বিটকয়েন : সহস্রলোচন শর্মা

বিটকয়েন : পর্ব ১

বেশ কিছুদিন হলো, কিছু ধোঁয়াশা নিয়েই, বিটকয়েন নামটার সাথে পরিচয় ঘটেছে আমাদের। কিন্তু ওই নামটুকুই শুধু পৌঁছেছে আমাদের কানে, বিটকয়েন নিয়ে কাম কিছুই করা হয়ে উঠে নি এখনও। দৈনন্দিন জীবনে বিটকয়েন ব্যবহার করে লেনদেন বা কেনাকাটায় আমাদের অনীহা বা অনভ্যাস গড়ে উঠার পিছনে বড় ভূমিকা রেখেছে- নিষিদ্ধতার বেড়াজাল। দীর্ঘদিন ধরে বিটকয়েন বিনিময় নিষিদ্ধ ছিল ভারতে। তবে ঠিক এই মুহূর্তে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। নিষিদ্ধতার বেড়াজালে বিটকয়েনকে আটকে রাখা আর সম্ভব হয় নি। গত ৪ঠা মার্চ ২০২০, এক রায়ে বিটকয়েন তথা সমস্ত রকমের ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময়কে বৈধ বলেই ঘোষণা করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ফলে এখন ভারতে বসে বিটকয়েন দিয়ে বেচাকেনা করতে কোনও অসুবিধা নেই আর। তবে দীর্ঘ নিষিদ্ধতার কারণে বিটকয়েন সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠে নি আমাদের মনে। বিটকয়েন সম্পর্কে কিছু সাধারণ তথ্য বিধৃত করে সেই অস্পষ্টতা দূর করতেই এই নিবন্ধের সূত্রপাত।

বিটকয়েন নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’ শব্দটার সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন আমাদের। কারেন্সি হলো বিনিময়ের মাধ্যম তথা নোট বা মুদ্রা। ডলার, পাউন্ড, টাকা, রুবল ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের কারেন্সি চালু আছে বিভিন্ন দেশে। বিটকয়েন হলো তেমনই এক মুদ্রা। তবে এটা সাধারণ কারেন্সি নয়, এটা ক্রিপ্টোকারেন্সি। ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে সাঙ্কেতিক মুদ্রা, একটা আলফানিউমারিক (Alphanumeric) লিপি। এই সংকেতটাকে ক্রিপ্টো দুনিয়ায় ‘হ্যাশ’ (Hash) বলা হয়ে থাকে। সেই হ্যাশ বা সংকেতটাই হলো মুদ্রা। কাগজের উপর বিশেষ ছবি আর লেখাকে যেমন কারেন্সি বলে থাকি আমরা, ঠিক তেমনই ছবি আর লেখার পরিবর্তে, সেই সংকেতটাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বলে গণ্য করা হয়। সেই বিশেষ সংকেতটা যাঁর কাছে থাকবে সেই এই মুদ্রার মালিক। বাস্তব দুনিয়ার নোটের মতো, এই মুদ্রাকে কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। কোনও টাকশালে মুদ্রিত হয় না এই মুদ্রা। ক্রিপ্টোকারেন্সির সবটাই ভার্চুয়াল অর্থাৎ ইদুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

কারেন্সি মানে যেমন শুধু ডলার বোঝায় না, ক্রিপ্টোকারেন্সি মানে তেমনই শুধু বিটকয়েন বোঝায় না। কারেন্সির মতোই বহু ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি পাওয়া যায় বাজারে। বিটকয়েন ছাড়াও নেমকয়েন (১৮ এপ্রিল ২০১১ থেকে চালু হয়), লাইটকয়েন (৭ অক্টোবর ২০১১), বাইটকয়েন (৪ জুলাই ২০১২), ফেদারকয়েন (১৬ এপ্রিল ২০১৩), রিপল (২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩), ইথিরিয়ম (৩০ জুলাই ২০১৫), জিক্যাশ (২৮ অক্টোবর ২০১৬) ইত্যাদি ইত্যাদি প্রায় দু’হাজারেরও বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু আছে বাজারে। অনলাইনে বেচাকেনার জন্য যে কোনও ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ভারতে যেমন ডলার বা পাউন্ড দিয়ে কিছু কেনা যায় না, তেমনই সব অনলাইন সাইট সব ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণ করে না। তুলনামূলক ভাবে বিটকয়েন প্রায় সর্বত্র ব্যবহার করা যায়।

