অতলে : সিন্ধু সোম

fail

হেমন্তের আবছা রাত তখনও ঝুপ করে নেমে আসে নাই ঠিকই, কিন্তু সন্ধ্যের কালো আকাশ তার মৃদুল খোপ খোপ ডানা ছড়িয়ে দিয়েছে যতদূর নজর করা যায়। পাড়া নাই, পথ নাই, পথিক নাই, আলো নাই, আশে পাশে গ্রাম কিম্বা শহর নাই তবুও যা রয়ে গেছে এবং মিটমিট করে জ্বলছে বহুদূরের পথ চেয়ে তা এক জোড়া বৃদ্ধ দৃষ্টি। বয়সের ছোপ তাতে লেগেছে বটে, তবে তাকে ঘোলা করতে পারে নাই! সে বড় ঋজু নজর। তবে তাতে লক্ষ্য নাই এও ঠিক। প্রাক শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন এই বাতাসে সে দৃষ্টি ভেসে রয় একা, বড় দীর্ঘ একাকীত্ব সাথে নিয়ে। সেই দৃষ্টির ভাসা ভাসা পথ বেপথের আশে পাশে জোনাই ছোঁক মারে এদিক ওদিক। ভুল করে দৃষ্টির এলাকায় ঢুকে পড়লেও সেই লক্ষ লক্ষ জোনাইয়ের অপার্থিব চলা ফেরা সেই দৃষ্টির কাছে পাত্তা পায় না। ঝাপসা মাটির খানিক ওপরে সেই চলাফেরা ঘষাটে কাঁচে পড়া আলোর মতো দিগশূন্যতায় ভোগে। অথবা ভাসিয়ে ফেলা দৃষ্টি কুয়াশায় টান টান ভেসে এমন কোনো ভুলভুলাইয়া তৈরি করে মাটির তারারা যার অলি গলি বুঝে উঠে নাই! এখানে ওখানে শ্যাওড়ার ঝুপসি আঁধারের মণ্ড পাকায়। তার গায়ে বুকে মুখে লেগে থাকে সেই আলো। সেই দৃষ্টির শেষ প্রান্তে খেজুরের কালো মোটা কাঁটায় দিগন্ত যেন ক্ষত-বিক্ষত। তার কমলা রক্ত কাঁটাকে স্পষ্ট আততায়ী বলে ঘোষণা করে। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে এই ঘোষণা, সেই দৃষ্টিকে তা ছুঁতে পারে কত টুকু? ভাববার বিষয়! কিন্তু ভাবে কে? এখানে লোক নাই, জন নাই, কুকুর, বেড়াল, এমন কি এক দুই খান শৃগাল পর্যন্ত বসতি করে নাই! আর কেউ নাই বলেই হয়তো আকাশ উপস্থিত এই একমাত্র দৃষ্টিকে আজ আশ্রয় করেছে। পশ্চিমের আকাশে এক টুকরো চাঁদা মেঘ ভুলে ফেলে গিয়েছিল কেউ যেন এই অভিশপ্ত বাথান ছেড়ে যাবার আগে। সেই মেঘেও কমলা ছোপ ধরেছে। সেই সুদূর দিগন্ত প্রান্তে ঝুলে থাকা চাঁদা মেঘের নীচে এক বিরাট আগুনের আয়োজন দেখা যায়। অথচ আয়োজনই সার। আগুন দেখা দেয় না। মুখ লুকিয়ে থাকে। যেন এই বিরাট হাঁ করা উদ্যত বিবরে তার অস্তিত্ব যে কয়েক সেকেণ্ডে মুছে যাবে কোনও ভাবে সেটা সে জানতে পেরেছে। তবু এই দৃষ্টির সীমানার মধ্যে ধরা দেওয়ার লোভ সামলাতে পারে নাই। তার পিছে পলাশের গাঢ় সবুজ জঙ্গল সেই আগুনকে পরম মমত্বে বুকে করে আগলে রাখে!
