অনুবাদকের মৃত্যু হয় না, হতে পারে না : মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় – সুখেন্দু দাস

fail

বাংলাতে অনুবাদকরা কি যোগ্য সম্মান পান? প্রকাশকদের সাথে তাদের চুক্তিপত্র কিংবা লয়্যালটি কতটা থাকে? পুস্তক বেরোনোর পরেই তো অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় প্রকাশকেরা অনুবাদকদের তেমন আমল দেন না, প্রচ্ছদে তাদের নাম থাকে না, তাদের গ্রন্থ উন্মোচনের সময় মঞ্চে ডাকা হয় না, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর লেখক হিসাবে পরিচয় দান করা হয়, আরো কত বিস্ময়কর ব্যাপার-স্যাপার। নবনীতা দেবসেন মাসির মতো ব্যক্তিত্বও বলেছিলেন – ‘‘অনুবাদ আমাদের দেশে প্রেমের পরিশ্রম। তবে প্রেমে চলবে না, অনুবাদককে হতে হবে প্রফেশনাল। অবসর বিনোদনের নয়, অনুবাদ হওয়া দরকার পদ্ধতিগতভাবে। ট্রান্সলেশন স্টাডিজের ওপর সেমিনার নয়, হাতে কলমে শিক্ষা, কর্মশালা, ডিগ্রী দিয়ে, ভালো বেতন দিয়ে অনুবাদ কাজটি করা দরকার। আমাদের ট্রানসলেশন রাইটারও নেই ওটা দরকার।’’ নবনীতা দেবসেনের সহপাঠী ছিলেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বলা যেতে পারে বিংশ শতকের শেষার্ধ থেকে একবিংশ শতকের দুই দশক পর্যন্ত বাংলার অনুবাদ-এর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনুবাদ করবেন বলে তিনি কোনো টিউশন করার পক্ষপাতী ছিলেন না। প্রকাশকেরা এবং পত্রিকার সম্পাদকেরা তাঁর কাছে ট্রানসলেশন অন ডিমান্ড-এর মাধ্যমে অনূদিত সাহিত্য গ্রহণ করতেন। মাস্টারমশাই বুদ্ধদেব বসুর মতো ব্যক্তিত্ব ‘ডক্টর জিভাগো’ অনুবাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তাঁর কাছে। তখন তিনি রেঙ্গুনে কর্মরত। অনুবাদ সম্পর্কে হাস্যকৌতুক করে তিনি বলতেন – ‘‘অনুবাদ মানে অনু পরিমান বাদ৷ তাই আমি ‘তর্জমা’ কথাটা ব্যবহার করলাম, যা তুলনামূলক ভাবে কিছুটা মেলে ৷’’
‘‘প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরীতে উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে জুল ভের্ন-এর অনেকগুলো বই ছিল, ইংরেজী অনুবাদে (ফরাসি ভাষারগুলো ছিল না৷ সেগুলো খুব দুষ্প্রাপ্য বলে তারক সেন বইগুলি কাউকে দিতে বারণ করতেন৷ সেখানে আমার সামাদ সাবের সাথে দেখা হল, অ্যাসিস্টেন্ট লাইব্রেরীয়ান৷ তিনি গোপনে একটি করে বই আমাকে দিতে লাগলেন৷ বইগুলোর বাংলা করে তারপর ফেরত দিয়ে দিতাম৷’’ এই ভাবে শুরু হয়েছিল জুল ভের্নের বইয়ের অনুবাদ। এগুলোই ছিল তার প্রথম দিকের অনুবাদ প্রেসিডেন্সিতে তখন বাংলা অনার্সে পড়াশোনা করেন।
৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দে (২৩শে মে ২০১৯) আমি এবং আমার মিসেস সুষ্মিতা দাস তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার (একটি অংশ প্রকাশিত হয়েছিল শারদীয়া ‘অনুবাদ পত্রিকা’ নভেম্বর ডিসেম্বর ২০১৯) নিয়েছিলাম, উঠে এসেছিল এই সমস্ত প্রসঙ্গ, তখন অবাক বিস্ময় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা। ছোট থেকেই যারা টিনটিন আর জুল ভের্নের অসাধারণ গল্পগুলি পড়ে বড় হয়েছে তারা নিশ্চয়ই তাঁকে দেখে আমাদের মতোই অনুভব করত। ৪ আগষ্ট ২০২০ তাঁর যাত্রা-সমাপনে আমরা সবাই শোকাহত।
১২ই বৈশাখ, ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে (২৫শে এপ্রিল ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ) শ্রীহট্ট জেলার সদরে জন্মগ্রহণ করেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ছেলেবেলায় বাবার কর্মসূত্রে অসমে কেটেছে ৷ ম্যাট্রিক দিয়েছেন সৈয়দ মুজতবা আলির শহর বলে পরিচিত করিমগঞ্জের স্কুলে৷ ইন্টারমিডেট দিয়েছেন আগরতলার মহারাজা বীর বিক্রম কলেজ থেকে৷ কোলকাতার প্রেসিডেন্সি থেকে স্নাতক ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নতকোত্তর (তুলনামূলক সাহিত্য : বাংলা)৷ বিদেশে পড়াশুনা (কিছুক্ষেত্রে অধ্যাপনা ) টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে (ভর্শভা)৷ কর্মজীবন শুরু হয়েছে রেঙ্গুনে, অধ্যাপনা দিয়ে৷ পরে খড়গপুরে হিজলি হাইস্কুলেও পড়িয়েছেন৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন৷ ১৯৯৮ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন ৷ কবিতা – প্রবন্ধ – উপন্যাস – অনুবাদ সাহিত্যে তাঁর দক্ষতা অতুলনীয়৷ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সাহিত্যিকের গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন৷
প্রথম লেখা শুরু হয়েছিল কবিতা দিয়ে৷ তখনকার সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে যেমন ‘মৌচাক’, ‘রামধনু’, ‘কিশোর বাংলা’তে ছোটোদের জন্য কবিতা লিখেছিলেন৷ ‌শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র স্মৃতিপুরস্কার।
সাক্ষাৎকারের একটি অংশে জানিয়েছিলেন – ‘‘আমি পাশ করে চাকরি করতে গেলাম রেঙ্গুনে ৷ যাবার সময় আমার শ্রদ্ধেয় স্যার বুদ্ধদেব বসু ‘‘ডক্টর জিভাগো’’ দিয়ে বললেন এর অর্ধেক অনুবাদ করতে৷ বাকি অর্ধেক মীনাক্ষী করবে আর কবিতাগুলি করবেন তিনি নিজে ৷ সকালে পড়াতাম, আর রাতে একটু একটু করে অনুবাদ করতাম৷ তাছাড়া আমার আর মীনাক্ষীর অনুবাদের ধরনের মধ্যে কোনো তারতম্য আছে কি না তা দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুবীর রায়চৌধুরীকে৷ সুবীর যদিও বলেছিল তারতম্য ঘটেনি ৷’’