বিটকয়েনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্টি মালমি। ২০১৮ সালে তোলা ছবি।

বিটকয়েনের যাত্রা শুরু হয় নতুন শতকের শুরুতে। ১৮ই অগস্ট ২০০৮, বিটকয়েন.অর্গ নামে একটা সাইট খোলা হয় ইন্টারনেটে। বিটকয়েন দিয়ে বেচাকেনার জন্য এই সাইটটা প্রতিষ্ঠা করেন জনৈক কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ তথা ক্রিপ্টোলজিস্ট সাতোশি নাকামোতো (Satoshi Nakamoto) ও তাঁর বন্ধু ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি শহরের সফটওয়্যার ডেভলপার মার্টি মালমি (Martti Malmi)। ৩১শে অক্টোবর ২০০৮, বিটকয়েন বিনিময়ের কথা প্রথম ঘোষণা করেন সাতোশি নাকামোতো। ইউএসএ সময় সূচীতে (EDA) তখন দুপুর ২.১০ [ভারতীয় সময় (IST) রাত ১১.৪০], ইন্টারনেটে তাঁর অধুনা বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Bitcoin: A Peer-to-Peer Electronic Cash System’ প্রকাশ করেন তিনি। Peer কথাটার আক্ষরিক অর্থ সমগোত্রীয় লোক। Peer-to-Peer বলতে এখানে এমন দুই ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যাঁরা নিজের মধ্যে ইলেকট্রনিক ক্যাশ (ক্রিপ্টোকারেন্সি) বিনিময় করতে পারবেন। ওই প্রবন্ধের শুরুতেই নাকামোতো লেখেন, ’A purely peer-to-peer version of electronic cash would allow online payments to be sent directly from one party to another without going through a financial institution.’ এই প্রথম দু’লাইনের মধ্যেই তাঁর প্রবন্ধের মূল বক্তব্য তুলে ধরেছেন নাকামোতো। তিনি বলতে চাইলেন, ব্যাঙ্কের (financial institution) মধ্যস্থতা ছাড়াই দুই ব্যক্তি সরাসরি নিজেদের মধ্যে ইলেকট্রনিক ক্যাশ (বিটকয়েন) বিনিময় করতে পারেন। সেইদিন অবশ্য এই বিখ্যাত প্রবন্ধটা অনেকেরই নজরে পড়ে নি। ৩রা নভেম্বর সেই প্রবন্ধটা তাই রিপোস্ট করেন নাকামোতো। তাতেও যে বড় একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল তেমনটা নয়। নাকামোতোর প্রবন্ধ প্রকাশের কিছুদিন পর মার্টি মালমি তাঁর নিজের অংশ বেচে দেন অজানা কিছু ব্যক্তিকে। ফলে বিটকয়েনের আদি মালিক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেন সাতোশি নাকামোতো।

