বাদুড়, মুদিদাদু ও ধম্মতলা : প্রণব চক্রবর্তী

fail

এবং অবশেষে সেটাই হলো যেটা ভাবতে গিয়ে তিনবার কমোডে ফ্ল্যাশ করলাম, একটা ছোট হ্যাঙ্গার নিয়ে রুমালটা মেলতে গিয়ে চারটে শ্যামাসংগীতকে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখে দেশলাইয়ের ভাঙ্গা খোলটায় নজর পড়তেই মনে পড়লো কালকের বাদুড়টার অই বিশ্রীরকম ঝুলে থাকায় বিরক্তির মাত্রাটা ওভাবে বেড়ে যাওয়া ঠিক হয় নি। যেহেতু দোষটা আমার ছিলোনা, গাণ্ডু বোলতা-টা কোথা থেকে এসে ন্যাংটো ঘাড়টা এভাবে খুঁচিয়ে না দিলে বুঝতেই পারতাম না, বোলতা-রা কিরকম অবজার্ভে রাখে আমাদের অসামাজিক অবদমনগুলি, বাধ্যত বেড়িয়ে যাওয়া শরীরের জল পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ যেহেতু হিসিঘরে নেই, জ্বলনটা বুঝে উঠতেই বেকায়দায় ছ্যা! দোষটা বোলতার গলা খুলে বোললাম। আর সে জন্যই তার সাথে দেখা। মহান বাদুড় ওভাবে চিলেকোঠায় ঝুলে থাকবে কে জানতো, লাঠি তো পেলামই না, উলটে কালো কুতকুতে মালটার চোখ দেখেই আমার মধ্যরাতের মাতাল সেই বৌদির কথা মনে পড়লো, যার বুকের চাপে আমার দম আটকে এসেছিলো এবং এক ঝটকায় ছিটকে ফেলেই ঘর থেকে বেরিয়ে সেই যে দৌড়টা, কি বলব বেগম শবনম, আপনার ঘরে তো সেই কবে থেকে আসি, এটা ওটা ইত্যাদি, কিন্তু কোনদিন কি আপনি দেখেছেন আপনাকে আমি বিরক্ত করেছি বরং ছেঁড়াফাটা কাপড় গেলাস গায়ে পুনর্বার জড়াতে জড়াতে আপনি নিজেই বলেছেন– একটা নেকড়ে। বিজয়ীর ছোট্ট হাসি দিয়ে দরোজায় পা রাখতেই আপনিই তো বারবার জানতে চেয়েছেন ‘আবার কবে’! বলেছি আসবো। কখনও কি আমি ও বাদুড় এক করে ভাবতে পেরেছেন, বলুন না, সবাই সে কথা জানতে চাইছে!
কিন্তু হবে না, ভাবনাটা আমাকে ভাবতেই হবে, সমীকরণটার মধ্যে একটা অসম্ভব বিকৃতির গন্ধ পেয়েছি, সাদাকালো যে বেড়ালটাকে নিয়ে এই বিস্তর জলঘোলা হলো তার একটা জঘন্য সূত্র কিছু আগেই হাতে এলো। আমি কি এতো বোকা যে বুঝতে পারবো না দুধ খাওয়াটা বড় ব্যাপার নয়, আরও অনেক বড় একটা অপরাধ কোন বাঁটের সেই দুধ সেটা না জেনেই চুষে সাপটে দেওয়া ঢাউস বাটিটাকে। যদি গরুর দুধ হয়, বেড়াল যেমন জানেনা সেই গরুটির গায়ের রঙ, জানেনা যে গয়লানি বা গোয়ালা সেই বাঁট চিপে বার করেছে তীব্র এই উপকারী রস। জানে না সেই গয়লানী বা গোয়ালার হাতের আঙুলের গড়ন এবং টিপে দুধ বার করবার শক্তি। বেড়াল এক জঘন্য অপরাধের মধ্যে যেভাবে টেনে আমাকে নামালো, তার স্বরূপ ভাবতে গিয়েই একদিকে যেমন গরু, পুষ্ট গরু না অপুষ্ট, সাদা কালো হলুদ বাদামী কিম্বা ইত্যাদী গাত্রবর্ণ, বাঁটের গড়ন, সরু না মোটা, ছোটো না বড়ো কিম্বা ইত্যাদী, এইসব। তারপর গয়লানী বা গোয়ালা প্রসঙ্গ। প্রথমে গয়লানী ধরা যাক। দুঠ্যাং ফাঁক ক’রে হাঁটু মাটিতে পুঁতে চিপে যাচ্ছে বাঁটের গরম। ফিনকি মারছে বালতি জুড়ে চিড়িক ফিড়িক দুধ। ভাবতেই কেমন পয়োধীনির সেই ঢাকনাহীন দুধেল বোঁটার কথা মনে পড়ে গেলো। একান্ত বেশরম না হলে চোখের সামনে দিয়ে এভাবে বউ সাজিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারে ল্যাংড়া কাত্তিক! কি স্পর্ধা! বাজারে বাঁধা-মালের ব্যবসা। তার কী গরম! মধ্যরাত হওয়ার আগেই বাসররাত্রীদের মুখের ওপর দরোজা বন্ধ করে দিলো। বেড়ালটাকে যদি একবার চোখের সামনে পাই, পুরো টাটাচ্ছে, বোলতার কামড় বলে কথা! তুই না হয় অসামাজিক, তাই বলে আমাদের ঘরের দুধ খেয়ে যাবি চুরি ক’রে!