চারিদিক ভালো করে ঠাওর করলে বোঝা যায় এ এক মহাশ্মশান! শুনশান এ অস্তিত্বের মাঝেমাঝে কয়েকটা নারিকেল, খেজুর আর শ্যাওড়া অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন ভুল করে এই চত্বরে ঢুকে পড়ায় তারা যার পর নাই লজ্জিত। ধানক্ষেত নাই, কারখানা নাই, গোলা নাই, বারুদ নাই- শুধু এই পাহাড় প্রমাণ নাই-এর মাঝে রয়েছে এক দাঁত ফোকলা দোতলা বাড়ি। বয়সের ভারে জীর্ণ। তবু এই একমাত্র বাড়ি, যা এখনও দাঁড়ায়ে রয়েছে। বাড়িটার চারপাশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আজ বহু বছর পেরিয়ে বাড়িটা প্রায় হতশ্রী হয়ে উঠেছে বটে, কিন্তু এককালে এরে যে কেউ খুব যত্ন নিয়ে দিনরাত এক করে তিলে তিলে তৈরি করে ছিল, বাড়ির চেহারায় সেই যত্নের ছাপ একেবারে মুছে যায় নাই! এখন যে যত্নের কেউ নাই তাও বোঝা যায়! সেই এক মানুষ উঁচু পাঁচিলের একপাশে ক্ষয় রোগ ধরে বেশ কিছুটা জায়গা আলগা হয়ে এসেছে। দৃষ্টির উজান বাইতে বাইতে সেই পথ দিয়ে পাঁচিলের ভেতরে ঢুকে পড়লে প্রথমেই চোখে পড়ে বিরাট এক বাগান। সেই বাগানে ফুল নাই। প্রায় দশ কাঠা জায়গার ওপরে থাকা এই বিশাল চত্বরের পিছনের দিক থেকে আদ্ধেকটা কুয়ো, ঘর ইত্যাদি দখল করে রেখেছে। ইতস্তত কয়েকটা পেঁপে গাছ রয়েছে। সেসবকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে শুয়ে রয়েছে এই বিস্তীর্ণ বাগান। তাতে কয়েকটা ঝাঁকড়া আম, নিম, নারিকেল গাছ গায়ে গায়ে লেগে পাঁচিলের গায়ে আঁধারের ঝুপসি পাকিয়ে তুলেছে। তার ফাঁক দিয়ে আকাশে সদ্য ওঠা চাঁদ মুখ বাড়িয়ে দেয় বাড়ির ভিতরে যেন কত প্রজন্মের কৌতূহলে।
বাড়ির ভিতরের দিকে দুটো মোড়া পাতা! তার একটা ফাঁকা! অথচ খানিক আগেই যে ওখানে কেউ বসে ছিল তা মোড়া থেকে ছড়িয়ে পড়া উষ্ণতায় বোঝা যায়! তার ঠিক পাশের মোড়াটিতে শেকড় গজিয়েছে বহুদিন ধরে একটু একটু করে। সেটায় বসে আছেন এক বৃদ্ধা! বয়েস তার প্রায় সত্তরের আশেপাশে! মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ সেই বয়েসকে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিয়েছে নব্বইয়ের কোঠায়! বৃদ্ধার মুখ এই চাঁদের মিহি আলোয় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে আরেক রকম অন্ধকার পাকিয়ে তোলে যা তার বাগানের অন্ধকারের সঙ্গে মিশ না খেয়ে সমস্ত মুখের চামড়ায় ঝুলতে থাকে একটা অতিরিক্ত অস্তিত্ব নিয়ে! বৃদ্ধার মুখখানা অল্প ফাঁক করা! যেন বহুদিন আগেকার কোনও দুরারোগ্য স্মৃতি সে খুঁজে পেয়েছে অথচ ভাষাহীন মুখ বেইমানী করে কোনও শব্দই বার করে নাই! থমকে গিয়েছে! বৃদ্ধার নিষ্পলক চোখ এই ক্লান্ত ভগ্ন মুখের পাশে একদমই অস্বাভাবিক! দিগন্ত জোড়া ছড়িয়ে থাকা সেই দৃষ্টির জাল গুটিয়ে আনলে তার উৎস চোখজোড়া চিকচিক করে ওঠে এবং বহুদিনের পুরোনো একটা চশমার পিছনে নিজেদের আড়াল করতে চায়!