নাকামোতোর সেই বিখ্যাত প্রবন্ধের প্রথমাংশ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই সাতোশি নাকামোতো? বিটকয়েনের সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মার্টি মালমির পরিচয় জানা থাকলেও সাতোশি নাকামোতোর পরিচয় কিন্তু অজানাই থেকে গেছে। অজানা থেকে গেছে তাঁর ঠিকানাও। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করেন, সাতোশি নাকামোতো আসলে একটা ছদ্মনাম। ছদ্মনামটা শুনে মনে করা হয় তিনি জাপানি। কারণ, আপনি, আমি বা কোনও ভারতীয় যখন ছদ্মনাম গ্রহণ করেন তখন সেই ছদ্মনামের মধ্যে একটা ভারতীয় ছাপ অবশ্যই রয়ে যাবে। সেই হিসেবেই সাতোশি নাকামোতোকে জাপানের নাগরিক বলেই মনে করা হয়। তবে এই সহজ সরল যুক্তি প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে যতটা প্রযোজ্য ইদুনিয়ার ক্ষেত্রে ততটা প্রযোজ্য নয়। আমি যদি ভারতীয় হই আর ইদুনিয়ায় ছদ্মনাম ব্যবহার করতে চাই তাহলে ভারতীয় নাম কেন গ্রহণ করবো আমি? তাহলে তো এটা সবাই বুঝে যাবেন যে আমি ভারতের নাগরিক। ঠিক এই যুক্তিতেই জনগণকে বোকা বানানোর জন্য কোনও চতুর ব্যক্তি সাতোশি নাকামোতো নাম গ্রহণ করেছেন, যাতে সবাই মনে করেন যে তিনি জাপানের বাসিন্দা। তবে নাকামোতোর মতো ধুরন্ধর মানুষও তো নেহাৎ কম নেই দুনিয়ায়। কিছু কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ নাকামোতোকে নিয়ে অনবরত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দিনের কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি পোস্ট করেন নাকামোতো তার কালানুক্রমিক হিসাব বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলছেন, জাপান নয় ইংলন্ডের সময় সূচীর সাথে অধিক মিল রয়েছে তাঁর পোস্টের। তাছাড়া নাকামোতো যে সমস্ত ইংরাজি শব্দ চয়ন করে থাকেন তার সাথে ইংলন্ড ও ইউএসএর মিল বেশি। সেই হিসেবে অনেকেই মনে করেন নাকামোতো ইংলন্ডের বাসিন্দা। সবাই অবশ্য এই ধারণার সাথে সহমত নন। কেউ কেউ মনে করেন সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্টি মালমি নিজেই আসলে নাকামোতো। মার্টি মালমি ছাড়াও বিভিন্ন দেশের অন্তত জনা দশেক ব্যক্তিকে সম্ভাব্য নাকামোতো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই আবার মনে করেন, নাকামোতো আদৌ কোনও ব্যক্তির নাম নয়, ছোটো এক দল কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ তাঁরা। কেউ আবার বলেন Satoshi Nakamoto নামটা এসেছে Samsung, Toshiba, Nakayama, Motorola নামের আদ্যাক্ষরগুলো জুড়ে। স্পষ্টতই, সাতোশি নাকামোতোর পরিচয় নিয়ে নানা মুনি নানা মত দিয়েছেন। মোটের উপর নাকামোতোর পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েই গেছে এখনও পর্যন্ত।

হ্যাল ফিনে

এহেন নাকামোতোর হাত ধরে শুরু হলো পৃথিবীর প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি তথা বিটকয়েনের যাত্রা। ৩রা জানুয়ারি ২০০৯, ইউএসএ সময় সূচীতে তখন সন্ধ্যা ৬.১৫, ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়া চালু হলো প্রথম ব্লক (পর্ব ২ দেখুন) ‘জেনেসিস’ (Genesis)। জেনেসিস কথাটার অর্থ হলো ‘প্রথম’ বা ‘সূচনা’। ১২ই জানুয়ারি ২০০৯, ইউএসএর ক্যালিফর্নিয়া প্রদেশের টেম্পেল সিটির কম্পিউটার গেম ডেভলপার হ্যাল ফিনে (Hal Finney, পুরো নাম Harold Thomas Finney II) কে ১০ বিটকয়েন পাঠান নাকামোতো। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে বিটকয়েন বিনিময়ের প্রথম ঘটনা। এটা ছিলো ১৭০তম ব্লক। ১২ই অক্টোবর ২০০৯, তাঁর সংগ্রহে থাকা ৫,০৫০টা বিটকয়েন ৫.০২ ডলারের বিনিময় বিক্রি করে দেন মার্টি মালমি। ভারতীয় টাকার অঙ্কে, ওইদিন ১ ডলারের দাম ছিল ৪৬.৩৬ টাকা। সেই হিসেবে ৫,০৫০টা বিটকয়েন বেচে মার্টি মালমি পেয়েছিলেন মাত্র ২৩২.৭২ টাকা। এটা ছিল বিটকয়েন বিনিময়ের দ্বিতীয় ঘটনা।