এই জন্যেই কাকাবাবু এতো মদ খান, কারণ গরু তিনি সহ্য করতে পারেন না। তার কথাই হলো গরু মানে দুধ আর সব দুধই যেহেতু সাদা, আলাদা করে গরু চেনা যায় না। কাকাবাবু সারাজীবন এই ধাঁধাটা মেলাতে পারেননি। তিনটি বিবাহ, নয়টি সন্তান, তার অষ্টমটি পয়োধীনি। এতো করে রোজ পুকুরে নিয়ে গিয়ে নেড়েঘেঁটে সাঁতার শেখালাম, তামাটে বোঁটায় এখনও আমার দাঁতের এনামেল লেগে আছে, সে কিনা এক ল্যাংড়া কাত্তিক, বাঁধা মালের ব্যাবসা, দুহাতে পয়সার জোরে… ! ভাবতেই হবে বেড়ালটা কোন এ্যাঙ্গেল দিয়ে বাটিটার দিকে এগোলো। মুদিদাদু এসব গবেষণায় পাক্কা ওস্তাদ। চওড়া বুক, টাটে বসে দিনরাত গবেষণা করে বুঝে ফেলে কার ঘরের কোন মাল কিভাবে বেচে দেয়া যায়। ল্যাংড়া কাত্তিক কদিন ওই মুদিদাদুর দোকানেই ঘুরঘুর করছিলো সেটা সে নিজে কানেই শুনেছে। ঠিক এ্যাঙ্গেল দিয়ে কাকাবাবু মানে পয়োধীনির বাপকে পটিয়ে মাল গপাস্। কদিন ধরে এটা সে নিজের চোখেই দেখেছে সন্ধ্যের পর ধম্মতলায় গিয়ে মুদিদাদুর হাত থেকে ছিলিম নিয়ে কাকাবাবু মোজ করে টানছে। বিনি পয়সার নেশা কে ছাড়ে! এ তল্লাটের সবাই জানে ধম্মতলার ডাক নিয়েছে এ বছর মুদিদাদু। আর গাঁজার জোগানদার সে নিজেই। মুদিখানার দোকানের আড়ালে কতরকম ব্যবসা। সবাই বলে দেশে যখন স্বাধীনতার লড়াই হয়েছিলো, মুদিদাদুর বাবারা তখন ইংরেজদের কাছ থেকে অনেক মাল্টু কামিয়েছে। এ তল্লাটের কে কোথায় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছে, নানারকম এ্যাঙ্গেল দিয়ে তার বাবারা সে সব জেনে নিয়েই ইংরেজদের জানিয়ে দিত আর মোটা মোটা বখশিস পেতো। আজ তো আর ইংরেজ নেই, তাই গাঁয়ে বসেই মুদি দোকান আর একে তাকে এর তার নানাবিধ মাল বেচে পাতি খিঁচে যাচ্ছে চোরাগোপ্তা। সুতরাং মুদিদাদুর কাছেই জানতে হবে বেড়াল আর গয়লানীর মধ্যে কোন গোপন বোঝাবুঝি আছে কিনা!
