রবীন্দ্রনৃত্য ভাবনাঃ প্রেক্ষিত ও চলন – সোমা দত্ত

fail

মুখবন্ধ:

“মানুষের জীবন, বিপদ সম্পদ –সুখ দুঃখের আবেগে নানাপ্রকার রূপে ধ্বনিতে স্পর্শে লীলায়িত হয়ে চলেছে;তার সমস্তটা যদি কেবল ধ্বনিতে প্রকাশ করতে হয় তাহলে সে এক বিচিত্র সংগীত হয়ে ওঠে,তেমনি আর সমস্ত ছেড়ে দিয়ে সেটাকে কেবলমাত্র যদি গতি দিয়ে প্রকাশ করতে হয় তাহলে সেটা হয় নাচ।“ জাভাবলীর পত্র,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই লাইনগুলি পড়ে মনে মনে যেন সেই প্রাচীনতম যুগে চলে গেলাম।বেশ কল্পনা করতে পারছি যে জগতে পশুপাখী, নদী, ঝরনা, বায়ু, গাছের পাতার শিরশিরানি এ ছাড়া আর কোনো শব্দ কোথাও নেই, মানুষ এখনো কথা বলেনা। তাহলে কি ভাবে যোগাযোগ স্থাপন করে একে অপরের সাথে? কি করে প্রকাশ করে তার সব অনুভূতি? অঙ্গভঙ্গি, নিজের হাত পা চোখ মুখ, গোটা শরীর তো নড়েচড়ে ভাব প্রকাশ করে। এখনো এত এত ভাষা সৃষ্টি হওয়ার পরও কথা বলার সময় মানুষ হাতপা নাড়ে।প্রাচীন অভ্যাস বহন করছি আমরা।খুব প্রয়োজনীয় অঙ্গভঙ্গির সাথে সাথে আনন্দ, উচ্ছ্বাস, লগ্নতা, ক্রোধ সব আবেগ প্রকাশ করতেও নানান অঙ্গভঙ্গির জন্ম দিয়েছিল তারা।এখানেই জন্ম মাইম ও নৃত্যের।কিভাবে কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গী কোন নির্দিষ্ট আবেগকে প্রকাশ করবে তা কি ভাবে স্থির হল? সেখানে কাজে লাগল প্রকৃতিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করার জ্ঞান।গাছ থেকে নেমে মানুষ যখন দু’পায়ে দাঁড়াল তখনি তার চোখের সামনে খুলে গেল গোটা জগতের রূপ। ওপর থেকে নয় সামনাসামনি দেখল জীবজগৎ ও প্রাণীজগৎকে।নাচে যে সব মুদ্রা আমরা ব্যবহার করি তার দিকে তাকালে এ সত্য প্রকাশ পায়,যা পরে নানান শাস্ত্রগ্রন্থে কোডিফায়েড হয়েছে। আকাশের চাঁদ, গাছের পাতা,ময়ূর্‌, হরিণ, সাপ যা কিছু মানুষ দেখছে হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে তাকেই রূপ দিয়েছে। শরীরের ভঙ্গীতেও যে তারা পশুপাখির ভঙ্গি অনুকরণ করবে তা আর আশ্চর্য কি।
যদি শিকারী মানুষকে মনে করি, শিকার করতে শিখল কেমন করে? প্রথমে সে ফলমূলের সাথে খেত শিকার করা পশুর উচ্ছিষ্ট। লক্ষ্য করত বড় পশুরা কেমন করে ছোট পশুদের শিকার করে। এভাবে সে নকল করল শিকারী পশুর দেহভঙ্গি।ছোট যে পশুকে সে শিকার করল লক্ষ্য করল তাকেও কারণ সেই অনুযায়ী তাকে স্থির করতে হবে তার চলন, ভঙ্গি। এবার তা তাকে অভ্যাস করে রপ্ত করতে হবে না হলে শিকারের সময় সে সফল হতে পারবেনা।এভাবেই তার নিজের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই তাকে শিখতে হল শরীর চালনা করতে। শরীর যত চলে তাতে মগজেরও পুষ্টি বাড়ে, শরীরী ভাষা সৃষ্টির এই হল প্রাথমিক ধাপ।এখানে তার শিক্ষক একমাত্র প্রকৃতি আর সে নিজে।নৃত্যের জন্ম একপ্রকার এখানেই।
