রাজস্থান ডায়েরিস : সিন্ধু সোম

পর্ব-১৪

রাজস্থান ডায়েরিস—২৭

দৈত্যপুরী গিলে ফেলল। আমি-তে কী জানি কে থাকে! নিজেকে অচেনা। বাস্তু আর বাস্তু। টানা বারান্দায় দোল খায় বাসন্তী। দুমাস পরেই তার বিয়ে। সোনার টব। হীরের ফুলে গোলাপ গোলাপ গন্ধ যেন। তার ডালে শুক সারি কথকতা করে। আমার বাম দিকে চাঞ্চল্য। স্রোত জানায় তাঁরা একজন বিভূতিভূষণ, একজন আশাপূর্ণা। গণ্ডগোল একটা কিছু। আমি স্রোতকে বলি,”ভালো করো নি! জানার অভিশাপ বয়ে বেড়াতে তুমি পারো। আমি তাকে সইবো কি করে? আমার শরীর জুড়ে ঢেউ। যা শুধু জল-অচলের নামবিশেষ!” স্রোত আমার কপালে গাল রাখে। মিষ্টতার রাগ ছুঁয়ে বলে, “রাগ কোরো না। সমস্ত গতির গন্তব্য স্থিরতায়। পরিপূর্ণতা স্থিরতায়। আর স্থিরতার সম্পৃক্ততা টুকরোর থেকেও টুকরো করে ভাঙায়। ধ্বংসের সঙ্গমে জন্ম দেওয়া ছোট্ট একটুকরো গতির। দিতিকে পাওয়ার জন্য না হয় একটু জানলে আমায়!” আমার মুখে অন্য কেউ সায় দিলে।

এত নেশা! চোখ চলছে অন্য কারোর হয়ে। কান শুনছে স্রোতের গোপন কথা। হাত। চটাপট। দেয়ালে ধাক্কা দিচ্ছে। আমি আবিষ্কার করলাম দেয়ালটা ভিতরে। কচ্ছপের মতো। হাঁকু পাঁকু । ওঠার শব্দ। সবের শব্দ হয়। তাই দৃষ্টির নিলামে শ্রবণ তুলে নেন রবি। পা চলতেই চায় না। স্রোত আমার হাতের প্রান্তে ইচ্ছে দিল। টান টান। এগিয়ে চলল বুক। এ রাস্তা আজকের সংকীর্ণতা নিয়ে বাঁচে না। মরুভূমির মাইয়ে পুষ্ট। জটিলতা নেই। ঠকাঠক। ঠকাঠক। ঠকাঠক। ছেনির পিছনে হাতুড়ির ব্যস্ততা। হাজার হাজার হাত। একি! দৈত্যপুরী তৈরি হচ্ছে। আমার হাতেও অস্পষ্ট লাঠির মতো একটা কিছু। স্রোতের আঙুল ছেনি হয়ে পেখম মেলছে এক একবার। আমি আরও এক গোপন জন্মের ইঙ্গিত পাচ্ছি।

শালবনের আলো মাখা ঝরাপাতার মতো বিগত কাজ। কাগজেই লেখা হোক কি পাথরে। হৃদয়ের ব্যপ্তি কতটুকু আজ? চৌকি থেকে চৌবাচ্চায় সে মুখ থুবড়ে পড়ে। আর্চের ওপর আর্চ। স্রোতের ওড়না। আমার চোখ ঢেকে দেয়। থামের পাশ কাটিয়ে আমাকে নিয়ে যায় আর কেউ। “তোমার ঘরে বাস করে কারা…”! কে আগামী? কে অতিথি? চেনার পর্দায় অচেনা ধূলোর দাগা দেয় মরুভূমি। স্রোত এগিয়ে এগিয়ে যায়। আমি কাটা কাটা আকাশ দেখি। হাসির রঙে আকাশের ব্যস্ততা লেগে থাকে। আমি স্রোতের নিষ্পাপ হাসির পাশে বসি। ও আমাকে ঠেলতে থাকে। বসতে দেয় না। স্রোতের গন্তব্য সমুদ্র। কিন্তু থাকে সে নদীরই চিরকাল। পাথরের ফুলঝুরিতে ধাঁধা লাগে। বৈষ্ণবীর মন্ত্র মনে পড়ে।