বৃদ্ধার নাম আশালতা তেওয়ারী। কনৌজি ব্রাহ্মণ! এককালের দুধে আলতা সাহেবদের মতো রং এখন অনেকটাই মলিন! গাঢ় কালো চুলের নীচে বয়সের শুভ্রতা বেরিয়ে আসার আকুল আকাঙ্ক্ষায় চুলের গোড়া ধরে ছোঁক ছোঁক করে। কলপের অবাস্তবতার পিছনে ঢেকে রাখা অতীতের সচ্ছল জীবন হয়তো মুখ লুকোতে চায়। তবু কখনও কখনও দু এক গাছি কলপ এড়িয়ে যাওয়া অবাধ্য পাকা চুল মুখে এসে পড়লে আশা তাড়াহুড়ো করে সেই চুল সরিয়ে ফেলে ও আবার নতুন করে দিগন্তে চোখ রাখার চেষ্টা করে। থেকে থেকে তার মনে হয় এমন গুলের জ্বলন মাখা ধীমা আগুন আকাশ বুকে রাখে কী করে! চিতায় ওঠার আগে তার বুকে কি এই আগুন রাখা যায়? না, বুকের আগুন না নিভলে মান্‌ষে কি বাঁচতে পারে? বুকের আগুন পুরা নিভলেও কি বাঁচে কেউ? তাই দেখো আকাশ নিজের বুকে কেমন হিমেল হাওয়াও থোয়! সেই হাওয়ায় বৃদ্ধার মুখের রেখা আরো কুঁচকে যেতে থাকলে বুঝা যায় আর একটা কাশির দমক উঠি উঠি করছে। কিন্তু শেষ অবধি কাশি উঠে না! একটা হাপরের মতো নিঃশ্বাস সেই কাশির গর্ভপাতের সাক্ষী হয়ে সারা উঠোনে ছুটোছুটি করে!
যে জায়গাটায় মোড়া পাতা রয়েছে সেখান থেকে দু ধাপ সিঁড়ি উঠে বাড়িটার দরজা! তার উল্টো দিকে বাগানের গেট পর্যন্ত নারিকেল দড়ির নক্সা করা ঢালাই রাস্তা। তারও এখানে ওখানে চামড়া উঠে ইঁট বেরিয়ে এসেছে! জীর্ণ বাড়ির অভিমান বাড়ির প্রতিটি ফাটলে বাসা করে থাকে। সাড়া শব্দ পেলে মাঝে মধ্যে উড়ে বেরিয়ে আসে এক দুইখান! বাড়ির বুকে ঘর আছে বটে কিন্তু তাতে আলো নাই! দুখানা বেশ বড় অথচ নীরব জানলার মাঝে এই বিরাট লোহার দরজার এখানে ওখানে জং-এর মারণব্যাধী তার ছোপ ছোপ ছাপ ফেলে গিয়েছে! দেখে মনে হয় কতদিন ধরে যেন সে সেধে চলেছে একটি পথিকের আগমনের জন্য! যেন বহুযুগ তার সেই ভারি আলগা ছেড়ে আসা পাল্লা খোলা হয় নাই। জমে পাকিয়ে ওঠার পূর্বেই দরজায় একটা আওয়াজ হলে ধারণাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আশ্রয় নেয় সিঁড়ির ধাপে ধাপে। ফুটিফাটা বয়স্ক সিঁড়ি সেই ধারণা বুকে করে আগলিয়ে রাখে! পরক্ষণেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে একটি মেয়ে। বয়েস তিরিশের আশে পাশে। তার রং দেখে আশার যৌবনের রঙের একটা ধারণা পাওয়া যায়! শরীরে অল্প মেদে লাবণ্য খুলেইছে! ভ্রু কুঁচকে মেয়েটি বলে ওঠে, “ভেতরে এসে বসো না মা! এই এত রাতে খালি মাথায় তুমি ওখানে বসাটা বন্ধ করো। হিম পড়ে না, নাকি? দেখছ এমনিতেই এত কাশছ!” আশা জবাব দেয় না। তার চোখ তখন আকাশ থেকে বাগানে নেমে এসেছে। “নাও! চা নাও!” মেয়েটি এক হাতে নিজের ধোঁয়া ওঠা কাপটা ধরে রেখে অন্য হাতে আশার দিকে আরেকটা কাপ বাড়িয়ে দেয়!