লাজলো হেনিয়েক্‌জ

বিটকয়েন দিয়ে প্রথম পণ্য বেচাকেনা শুরু হয় আরও ৭ মাস পর, ১৮শে মে ২০১০ সালে। ইউএসএর ফ্লোরিডা প্রদেশের জ্যাকসনভিল শহরের বাসিন্দা কম্পিউটার প্রোগ্রামার লাজলো হেনিয়েক্‌জ (Laszlo Hanyecz) ওই দিন সকাল ১২টা ৩৫ মিনিটে বিটকয়েন ফোরামে লেখেন ”I’ll pay 10,000 bitcoins for a couple of pizza … like maybe 2 large ones so that I have some left over for next day. … but what I’m aiming for is getting food delivered in exchange for bitcoins …”। লাজলোর পোস্ট থেকে এটা স্পষ্ট, পিৎজা কেনাটা তাঁর উদ্দেশ্য নয়, বিটকয়েন বিনিময় করে পণ্য কেনাটাই তাঁর আসল লক্ষ্য। বিটকয়েন দিয়ে পণ্য কেনার তাঁর এই উদ্যোগ, পৃথিবীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তবে লাজলোর সেই উদ্যোগে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হলো। কারণ, কোনও পিৎজা দোকানই বিটকয়েন দিয়ে পিৎজা বেচাকেনার পাঠ শুরু করে নি তখনও পর্যন্ত। ফলে বিটকয়েন বিনিময় করে পিৎজা কেনার উদ্যোগ বিশ বাঁও জলে পড়ে যায়। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে বিটকয়েন ফোরামের জনৈক সদস্য জিগেস করেন ”In which country do you live?” জবাবে লাজলো লেখেন “Jacksonville, Florida, zip code 32224, United States” পিৎজা কেনা নিয়ে ওই ফোরামে এরপরও আরও দু’চারটে পোস্ট হয়, কিন্তু কিভাবে তা কেনা সম্ভব তার কোনও সুরাহা হলো না তখনও পর্যন্ত। ১৯, ২০ আরও দুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল, পিৎজা কেনা নিয়ে কোনও সদর্থক উদ্যোগ চোখে পড়ল না। ২১শে মে সন্ধ্যা ৭টা ৬মিনিটে হতাশ হয়েই ফোরামে লাজলো লেখেন “Is the Bitcoin amount I’m offering too low?” দু’টো পিৎজার জন্য ১০,০০০ বিটকয়েনের যে দর দিয়েছিলেন লাজলো সেটা কম না বেশি, সমস্যাটা তো সেখানে ছিল না। সমস্যা হলো, বিটকয়েনের বিনিময়ে পিৎজা পাঠানোর কোন উপায়ই তো ছিল না সেই সময়ের পিৎজা বিক্রেতাদের হাতে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সমাধান একটা পাওয়া গেল।