তো সেই রুমাল কিছুতেই হ্যাঙ্গারে থাকছে না কিম্বা বোলতার এমন অভিরুচি কেন হলো! যেখানে সে দেখছে একজন সুসু করছে, আর সে কিনা এসে তার ঘাড়ে, মানে ঢুকিয়ে দিলো, হুল এবং চিড়িক মারলো হুল দিয়ে বিষ! লাঠিটাও কম বেয়াড়া নয়, সময় মতো চোখেই পড়ে না, উলটে বাদুড় দেখিয়ে ছাড়লো! মারতেই হবে, মুদিদাদু যদি দুধের বাটি এই খোলা বর্ষায় দেখেও না-বলে বেড়ালটা কতক্ষণ বসে ছিলো বাটিটা টানবে বলে, তবে আজ মুদির দোকানটাই উদলা করে দোবো। ধম্মতলায় যখন গাঁজা বেচতে যাবে, ওর কাছা টেনে খুলে দেবো। সেই ঢাউস বুকো মাতাল বৌদিকে ওর মুদি দোকানে ল্যাণ্ড করিয়ে বলবো– কেমন চওড়া বুকের ছাতি দেখেছো, তোমার চাপে ওর কিচ্ছু হবে না, লড়ে যাও। আর পেটে মাল পড়লে, বৌদির বুড়ো ছোঁড়া কোনও জ্ঞান থাকে না, দু-ঊরুর ফাঁক দিয়ে শুধু ধোঁয়া বেরোয়। সুতরাং চলো, আগে এ্যাঙ্গেলবাজ মুদিদাদুর কাছে যাই।… এ কথা ভেবে যেই বেরোতে যাব, হঠাৎ কুত্তা কেঁদে উঠলো আর এক ডুগডুগি ঘুড়ি গোঁত্তা খেয়ে পড়লো দক্ষিণ ঘরের ঝোপের কোণায়। কুত্তা হাটিয়ে ঝোপের কাছে যেতেই আরিব্বাস, না চাইতেই জল। গালে হাত দিয়ে এক জয় বজরঙ্গবালি হনুমান, দূরের কাঁঠাল গাছের ঝুলে পড়া কাঁঠালটির দিকে গভীর মগ্ন হয়ে এ্যাঙ্গেল ভাবছে। কোন এ্যাঙ্গেলে তাকে পেরে ফেলা যায়, সেটাই মোক্ষ। আর তার পাশেই রোঁয়া ফুলিয়ে বসে এক বেড়াল, ল্যাজটা গুটিয়ে মাঝে মাঝেই তিড়িক বিড়িক করে নাচাচ্ছে। এও তো এক নতুন এ্যাঙ্গেল। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারিনা এই ত্রিকোণ প্রতীক্ষার রহস্যময় সমীকরণ। যে কুত্তাকে কিছু আগে তাড়িয়ে এসেছি, হঠাৎ দেখি আমার কাছাকাছি এসে বীরদর্পে তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে হনুমান তাড়াতে, আর গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। জয় বজরঙ্গবালি পালটা কিছুক্ষণ দাঁত খিঁচিয়ে তার বিরক্তির কথা জানায় কুকুরকে ভয় দেখানোর ভঙ্গীমায়, তারপর নিজেই ধ্যান ভেঙে সুরুৎ দেয় ঝোপ ডিঙিয়ে কাঁঠাল গাছের দিকে। আর তৎক্ষণাৎ বেড়ালটি পাল্টা তৎপরতায় হনুমানের ছেড়ে যাওয়া জায়গায় যে ছোট্ট গর্তটি আছে, তার দিকে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে আসতে থাকে এবং শুরু হয় শিকারী দক্ষতার প্রয়োজনীয় লাফঝাঁপ। বোঝা যায় গর্তের ইঁদুরই তার লক্ষ্য। কিন্তু কুত্তা এবার অসীম সাহসী, ব্যাপক তড়পাতে তড়পাতে তার দিকে যতবার তেড়ে তেড়ে যায় বেড়ালও প্রতিরোধে বাঘের মাসি। হাতপা ছোট হলে কি হবে, অই সেকেণ্ডে ১৩০০ বার (অজ্ঞানীর তথ্য) নখের চাবুক যে কুকুর একবার খেয়েছে, বেড়াল ফুঁসে উঠে প্রতিরোধে দাঁড়ালে, দ্বিতীয়বার কাছে ঘেঁষবে না। এখানেও তাই হলো। মালটি আবার হুলো। এ্যাঙ্গেলে পাক্কা ওস্তাদ। কিন্তু এসব ভাবলে ডুগডুগি ফেঁসে যাবে। সুতোয় জড়িয়ে আছে কাঁটা। হ্যাট শালা, বেড়াল কুকুর হনুমান ঘুড়ি পথজুড়ে মুদি-অভিযান ঘেঁটে দিতে চাইছে। সূত্র যখন মিলেছে, ভাঙ্গা দেশলাই কার পকেট থেকে বেরুলো, খুঁজে বার করতে হবেই।