আশা মেয়ের হাত থেকে কাপটা নিলে মেয়ে তার পাশের মোড়াটায় বসে এবং খানিক আগেও যে সেইই ওখানে বসে ছিল তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকে না! চায়ে একটা আলতো চুমুক দিয়ে সে আশাকে মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলে, “এখানে রোজ বসে থেকে কী লাভ মা? বাগানের কি আর কিছু বাকি রয়েছে যে ফুল আসবে? কেন শরীরটা খারাপ করে ফেলছো হিম লাগিয়ে বলো তো!” গলাতে তার অকৃত্রিম উদ্বেগ দলা পাকিয়ে ওঠে বটে, কিন্তু বলার সময় সেও যে মায়ের পাশেই খোলা আকশের নীচে বসে আছে – এ কথা সম্ভবত তার মনে থাকে না! আশা মেয়ের দিকে তাকায় না! ধীরে ধীরে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, “আমি যে দেখতে পাই সুমি! এই বাগানে অসংখ্য বেড হয়েছে! ইনকা লেগেছে, চন্দ্রমল্লিকা লেগেছে, পপি লেগেছে………এক একটা ডালিয়ার ঘের হয়েছে সোয়া ফুটের! মালিরা কাজ করছে, পুতলার মা জল ঢালছে এলাহি কাণ্ড- আমি যে সব দেখতে পাই! তোর দাদা ওই যে, ঠিক ঐখানটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তদারক করে! কেন, তুই দেখতে পাস না?” আশার চোয়ালের দৃঢ়তায় সে যে সত্যি কিছু দেখছে এই ভাবটা এত স্পষ্ট ফুটে ওঠে যে সুমি চমকে ওঠে! “আহ্‌! মা! কী হচ্ছে কি এই ভর সন্ধে বেলা! সে আর আসছে, আর তুমিও তাকে দেখেছো! তাহলে তো হয়েই যেত! আজ কত যুগ হয়ে গেল, তার একটা খবর পর্যন্ত জোগাড় করা গেল না! এই বাড়ি, জমি সবই তো ওর নামে ছিল চিরদিন! তার একটা টান থাকতে নেই? উফফ্‌!” আশা বলে, “সে আবাগী ডাইনি মাথা খেয়েছিল না আমার দেবতার মতো ছেলেটার! বাণ মেরেছিল সেইই দেখ গা! তাই আর ফিরে আসে নাই! হয়তো আসতে চায় সে! হয়তো কোনও আদাড়ে বাদাড়ে ঘুরছে গা বাণ খেয়ে! ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছে না! মাথা তার আউলান গেছে। সে ঢেমনি তো আর সহজ না! বাচ্চাটাও হয়েছিল মা ঘেঁষা! হুর!” ঘরঘর করে টানা কফ মুখে দলা পাকিয়ে তাতে সমস্ত অভিমান রাগ ঘেন্না ঢেলে তাকে পরিপুষ্ট করে তুললে সেই কফের আঁঠালো গঠনে আশালতার জিভ জড়িয়ে যেতে থাকে। সে বুঝতে পারে কফটা ছুঁড়ে এই মুহুর্তে দূরে ফেলা দরকার। কিন্তু ভয় পায়! শেষ সঞ্চয়টুকু যদি এই কফের সঙ্গে বেরিয়ে যায়- এরকম একটা সব হারিয়ে যাওয়া ফাঁকা বোধের ভয় তার জড়িয়ে যাওয়া জিভ থেকে চোয়ালে উঠে ক্রমশ চোখের পিছন দিয়ে মাথার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকলে সে কফ ফেলার আর চেষ্টা করে না। আবার গিলে ফেলে। বার্ধক্যের জ্যোতি তার এই গিলে ফেলা কফের সঙ্গে সঙ্গে যেন আরো খানিকটা বেড়ে গিয়ে বড় স্নিগ্ধতা পাকিয়ে তোলে তার মুখের চারপাশে। সুমি মায়ের কথায় সায় দিয়ে বলে, “অথচ দেখো! আমাদের এত বড় সব্বোনাশ করেও তো সে আবাগী মেয়ে নিয়ে দিব্বি আছে! জ্বলে পুড়ে মরছি আমরাই! বিচার নাই জগতে! মরণ! আচ্ছা মা, তোমার কি মনে হয় দাদা ভালো আছে আমাদের ছেড়ে?” আশার গলা নিরুত্তাপ, সে বলে, “সে ভালো থাকলেই বা কী? জায়গাটাই তো শ্মশান হয়ে গেল মা! সে থাকতে বাড়িতে তখন ফুল! আহা! দূর দূর গ্রাম থেকে শহর থেকে পর্যন্ত লোক এসেছে তখন অনির্বান তেওয়ারীর বাগান দেখতে! দুইটা পুকুরের মাছ! খেয়ে শেষ করা যেত না! তারপরে বাবুর হোটেলের রোজগার! কিছুই তো রাখতে পারলাম না! ভাগ্যিস বউটাকে নাতনিটাকে সামলে নিয়েছি সে সময়! নইলে বাড়িখানাও চলে যেত! তোর বাবার এত জমি, সব পোড়ো জমি হয়ে গেল সুমি! আমি কিছুই করে উঠতে পারলাম না! বাবুটাও চলে গেল!” ছেলের শোক আবার নতুন করে জেগে ওঠায় নাকি হারানো সম্পত্তির শোকে ঠিক বোঝা যায় না, আশার চোখ আবার চিকচিক করে ওঠে! সেই চিকচিকানি সুমির গলাকেও কবজা করে ফেলে ও খাদে নামিয়ে আনে! ভিজে ভিজে চাঁদের আলো ছোঁয়া গলায় সুমি বলে ওঠে, “সেই! হোটেল গুলোও তো আয় নেহাৎ… ওটা থাকলে আজ এভাবে…”। শেষ করার মতো কোনো বাক্যই জুতসই না মনে হওয়ায় সুমির খাদের গলা আরো নীচে নেমে কোন পাতাল গহ্বরে তলিয়ে যায় তার আর হদিস পাওয়া যায় না!