অন্তর্নিহিতা। সেই। একজন মূলমন্ত্র জানে। আমি নিজেকে পরিচয় জিজ্ঞেস করতে করতে করতে ক্লান্ত। স্রোত আমার চুল গুছিয়ে দেয়। বলে, “দৈত্যপুরীর মতো করে নিচ্ছি তোমাকে। আটকিও না আমায়। দিতির কাছে পৌঁছে দেব আমি।” আটকাতে চাওয়াটাও আমার হাতে নেই। স্রোত গুনগুন করে,”চিত্রকর, তুমি…”! মৌসুমী আগুন লাগে আমার বুকে। আমিও দুলে উঠি। কে আমি? কে দোলে? শাক্ত নাকি সাংখ্য নাকি বৈষ্ণব নাকি বাউল? “ভাবি ছেড়ে গেছ, পিছে চেয়ে দেখি, এক পা-ও ছেড়ে যাও নি॥ আমি অকৃতি অধম বলেও তো…”! কে জানে? স্রোত? নাকি নদীর চরাচর? আমার মাথায় জট। জটার থেকে নেমে আসে গঙ্গা। ভগীরথের মুখে আমি আবার সুর শুনি। দৈত্যের কাছে পৌঁছানোর চরম স্তম্ভ। আমি দেখি সাদাকালো চুলের এক প্রকৃত সর্বহারা নারী। তাঁর ঠোঁটে অনাদির আওয়াজ আমার মাতাল চোখে ধূলো ছোঁড়ে। আমি না। আমি না। কাঁদে অন্য কেউ। স্রোতের ঠোঁটের সঙ্গে ঐ পুরু ঠোঁটের বড় মিল। গুনগুন করছ ওঠে অস্তিত্ব—”তাই ঝড়ের কাছাকাছি, এই কাতর বিবরণ…”……….

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
৩১শে অক্টোবর ২০১৮
রাত ১০টা ৪

শহরালু কেশর-চিরাগী রেখা, চক্র গলার শিরা উপশিরার সঙ্গমে ক্লান্ত, তবুও ফেরার পথ হারানোর থেকে নমনীয়

তবুও ফেরার পথ হারানোর থেকে নমনীয়


আঁধারে ঘনায়মান কুঞ্জকুসুম দোঁহে, একপল কানু মোকে রাধা না চিনিল আহা, নিজরূপে হৃদয় তিতিল

রাজস্থান ডায়েরিস—২৮

উঠলো ঝড়। ঝুম ঝুম ঝুম। চলায় ধাঁধা। এ কিসের শব্দ? ভাবার অবকাশ কতটুকু? ভুর ভুর। কর্পূ্রের গন্ধ। যাও মেঘ। আমি কোনওদিন উচ্চারণ করতে পারি না। ঝাপসা আকাশে সোনার দাগ লেগেছে। কই না! সোনাই তো। থামের অরণ্য। সোনার পাতা তার মুখে বুকে। ভারি। পায়ের ঘাম। মখমল। কয়েকটা গদি। ও কে! ধক্ ধক্। চোখের ভাষ্যে মিনার কাজ। সরসর। সরে যায় মাকড়সা। যুগান্তরের লালা তার গায়ে, পায়ে, আশ্রয়ে। এ কি নাচঘর? স্থির। আমি স্রোতের হাত চেপে ধরি। ধরি না। আমি চাই। পারি না। চাইছি না। ঝুর ঝুর। বালির সারেঙ্গির বুকে ওঠে কম্পন। মচ মচ। কেউ পাশ ফেরে। ঐ চোখ! “ও কি ভুলিবার ধন…”! জগন্ময়ী গুনগুন ভাসে। দানা বাঁধে নীল। গোলাপির আগে। গোলাপি? শহর। তার দান নেই! দৈত্য? দৈত্য! দৈত্য। ছন ছন। হাতের তুড়িতে ছুটে আসে ঘাঘরা। ও চাউনি সহ্য হয় না কেন? ঐ পেশীবহুল বুক। খাঁচার মরণকথা। মরি মরি! স্বর! মেঘের কম্পাঙ্ক। “ওকে নাচতে বলো! দিতির খোঁজে এসেছে। দিতির অবহেলা ঠেলতে হবে। অহং-এর টুকরো এখনও ঐ বুকে। এই দৈত্যপুরী অপবিত্র হতে দেব না আমি। স্রোত। ওকে নাচতে বলো।”