সম্মুখ সমরে পড়ি / বীরবাহু বীর চুড়ামণি / চলি যবে গেলা অকারণে… মাথায় ঝাঁপিয়ে পড়লো মেঘনাদ বধ। আপাতত মেঘের আড়ালে থেকেই মুদিদাদুর লঙ্গোটি ঝাপতে হবে। কোন দিকে তাকালে হবেনা। গরুর বাঁট না গয়লানীর, পয়োধীনির বাপকে তুমি ঢিলা করেছো মুদিদাদু, তোমার বাদুড়বাজি আজ আমারই একদিন কি বেড়ালের, সব বুঝে নোবো। প্যান্টফ্যান্ট ঝেড়ে লাঠি খোঁচাতে গিয়েই রক্তপাত। ডুগডুগির এমন কায়দা, লটকেছে এমন ভাবে, না ছিঁড়ে যেই ভাবলাম মালটাকে আগে জ্যান্ত উদ্ধার করি, পেছন থেকে পয়োধীনি ডাকলো না ! তাড়াহুড়ো তাকাতে গিয়েই ঘ্যাঁচ। না লাঠি না ঘুড়ি, ত্যারা এক কাঁটা ছিঁড়ে দিল গালের চামড়া। তো কেয়া! তাকিয়ে দেখি, গর্ত থেকে হিঁয়া ইঁদুরের ল্যাজ ধরে টানাটানি করছে সেই হুলো আর গলা চিড়ে যে আওয়াজ বেরোচ্ছে, সেই তো পয়োধীনির গলা। তবে কি বেড়াল ও পয়োধীনির মধ্যেও গোপন কোন চুক্তি হয়েছে আমাকে রুখে দেবার। মরিয়া এক ঝোপের ডাল টানাটানি করতেই, সারা শরীরে অজস্র রক্তের চিকণ ধারা। আমি যেন কাঁটার দুনিয়ায় মহামহেশ্বর। ছ্যাঃ, এভাবে কেঊ লড়াইয়ে নামে। কোথায় মলম করা চকচকে চুল, ইস্ত্রি ভাঁজ রঙ ঝলমলে চোগা চাপকান, গলায় ফুলতোলা নক্সীকাটা চাদরে ফুরফুরে গন্ধ, কব্জীজুড়ে ঢাউস ঘড়ি বাঁধা… তা নয়, ধুলোকাদা ছোপানো, রঙ চটা ঘুটঘুটে বাতিল আস্তিন আর ঢিলেঢালা পুরোনো প্যান্টেলুনে বিপ্লবে যাবে ক্যাওড়া রহস্যবাজ! হ্যাঃ! এখনও একটা লাঠি খুঁজেই বার করতে পারলো না। প্রায় ব্যর্থতায় যখন কেঁদে ফেলার উপক্রম হয়েছে, চোখ পড়লো বেয়াক্কেলে মদিরার দিকে। তখন থেকে আঙুল নেড়ে কাছে ডাকছে। আমি তো জানি ওর কাছে যাওয়া মানেই তেড়ে ঘাপাতে হবে, তারপর কেলিয়ে যেতে হবে ঘুম। মেয়েটা এখনও ২২ পেরোয়নি ইতিমধ্যেই অক্লান্ত যোদ্ধা। কোন্ বাপ যে এমন নাম রেখেছিলো, ও নিজেও জানে না। এযাবৎ সবাই জানে, মদিরা পথেরই ছানাছ্যানা কুমারী রঙিলা। কে কবে কোথায় ফেলে গেছিলো, কুকুরেরা নাকি ওকে মাই খাইয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তারপর মহান গণতান্ত্রিক তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেভাবে পথশিশু বাঁচে, সেভাবেই ডবকা আজ শরীর ভাড়া খাটিয়ে টু-পাইসে টিকে আছে এদিকে ওদিকে। কিন্তু মদিরা ভাবলে হবে না, নিজের মাথায় অনেক বড় বড় ভাবনা ঝুলে আছে। ভাঙ্গা দেশলাই, বোলতার হুল, বাদুড়ের প্যাটপেটে চোখ, পয়োধীনির ঢাকনাহীন উথলে ওঠা দুধ, বেড়াল, গয়লানীর হাতের কসরৎ, বাঁটের ফোয়াড়া এবং এ্যাঙ্গেল, এ্যাঙ্গেলের মুদিদাদু । এখন অভিযান মুদিদাদুর লঙ্গোটি হাপিস।