ঠিক এই সময় পাশের তালগাছটা প্রচণ্ড রকম দুলে ওঠে! সুমি বিদ্যুৎ বেগে উঠে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলে দরজা বন্ধ হওয়ার ধাতব শব্দের রেশ সমস্ত বাগান জুড়ে ঘূর্ণি তোলে ছোটো ছোটো! আশালতা ওপরের দিকে তাকিয়ে হাঁকাড় দেয়, “কে রে? কে রে ওখানে?” এইবার দু একটা শুকনা তালপাতার সঙ্গে সড়াৎ করে নেমে আসে একটা পুঁটুলির মতো বস্তু! মিশমিশে কালো বস্তুটা সন্ধের পাতলা অন্ধকারের মধ্যে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারে না, শেষমেশ যেন বেশ হতাশ হয়েই উঠে পড়ে! বস্তুটা চলে মানুষেরই মতো, কিন্তু তার অবয়ব কিছুই বোঝা যায় না! মানুষের মতো পা দু পা হেঁটে বস্তুটা আশালতার কাছে পৌঁছে অবিকল মানুষের স্বরেই বলে ওঠে, “আমি কাকিমা! আমি দিব্যেন্দু!” “ওমা! দিব্যেন্দু, মানে দিবু? আমাদের ওই গোকুল মণ্ডলের ছেলে?” আশালতা চিনতে পেরে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন, তার মুখের খাঁজগুলোতে কালির প্রলেপ একটু ফ্যাকাসে হয়ে আসে! “তা কবে এলি এখেনে? তোকে তো আগে দেখি নাই বাবা! নিত্যি কতজনা আসে! তোকে তো দেখি নাই! ছিলিস কোথায়?” দিব্যেন্দু নামধারী বিমূর্ত অবয়বটা সুমির ছেড়ে যাওয়া মোড়াতেই বসে পড়ে! “তা আর বলেন কেন! অনেক ঘাটের জল খেয়ে তবে এসেছি! অপঘাত বলে কথা! চট করে কি ফেরা যায়?”
– তা বটে, তা বটে! অপঘাত হলে ফিরতে একটু দেরী হয় বৈ কি বাবা! তা আছিস কেমন? ধুর, কেমন আছিস সে তো দেখতেই পাচ্ছি! রাগ করিস নে বাবা! বয়েস হয়েছে তো! পুরোনো অভ্যাস গুলো মাঝে মাঝে ফিরে আসে!
– আরে না না, রাগ করবো কেন! আপনি কেমন আছেন বলুন! আপনি চেহারা কিন্তু অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছে কাকিমা!
– আরে বাবা জীয়ন্তের বয়েস বাড়বে না? গতর থাকলেই শরীর খারাপ হবে! ও নিয়ে চিন্তা করিস না বাপ! অবিশ্যি করারই বা এখন কে আছে! যাক, তুই বললি, বড় আরাম পেলাম বাপ! অ্যাঁ? কী বলিস! তোদের মতো সুখী আর হতে পারলাম কই বাবা! যমেও নিলে না! এখনও কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বেঁচে আছি! আমি বলি, আমি বামুনের মেয়ে, হ্যাঁ? এতটুকু কি আমার পুণ্যি নেই যে পোড়ার মুখো যমেও আমারে নেয় না? খালভরার মুখে পোকা পড়ুক!
– আমার ঠাকুমা কী বলতেন জানেন? এই যে লাখো লাখো জোনাকি, এরা আদতে যমের চোখ! মাঝে ইলেকট্রিকের ঠ্যালায় এক্কেবারে কমে গিয়েছিল! এখন চারিদিকে থই থই করছে দেখুন! ওরা ঠিক সময় চেনে!
