যে রাক্ষসেরা থাকে, অপ্রকাশ্যে অচেনায় : প্রবুদ্ধ ঘোষ

fail

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আমরা সবসময় ভাল-র কথা বলি কেন? সেকি আমাদের বৃত্তে থাকা বাকিদের সঙ্গে পরিধি অটুট রাখতে? সযত্ন আয়না যাতে ভেঙে চুরমার না হয়, সেই ভয়ে আমরা নঞর্থক মুহূর্তগুলোকে ভাল-ভাল কথার মঙ্গলঘটে ‘শুভ’ বোধের কাঁঠলিকলা চাপা দিয়ে রাখি? জানেন ধর্মাবতার, ১৯৪৬-৪৭ দাঙ্গামুহূর্তের যতগুলো ন্যারেটিভ আর সাক্ষাৎকার জেনেছি, তাতে হিংসা-ভয়-ক্রোধ-বিষণ্ণতা সবই আছে। কিন্তু দেখেছি এই প্রজন্মের বা এক প্রজন্ম আগের প্রায় সকলেই বলেছে, “আমার দাদু ৩ জন মুসলমানকে আশ্রয় দিয়েছিল”, “আমার ঠাকুমা ১টা হিন্দু পরিবারকে লুকিয়ে রেখেছিল ৭ দিন”, “আমাদের বাড়িতে দাঙ্গার সময় বিপন্নদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল”। এই আখ্যানগুলো ভাল, এগুলো প্রয়োজন। কিন্তু ধর্মাবতার, কখনও কি প্রশ্ন জাগে না, যে, আমাদের চেনাজানা সব পরিবারই যদি এত ভাল হয়, তা’লে খারাপ কারা? আমরা বা আমাদের পরিচিতরা যদি উপমহাদেশের সবচেয়ে বিপন্ন সময়ে দাঙ্গাবিরোধী ভূমিকা নিয়ে থাকি, আশ্রয় দিয়ে থাকি, তা’লে দাঙ্গাটা কারা করেছিল? তা’লে কারা এত মানুষ মেরেছিল বা খুন করেছিল? অথচ, আমাদেরই পূর্বপুরুষদের হাতে লেগে আছে ক্রোধ, চেতনায় এখনও চাপ চাপ রক্ত। আমাদেরই কারোর পূর্বপুরুষ ওপার থেকে এপারে বাধ্যতঃ এসেছিল। কেউ এপার থেকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কোনওরকমে ওপারে। সেইসব কি উবে যায়? কোথায় যায় তারা? যত সাক্ষাৎকার আর বয়ান, সবেতেই স্মৃতিকাতরতা অথবা স্মৃতিকামুকতা। “সবই ভাল ছিল আগে। হঠাৎ কেমন অবিশ্বাসের মেঘ”- কিন্তু, কোনও মেঘই কি হঠাৎ জমে? তারও তো প্রস্তুতি থাকে। ওই যে দাঙ্গা, ওই যে রক্তোল্লাস, ওই যে মার-মার-মার, ওই যে অবিশ্বাস- এসবেরও তো প্রস্তুতি ছিলই। শতক-দশকব্যাপী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দু’টি সম্প্রদায়ের ধর্মভিত্তিক সামাজিক অবস্থান ক্রমশঃ ফাটলে ফাটলে বেড়ে গেছে। সাহিত্য দিয়ে, গান দিয়ে সেই ফাটলগুলিকে ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু, ফাটলগুলো তো মিলিয়ে যায় না। বৃত্ত আর পরিধি মসৃণ রাখার খেলায়, কেন্দ্র থেকে অন্যদের থেকে সমদূরত্ব-সমনৈকট্য বজায় রাখা খেলতে খেলতে আমরাও শুধু ভাল বয়ানগুলোই উচ্চারণ করি, বিশ্বাস করাই। তারপর কোনও বিপন্ন মুহূর্তে আমরাই রক্তপানে অধীর হই। কামারপাড়া, কলুপাড়া, মাঝিপাড়া, পালপাড়া জাত-ধর্মের বিভেদ আর ঝামেলা-গলাগলির সহাবস্থানে একে অপরের পাশে থাকত, তারাও ছুটে যায় ‘বন্দে মাতরম’ আর ‘নারায়ে তকবির’ হাঁক ছেড়ে। আফসার মাঝির পেটে ছুরি ঢুকিয়ে ‘এল্‌’ আঁকতে কেষ্ট পালের বাধে না, দশরথ কামারের ঘরে আগুন দিয়ে ব্যাঙ্গের হাসি