জেরেমি স্টুরডিভান্ট

সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন ক্যালিফর্নিয়ার সান্তা ক্রুজ শহরের নিকটবর্তী ফেলটন অঞ্চলের ১৮ বছরের ছাত্র জেরেমি স্টুরডিভান্ট (Jeremy Sturdivant, বিটকয়েন ফোরামে ইনি Jercos নামে পরিচিত)। পরদিন, ২২শে মে ২০১০ সালে[১], পাপা জন’স (Papa John’s) থেকে নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে ২৫ ডলার দিয়ে দু’টো বড় সাইজের পিৎজা অর্ডার করে লাজলোর কাছে পাঠিয়ে দেন জেরেমি[২]। জেরেমির পাঠানো পিৎজা পেয়ে সন্ধ্যা ৭টা ১৭ মিনিটে বিটকয়েন ফোরামে লাজলো লেখেন “I just want to report that I successfully traded 10,000 bitcoins for pizza. Thanks jercos!” লেখার সাথে পাপা জোন’সের পিৎজার ছবি দিতে ভোলেন নি লাজলো। বলা বাহুল্য পিৎজা পাঠানোর জন্য জেরেমির ক্রিপ্টো একাউন্টে ১০,০০০ বিটকয়েন জমা দিতে ভোলেন নি লাজলো। সেইদিন ১ বিটকয়েনের মূল্য ছিল ০.০০৪১ ডলার। সেই হিসেবে ১০,০০০ বিটকয়েনের মূল্য দাঁড়ায় ৪১ ডলার। পিৎজা দু’টোর আসল দাম ছিল ২৫ ডলার। স্পষ্টতই লাজলোকে দু’টো পিৎজা পাঠিয়ে সেদিন ১৬ ডলার লাভ করেছিলেন জেরেমি। ২০১০ সালের ২২ মে, ভারতীয় অঙ্কে ১ ডলারের দাম ছিল ৪৭ টাকা মতো। সেই হিসেবে ২৫ ডলারের দাম ছিল ১,১৭৫ টাকা এবং ৪১ ডলারের দাম ছিল ১৯২৭ টাকা। ভারতীয় অঙ্কে জেরেমি সেদিন লাভ করেছিলেন ৭৫২ টাকা। জেরেমির এই ১৬ ডলার লাভ করাটাকে কেউ কোনও দিনও তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেন নি। বরং কালক্রমে গুরুত্ব পেতে থাকে লাজলোর ব্যয় করা ১০,০০০ বিটকয়েনের ঘটনাটা। কারণ তারপর থেকেই বাড়তে থাকে বিটকয়েনের মূল্য। টাকা-ডলার সম্পর্কের মতোই বিটকয়েন-ডলারের দরও সদা পরিবর্তনশীল। আজ, এই মুহূর্তে ১ বিটকয়েনের মূল্য ১১,৫০০ ডলার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। ১ ডলার = ৭৪ টাকা ধরলে এই মুহূর্তে ১ বিটকয়েনের দাম পড়ছে ৮,৫১,০০০ টাকা বা সাড়ে ৮ লাখ টাকারও বেশি। সেই হিসেবে আজকের দিনে ১০,০০০ বিটকয়েনের মূল্য ৮৫১,০০,০০,০০০ টাকা বা সাড়ে ৮ শ’কোটি টাকারও বেশি। মাত্র ১০ বছর ১৯২৭ টাকা, সাড়ে ৮ শ’কোটি টাকায় পরিণত হয়েছে। স্পষ্টত এক বিশাল অঙ্ক লোকসান করে ফেলেছেন লাজলো হেনিয়েক্‌জ। আর কয়েকটা বছর যদি তিনি বিটকয়েনগুলো নিজের কাছে রাখতে পারতেন, তাহলে বিশাল এক অঙ্ক লাভ করতে পারতেন লাজলো। দু’টো পিৎজা আর সাড়ে ৮ শ’কোটি টাকা! আজ এই নিয়ে আফসোস করেন সবাই। কিন্তু খোদ মালিক কি আফসোস করেন তাঁর এই পিৎজা কেনা নিয়ে? এই নিয়ে বহুবার একই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে লাজলোকে। জবাবে তিনি জানিয়েছেন, ’You know, I don’t regret it. I think that it’s great that I got to be part of the early history of Bitcoin in that way, … it’s an interesting story because everybody can kind of relate to that and be – “Oh my God, you spent all of that money!”