গম গম। গলায় কাঁপে মহল। শিরদাঁড়ার নিভৃতে মোমের মতো ছুঁয়ে দেয় স্রোত। আমি গালে হাত রাখি। অজান্তে। রাখি না। স্রোত। ব্যকুলতা। ঠনঠন। ছিটকে পড়ে সোনা। পেয়। তবু পিপাসার পাশে ম্লান। আমি বুকে হাত রাখি। চমক। একি? চমকাই না। স্বাভাবিক ভাবেই অস্বাভাবিকতা আসে। আমার পরনে ঘাঘরা। বুক ভারাতুর স্তনে। স্তন দুধে। নেশার মাঝে রক্তে নেশা ধরে। চকমকি। কাঁচ। হীরে। চেতনার স্রোত আগলে স্রোত ভরে থাকে। স্রোতের ঠোঁটে ডুবে আসে ঠোঁট। অনুভূতি। তলোয়ারও আছে। কি? কি চাই? কি হয়? কি হবে? একাধারে স্রোত আমায় আমি থেকে উভগামীর সংজ্ঞা দিয়েছে। সমস্ত ম্লানতা ধীর। চলকে ওঠে কলসি। মা। বাবা। সংসার নেই। আমি শুধু প্রেম। আমি প্রেমের লিঙ্গ। ঝুম ঝুম। আমারই পায়ের সুর। ইদস্ কে? ইদং কি? অহং তার শত্রু? দৈত্য যেন শুনতে পেলে। কৃষ্ণের মতো হাসি। উফফ্। জ্বলে যায়। গলার নীচে নীলকন্ঠের অস্তি। স্তন রোমাঞ্চিত। গঙ্গোত্রীর গোমুখ। ত্রিবেণী হয়ে মেশে। দৈত্য বলে,”অহং কোনওদিন তোমার শত্রু ছিলনা। অহং-এর ব্যবহার তুমি শেখো নি। পাথর কুঁদে মহল হয়। ইদং-কে শিল্পের রূপ দিতে অহং-এর ছেনি হাতুড়ি লাগে। সাবলিমেশনটা একটু বোঝো হে! নাচো অজ্ঞাত। না নাচলে অভিশাপের স্খলন নেই।”

নাকের নথ। স্খলন হয় অন্যকারও। পূজোয় ফুলের আরতির মতো। টুপ টুপ। অন্দরমহলে। স্রোত আমার শব্দ ছুঁড়ে নেয়। দুলদুল। দুলুনি। পা ছুঁয়েছে। আমার শরীর? কার? কোথায়? কতটুকু অসাধ্যের আলোড়ন? দিতির কাছে আমায় পৌঁছতেই হবে। আমি নাচি। নাচি না। নাচে অন্য কেউ। আমি কোনওদিন নাচ শিখি নি। দিতির নাচের পা। স্মৃতির পাথর। আমি খেয়াল করি নি। আজ করি। পায়ের চাপ। নাচঘর কেঁপে ওঠে রোমাঞ্চে। আমার বুকে ঢেউ। প্রথমবার। স্রোত আমার পায়ে পায়ে নাচে। আমরা গড়িয়ে পড়ি স্তনের থেকে শিশ্নের গভীরে আরও গাভীন বুক নিয়ে। সমুদ্র মন্থন। কে ওঠে? সুর আর অসুরের জন্মযোনি কেন এক? একের মতো! একের নামতা। জীবন আসর জুড়ে থমকে দাঁড়ায়। যাকে গুনের স্বাধীনতা দিই, ভাগটুকু সে কামড়ে শুষে অধিকারে নেয়। আমি মৃত্যুর কোলে নাচি। আমার টুকরো হয় না। আমি শিব। আমি সতী। কে? কে? অন্ধকারে কার অবয়ব। জগন্ময়ী কন্ঠ কানে আসে। “রমনীমোহন”!

