যতা কমে। এক গোছা তারে বিজলী জ্বলে ওঠে ছই-এ। দিতি মাঝরাতে এমনি করে চাইত। টেবিলের পাশে ডাস্টবিন। উপুড় হয়ে পড়ে থাকত মুখ ঢেকে। গুন গুন। সনৎ সিংহ। “কে আমারে বলতে পারে রংমশালের মশলা কি…”। পৌঁছে গেছি প্রায়। শিমূলের মতো ফাটে কিছু। উত্তেজনার জোৎস্না হয়। আজও সাধনা রাস্তায় লেগে থাকে। অজন্তার মৈথুনের মূর্তি দেখে ডুকরে ওঠে সৃষ্টির বিধবা। বাস্তবের অধিবাস্তবতা কাটানোর জন্য। আমি শেষবার নজরুলের সঙ্গে ভাব জমাতে যাই। সূর্যের সংস্কৃতি তাঁর মাঝ সিঁথিতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বাবরির পরতে পরতে দূর জমে উঠেছে ঘন থেকে আরো ঘন। নজরুল আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন। অভিমান। আমার ঝাপসা লাগে চারদিক। অনেক দূর থেকে ভেসে আসে নজরুলের কন্ঠ—”অনেক ছিল বলার যদি সেদিন………”

ডটের পর ডট। ডটের পর ডট। ডটের পর ডট। এভাবেই এক একটা মহাকাব্য গড়ে ওঠে। কালিদাস জানতেন। মাইকেলও জানতেন। অযাচিত জেনে ভাঙার ক্ষমতাকে মূর্খামি বলে না, সাধনা বলে, ছোট্ট করে, সাধনা…

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
৩১শে অক্টোবর ২০১৮
সন্ধে৭টা ৪৮

দোলে দোলে মম তনু নাওয়েরই অধীনে, ডুবিয়ে পসরা মোকে নাবিক করিলে শ্যাম, পারানিতে সুর দিও দীনে

রাজস্থান ডায়েরিস—২৬

নীচে দাঁড়িয়ে মাথা তুলি। তা নাহলে মানবিকতা ভয় পায়। সোনার দূর্গ। সপাং। কোথাও চাবুক। হ্রেষাধ্বনি। আমার দুপাশ দিয়ে চাকা গড়িয়ে যাবার শব্দ। একটা হিম শীতলতা। আর কোনো আলো নেই অনুভূতির। দৈত্যপুরী। তিন কোনা পরোটার মতো পোড়ার দাগ গায়ে। ছন্দ। নাচের আওয়াজ। যন্ত্রদানবের পিঠে ধুলোর প্যারাসুট। আলোচনা। মৃতদের বাজারের তাড়া নেই। বৃত্তাকার সিঁড়ি ধাপের পর ধাপ। এভাবেই চলার কথা সংস্কৃতির। কিন্তু সে রবীন্দ্রনাথ। ভাঙার আনন্দে গড়ার স্রোতে ঢেউ। একটানা ঘুঙুর কাঁদে। আমার পাশের হাওয়ায় দোল দিয়ে যায় অক্ষমতা। শিরশির। সরে গেল একটা গিরগিটি। দেয়ালের গর্তে। পা এগোয় না। দিতির ছায়া ডাকে। আয় আয়। ছায়ারা কতটা সত্যি? শরীরের থেকে তার কাপড় বেশি কি?