বিশাল পরিমাণ টাকা হাতছাড়া হওয়াতে ‘বিটকয়েন নায়ক’এর কোনও আক্ষেপ নাও থাকতে পারে, কিন্তু আমজনতার আক্ষেপ যেন রয়েই গেছে। বিটকয়েনের ঊর্ধ্বমুখী দামের কথা শুনে এখন সবারই মনে হচ্ছে আগেই যদি কিছু বিটকয়েন কেনা থাকতো, কী পরিমাণ লাভই না হতো তাহলে। এমন কি এখনও যদি কিছু বিটকয়েন কিনে রাখা যেত তাহলেও ভালো হতো। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করছে বিটকয়েনের চড়া দর। এখন ১ বিটকয়েনের দাম তো প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা মতো। এই পরিমাণ টাকা ইনভেস্ট করার সামর্থ সাধারণ মানুষের থাকে না। বিটকয়েন কেনার স্বপ্ন কি তবে মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে? সাধারণ মানুষ কি বিটকয়েন কিনতে পারবেন না? উত্তরে বলতে হচ্ছে, হ্যাঁ পারবেন, নিশ্চয় পারবেন। একজন দরিদ্র মানুষও যে কোনও ছোটো অঙ্ক বিনিয়োগ করতে পারেন বিটকয়েনে। ১ টাকার ১০০ ভাগের এক ভাগকে যেমন পয়সা বলা হয়, ১ বিটকয়েনের ১০ কোটি (100 million) ভাগের ১ ভাগকে সাতোশি বলা হয়। সাতোশি নাকামোতোর নাম থেকেই ‘সাতোশি’ একক এসেছে। বিটকয়েন ও সাতোশির মাঝে আরও দু’টো স্তরও তৈরি করা হয়েছে। সেই হিসাবটা এই রকম, ১ বিটকয়েন = ১০০০ মিলিবিটকয়েন = ১,০০০,০০০ মাইক্রোবিটকয়েন = ১০০,০০০,০০০ সাতোশি। সেই হিসেবে এই মহূর্তে ১ সাতোশির মূল্য ১ পয়সারও কিছু কম পড়ছে। ১ সাতোশি = ১ পয়সাই ধরুন না। তাহলে তো বিটকয়েন বা সাতোশি কেনার আর কোনও অসুবিধা রইল না। যে কোনও অঙ্কের বিটকয়েন কিনতে পারেন যে কোনও ব্যক্তি।
এবার হয়তো জানতে ইচ্ছা হচ্ছে, কোথা থেকে, কিভাবে কেনা যেতে পারে বিটকয়েন? বিটকয়েন বা যে কোনও ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনার মূলত দু’টো উপায় আছে- ১) অনলাইন ২) এটিএম। অনলাইনে ক্রিপ্টোকারেন্সি বেচাকেনার জন্য কয়েনবেস, বিনান্স, আপবিট, ক্রিপ্টোপে, বিটপান্ডার মতো বেশ কিছু সংস্থা রয়েছে ইদুনিয়ায়। এদের সবগুলো অবশ্য ভারতে চালু নেই। কয়েনমামা, উনোকয়েন, কয়েনেক্সের মতো প্রায় ১৫টা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় সংস্থা রয়েছে ভারতের বাজারে। এই সমস্ত সংস্থার অনলাইন সাইটে ঢুকে নিজের পরিচয় নথিভুক্ত করে, ব্যাঙ্ক একাউন্ট লিঙ্ক করালেই কাজ শেষ। এখানে নাম নথিভুক্ত করলেই একটা ক্রিপ্টো ওয়ালেট[৩] চালু হয়ে যাবে গ্রাহকের নামে। এই ওয়ালেটে কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সি জমা পড়বে। ক্রিপ্টো ওয়ালেটে ঢুকে এবার কিনে ফেলুন প্রয়োজন মতো বিটকয়েন বা পছন্দ মতো অন্য যে কোন ক্রিপ্টোকারেন্সি। ব্যস, আপনার ওয়ালেটে চলে আসবে সেই কয়েন। এবার অনলাইন সাইট থেকে যখন মোবাইল বা অন্য কিছু কিনবেন তখন টাকার বদলে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে পেমেন্ট করে দিন। অবশ্য দেখতে হবে যে, সেই অনলাইন স্টোর ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে বেচাকেনা করে থাকে কি না[৪]।