– সরাকদের বাপু কায়দায় আলাদা! এত বয়েস হল জীবনে তো এমন কথা শুনি নাই বাপু! আমার বাবা আমার মায়ের হাতে পর্যন্ত কোনদিন জল খান নাই! সেই বিধান তেওয়ারীর মেয়ে আমি! আমাকে ওসব গল্প দিস না, হুর”

আশার গলার ভেতর থেকে আবার কফের দলাটা উঠে আসে ভুল করে! কিন্তু এবারেও ভেতর দিকে তাকে সেঁধিয়ে দিয়ে আশা প্রশ্ন করে, “তা হ্যাঁরে, দিব্যেন্দু, তুই ওই টুকুন ছেলে, হঠাৎ স্যুইসাইড করলি কেন বাবা?”
দিব্যেন্দুর মাথা থাকলে এতক্ষণে হয়তো দেখা যেত সে মাটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে! কিন্তু তার সামগ্রিক প্রকাশেই অনিশ্চয়তা থাকায় এই মুহূর্তে সে যে কী করছে বোঝা যায় না! কিছুক্ষণ চুপ থেকে দিব্যেন্দু বলে, “সে আর শুনে কী করবেন কাকিমা! এখন আর লাভ কী?” আশালতা হাঁ হাঁ করে ওঠে, “কী যে বলিস! তখন আর এখন! তখন শুনি নাই ঠিকই, তা সরাকের কি জাতের ঠিক আছে না পাতের ঠিক যে তার কথা শুনব! তখন বয়েসটাও তো পঁচিশ তিরিশ বছর কম ছিল বাবা! মনের তেজ বেশি ছিল! কিন্তু এখন আর সে সব কই! এখন কারোর মরার গল্পে বড্ড শান্তি পাই বাবা! নিজের তো আর হাড় জুড়ালো না!” দিব্যেন্দু স্বর নামিয়ে বলে, “সে ওই একই গল্প! কারখানা বন্ধ হল! একটা মুদির দোকানে কিছুদিন কাজ করলাম। সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। মালিক দোকান উঠিয়ে পালিয়ে গেল। চলে না দোকান, খদ্দের নাই! কেন রাখবে?” আশা গালে হাত দিয়ে যেন খানিকটা অবাক হয়েই বলে, “কেন? পালিয়ে গেলি না কেন? তোর তো নিজের জায়গা জমি ছিল না যে ধরে বসে থাকবি! কোয়ার্টারে থাকতি!” “পালিয়ে যাব কোথায় বলুন! মানুষ পালিয়ে নিরাশ্রয় ছেড়ে যায় আশ্রয়ের আশায়! সেই জায়গা কি আর বেঁচে আছে? গোটাটাই তো শ্মশান!”
আশা চমৎকৃত হয়! “ব্রহ্ম তো সর্বত্রই বাবা! ব্রহ্ম এই শ্মশানেও, বুঝলি! খুঁজে দেখতে পারতি!” স্তূপটা একটু ইতস্তত করে উঠে দাঁড়ালে চাঁদের আলোটা আরো এক পোঁচ ঘন হয়। দিব্যেন্দু বিড়বিড় করে বলে,”আমরাও তো সর্বত্র। একপ্রকার পরমেরই প্রকাশভঙ্গি মাত্র!”
“অ্যাঁ! কিছু বললি?”
“না কাকিমা!” তারপর একটু থেমে দিব্যেন্দু বলে, “লাগাতার হপ্তাখানেক শুধু জল খেয়ে বুবাইয়ের খালি বমি হচ্ছিল! পেটে কিছু থাকছিল না! একসময় সেই শব্দেই মাথাটা আর ঠিক থাকল না, বউ বেটাকে বহুদিনের ফেলে রাখা শিলে মাথা ছেঁচে, নিজেও ঝুলে পড়লাম আর কি! এখন আর অভাব নাই!”
“তা তোর বউ বেটা গেল কোথা?”
“কে জানে! আছে সবাই নিজের মত! আমরা জীয়ন্ত শরীর ছাড়া আর সাড় পাই না আজকাল কাকিমা! সে তো হাতে গোনা এখন! হয়তো নিজের মতো খুঁজে নিয়েছে কাউকে! মরার পরে আর টান থাকে না!”