আবার সবসময় যে শিকার জুটে যায় তাও নয়। অসফলও হতে হয় তাকে।এই অসফলতা ও সফলতার মাঝখানে ঢুকে বসে কিছু মায়াময় কল্পনা যা তাকে আবার কর্মে উৎসাহিত করে। সবই প্রকাশিত হতে থাকে শরীরের মাধ্যমেই।শরীরের ভাষা, ও তার কন্ঠাগত কিছু শব্দ সবমিলে জন্ম হয় এক মায়াময় পরিবেশনা যাকে জাদুবিদ্যা বলা হয়।
আবার শিকারজীবি মানুষ যখন কৃষিজীবী হচ্ছে তখনও সে আর একপ্রকারে প্রকৃতিকে জয় করতে বেড়িয়েছে।স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতি যে ফলমূল দিয়েছে তার উপর নির্ভর না করে নিজে উৎপাদন করে নিতে চেয়েছে। আবার প্রকৃতির নিয়মকানুনের বাইরে যে কিছুই করা সম্ভব নয় তাও সে বুঝেছে প্রকৃতিকে লক্ষ্য করেই। যথা সময়ে বৃষ্টি না হলে ফসল তো হবে না,আবার অতিবৃষ্টিতেও হবেনা।একদিকে লক্ষ্য করা হাওয়ার গতিপথ,আকাশের রঙ,অনুমান করার চেষ্টা বৃষ্টি হবে কি, হবেনা? অন্যদিকে সফলতা অসফলতার মাঝের যে পরিসর সেখানে জাদুবিদ্যা আরো বিস্তৃত ও মায়াময় হয়ে ওঠে। এতে একদিকে শারীরিক শক্তিক্ষয়ও হয় আবার এসবের ফলে একটা কিছু ঘটবে সে আশাও জন্মায়, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জ্ঞান যে এখানেও কিছু কাজে লাগে তাও নিশ্চিত।সবকিছু মিলেই গড়ে ওঠে প্রাচীন জাদুবিদ্যা, যা আবার নাট্যের আঁতুড়ঘর।
পরবর্তী কৃষিজীবনেও মানুষের সবকাজের সাথেই জড়িয়ে আছে ছন্দ, সুর তাল।দৈনন্দিন জীবনে তারা প্রকৃতির সাথেই অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত,যুক্ত উৎপাদনের সঙ্গে।প্রাথমিকভাবে মানুষের আচার ধর্ম শিল্প সংস্কৃতি এ সবের মূল চালিকাশক্তি হল এই দুই, প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করা ও উৎপাদনের রহস্যকে জানা ও ব্যাখ্যা করা।মানুষ যখন অবসর পেয়েছে তখনই আরো গভীরভাবে ভাবতে পেরেছে এবং তার কাছে নানা রহস্য উদ্ঘাটিতও হয়েছে।ভাবনার গভীরতা নানা বিষয়ে সূক্ষতা নিয়ে এসেছে, কামও তখন কলা হয়ে উঠেছে।এই সূক্ষতা ও সৌন্দর্যবোধ শিল্পের জন্ম দিয়েছে।নৃত্যের ইতিহাসেও আমরা দেখি কিভাবে সূক্ষ থেকে সূক্ষতর হয়ে উঠেছে ভাব প্রকাশের ভঙ্গি।
এরপর নাচ চলেছে মানুষের সভ্যতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে,তার জীবন জীবিকার প্রয়োজনে, সুখ দুঃখে, ভয় ভাবনায় তার দোসর হয়ে।কিন্তু নগর জীবনে নাচ এমন কোণঠাসা হয়ে দাঁড়াল কেন?অষ্টাদশ শতক থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা কলকাতাই তো আর একমাত্র শহর নয়। এর আগে ইতিহাস জুড়ে নানা নগরের গড়ে ওঠা ও তার বিবরণ আছে।