ঝংকার। বীণা। রুদ্রবীণা। নাকি বুকের? নারীর অস্তিত্বের? ঝাপসার মালাখানি ম্লান হয় না কখনও। কতজন আসে যায়। সাদা কালোর পায়ুরেখার মাঝে ঝাপসা তার ধূসরতা নিয়ে লেগে থাকে স্থির। শক্তি শাক্তে মিলে যায়। মনের মানুষ পাওয়া কি এই? সাধনা। একতারার সুর। কখনও খোল। কাশেম মল্লিকের কন্ঠ। “ওগো বেদরদী ঐ রাঙা পায়, মালা হয়ে কে গো…”! মিনার কাজে পালিশ লাগে। তবে তার আগে ছিঁড়তে হয় বুক। আমার ঘাঘরার ওপর চোখ রাখে কাঁচুলী। পায়ের তালে অনাবৃত। চটাপট চটাপট। হাততালি পড়ে। পয়সা ছুঁড়ে দেয় মহল। আমার আর স্রোতের গায়। হ্যাঁচকা টান। ছিঁড়ে যায় বুকের বাঁধন। দৈত্য হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসে স্রোত আর আমাকে। চেপে ধরে আমার কণ্ঠ। আমার গলায় রোঁয়ায় বিশ্বাস ঘাতকতা। উফফ্। একি বিষ? একি আগুন। জহরব্রত। ডুবতে চাওয়া। দৈত্য একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তারপর শ্বাস ফেলে শ্বাসের ওপর। গম গম করে ওঠে ঘর। “কীভাবে?” একপর্দায় ছন্দপতন বিশ্বের। উড়ে যায় কালো প্যাঁচা। জীবনানন্দের ইঁদুরও কি হাতঘড়িতে অপেক্ষা করে থাকত প্যাঁচার? ক্লপ ক্লপ। ভেঙে যায়। ভাঙে না। অস্তিত্বের মধ্যে অস্তিত্ব। আস্তিক্যের আদলে আস্তিক্যের ঘোমটা জোড়া। জড়িয়ে জড়িয়ে আমি গেয়ে উঠি,”এই করেছো ভালো নিঠুর হে…”! ছ্যাঁকা। সিগারেটের কড়া গন্ধে ভরে যায় সভা। আমার দ্বিগুন দূরত্বে স্রোত। আমি আঙুলটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসি। ধোঁয়াশার বুকে চিল। সাঁ । শব্দ । আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দৈত্য অন্ধকার ঘরে‌। অশ্লীলতার জাজিমে ডুবে আসে দুনিয়া। অন্ধকার আমায় ঠেলে দেয় স্রোতের বুকে। ধীরে ধীরে আরও গম্ভীরতার বেদীমূলে…

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
১লা নভেম্বর ২০১৮
সন্ধ্যে ৭টা ৩৭

গুটি কেটে সোনালি পিরালি একা স্তম্ভনের ঝিরঝিরি যার নাগাল পায় না, একটা পিচ্ছিল খননও লাগে তায়

নাচঘরে একা আমি উভলিঙ্গ ও স্রোত, বসন্তের থেকেও ভারী অধরতা ঘনায় নিঃশ্বাসে

বিহারকুয়াশাধূপ সাগরতীরতঘন রচে হরিহরকামীশয্যা/ সাধকসলিল ভণতই তুয়ামূলব্যাপীতৃষ্ণাগরলতঃ প্রবজ্যা

জয়দেব আত্মরতির কবি, কৃষ্ণ জানতেন! তুমিও কি জানো কিছু তবে?

Facebook Comments

1 thought on “রাজস্থান ডায়েরিস : সিন্ধু সোম Leave a comment

  1. অনাস্বাদিত কল্পরুপ … সাধারণের বোধ এখানে অগম্য … অভিজ্ঞতা সাধারণ হলেও লিপিকার কি চাইছেন ? অসাধারণ শতকরা ০.০১…”অপরজন” কি শতকরা ০.০১ ? এটা হলে”আপনজন” আর “অপরজন” এর বিভাজন যেন না হয়। তলস্তয়, ও হেনরি, মারিও পুজো , লীলা মজুমদার, বিভূতিভূষণ, সত্যজিৎ, আরো অনেকে “অপরজন/আপনজন” এর মান্যতা পেয়ে আমাদের মধ্যে আছেন।

Leave a Reply