তাঁর কথা অনুসারে, ভারতবর্ষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যকে যুক্ত করা হয়েছিল। তুলনামূলক সাহিত্যে যখন এম. এ. পড়ছিলেন তখনই তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যের সাথে পরিচয় ঘটে। যার একটি ফল সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন – ‘‘তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্যের প্রতি আমার বিশেষ ঝোঁক ছিল৷ কিছুটা আফ্রিকান সাহিত্যও করেছি৷ কানাডার ভ্যানকোভারে, পোল্যান্ডে আরো নানা জায়গায় ছিলাম কর্মসূত্রে ৷ পোল্যান্ডে থাকার সময় পোলিশ ভাষা শিখতে হয়েছিল৷ যেখানে যেখানে ছিলাম সেখানকার ভাষা কিছুটা রপ্ত করতে হয়েছিল৷ এমনকি পোল্যান্ডে যাবার আগে আমি বেশ কিছু পোলিশ সিনেমা দেখেছি, তাতেই আমার ভাষার প্রতি আগ্রহ হয়েছিল৷ পোল্যান্ডে গিয়ে দেখলাম ওখানকার সিনেমা শুধু নয় কবিতাও বেশ ভালো, সাহিত্য-গল্প-উপন্যাসও খুব ভালো৷ যদিও আমি দুই-তিন জন কবির কবিতা অনুবাদ করেছি৷ আর মজার ব্যাপার হল, তাদের মধ্যে একজন দুজন পরে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন৷ যেমন, আমি অনুবাদ করেছি, চেশোয়াভ মিউশ-এর কবিতা৷’’ বিস্ময়ের বিষয় হল তিনি মর্কেজের ‘সরলা এরেন্দিরা আর তাঁর নিদয়া ঠাকুমার অবিশ্বাস্য কাহিনী’ ১৯৭০ সালে অনুবাদ করার পরে ১৯৮২তে মর্কেজ নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ৮১ বছর বয়সেও তিনি অনায়াসে বলতে পেরেছিলেন – ‘‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মর্কেজ-এর বইতে ম্যাজিক রিয়েলিজম বা জাদুবাস্তবতার কথা পাওয়া যায়৷ তার সাথে ভাব ছিল কিউবার প্রেসিডেন্ট ফ্রিদেল কাস্ত্রোর ৷ সেখানে বেশ কয়েকটি আন্দোলনে তারা পরস্পরের সাথে যুক্ত হন৷ পরে মর্কেজ ম্যাক্সিকোতে চলে যান৷ এমনকি মর্কেজ পরে কিউবাতে অনেকবার গেছেন আর বই বিক্রির টাকাও কিউবাকে দান করেছেন ৷’’
তিনি মালায়লম ভাষার লেখক ভৈকম মহম্মদ বশীরের ছোটোগল্প অনুবাদের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন (১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ)। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন – ‘‘ওনার নাম মহম্মদ বশীর৷ ভৈকম কেরালার একটি জায়গার নাম৷ দেশ স্বাধীন হয়নি যখন তখন বশীর রাজনীতি করতেন৷ তিনি একবার এখানে (কলকাতায়) পালিয়ে এসেছিলেন; নাখোদা মসজিদের কাছে একটি উঁচু বাড়ির চিলেকোঠায় তিনি কিছুদিন ছিলেন৷ আমার কেরালার লেখা বেশ ভালোই লাগে৷ বিশেষ করে বশীরের লেখা৷ যদিও আমি মালায়লম ভাষাটা জানিনা৷ অনুবাদের ক্ষেত্রে আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে ইংরেজি অনুবাদের ওপর৷ সেখানকার একজন সাংবাদিক যিনি মাতৃভূমি নামক একটি কাগজে কাজ করতেন, তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন এবং তিনি আমাকে পারমিশন পেতেও সাহায্য করেছেন৷ বশীরের সাথে যোগাযোগও করে দিয়েছিলেন৷ অনুবাদটা বাংলায় হবে শুনে বশীর খুবই উৎসাহিত ছিলেন৷ একাদেমি পুরস্কার লাভের সময় আমার মনে হয়েছিল সত্যই ওনার লেখা এতদিনে সমাদর পেল৷ এমনকি তাঁর লেখা থেকে সিনেমাও হয়েছে, যেমন, দেয়াল৷’’ সত্যি কি দূরদর্শী মানুষ।