সমুদ্র তীরবর্তী প্রাচীন বাণিজ্য নগরী কালিকটই হোক বা শতাব্দী প্রাচীন বৈশালী নগরী, সব যুগেই সব নগরের সমসাময়িক সাহিত্যে,স্থাপত্যে,চিত্রে ‘নগরনটি’ র দেখা পাওয়া যাচ্ছেই।দক্ষিণের ‘শিলাপদিকরম’ ও ‘মণিমেখলাই’ এ মাধবীর কাহিনীই হোক বা বৈশালী নগরীর আম্রপালী, নগরনটী আছেন কাহিনীর কেন্দ্রে। আবার এসবই সম্পদ ও তার দখলের কাহিনী যার সাথে জুড়ে আছে ধর্ম ও রাজনীতি, সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে।আরো অতীতে চলে যাই যদি, রামায়ন মহাভারত পুরাণ, সব রাজার দরবারে নাচের উপস্থিতি,ইন্দ্রের দরবারে নাচ আছেই।নৃত্য গীত বাদ্যের সাথে যুক্ত পৃথক গোষ্ঠী গন্ধর্বরা থাকতেও অপ্সরাদের প্রয়োজন হয় ইন্দ্রের দরবারে। মাঝে মাঝেই কোনো ঋষি মুনির পক্ষ থেকে বিরোধের আশঙ্কা পেলেই এই অপ্সরাদের পাঠিয়ে দেওয়া হত তাকে মোহাবিষ্ট করতে, পরে তার সাথে একপ্রকার সন্ধি করা সম্ভব হত। নাট্যশাস্ত্রে যে আটটি রসের কথা বলা হয়েছে, শৃংগার তার প্রথম রস, রতি যার ভাব। কাম, রতি, শৃঙ্গার এই শব্দগুলিরই ব্যবহার হচ্ছে নরনারীর যুগল মিলন বোঝাতে। কাম প্রানীজগতে অত্যন্ত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। কাম এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই না পুরোদস্তুর একজন দেবতার সৃষ্টি করতে হয়েছে। কামদেব অথবা অনঙ্গদেব বাণে কামাবিষ্ট হয়ে নরনারী সংগী অথবা সঙ্গিনী খুঁজে বেড়ায়।আবার এই ‘অনঙ্গ’ শব্দের কতরকম অর্থ, দেহহীন,আকাশ,চিত্ত।কাম যা চিত্তকে অধিকার করে? কাম এবং রূপজ মোহ, তার সাথে যুক্ত হল নৃত্য ও লাস্য যা একত্রে এতটাই শক্তিশালী হাতিয়ার, শত্রুপক্ষকে বাগে আনতে তার প্রয়োগও হচ্ছে অব্যর্থভাবে। অমৃতভান্ড রক্ষা করতে বিষ্ণুকেও মোহিনীরূপ নিতে হচ্ছে। যার হাতে ক্ষমতা,তার কাছে এও আর এক অস্ত্র। নৃত্যের সাথে ভোগের সম্পর্ক সেই যুগ থেকেই কিন্তু তাই এক এবং একমাত্র নয়, পাশাপাশি নৃত্যের শিল্পীত রূপও গড়ে উঠেছে।আবার মূলবাসী মানুষ, গ্রামীন কৃষিজিবী মানুষের নাচ তার জীবনের সাথে জড়িয়ে বয়ে চলছে উচ্ছ্বল নদীর মতই। এত হাজার বছর পরেও এত ঝড় ঝাপটা সয়েও পৃথিবীর প্রাচীন কিছু প্রজাতী যেমন এখনো বেঁচে আছে বেঁচে আছে তাদের নাচও।কোল, ভীল ,মুন্ডা,সান্তাল,আফ্রিকার বিভিন্ন প্রজাতি এবং তাদের নাচ এরই সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