আশার গলার স্বর ভিজে আসে! “একদম টান থাকে না? হ্যাঁ রে? সত্যি বলছিস?” কথাটার প্রতিটা শব্দ আশার চোখে মুখে মাকড়সার জাল হয়ে প্রতি মুহুর্তে আরো ঘন বুননে জড়িয়ে যেতে থাকলে আশা খেই হারিয়ে ফেলে। তার মনে হয় এই আগুনের সাক্ষী খানিকটা সে নিজেও নয় কি! কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে ফেলে যাওয়া চাকের ধারে কাছে আর লোকজন আসে না বাইরে থেকে। জায়গা ক্রমে খালি হতে শুরু করে। তার ছেলের হোটেলও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়! আশে পাশের গ্রামগুলোর ছোটখাটো ব্যাবসা সব বন্ধ হয়ে যায়। গনেশ উলটিয়ে লালবাতি জ্বালতে জ্বালতে গোটা এলাকা কোনদিকে এগোচ্ছিল বোঝা যায় না! তার মধ্যে দুর্ভিক্ষের মহামারি লেগে গেল। কত মরল আর কত পালাল কে জানে! সমস্ত চরাচর ধীরে ধীরে শ্মশান হয়ে এল! আশার মনে হঠাৎ ঘাই মারে তার ছেলের কথাটা! সে হঠাৎ বলে ওঠে, “আমার বাবুটাও তো বাঁচল না রে! বেটার বউ আবাগি কী যে বাণটা মারল! বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ক্যান্সার ধরা পড়লো! ভেলোর নিয়ে গেলাম, কোলকাতা নিয়ে গেলাম, কেউ কিচ্ছু করতে পারলে না! হোটেল তো উঠেই গেছিল, পুকুর জমি সব্বোস্ব গেল সেই সর্বনাশা রোগে! আমি বলি দুটো টাকা খরচ করে যদি ভগবানের জিনিস বাঁচানো যেত, তাহলে তো হয়েই যেত! ছেলে আমার বাঁচল না! এই বাগান তার নিজের হাতে তৈরী! কত ফুল! তুই তো দেখেছিস বাবা! সব শেষ হয়ে গেল! যে দুয়েকটা গাছ বেঁচেছে, ওদের মালি বা মালিক কিছুই লাগে নাই দিবু, কিছুই লাগে নাই!” শেষের দিকে আশালতার গলা অত্যন্ত ভারী হয়ে মালি বা মালিক ছাড়াই বেড়ে ওঠা কামিনী ফুল ভর্তি গাছটাকে সদর্পে মুড়িয়ে ছিঁড়ে ছিবড়ে করে ফেলতে চায় বেঁচে থাকার অপরাধে। পারে না। গাছটার গোড়ায় সেই অপারগতা জমে আচ্ছন্ন একটা নেশা তৈরি করলে সেই নেশার ভিতর অসংখ্য জোনাকি পাক দিতে দিতে উড়ে যায় গাছটি থেকে। একা কামিনীর পাতা ছলছল করে শুধু। তা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেই বিমূর্ত অবয়ব বলে, “তা কাকীমা, সুমি কই? ভেতরের ঘরে? তাহলে এইবেলা যাই, বুঝলেন! সেরে আসি।” এতক্ষণে আবার আশার চোয়াল দৃঢ় হয়ে ওঠে, “দেখো বাবা, পায়েস, মিষ্টি, তেল কই, বাসন্তী চালের ভাত, ডাল আর আলুভাজা, দুই জনের পরিমাণ এই সমস্ত লাগবে! আমার সত্যনারায়ণের ভোগও চড়াতে হবে তো! তুই প্রথমবার এলি বলে কম ধরছি! পরের বার থেকে কিন্তু বাড়বে। কাজ সেরে দেব না বললে কিন্তু হবে না!” দিব্যেন্দু আরেকটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে! তার অনাহারে মরা পরিবার মনে পড়ে নাকি বুড়ির চোখে ব্রহ্মের অহেতুক অবয়ব ধারণের প্রতি লোভ দেখে মন তার উদাসীন হয় কিছুই বোঝা যায় না! প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। লোহার দরজা আবার শব্দ করে বন্ধ হয়। সেই হেমন্তের ঠাণ্ডা রাতে একরাশ হিম মাথায় নিয়ে বুড়ি তার দৃষ্টি পাকিয়ে