এবং অবশেষে তাই হলো, যা ভাবতে চেয়েই এক পশলা সামনে তাকিয়েছিলাম । আর তাকাতেই মাকু হয়ে গেলাম । মুদিদাদুর দোকান ঘিরে ফেলেছে হনুমান বাহিনী। কেলেঙ্কারী আমি আসছি সে খবর দাদুকে পাঠালো কে! তবে কি আমার সামনে যে দার্শনিক চোখে কাঁঠাল ভাবছিলো, সেটাই ছিলো খোচোর! কি করে হবে, তাকে তো গাছের তলাতেই দেখে এলাম! তবে জয় বজরঙ্গবালী তো, থট-রিডীং জানতেই পারে আর সেটা জেনে বায়ুযোগে হেড-কোয়ার্টারে পাঠিয়ে বাহিনীর ব্যবস্থা কোরে ফেলেছে। কিন্তু মুদিদাদু এতো লাফাচ্ছে কেনো। আসলে বাহিনি মানে সেটা হনুমান বাহিনী হলেও তাদের খাবার জোগানোর দায়িত্ব মুদিদাদুকেই সামলাতে হবে। আর এতেই দোকান ফাঁক হবার আর্তনাদে দাদুর কাছাকোছা খুলে গিয়েছে। কোনটা দিয়ে কাকে সামাল দেবে বুঝতে পারছে না। এতো দিন প্রাণ খুলে বেচে গিয়েছে আর যেই দেবার প্যাঁচে পড়েছে অমনি বুক ফাটছে চড়াৎ চড়াৎ। কেমন উন্মাদের মতো দাদু লাফিয়ে যাচ্ছে। আহা, সুযোগ একেই বলে। সামনে দিয়ে না গিয়ে ঘোরা পথে পেছনের বাগান দিয়ে ঢুকলে হনুমান বাহিনী টের পাবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ভাঙ্গা দেশলাই কোথা থেকে আসে, এবার টের পাবি। দাদুর বাড়ির পেছনেই টানা দড়ি টাঙিয়ে তিনটি লঙ্গোটি লাইন দিয়ে যেন অপেক্ষা করছে আমি আসব বলেই। মুদিদাদুও কি জানে আমার গুপ্ত ষড়যন্ত্রের কথা, নইলে এভাবে কেউ থরে থরে সাজিয়ে রাখে আমার লক্ষ্যবস্তুটিকে! কোথায় যেন একটা গোপন কানেকশন চলছে আমার অজ্ঞাতে। ভাবতে হবে। আপাতত লঙ্গোটি তিনটেই দলা কোরে নিয়ে বাগানের পথে যেই সুরুৎ হতে যাবো, সামনে বিরাট বড় এক সোনাব্যাঙ। শুনেছি আমার ঠাকুদ্দার বাবা আচমকা সোনাব্যাঙের লাথি খেয়েই দম আটকে অক্কা পেয়েছিলো। একই রকম এ্যাঙ্গেল নিয়ে কি এ ব্যাটাও আমায় টার্গেট করেছে! করুক, আপাতত ভয় নেই কারণ আমার মুঠোর মধ্যে এ্যাঙ্গেলবাজ মুদিদাদুর লঙ্গোটি। জাস্ট মুঠো খুলে ব্যাঙবাবাজীর সামনে একবার নেড়ে দিতেই ধাঁ। সেই সোনাব্যাঙও নেই, আমার মৃত্যুভয়ও কুপোকাৎ। মুদিদাদুর লঙ্গোটির জোর দেখেছো, একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজ। তবে কি এই লঙ্গোটির জোরেই মুদিদাদুর এত বেচাকেনা, দোকান-পসার, ধম্মতলার টাটবাজি, গাঁজার আড়ৎদারি, তারপর ইয়েটিয়ে ইত্যাদি। বাগান পেরোবার শেষ শ্যাওড়া গাছে চোখ পড়তেই মাথা ঘুরে পড়ি আর কি! দুমুঠোয় শক্ত কোরে লঙ্গোটি চেপে ধরতেই শক্তি ফিরে এলো। গাছে ঝুলছে থোকাথোকা বাদুড় । সূত্র মিলে যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম আমার টিনের চালে বাদুড় ঝোলাবার কারিগরটি আসলে কে ! একেই বলে তদন্তের ক্লু হাতে পাওয়া। আবার সেই শ্যামাসঙ্গীত আসছে । না, চেপে রাখতে হবে । বেগম শবনমকে আজ ফাকাতে হবে । ওর ঘরেই গিয়েই জিম্মা কোরে আসবো এসব মাল । ওর ফাটা বাক্সে এমন বহু মাল মজুত আছে । কোথা থেকে এসেছে জানতে চাইতেই ফিক হাসি দিয়ে বলেছিলো– তোরটাও আজ রেখে দেব । ঘন্টা দুলিয়ে বাড়ি যাবি তুই । এবং সত্যি সেটাই করেছিলো । আসলে বেগম সব কিছুর একটা রেকর্ড রাখতে চায় । তবে চুরি করা মাল রাখতে চাইবে কি ! দরকার নেই, চুপিচুপি আমি গিয়ে আগেই ঢুকিয়ে দোবো স্যাট কোরে । জানতেই পারবে না । পুকুর ঘেঁষে হনহন হাঁটতে থাকি চরম টেনশনে । চুরি বলে কথা । একবার বামাল সমেত ধরা পড়লে, পাছার চামড়া তুলে নেবে গরম ছ্যাঁকা দিয়ে । চুরি চুরিই । লঙ্গোটি বলে কি ছার দেবে নাকি ! গরম ছ্যাঁকের কথা মনে হতেই, মনে পড়লো ভাঙ্গা দেশলাই । বোলতার কামড়ে ঘাড়টা কঁদু হয়ে আছে । প্যান্টের ভেতর থেকে কেমন কড়কড় কোরে যেন মেঘ ডেকেই চলেছে । সবই মুদিদাদুর লঙ্গোটির ম্যাজিক । হাঁটতে থাকি জোরে । কড়কড় মেঘ বাজ হয়ে ফাটতে থাকলে প্যান্ট নষ্ট হবে । তার আগেই বেগম শবনমে পৌঁছোতে হবে !
এবং এই জোরে পা চালাতে গিয়েই ফেঁসে গেলাম । পুকুর পাড়ে হাতে পাঁচন উসকো-খুসকো ল্যাংড়া কাত্তিক বসে । একভাবে জল দেখছে । আশঙ্কা হলো, তবে কি পয়োধীনি জলে তলিয়ে গেছে ! কাছে যেতেই আমার দিকে পাঁচন মানে গরু পেটানোর লাঠি তুলে দিয়ে বললো– এটা আপনি রাখেন । আমার ব্রহ্মতালু তার কথা শুনেই বোঁ হয়ে গেলো । কানেকশন । আমি যে লাঠি খুঁজছিলাম, এ কাত্তিককে কে বললো ! সব শালা ছুপে ছুপে কানেকশন । দে শালা, বাদুড় তাড়াবো । পাঁচনটা ছোঁ মেরে হাতে তুলে নিতেই কাত্তিক ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলো ডুকড়ে । তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে চললো– আমার সব শেষ করে দিলো ওই মুদিব্যাটা । সেদিন দোকানে সেজেগজে একঝাঁক লোক পুলিশ-পেয়াদা নিয়ে এসে বললো কাগজপ্ত্র দেখি, হিসাবনিকাশ । আমার আর কি কাগজ, অল্প পয়সায় মাল কিনে কদিন ঘরে রাখি, বাজার বাড়লে বেচে দিই, তাতে কিছু পয়সা হয় । কোন কথা শুনলো না, লরিতে তুলে সব মাল নিয়ে গেল । ঘরবাড়ি ন্যাড়ান্যাকড়া কোরে যেখানে যে টাকাপয়সা গোছানো ছিল, সোনাদানা সব নিয়ে ঘরবাড়ি-দোকানপাটে তালা দিয়ে নতুন বউ নিয়ে আমাকে রাস্তায় বার কোরে দিলো । ওরা চলে যেতেই অই মুদিব্যাটা বউয়ের বাপকে নিয়ে এসে হাজির । একপেট মাল খাওয়া মেয়ের বাপ মেয়ের দুঃখে হামলে পড়লো । হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে মুদিব্যাটার সাথে চলে গেলো । কাতর হয়ে বললাম বঊটার পেটে কেবল বাচ্চা এসেছে, ওকে নিয়ে যেও না । মুদিব্যাটা আমার মাথায় এক চাঁটি দিয়ে বললো– আরে ব্যাটা খাওয়াবি কি ! তোকে তো বাঁচিয়ে দিলাম রে ! ও মেয়ের আবার বিয়ে দিয়ে দেবো ।