অনলাইনে ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে গেলে, গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ও ব্যাঙ্ক একাউন্ট লিঙ্ক করা প্রয়োজন। গ্রাহক তাঁর নাম, ঠিকানা ও ব্যাঙ্ক একাউন্ট লিঙ্ক না করিয়েও ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে ক্রিপ্টো এটিএমে যেতে হবে[৫]। সাধারণ এটিএম মেশিনের মতোই দেখতে ক্রিপ্টো এটিএম মেশিন। এই মেশিন অপারেট করার পদ্ধতিও সাধারণ এটিএম মেশিনের মতোই। সেই এটিএমে গ্রাহকের মোবাইল নাম্বার ও ইমেল অ্যাড্রেস ইনপুট করতে হবে। সেই মোবাইলে একটা ওটিপি যাবে। সেটা ব্যবহার করে এটিএমে নগদ বা ক্যাশ ইনপুট করতে হবে। যে রকমে টাকা দেবেন সেই পরিমাণে বিটকয়েন বা অন্য কোনও ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারবেন গ্রাহক। ‘ট্রান্সাকশন কমপ্লিট’ হলে মেশিন থেকে কিউআর কোড (QR code) সম্বলিত একটা স্লিপ বেড়িয়ে আসবে। কিউআর কোড সম্বলিত এই স্লিপটার নাম পেপার ওয়ালেট। স্লিপের কিউআর কোড স্ক্যান করে অন্যত্র পেমেন্ট করতে হবে।

এই দুটো পথ ছাড়াও ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনার তৃতীয় একটা উপায়ও অবশ্য আছে। শেয়ার বেচাকেনার মতো কয়েকটা অফিস বা এজেন্ট আছেন যাঁরা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রি করেন। সশরীরে সেই অফিসে গিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা যেতে পারে। তবে সব দেশে এই জাতীয় অফিস/এজেন্ট নেই। আর যে সব দেশে সেই সংস্থার অফিস আছে, সেই সব দেশের সব শহরে বা সর্বত্র তাদের শাখা নেই। ফলত সরাসরি অফিস/এজেন্ট থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় নি এখনও।

সশরীরে গিয়ে এজেন্টদের থেকে বিটকয়েন কেনা বা এটিএম থেকে বিটকয়েন কেনার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয় নি বাংলায় বা ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোতে। বিটকয়েন কেনার জন্য অনলাইন সাইট গুলোই এখনও পর্যন্ত একমাত্র ভরসার স্থল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি ভরসা পাচ্ছেন এই সমস্ত অনলাইন সাইট গুলোতে ঢুঁ মারতে? পাচ্ছেন না! বিটকয়েন নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন ঘুরছে মনের মধ্যে? আচ্ছা ঠিক আছে, আগামী সংখ্যায় আপনাদের সেই সমস্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো ক্ষণ। (ক্রমশ)