যে প্রশ্নটা থেকে এত কথা উঠে এল, এবার আসি সেই জায়গায়।নাচ নগরজীবনে কোণঠাসা হল কেন? নাচ যে পরিসরেই ভোগের সামগ্রী হয়েছে সে পরিসরেই পরিবেশক ও ভোক্তা তৈরি হয়েছে,যা গ্রামীন স্তরগুলোতেও হয়েছে, কিন্তু তা সমগ্র গ্রাম্যজীবনের সামাজিক পরিসর থেকে নাচকে সরিয়ে দিতে পারেনি। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা যে ভারতবর্ষে ঠিক কবে থেকে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও তা যে বহাল তবিয়তেই ছিল তা নিশ্চিত।সে সামন্তরাজা সম্পদ সঞ্চয় যেমন করেছে ভোগও করেছে যথেচ্ছ, সে তালিকায় নাচ ও ছিল।এই বাঙ্গলাতেই নাচনী, ঝুমুর লাস্য প্রধান এই নাচগুলি কিন্তু এখনো রয়েছে।ভোক্তা নাচ করে না,নৃত্য পরিবেশনের জন্য তখন একটি পৃথক দল তৈরী হয়েছে,যারা শুধু এর চর্চা করবে।আর চর্চায় যে কোনো বিষয়ের মান উন্নত হতে বাধ্য এবং তা হয়েওছে। যে প্রকৃতির কাছে শিক্ষার কথা প্রথমেই বলেছি, নাট্যশাস্ত্রে এসে তারই অতি উন্নত নির্দিষ্ট কাঠামো নির্মিত হতে দেখব। নাচ যখনই ইন্দ্রীয় ভোগের বস্তু হয়েছে তখনি তার সাথে ভোগের উপাদান মিশ্রিত হয়েছে,কিভাবে ভোক্তাকে খুশি করা যায় তার প্রচেষ্টা এসে পড়েছে। এর সাথে আবার এই চর্চাকারী দলের গ্রাসাচ্ছাদন নির্ভর করেছে। নগরজীবনে ও গ্রামজীবনের একটা অংশে তাই দু’টি দল, একদল নাচের চর্চা করে আর একদল যারা এদের পৃষ্ঠপোষক ও ভোক্তা। নগরজীবনে এই ভোক্তা বা পৃষ্ঠোপোষক যারা, তারা কিন্তু নাচেন না বা তাদের বাড়ির মেয়েরা বউরাও নাচেনা।গ্রামজীবনে রসিক নাচনী ও তার দলবল যেমন একটা অংশ আবার সামাজিক জীবনে বাড়ির মেয়ে বউদেরও নাচ ছিল পাশাপাশি।
সমস্ত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই নতুন কিছু গড়ে উঠেছে সর্বকালেই।এই সামাজিক জীবনে যা গড়ে উঠল তা কখনো সরাসরি ধর্মের হাত ধরে কখনো ধর্মীয় সংস্কারের অংগ হিসেবে।নগরজীবনে যখন বৃহৎ মন্দির গড়ে উঠল তখন মন্দিরের সংগে সংযুক্ত শিল্পধারার সমৃদ্ধি ও প্রসার হল এই ধর্মের প্রচার ও প্রসারের প্রয়োজনেই।মন্দিরে দেবদাসী ধারার নাচ গড়ে উঠল। অন্যদিকে আবার ধর্মীয় উৎসবে মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে মেলার প্রচলন হল একদিকে অর্থনৈতিক কারণে অন্যদিকে সামাজিক কারণে।সরাসরি মন্দির ও ধর্মের সাথে যুক্ত না হয়েও এই মেলা একপ্রকার সামাজিক মিলনের কাজ করল,যেখানে সামাজিক জীবনের বৃহৎ পরিসরে খুব সূক্ষভাবে ধর্মীয় ভাবধারার প্রসার হতে থাকল। এই সমস্ত পরিসরের নাচ হিসেবে আমরা চিহ্ণিত করতে পারি দক্ষিণের কোইকোট্টীকোলি, বাঙলার ধামাইল( মেয়েরা গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচে) প্রভৃতি কে।প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা,উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে জুড়ে থাকা গ্রামজীবনের যূথবদ্ধতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে,যা তাদের শিল্প সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে,নানান ঝড় ঝাপটা সত্ত্বেও একেবারে ভেংগে পড়েনি, এই শতাব্দীর বিচ্ছিন্নতাবোধ একে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। নগরজীবনে সংকট এসেছে আরো অনেক আগে।