হাসে গফুর কলু। সতীশ মুক্তার, পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তীর হিন্দুত্ববয়ানের পাল্টা তৈরি হয়ে যায় আব্দুল কাদের, সাদেক উকিলের ইসলামবয়ানে। মজনু শাহ্‌ ও ভবানী পাঠকের সঙ্ঘবদ্ধ শাসকবিরোধিতা এবং দেশভাগের অবিশ্রান্ত রক্তস্রোতের ইতিহাস তো জানাই; কিন্তু, সে ইতিহাসকে ধারণ করে, সে ইতিহাসের ফাঁকফোকরে জীবনযাপন করে কারা? আমরাই না? আমাদের প্রতিবেশীরাই না? দাঙ্গাটা যারা করেছিল, যারা করেছে, তাদের গল্পগুলো কেমন? তাদেরও তো পরিবার স্বজন সন্তান রয়েছে। তারা কি আমারই প্রতিবেশী নয়? তাদের সন্তান আমার সাথে কোচিং-এ পড়তে যায় না? যে গতকাল প্রবল ঘৃণায় পরধর্মমতের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংগঠিত করতে উৎসাহ দিয়েছে, সে আমারই সহকর্মী। আর, কোনও অবসর অ্যালবামের কথায় আমরাই জেনে ফেলি যে, আমাদের পূর্বপুরুষ ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিল সমস্বরে। আমারই কোনও স্বজন আতঙ্কিত মুহূর্তে সংগঠিত করেছিল আরও কয়েকজন সম্ভাব্য হন্তারককে। আমিই কোনও ফেক প্রোফাইল থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছি কোনও সাধ্বী বা ‘বাবা’র খুনেবচন। ভুয়ো ভিডিও দেখে আতঙ্কিত হয়ে স্বধর্মরাষ্ট্র বানাতে সায় দিচ্ছি। “ওদের বিরুদ্ধে অন্যায় হয়েছে, কিন্তু…” বা “সরকার এটা ভাল করেনি, তবু…” এই প্রত্যেকটা কিন্তু আর তবু উচ্চারণে ভবিষ্যৎ দাঙ্গাকারীর রক্তবীজ লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের রাক্ষস মরে নি কোনওদিন। কিছু শান্তি শান্তি ফুল-বেলপাতা দিয়ে পুজো করে গেছি শুধু, ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’ লিখে দশে আট পেয়েছি। বন্ধু বেড়েছে, খ্যাতি বেড়েছে, বৃত্ত বড় হয়েছে, সভ্যতার শর্তগুলো অনুশীলিত হয়েছে। কিন্তু, কোনও এক সংকটে অস্ত্রে শান দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিপন্নতায় বর্মহীন যুদ্ধসাজে রৈ রৈ রবে তেড়ে গেছি সাজানো বিপক্ষের দিকে। সকালে পাড়ার কুকুরদের বিস্কুট খাইয়ে বিকেলে কোনও শিক্ষকের ঘরভাড়া নেওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে হৃষিকেশ, কারণ আবেদনকারী ‘মুসলমান’। আমপানের পরে ত্রাণ বিলি ক’রে বাড়ি ফিরে ‘আজাদ কাশ্মীর = সন্ত্রাসবাদ’ বয়ানে গল্প লিখে ফেলেছে পতিতপাবন, কারণ তার কাছে কাশ্মীর মানে শুধুই শালঅলা, ডাল লেক আর আপেলগাল। রাক্ষুসে সম্ভাবনা অনির্বাণ। ধর্মাবতার, আপনার পূর্বপুরুষ কী করেছিল ১৯৪৬ সালে? ১৯৬৪ সালে? ১৯৯২ সালে? রামমন্দির জবরদস্তি-প্রতিষ্ঠার রাতে? তারাও কি রাক্ষস সাজেনি? শব্দহীন পাপ করেনি? নাকি পবিত্র পাপীর মতো কবিতা লিখে নিরপেক্ষ সেজেছিল? ধর্মাবতার, রাক্ষসধর্মকে কতদিন আড়াল করবেন, যখন আমাদের ভার্চুয়াল যাপনও দাউদাউ জ্বলে উঠেছে?