কথাপ্রসঙ্গে উঠে এসেছিল অদ্রীশ বর্ধনের প্রসঙ্গ ‘‘অদ্রীশ তো মারা গেল সেদিন (২১শে মে, ২০১৯)। ভালো অনুবাদ করতো।’’ মানিক কিংবা জীবনানন্দকে দেখেছেন কিন্তু আলাপ হয়নি। জীবনানন্দ সম্পর্কে জানিয়েছেন – ‘‘ওর এক ছেলে ছিল সে পাগোল, শম্ভু। মেয়েরও মাথা খারপ ছিল, মঞ্জু। মঞ্জুর সাথে এমনিতে আমার মেমুতে খাতির হয়েছিল। প্রণবেন্দু যে হাসপাতালে ছিল মাথার চিকিৎসা করবার জন্য সেখানে মঞ্জুও ছিল। মঞ্জু সম্পর্কে একটা গল্প আছে -যে ও একটা স্যুটকেসে করে জীবনানন্দের কিছু পান্ডুলিপি নিয়ে যখন যাচ্ছিল, কোলাঘাটের কাছে কোথাও ফেলে দিয়ে চলে আসে মনে নেই। আমি ভূমেরকে জিজ্ঞাসা করে ছিলাম, ভূমের বলেছিল শোনা তো যায় হতেও পারে। জীবনানন্দ এত লিখেছিলেন যে সেটা কেউ জানতোই না।’’ শীর্ষেন্দু সম্পর্কে জানিয়েছেন – ‘‘শীর্ষেন্দু কলেজ স্ট্রিটের ওখানে একটা মেস বাড়িতে থাকতো, দুবেলা প্রায় খাওয়াও জুটতো না। তখন কফি হাউসে কফির দাম ছিল ১৯ পয়সা, তা সেটাও ও দিতে পারতো না। খুব কষ্ট করেছে। দেশভাগে বাড়ি বিক্রমপুর থেকে এখন যোধপুর পার্ক-এ থাকে। আর এত বই লিখেছ।’’
কথা প্রসঙ্গে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম – ‘‘কাকে বলে জীবন, কে জানে? / যা কেউ যেমন ভাবে বেঁচে থাকে, জীবন তা নয় – / বরং যা-কিছু কেউ মনে করে রাখে / এবং যেমন করে মনে রাখে, তা যদি কেউ কাউকে শোনায় / সমস্ত আপদ ভয় দ্বেষ ঘৃণা অনীহা সমেত / – এবং হয়তো তার প্রেম-প্রীতি আদর্শ ইত্যাদি – / তবেই হয়তো কেউ খোঁজ পায় জীবনের রীতি ভঙ্গিমার।’’ (চোরকাঁটা) এই কবিতাটি কি একান্তই আপনার জীবনের ব্যক্তিগত অনুভূতির ফসল? অবাক বিস্ময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আচ্ছা তাহলে কি খারাপ অনুভূতিগুলো চোরকাঁটা! বললেন – ‘‘চোরকাঁটা! শুধু কাঁটা নয়, এইটা। যেগুলো গোপনে থাকে লুকিয়ে থাকে, খেয়ালও করা হয় না, এগুলো। আমাদের অজানতে আড়ালে থেকে যায়..’’ গোপন অনুভূতি- ‘‘কখন সুযোগ বুঝে হানা দেয় যত চোরকাঁটা।’’ জীবনের প্রান্তে এসে এমনই গোপন অনুভূতি কি চোরকাঁটার মতো রয়েছিল? ভাবলেও আজ অবাক লাগে! সত্যি অনুবাদকের মৃত্যু হয় না হতে পারেনা, মনের গোপন অনুভূতিতে তারা যে চোরকাঁটা হয়ে থেকে যায়। সমাজ তার মূল্য বুঝে বা না বুঝে, মানুষের মনে তিনি থেকে যাবেন। তাই তাঁর কথাতেই বলতে হয় ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ থেকে – ‘‘পড়ে না-পড়ুক সেটা নিতান্ত ঘরোয়া ব্যাপার – / তোমরা কিন্তু মনে রেখো : আমি ঠিক বাংলাকে বাঁচাবো!’’

[লেখক – অনুবাদ বিষয়ক অন্বেষক। অনুবাদচর্চা ফেসবুক গ্রুপের এডমিন। পরিকল্পিত অনুবাদ সমিতির সাংগঠনিক উদ্যোক্তা।]

Facebook Comments

Leave a Reply