যত মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে সরেছে, যত সরে এসেছে কায়িক শ্রম থেকে,উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে যূথবদ্ধতা ততটাই সরে গেছে তাদের জীবন থেকে। সেখানে নাচ শুধুমাত্র ভোগের উপকরণ হয়েই রইল।

কলকাতা নগরী ও তার জীবনযাত্রা:

কলকাতা নগর মূলত গড়ে উঠেছে সামুদ্রিক বন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে।তখন সে নগরে দেশিয় তথা বিদেশী বণিকদেরও জীবন জীবিকার কোনো নিশ্চয়তাই ছিলনা বলা চলে।শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে দেশী বিদেশী মানুষ মরেছে এই নগরের জলহাওয়ায়। তারপর যখন ইংরাজ তার ব্যবসা ও শাষন নিয়ে জাকিয়ে বসল তখন সরাসরি ব্রিটিশ ও নেটিভ এই দুইধারা জীবনে ভাগ হয়ে গেল কালকাতার নাগরীক জীবন।ব্রিটিশ কলোনী বলতে বড় বড় আলো ঝলমল প্রাসাদ, নাচা গানা ভোগসর্বস্ব জীবন। আর নেটিভ কলোনি পুতিগন্ধময় নরক। ইংরাজের সাথে ব্যবসায়িক যোগে এক অংশ বাঙ্গালির অর্থ ও প্রতিপত্তিলাভ আবার তাদের চাকুরী করে বাঙ্গালি বাবুশ্রেণীর উদ্ভব। বাংগালি বাবুশ্রেনীও ভোগ বিলাসে কিছু কম যেতেননা তার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। একদিকে ইংরাজ টাউনহল বানাচ্ছে তাদের সপ্তাহান্তের বিলাসের জন্য(নেটিভদের মধ্যে করা লটারির টাকায়) তো তাদের কেরানীরা রাইটার বিল্ডিংয়ে গুটিকয়েক চাকর, রাঁড় নিয়ে সংসার সাজাচ্ছেন।আরো একটু পদোন্নতি হলে একেবারে বাগানবাড়ি। এহেন বাংগালির শিল্প সংস্কৃতি সম্পর্কিত রুচিবোধ কেমন হবে তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
রবীন্দ্রনাথ যে কলকাতায় বড় হচ্ছেন তার খানিক চিত্র আমরা পাই তার রচনা থেকে এবং কলকাতার মোটামুটি যে ইতিহাস আমরা পাই তা থেকে।সেখানে বাঈজীনাচ, খেমটা, খেউড় সবই ছিল শুধু ছিলনা,পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নাচের চল। উচ্চাঙ্গ সংগীত কিছু কিছু ভিতর বাড়িতে ঢুকলেও নাচ কিন্তু বাইরের বিষয়।নাচ হবে বাগানবাড়িতে, রাত হবে রঙীন।কে কত বড় বাঈজী এনে আসর বসাতে পারল তার প্রতিযোগিতা চলবে জমিদার ও বাবুদের মধ্যে। বাহির বাড়ির নাচের মূরচ্ছনা ভেসে আসবে অন্দরে,নাচ আসবেনা।তাই বোধহয় জাভা ও বালীদ্বীপ ভ্রমনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠি লিখছেন তাতে এই অঞ্চলের নৃত্য সম্বন্ধে মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।তিনি জাভাযাত্রীর পত্রে লিখছেন, “এখানকার নাচ তাদের ভাষা, মনোহারিতা বা ভোগের বিষয় নয়।“