_________________________

[১] লাজলো হেনিয়েক্‌জের বিটকয়েন দিয়ে পিৎজা কেনার ঘটনার স্মরণে, প্রতি বছর ২২শে মে ‘বিটকয়েন পিৎজা ডে’ পালন করা হয়। ওইদিন বিটকয়েন দিয়ে পিৎজা কিনলে বিভিন্ন রকমের ছাড়ের ব্যবস্থা থাকে। প্রথম অর্ডারের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে, পাপ জোন’স থেকে ফের দু’টো পিৎজা অর্ডার করেন লাজিও। তখন ওই পিৎজার দাম পড়েছিল ০.০০৬৪৯ বিটকয়েন বা ৬৭ ডলার। এই ট্রান্সাকশন থেকে স্পষ্ট, ১০ বছর পর ডলারের দাম কমেছে কিন্তু বিটকয়েনের দাম বেড়েছে।

[২] ইউএসএর পূর্ব প্রান্তে অতলান্তিক মহাসাগর পাড়ে অবস্থিত জ্যাকসনভিল শহর থেকে পশ্চিম প্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত সান্তা ক্রুজের দূরত্ব ৪,৫০০ কিমি, যেখানে অরুণাচলের পূর্বতম প্রান্ত থেকে গুজরাটের পশ্চিমতম প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ৩০০০ কিমি। ইন্টারনেটের দৌলতেই ৪,৫০০ কিমি দূরের পাপা জোন’সের দোকানে পিৎজা অর্ডার দিয়েছিলেন জেরেমি।

[৩] এই পর্যন্ত সমস্ত রকমের ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়ে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি ক্রিপ্টো ওয়ালেট ডাউনলোড হয়েছে। তাছাড়াও আছে পেপার ওয়ালেট, ওয়েব ওয়ালেট ইত্যাদি ইত্যাদি।

[৪] ক্রিপ্টোকারেন্সি (মূলত বিটকয়েন) দিয়ে বেচাকেনা করা যায় এমন কিছু উল্লেখযোগ্য সংস্থা হলো– AT&T, Archive.org, Dish Network, Domino’s pizza, Microsoft, Norwegian Air, Paypal, PornHub, Shopify, Subway, Uber, Wikipedia ইত্যাদি।

[৫] ২৯শে অক্টোবর ২০১৩ সালে পৃথিবীর প্রথম ক্রিপ্টো এটিএম চালু হয় কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে। ১লা জানুয়ারি ’১৪ সালে আরো ৭টা এটিএম স্থাপিত। ১লা জানুয়ারি ’১৫ সালে সারা পৃথিবীতে ক্রিপ্টো এটিএমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮টায়। ১লা জানুয়ারি ’১৬ সালে সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫০৩টে। ১লা জানুয়ারি ’১৭ সালে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৯৬৬, ১লা জানুয়ারি ’১৮ সালে তা বেড়ে হয় ২০৬৮, ১লা জানুয়ারি ২০১৯ সালে সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৪১০৪। ১লা জানুয়ারি ২০২০ তে ৬৩৬২ আর ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৯৬৪২টায়। স্পষ্টতই, জ্যামিতিক হারে (দু’গুণ) বেড়ে চলেছে এটিএম সংখ্যা। ১৫ই অক্টোবর ২০১৮ সালে উনোকয়েন টেকনোলজিসের তরফ থেকে ভারতের প্রথম ক্রিপ্টো এটিএম স্থাপন করা হয় বেঙ্গালুরুর একটা মলে। কিন্তু তখন ক্রিপ্টো ট্রান্সাকশন নিষিদ্ধ ছিল ভারতে। ৫ দিন পর, ২১শে অক্টোবর ২০১৮ সালে, বেঙ্গালুরু পুলিশের সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের তরফ থেকে সিজ করা হয় মেশিনটাকে। গ্রেপ্তার করা হয় এটিএমের মালিককে। ক্রিপ্টোকারেন্সি আইনসিদ্ধ পর, এই মুহূর্তে ভারতের একমাত্র ক্রিপ্টো এটিএমটা রয়েছে নিউ দিল্লিতে।

Facebook Comments

Leave a Reply