পায়রা ওড়ে। ঝটপট ঝটাপট। পুরীর গায়ে জানলা ব্রণর মতো। ধিকি ধিকি। আলো বাড়ে। আলো কমে। আলস্য। নাচের মজলিস। কত জন্ম এভাবেই ফোটে। যৌনতার সঙ্গে আলোর সম্বন্ধ হয়েছিল নাচঘরে। পাকা দেখা। তারপর দৈত্যের ঝাপটায় অন্ধকার উষ্ণতা দিল ঢেলে। তখন থেকেই আলো মুখ ঢেকে ঘোরে। পাছে তার চুনকালি নাচঘরের আয়নায় দেখা যায়। ক্যাঁচ করে লোহার দরজা কাঁদে। আমার সামনে এসে দাঁড়ায় প্রহরী। মাথায় উল্কি করা,”যেতে নাহি দিব”। শিশুর এ আকার দেখে আমি চমকে উঠি।

পাহারার ইতিহাস বৃদ্ধ। অতিবৃদ্ধ। আরামের চক্রবূহ্যের মতো ঋজু শিশ্ন তার নেই। অভিমন্যু কে? তার নাম মনে রাখে নি অশ্বত্থামার মণি। ঝলমল। আলোর প্রতিক্রিয়া। দৈত্যপুরীর বাইরের সে কাঁপে থরো থরো। আবার যদি চরম মুহুর্তে নিভে যায়? সে অনুভূতি দেখার চেয়েও বেশি দেখার। শোনার চেয়েও বেশি শোনার। পার্থিব কান্নার বুকে মড়ক লাগে। শকুনশিশুর অনুকরণ করে মৃত্যু। প্রহরী হাতের বল্লম নিয়ে পথ আগলায়। নীরব উচ্চারণ। আমি সাদা জামার দাগটুকু তুলে ধরি। রক্তের মতো। সময়ের উপহার। প্রহরী ভাবে আমি মৃত। মরা ছাগলের মতো ঘোলাটে আমার চোখে কাকের দৃষ্টি এসে মেশে। দ্বার ছাড়ো। দ্বার ছাড়ো দ্বারী।

ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়। নেমে আসে অস্ত্র। পাথরের বুকে। টানতে টানতে সরে যায় প্রহরী। বিশ্বের বাণীতে বীর্যের দাগ লেগে থাকে। এভাবেই। কাপুরুষ আর মহাপুরুষের ভেদ রাখেন না সত্যজিৎ। মঁপাসা বেঁধে রাখেন ঘোড়া। আমি সাদা পাঞ্জাবিতে দেশলাই খুঁজি। গোল্ড ফ্লেকের রহস্যে চামড়ার দাগ লেগে থাকে। ‘ঋজু’রাহোর মতো। ধোঁয়াশা আর মেঘ ঝুঁকে চুমু খায়। জানলার প্রদীপের ছটা তাদের উঁকি দিয়ে দেখে। সোনালী মাশকারা ঝলকে ঝলকে ওঠে। আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকি। জন্ম বাড়ে। মৃত্যু তবু পুরোনো হয় না এক তিল। তার সমস্ত অস্তিত্বের গাভীন দৃষ্টি নিয়ে দৈত্যপুরীর হা হা বুক তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে দুলতে দুলতে ঝরে পড়া এক দুটো পাতার আবেগটুকুতেই। আমি জানি ওগুলো মাটি ছুঁলেই ফিরে আসবে প্রহরী। অন্ধকারের অনাবিল সঙ্গ মেখে আমি এগিয়ে চলি ভূতের মতোই। বীরভদ্রের উদাসীনতা নিয়ে। আমার রক্ত আমার শিরায় ছড়িয়ে দেয় অন্তিম বোধের আশিষ। অথবা অভিশাপ। শীত আসছে, শীত আসছে, শীত আসছে, শীত আসছে…

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
৩১শে অক্টোবর ২০১৮
সন্ধে ৮টা ২৯

দৈত্যপুরীর প্রত্যখ্যান তার জন্মের গোড়াতে চারায় নাকো! পাথর আর জলের মাঝে মাটিরও বলার কিছু থাকে

সিঁড়ির বুকের পাশে প্রোলেতারিয়েত অন্দরমহল বসে আছে, কোকিলের গলা কেটে রেখে গেছে রেলিং দালালে

Facebook Comments

Leave a Reply