উনিশ শতকের কলকাতা আবার শুধুমাত্র নবাবিয়ানাতেই মজে ছিলনা,আরো নতুন নতুন ঢেউ এসে লেগেছিল এই শতকে বাঙালিবাবুদের জীবনে।হিন্দু কলেজ, সভা সমিতি, সোসাইটি, ধর্মসভা, সতীদাহ নিবারক আইন,প্রথম বাংলা কাগজ, ইয়ং বেঙল, গৌড়িয় সমাজ, তত্ত্ববোধিনী সভা এমন আরো কত কি।বাঙালি বাবুর আর এক নতুন অবতার আবির্ভূত হল বলে চলে, উদারপন্থী বাবুসমাজ। যারা বিভিন্ন “পাবলিক ইস্যু”তে কলম ধরেন, সভা সমিতি করেন।উনিশ শতকে কলকাতায় বাঙালির কাছে নতুন নতুন জীবিকার পথ খুলে যেতে জন্ম হয়েছে নবতম মধ্যবিত্ত সমাজের।এমন ধারনা করা যেতে পারে যে,এইসব সভা সমিতি সোসাইটি মোটামুটি তিন ধরণের অবস্থানে ভাগাভাগি হয়ে চলেছিল, সনাতনপন্থী, উদারপন্থী, ও চরমপন্থী।সমস্ত পক্ষেই কিছু সাহেবের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেছিলেন তারা।নব্য শিক্ষিত যুবসমাজ যে বিদ্যের গৌরবে উদারপন্থী ও চরমপন্থী হয়ে উঠেছিল তা আসলেই এই সাহেবি সংসর্গের ফল তা একপ্রকার নিশ্চিত।সাহেবিয়ানাই মূলত এই শ্রেনির বাঙালি বাবুদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল বলা যেতে পারে।উনিশ শতকের এই উদারপন্থা ও সংস্কার আন্দোলন যদি প্রকৃত অর্থে দেশের খুব কাজে না লেগে থাকে তার মূল কারণও এই মনোভাব,যার সাথে দেশের আপামর জনগনের যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি।এই আন্দোলন শহুরে মধ্যবিও ও হিন্দুদের আন্দোলন হয়েই রয়ে গিয়েছে।এই ধারা উনিশ শতক ছাড়িয়ে বিশ শতকেও প্রবেশ করেছিল, যার একরকম প্রকাশ আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘গোরা’ উপন্যাসে।এ প্রসঙ্গে আসব খানিক পরে।
বিংশ শতকের গোড়ায় বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব এবং তার বিরুদ্ধে বিপুল আন্দোলন বাঙ্গলা ও বাঙ্গালির ইতিহাসের এক বৃহৎ অধ্যায়।রাজনৈতিক সামাজিক শিক্ষা ধর্ম সমস্ত ক্ষেত্রগুলিতেই একপ্রকার পরিবর্তনের আভাষ পাওয়া যেতে লাগল এই সময়।রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় স্থাপন করলেন এক ভিন্নতর শিক্ষার আদর্শে। ‘গোরা’ ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস লিখছেন, প্রকাশিত হচ্ছে যথাক্রমে ১৯১০ ও, ১৯১৬ সালে।কোন ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়। তারও আগে ১৮৮০ সালে ইংলন্ড থেকে ফিরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে নাটকের গানের সাথে নাচের সংযোগ ঘটাচ্ছেন তিনি ‘মানময়ী’ নাটকে। ‘আয় তবে সহচরী’ গানটির সাথে বিলিতি ঢঙে নাচ শিখিয়েছিলেন তিনি। শহুরে শিক্ষিতের পালে নাটকের সাথে নৃত্যের হাওয়া লাগাতে এই ছিল তাঁর প্রথম পদক্ষেপ।

ক্রমশঃ

Facebook Comments

Leave a Reply