#
রাক্ষসাকাঙ্খা ফিরে ফিরে আসে, জন্মায়। ঘোলাটে সময়ে একবগ্‌গা খুনের ইচ্ছেয়। চেপে রাখা খুনের ইচ্ছেয়, পাল্টা বেধড়ক মারের খোয়াবে অন্য কেউ জেগে ওঠে। যার কাছে হেরে গেছি জেতার কাছে পৌঁছেও, যার অযোগ্য অভিব্যক্তির অপমান সয়ে নিয়েছি, যার ক্ষমতার কাছে ঢোঁক গিলে হ্যাঁ বলেছি, তাদের পেড়ে ফেলার দুর্দম ইচ্ছে। শ্যাডো প্র্যাকটিস। আয়নার সামনে তারাই রেগে উঠে ফুঁসে উঠে বদলা নিয়ে নিয়েছে। বাস্তবে সেই তেল-পরিপাটি পেতে আঁচড়ানো চুল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যাডাম’ বলে নিজেকে বাঁচানো, ‘না, না স্যার, ঠিকই’ বলে অবান্তর সায় দিয়ে যাওয়া আর আমি তো ‘মধ্যবিত্ত নিছক ছাপোষা ব’লে’ না-পারার যুক্তি খুঁজে নেওয়া। কিন্তু আয়নার সামনে এরাই কেমন ভয়ংকর- পাতালপুরী থেকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দিচ্ছে, অভিনয় ক’রে সাহস মজুত করছে অলীক গুদামে। কিন্তু, থেকে যাচ্ছে তো কোথাও! পাড়ায় সিন্ডিকেট চালানো ঘেঁটু মস্তানের দাঁতের পাটি নড়িয়ে দেওয়া চড়ের কল্পনা কি কম করেছে সেন্টু? ঘেঁটু মস্তানের প্রিয় খাবার মন্ত্রীর শুকতলা জেনে অসহায় খোয়াবে তার মুখে নুড়ো জ্বেলে নরকে পাঠানোর টিকিট কি কেটে ফেলেনি সে? বিপন্ন তমিজের খোয়াবে রাক্ষুসে ইচ্ছেরা শরাফত মণ্ডলের গলায় বাবলার ডাল দিয়ে মেরেছিল। নিপাট গোবেচারা, ছাপোষা অথবা মানিয়ে নেওয়া সমস্ত বাধ্যতামূলক অভিব্যক্তির ভেতরে কি ভয়ঙ্কর ইচ্ছেগুলো ঘাপটি মেরে থাকে? সহ্যের ইলাস্টিক ছিঁড়ে গেলে ধাতব অস্ত্রের মতো শানিয়ে উঠতে পারে কেউ। যা কিছু ‘ভাল’ বলে বিশ্বাস করাতে চেয়েছে গুরুজন স্কুল আত্মীয় স্বজনরা, সেই সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করা যায়। সব নীতিবোধ আর শুভবোধের বৃত্তে জোরজার ঠেলে দেওয়াকে হাহা ঠাট্টায় উড়িয়ে দেওয়া যায়। যে শ্রমিক ‘পরিযায়ী’র অপমান মাথায় নিয়ে বাধ্যত উড়ে এসেছিল ধুঁকতে ধুঁকতে, সমস্ত পালক খুইয়ে, যদি সেও ক্ষেপে যায়? লকডাউনে বাধ্যতঃ দোকান বন্ধ ক’রে চার টাকার মাস্ক বিক্রি করতে করতে যার সমস্ত আলো নিভে যাচ্ছে, সে যদি হঠাৎ কোনও অলৌকিক ভোরে ধ্বংসের ইচ্ছেয় জ্বলে ওঠে? ঘরবাড়ি ছারখার ক’রে যাদের তুলে নিয়ে গেল সিআরপিএফ, ভুয়ো এনকাউন্টারে মেরে দিল, তাদেরই স্বজন যদি পাল্টাপ্রশ্নের ভেতরে আইইডি লুকিয়ে রাখে? না-পারার অসহায় অজুহাত সরিয়ে সরিয়ে কোনও এক আয়নায় যদি জেগে ওঠে অশান্ত কোনও মুখ? রাষ্ট্র এদের রাক্ষস বলে। রাষ্ট্রর তৈরি ক’রে দেওয়া সুর-দেব-ঋষিকল্পের ক্যালেন্ডারে এদের থাকতে নেই। অথচ ধর্মাবতার, এই পাল্টাবয়ানগুলো, না-হওয়া দৃশ্যগুলো তো থেকে যাচ্ছে। হয়তো ঘুমোচ্ছে, পাশ ফিরে শুচ্ছে, দপদপে মাথায় টাইগার বাম্‌ লাগাচ্ছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সেঁটে থাকছে। অপ্রকাশ্যে, স্বাভাবিক সহজ গয়ংগচ্ছের আড়ালে। ধর্মাবতার, যদি ‘প্রতিবাদে প্রতিরোধে প্রতিশোধে কমরেড’ স্লোগানের দ্বিতীয় আর তৃতীয় শব্দ সত্যি হয়ে যায়? যদি ওই তৃতীয় শব্দটা, প্রতিশোধ শব্দটা শুধু ছন্দ মেলানোর শব্দ না থেকে সত্যি হয়ে ওঠে? খুব কি কেলেঙ্কারি হবে? যদি মধুসূদন দত্তের মতো রাক্ষসকে নায়ক ক’রে তোলার প্রস্তাব রাখা যায়? মহাকাব্য আর ইতিহাসের ফুটনোট থেকে বিজয়ীদের চাপানো ভাল-শুভ-নীতি-মূল্যবোধের বস্তা ছিঁড়েখুঁড়ে খুব সাধারণ কুশীলবেরা প্রতিস্পর্ধী উদ্‌যাপনে মেতে ওঠে। খুশি থাকুন ধর্মাবতার, টালমাটাল করেও স্থিতাবস্থাকে যতক্ষণ টেঁকাতে পারেন। টিঁকে থাকো হে রাষ্ট্র, যতদিন না সম্মিলিত রাক্ষসজন্ম গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে; ফিনিক্সের মতো।

[লেখক – গবেষক, তুলনামূলক সাহিত্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়]

Facebook Comments

Leave a Reply