তোলে ক্রমশ। সেইখানে, সেই বাগানে জ্বলতে থাকে এক লেলিহান চিতা! সেই চিতার মধ্যে বুড়ি নিজের ব্যাটার বেরিয়ে থাকা পা দেখতে পায়! সেই পায়ের সঙ্গে তার স্বামীর পায়ের কী ভীষণ মিল! একটা বুনো আকাঙ্ক্ষা আশালতার সত্তর বছরে শরীরের সাড় না পেয়ে কামিনী গাছের ডাল থেকে ডালে হাহাকার করে ঘুরে বেড়াতে থাকে। পোড়া গন্ধে চারিদিক ভরে উঠলে চিতার আগুনের চটচট করে কাঠ ফাটার শব্দ ধীরে ধীরে পরিনত হয় একটি বিমূর্ত ভৌতিক অস্তিত্বে ও একাধারে সুমির মানবিক শীৎকারে! ও কি! অত আলো কেন? কুয়োর উপরে অসংখ্য জোনাই জড়ো হয়ে ঘোরে চক্রাকারে। জ্বলন্ত চাকা চলে যেন এক! ওরা কি তবে বুঝতে পারল! আশালতার বয়েস এক ধাক্কায় কয়েকশো বছর বেড়ে যায়। গিলে রাখা কফের মণ্ড ওর বুকের ওপর ধীরে অতি ধীরে চাপ দিতে থাকে। দিব্যেন্দুর ঠাকুমা কি তবে সত্যি বলত নাকি? ধ্যার সরাকের মেয়ে! কিন্তু তাহলে এ কী হচ্ছে? ওরা কি সত্যি খোঁজ পায় নাই? কেমন কামিনী ফুটেছে…আলোছায়ার বুকে সরে যায় কেউ…চিতা গনগন করে…সুমি শীৎকার দেয়…এত আলো…জ্বলে নেভে…জোনাইয়ের এত ভিড় কেন? কুয়োর নিচে…না না……তারা তো বন্দী…ঐ খানকিকে যমে আগে নেবে কেন তার থেকে?…জোনাই যদি যমের চোখ হয়ও………কেন নেবে আগে? আগে তাকে নিক! ওরা কি জেনে গিয়েছে? আচ্ছা মৃত বাবু জানে নাই তো যে তার বাড়ির কুয়ার নিচে বহু নিচে তার ডাইনি বউয়ের ছেঁচে দেওয়া ঘাড় থেকে মাংস পচে গলে ক্রমশ মিশে গিয়েছে…অতলে……কুয়োর তলায় সেই ঘোলাটে কঙ্কালের গায়ে লটকে আছে একটা বছর খানেকের ছোট্টো কঙ্কাল…বাপঘেঁষা…সে কি বাবুই ছিল না? ফাঁকা ফাঁকা…বুকে বড্ড চাপ মা গো!…কুয়োর মুখটা তারপরে মন্ত্র দিয়ে বাঁধা…বাবূর ঠোঁট…অবিকল বাপের মতো… যাতে ওরা চিরকালের মতো আটকে থাকে, ছটফট করে,বেরোতে না পারে…শাস্তি…শাস্তি চাই…না হলে সমাজ টেকে?… বেরোলেই তো মুক্তি…ছেলেটা…আর আসে নাই গোওওও…আর… মাগী আবার সম্পত্তির ভাগ চেয়েছিল, দেওয়াচ্ছি সম্পত্তি তোমায় খানকি মাগী, দাঁড়াও… আচ্ছা! বাবু কি সেই জন্যেই আর আসে না?…বড় আগুন…চিতাটা কেমন জ্বলে…এত জোনাই কেন…ঐ যাহ্…হুসসসস্…যাহ্… না, দিব্যেন্দু তো বললই মরলে আর টান থাকে না… তাইই হবে! নিশ্চয়ই তাই! সরাকের বেটি আবাগী বাজে কথা বলেছে…সরাকের আবার…পাওনা গুনতে হবে নি? সময়…সময় হল? সময়…খালভরা জোনাই গুলো তাড়ানো দরকার…চক্রটা ভাঙা দরকার…গোল জ্বলন্ত চাকা…খুব ঘুরছে…কুয়োর জলে তার ছায়া…কুয়োর ওপরে জোনাই ঘোরে? নাকি অতলে? হুসসস…হুসসস…জোনাইগুলো অশুচি…হুসসসস…গেলি? ঢেমনির বাচ্চারা…গেলি? হুসসস্…
তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে বহুদিনের মোড়ার ঘন শিকড়েই বুঝি পা বেধে আশালতা হুমড়ি খেয়ে পড়ে কামিনী গাছটার গোড়ায়…বন্ধ দরজার ভিতর থেকে শুধু সুমির তীব্র সত্যি অথবা মিথ্যা শীৎকার কামিনীর গাঁটে গাঁটে ঝঙ্কার তুলতে থাকে…

Facebook Comments

Posted in: September 2020, STORY

Tagged as: ,

Leave a Reply