… ওই হারামখোরটা আমার কাছ থেকেও বিয়ে করানোর জন্যে মোটা টাকা নিয়েছিলো, আবার কাকে ভজিয়েছে, তার কাছ থেকেও আবার টাকা খাবে । আমি ল্যাংড়া না হোলে লাথি মেরে ওর মাজা ভেঙ্গে দিতাম । পরশু দিন শুনলাম ধম্মতলায় নিয়ে গিয়ে কোন্ এক দূর শহরের সোনার চেনপরা বাবুর সাথে নাকি বঊটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে, বিয়ে করে বউটাকে নিয়ে তারা চলেও গেছে এ এলাকা ছেড়ে । আর বউয়ের বাপ মুদিব্যাটার পয়সায় সারারাত চোলাই খেয়ে হেগেমুতে সেখানেই পড়ে ছিলো । সকালে নাকি সবাই দেখেছে কুত্তা এসে মেয়ের বাপের মুখ চেটে বমি খাচ্ছে ।
ব্যাস্, আমার লাঠি পাওয়া গেছে, খেল এবার আমার । মাটির দু-একটা ঢ্যালা তুলে লঙ্গোটিতে জড়িয়ে ছুঁড়ে দিলাম পুকুরে । ভুস্ কোরে ডুবে গেলো । দাদুর বাগান পেরিয়ে যত জোরে পা চালিয়ে এদিকে এসেছিলাম, তার দ্বিগুন গতিতে আবার সেই মুদির বাগানের দিকে চললাম । উদ্দেশ্য বিধেয় একটাই । বাগানের কাছাকাছি আসতেই আবারও মাটির ঢ্যালা তুলে টার্গেট শ্যাওড়া গাছের ঝোলা বাদুড় । একের পর এক ঢ্যালা খেয়ে কিছু বাদুড় মুখ থুবড়ে পড়লো মাটিতে, কিছু কিছু উড়ে দাদুর দোকানে ঢুকে পড়লো । খেল্ শুরু । বাইরে থেকেই মুদিদাদুর হাউমাউ কানে আসছিলো । বাদুড় তাড়াচ্ছে আর একনাগাড়ে খিস্তিখেউড় করছে । পাঁচনটা কষে বাগিয়ে ধরে চুপিচুপি ঢুকে গেলাম দাদুর ঘরে । কাপড়চোপড় খুলে গেছে, উদভ্রান্তের মতো দাদু বাদুড়দের পেছনে লাফাচ্ছে । আমাকে দেখেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো । কোন সুযোগ না দিয়েই আমিও মুদিদাদুর কপাল টিপ কোরে ঠাটিয়ে মারলাম কষিয়ে পাঁচনের বারি । ফটাস্ করে ফেটে গেল মুদিদাদুর খুলির সামনেটা । ঝাঁপিয়ে রক্ত নামছে নীচে । দাদু নিজের রক্ত ওভাবে বইতে দেখে কেমন চোখ আটকে ঠকাস্ কোরে পড়ে গেলো মেঝেতে । আমিও আর কোনদিকে না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই চোখে পড়লো ঘরেরর কোণায় থরে থরে গুছিয়ে রাখা ফাঁকা দেশলাইয়ের খোল । খপ্ কোরে আমিও তুলে নিলাম ফাঁকা এক বাক্স । সেকি, এতো ভারি কেন ? তুলেই দেখি ফাঁকা বাক্সে গাঁজা ঠুসে রাখা । আর দেরী না কোরে, ঘর থেকে বেরিয়ে মনে মনে ঠিকই করে নিলাম আজ বেগম শবনমের ঘরে বসেই এই দেশলাই বাক্স ফাঁকা কোরে আসর জমাবো, তারপর ভাঙ্গা বাক্স ছড়িয়ে দেব বেগমের বাক্স প্যাঁটরায়…

Facebook Comments

Leave a Reply